📄 ‘আজ আল্লাহর জন্যে জীবন বিলিয়ে দেবোনা?’
আজনাদাইনের যুদ্ধ শেষ। দামেস্ক বিজয় সম্পূর্ণ হয়েছে। মুসলিম বাহিনী জর্দানের ফাহলে। ছোট মুসলিম বাহিনী ৮০ হাজার রোমক সৈন্যের মুখোমুখি।
সম্মুখ সমরে ভীত রোমক বাহিনী বীরত্বের বদলে বেছে নিল ষড়যন্ত্রের পথ। এক অন্ধকার রাত। রোমক বাহিনী এসে আপতিত হলো মুসলিম বাহিনীর উপর। ভীষণ যুদ্ধ শুরু হলো।
যুদ্ধ চলল সে রাত এবং পরের গোটা দিন। এক ইকরামা ইবনে আবু জাহেল যেন দশ ইকরামায় পরিণত হয়েছেন। যেদিকে তিনি ছুটছেন, লাশের সারি পড়ে যাচ্ছে। যুদ্ধের স্রোত তাকে মূল বাহিনী থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। সামনে তাঁর বিরাট এক শত্রু ব্যুহ।
ঢুকে পড়লেন তিনি সে শত্রু ব্যুহে। তাঁর লক্ষ্য শত্রু নিধন। নিজের প্রতি কোন খেয়াল তাঁর নেই। আঘাতে আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হতে লাগল তাঁর দেহ। সাথীরা চিৎকার করে বলল, “ইকরামা আল্লাহর ভয় করো। এভাবে নিজেকে ধ্বংসের মধ্যে নিপতিত করো না। আবেগকে বুদ্ধির উপর বিজয়ী হতে দিও না।”
ইকরামা তার তরবারী না থামিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলেন, “হে লোকেরা, আমি লাত-উজ্জার খাতিরে জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতাম। আজ আল্লাহ ও রাসূলের (সা) জন্যে জীবন বিলিয়ে দেব না? আল্লাহর কসম, তা কখনো হবে না।"
রোমক সৈন্যরা তখন পিছু হটতে শুরু করেছে। যুদ্ধে তাদের শোচনীয় পরাজয় ঘটল। মাত্র কতিপয় সৈন্য ছাড়া গোটা রোমক বাহিনী নিশ্চিহ্ন হয়েছিল ঐ যুদ্ধে। শহীদ হতে চাইলেও এ যুদ্ধেও ইকরামা গাজী হয়ে ফিরলেন。
📄 শাহাদাতের বাইয়াত
ইয়ারমুকের ভয়াবহ রণক্ষেত্র।
রোমক সম্রাটের ২ লাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনী অতুল সমর-সম্ভার নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে সমবেত।
তাদের মুকাবিলায় দাঁড়িয়েছে খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে ৪০ হাজার সৈন্যের মুসলিম বাহিনী।
দুই পক্ষ থেকেই শুরু হয়েছে মরণপণ যুদ্ধ। যুদ্ধের এক পর্যায়ে বিশাল রোমক বাহিনীর চাপে মুসলিম বাহিনীর ব্যুহগুলো ভেঙে পড়ার উপক্রম হলো। খোদ সেনাপতির তাঁবু বিপন্ন হয়ে উঠল।
ইকরামা বিন আবু জাহেলের হৃদয়ের সব আবেগ যেন উথলে উঠল। নিজের ঘোড়া হাঁকিয়ে অগ্রসর হলেন সামনে এবং উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন, "হে রোমকরা, আমি কোন এক সময় স্বয়ং রাসূলের (সা) বিরুদ্ধে (কুফরী অবস্থায়) লড়াই করেছি। আজ কি তোমাদের মুকাবিলায় আমার কদম পিছু হটতে পারে? আল্লাহর কসম, এমনটি কখনও হবে না।"
বলে তিনি পেছনে তাকিয়ে তাঁর বাহিনীর উদ্দেশ্যে বললেন, "এসো, কে আমার হাতে মৃত্যুর বাইয়াত করবে?"
চারজন অগ্রসর হলো তাঁর দিকে। তাঁরা ইকরামার হাতে হাত রেখে শাহাদাতের বাইয়াত গ্রহণ করল। এই চারজনের মধ্যে দু'জন ছিল ইকরামার দুই ছেলে। তারা ঝাঁপিয়ে পড়ল খালিদ ইবনে ওয়ালিদের তাঁবু লক্ষ্য করে এগিয়ে আসা রোমক সৈন্যদের উপর।
শুরু হলো তাদের মরণপণ লড়াই।
এক এক করে তারা শহীদ হলেন অথবা গুরুতর আহত হয়ে লড়াই করতে অক্ষম হয়ে পড়লেন। গুরুতর আহত ছিলেন ইকরামার দুই পুত্র। ছুটে এলেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ।
নিহতের স্তূপে পাওয়া গেল হযরত ইকরামার (রা) লাশ। তাঁর নিঃশ্বাস তখনও ছিল। হযরত খালিদ তাঁর মাথা কোলে তুলে নিলেন। তাঁর মুখে ফোটা ফোটা পানি দিতে দিতে বললেন, "আল্লাহর কসম, ইবনে হানতামার (হযরত উমর ফারুকের) ধারণা সঠিক প্রমাণিত হয়নি। তাঁর ধারণা ছিল যে, বনি মাখজুমীরা শাহাদাত লাভ করতে চায় না।"
📄 আকাবার প্রথম বাইয়াত
ইসলাম-পূর্ব জাহেলী যুগ।
মদীনার ছয় যুবক হজ্বে এসেছেন। তখন মদীনার নাম ছিল ইয়াসরিব।
সে যুগেও হজ্ব হতো, কিন্তু জাহেলী রীতি অনুসারে।
মক্কার আকাবা নামক স্থানে তাঁবু গাড়লেন মদীনার সেই যুবকরা।
এই ছয়জন যুবক একদিন গভীর আলোচনায় মশগুল, একজন অতিথি এলেন তাঁবুর দরজায়।
শ্রদ্ধা জাগানো সুন্দর সৌম্য-দর্শন এক অতিথি।
অতিথি সালাম দিলেন যুবকদের উদ্দেশ্যে। তারপর বললেন, 'আপনারা কি আমার কথা শুনবেন?'
মিষ্টি কণ্ঠস্বর অতিথির।
যুবকরা সমস্বরে বলে উঠলো, 'অবশ্যই অবশ্যই।'
অতিথি ব্যক্তিটি ছিলেন মহানবী (সা)।
তিনি তখন ছয় যুবককে মানুষের জন্যে রাব্বুল আলামিনের খোশখবর শোনালেন, তাওহীদের দাওয়াত গ্রহণের উৎসাহ দিলেন এবং বললেন, 'আমি আল্লাহর রাসূল। আল্লাহর বান্দাদের পথ প্রদর্শনে নিয়োজিত রয়েছি।'
ছয়জন যুবকই মহানবীর কথা গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। আল্লাহর রাসূলের কথা শেষ হতেই তাঁরা বললেন, 'আল্লাহর যে কালাম আপনার উপর অবতীর্ণ হয়েছে, তা থেকে আমাদের কিছু শোনান।'
মহানবীর পবিত্র কণ্ঠে সূরা ইবরাহিম পাঠ হতে লাগলো। কয়েকটি আয়াত পাঠ হতেই চমৎকৃত হয়ে গেলেন ছয় যুবক। তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগলেন, "আল্লাহর কসম, এতো সেই নবী যাঁর উল্লেখ সবসময় আমাদের শহরের ইহুদীদের মুখে শোনা যায়। ইসলাম গ্রহণে ইহুদীদের আগে তাদেরই অগ্রসর হওয়া উচিত।"
অতঃপর তারা উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে মহানবী (সা)-কে আরজ করলো, 'হে মুহাম্মাদ (সা), আমরা আপনার দাওয়াত মনে-প্রাণে গ্রহণ করছি এবং সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ এক আপনি তাঁর রাসূল।'
এই ঘোষণা দেয়ার পর ছয়জনের মধ্য থেকে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও সুদর্শন যুবক আবু উসামা আসয়াদ বিন যুরারাহ মহানবীর দিকে অগ্রসর হয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আপনার হাত সম্প্রসারিত করুন। আমি এই হাতে ইসলামের বাইয়াত করছি।'
মহানবী (সা) সানন্দে তাঁর হাত এগিয়ে দিলেন।
প্রথম বাইয়াত করলেন আসয়াদ বিন যুরারাহ। তারপর তাঁর সাথী পাঁচজন যুবক।
তাঁরা হলেন মদীনার প্রথম মুসলমান।
এইভাবেই এই উদ্যমী যুবকদের মাধ্যমে ইসলামের আলো প্রথম প্রবেশ করে ইয়াসরিব বা মদীনায়।
📄 উবাদার (রা) সত্যনিষ্ঠা
তখন উসমান (রা)-এর খিলাফত। মুয়াবিয়া (রা) তখন সমগ্র সিরিয়ার গভর্নর। উবাদাহ ইবনে সামিত তাঁর অধীনে একজন শাসক। উবাদাহ (রা) সেই লোক যিনি সত্য কথা, উচিত কথা যখন বলেন, তখন কোথায় কার কাছে বলছেন তার পরোয়া করেন না।
তাঁর বিরোধ বাধল মুয়াবিয়া (রা)-এর সাথে। মুয়াবিয়া (রা) খলিফা উসমান (রা) কে লিখলেন, "উবাদাহ বিন সামিতের কথা ও ভাষণ জনগণকে উত্তেজিত করে এবং বিশৃংখল করে তোলে। তাঁকে সিরিয়া থেকে প্রত্যাহার করে নিন। তা না হলে আমি সিরিয়ার শাসন কাজ পরিত্যাগ করব।"
উসমান (রা) উবাদাহ ইবনে সামিতকে মদীনায় ডেকে পাঠালেন। তিনি এলেন খলিফা উসমান (রা)-এর দরবারে। দরবারে তখন অনেক লোক। উবাদাহ (রা) এক কোনায় চুপ করে বসে পড়লেন। উবাদাহ (রা)-কে দেখতে পেয়েই উসমান (রা) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, "বলুন তো কি ঘটনা।"
স্পষ্টবাদী উবাদাহ (রা) উঠে দাঁড়ালেন। সত্য প্রকাশের অসীম আবেগে তিনি উদ্দীপ্ত। দরবারের সমাবেশকে লক্ষ্য করে তিনি বললেন, “হে মানুষেরা, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, আমার পর আমীরেরা সৎকে অসৎ এবং অসৎকে সৎ-এ পরিবর্তন করবে। অবৈধ কাজকে বৈধ মনে করতে থাকবে। কিন্তু গুনাহর কাজে কারও আনুগত্য জায়েয নয়। তোমরা অবশ্যই অসৎ কাজ থেকে দূরে থাকবে।'
আবু হুরাইরা (রা) উবাদাহ (রা)-এর বক্তব্যে কিছু বাধা দিতে চাইলেন। উবাদাহ ইবনে সামিত সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, "আমরা যে সময় রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাইয়াত (নবুয়তের ত্রয়োদশ বছরে বাইয়াতে আকাবায় এই বাইয়াত সংঘটিত হয়) করেছিলাম, তখন আপনি সেখানে ছিলেন না। আমাদের বাইয়াতের শর্ত ছিল যে, লোকদের কাছে ভাল কথা পৌঁছাতে থাকবো, খারাপ কথা থেকে বিরত রাখবো। কখনো কারো ভয়ে ভীত হবো না।... এই বাইয়াত মহানবীর সাথে হয়েছিল। ওয়াদা পূরণ আমাদের অবশ্যকর্তব্য কাজ।"
উবাদার (রা) এই কথার পর কারও কোন কথা আর থাকতে পারে না। আর কেউ কোন কথা বলতে সাহস করলো না।