📘 আমরা সেই জাতি > 📄 উমারের (রা) ছেলের কান্না

📄 উমারের (রা) ছেলের কান্না


মক্তব থেকে এসে খলীফা উমারের ছেলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। হযরত উমার তাকে কাছে টেনে জিজ্ঞাসা করলেন, “কাঁদছো কোন বৎস?”
ছেলে উত্তর দিল, "সবাই আমাকে টিটকারী দেয়। বলে, “দেখনা জামার ছিরি, চৌদ্দ জায়গায় তালি। বাপ নাকি আবার মুসলিম জাহানের শাসনকর্তা।” বলে ছেলেটি তার কান্নার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিল।
ছেলের কথা শুনে হযরত উমার ভাবলেন কিছুক্ষণ। তারপর বাইতুল মা'লের কোষাধ্যক্ষকে লিখে পাঠালেন, “আমাকে আগামী মাসের ভাতা থেকে চার দিরহাম ধার দেবেন।” উত্তরে কোষাধ্যক্ষ তাঁকে লিখে জানালেন, “আপনি ধার নিতে পারেন। কিন্তু কাল যদি আপনি মরে যান তাহলে কে আপনার ধার শোধবে?”
হযরত উমার ছেলের গা-মাথা নেড়ে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “যাও বাবা, যা আছে তা পরেই মক্তবে যাবে। আমাদের তো আর অনেক টাকা পয়সা নেই। আমি খলীফা সত্য, কিন্তু ধন সম্পদ তো সবই জনসাধারণের।”

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 উসমান (রা) কিভাবে খলিফা হলেন

📄 উসমান (রা) কিভাবে খলিফা হলেন


দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমার ফারুকের শাহাদাত প্রাপ্তির পর খলীফা নির্বাচন নিয়ে মতানৈক্যের সৃষ্টি হলো। শাহাদাতের পূর্বে হযরত উমারকে (রা) ভাবি খলীফা নির্বাচন সম্পর্কে তাঁর মতামত জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। হযরত উমার (রা) কোন বিশেষ একজনের নাম না করে হযরত আলী (রা), হযরত উসমান (রা), হযরত আবদুর রহমান (রা), হযরত সা'দ (রা), হযরত তালহা (রা) ও হযরত যুবাইর (রা) এ ছয় জনের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু নির্বাচন সভায় তাদের মধ্য থেকে একজনকে নির্বাচন করতে গিয়ে বিভিন্ন মত এমনকি ছয় জনকে নিয়ে ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন ভাগের সৃষ্টি হয়ে গেল। আলোচনায় অচলাবস্থার সৃষ্টি হলো। অবশেষে যুবাইর বললেন, 'আমি হযরত আলীর স্বপক্ষে আমার দাবী পরিত্যাগ করলাম'। হযরত তালহা দাঁড়িয়ে বললেন, 'খিলাফাতের দায়িত্ব মাথায় নিতে আমি একেবারে অক্ষম। সুতরাং আমার দাবী আমি হযরত উসমান গনির (রা) উপর অর্পন করলাম।' হযরত সা'দ (রা) দন্ডায়মান হয়ে বললেন, 'আমার মতে খিলাফতের যোগ্য ব্যক্তি হযরত আবদুর রহমান ইবন আউফ। সুতরাং আমি আমার দাবী পরিত্যাগ করে হযরত আব্দুর রহমান ইবন আউফকে সমর্থন করছি।”
অতপর সমস্যা ছয় থেকে তিনে এসে দাঁড়াল। সেদিনকার মত সভা ভেঙে গেল। মীমাংসা হলোনা। বাড়ী গিয়ে হযরত আব্দুল রহামান ইবন আউফ চিন্তা করলেন, হযরত আলী ও হযরত উসমানের মতো যোগ্য ব্যক্তি উপস্থিত থাকতে খিলাফত পদ আমার জন্য সাজে না। বিষয়টা চিন্তা করেই হযরত আব্দুর রহমান ইবন আউফ হযরত আলীর কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন, "আমি আদৌ খলীফা হতে চাইনে, আর এইভাবে খলীফাহীন অবস্থায় মুসলিম জাহান একদিনও থাকা উচিত নয়। এজন্য আমি চাই, সত্বরই একটি সভা আহবান করে আপনাকে খলীফা হিসেবে ঘোষণা করি।
সম্মান ও সম্পদের প্রতি চির বীতশ্রদ্ধ হযরত আলী বললেন, "উত্তম, আমিও খলীফা নির্বাচন ব্যাপারে বিলম্ব পছন্দ করিনা। আর খিলাফতের দায়িত্বকে গুরুতর বোঝা মনে করি। অতপর আসুন কালই আমরা হযরত উসমানকে (রা) খলীফা পদে বরণ করি।' হযরত আলীর প্রস্তাব অনুসারেই কাজ হলো। পরবর্তী দিনের সভায় হযরত উসমান (রা) খলীফা নির্বাচিত হলেন।

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 আমিরুল মুমিনীন কৈফিয়ত দিলেন

📄 আমিরুল মুমিনীন কৈফিয়ত দিলেন


শুক্রবার। জুমার নামায। ইমামের আসনে হযরত উমার। খোতবাদানের জন্য তিনি মিম্বারে দাঁড়িয়েছেন। চারদিকে নিঃসীম নীরবতা। সকলের চোখ খলীফা উমারের দিকে। হঠাৎ মসজিদের অভ্যন্তর থেকেএকজন লোক উঠে দাঁড়াল। সে বলল, "উপস্থিত ভ্রাতৃগণ! গতকাল আমরা বাইতুল মাল থেকে এক টুকরা করে কাপড় পেয়েছি। কিন্তু খলীফা আজ যে নতুন জামাটি গায়ে দিয়েছেন, তা তৈরী করতে অন্ততঃ তিন টুকরা কাপড়ের প্রয়োজন। তিনি আমাদের খলীফা, এই জন্যই কি আরও টুকরা কাপড় বেশী নিয়েছেন?”
খলীফার পুত্র দাঁড়িয়ে বললেন, "আববাজানের পুরানো জামাখানা গায়ে দেয়ার অযোগ্য হয়ে গেছে। এজন্য আমার অংশের টুকরাটি আববাজানকে দিয়েছি।"
এরপর খলীফার চাকর উঠে বলল, "আমার টুকরাটিও অনেক সাধা-সাধি করে খলীফাকে দিয়েছি। তাই দিয়েই জামা তৈরী হয়েছে।”
এই বার খলীফা সেই জিজ্ঞাসাকারী ব্যক্তিকে কৃত্রিম রোষে বললেন, "দেখুন সাহেব, কার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন?”
লোকটি বলল, "নিশ্চয়ই আমি বর্তমান বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শাসক আমীরুল মুমিনীন সম্বন্ধে অভিযোগ করেছি।”
খলীফা পুনরায় বললেন, "আচ্ছা সত্যই যদি আমি এমন কাজ করতাম, আপনি কি করতেন?”
খলীফার কথা শেষ হবার সংগে সংগেই লোকটি সরোষে বলল, "তরবারি দিয়ে আপনার মস্তক দুইখন্ড করে ফেলতাম।”
লোকটির এ ধৃষ্টতা দর্শনে জামাতের সকলেরই মুখ ভয়ে শুকিয়ে গেল। কিন্তু খলীফা হাত উঠিয়ে হাসি ও খুশী ভরা গদগদ কন্ঠে মুনাজাত করলেন, "ইয়া আল্লাহ, আপনার শুকরিয়া যে, আপনার প্রিয় নবীর বিধান রক্ষার্থে নামাযের জামাতে বসেও এমন বিশ্ব ভীতি উমারকে তলোয়ার দেখাবার মুসলমানের অভাব নেই।”
শুক্রবার। জুমআর নামায পড়তে খলীফা মসজিদে গেছেন। সামনে পিছনে তালি দেয়া একটি কামিছ তাঁর গায়ে। একজন অনুযোগ করে বলল, "আল্লাহ আপনাকে প্রচুর দিয়েছেন, আপনি অন্ততঃ একটু ভালভাবে পোষাক পরিধান করুন।” খলীফা কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, "প্রাচুর্যের মধ্যে সংযম পালন ও শক্তিমানের পক্ষে ক্ষমা প্রদর্শন অতীব প্রশংসনীয়।” উৎসর্গীকৃত জীবন যাদের, আড়ম্বর-বিলাস, সুখাদ্য গ্রহণ, পোশাক পরিচ্ছদ প্রভৃতির দিকে লক্ষ্য দেয়ার সময় তাদের কোথায়?

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 আইনের চোখে সবাই সমান

📄 আইনের চোখে সবাই সমান


হজ্জ করবার সময় ভিড়ের মধ্যে আরবের পার্শ্ববর্তী এক রাজার চাদর এক দাসের পায়ে জড়িয়ে যায়। বিরক্ত ও ক্রুদ্ধ হয়ে রাজা জাবালা সেই দাসের গালে চড় বসিয়ে দিলেন। লোকটি খলীফা উমারের (রা) নিকট সুবিচার প্রার্থনা করে নালিশ করে। জাবালাকে তৎক্ষণাৎ ডেকে পাঠানো হলো। অভিযোগ সত্য কিনা জিজ্ঞাসা করায় জাবালা রূঢ় ভাষায় উত্তর দিলেন, "অভিযোগ সত্য। এই লোকটি আমার চাদর মাড়িয়ে যায় কাবা ঘরের চত্বরে।”
"কিন্তু কাজটি তার ইচ্ছাকৃত নয়, ঘটনাক্রমে হয়ে গেছে”—রুক্ষ স্বরে বাধা দিয়ে বললেন খলীফা। উদ্ধত ভাবে জাবালা বললেন, "তাতে কিছু আসে যায় না—এ মাসটা যদি পবিত্র হজ্জের মাস না হতো তবে আমি লোকটিকে মেরেই ফেলতাম।” জাবালা ছিলেন ইসলামী সাম্রাজ্যের একজন শক্তিশালী মিত্র ও খলীফার ব্যক্তিগত বন্ধু।
খলীফা কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন, তারপর অতি শান্ত ও দৃঢ় স্বরে বললেন, "জাবালা, তুমি তোমার দোষ স্বীকার করেছ। ফরিয়াদী যদি তোমাকে ক্ষমা না করে তবে আইনানুসারে চড়ের পরিবর্তে সে তোমাকে চড় লাগাবে।”
গর্বিত সুরে উত্তর দিলেন জাবালা, "কিন্তু আমি যে রাজা আর ও যে একজন দাস।” উত্তরে উমার বললেন, "তোমরা দু'জনেই মুসলমান এবং আল্লাহর চোখে দু'জনেই সমান।”
গর্বিত রাজার অহংকার চূর্ণ হয়ে গেল। গর্ব অহংকার মদমত্ততা মানুষের ধর্ম নয়। সে নির্ভীক, নির্বিকার ও নির্মম। কিন্তু শান্ত সংযত ও সুন্দর সে। সত্যের বাণী যারা অন্তর দিয়ে গ্রহণ করেছেন, মানব গোষ্ঠীর প্রতি তাঁদের দায়িত্ববোধ অসীম। মানুষের সেবা সৃষ্ট জীবের সেবা করেই তাঁরা এই দায়িত্ব থেকে মুক্ত হন।
মানব সেবার এই গুরুদায়িত্ব ভার গ্রহণ করে খলীফা উমারের আর স্বস্তি নেই। কর্তব্যের যদি ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে যায়, যদি তাঁর তিলমাত্র অবহেলায় কেউ কষ্ট পায়, তবে আল্লাহর কাছে যে তার প্রত্যেকটির জন্য জবাব দিহি করতে হবে। তাই উমারের (রা) চোখে ঘুম নেই। রাতের অন্ধকারে তিনি ঘুরে বেড়ান। কে কোথায় কি করছে, কে রোগ যন্ত্রণায় বা ক্ষুধায় কাঁদছে, কে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে অন্ধকারে, কে শোকে মুহ্যমান হয়ে আর্তনাদ করছে। তা তিনি খুঁটে খুঁটে দেখেন। আল্লাহ নেতৃত্ব যার হাতে দেন, তিনি আসলে জন সেবক। তাঁর অসীম বেদনা বোধ, বিপুল দায়িত্বভার তার। এই বেদনা ও দায়িত্বভারেই খলীফা উমার অস্থির থাকতেন। সবাই ঘুমিয়ে পড়লেও নিঝুম নিশীথে স্বীয় দায়িত্বের কথা স্মরণ করে উমার (রা) অঝোরে কাঁদতেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00