📘 আমরা সেই জাতি > 📄 আমিরুল মুমিনীন কৈফিয়ত দিলেন

📄 আমিরুল মুমিনীন কৈফিয়ত দিলেন


শুক্রবার। জুমার নামায। ইমামের আসনে হযরত উমার। খোতবাদানের জন্য তিনি মিম্বারে দাঁড়িয়েছেন। চারদিকে নিঃসীম নীরবতা। সকলের চোখ খলীফা উমারের দিকে। হঠাৎ মসজিদের অভ্যন্তর থেকেএকজন লোক উঠে দাঁড়াল। সে বলল, "উপস্থিত ভ্রাতৃগণ! গতকাল আমরা বাইতুল মাল থেকে এক টুকরা করে কাপড় পেয়েছি। কিন্তু খলীফা আজ যে নতুন জামাটি গায়ে দিয়েছেন, তা তৈরী করতে অন্ততঃ তিন টুকরা কাপড়ের প্রয়োজন। তিনি আমাদের খলীফা, এই জন্যই কি আরও টুকরা কাপড় বেশী নিয়েছেন?”
খলীফার পুত্র দাঁড়িয়ে বললেন, "আববাজানের পুরানো জামাখানা গায়ে দেয়ার অযোগ্য হয়ে গেছে। এজন্য আমার অংশের টুকরাটি আববাজানকে দিয়েছি।"
এরপর খলীফার চাকর উঠে বলল, "আমার টুকরাটিও অনেক সাধা-সাধি করে খলীফাকে দিয়েছি। তাই দিয়েই জামা তৈরী হয়েছে।”
এই বার খলীফা সেই জিজ্ঞাসাকারী ব্যক্তিকে কৃত্রিম রোষে বললেন, "দেখুন সাহেব, কার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন?”
লোকটি বলল, "নিশ্চয়ই আমি বর্তমান বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শাসক আমীরুল মুমিনীন সম্বন্ধে অভিযোগ করেছি।”
খলীফা পুনরায় বললেন, "আচ্ছা সত্যই যদি আমি এমন কাজ করতাম, আপনি কি করতেন?”
খলীফার কথা শেষ হবার সংগে সংগেই লোকটি সরোষে বলল, "তরবারি দিয়ে আপনার মস্তক দুইখন্ড করে ফেলতাম।”
লোকটির এ ধৃষ্টতা দর্শনে জামাতের সকলেরই মুখ ভয়ে শুকিয়ে গেল। কিন্তু খলীফা হাত উঠিয়ে হাসি ও খুশী ভরা গদগদ কন্ঠে মুনাজাত করলেন, "ইয়া আল্লাহ, আপনার শুকরিয়া যে, আপনার প্রিয় নবীর বিধান রক্ষার্থে নামাযের জামাতে বসেও এমন বিশ্ব ভীতি উমারকে তলোয়ার দেখাবার মুসলমানের অভাব নেই।”
শুক্রবার। জুমআর নামায পড়তে খলীফা মসজিদে গেছেন। সামনে পিছনে তালি দেয়া একটি কামিছ তাঁর গায়ে। একজন অনুযোগ করে বলল, "আল্লাহ আপনাকে প্রচুর দিয়েছেন, আপনি অন্ততঃ একটু ভালভাবে পোষাক পরিধান করুন।” খলীফা কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, "প্রাচুর্যের মধ্যে সংযম পালন ও শক্তিমানের পক্ষে ক্ষমা প্রদর্শন অতীব প্রশংসনীয়।” উৎসর্গীকৃত জীবন যাদের, আড়ম্বর-বিলাস, সুখাদ্য গ্রহণ, পোশাক পরিচ্ছদ প্রভৃতির দিকে লক্ষ্য দেয়ার সময় তাদের কোথায়?

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 আইনের চোখে সবাই সমান

📄 আইনের চোখে সবাই সমান


হজ্জ করবার সময় ভিড়ের মধ্যে আরবের পার্শ্ববর্তী এক রাজার চাদর এক দাসের পায়ে জড়িয়ে যায়। বিরক্ত ও ক্রুদ্ধ হয়ে রাজা জাবালা সেই দাসের গালে চড় বসিয়ে দিলেন। লোকটি খলীফা উমারের (রা) নিকট সুবিচার প্রার্থনা করে নালিশ করে। জাবালাকে তৎক্ষণাৎ ডেকে পাঠানো হলো। অভিযোগ সত্য কিনা জিজ্ঞাসা করায় জাবালা রূঢ় ভাষায় উত্তর দিলেন, "অভিযোগ সত্য। এই লোকটি আমার চাদর মাড়িয়ে যায় কাবা ঘরের চত্বরে।”
"কিন্তু কাজটি তার ইচ্ছাকৃত নয়, ঘটনাক্রমে হয়ে গেছে”—রুক্ষ স্বরে বাধা দিয়ে বললেন খলীফা। উদ্ধত ভাবে জাবালা বললেন, "তাতে কিছু আসে যায় না—এ মাসটা যদি পবিত্র হজ্জের মাস না হতো তবে আমি লোকটিকে মেরেই ফেলতাম।” জাবালা ছিলেন ইসলামী সাম্রাজ্যের একজন শক্তিশালী মিত্র ও খলীফার ব্যক্তিগত বন্ধু।
খলীফা কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন, তারপর অতি শান্ত ও দৃঢ় স্বরে বললেন, "জাবালা, তুমি তোমার দোষ স্বীকার করেছ। ফরিয়াদী যদি তোমাকে ক্ষমা না করে তবে আইনানুসারে চড়ের পরিবর্তে সে তোমাকে চড় লাগাবে।”
গর্বিত সুরে উত্তর দিলেন জাবালা, "কিন্তু আমি যে রাজা আর ও যে একজন দাস।” উত্তরে উমার বললেন, "তোমরা দু'জনেই মুসলমান এবং আল্লাহর চোখে দু'জনেই সমান।”
গর্বিত রাজার অহংকার চূর্ণ হয়ে গেল। গর্ব অহংকার মদমত্ততা মানুষের ধর্ম নয়। সে নির্ভীক, নির্বিকার ও নির্মম। কিন্তু শান্ত সংযত ও সুন্দর সে। সত্যের বাণী যারা অন্তর দিয়ে গ্রহণ করেছেন, মানব গোষ্ঠীর প্রতি তাঁদের দায়িত্ববোধ অসীম। মানুষের সেবা সৃষ্ট জীবের সেবা করেই তাঁরা এই দায়িত্ব থেকে মুক্ত হন।
মানব সেবার এই গুরুদায়িত্ব ভার গ্রহণ করে খলীফা উমারের আর স্বস্তি নেই। কর্তব্যের যদি ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে যায়, যদি তাঁর তিলমাত্র অবহেলায় কেউ কষ্ট পায়, তবে আল্লাহর কাছে যে তার প্রত্যেকটির জন্য জবাব দিহি করতে হবে। তাই উমারের (রা) চোখে ঘুম নেই। রাতের অন্ধকারে তিনি ঘুরে বেড়ান। কে কোথায় কি করছে, কে রোগ যন্ত্রণায় বা ক্ষুধায় কাঁদছে, কে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে অন্ধকারে, কে শোকে মুহ্যমান হয়ে আর্তনাদ করছে। তা তিনি খুঁটে খুঁটে দেখেন। আল্লাহ নেতৃত্ব যার হাতে দেন, তিনি আসলে জন সেবক। তাঁর অসীম বেদনা বোধ, বিপুল দায়িত্বভার তার। এই বেদনা ও দায়িত্বভারেই খলীফা উমার অস্থির থাকতেন। সবাই ঘুমিয়ে পড়লেও নিঝুম নিশীথে স্বীয় দায়িত্বের কথা স্মরণ করে উমার (রা) অঝোরে কাঁদতেন।

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 ধন্য সেই বিধান যা খলীফাকেও খাতির করে না

📄 ধন্য সেই বিধান যা খলীফাকেও খাতির করে না


৬৫৮ সাল। হযরত আলী (রা) খলীফার আসনে। তাঁর ঢাল চুরি গেল। চুরি করল একজন ইহুদী। খলীফা আলী কাযীর কাছে বিচার প্রার্থী হলেন। কাযী আহ্বান করলেন দু'পক্ষকেই। ইহুদী খলীফার অভিযোগ অস্বীকার করলো। কাযী খলীফার কাছে সাক্ষী চাইলেন। খলীফা হাজির করলেন তাঁর এক ছেলে এবং এক চাকরকে। কিন্তু আইনের চোখে এ ধরনের সাক্ষী অচল। কাযী খলীফার অভিযোগ নাকচ করে দিলেন।
মুসলিম জাহানের খলীফা হয়েও কোন বিশেষ বিবেচনা তিনি পেলেন না। ইসলামী আইনের চোখে শত্রু মিত্র সব সমান।
ইহুদী বিচার দেখে অবাক হলো। অবাক বিস্ময়ে সে বলে উঠলো, “অপূর্ব এই বিচার, ধন্য সেই বিধান যা খলীফাকে পর্যন্ত খাতির করে না, আর ধন্য সেই নবী যার প্রেরণায় এরূপ মহৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ জীবনের সৃষ্টি হতে পারে। হে খলীফাতুল মুসলিমীন, ঢালটি সত্যই আপনার। আমিই তা চুরি করেছিলাম। এই নিন আপনার ঢাল। শুধু ঢাল নয়, তার সাথে আমার জানমাল—আমার সব কিছু ইসলামের খেদমতে পেশ করলাম।” সত্য তার আপন মহিমায় এভাবেই ছড়িয়ে পড়ে।

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 আবু বকরকে কোনদিন ছাড়িয়ে যেতে পারবো না

📄 আবু বকরকে কোনদিন ছাড়িয়ে যেতে পারবো না


আবু বকর (রা) তাঁর অতুলনীয় বিশ্বাসপরায়ণতার জন্যে উপাধি পেয়েছিলেন "আস্ সিদ্দিক”।
শুধু বিশ্বাস ও আমলেই নয়, দানশীলতার জন্যে উপাধি পেয়েছিলেন "আস্ সিদ্দিক”।
উমার ইবনে খাত্তাব (রা) বলেছেন, "তাবুক যুদ্ধের প্রাক্কালে মহানবী (সা) আমাদের যার যা আছে তা থেকে যুদ্ধ তহবিলে দান করার আহবান জানালেন। এ আহবান শুনে আমি নিজে নিজেকে বললাম, "আমি যদি আবু বকরকে অতিক্রম করতে পারি, তাহলে আজই সেই দিন।” এই চিন্তা করে আমি আমার সম্পদের অর্ধেক মহানবীর (সা) খেদমতে হাজির করলাম। আল্লাহর রাসূল জিজ্ঞাসা করলেন, "পরিবারের জন্য তুমি কি রেখেছ?” বললাম, "যেই পরিমাণ এনেছি সেই পরিমাণ রেখে এসেছি।” এরপর আবুবকর তাঁর দান নিয়ে হাযির হলেন। মহানবী ঠিক ঐভাবেই তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, "আবুবকর, পরিবারের জন কি অবশিষ্ট আছে?” আবুবকর জবাব দিলেন, "তাদের জন্য আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল রয়েছেন।” আমি আমার কানকে আগের মত করেই বললাম, "কোন ব্যাপারেই আবুবকরকে কোন দিন ছাড়িয়ে যেতে পারবোনা।”

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00