📄 আলী (রা) পথিককে পাশাপাশি হাঁটতে বাধ্য করলেন
চতুর্থ খলীফা হযরত আলী (রা)। তাঁকে জ্ঞানের দরওয়াজা বলা হতো। সরলতার তিনি ছিলেন মূর্ত প্রতীক।
খলীফা হওয়ার পরও সাধারণ মানুষ এবং তাঁর মধ্যে কোন পার্থক্যই তিনি বরদাশত করতেন না।
একদিনের ঘটনা। খলীফা আলী (রা) প্রায়ই জনগণের অবস্থা স্বচক্ষে দেখার জন্য বাজারে যেতেন। একদিন তিনি বাজারে যাচ্ছেন। পথিমধ্যে এক ব্যক্তি. তাঁকে দেখেই তাঁর সম্মানার্থে থেমে যায় এবং তাঁর পিছু পিছু চলতে থাকে।
খলীফা বললেন। “আমার পাশাপাশি চলো।"
"আমীরুল মুমিনীন! আপনার মর্যাদা ও সম্মানার্থে পিছে হাঁটছি"—লোকটি বলল।
খলীফা বললেন, "সম্মান ও মর্যাদা প্রদানের এ পন্থা ঠিক নয়। এতে শাসকদের জন্যে ফিতনা ও মুমিনদের জন্য অপমান রয়েছে।” বলে তিনি তাকে পাশাপাশি চলতে বাধ্য করলেন।
📄 আলীর (রা) কাছে একটি প্রশ্ন দশটি উত্তর
একদা ১০ জন লোক হযরত আলীর (রা) নিকট হাযির হলো এবং বলল, 'আমরা আপনাকে একটা প্রশ্ন করার অনুমতি চাচ্ছি।' হযরত আলী (রা) বললেন, 'স্বাধীনভাবে আপনারা প্রশ্ন করতে পারেন।'
তারা প্রশ্ন করল, "জ্ঞান ও সম্পদের মধ্যে কোনটা ভাল এবং কেন ভাল? অনুগ্রহ করে আমাদের প্রত্যেকের জন্যে একটি করে জবাব দিন।” জবাবে হযরত আলী (রা) নিম্নলিখিত ১০টি উত্তর দিলেন:
(১) জ্ঞান হলো মহানবীর (সা) নীতি, আর সম্পদ ফেরাউনের উত্তরাধিকার। সুতরাং জ্ঞান সম্পদের চেয়ে উত্তম।
(২) তোমাকে সম্পদ পাহারা দিতে হয়, কিন্তু জ্ঞান তোমাকে পাহারা দেয়। সুতরাং জ্ঞান উত্তম।
(৩) একজন সম্পদশালীর যেখানে শত্রু থাকে অনেক, সেখানে একজন জ্ঞানীর অনেক বন্ধু থাকে। অতএব জ্ঞান উত্তম।
(৪) জ্ঞান উত্তম, কারণ এটা বিতরণে বেড়ে যায়, অথচ সম্পদ বিতরণে কমে যায়।
(৫) জ্ঞান উত্তম, কারণ একজন জ্ঞানী লোক দানশীল হয়, অন্যদিকে সম্পদশালী ব্যক্তি হয় কৃপণ।
(৬) জ্ঞান চুরি করা যায় না, কিন্তু সম্পদ চুরি হতে পারে। অতএব জ্ঞান উত্তম।
(৭) সময় জ্ঞানের কোন ক্ষতি করে না, কিন্তু সম্পদ সময়ের পরিবর্তনে ক্ষয় পেয়ে যায়, নষ্ট হয়ে যায়। সুতরাং জ্ঞান উত্তম।
(৮) জ্ঞান সীমাহীন, কিন্তু সম্পদ সীমাবদ্ধ এবং গোণা যায়। অতএব জ্ঞান উত্তম।
(৯) জ্ঞান হৃদয়-মনকে জ্যোতির্ময় করে, কিন্তু সম্পদ একে মসিলিপ্ত করার মত। সুতরাং জ্ঞান উত্তম।
(১০) জ্ঞান উত্তম। কারণ জ্ঞান মানবতাবোধে উদ্বুদ্ধ করে যেমন আমাদের মহানবী (সা) আল্লাহকে বলেছেন: "আমরা আপনার উপাসনা করি, আমরা আপনারই দাস।” অন্যদিকে সম্পদ ফেরাউন ও নমরুদকে বিপদগ্রস্ত করেছে। যারা দাবী করে যে তারাই ইলাহ।'
📄 একজন নাগরিকের অধিকার রক্ষার জন্যে একটি যুদ্ধ
ইসলামী সাম্রাজ্যের খলীফা আবু জাফর আল-মানসূর। প্রবল প্রতাপশালী খলীফা তিনি।
তিনি যেমন ভালোবাসেন তাঁর রাজ্যকে, তেমনি ভালোবাসেন রাজ্যের প্রতিটি নাগরিককে।
প্রতিটি নাগরিকের জীবন, সম্পদ ও অধিকার তাঁর কাছে পরম পবিত্র। একদিন খলীফা আল-মানসূরকে জানানো হলো, একজন মুসলিম মহিলা নোভারী রাজ্যে বন্দী রয়েছে। এই খবর শোনার পরই খলীফা সসৈন্যে নোভারী রাজ্যের দিকে যাত্রা করলেন। নোভারীর রাজা গার্সিয়া অদম্য আল-মানসূরের এই অভিযানে ভীত হয়ে পড়লেন এবং আল-মানসূরের কাছে দূত পাঠিয়ে বললেন, "খলীফা যে তাকে শাস্তি দিতে আসছেন, তার অপরাধ কি?”
আল-মানসূর গর্জন করে দূতকে বললেন, "কি, আপনার মনিব কি আমার কাছে শপথ করে বলেননি যে, কোন মুসলমান বন্দী তাঁর দেশে নেই। এখন আমি জানতে পেরেছি একজন মুসলিম মহিলা তাঁর দেশে আছে। আমি নোভারী থেকে যাব না যতক্ষণ না আপনার মনিব ঐ মহিলা বন্দীকে আমার হাতে ফেরত দেন।”
এই খবর পেয়ে গার্সিয়া সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মহিলা বন্দীকে এবং সেইসাথে খুঁজে পেয়ে আরও দু'জন মুসলিম বন্দীকে আল-মানসূরের কাছে ফেরত পাঠালেন এবং শপথ করলেন যে, কোন মুসলিম বন্দীই আর তাঁর দেশে নেই।
📄 বিরুদ্ধে রায় পেয়ে খলীফা পুরস্কৃত করলেন কাযীকে
ইসলামী সাম্রাজ্যের অত্যন্ত শক্তিমান ও প্রবল প্রতাপশালী খলীফা আল-মানসূর।
ঐতিহাসিকরা একবাক্যে তাঁকে নিষ্ঠুরতার প্রতিমূর্তি হিসেবে অভিহিত করেছেন।
এ সত্ত্বেও সংযম ও নীতি-নিষ্ঠতার জন্যে তিনি ইতিহাসে স্থান রেখে গেছেন।
৭৭৫ খৃষ্টাব্দের কথা। খলীফা আল-মানসূর রাজধানী বাগদাদ থেকে মদীনায় এলেন। মুহাম্মাদ বিন ইমরান তখন মদীনার কাযী।
কাযী সেদিন তাঁর বিচারাসনে আসীন ছিলেন। এমন সময় একজন উট চালক আদালতে এসে খলীফার বিরুদ্ধে একটি সুস্পষ্ট অভিযোগ উত্থাপন করে সুবিচার প্রার্থনা করল।
অভিযোগ শুনেই কাযী মুহাম্মাদ বিন ইমরান তাঁর সহকারীকে খলীফার নামে কোর্টে হাযির হবার জন্যে লিখিত সমন পাঠাবার নির্দেশ দিলেন। তাঁর সহকারী এই আদেশের ব্যাপারে একটু নরম হবার জন্যে অনুরোধ করলেন। কিন্তু কাযী রাযী হলেন না।
অবশেষে তাঁর সহকারী লিখিত সমন পাঠালেন খলীফার কাছে।
খলীফা আল-মানসূর কাযীর সমন পেলেন। সমন পড়ে সভাসদদের বললেন, 'কাযীর আদালত থেকে সমন পেয়েছি। আমি সেখানে যাচ্ছি, কেউ আমার সাথে যাবে না। এটা আমার ইচ্ছা।'
যথা সময়ে খলীফা কাযীর আদালতে হাযির হলেন। কাযী তাঁর আসন থেকে উঠলেন না। খলীফার প্রতি কোন প্রকার ভূক্ষেপ না করে তিনি তাঁর কাজ করে যেতে লাগলেন।
খলীফার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিচার শুরু হলো। কাযীর বিচারে খলীফার বিরুদ্ধে রায় গেল।
যখন বিচারের রায় ঘোষণা করা হলো, খলীফা আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন এবং কাযীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'এই রায়ের জন্য আল্লাহ আপনাকে বিরাট পুরস্কারে পুরস্কৃত করুন। আর আমি আপনার জন্যে ১০ হাজার দিরহাম পুরস্কার ঘোষণা করছি।'