📄 মুরতাদ প্রশ্নে আবু বকরের দৃঢ়তা
ভন্ড মহিলা নবী সাজাহ-এর মিত্র ও সাহায্যকারী মালিক ইবনে নুয়াইরা মুসলিম সেনাধ্যক্ষ খালিদের হাতে যুদ্ধে পরাজিত ও বন্দী হলেন। মালিক ইবনে নুয়াইরা যাকাত দেয়া বন্ধ করেছিল। অনেকের মতে মাগরিব ও ইশার নামায পড়াও বন্ধ করে দিয়েছিল সে। সিন্ধান্ত সাপেক্ষে হযরত খালিদ মালিককে সাহাবী হযরত যিরার ইবনে আওয়ারের দায়িত্বে সোপর্দ করেছিলেন। পরে সে নিহত হয়ে ছিল। এ খবর মদীনায় পৌঁছলে হযরত উমার (রা) হযরত যিরার ও হযরত খালিদের বিরুদ্ধে মালিক হত্যার অভিযোগ আনলেন। হযরত উমার (রা) পরিস্থিতিগত কারণে যাকাত অস্বীকারকারীদেরকেও সাময়িকভাবে মুসলমান বলে মনে করার পক্ষপাতি ছিলেন।। উমার ফারূক হযরত আবুবকরের কাছে অভিযোগ করে বলেছিলেন, "খালিদ মালিককে হত্যা করে কিতাবুল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করেছে।”
কিন্তু হযরত আবুবকর তাঁর সাথে একমত হলেন না। মুরতাদদের জন্য খলীফা হযরত আবু বকরের বিন্দুমাত্র দরদও ছিল না। মুরতাদদের প্রতি হযরত উমারের শৈথিল্য প্রস্তাবের উত্তরে খলিফা আবুবকর বলেছিলেন, "আমি নামায, যাকাত, প্রভৃতি কোন ফরয সম্বন্ধে সামান্যও শৈথিল্য প্রদর্শন করতে পারি না। আল্লাহর ফরয হিসেবে নামায ও যাকাতের মধ্যে কোন প্রভেদ নেই। আজ যাকাত সম্বন্ধে শৈথিল্য দেখালে কাল নামায রোযা সম্বন্ধেও কিছুটা ঢিল দিতে হবে। আল্লাহর শপথ করে বলছি, রাসূলুল্লাহকে (সা) যারা একটি মেষ শাবক যাকাত দিত, আমি সেই মেষশাবক পর্যন্ত লোকের ভয়ের খাতিরে বাদ দিতে পারব না। আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূলের (সা) হুকুমের সকল অবাধ্য লোককে অবনত করতে আমি একা হলেও যুদ্ধ করে যাব।”
📄 উমারের (রা) ভাতা বৃদ্ধির চেষ্টা
উমারের (রা) খিলাফত। খলীফা হওয়ার পূর্বে উমার ব্যবসা করে পরিবার চালাতেন। যখন খলীফা নিযুক্ত হলেন, তখন জনসাধারণের ধনাগার (বাইতুলমাল) থেকে অতি সাধারণভাবে জীনব ধারণের উপযুক্ত অর্থ তাঁকে ও তাঁর পরিবারের জন্য দেয়া হলো। বছরে মাত্র দু'প্রস্থ পোশাক। পারস্য ও রোম সাম্রাজ্যের শক্তি যাঁর কাছে নত, সেই দোর্দন্ড প্রতাপ খলীফা উমার সামান্য অর্থ পান জীবনধারণের জন্য।
হযরত আলী, উসমান ও তালহা ঠিক করলেন খলীফার এই মাসোহারা যথোপযুক্ত নয়, আরও কিছু অর্থ বাড়িয়ে দেয়া হোক। কিন্তু কে এই প্রস্তাব খলীফা উমারের কাছে পেশ করবে। অবশেষে উমারের কন্যা ও রাসূলের (সা) স্ত্রী হাফসাকে (রা) তাঁর কাছে এই প্রস্তাব উত্থাপন করার জন্য অনুরোধ করা হলো। হাফসা (রা) পিতার নিকট এই প্রস্তাব তুলতেই খলীফা উমার তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন। রুক্ষস্বরে তিনি প্রশ্ন করলেন, "কারা এই প্রস্তাব করেছে?” হাফসা নিরুত্তর। পিতাকে তিনি কি উত্তর দেবেন? সাহস হলোনা। খলীফা বললেন, "যদি জানতাম কারা এই প্রস্তাব তোমার মারফতে পাঠিয়েছে। তবে তাদের পিটিয়ে আমি নীল করে দিতাম। বেটি, তুমিতো জান, কি পোশাক রাসূল (সা) পরিধান করতেন, কিরূপ খাদ্য তিনি গ্রহণ করতেন, কি শয্যায় তিনি শয়ন করতেন। বলত, আমার পোশাক, আমায় খাদ্য, আমার শয্যা কি তার চাইতে নিকৃষ্ট?”
হাফসা উত্তর দিলেন, "না"। খলীফা বললেন, "তবে যারা এই প্রস্তাব করে পাঠিয়েছে, তাদের বলো, আমাদের নবী জীবনের যে আদর্শ স্থাপন করে গেছেন তা থেকে আমি এক চুলও বিচ্যুত হবো না।” সে আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে-।
সহজ অনাড়ম্বর ও নিঃস্বার্থ জীবন যাপন সত্যিকার মানুষের আদর্শ---সংযত ও সুনিয়ন্ত্রিত যার জীবন নয়, সে কি করে শহীদের রক্তাক্ষরে লেখা সত্যের জীবনকে গ্রহণ করবে? খলীফা উমারও এক দিন আততায়ীর হস্তে নিহত হন। সত্যের পথে, ন্যায়ের পথে চলেছিলেন এই তাঁর অপরাধ। খলীফা উমার শহীদ হয়েছেন কবে, কিন্তু সত্যের নির্ভীক সাধক শহীদ উমার আজও বেঁচে আছেন দেশ ও জাতির দিগদর্শনরূপে।
📄 উমারের (রা) ছেলের কান্না
মক্তব থেকে এসে খলীফা উমারের ছেলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। হযরত উমার তাকে কাছে টেনে জিজ্ঞাসা করলেন, “কাঁদছো কোন বৎস?”
ছেলে উত্তর দিল, "সবাই আমাকে টিটকারী দেয়। বলে, “দেখনা জামার ছিরি, চৌদ্দ জায়গায় তালি। বাপ নাকি আবার মুসলিম জাহানের শাসনকর্তা।” বলে ছেলেটি তার কান্নার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিল।
ছেলের কথা শুনে হযরত উমার ভাবলেন কিছুক্ষণ। তারপর বাইতুল মা'লের কোষাধ্যক্ষকে লিখে পাঠালেন, “আমাকে আগামী মাসের ভাতা থেকে চার দিরহাম ধার দেবেন।” উত্তরে কোষাধ্যক্ষ তাঁকে লিখে জানালেন, “আপনি ধার নিতে পারেন। কিন্তু কাল যদি আপনি মরে যান তাহলে কে আপনার ধার শোধবে?”
হযরত উমার ছেলের গা-মাথা নেড়ে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “যাও বাবা, যা আছে তা পরেই মক্তবে যাবে। আমাদের তো আর অনেক টাকা পয়সা নেই। আমি খলীফা সত্য, কিন্তু ধন সম্পদ তো সবই জনসাধারণের।”
📄 উসমান (রা) কিভাবে খলিফা হলেন
দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমার ফারুকের শাহাদাত প্রাপ্তির পর খলীফা নির্বাচন নিয়ে মতানৈক্যের সৃষ্টি হলো। শাহাদাতের পূর্বে হযরত উমারকে (রা) ভাবি খলীফা নির্বাচন সম্পর্কে তাঁর মতামত জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। হযরত উমার (রা) কোন বিশেষ একজনের নাম না করে হযরত আলী (রা), হযরত উসমান (রা), হযরত আবদুর রহমান (রা), হযরত সা'দ (রা), হযরত তালহা (রা) ও হযরত যুবাইর (রা) এ ছয় জনের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু নির্বাচন সভায় তাদের মধ্য থেকে একজনকে নির্বাচন করতে গিয়ে বিভিন্ন মত এমনকি ছয় জনকে নিয়ে ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন ভাগের সৃষ্টি হয়ে গেল। আলোচনায় অচলাবস্থার সৃষ্টি হলো। অবশেষে যুবাইর বললেন, 'আমি হযরত আলীর স্বপক্ষে আমার দাবী পরিত্যাগ করলাম'। হযরত তালহা দাঁড়িয়ে বললেন, 'খিলাফাতের দায়িত্ব মাথায় নিতে আমি একেবারে অক্ষম। সুতরাং আমার দাবী আমি হযরত উসমান গনির (রা) উপর অর্পন করলাম।' হযরত সা'দ (রা) দন্ডায়মান হয়ে বললেন, 'আমার মতে খিলাফতের যোগ্য ব্যক্তি হযরত আবদুর রহমান ইবন আউফ। সুতরাং আমি আমার দাবী পরিত্যাগ করে হযরত আব্দুর রহমান ইবন আউফকে সমর্থন করছি।”
অতপর সমস্যা ছয় থেকে তিনে এসে দাঁড়াল। সেদিনকার মত সভা ভেঙে গেল। মীমাংসা হলোনা। বাড়ী গিয়ে হযরত আব্দুল রহামান ইবন আউফ চিন্তা করলেন, হযরত আলী ও হযরত উসমানের মতো যোগ্য ব্যক্তি উপস্থিত থাকতে খিলাফত পদ আমার জন্য সাজে না। বিষয়টা চিন্তা করেই হযরত আব্দুর রহমান ইবন আউফ হযরত আলীর কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন, "আমি আদৌ খলীফা হতে চাইনে, আর এইভাবে খলীফাহীন অবস্থায় মুসলিম জাহান একদিনও থাকা উচিত নয়। এজন্য আমি চাই, সত্বরই একটি সভা আহবান করে আপনাকে খলীফা হিসেবে ঘোষণা করি।
সম্মান ও সম্পদের প্রতি চির বীতশ্রদ্ধ হযরত আলী বললেন, "উত্তম, আমিও খলীফা নির্বাচন ব্যাপারে বিলম্ব পছন্দ করিনা। আর খিলাফতের দায়িত্বকে গুরুতর বোঝা মনে করি। অতপর আসুন কালই আমরা হযরত উসমানকে (রা) খলীফা পদে বরণ করি।' হযরত আলীর প্রস্তাব অনুসারেই কাজ হলো। পরবর্তী দিনের সভায় হযরত উসমান (রা) খলীফা নির্বাচিত হলেন।