📄 বিপদের বেষ্টনিতে বিশ্বাসের সঞ্জীবনী
খন্দক যুদ্ধের মুহূর্ত। মক্কার কুরাইশদের নেতৃত্বে দশ হাজার মুশরিক সৈন্য মদীনার প্রায় উপকণ্ঠে এসে পৌঁছেছে।
একদিকে বাইরে এই বিপদ, অন্যদিকে রয়েছে মদীনার ষড়যন্ত্রকারী ইহুদী এবং মুনাফিকদের ভেতর থেকে অভ্যুত্থানের আশংকা।
বাইরের আক্রমণকে বাধা দেয়ার জন্য পরিখা খনন করা হয়েছে।
ভেতরের ইহুদী মুনাফিকদের অভ্যুত্থান রোধের জন্যে মহানবী (সা) ছালমা ইবনে আছলাম ও যায়েদ ইবনে হারেসার নেতৃত্বে দুটি নগর রক্ষা বাহিনী গঠন করলেন। ছালমার বাহিনীতে দু'শ' আর যায়েদের বাহিনীতে থাকল তিনশ' লোক। ভেতরের যে কোন ষড়যন্ত্র প্রতিরোধের দায়িত্ব দেয়া হলো এই দু'টি দলের উপর।
দশ হাজার মুশরিক সৈন্য যখন মদীনার উপকণ্ঠে পৌঁছল, তাদের রণহুংকার, তাদের নানারকম আস্ফালন আর চিৎকারে ছোট শহর মদীনায় এক ভীতিকর পরিবেশের সৃষ্টি করলো।
মুসলিম সেনা দলে পনের বছরের বালকদের শামিল করার পরেও মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র তিন হাজার। নারী ও শিশুদের নগরীর এক প্রান্তে এক সুরক্ষিত বাড়ীতে আশ্রয় দেয়া হয়েছে।
মহানবী (সা) সর্বসাকুল্যে আড়াই হাজার সৈন্য নিয়োগ করতে পারলেন পরিখা রক্ষা ও পরিখা অতিক্রমে শত্রুদের বাধা দেয়ার জন্য।
মদীনার আকাশ বাতাস তখন কাঁপছে মহা বিপদের ঘনঘটায়।
মহানবী (সা) প্রতিরক্ষার আশু ব্যবস্থাগুলো সম্পন্ন করার পর অন্যদিকে মনোযোগ দিতে যাচ্ছেন, এমন সময় খবর এল, মদীনার ইহুদি গোত্র বনি কোরাইজাও বিদ্রোহ করেছে।
সমগ্র মদীনায় মুসলমানরা ছাড়া এই একমাত্র বনি কোরাইজা সন্ধিসূত্রে মুসলমানদের মিত্র ছিল। অন্য দুই ইহুদি গোত্র আগেই মুশরিক পক্ষে যোগ দিয়েছে। বনি কোরাইজা বিদ্রোহ করার পর মদীনায় মুসলমানদের মিত্র বলতে কেউ আর থাকলো না।
এই খবর মুসলমানদের জন্য খুবই বেদনাদায়ক হল। সর্বশেষ একটি বড় আঘাত হিসেবে খবরটি মুসলমানদের অন্তরকে যেন ক্ষত-বিক্ষত করে দিল।
যেন তারা ভেতর ও বাইরে থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ল।
সকলের মুখেই তখন মহাবিপদের এক কাল ছায়া। কিন্তু মহানবী (সা)-এর মুখে কোনই ভাবান্তর নেই। বার্তা-বাহকের মুখ থেকে খবর শোনার পরেই শান্ত, অথচ অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে তিনি ঘোষণা করলেন, ভয় কি, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। তিনি সর্বশক্তিমান, তিনি একাই সকলের পক্ষে যথেষ্ট। মহানবীর (সা) এই একটি বাক্য যেন সকলের দেহে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের কাজ করল।
সমবেত কণ্ঠে আল্লাহু আকবার ধ্বনি মুহূর্তের জড়তা-উদ্বেগ কোথায় যেন দূর করে দিল।
📄 নতুন ইকরামা
ইকরামা বিন আবু জাহল পালাচ্ছে।
মহানবীর মক্কা বিজয়ের পর স্বাভাবিকভাবেই সে মনে করল তার আর রক্ষা নেই। মহানবী (সা) ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে তার অপরাধ সীমাহীন।
মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে মহানবী (সা) মক্কাবাসীরা অস্ত্র হাতে না নিলে তাদের জন্যে শান্তি ও নিরাপত্তা ঘোষণা করেছিলেন। এ সময় ইকরামা মুসলিম বাহিনীকে আক্রমণ করে। দু'জন মুসলিম শহীদ হওয়া ছাড়াও আরও কয়েক ডজন লোক আহত হয় তার কারণে। এছাড়া বদর, উহুদ, খন্দক ও মুসলমানদের আশ্রিত বানু খোজায়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে সে চরম বৈরিতা ও নৃশংসতা প্রদর্শন করেছে। সুতরাং পালাচ্ছে সে।
জিদ্দার উপকূল থেকে নৌকা নিয়ে সে পালাচ্ছে আরব ভূমি থেকেই। কিন্তু পার হতে পারল না সে লোহিত সাগর। প্রবল বাতাস তার নৌকা আবার ফিরিয়ে আনল জিদ্দা উপকূলে। শত চেষ্টা করেও সে রোধ করতে পারল না নৌকার পেছন গতি।
কূলের কাছাকাছি এসে দেখল তীর থেকে তার স্ত্রী উম্মে হাকিম তাকে কাপড় উড়িয়ে ডাকছে।
ইকরামা তীরে নামলে তার স্ত্রী তাকে বলল, 'আমি সেই মহানুভবের কাছ থেকে এসেছি যিনি সকল মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম ও সবচেয়ে বেশী আত্মীয়তার বন্ধন মজবুতকারী। আমি তার নিকট থেকে তোমার নিরাপত্তা লাভ করেছি। তুমি রাসূলুল্লাহর কাছে চলো।'
ইকরামা তার স্ত্রীর সাথে হাজির হলো মহানবী (সা)-এর দরবারে। আমৃত্যু বৈরী সেই আবু জাহলের পুত্র ইকরামা। এই ইকরামাও বৈরিতার কোন কিছুই বাদ রাখেনি।
সেই ইকরামা সমীপবর্তী হলেন মহানবীর। বেশ দূরে থাকতেই ইকরামাকে চিনতে পারলেন মহানবী (সা)। উৎসাহ আগ্রহে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছেন তিনি।
দ্বিধা, সংকোচ, ভয় সব মিলিয়ে পদক্ষেপগুলো জড়িয়ে পড়ছে ইকরামার। এগুতে যেন কষ্ট হচ্ছে তার।
উঠে দাঁড়িয়ে মহানবী (সা) দু'হাত বাড়িয়ে ছুটলেন ইকরামার দিকে। দ্রুততার কারণে তাঁর গায়ের চাদর খসে পড়ে গেল গা থেকে।
মহানবী (সা) জড়িয়ে ধরলেন ইকরামাকে। বললেন, 'খোশ আমদেদ, বিদেশী সওয়ার।'
ইকরামা তার স্ত্রীর দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, 'সে জানতে পেরেছে, আপনি আমাকে নিরাপত্তা দিয়েছেন।'
'সে সত্য বলেছে।' বললেন মহানবী (সা)। আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল ইকরামার মুখ। লজ্জা-বেদনায় নুয়ে গেল ইকরামার মাথা। ভেজাকণ্ঠে বললেন, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ এক। তাঁর কোন অংশীদার নেই এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, অবশ্যই আপনি তাঁর বান্দাহ ও রাসূল। হে আল্লাহর রাসূল, এর আগে আমি ইসলাম-দুশমনির বহু প্রমাণ দিয়েছি। এখন আমার আশা, আজ পর্যন্ত আমি আপনার সাথে যে শত্রুতা করেছি, যত যুদ্ধে আপনার বিরুদ্ধে লড়েছি, হক পথে যত বাধা আরোপ করেছি, সেসব ক্ষমা করে দিন। আমার জন্য আল্লাহর কাছে মাগফিরাত কামনা করুন।"
আল্লাহর রাসূল দু'হাত তুললেন। ক্ষমা প্রার্থনা করলেন তিনি আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের কাছে ইকরামার জন্যে।
আনন্দাশ্রুতে ভরে গেল ইকরামার দু'চোখ।
আরজ করলেন তিনি মহানবীকে, 'হে আল্লাহর রাসূল, এমন কিছু আপনি আমাকে শিখিয়ে দিন যা আমি সবসময় আমল করতে পারি।'
রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, "খালিস অন্তরে (কথা ও কাজে) আল্লাহর ওয়াহদানিয়াত বা একত্ব এবং আমার রিসালাতের সাক্ষ্য দিতে ও আল্লাহর পথে জিহাদ করতে থাকো।"
ইকরামা আবেগ-কম্পিত কণ্ঠে বললেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ, আল্লাহর কসম, আমি আজ পর্যন্ত যত সম্পদ দাওয়াতে হকের বাধা দানে ব্যয় করেছি, তার চেয়ে দ্বিগুণ এখন আমি আল্লাহর পথে ব্যয় করবো। যত লড়াই আমি হকের বিরুদ্ধে লড়েছি, এখন আল্লাহর পথে তার দ্বিগুণ জিহাদ করবো।"
আল্লাহর রাসূল (সা) আবার দোয়া করলেন ইকরামার জন্যে।
ইকরামা যখন মহানবীর কাছ থেকে ফিরছিলেন, তখন তার দু'গণ্ড বেয়ে নামছিল অবিরাম অশ্রুধারা। কি এক স্বর্গীয় নূরের আলোতে তাঁর মুখমণ্ডল দীপ্ত হয়ে উঠেছে। ইকরামার হলো নতুন জন্ম- নতুন এক ইকরামা তিনি।
📄 ইকরামার ওয়াদা পালন
ইসলাম গ্রহণের সময় ইকরামা বিন আবু জাহল বলেছিলেন, ইসলামের বিরুদ্ধে তিনি যত যুদ্ধ করেছেন, যত অর্থ খরচ করেছেন, তার দ্বিগুণ তিনি খরচ করবেন ইসলামের জন্যে।
আমৃত্যু কথাটা মনে রেখেছেন ইকরামা বিন আবু জাহল।
হযরত আবু বকর (রা)-এর খিলাফতকালে ভণ্ড নবীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ব্যস্ত ছিলেন ইকরামা। এ জন্যে গঠিত ১১টি বাহিনীর একটির সেনাপতি ছিলেন তিনি। ইয়ামামা থেকে জর্ডান, জর্ডান থেকে ইয়েমেন- এই বিস্তৃত অঞ্চলে তিনি যুদ্ধে ব্যস্ত ছিলেন। তাঁর বাহিনীর গোটা খরচ তিনি নিজের অর্থ থেকে ব্যয় করেছেন, বায়তুল মাল থেকে তিনি এক পয়সাও নেননি।
ভণ্ড নবীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষে আমর ইবনুল আসের নেতৃত্বাধীন সিরিয়াগামী বাহিনীতে শামিল হলেন ইকরামা (রা) একজন সেনাধ্যক্ষ হিসেবে। সিরিয়াগামী বাহিনী সমবেত হয়েছে মদীনার উপকণ্ঠে।
এ বাহিনীর পরিদর্শনে বেরিয়েছেন আমীরুল মুমিনীন হযরত আবু বকর (রা)। এক তাঁবু তাঁর দৃষ্টিগোচর হলো যার চারদিকে ঘোড়া আর ঘোড়ার মিছিল। আর দেখলেন, বর্শা, তরবারী এবং অন্যান্য যুদ্ধ সরঞ্জামের বিশাল স্তূপ সেখানে। হযরত আবু বকর এলেন সে তাঁবুর কাছে। উঁকি দিলেন ভেতরে। দেখতে পেলেন ইকরামা (রা)-কে।
তিনি জানতে পারলেন, এসব ঘোড়া ও সরঞ্জাম ইকরামা নিজ অর্থে কিনেছেন যুদ্ধের জন্যে।
হযরত আবু বকর (রা) ইকরামাকে সালাম করলেন এবং বললেন, "ইকরামা তুমি এই যুদ্ধাস্ত্র ও সরঞ্জামাদি ক্রয়ের জন্যে বিপুল অর্থ খরচ করেছো। আমি চাই, এর একটা অংশ বায়তুল মাল থেকে তুমি নাও।"
ইকরামা (রা) আরজ করলেন, “হে খলিফাতুর রাসূল, আমার নিকট এখনও দু'হাজার দিনার নগদ রয়েছে। আমার সম্পদ আমি আল্লাহর রাস্তায় ওয়াকফ করে দিয়েছি। বায়তুল মালের উপর বোঝা আরোপ করা থেকে আমাকে মাফ করুন।"
হযরত আবু বকর (রা) আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন। দু'হাত তুলে তিনি দোয়া করলেন ইকরামার জন্যে।
📄 ‘আজ আল্লাহর জন্যে জীবন বিলিয়ে দেবোনা?’
আজনাদাইনের যুদ্ধ শেষ। দামেস্ক বিজয় সম্পূর্ণ হয়েছে। মুসলিম বাহিনী জর্দানের ফাহলে। ছোট মুসলিম বাহিনী ৮০ হাজার রোমক সৈন্যের মুখোমুখি।
সম্মুখ সমরে ভীত রোমক বাহিনী বীরত্বের বদলে বেছে নিল ষড়যন্ত্রের পথ। এক অন্ধকার রাত। রোমক বাহিনী এসে আপতিত হলো মুসলিম বাহিনীর উপর। ভীষণ যুদ্ধ শুরু হলো।
যুদ্ধ চলল সে রাত এবং পরের গোটা দিন। এক ইকরামা ইবনে আবু জাহেল যেন দশ ইকরামায় পরিণত হয়েছেন। যেদিকে তিনি ছুটছেন, লাশের সারি পড়ে যাচ্ছে। যুদ্ধের স্রোত তাকে মূল বাহিনী থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। সামনে তাঁর বিরাট এক শত্রু ব্যুহ।
ঢুকে পড়লেন তিনি সে শত্রু ব্যুহে। তাঁর লক্ষ্য শত্রু নিধন। নিজের প্রতি কোন খেয়াল তাঁর নেই। আঘাতে আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হতে লাগল তাঁর দেহ। সাথীরা চিৎকার করে বলল, “ইকরামা আল্লাহর ভয় করো। এভাবে নিজেকে ধ্বংসের মধ্যে নিপতিত করো না। আবেগকে বুদ্ধির উপর বিজয়ী হতে দিও না।”
ইকরামা তার তরবারী না থামিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলেন, “হে লোকেরা, আমি লাত-উজ্জার খাতিরে জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতাম। আজ আল্লাহ ও রাসূলের (সা) জন্যে জীবন বিলিয়ে দেব না? আল্লাহর কসম, তা কখনো হবে না।"
রোমক সৈন্যরা তখন পিছু হটতে শুরু করেছে। যুদ্ধে তাদের শোচনীয় পরাজয় ঘটল। মাত্র কতিপয় সৈন্য ছাড়া গোটা রোমক বাহিনী নিশ্চিহ্ন হয়েছিল ঐ যুদ্ধে। শহীদ হতে চাইলেও এ যুদ্ধেও ইকরামা গাজী হয়ে ফিরলেন。