📘 আমরা সেই জাতি > 📄 সোনার টুকরারা

📄 সোনার টুকরারা


ওহোদ যুদ্ধের প্রাক্কাল।
মহানবীর মদীনা ধ্বংসের জন্যে কালবৈশাখীর মত ধেয়ে আসা কুরাইশ বাহিনী মদীনার উপকণ্ঠে উপস্থিত।
মহানবীর নেতৃত্বে মুসলমানরা যুদ্ধযাত্রা করেছে।
ক্ষুদ্র মুসলিম বাহিনী। কুরাইশদের তিন হাজারের মুকাবিলায় মাত্র সাতশ' জন। ছোট কিশোরদের বাহিনীতে নেয়া হয়নি।
কিন্তু কয়েকজন নাছোড়বান্দা।
তবু তাদের অনুরোধ ফিরিয়ে দিলেন মহানবী (সা)।
তাদের একজন রাফে নিজেকে বড় করে তোলার জন্যে পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে ভর করে উঁচু হয়ে নিজের বড়ত্বকে প্রমাণ করতে চাইল।
সবাই বললো, রাফে একজন উৎকৃষ্ট তীরন্দাজ। সকলের অনুরোধে মহানবী (সা) তাকে বাহিনীতে শামিল করলেন।
এটা দেখে আরেক বালক সামরা ইবনে জোন্দা ছুটে এলো মহানবীর কাছে। অভিমানী কন্ঠে বললো, 'কুস্তিতে রাফেকে আমি হারিয়ে দিয়ে থাকি। সে যুদ্ধের অনুমতি পেলো, আর আমাকে ফিরে যেতে হচ্ছে!'
বালকের এই অভিমানে আনন্দ পেলেন মহানবী (সা)। হাসিমুখে আদর করে বললেন, লড়ো দেখি কুস্তি রাফের সাথে।
সত্যই মল্লযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো দুই বালকের মধ্যে।
জিতে গেলো অভিমানী সামরা।
মহানবী (সা) হেসে বললেন সামরাকে, বেশ তোমাকেও যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হলো।
এই সোনার টুকরোরাই, ঈমানের এই জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গরাই পরবর্তীকালে অর্ধেক পৃথিবীর উপর ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন করেছিল।

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 যে নিরাপত্তার চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়

📄 যে নিরাপত্তার চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়


বদর যুদ্ধের পরের ঘটনা।
মক্কায় কুরাইশরা বদর যুদ্ধে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে পাগল হয়েছে তখন। রাত-দিন তারা ব্যস্ত শলাপরামর্শ আর আয়োজনের তৎপরতায়। মহানবী (সা) কুরাইশদের যুদ্ধ প্রস্তুতির খোঁজ-খবর নেবার জন্যে একটা অনুসন্ধানী দল প্রেরণ করলেন।
দশজনের সে দলটির নেতৃত্ব দিলেন আসেম ইবনে সাবিত।
অনুসন্ধানী এ দলটি মক্কা ও উসফানের মধ্যবর্তী হাদয়াহ পর্যন্ত পৌঁছলে তা টের পেয়ে গেল হোযায়েল গোত্রের বনু লেহিয়ান শাখা।
খবর পাওয়ার সাথে সাথেই ওরা দু'শ' তীরন্দাজের একটা বাহিনী প্রেরণ করল নবী (সা) প্রেরিত অনুসন্ধানী দলকে ধরার জন্যে।
ক্ষুদ্র দলটি ওরা ঘিরে ফেলল।
আসেম ইবনে সাবিতের নেতৃত্বাধীন ১০ জনের ক্ষুদ্র বাহিনীটি ঘেরাও হয়ে পড়ার পর একটা পাহাড়-শীর্ষে উঠে দাঁড়াল।
শত্রুবাহিনী পাহাড়টির চারদিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে মুসলমানদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে বলল, তোমাদের একজনকেও হত্যা করব না।
দলনেতা আসেম ইবনে সাবিত পাহাড়-শীর্ষ থেকে বললেন, আল্লাহর শপথ, কাফেরের প্রদত্ত নিরাপত্তায় আমরা পাহাড় থেকে নামব না।
চারদিক থেকে বৃষ্টির মত তীর বর্ষণ শুরু হলো। একে একে ওরা ঢলে পড়তে লাগল মৃত্যুর কোলে। তীরে তীরে ক্ষত-বিক্ষত আসেম ইবনে সাবিতেরও সময় ঘনিয়ে এল। প্রার্থনার জন্যে হাত তুললেন তিনি। বললেন, “হে আল্লাহ, আমাদের অবস্থার খবর আপনার নবীকে জানিয়ে দিন।"

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 ওহোদ গিরিপথের দৃষ্টান্ত

📄 ওহোদ গিরিপথের দৃষ্টান্ত


ওহোদ যুদ্ধের এক মহা সন্ধিক্ষণ। মুসলিম বাহিনীর জয় বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। মুসলিম বাহিনীর পেছনে ওহোদ পাহাড়ের এক গলিপথে মহানবী (সা) ৫০ জনের একটি ক্ষুদ্র দলকে পাহারায় রেখেছিলেন। তাদের উপর নির্দেশ ছিল, তাদের শরীরের গোস্ত পাখিরা ঠুকরে যদিও খায় এবং রণাঙ্গনের মুসলিম সৈন্য সবাই যদি মরেও যায় তবু তারা যেন নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত গলিপথ ত্যাগ না করে। সুদক্ষ সেনাপতি মহানবী (সা) নিশ্চিতই বুঝেছিলেন যে, মুসলিম বাহিনীকে পেছন থেকে আক্রমণের জন্য মক্কার মুশরিক বাহিনী অবশ্যই কিছু লোক এ গলিপথের পেছনে রাখবে।
যুদ্ধ জয়ের আনন্দে পাহাড়ের এই গলিপথে মোতায়েন সৈন্যদের অধিকাংশ গলিপথ ত্যাগ করে শত্রুমুক্ত রণক্ষেত্রের দিকে ছুটতে শুরু করেছিল।
মোতায়েন এই ক্ষুদ্র দলের সেনাপতি আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের প্রাণপণ চেষ্টা করলেন মহানবীর (সা) আদেশ স্মরণ করিয়ে দিয়ে ওদের নিবৃত্ত করতে। 'আমাদের সম্পূর্ণ জয় হয়েছে, এখন এখানে আর বসে থাকব কেন'- এই যুক্তি তুলে তারা দলনেতা আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়েরের নিষেধ উপেক্ষা করল।
কিন্তু আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের কয়েকজন সাথী নিয়ে মহানবী (সা) নির্দেশিত স্থান থেকে এক ইঞ্চি পরিমাণও নড়লেন না।
পাহাড়ের সেই গলিপথে খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে পাহাড়ের পেছনে ওত পেতে থাকা মুশরিক সৈন্যের দু'শ' অশ্বারোহীর একটা বাহিনী এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের এবং তাঁর কয়েকজন সাথীর উপর। তাঁরা কয়েকজন প্রথমে তীর ছুড়ে, তারপর তলোয়ার দিয়ে শত্রুদের বাধা দেয়ার চেষ্টা করলো। তাদের আপ্রাণ চেষ্টা ব্যর্থ হলো। তারা আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে এক এক করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। অক্ষত থাকা অবস্থায় একজন শত্রু সৈন্যকেও তাদেরকে অতিক্রম করতে দেয়নি।

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 দেহ যাদের ঢাল হল

📄 দেহ যাদের ঢাল হল


ওহোদ যুদ্ধের মর্মন্তুদ ও মহোত্তম দৃশ্য। যুদ্ধে বিপর্যয় ঘটেছে। বিপর্যয়ের মধ্যে বিপর্যয়। খবর রটল যে, মহানবী (সা) নিহত হয়েছেন।
মুসলিম বাহিনীর পতাকাধারী মুছআব নিহত হওয়ার থেকেই এই খবর রটে। রাসূলুল্লাহর (সা) চেহারার সাথে তাঁর চেহারার বাহ্যিক কিছুটা সাদৃশ্য দর্শনে মক্কার মুশরিক ইবনে কামিয়া এই খবর রটিয়ে দেয়।
মুহূর্তেই খবরটি যুদ্ধক্ষেত্রে আগুনের মত ছড়িয়ে পড়ল। বিশাল যুদ্ধক্ষেত্রের এই খবরটি যাচাই করা অধিকাংশের পক্ষে সম্ভব ছিল না। ফলে এই খবর মক্কার মুশরিক সৈন্যদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা ও নতুন শক্তির সঞ্চার করলো। বিপর্যয়ের মধ্যে মুসলিম বাহিনীকে ধ্বংসের জন্যে তারা বন্যার তীব্র স্রোতের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল। অন্যদিকে বিপর্যয় ও মহা দুঃসংবাদ একসাথে হয়ে অনেক মুসলিম সৈন্যের সব শক্তি ও সাহস কেড়ে নিল। তারা হতাশ হয়ে পড়ল যে, মহানবী (সা) না থাকলে কি হবে এই যুদ্ধ দিয়ে।
যুদ্ধের এক পর্যায়ে মক্কার মুশরিক সৈন্যরা যখন জানতে পারল যে, মহানবী (সা) জীবিত আছেন, তখন তাদের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ালেন মহানবী (সা)।
মুসলিম বাহিনীর বিশৃঙ্খল ও বিপর্যয়কর অবস্থায় পরিস্থিতিটা অত্যন্ত ভয়াবহ হয়ে দাঁড়াল।
যুদ্ধক্ষেত্রের একটি স্থানে সাহাবীদের একটি ক্ষুদ্র দল তাদের দেহ দিয়ে মহানবীকে আড়াল করে চারদিক থেকে বন্যাবেগের মত ছুটে আসা মুশরিক সৈন্যদের সাথে যুদ্ধ করছিল। আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে এক এক করে তারা ঢলে পড়ল। অবশিষ্ট থাকলো মাত্র তালহা এবং সা'আদ।
দু'জনেই মদীনার অব্যর্থ-লক্ষ্য তীরন্দাজ। তাঁরা ঘুরে ঘুরে তাঁদের দেহ দিয়ে মহানবীর দেহকে আড়াল করে অবিরাম তীর ছুড়ে কাফেরদের হত্যা করছিল ও তাদের ঠেকিয়ে রাখছিল। সা'আদ একাই সেদিন দু'খানা ধনুক ভেঙ্গেছিলেন এবং সহস্রাধিক তীর ছুড়েছিলেন। এক কঠিন মুহূর্তে তালহা তীর ধনুক বাদ দিয়ে নিজের ঢাল ও নিজের দেহ দিয়ে মহানবীকে আচ্ছাদন করতে লাগলেন। আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে পড়ল তাঁর দেহ। এ সময় দূর থেকে আবু দোজানা ছুটে এলেন এ দৃশ্য দেখে। যোগ দিলেন তিনি তালহা ও সা'আদের সাথে। দেখলেন আবু দোজানা শত্রুর একটা বর্শা ছুটে আসছে মহানবীকে লক্ষ্য করে। আবু দোজানা বুক দিয়ে মহানবীকে আচ্ছাদন করে পৃষ্ঠদেশ এগিয়ে দিলেন বর্শার দিকে। বর্শা তার পৃষ্ঠদেশ বিদ্ধ করল।
উম্মে আমারা আহত মুসলিম সৈন্যদের পানি পান করাচ্ছিলেন। তিনি শুনতে পেলেন মহানবী (সা)-এর আক্রান্ত হওয়ার কথা। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি পানির মশক ফেলে দিয়ে ছুটলেন মহানবীর কাছে। যোগ দিলেন মহানবীর কয়েকজন সাথীর দলে। প্রথমে অবিরাম তীর বর্ষণ। তীরে যখন কুলালো না, তখন তিনি তলোয়ার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন শত্রুর উপর। আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হচ্ছে তাঁর দেহ, কিন্তু সেদিকে বিন্দুমাত্রও ভ্রূক্ষেপ নেই তাঁর। এ সময়ের অবস্থা সম্পর্কে স্বয়ং মহানবী (সা) বলেছেন, "সেই বিপদের সময় দক্ষিণে, বামে যেদিকে তাকাই সেদিকেই দেখি উম্মে আমারা আমাকে রক্ষার জন্যে যুদ্ধ করছে।"
সোনার মানুষেরা যখন তাঁকে ঘিরে এভাবে লড়াই করছেন, তখন এই সোনার মানুষগুলো যাঁর হাতে গড়া সেই মহানবী (সা) অচঞ্চল পর্বতের মত দণ্ডায়মান। ভয় নেই, ভীতি নেই, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নেই, শোচনীয় অবস্থা দর্শনে অবসাদ নেই, বিষণ্ণতা নেই। পর্বতের মত দাঁড়িয়ে ক্ষুদ্র বাহিনীকে তিনি নির্দেশ দিচ্ছেন, পরিচালনা করছেন।
এক শত্রুর আঘাতে তার লৌহ শিরস্ত্রাণের দুই কড়া যখন তার মাথায় ঢুকে গেল, রক্তের দরবিগলিত ধারায় তাঁর মুখমণ্ডল ও দেহ যখন রঞ্জিত হচ্ছিল তখন তিনি প্রার্থনা করলেন, “হে আমার প্রভু, আমার জাতিকে তুমি ক্ষমা কর। কারণ তারা অজ্ঞ।"
সেদিন মুসলিম বাহিনীর বিপর্যয় পরাজয় পর্যন্ত পৌঁছেনি অকুতোভয় ঐ সব সোনার মানুষদের কারণেই। মুসলিম বাহিনী হামজা, মুছআব প্রমুখের মত ৭০ জনের জীবন বিসর্জনের বিনিময়ে বিপর্যয় রোধ করেছিল। ৩ হাজার সৈন্যের বিশাল মুশরিক বাহিনীকে খালি হাতে ফিরতে হয়েছিল মক্কায়。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00