📄 আকাবার প্রথম বাইয়াত
ইসলাম-পূর্ব জাহেলী যুগ।
মদীনার ছয় যুবক হজ্বে এসেছেন। তখন মদীনার নাম ছিল ইয়াসরিব।
সে যুগেও হজ্ব হতো, কিন্তু জাহেলী রীতি অনুসারে।
মক্কার আকাবা নামক স্থানে তাঁবু গাড়লেন মদীনার সেই যুবকরা।
এই ছয়জন যুবক একদিন গভীর আলোচনায় মশগুল, একজন অতিথি এলেন তাঁবুর দরজায়।
শ্রদ্ধা জাগানো সুন্দর সৌম্য-দর্শন এক অতিথি।
অতিথি সালাম দিলেন যুবকদের উদ্দেশ্যে। তারপর বললেন, 'আপনারা কি আমার কথা শুনবেন?'
মিষ্টি কণ্ঠস্বর অতিথির।
যুবকরা সমস্বরে বলে উঠলো, 'অবশ্যই অবশ্যই।'
অতিথি ব্যক্তিটি ছিলেন মহানবী (সা)।
তিনি তখন ছয় যুবককে মানুষের জন্যে রাব্বুল আলামিনের খোশখবর শোনালেন, তাওহীদের দাওয়াত গ্রহণের উৎসাহ দিলেন এবং বললেন, 'আমি আল্লাহর রাসূল। আল্লাহর বান্দাদের পথ প্রদর্শনে নিয়োজিত রয়েছি।'
ছয়জন যুবকই মহানবীর কথা গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। আল্লাহর রাসূলের কথা শেষ হতেই তাঁরা বললেন, 'আল্লাহর যে কালাম আপনার উপর অবতীর্ণ হয়েছে, তা থেকে আমাদের কিছু শোনান।'
মহানবীর পবিত্র কণ্ঠে সূরা ইবরাহিম পাঠ হতে লাগলো। কয়েকটি আয়াত পাঠ হতেই চমৎকৃত হয়ে গেলেন ছয় যুবক। তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগলেন, "আল্লাহর কসম, এতো সেই নবী যাঁর উল্লেখ সবসময় আমাদের শহরের ইহুদীদের মুখে শোনা যায়। ইসলাম গ্রহণে ইহুদীদের আগে তাদেরই অগ্রসর হওয়া উচিত।"
অতঃপর তারা উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে মহানবী (সা)-কে আরজ করলো, 'হে মুহাম্মাদ (সা), আমরা আপনার দাওয়াত মনে-প্রাণে গ্রহণ করছি এবং সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ এক আপনি তাঁর রাসূল।'
এই ঘোষণা দেয়ার পর ছয়জনের মধ্য থেকে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও সুদর্শন যুবক আবু উসামা আসয়াদ বিন যুরারাহ মহানবীর দিকে অগ্রসর হয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আপনার হাত সম্প্রসারিত করুন। আমি এই হাতে ইসলামের বাইয়াত করছি।'
মহানবী (সা) সানন্দে তাঁর হাত এগিয়ে দিলেন।
প্রথম বাইয়াত করলেন আসয়াদ বিন যুরারাহ। তারপর তাঁর সাথী পাঁচজন যুবক।
তাঁরা হলেন মদীনার প্রথম মুসলমান।
এইভাবেই এই উদ্যমী যুবকদের মাধ্যমে ইসলামের আলো প্রথম প্রবেশ করে ইয়াসরিব বা মদীনায়।
📄 উবাদার (রা) সত্যনিষ্ঠা
তখন উসমান (রা)-এর খিলাফত। মুয়াবিয়া (রা) তখন সমগ্র সিরিয়ার গভর্নর। উবাদাহ ইবনে সামিত তাঁর অধীনে একজন শাসক। উবাদাহ (রা) সেই লোক যিনি সত্য কথা, উচিত কথা যখন বলেন, তখন কোথায় কার কাছে বলছেন তার পরোয়া করেন না।
তাঁর বিরোধ বাধল মুয়াবিয়া (রা)-এর সাথে। মুয়াবিয়া (রা) খলিফা উসমান (রা) কে লিখলেন, "উবাদাহ বিন সামিতের কথা ও ভাষণ জনগণকে উত্তেজিত করে এবং বিশৃংখল করে তোলে। তাঁকে সিরিয়া থেকে প্রত্যাহার করে নিন। তা না হলে আমি সিরিয়ার শাসন কাজ পরিত্যাগ করব।"
উসমান (রা) উবাদাহ ইবনে সামিতকে মদীনায় ডেকে পাঠালেন। তিনি এলেন খলিফা উসমান (রা)-এর দরবারে। দরবারে তখন অনেক লোক। উবাদাহ (রা) এক কোনায় চুপ করে বসে পড়লেন। উবাদাহ (রা)-কে দেখতে পেয়েই উসমান (রা) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, "বলুন তো কি ঘটনা।"
স্পষ্টবাদী উবাদাহ (রা) উঠে দাঁড়ালেন। সত্য প্রকাশের অসীম আবেগে তিনি উদ্দীপ্ত। দরবারের সমাবেশকে লক্ষ্য করে তিনি বললেন, “হে মানুষেরা, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, আমার পর আমীরেরা সৎকে অসৎ এবং অসৎকে সৎ-এ পরিবর্তন করবে। অবৈধ কাজকে বৈধ মনে করতে থাকবে। কিন্তু গুনাহর কাজে কারও আনুগত্য জায়েয নয়। তোমরা অবশ্যই অসৎ কাজ থেকে দূরে থাকবে।'
আবু হুরাইরা (রা) উবাদাহ (রা)-এর বক্তব্যে কিছু বাধা দিতে চাইলেন। উবাদাহ ইবনে সামিত সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, "আমরা যে সময় রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাইয়াত (নবুয়তের ত্রয়োদশ বছরে বাইয়াতে আকাবায় এই বাইয়াত সংঘটিত হয়) করেছিলাম, তখন আপনি সেখানে ছিলেন না। আমাদের বাইয়াতের শর্ত ছিল যে, লোকদের কাছে ভাল কথা পৌঁছাতে থাকবো, খারাপ কথা থেকে বিরত রাখবো। কখনো কারো ভয়ে ভীত হবো না।... এই বাইয়াত মহানবীর সাথে হয়েছিল। ওয়াদা পূরণ আমাদের অবশ্যকর্তব্য কাজ।"
উবাদার (রা) এই কথার পর কারও কোন কথা আর থাকতে পারে না। আর কেউ কোন কথা বলতে সাহস করলো না।
📄 বারা ইবনে মালিক কথা রাখলেন
অগ্নিপূজক ইরানীদের সাথে যুদ্ধ। যুদ্ধ চলছে সুস্তার রণাঙ্গনে। আনাস ইবনে মালিক এবং তার ভাই বারা ইবনে মালিক পদাতিক বাহিনীর অফিসার।
বারা ইবনে মালিক ছিলেন দক্ষিণ বাহুর একজন অফিসার। অনেক দিন ধরে চলছে সুস্তার দুর্গের অবরোধ। যুদ্ধের এক ফাঁকে আনাস ইবনে মালিক তার ভাই বারা ইবনে মালিকের তাঁবুতে প্রবেশ করলেন। দেখলেন, বারা সুর করে কবিতা আবৃত্তি করছেন।
আনাস ইবনে মালিক বললেন, 'ভাই আমার, আল্লাহ আমাদের কুরআন শরীফ দান করেছেন। কুরআন কবিতা থেকে উত্তম। সুললিত কণ্ঠে তা তেলাওয়াত করুন।'
বারা ইবনে মালিক হাসলেন। বললেন, "আনাস, সম্ভবত তুমি ভয় পাচ্ছ যে, আমি বিছানাতেই মারা যাব। কিন্তু আল্লাহর কসম, এমন তরো হবে না। আমি মরলে ময়দানেই মরবো।" সে দিনই বাধল ইরানীদের সাথে এক ঘোরতর যুদ্ধ। মরণপণ এ লড়াইয়ে মুসলিম বাহিনী চূড়ান্ত আঘাত হানতে চাইল ইরানীদের উপর।
ইরানীদের দুর্ধর্ষ সেনাপতি হুরমুযানকে লক্ষ্য করে অগ্রসর হলো বারা ইবনে মালিক। ইরান সেনাপতির অবস্থানে বিপর্যয় ঘটাতে পারলে বিজয় সুনিশ্চিত হবে।
ইরান সেনাপতির দুর্ভেদ্য ব্যুহে ঝাঁপিয়ে পড়ল বারা ইবনে মালিক। ব্যুহটি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে বারা আক্রমণ করে বসলেন সেনাপতি হুরমুযানকে। আহত, ক্লান্ত বারা শহীদ হলেন হুরমুযানের হাতে, কিন্তু ইরান বাহিনীর মেরুদণ্ড তখন ভেঙ্গে পড়েছে। বারা শহীদ হলেন, কিন্তু হুরমুযান শোচনীয়ভাবে পরাজিত ও বন্দী হলেন।
বারা তাঁর ভাই আনাসকে দেয়া কথা রাখলেন শাহাদাতের অমৃত পেয়ালা পান করে।
📄 মাগের ইবনে মালিকের তাওবা
মাগের ইবনে মালিক (রা) মহানবী (সা)-এর একজন সাহাবী। সতর্কতা সত্ত্বেও কখনও কারো পা পিছলাতে পারে। মাগের ইবনে মালিকও (রা) গুরুতর অপরাধ করে বসলেন।
অপরাধ করার পরই আল্লাহর ভয় তার মধ্যে এক মহাযন্ত্রণার সৃষ্টি করল। তার মনে হলো, এ অপরাধের জন্য আল্লাহ-নির্ধারিত শাস্তি গ্রহণের মাধ্যমেই তার যন্ত্রণার অবসান হতে পারে।
মাগের ইবনে মালিক (রা) মহানবী (সা)-এর কাছে হাজির হলেন। বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ আমাকে পবিত্র করুন।'
আল্লাহর রাসূল (সা) তাকে বললেন, "তোমার সুমতি হোক। যাও, গিয়ে আল্লাহর কাছে তওবা কর।"
মাগের ইবনে মালিক আল্লাহর রাসূলের এ আদেশ নিয়ে ফিরে চললেন। কিন্তু হৃদয়ের সে যন্ত্রণা তাঁর দূর হলো না। আল্লাহ-নির্ধারিত শাস্তি গ্রহণ করার মাধ্যমে তওবা না করলে কিভাবে তিনি পবিত্র হবেন? মনের তাড়নায় আবার তিনি ফিরে গেলেন মহানবীর কাছে। আগের মতই তিনি মহানবীর কাছে আরজ পেশ করলেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাকে পবিত্র করুন?"
মহানবী (সা) আগের মতই তাঁকে নির্দেশ দিলেন।
মাগের ইবনে মালিক (রা) মহানবীর নির্দেশ নিয়ে আবার ফিরে গেলেন। কিন্তু মনের তাড়নায় আবার ফিরে এলেন। এভাবে তিনবার এই ঘটনা ঘটল।
চতুর্থবার মাগের ইবনে মালিক (রা) ফিরে এলে মহানবী (সা) মাগের ইবনে মালিক (রা)-কে বললেন, "আমি তোমাকে কি থেকে পবিত্র করব?”
মাগের বিনীতভাবে আরজ করলেন, 'ব্যভিচার থেকে।'
মহানবী (সা) আশেপাশের লোকদের জিজ্ঞাসা করলেন, "এ মাতাল নাতো?"
সকলে বলল, 'সে মাতাল নয় ইয়া রাসূলাল্লাহ!'
আল্লাহর রাসূল আবার জিজ্ঞাসা করলেন, 'ও কি মদ খেয়েছে?'
লোকজন মাগের ইবনে মালিকের কাছে গিয়ে তার মুখ শুঁকে বলল, "না সে মদ খায়নি।"
এবার মহানবী (সা) মাগের ইবনে মালিককে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞাসা করলেন, "তুমি কি সত্যই ব্যভিচার করেছ?'
মাগের আরজ করল, 'হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ।'
মাগেরের সুস্পষ্ট স্বীকৃতি পুনরায় লাভ করার পর মহানবী (সা) আল্লাহর বিধান অনুযায়ী তাঁর শাস্তির ব্যবস্থা করলেন। প্রস্তরাঘাতে তাঁকে হত্যা করার শাস্তি কার্যকর করা হলো। ব্যভিচারের অপরাধ থেকে পবিত্র হবার জন্যে মাগের ইবনে মালিক পরম সন্তুষ্টচিত্তে প্রস্তরাঘাতে তাঁর জীবন বিসর্জন দিলেন।
দু'তিন দিন পর মহানবী (সা) সাহাবীদের ডেকে বললেন, "তোমরা মাগের ইবনে মালিকের জন্যে মাগফিরাতের দোয়া কর। সে যে তাওবা করেছে, তা গোটা একটা জাতির মধ্যে বণ্টন করে দিলেও তাদের সকলের জন্যে তা যথেষ্ট হবে।"