📄 ইবনে জাহাশের কাফেলা
মহানবীর (সা) শিশু রাষ্ট্র মদীনা তখন উত্তাল সাগর ঘেরা এক দ্বীপের মত। মক্কা থেকে হিজরত করার পর তখন এক বছর গত হয়েছে। ক'দিন আগে মক্কা থেকে প্রেরিত কাফের কুরাইশদের একটা বাহিনী কুর্জ ইবনে জাবেরের নেতৃত্বে গোপনে এসে অতর্কিতে মদীনার এক প্রান্তরে চড়াও হয়ে মুসলমানদের একটা পশুপাল ধরে নিয়ে গেল।
এমন ধরনের আরও আক্রমণের আশংকা মদীনার মুসলিমদের চিন্তিত করে তুলল। খবর এল, বড় একটা আয়োজন করেছে মক্কার কাফেররা। মদীনায় তারা বড় কিছু ঘটাতে চায়।
একটা কাফেলা সাজালেন মহানবী (সা)। কাফেলার যাত্রী ৮ জন মুসলমান চারটি উটে। কাফেলার অধিনায়ক আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ।
কাফেলা কোথায় যাবে, কি করবে কেউ জানে না। কাফেলার অধিনায়ক আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশও নয়।
যাত্রার মুহূর্তে মহানবী (সা) একটি চিঠি আবদুল্লাহর হাতে তুলে দিয়ে বললেন, মক্কার পথে দু'দিন এগুবার পর এই চিঠি খুলবে। চিঠির নির্দেশ অনুসারে কাজ করবে। তবে কাউকে তা করতে বাধ্য করবে না।
দু'দিন চলার পর চিঠি খুলল আবদুল্লাহ। দেখল চিঠিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী নাখলা নামক স্থানে অবস্থান করে গোপনে মক্কার কাফেরদের গতিবিধির উপর নিয়মিত খবর পাঠাতে হবে মদীনায়।
অত্যন্ত বিপজ্জনক কাজ। বন্দী ও মৃত্যু অবধারিত, এমন এক বিপজ্জনক শত্রু-পুরীতে বসে তাদের কাজ করতে হবে।
বিষয়টি কাফেলার সবাইকে জানিয়ে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ ঘোষণা করলেন, ভাইসব, কোন জোর নেই, কোন জবরদস্তি নেই। যার ইচ্ছা হয় দেশে ফিরে যান। আর ইসলামের জন্য, আল্লাহর জন্য শহীদের গৌরবজনক মৃত্যু যাদের অভিপ্রেত, তারা আমার সাথে আসুন।
বলে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ কারো দিকে না তাকিয়ে নবীর (সা) আদেশ পালনের জন্য নাখলার দিকে পা বাড়ালেন।
দেখা গেল, আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশের পেছনে সমান তালে পা ফেলে এগিয়ে চলল অবশিষ্ট সাতজন।
কারো দৃষ্টিই ফেলে আসা পেছনের দিকে নয়। শহীদি মৃত্যুর হাতছানিতে তারা যেন ভুলে গেছে পেছনের সব।
📄 জান্নাতের সুগন্ধ
আনাস ইবনে নযর বদর যুদ্ধে যোগ দিতে পারেননি। মুসলমানদের প্রথম অগ্নি-পরীক্ষায় শরীক হতে না পারায় ভীষণ দুঃখ তাঁর। দুঃখ-ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি একদিন মহানবী (সা)-কে বললেন, আল্লাহ যদি মুশরিকদের বিরুদ্ধে কোন সুযোগ আমাকে দেন, তাহলে দেখবেন কিভাবে যুদ্ধ করি। সুযোগ এলো আনাস ইবনে নযরের জীবনে। ওহোদ যুদ্ধের দিন।
প্রচণ্ড যুদ্ধ।
এক মহাসন্ধিক্ষণে মুসলমানরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল।
তলোয়ার হাতে আনাস ইবনে নযর শক্ত হয়ে দাঁড়ালেন। চিৎকার করে বললেন মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যে, এদের (সাহাবাদের) কৃতকর্মের জন্যে আমি আপনার কাছে অক্ষমতা প্রকাশ করছি, আর ওদের (কাফেরদের) কাজের সাথে আমার সম্পর্কহীনতা ঘোষণা করছি।
তারপর ছুটলেন আনাস ইবনে নযর যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে। পথে দেখা হলো সা'আদ ইবনে মু'য়াযের সাথে। বললেন আনাস সা'আদকে, 'এ মুহূর্তে জান্নাতই আমার একমাত্র কাম্য, ওহোদের প্রান্তভাগ থেকে আমি জান্নাতের সুগন্ধ পাচ্ছি।'
যুদ্ধের পরে আনাস ইবনে নযরকে শহীদ অবস্থায় পাওয়া গেল যুদ্ধক্ষেত্রে। তাঁর দেহে তলোয়ার, বর্শা ও তীরের আশিটিরও অধিক জখম। মুশরিকরা নাক, কান কেটে ও চোখ উপড়িয়ে তাঁর লাশকে এতোটাই বিকৃত করেছিল যে বোন ছাড়া আর কেউ তাকে চিনতে পারেনি।
ধারণা করা হয়, কুরআন শরীফের এই আয়াত "মুমিনদের মধ্য থেকে কিছু সংখ্যক আল্লাহর কাছে কৃত তাদের ওয়াদা বাস্তবে রূপ দিয়ে দেখিয়েছেন”- আনাসের শাহাদাত উপলক্ষেই নাযিল হয়।
📄 সোনার টুকরারা
ওহোদ যুদ্ধের প্রাক্কাল।
মহানবীর মদীনা ধ্বংসের জন্যে কালবৈশাখীর মত ধেয়ে আসা কুরাইশ বাহিনী মদীনার উপকণ্ঠে উপস্থিত।
মহানবীর নেতৃত্বে মুসলমানরা যুদ্ধযাত্রা করেছে।
ক্ষুদ্র মুসলিম বাহিনী। কুরাইশদের তিন হাজারের মুকাবিলায় মাত্র সাতশ' জন। ছোট কিশোরদের বাহিনীতে নেয়া হয়নি।
কিন্তু কয়েকজন নাছোড়বান্দা।
তবু তাদের অনুরোধ ফিরিয়ে দিলেন মহানবী (সা)।
তাদের একজন রাফে নিজেকে বড় করে তোলার জন্যে পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে ভর করে উঁচু হয়ে নিজের বড়ত্বকে প্রমাণ করতে চাইল।
সবাই বললো, রাফে একজন উৎকৃষ্ট তীরন্দাজ। সকলের অনুরোধে মহানবী (সা) তাকে বাহিনীতে শামিল করলেন।
এটা দেখে আরেক বালক সামরা ইবনে জোন্দা ছুটে এলো মহানবীর কাছে। অভিমানী কন্ঠে বললো, 'কুস্তিতে রাফেকে আমি হারিয়ে দিয়ে থাকি। সে যুদ্ধের অনুমতি পেলো, আর আমাকে ফিরে যেতে হচ্ছে!'
বালকের এই অভিমানে আনন্দ পেলেন মহানবী (সা)। হাসিমুখে আদর করে বললেন, লড়ো দেখি কুস্তি রাফের সাথে।
সত্যই মল্লযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো দুই বালকের মধ্যে।
জিতে গেলো অভিমানী সামরা।
মহানবী (সা) হেসে বললেন সামরাকে, বেশ তোমাকেও যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হলো।
এই সোনার টুকরোরাই, ঈমানের এই জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গরাই পরবর্তীকালে অর্ধেক পৃথিবীর উপর ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন করেছিল।
📄 যে নিরাপত্তার চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়
বদর যুদ্ধের পরের ঘটনা।
মক্কায় কুরাইশরা বদর যুদ্ধে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে পাগল হয়েছে তখন। রাত-দিন তারা ব্যস্ত শলাপরামর্শ আর আয়োজনের তৎপরতায়। মহানবী (সা) কুরাইশদের যুদ্ধ প্রস্তুতির খোঁজ-খবর নেবার জন্যে একটা অনুসন্ধানী দল প্রেরণ করলেন।
দশজনের সে দলটির নেতৃত্ব দিলেন আসেম ইবনে সাবিত।
অনুসন্ধানী এ দলটি মক্কা ও উসফানের মধ্যবর্তী হাদয়াহ পর্যন্ত পৌঁছলে তা টের পেয়ে গেল হোযায়েল গোত্রের বনু লেহিয়ান শাখা।
খবর পাওয়ার সাথে সাথেই ওরা দু'শ' তীরন্দাজের একটা বাহিনী প্রেরণ করল নবী (সা) প্রেরিত অনুসন্ধানী দলকে ধরার জন্যে।
ক্ষুদ্র দলটি ওরা ঘিরে ফেলল।
আসেম ইবনে সাবিতের নেতৃত্বাধীন ১০ জনের ক্ষুদ্র বাহিনীটি ঘেরাও হয়ে পড়ার পর একটা পাহাড়-শীর্ষে উঠে দাঁড়াল।
শত্রুবাহিনী পাহাড়টির চারদিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে মুসলমানদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে বলল, তোমাদের একজনকেও হত্যা করব না।
দলনেতা আসেম ইবনে সাবিত পাহাড়-শীর্ষ থেকে বললেন, আল্লাহর শপথ, কাফেরের প্রদত্ত নিরাপত্তায় আমরা পাহাড় থেকে নামব না।
চারদিক থেকে বৃষ্টির মত তীর বর্ষণ শুরু হলো। একে একে ওরা ঢলে পড়তে লাগল মৃত্যুর কোলে। তীরে তীরে ক্ষত-বিক্ষত আসেম ইবনে সাবিতেরও সময় ঘনিয়ে এল। প্রার্থনার জন্যে হাত তুললেন তিনি। বললেন, “হে আল্লাহ, আমাদের অবস্থার খবর আপনার নবীকে জানিয়ে দিন।"