📄 বিরুদ্ধে রায় পেয়ে খলীফা পুরস্কৃত করলেন কাযীকে
ইসলামী সাম্রাজ্যের অত্যন্ত শক্তিমান ও প্রবল প্রতাপশালী খলীফা আল-মানসূর।
ঐতিহাসিকরা একবাক্যে তাঁকে নিষ্ঠুরতার প্রতিমূর্তি হিসেবে অভিহিত করেছেন।
এ সত্ত্বেও সংযম ও নীতি-নিষ্ঠতার জন্যে তিনি ইতিহাসে স্থান রেখে গেছেন।
৭৭৫ খৃষ্টাব্দের কথা। খলীফা আল-মানসূর রাজধানী বাগদাদ থেকে মদীনায় এলেন। মুহাম্মাদ বিন ইমরান তখন মদীনার কাযী।
কাযী সেদিন তাঁর বিচারাসনে আসীন ছিলেন। এমন সময় একজন উট চালক আদালতে এসে খলীফার বিরুদ্ধে একটি সুস্পষ্ট অভিযোগ উত্থাপন করে সুবিচার প্রার্থনা করল।
অভিযোগ শুনেই কাযী মুহাম্মাদ বিন ইমরান তাঁর সহকারীকে খলীফার নামে কোর্টে হাযির হবার জন্যে লিখিত সমন পাঠাবার নির্দেশ দিলেন। তাঁর সহকারী এই আদেশের ব্যাপারে একটু নরম হবার জন্যে অনুরোধ করলেন। কিন্তু কাযী রাযী হলেন না।
অবশেষে তাঁর সহকারী লিখিত সমন পাঠালেন খলীফার কাছে।
খলীফা আল-মানসূর কাযীর সমন পেলেন। সমন পড়ে সভাসদদের বললেন, 'কাযীর আদালত থেকে সমন পেয়েছি। আমি সেখানে যাচ্ছি, কেউ আমার সাথে যাবে না। এটা আমার ইচ্ছা।'
যথা সময়ে খলীফা কাযীর আদালতে হাযির হলেন। কাযী তাঁর আসন থেকে উঠলেন না। খলীফার প্রতি কোন প্রকার ভূক্ষেপ না করে তিনি তাঁর কাজ করে যেতে লাগলেন।
খলীফার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিচার শুরু হলো। কাযীর বিচারে খলীফার বিরুদ্ধে রায় গেল।
যখন বিচারের রায় ঘোষণা করা হলো, খলীফা আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন এবং কাযীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'এই রায়ের জন্য আল্লাহ আপনাকে বিরাট পুরস্কারে পুরস্কৃত করুন। আর আমি আপনার জন্যে ১০ হাজার দিরহাম পুরস্কার ঘোষণা করছি।'
📄 হযরত উমর (রা)-এর কঠোর সিদ্ধান্ত
হযরত আবু বকর (রা)-এর খিলাফতকাল। দুই সাহাবী আকরা বিন হারিস এবং আইনিয়া বিন হাসান আবু বকরের দরবারে হাজির হলেন।
মহানবী (সা) তালিফে কুলুব হিসেবে যাদের সাহায্য করতেন, আকরা তাদের একজন। তারা খলিফা আবু বকরের কাছে 'জায়গীর'-এর আবেদন জানালেন।
আবু বকরের দরবারে তখন উমর ফারুক (রা) হাজির ছিলেন। তিনি আকরা (রা)-কে উদ্দেশ্য করে বললেন, "রাসূলুল্লাহ (সা) তোমাকে তালিফে কুলুব করতেন। এখন তোমার পরিশ্রম করা উচিত।"
আবু বকর (রা) রাসূল (সা)-এর আমলের সকল দান ও উপঢৌকন বহাল রাখেন এবং আকরা ও আইনিয়া হাসানের আবেদন অনুসারে তাদের জমি বরাদ্দের লিখিত নির্দেশ দিলেন।
এর অনেক পরের ঘটনা।
তখন উমর ফারুক (রা)-এর শাসনকাল।
আকরা (রা) এবং আইনিয়া হাসান এলেন তাঁর কাছে এবং আবেদন করলেন আবু বকর (রা) কর্তৃক নির্দেশ বহাল রাখার জন্যে।
উমর (রা) তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করলেন এবং বললেন, "আল্লাহ ইসলামের বিজয় দিয়েছেন এবং তোমাদের থেকে মুখাপেক্ষীহীন করেছেন। এখন তোমরা (জায়গীর ও উপঢৌকন ছাড়া) ইসলামের উপর মজবুতভাবে দাঁড়িয়ে যাও। নচেৎ আমাদের ও তোমাদের মধ্যে তরবারিই ফায়সালা করবে।"
উমর (রা)-এর এই সিদ্ধান্ত কঠোর হলেও তার মধ্যে কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়াই হলো না। আকরা (রা) হাসিমুখে ও আন্তরিকতার সাথে এই সিদ্ধান্ত মেনে নিলেন। অতঃপর জিহাদের ময়দান হলো আকরা (রা)-এর স্থান। যুদ্ধরত অবস্থায়ই তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
📄 উপযুক্ত খাজনা আদায়কারী
তখন নবম হিজরী সাল।
মহানবী বিভিন্ন অঞ্চলে যাকাত ও খারাজ আদায়কারী নিয়োগ করছেন। যারা গোত্রে গোত্রে ঘুরে যাকাত ও খারাজ আদায় করে মহানবীর বাইতুলমালে জমা দেবেন।
যাকাত ও খারাজ আদায়কারী নিয়োগের লক্ষ্যে মহানবী (সা) ডেকে পাঠালেন খাজরাজ গোত্রের বনু সালেমের নব্য যুবক উবাদাহ বিন সামিতকে।
দীর্ঘদেহী ও দোহারা গড়নের উবাদাহ হাজির হলেন মহানবীর দরবারে।
মহানবী (সা) তাঁকে পদ ও দায়িত্বের কথা বুঝিয়ে বললেন, “নিজের দায়িত্ব পালন-কালে আল্লাহকে ভয় করবে। কিয়ামতের দিন কোন চতুষ্পদ জন্তুও যেন তোমার বিরুদ্ধে কোন ফরিয়াদ নিয়ে না আসে।”
শুনে হযরত উবাদাহ (রা) বিন সামিত কেঁদে ফেললেন। বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার পিতা-মাতা আপনার উপর কুরবান হোন। আল্লাহর কসম, দু'জন মানুষের শাসক বা রাজস্ব আদায়কারী হওয়ারও ইচ্ছা আমার নেই।”
কেউ কোন পদ চাইলে রাসূলুল্লাহ সেই পদ তাকে দিতেন না।
উবাদাহর কথায় তিনি খুশী হলেন। এই পদের জন্যে তাকেই উপযুক্ত মনে করলেন।
📄 উমর (রা) নিজের অহংকারকে শাস্তি দিলেন
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) তখন আমীরুল মুমিনীন, অর্ধ পৃথিবীর শাসক। ইনসাফের ব্যাপারে আপোষহীন উমারের (রা) শাসনদণ্ডকে ভয় না করেন এমন মানুষ নেই।
একদিন দেখা গেল সেই উমর ইবনুল খাত্তাব ভারি একটি পানির মশক ঘাড়ে নিয়ে হাঁটছেন।
বিস্মিত, বিক্ষুব্ধ তাঁর পুত্র তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, "কেন আপনি এরূপ করছেন?"
উমর (রা) বললেন, "আমার মন অহংকার ও আত্মগরিমায় লিপ্ত হয়েছিল, তাই ওকে আমি শায়েস্তা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।"
উমর (রা) ন্যায়দণ্ডের রক্ষায় মানুষের ব্যাপারে যেমন কঠোর ছিলেন, তেমনি কঠোর ছিলেন নিজের ব্যাপারেও।