📘 আমরা সেই জাতি > 📄 জান্নাতের সুগন্ধ

📄 জান্নাতের সুগন্ধ


আনাস ইবনে নযর বদর যুদ্ধে যোগ দিতে পারেননি। মুসলমানদের প্রথম অগ্নি-পরীক্ষায় শরীক হতে না পারায় ভীষণ দুঃখ তাঁর। দুঃখ-ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি একদিন মহানবী (সা)-কে বললেন, আল্লাহ যদি মুশরিকদের বিরুদ্ধে কোন সুযোগ আমাকে দেন, তাহলে দেখবেন কিভাবে যুদ্ধ করি। সুযোগ এলো আনাস ইবনে নযরের জীবনে। ওহোদ যুদ্ধের দিন।
প্রচণ্ড যুদ্ধ।
এক মহাসন্ধিক্ষণে মুসলমানরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল।
তলোয়ার হাতে আনাস ইবনে নযর শক্ত হয়ে দাঁড়ালেন। চিৎকার করে বললেন মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যে, এদের (সাহাবাদের) কৃতকর্মের জন্যে আমি আপনার কাছে অক্ষমতা প্রকাশ করছি, আর ওদের (কাফেরদের) কাজের সাথে আমার সম্পর্কহীনতা ঘোষণা করছি।
তারপর ছুটলেন আনাস ইবনে নযর যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে। পথে দেখা হলো সা'আদ ইবনে মু'য়াযের সাথে। বললেন আনাস সা'আদকে, 'এ মুহূর্তে জান্নাতই আমার একমাত্র কাম্য, ওহোদের প্রান্তভাগ থেকে আমি জান্নাতের সুগন্ধ পাচ্ছি।'
যুদ্ধের পরে আনাস ইবনে নযরকে শহীদ অবস্থায় পাওয়া গেল যুদ্ধক্ষেত্রে। তাঁর দেহে তলোয়ার, বর্শা ও তীরের আশিটিরও অধিক জখম। মুশরিকরা নাক, কান কেটে ও চোখ উপড়িয়ে তাঁর লাশকে এতোটাই বিকৃত করেছিল যে বোন ছাড়া আর কেউ তাকে চিনতে পারেনি।
ধারণা করা হয়, কুরআন শরীফের এই আয়াত "মুমিনদের মধ্য থেকে কিছু সংখ্যক আল্লাহর কাছে কৃত তাদের ওয়াদা বাস্তবে রূপ দিয়ে দেখিয়েছেন”- আনাসের শাহাদাত উপলক্ষেই নাযিল হয়।

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 সোনার টুকরারা

📄 সোনার টুকরারা


ওহোদ যুদ্ধের প্রাক্কাল।
মহানবীর মদীনা ধ্বংসের জন্যে কালবৈশাখীর মত ধেয়ে আসা কুরাইশ বাহিনী মদীনার উপকণ্ঠে উপস্থিত।
মহানবীর নেতৃত্বে মুসলমানরা যুদ্ধযাত্রা করেছে।
ক্ষুদ্র মুসলিম বাহিনী। কুরাইশদের তিন হাজারের মুকাবিলায় মাত্র সাতশ' জন। ছোট কিশোরদের বাহিনীতে নেয়া হয়নি।
কিন্তু কয়েকজন নাছোড়বান্দা।
তবু তাদের অনুরোধ ফিরিয়ে দিলেন মহানবী (সা)।
তাদের একজন রাফে নিজেকে বড় করে তোলার জন্যে পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে ভর করে উঁচু হয়ে নিজের বড়ত্বকে প্রমাণ করতে চাইল।
সবাই বললো, রাফে একজন উৎকৃষ্ট তীরন্দাজ। সকলের অনুরোধে মহানবী (সা) তাকে বাহিনীতে শামিল করলেন।
এটা দেখে আরেক বালক সামরা ইবনে জোন্দা ছুটে এলো মহানবীর কাছে। অভিমানী কন্ঠে বললো, 'কুস্তিতে রাফেকে আমি হারিয়ে দিয়ে থাকি। সে যুদ্ধের অনুমতি পেলো, আর আমাকে ফিরে যেতে হচ্ছে!'
বালকের এই অভিমানে আনন্দ পেলেন মহানবী (সা)। হাসিমুখে আদর করে বললেন, লড়ো দেখি কুস্তি রাফের সাথে।
সত্যই মল্লযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো দুই বালকের মধ্যে।
জিতে গেলো অভিমানী সামরা।
মহানবী (সা) হেসে বললেন সামরাকে, বেশ তোমাকেও যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হলো।
এই সোনার টুকরোরাই, ঈমানের এই জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গরাই পরবর্তীকালে অর্ধেক পৃথিবীর উপর ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন করেছিল।

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 যে নিরাপত্তার চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়

📄 যে নিরাপত্তার চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়


বদর যুদ্ধের পরের ঘটনা।
মক্কায় কুরাইশরা বদর যুদ্ধে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে পাগল হয়েছে তখন। রাত-দিন তারা ব্যস্ত শলাপরামর্শ আর আয়োজনের তৎপরতায়। মহানবী (সা) কুরাইশদের যুদ্ধ প্রস্তুতির খোঁজ-খবর নেবার জন্যে একটা অনুসন্ধানী দল প্রেরণ করলেন।
দশজনের সে দলটির নেতৃত্ব দিলেন আসেম ইবনে সাবিত।
অনুসন্ধানী এ দলটি মক্কা ও উসফানের মধ্যবর্তী হাদয়াহ পর্যন্ত পৌঁছলে তা টের পেয়ে গেল হোযায়েল গোত্রের বনু লেহিয়ান শাখা।
খবর পাওয়ার সাথে সাথেই ওরা দু'শ' তীরন্দাজের একটা বাহিনী প্রেরণ করল নবী (সা) প্রেরিত অনুসন্ধানী দলকে ধরার জন্যে।
ক্ষুদ্র দলটি ওরা ঘিরে ফেলল।
আসেম ইবনে সাবিতের নেতৃত্বাধীন ১০ জনের ক্ষুদ্র বাহিনীটি ঘেরাও হয়ে পড়ার পর একটা পাহাড়-শীর্ষে উঠে দাঁড়াল।
শত্রুবাহিনী পাহাড়টির চারদিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে মুসলমানদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে বলল, তোমাদের একজনকেও হত্যা করব না।
দলনেতা আসেম ইবনে সাবিত পাহাড়-শীর্ষ থেকে বললেন, আল্লাহর শপথ, কাফেরের প্রদত্ত নিরাপত্তায় আমরা পাহাড় থেকে নামব না।
চারদিক থেকে বৃষ্টির মত তীর বর্ষণ শুরু হলো। একে একে ওরা ঢলে পড়তে লাগল মৃত্যুর কোলে। তীরে তীরে ক্ষত-বিক্ষত আসেম ইবনে সাবিতেরও সময় ঘনিয়ে এল। প্রার্থনার জন্যে হাত তুললেন তিনি। বললেন, “হে আল্লাহ, আমাদের অবস্থার খবর আপনার নবীকে জানিয়ে দিন।"

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 ওহোদ গিরিপথের দৃষ্টান্ত

📄 ওহোদ গিরিপথের দৃষ্টান্ত


ওহোদ যুদ্ধের এক মহা সন্ধিক্ষণ। মুসলিম বাহিনীর জয় বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। মুসলিম বাহিনীর পেছনে ওহোদ পাহাড়ের এক গলিপথে মহানবী (সা) ৫০ জনের একটি ক্ষুদ্র দলকে পাহারায় রেখেছিলেন। তাদের উপর নির্দেশ ছিল, তাদের শরীরের গোস্ত পাখিরা ঠুকরে যদিও খায় এবং রণাঙ্গনের মুসলিম সৈন্য সবাই যদি মরেও যায় তবু তারা যেন নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত গলিপথ ত্যাগ না করে। সুদক্ষ সেনাপতি মহানবী (সা) নিশ্চিতই বুঝেছিলেন যে, মুসলিম বাহিনীকে পেছন থেকে আক্রমণের জন্য মক্কার মুশরিক বাহিনী অবশ্যই কিছু লোক এ গলিপথের পেছনে রাখবে।
যুদ্ধ জয়ের আনন্দে পাহাড়ের এই গলিপথে মোতায়েন সৈন্যদের অধিকাংশ গলিপথ ত্যাগ করে শত্রুমুক্ত রণক্ষেত্রের দিকে ছুটতে শুরু করেছিল।
মোতায়েন এই ক্ষুদ্র দলের সেনাপতি আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের প্রাণপণ চেষ্টা করলেন মহানবীর (সা) আদেশ স্মরণ করিয়ে দিয়ে ওদের নিবৃত্ত করতে। 'আমাদের সম্পূর্ণ জয় হয়েছে, এখন এখানে আর বসে থাকব কেন'- এই যুক্তি তুলে তারা দলনেতা আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়েরের নিষেধ উপেক্ষা করল।
কিন্তু আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের কয়েকজন সাথী নিয়ে মহানবী (সা) নির্দেশিত স্থান থেকে এক ইঞ্চি পরিমাণও নড়লেন না।
পাহাড়ের সেই গলিপথে খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে পাহাড়ের পেছনে ওত পেতে থাকা মুশরিক সৈন্যের দু'শ' অশ্বারোহীর একটা বাহিনী এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের এবং তাঁর কয়েকজন সাথীর উপর। তাঁরা কয়েকজন প্রথমে তীর ছুড়ে, তারপর তলোয়ার দিয়ে শত্রুদের বাধা দেয়ার চেষ্টা করলো। তাদের আপ্রাণ চেষ্টা ব্যর্থ হলো। তারা আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে এক এক করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। অক্ষত থাকা অবস্থায় একজন শত্রু সৈন্যকেও তাদেরকে অতিক্রম করতে দেয়নি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00