📄 আটলান্টিকের তীরে সেনাপতি উকবা
আটলান্টিক আর ভূমধ্য সাগরের নীল পানি বিধৌত উত্তর- পশ্চিম আফ্রিকা। রোমানদের অত্যাচারে জর্জরিত দেশ। সীমাহীন শোষণ আর অমানুষিক অত্যাচারে কাতরাচ্ছে সে দেশের বনি আদম। আর্তনাদ উঠছে আকাশে বাতাশেঃ মুক্তি চাই, এ অত্যাচার থেকে মুক্তি চাই। কিন্তু বাঁচাবে কে? কে এগিয়ে আসবে বলদর্পি রোমানদের শক্তিশালী হাতের মুঠো থেকে তাদের বাঁচাতে? উত্তর পশ্চিম আফ্রিকার মানুষ সব শেষে অসহ্য হয়ে দামেশকে খলীফার দরবারে পাঠাল আকুল আবেদনঃ অত্যাচার অসত্যের হাত থেকে বাঁচান আমাদের। খলীফার নির্দেশে সিপাহসালার উকবা ছুটে চললেন ক্রমাগত পশ্চিমে। উকবার গতি রোধ করবে কে? সত্যের সৈনিক উকবা থামতে পারেন না। তিনি খুঁজে ফিরছেন আরও কে কোথায় নিপীড়িত হচ্ছে, অসত্য কোথায় এখনও অন্ধকারের সৃষ্টি করছে, আরও সামনে কতদেশ আছে-কত প্রান্তর আছে। উকবার অগ্রগতি সমানে চলছে। ক্লান্তি নেই। বিশ্রাম নেই। এগিয়ে চলেছেন তিনি তাঁর জানবাজ মুজাহিদদের নিয়ে। তাঁর প্রার্থনাঃ 'আল্লাহ' আপনি বলুন আর কত দেশ আছে, এখনও কোথায় সত্যের আলো বিচ্ছুরিত হয়নি, বলুন, এ উন্মুক্ত অসি আর কোষবদ্ধ করবো না।'
কিন্তু উকবার গতি রুদ্ধ হলো। আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে দাঁড়িয়ে অশ্বের বল্লা টেনে তিনি চেয়ে দেখছেন, অসীম সমুদ্রের বারি রাশি উন্মাদ গতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। উকবা বিদ্রোহী, সিন্ধুও বিদ্রোহী। দুই দোসর একে অন্যকে দেখে ক্ষণিকের জন্য থমকে
দাঁড়ালো। অশ্রান্ত বিরামহীন গতি সমুদ্রের। উকবার গতিও অপ্রতিহত। অশ্বের বল্গা ছেড়ে দিয়ে তীব্র বেগে ছুটে তিনি সাগরের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তরঙ্গের বাহু মেলে সিন্ধু তার বিদেশী বন্ধুকে আলিঙ্গন করলো। দু'হাত তুলে উকবা বললেন, "আল্লাহ” আজ যদি এই অনন্ত সমুদ্র পথের অন্তরায় না হতো তবে আরও দেশ, আরও রাজ্য জয় করে আপনার নামের মহিমা প্রচার করতাম, সত্যের মহিমা প্রচার করতাম, সত্যের বাণী ছড়িয়ে দিতাম, অসত্যকে নিশ্চিহ্ন করে সত্যের আলো জ্বালিয়ে দিতাম।”
📄 আরমেনিয়া প্রান্তরে আলপ আরসালান
১০৬৩ সন। সুলতান আলপ আরসালানের হাত থেকে আরমেনিয়া কেড়ে নেবার জন্য কনষ্টান্টিনোপলের সম্রাট রোমানাস ছুটে এলেন। ফ্রান্স, ম্যাসিডনিয়া, বুলগেরিয়া প্রভৃতি দেশের সেনাদলও তাঁর সাহায্যে ছুটে এসেছে। সুলতান আরসালান ৪০ হাজার সৈন্য নিয়ে ছুটে গেলেন সম্রাট রোমানাসকে বাধা দিতে।
সুলতান আরসালান শান্তির প্রস্তাব দিলেন রোমানাসকে। সমুদ্র তরঙ্গমালার মত বিশাল বিক্ষুব্ধ সেনাবাহিনীর অধিনায়ক রোমানাস শান্তির প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করলেন। শান্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হলে সুলতান আরসালান রোমানাসের মুকাবিলার জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে সেনা সন্নিবেশ করলেন। কিন্তু তাঁর কত মুসলিম ভাই যে এ যুদ্ধে প্রাণ দেবে, সেটা চিন্তা করে সুলতান আরসালানের প্রাণ কেঁদে উঠল। তিনি উচ্চস্বরে গম্ভীর কন্ঠে সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্যে বললেন, "যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে যদি কেউ চলে যেতে চাও, যেতে পার। কাউকেই আমি জোর করে যুদ্ধে যোগদান করতে প্ররোচিত করব না।”
কিন্তু যে সেনাপতি তাঁর সৈন্যদের জন্য এত দরদ পোষণ করেন সে সেনাপতিকে তাঁর সৈন্যরা মৃত্যুর মুখে ছেড়ে যেতে পারে না। সুলতান আরসালানের ক্ষেত্রেও তাই হলো। সকলেই এক বাক্যে সুলতানের অনুগামী হতে চাইলো।
সুলতান গোসল করে শুভ্র পোশাকে সজ্জিত হয়ে সৈন্য পরিচালনার জন্যে ঘোড়ায় আরোহণ করলেন। সংগীদের তিনি বললেন, "যুদ্ধ ক্ষেত্রের যেখানে আমার মৃত্যু হবে, সেখানেই আমাকে যেন কবর দেয়া হয়।” বস্তুতঃ শাহাদাতের দুর্লভ পিয়ালা
পানের আশায় যুদ্ধে যাচ্ছেন সুলতান আরসালান। তাঁর প্রতিটি সৈন্যও এই মন্ত্রে দীক্ষিত।
যুদ্ধ শুরু হলো আরমেনিয়ার প্রান্তরে। রক্তের প্রবাহ ছুটছে যুদ্ধের গোটা ময়দানে। ক্ষুদ্র মুসলিম বাহিনী অকুতোভয়ে মুকাবিলা করে যাচ্ছে বিশাল-বিপুল শত্রু বাহিনীকে। এক সারি শহীদ হয়ে ঢলে পড়ছে মাটিতে, সংগে সংগে পেছনের সারি সামনে এগিয়ে সে স্থান পূরণ করছে। শত্রু নিধন করে শাহাদাতের পিয়ালা পানের নেশায় পাগল হয়ে উঠেছে তারা। দুঃখ নেই, কাতরোক্তি নেই। অশ্বের গতিবেগের সংগে সংগে তাদের জীবন-মৃত্যু সৃষ্টি ও ধ্বংসলীলা উঠছে আর পড়ছে। অবশেষে বদর, খন্দক, ইয়ারমুক, আজনাদাইনের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হলো। দিনান্তে মাগরিবের সময় সমাবেশের শুভ মূহূর্তে আল্লাহর অফুরন্ত দয়ার আকারে বিজয় নেমে এল। জয়ী হলেন সুলতান আর সালান।
যুদ্ধ শেষে বন্দী রোমানাসকে সুলতান আরসালানের সামনে নিয়ে আসা হলো। সুলতান জিজ্ঞাসা করলেন, 'আমার জায়গায় আপনি হলে আমার জন্য কি শাস্তির ব্যবস্থা করতেন?' রোমানাস বললেন, 'নির্মম বেত্রাঘাতে আপনার দেহ ক্ষত-বিক্ষত করে দিতাম।' সুলতান হাসলেন। বললেন, 'আপনার বাইবেল বলে- শত্রুকে ক্ষমা করো। আমি আপনার সে বাইবেলের উপদেশ অনুসারেই আপনাকে ক্ষমা করে দিলাম। যান আপনি মুক্ত।'
📄 জেরুসালেমে দু’টি ঐতিহাসিক দিন
জেরুসালেম নগরী। ১০৯৯ খৃষ্টাব্দ। ১৫ই জুলাই। বিকেল ৩টা। খৃষ্টান ক্রুসেডারদের হাতে মুসলিম নগরী জেরুসালেমের পতন ঘটল।
খৃষ্টান বাহিনী বন্যা স্রোতের মত প্রবেশ করলো নগরীতে। খৃষ্টান অধিনায়ক গডফ্রের নির্দেশে নরবলির মাধ্যমে বিজয়োৎসবের ব্যবস্থা করা হল। নারী, শিশু, বৃদ্ধ নির্বিশেষে সকল মুসলিম ও ইহুদী নাগরিকদের নিধন যজ্ঞ চললো তিন দিন ধরে। বীভৎস সে দৃশ্য। কারো মাথা ছিঁড়ে ফেলা হলো, কারো হাত-পা কাটা হলো, কাকেও তীর বৃষ্টি করে মারা হলো, কাউকে মারা হলো পুড়িয়ে। অনেক মুসলমান গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল উমার মসজিদে, মসজিদের ভেতরেই তাদেরকে হত্যা করা হলো। ৩০০ মুসলিম নারী, শিশু, বৃদ্ধ, যুবক গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল আল আকসা মসজিদের ছাদে, তাদেরকেও রেহাই দেয়া হলো না। হত্যা করা হলো প্রত্যেককে। রাজপথ দিয়ে রক্তের স্রোত বয়ে গেল। ঘোড়ার হাঁটু পর্যন্ত ডুবে গেল সে রক্তে। তিনদিনের হত্যাকান্ডে জেরুসালেম নগরীতে ৭০,০০০ মুসলমানকে হত্যা করা হলো।
সেই সেরুসালেমে আর এক দৃশ্যঃ
১১৮৭ খৃষ্টাব্দ। ২রা অক্টোবর। ৮৮ বছর পর মুসলিম বাহিনী গাজী সালাহউদ্দীনের নেতৃত্বে বিজয়ী বেশে জেরুসালেম নগরীতে প্রবেশ করলো। নগরীর আতংকউদ্বেগ পীড়িত খৃষ্টান নাগরিকদের চোখে-মুখে মৃত্যুর ছাপ। কিন্তু শান্ত সুশৃংখলভাবে মুসলিম বাহিনী নগরে প্রবেশ করলো। সকলের আগে চলছেন গাজী সালাহউদ্দীন।
মুখ তাঁর প্রশান্ত, চোখে কোন উত্তাপ নেই। ۸۸ বছর আগে যারা জেরুসালেমকে কসাই খানায় পরিণত করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে কোন ঘৃণাও তাঁর চোখে মুখে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বিজয়ের পর ক্রুসেডারদের মুক্তিদেয়ার ব্যাপারে গাজী সালাহউদ্দীন অপরিসীম উদারতার পরিচয় দিলেন। প্রত্যেক পুরুষের জন্য দশ, নারীর জন্য পাঁচ ও শিশুর জন্য একটি করে স্বর্ণমুদ্রা মুক্তিপণ নির্ধারিত হলেও নামমাত্র মুক্তিপণ গ্রহণ করে তিনি বন্দীদের মুক্তি দিলেন। পরিশেষে দরিদ্র, বৃদ্ধ ও নারীদের তিনি বিনাপণে মুক্তি দিলেন। সহায়সম্বলহীন নারীদের তিনি প্রচুর পরিমাণে অর্থ দানও করলেন।
📄 টাইবেরিয়াসে সালাহউদ্দীন
ক্রুসেডের ৯০ বছর পার হয়ে গেছে। ইউরোপ থেকে তৃতীয় ক্রুসেডারদের নতুন দল এসে ফিলিস্তিনে ক্রুসেডারদের শক্তি বৃদ্ধি করছে। ওদিকে সুলতান সালাহউদ্দীন খন্ড-বিখন্ড মুসলিম শক্তিকে সংঘবদ্ধ করে তুলছেন।
১১৮২-৮৩ সন। মিসর সহ সমগ্র এশিয়া-মাইনর ও তুর্কী অঞ্চল প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে সুলতান সালাহউদ্দীনের পতাকাতলে আশ্রয়লাভ করল। অতঃপর এদিক থেকে নিশ্চিন্ত হয়ে সুলতান এবার মনোযোগ দিলেন ক্রুসেডারদের দিকে। সমগ্র ফিলিস্তিন তখনও তাদের করতলগত। ফিলিস্তিনের প্রত্যেকটি শহরে হাজার হাজার মুসলিম বন্দী অকথ্য নির্যাতন ভোগ করছে। প্রায় ৮৪ বছর ধরে বাইতুল মুকাদ্দাসের মিনার শীর্ষ থেকে মুয়াযযিনের উচ্চকণ্ঠ শোনা যায়নি। জেরুসালেমের উমর মসজিদের অভ্যন্তরে খৃষ্টানরা যে হত্যাকান্ড সংঘটিত করেছিল, তার রক্তের দাগও হয়তো মুছে ফেলা হয়নি তখনও। সুলতান সালাহউদ্দীন অধীর হয়ে উঠেছেন। একদিকে তাঁর এই অধীর চিত্ততা, অন্যদিকে খৃষ্টান ক্রুসেডারদের অত্যাচারও তাঁকে অতিষ্ঠ করে তুলল। শান্তির সময়েও মুসলিম বণিকদের কাফিলা বার বার লুণ্ঠিত ও মুসলিম বণিকরা নিহত হচ্ছিল তাদের হাতে। ১১৮৬ সনেও খৃষ্টান অধিনায়ক রেজিনাল্ড অতীতের ঘটনার পুনরাবৃত্তি করল। ধৈর্যের বাঁধ ভেংগে গেল সুলতান সালাহ উদ্দীনের। ৯০ বছরের পুরাতন খৃষ্টান ক্রুসেডের বিরুদ্ধে সুলতান সালাহউদ্দীন জিহাদ ঘোষণা করলেন। সময়টা ছিল
১১৮৭ সনের মার্চ মাস। জিহাদ ঘোষণার পর সুলতান সালাহউদ্দীন আশতারায় শিবির সন্নিবেশ করলেন। সালাহ উদ্দীনের প্রাথমিক প্রধান লক্ষ্য ছিল ফিলিস্তিনের সীমান্ত শহর তাইবেরিয়াস।
তাইবেরিয়াসের রাজা গেডি লুসিগনানের নেতৃত্বে জেরার্ড, রেজিনাল্ড, হামফ্রে রিমন্ড, বিলিয়ান প্রমুখ বিখ্যাত ক্রুসেড অধিনায়করা সালাহ উদ্দীনের মুকাবিলার জন্য এগিয়ে এল। তাদের অধীনে ১২০০ নাইট সহ অর্ধলক্ষ সৈন্য সমবেত হলো। সুলতান সালাহউদ্দীন ১২ হাজার ঘোড় সওয়ার ও অনুরূপ সংখ্যক পদাতিক সৈন্য নিয়ে তাইবেরিয়াস অভিমুখে যাত্রা করলেন। সিত্তিনের দু'মাইল দক্ষিণ পশ্চিমে ফিলিস্তিনের লুবিয়া গ্রামের সন্নিকটবর্তী প্রান্তরে খৃষ্টান ও মুসলিম সৈন্য মুখোমুখি দাঁড়াল। সুলতান সালাহ উদ্দীন প্রথম বারের মতো খৃষ্টান ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে জিহাদে অবতীর্ণ হলেন। লুবিয়া প্রান্তরে ঘোরতর যুদ্ধ সংঘটিত হলো। ক্রুসেডার সেই যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয় বরণ করল। জেরার্ড, রেজিনাল্ড, হামফ্রে প্রমুখ অধিনায়ক সহ স্বয়ং রাজা ও তাঁর ভাই বন্দী হলেন। যুদ্ধে ৩০ হাজার খৃষ্টান সৈন্য মৃত্যুবরণ করল। ১১৮৭ সনের জুলাই মাসে সুলতান সালাহ উদ্দীন তাইবেরিয়াস পুনরুদ্ধার করলেন। প্রথম জিহাদে জয়ী হয়ে সুলতান সালাহ উদ্দীন তাইবেরিয়াস নগরীতে প্রবেশ করলেন। কিন্তু তাঁর চোখে আজ খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে কোন ঘৃণা নেই। কিংবা নেই কোন প্রতিহিংসার আগুন। ক্রুসেডাররা ১০৯৬ সনে তাদের প্রথম বড় রকমের সাফল্য অর্থাৎ এন্টিয়ক নগরী দখল করার পর যে মানসিকতার পরিচয় দিয়েছিল তা থেকে এ মানসিকতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুদ্ধ নয়, বরং জনৈক মুসলিম নামধারী বিশ্বাসঘাতকের সহায়তায় এন্টিয়ক নগরী দখল করার পর আত্মসমর্পনকারী দশ হাজার মুসলিম নর-নারী ও শিশুকে তারা হত্যা করেছিল। আর সুলতান সালাহউদ্দীন তাঁর প্রথম
জিহাদে সাফল্য লাভ করার পর কোন খৃষ্টানের গায়ে আঁচড়ও লাগল না। অগণিত লুণ্ঠন ও হত্যাকান্ডের নায়ক রেজিনান্ডকেই শুধু তার দু'শ সাঙ্গ-পাঙ্গসহ প্রাণদন্ডে দন্ডিত করা হলো। আর এন্টিয়ক নগরীতে খৃষ্টানরা যেখানে শহীদ আমীরদের লাশ কবর থেকে তুলে মাথা কেটে বর্শায় গেঁথে এন্টিয়কের রাস্তায় বন্য নৃত্য করে বেড়িয়েছিল, সেখানে সুলতান সালাহ উদ্দীন তাইবেরিয়াসের খৃষ্টান রাজাকে হাতে ধরে নিজের কাছে বসিয়ে ঠান্ডা শরবত পান করিয়েছিলেন।