📄 একটি হাদীস এবং আবু বকর
এই হাদীস শুনানোর পরবর্তীকালে হযরত উমার (রা) বলেছিলেন, "সত্যই জগতে এমন কোন উত্তম কাজ নেই, যা আবুবকর (রা) সর্বাগ্রে সুসম্পন্ন না করেন। এটা আমার অনুমান নয়, অভিজ্ঞতার কথা। একদিন আমি অশীতিপর এক বৃদ্ধার উপবাসের কথা শুনে কিছু খাবার নিয়ে তার বাড়ীতে গিয়ে উপস্থিত হলাম। কিন্তু গিয়েই শুনলাম, কে একজন দয়ালু ব্যক্তি অল্পক্ষণ আগে আহার করিয়ে গেছেন। আমি সেদিন ফিরে এসে পরের দিন একইভাবে কিছু আহার নিয়ে তার কাছে গেলাম। কিন্তু একই ঘটনা প্রত্যক্ষ করলাম, কে একজন আমার যাওয়ার পূর্বেই তাকে আহার করিয়ে গেছে। কে এই দয়ালু ব্যক্তি, কে এমন নিয়ম বেঁধে তাকে আহার করিয়ে যায়, তা জানবার জন্য আমার জিদ চেপে গেল।
পরের দিন সকাল সকাল আমি বৃদ্ধার বাড়ী গিয়ে হাজির হলাম। আমার আজকের শপথ, বৃদ্ধাকে আজ আমার আহার করাতেই হবে, সে ব্যক্তিকে আজ আমাকে দেখতেই হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, বৃদ্ধার গৃহমধ্যে ঢুকতে যাচ্ছি এমন সময় দেখলাম, শূণ্য বাসন পেয়ালা নিয়ে আবু বকর (রা) বের হয়ে আসছেন। আমি তাঁকে সালাম জানিয়ে বললাম, 'বন্ধুবর' আমিও এটাই অনুমান করেছিলাম। তিনি নীরব হাস্যে আমাকে প্রতিসালাম জানিয়ে করমর্দন করে বাড়ীর পথ ধরলেন।”
📄 আবু বকর পরবর্তী খলিফাদের বড় মুশকিলে ফেলে গেলেন
হযরত আবুবকর ছিদ্দীক (রা) মুসলিম জাহানের খলীফা হয়েছেন। খলীফা নির্বাচিত হবার ক'দিন পরের ঘটনা। নতুন চাদরের একটি বোঝা নিয়ে খলীফা বাজারে চলেছেন বিক্রি করার জন্য। উমার (রা) পড়লেন পথে। তিনি বললেন, "কোথায় চললেন?”
আবু বকর (রা) বললেন, "বাজারে যাচ্ছি”। হযরত উমার (রা) বুঝলেন, খলীফা হওয়ার আগে হযরত আবু বকর কাপড়ের যে ব্যবসা করতেন, তা এখনও ছাড়েননি। উমার বললেন, "ব্যবসায় মগ্ন থাকলে খিলাফাতের কাজ চলবে কেমন করে?”
হযরত আবু বকর বললেন, "ব্যবসা না করলে পরিবার-পরিজনদের ভরণ পোষণ করব কি দিয়ে?” উত্তরে হযরত উমার বললেন, "বাইতুল মালের খাজাঞ্চি আবু উবাইদার কাছে চলুন, তিনি আপনার জন্য একটা ভাতা নির্দিষ্ট করে দেবেন”, বলে হযরত আবুবকরকে টেনে নিয়ে আবু উবাইদার কাছে গেলেন।
আলোচনার পর অন্যান্য মুহাজিরকে যে হারে ভাতা দেয়া হয় সে পরিমাণের একটি ভাতা খলীফা হযরত আবু বকরের জন্য নির্দিষ্ট হলো। ভাতা নির্দিষ্ট হবার পর খলীফা এ কথাটি জনসাধারণের্যে প্রকাশ করার প্রয়োজন মনে করলেন। তিনি মদীনায় সকল লোককে ডেকে বললেন, "তোমরা জান যে, ব্যবসা দ্বারা আমি জীবিকা নির্বাহ করতাম। এখন তোমাদের খলীফা হবার ফলে সারাটা দিনই খিলাফতের কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়, ব্যবসা দেখাশুনা করতে পারিনা। সেজন্য বাইতুল মাল থেকে আমাকে ভাতা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে।”
হযরত আবু বকর (রা) বেঁচে থাকার প্রয়োজনে যেটুকু ভাতা গ্রহণ করতেন, জনসাধারণের কাছ থেকে এই ভাবে তা তিনি মঞ্জুর করিয়া নিলেন।
মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে তিনি হযরত আয়িশাকে (রা) বললেন, "আমার মৃত্যুর পর আমার প্রয়োজনার্থে আনা বাইতুল মালের যাবতীয় জিনিস আমার পরবর্তী খলীফার নিকট পাঠিয়ে দিও।” তাঁর মৃত্যুর পর কোন টাকা পয়সাই তাঁর কাছে পাওয়া যায়নি। মাত্র একটি দুগ্ধবতী উট, একটি পেয়ালা, একটি চাদর ও একটি বিছানাই তাঁর সম্পদ ছিল। এ জিনিসগুলো মৃত খলীফার নির্দেশ মুতাবিক খলীফা উমারের (রা) কাছে পাঠিয়ে দেয়া হলো। এসব দেখে খলীফা উমার (রা) অশ্রুসজল চোখে বললেন, "আল্লাহ আবুবকরের উপর রহম করুন। তিনি তাঁর পরবর্তী খলীফাদের বড় মুস্কিলে ফেলে গেলেন।”
📄 মুরতাদ প্রশ্নে আবু বকরের দৃঢ়তা
ভন্ড মহিলা নবী সাজাহ-এর মিত্র ও সাহায্যকারী মালিক ইবনে নুয়াইরা মুসলিম সেনাধ্যক্ষ খালিদের হাতে যুদ্ধে পরাজিত ও বন্দী হলেন। মালিক ইবনে নুয়াইরা যাকাত দেয়া বন্ধ করেছিল। অনেকের মতে মাগরিব ও ইশার নামায পড়াও বন্ধ করে দিয়েছিল সে। সিন্ধান্ত সাপেক্ষে হযরত খালিদ মালিককে সাহাবী হযরত যিরার ইবনে আওয়ারের দায়িত্বে সোপর্দ করেছিলেন। পরে সে নিহত হয়ে ছিল। এ খবর মদীনায় পৌঁছলে হযরত উমার (রা) হযরত যিরার ও হযরত খালিদের বিরুদ্ধে মালিক হত্যার অভিযোগ আনলেন। হযরত উমার (রা) পরিস্থিতিগত কারণে যাকাত অস্বীকারকারীদেরকেও সাময়িকভাবে মুসলমান বলে মনে করার পক্ষপাতি ছিলেন।। উমার ফারূক হযরত আবুবকরের কাছে অভিযোগ করে বলেছিলেন, "খালিদ মালিককে হত্যা করে কিতাবুল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করেছে।”
কিন্তু হযরত আবুবকর তাঁর সাথে একমত হলেন না। মুরতাদদের জন্য খলীফা হযরত আবু বকরের বিন্দুমাত্র দরদও ছিল না। মুরতাদদের প্রতি হযরত উমারের শৈথিল্য প্রস্তাবের উত্তরে খলিফা আবুবকর বলেছিলেন, "আমি নামায, যাকাত, প্রভৃতি কোন ফরয সম্বন্ধে সামান্যও শৈথিল্য প্রদর্শন করতে পারি না। আল্লাহর ফরয হিসেবে নামায ও যাকাতের মধ্যে কোন প্রভেদ নেই। আজ যাকাত সম্বন্ধে শৈথিল্য দেখালে কাল নামায রোযা সম্বন্ধেও কিছুটা ঢিল দিতে হবে। আল্লাহর শপথ করে বলছি, রাসূলুল্লাহকে (সা) যারা একটি মেষ শাবক যাকাত দিত, আমি সেই মেষশাবক পর্যন্ত লোকের ভয়ের খাতিরে বাদ দিতে পারব না। আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূলের (সা) হুকুমের সকল অবাধ্য লোককে অবনত করতে আমি একা হলেও যুদ্ধ করে যাব।”
📄 উমারের (রা) ভাতা বৃদ্ধির চেষ্টা
উমারের (রা) খিলাফত। খলীফা হওয়ার পূর্বে উমার ব্যবসা করে পরিবার চালাতেন। যখন খলীফা নিযুক্ত হলেন, তখন জনসাধারণের ধনাগার (বাইতুলমাল) থেকে অতি সাধারণভাবে জীনব ধারণের উপযুক্ত অর্থ তাঁকে ও তাঁর পরিবারের জন্য দেয়া হলো। বছরে মাত্র দু'প্রস্থ পোশাক। পারস্য ও রোম সাম্রাজ্যের শক্তি যাঁর কাছে নত, সেই দোর্দন্ড প্রতাপ খলীফা উমার সামান্য অর্থ পান জীবনধারণের জন্য।
হযরত আলী, উসমান ও তালহা ঠিক করলেন খলীফার এই মাসোহারা যথোপযুক্ত নয়, আরও কিছু অর্থ বাড়িয়ে দেয়া হোক। কিন্তু কে এই প্রস্তাব খলীফা উমারের কাছে পেশ করবে। অবশেষে উমারের কন্যা ও রাসূলের (সা) স্ত্রী হাফসাকে (রা) তাঁর কাছে এই প্রস্তাব উত্থাপন করার জন্য অনুরোধ করা হলো। হাফসা (রা) পিতার নিকট এই প্রস্তাব তুলতেই খলীফা উমার তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন। রুক্ষস্বরে তিনি প্রশ্ন করলেন, "কারা এই প্রস্তাব করেছে?” হাফসা নিরুত্তর। পিতাকে তিনি কি উত্তর দেবেন? সাহস হলোনা। খলীফা বললেন, "যদি জানতাম কারা এই প্রস্তাব তোমার মারফতে পাঠিয়েছে। তবে তাদের পিটিয়ে আমি নীল করে দিতাম। বেটি, তুমিতো জান, কি পোশাক রাসূল (সা) পরিধান করতেন, কিরূপ খাদ্য তিনি গ্রহণ করতেন, কি শয্যায় তিনি শয়ন করতেন। বলত, আমার পোশাক, আমায় খাদ্য, আমার শয্যা কি তার চাইতে নিকৃষ্ট?”
হাফসা উত্তর দিলেন, "না"। খলীফা বললেন, "তবে যারা এই প্রস্তাব করে পাঠিয়েছে, তাদের বলো, আমাদের নবী জীবনের যে আদর্শ স্থাপন করে গেছেন তা থেকে আমি এক চুলও বিচ্যুত হবো না।” সে আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে-।
সহজ অনাড়ম্বর ও নিঃস্বার্থ জীবন যাপন সত্যিকার মানুষের আদর্শ---সংযত ও সুনিয়ন্ত্রিত যার জীবন নয়, সে কি করে শহীদের রক্তাক্ষরে লেখা সত্যের জীবনকে গ্রহণ করবে? খলীফা উমারও এক দিন আততায়ীর হস্তে নিহত হন। সত্যের পথে, ন্যায়ের পথে চলেছিলেন এই তাঁর অপরাধ। খলীফা উমার শহীদ হয়েছেন কবে, কিন্তু সত্যের নির্ভীক সাধক শহীদ উমার আজও বেঁচে আছেন দেশ ও জাতির দিগদর্শনরূপে।