📄 ইয়ারমুকে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলো যারা
ইয়ারমুক প্রান্তরে ভীষণ যুদ্ধ চলছে। রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের এটা এক মরণ পণ সংগ্রাম। রোম সাম্রাজ্যের সবচেয়ে নিপুণ সেনাপতি ম্যানোয়েল বা মাহান দুই লক্ষেরও অধিক সৈন্য নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন ৪০ হাজার সৈন্যের এক ক্ষুদ্র মুসলিম বাহিনীর উপর। একদিন নয় দুদিন নয়, ৫ দিন ধরে যুদ্ধ চলছে। রোমক সৈন্যদের পায়ে শৃঙ্খল লাগানো হয়েছে যাতে তারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাতে না পারে। অর্থাৎ জিততে না পারলে আত্মবলি দেবে এই দুর্জয় পণ নিয়েই রোমকরা যুদ্ধে নেমেছে। একদিন যুদ্ধ করতে করতে ইয়ারমুক বিজয়ের মূলস্তম্ভ মহাবীর খালিদ ইবন ওয়ালিদের হাত অবিরাম তরবারী চালনায় প্রায় অবশ হয়ে পড়ল।
এটা দেখে হারেস ইবনে হিশাম প্রধান সেনাপতি আবু উবাইদাকে বললেন, 'খালিদের তলোয়ারের হক যতখানি ছিল তার চেয়ে অনেক বেশী খালিদ করে দেখিয়েছেন। তাঁকে এবার আরাম দেয়া দরকার। হযরত আবু উবাইদা তাঁর কথায় সায় দিয়ে খালিদের সমীপবর্তী হয়ে তাঁকে যুদ্ধ বন্ধ করতে বললেন। খালিদ তার উত্তরে বললেন, "আমি সব রকমে সবদিকে থেকে চেষ্টা করে শাহাদাত লাভের আশা করি, আমার নিয়ত আল্লাহ তায়ালাই জানেন।” বলে তিনি আবার শত্রু ব্যুহে ঢুকে পড়লেন। দু'লক্ষাদিক রোমক সৈন্যের বিরুদ্ধে ৪০ হাজার মুসলিম সৈন্যের প্রত্যেকে এ ভাবেই লড়ে যাচ্ছে।
একদিকে যখন এই অবস্থা আহতদের কাতারে আর এক দৃশ্য। আবু জাহিম ইবনে হুজাইফা আহত নিহতদের সারিতে তাঁর চাচাতো ভাইকে খুঁজে ফিরছিলেন। তাঁর কাঁধের মশকে পানি। খুঁজতে খুঁজতে তিনি তাঁর ভাইকে পেয়ে গেলেন। সে তখন মুমূর্ষ। যন্ত্রণায় সে কাতরাচ্ছে। ইশারায় সে পানি চাইল। হুজাইফা তাঁকে পানি দিতে গেলেন। এমন সময় পাশেই আর একজন মৃত্যু যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল। তারও পানি চাই। হুজাইফার ভাই পানি পান না করে পাশের হিশাম ইবন আবিল আসের কাছে তাড়াতাড়ি পানি নিয়ে যেতে বললেন। হুজাইফা যখন হিশামের কাছে পৌঁছলেন, তখন পাশের আর একজন মুমূর্ষ সাহাবী পানি পান করতে চাইলো। হিশাম ইংগিতে প্রথমে তাকেই পানি দিতে বললেন। হুজাইফা যখন পানি নিয়ে পাশের সাহাবীর কাছে পৌঁছলেন, তখন তাঁর রূহ ইহজগত ছেড়ে চলে গেছে। হুজাইফা ফিরে এলেন হিশামের কাছে। কিন্তু হিশামও ততক্ষণে জান্নাতবাসী হয়েছেন। হুজাইফা ফিরে গিয়ে তার চাচাতো ভাইকেও আর পেলেন না। ততক্ষণে শাহাদাত বরণ করেছেন তিনিও।
অদ্ভুত এ ত্যাগ, ভ্রাতৃত্ব আর মমত্ববোধ। তাঁরা পরস্পরে মিলে এমন সিসার প্রাচীর গড়ে তুলতে পেরেছিলেন বলেই সেদিন মাত্র চল্লিশ হাজার সৈন্য ইয়ারমুক প্রান্তরে সমগ্র এশিয়ার সম্মিলিত খৃষ্টান শক্তির বিজয়ের প্রাণান্ত প্রচেষ্টাকে শোচনীয় পরাজয়ের অতল পঙ্কিলে ডুবিয়ে দিতে পেরেছিল।
📄 রোমান সেনাপতি মাহানের তাঁবুতে খালিদ
ইয়ারমুক যুদ্ধ তখনও শুরু হয়নি। সম্রাট হিরাক্লিয়াসের প্রধান সেনাপতি মাহানের অধীনে কয়েক লক্ষ সৈন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে নির্দেশের অপেক্ষায় দন্ডায়মান। এমন সময় ময়দানের অপর প্রান্তে মুসলিম শিবিরে খবর এল, রোমক সেনাপতি মাহান মুসলিম দূতের সাথে দেখা করতে চান। এই আহবান অনুসারে মুসলিম বাহিনীর প্রধান সেনাপতি আবু উবাইদার নির্দেশে খালিদ ১০০ অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে মাহানের শিবিরে যাবার জন্য প্রস্তুত হলেন। কয়েক লক্ষের বিশাল বাহিনীর মধ্য দিয়ে বীরদর্পে খালিদ তাঁর ১০০ জন সাথী সহ মাহানের দরবারে গিয়ে পৌঁছলেন।
রোমক সেনাপতি মাহান চাইলেন রোমক সৈন্যের শান শওকত ও রোমক দরবারের ঐশ্বর্য দেখিয়ে মুসলমানদেরকে দুর্বল করে দিতে। কিন্তু হযরত খালিদ যখন স্বর্ণ ও রৌপ্য নির্মিত ও কিংখাব খচিত চেয়ারগুলো সরিয়ে রেখে মেঝেতে নিঃসংকোচে আসন গ্রহণ করলেন, তখন যে মাহান মুসলমানদের দুর্বল করে দিতে চেয়েছিলেন নিজেই মনে মনে দুর্বল হয়ে পড়লেন। তারপর মাহানের সাথে খালিদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক হলো।
মাহান এক সময় বললেন, "মুসলিম সৈন্যের প্রত্যেককে একশত দিনার, আবু উবাইদাকে তিনশত দিনার এবং খলীফাকে দশ হাজার দিনার আমি দান করছি, বিনিময়ে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকতে হবে।” খালিদ পাল্টা দাবী উত্থাপন করলেন, "হয় জিযিয়া দিন, নয় তো ইসলাম গ্রহন করুন।” মাহান খালিদের প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করলেন।
করে বললেন, “ঠিক আছে তলোয়ারই সব ফায়সালা করে দেবে।”
উত্তরে খালিদ বললেন, "যুদ্ধের বাসনা আপনাদের চেয়ে আমাদেরই বেশী এবং আমরা অবশ্য আপনাদের পরাজিত করব। বন্দী করে খলীফার দরবারে হাজির করব।”
মাহান তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন। ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, “দেখ, চেয়ে দেখ তোমরা, এখনই তোমাদের সামনে তোমাদের পাঁচ জন বন্দী বীরকে হত্যা করছি।” সংগে সংগে খালিদ বলে উঠলেন, “তুমি আমাদের মৃত্যুর ভয় দেখাচ্ছ। অথচ মৃত্যুই আমাদের কাম্য। মুসলমানদের জীবন তো মৃত্যুর পর থেকেই শুরু হয়। কিন্তু জেনে রাখ, কোন বন্দীর গায়ে যদি হাত তোল তাহলে এখনই তোমাকে আমরা সদল বলে হত্যা করব। তোমাদের সংখ্যাধিক্যের পরোয়া আমরা করি না।”
লক্ষ লক্ষ রোমক সৈন্য পরিবেষ্টিত শিবিরে খালিদের এই বীরত্বপূর্ণ কথা মাহানের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে দিল। সে খাপ থেকে তলোয়ার বের করার জন্য তলোয়ারের বাঁটে হাত দিল। শিবিরে উপস্থিত কয়েকশ রোমক সৈন্যও প্রস্তুত হয়ে দণ্ডায়মান। কিন্তু তলোয়ার বের করার সুযোগ সে পেল না। হযরত খালিদ এক লাফে তার সমীপবর্তী হয়ে তার বুকে তলোয়ারের অগ্রভাগ ঠেকিয়ে নির্দেশ দিলেন, “সব প্রহরীদের অস্ত্র ফেলে দিতে বল, এবং কেউ যাতে কোন বাধা দিতে এগিয়ে না আসে, সে নির্দেশ ঘোষণা কর।” ভীত ও বিস্ময় বিস্ফারিত মাহান সে নির্দেশ পালন করল।
খালিদ তার সংগিগণ সহ বিশাল সৈন্য সারির মধ্য দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে স্বীয় তাঁবুতে এসে পৌঁছলেন।
📄 সেনাপতি হলেন সাধারণ সৈনিক
সিরিয়ার রণক্ষেত্র। সিরিয়ায় মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক খালিদ সৈন্য পরিচালনা করছেন। মদীনা থেকে খলীফা উমারের (রা) দূত শাদ্দাদ ইবনে আউস খালিদের পদচ্যুতি এবং সেনাপতি আবু উবাইদার প্রধান সেনাপতি মনোনয়নের চিঠি নিয়ে এলেন সিরিয়ায়। সিরিয়ার সেনাশিবির। সকল সৈনিক ও সেনাধ্যক্ষরা উপস্থিত।
খলীফার দূত শাদ্দাদ সকলের সামনে সর্বাধিনায়ক খালিদের পদাবনতি এবং আবু উবাইদার প্রধান সেনাপতি পদে মনোনয়নের কথা ঘোষণা করলেন। সেনা ও সেনাধ্যক্ষদের পিনপতন নীরবতা। নীরবভাবে খালিদও খলীফার নির্দেশনামার পাঠ শুনলেন। তারপর নীরবে নতমুখে তিনি সেনাপতির পদ থেকে পিছনের সারিতে গিয়ে দাঁড়ালেন। শূন্যস্থান পূরণ করলেন গিয়ে আবু উবাইদা।
সর্বাধিনায়ক খালিদ সাধারণ সৈন্যের সারিতে মিশে গেলেন। এই পদাবনতিতে খালিদের চোখ কি ক্রোধে জ্বলে উঠেছিল? কিংবা অপমানে তাঁর মুখ কি লাল হয়ে উঠেছিল? অথবা তাঁর গন্ডদ্বয় বয়ে কি দুঃখের অশ্রু নেমে এসেছিল? না, এগুলোর কিছুই হয়নি তাঁর, সিরিয়া মরু দেশের প্রান্তর থেকে প্রান্তরে ঘোরা খালিদের রোদপোড়া লাল মুখটিতে তাঁর আগের সেই উজ্জ্বল হাসি—সেই শান্ত স্বর্গীয় নুরানী দীপ্তি তখনও। তাঁর শির মুহূর্তের জন্য আনত হয়েছিল খলীফার নির্দেশ মাথা পেতে নেবার জন্য। তারপর তাঁর শির সেই আগের মতই উন্নত। সে শিরে লজ্জা অপমান কোন স্থান পেলনা, দুঃখের কালিমাও তাঁকে স্পর্শ করতে পারলো না। তিনি পিছনের সারিতে দাঁড়িয়ে বললেন, "হযরত উমার (রা) কোন হাবশী গোলামকেও যদি আমার নেতা মনোনীত করতেন, তবু তাঁর আদেশ সানন্দে মেনে আমি জিহাদ চালিয়ে যেতাম। আর হযরত আবু উবাইদা তো কত উঁচু দরের লোক।”
পদাবনতির ফলে কোন স্বাভাবিক নিরুৎসাহও কি হযরত খালিদকে ঘিরে ধরেছিল? তিনি উৎসাহ উদ্দীপনা—গতিবেগ হারিয়ে ফেলেছিলেন? না, কোনটিই নয়। পদচ্যুত হবার পর মুহূর্তেই সেনাপতি আবু উবাইদার নির্দেশে তিনি আবদুল্লাহ ইবন জাফরের সাহায্যে এক রণক্ষেত্রে ছুটে যান, প্রাণপণ যুদ্ধ করেন, জয়ীও হন সেখানে।
এই আনুগত্য, এই আন্তরিকতা; এই নিবেদিত চিত্ততার কোন নজীর ইতিহাসে নেই। একজন প্রধান সেনাপতি দেশের পর দেশ জয় করলেন, যিনি পেলেন সৈন্য ও সেনাধ্যক্ষদের অকুণ্ঠ ভালবাসা ও আনুগত্য, তিনি বিনাবাক্য ব্যয়ে পদাবনতি মেনে নিয়ে অধীনস্থ সেনাধ্যক্ষের অধীনে সাধারণ সৈনিকের মত পূর্বের ন্যায় একই আন্তরিকতা নিয়ে যুদ্ধ করছেন, নেতৃত্ব ও সামরিক শৃংখলার প্রতি এমন সম্মান প্রদর্শন অপরূপ—বিস্ময়কর। বিস্ময়কর নয় শুধু ইসলামের ইতিহাসে—মুসলমানদের জন্য, যারা যুদ্ধ করে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য ধন—মান—পদের লোভে নয়।
📄 ফোরাত তীরে সত্যের সৈনিক
৬৮০ সন। আমীর মু'আবিয়া মৃত্যুবরণ করেছেন। পিতার সিংহাসনে বসেছেন ইয়াযিদ। হযরত মু'আবিয়া এবং ইয়াযিদ ইসলামের গণতন্ত্র, ইসলামের খিলাফতকে রাজতন্ত্রে পরিণত করলেন এইভাবে। সাধারণের রাজকোষ-বাইতুল মাল পরিণত হল ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে। ইয়াযিদের খলীফা পদে আসীন হওয়া একদিকে ছিল স্বীকৃত চুক্তির খেলাফ, অন্যদিকে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ইয়াযিদ ইবনে মু'আবিয়ার এই আচরণের তীব্র প্রতিবাদ করলেন হযরত হুসাইন। এত বড় অন্যায়কে, ইসলামী আদর্শের এই ভূলুণ্ঠিত দশাকে বরদাশত করা যায় কি করে? মদীনায় অলসভাবে বসে থেকে ইসলামের এই অবস্থা, মুসলিম জাতির এই দৃশ্য তিনি সহ্য করতে পারেন না। পারেন না বলেই উঠে দাঁড়ালেন তিনি। কুফা থেকে সেখানকার অধিবাসীরা জানালঃ আসুন, আমরা আপনাকে এ ন্যায়ের সংগ্রামে সাহায্য করব। তাদের আহবান মতে মুষ্টিমেয় সাথী ও নিজের আত্মীয়-পরিজন নিয়ে রওনা হলেন তিনি কুফার দিকে।
কুফার পথে হযরত হুসাইন এসে উপস্থিত হলেন কারবালা মরু প্রান্তরে। সামনেই ইউফ্রেটিস-ফোরাত নদী। তিনি দেখলেন, ফোরাত নদী ঘিরে রেখেছে ইয়াযিদ সৈন্যরা। তাঁর ক্ষুদ্র বাহিনীকেও ঘিরে ফেলা হয়েছে। সামনে পিছনের সব দিকের পথ বন্ধ। বাধ্য হয়ে হযরত হুসাইন তাঁবু গাড়লেন ফোরাত নদীর তীরে।
প্রস্তাব এল ইয়াযিদের সেনাপতি আবদুল্লাহ ইবন যিয়াদের কাছ থেকে, "বিনা শর্তে আত্মসমর্পন করতে হবে।”
আত্মসমর্পন? অন্যায়ের কাছে, অত্যাচারের কাছে আত্মসমর্পণ? একজন জিন্দাদিল মুসলমান, একজন জিন্দাদিল মুজাহিদের পক্ষে এমন আত্মসমর্পণ কি জীবন থাকতে সম্ভব? সম্ভব নয়। নবীর (সা) দৌহিত্র হযরত হুসাইনের পক্ষেও তা সম্ভব হলোনা।
হযরত হুসাইনকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার জন্য সে ক্ষুদ্র দলের উপর চললো নিপীড়ন। ফোরাতের তীর বন্ধ করে দেয়া হলো। কোথাও থেকে এক কাতরা পানি পাবারও কোন উপায় রইলনা। শুরু হলো খন্ড যুদ্ধ।
অদ্ভুত এক অসম যুদ্ধ। একদিকে সত্তরজন, অন্য দিকে বিশ হাজার। হযরত হুসাইনের জানবাজ সব সাথীই একে একে শাহাদাত বরণ করেছেন। ক'দিন থেকে পানি বন্ধ। তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে সকলের। দুধের বাচ্চা মায়ের দুধ পাচ্ছে না। অবোধ শিশুদের ক্রন্দনে আকাশ যেন বিদীর্ণ হচ্ছে। হযরত হুসাইন সবই দেখছেন, শুনছেন। নীরব-নির্বিকার তিনি। জীবন যেতে পারে, কিন্তু অন্যায়ের কাছে তো নতি স্বীকার চলে না!
সংগ্রামী সাথীদের সবাই একে একে চলে গেছে জান্নাতে। একা হযরত হুসাইন। তিনি উঠে দাঁড়ালেন, ফোরাত থেকে পানি আনার একবার শেষ চেষ্টা করে দেখা যাক। তিনি দুলদুল নিয়ে চললেন ফোরাতের দিকে। নদীর তীরে পৌঁছলেনও তিনি। কিন্তু অজস্র তীরের প্রাচীর এসে তাঁর গতি রোধ করল। তাঁবুতে ফিরে এলেন হযরত হুসাইন। এসে দেখলেন স্ত্রী শাহারবানু শিশুপুত্রকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। পানির অভাবে মুমূর্ষ তাঁর শিশুপুত্র। হুসাইন সহ্য করতে পারলেন না এ দৃশ্য। শিশুপুত্রকে কোলে নিয়ে তিনি ছুটলেন আবার ফোরাতের দিকে। পানির কাছে পৌঁছার আগেই শত্রুর নির্মম তীর এসে বিদ্ধ করল পুত্রের কচি বুক! ফোরাতের কূলে আর নামা হলো না। মৃত শিশু পুত্রকে নিয়ে ফিরে এলেন তিনি। মৃত শিশুকে
স্ত্রী শাহারবানুর হাতে তুলে দিয়ে শ্রান্ত-ক্লান্ত হুসাইন বসে পড়লেন। রক্তে ভেজা তাঁর দেহ। তারপর হযরত হুসাইন হাত দু'টি তাঁর উর্ধে তুললেন। দু'হাত তুলে তিনি জীবিত ও মৃত সকলের জন্য দোয়া করলেন। তারপর স্ত্রী শাহারবানুকে বিদায় সালাম জানিয়ে মর্দে মুজাহিদ সিংহ বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়লেন ইয়াযিদ বাহিনীর উপর। সে বিক্রম বিশ হাজার সৈন্যের পক্ষেও বরদাশত করা সম্ভব হলো না। নদীকূল ছেড়ে পলায়ন করল ইয়াযিদ সৈন্যরা। কি শক্তি বিশ্বাসীর, সত্যাশ্রয়ীর!! বহুর বিরুদ্ধে একের সংগ্রাম, তবু সে অজেয়-অদম্য।
কিন্তু অবিরাম রক্তক্ষরণে দুর্বল হয়ে পড়লেন নবী দৌহিত্র হুসাইন। সংজ্ঞাহীন হয়ে লুটিয়ে পড়লেন তিনি ফোরাতের তীরে, কারবালার মরু বালুতে। শত্রুর নির্মম খঞ্জর এসে স্পর্শ করল তাঁর কন্ঠ। পবিত্র রুধির ধারায় প্লাবিত হলো কারবালার মাটি।
হযরত হুসাইন প্রাণ দিলেন, কিন্তু সত্যের উন্নত শিরকে আকাশস্পর্শী করে গেলেন। সত্যের সে উন্নত শির আনত হয়নি কখনও, এখনও নয়, হবেও না কোনদিন। শহীদের এই লহুতে স্নান করেই পতনের পংক থেকে বার বার গড়ে উঠছে জাতি, দেশ, স্বাধীনতা এবং সত্যের শক্তি-সৌধ।