📄 উবাদা ইবনে সামিতের শপথ রক্ষা
খলীফা উমার (রা) এর শাসনকাল। মুয়াবিয়া তখন সিরিয়ার শাসনকর্তা। মদীনার খাযরাজ গোত্রের হযরত উবাদা ইবন সামিত গেলেন সিরিয়ায়। বাইয়াতে রিদওয়ানে শরীক আনসার উবাদা ইবন সামিত সত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে দুনিয়ার কোন মানুষকেই ভয় করেন না। সিরিয়ায় ব্যবসা ও শাসনকার্যে কতকগুলো অনিয়ম দেখে তিনি ক্রোধে জ্বলে উঠলেন।
দামেশকের মসজিদ। সিরিয়ার গবর্ণর মুয়াবিয়াও উপস্থিত মসজিদে। নামাযের জামাত শেষে হযরত উবাদা ইবন সামিত উঠে দাঁড়িয়ে মহানবীর (সা) একটি হাদীস উদ্ধৃত করে তীব্র ভাষায় অভিযুক্ত করলেন হযরত মুয়াবিয়াকে। চারদিকে হৈচৈ পড়ে গেল। মুয়াবিয়ার পক্ষে তাঁর মুখ বন্ধ করা সম্ভব হলো না। একা উবাদা ইবনে সামিত গোটা সিরিয়াকে যেন নাড়া দিলেন। ইতোমধ্যে হযরত উমার (রা) ইন্তিকাল করেছেন। অবশেষে উপায়ান্তর না দেখে হযরত মুয়াবিয়া তৃতীয় খলীফা হযরত উসমানকে (রা) লিখলেন, "হয় আপনি উবাদাকে মদীনায় ডেকে নিন, নতুবা আমিই সিরিয়া ত্যাগ করব। গোটা সিরিয়াকে উবাদা বিদ্রোহী করে তুলেছে।"
উবাদাকে মদীনায় ফিরিয়ে আনা হলো। মদীনায় এসে হযরত উবাদা সোজা গিয়ে হযরত উসমানের (রা) বাড়ীতে উঠলেন। হযরত উসমান (রা) ঘরে বসে, ঘরের বাইরে প্রচুর লোক। তিনি ঘরে ঢুকে ঘরের এক কোণে বসে পড়লেন। হযরত উসমান (রা) জিজ্ঞাসা করলেন, "কি খবর।" হযরত উসমানের (রা) কথার উত্তরে উবাদা উঠে দাঁড়ালেন। স্পষ্টবাদী, নির্ভীক উবাদা বললেন, "স্বয়ং মহানবীর উক্তি পরবর্তী কালের শাসকরা অসত্যকে সত্যে এবং সত্যকে অসত্যে পরিণত করবে। কিন্তু পাপের অনুকরণ বৈধ নয়, তোমরা কখনও অন্যায় করো না।"
হযরত আবু হুরাইরা (রা) কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। হযরত উবাদা তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, "যখন আমরা মহানবীর (সা) হাতে বাইয়াত করি, তখন তোমরা ছিলে না, কাজেই তোমরা অনর্থক কথার মাঝখানে বাধা দাও কেন? আমরা সেদিন মহানবীর (সা) কাছে শপথ করেছিঃ সুস্থতা ও অসুস্থতা সব অবস্থায়ই আপনাকে মেনে চলব, প্রাচুর্য ও অর্থ সংকট সব অবস্থায়ই আপনাকে অর্থ সাহায্য করব, ভাল কথা অন্যের কাছে পৌঁছাব, অন্যায় থেকে সবাইকে বারণ করব। সত্য কথা বলতে কাকেও ভয় করবো না।"
হযরত উবাদা এসব শপথের প্রতিটি অক্ষর পালন করে গেছেন জীবনের শেষ পর্যন্ত। তাঁর জীবনের অন্তিম মুহূর্ত। তাঁকে কিছু অসিয়ত করতে বলা হলে তিনি বললেন, "যত হাদীস প্রয়োজনীয় ছিল, তোমাদেরকে পৌঁছে দিয়েছি, আর একটি হাদীস ছিল, বলছি শুন।" হাদীস বর্ণনা শেষ হবার সাথে সাথেই হযরত উবাদা ইবন সামিত ইন্তিকাল করলেন।
📄 ইবনে জাহাশের কাফেলা
মহানবীর (সা) শিশু রাষ্ট্র মদীনা তখন উত্তাল সাগর ঘেরা এক দ্বীপের মত। মক্কা থেকে হিজরত করার পর তখন এক বছর গত হয়েছে। ক'দিন আগে মক্কা থেকে প্রেরিত কাফের কুরাইশদের একটা বাহিনী কুর্জ ইবনে জাবেরের নেতৃত্বে গোপনে এসে অতর্কিতে মদীনার এক প্রান্তরে চড়াও হয়ে মুসলমানদের একটা পশুপাল ধরে নিয়ে গেল।
এমন ধরনের আরও আক্রমণের আশংকা মদীনার মুসলিমদের চিন্তিত করে তুলল। খবর এল, বড় একটা আয়োজন করেছে মক্কার কাফেররা। মদীনায় তারা বড় কিছু ঘটাতে চায়।
একটা কাফেলা সাজালেন মহানবী (সা)। কাফেলার যাত্রী ৮ জন মুসলমান চারটি উটে। কাফেলার অধিনায়ক আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ।
কাফেলা কোথায় যাবে, কি করবে কেউ জানে না। কাফেলার অধিনায়ক আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশও নয়।
যাত্রার মুহূর্তে মহানবী (সা) একটি চিঠি আবদুল্লাহর হাতে তুলে দিয়ে বললেন, মক্কার পথে দু'দিন এগুবার পর এই চিঠি খুলবে। চিঠির নির্দেশ অনুসারে কাজ করবে। তবে কাউকে তা করতে বাধ্য করবে না।
দু'দিন চলার পর চিঠি খুলল আবদুল্লাহ। দেখল চিঠিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী নাখলা নামক স্থানে অবস্থান করে গোপনে মক্কার কাফেরদের গতিবিধির উপর নিয়মিত খবর পাঠাতে হবে মদীনায়।
অত্যন্ত বিপজ্জনক কাজ। বন্দী ও মৃত্যু অবধারিত, এমন এক বিপজ্জনক শত্রু-পুরীতে বসে তাদের কাজ করতে হবে।
বিষয়টি কাফেলার সবাইকে জানিয়ে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ ঘোষণা করলেন, ভাইসব, কোন জোর নেই, কোন জবরদস্তি নেই। যার ইচ্ছা হয় দেশে ফিরে যান। আর ইসলামের জন্য, আল্লাহর জন্য শহীদের গৌরবজনক মৃত্যু যাদের অভিপ্রেত, তারা আমার সাথে আসুন।
বলে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ কারো দিকে না তাকিয়ে নবীর (সা) আদেশ পালনের জন্য নাখলার দিকে পা বাড়ালেন।
দেখা গেল, আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশের পেছনে সমান তালে পা ফেলে এগিয়ে চলল অবশিষ্ট সাতজন।
কারো দৃষ্টিই ফেলে আসা পেছনের দিকে নয়। শহীদি মৃত্যুর হাতছানিতে তারা যেন ভুলে গেছে পেছনের সব।
📄 জান্নাতের সুগন্ধ
আনাস ইবনে নযর বদর যুদ্ধে যোগ দিতে পারেননি। মুসলমানদের প্রথম অগ্নি-পরীক্ষায় শরীক হতে না পারায় ভীষণ দুঃখ তাঁর। দুঃখ-ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি একদিন মহানবী (সা)-কে বললেন, আল্লাহ যদি মুশরিকদের বিরুদ্ধে কোন সুযোগ আমাকে দেন, তাহলে দেখবেন কিভাবে যুদ্ধ করি। সুযোগ এলো আনাস ইবনে নযরের জীবনে। ওহোদ যুদ্ধের দিন।
প্রচণ্ড যুদ্ধ।
এক মহাসন্ধিক্ষণে মুসলমানরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল।
তলোয়ার হাতে আনাস ইবনে নযর শক্ত হয়ে দাঁড়ালেন। চিৎকার করে বললেন মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যে, এদের (সাহাবাদের) কৃতকর্মের জন্যে আমি আপনার কাছে অক্ষমতা প্রকাশ করছি, আর ওদের (কাফেরদের) কাজের সাথে আমার সম্পর্কহীনতা ঘোষণা করছি।
তারপর ছুটলেন আনাস ইবনে নযর যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে। পথে দেখা হলো সা'আদ ইবনে মু'য়াযের সাথে। বললেন আনাস সা'আদকে, 'এ মুহূর্তে জান্নাতই আমার একমাত্র কাম্য, ওহোদের প্রান্তভাগ থেকে আমি জান্নাতের সুগন্ধ পাচ্ছি।'
যুদ্ধের পরে আনাস ইবনে নযরকে শহীদ অবস্থায় পাওয়া গেল যুদ্ধক্ষেত্রে। তাঁর দেহে তলোয়ার, বর্শা ও তীরের আশিটিরও অধিক জখম। মুশরিকরা নাক, কান কেটে ও চোখ উপড়িয়ে তাঁর লাশকে এতোটাই বিকৃত করেছিল যে বোন ছাড়া আর কেউ তাকে চিনতে পারেনি।
ধারণা করা হয়, কুরআন শরীফের এই আয়াত "মুমিনদের মধ্য থেকে কিছু সংখ্যক আল্লাহর কাছে কৃত তাদের ওয়াদা বাস্তবে রূপ দিয়ে দেখিয়েছেন”- আনাসের শাহাদাত উপলক্ষেই নাযিল হয়।
📄 সোনার টুকরারা
ওহোদ যুদ্ধের প্রাক্কাল।
মহানবীর মদীনা ধ্বংসের জন্যে কালবৈশাখীর মত ধেয়ে আসা কুরাইশ বাহিনী মদীনার উপকণ্ঠে উপস্থিত।
মহানবীর নেতৃত্বে মুসলমানরা যুদ্ধযাত্রা করেছে।
ক্ষুদ্র মুসলিম বাহিনী। কুরাইশদের তিন হাজারের মুকাবিলায় মাত্র সাতশ' জন। ছোট কিশোরদের বাহিনীতে নেয়া হয়নি।
কিন্তু কয়েকজন নাছোড়বান্দা।
তবু তাদের অনুরোধ ফিরিয়ে দিলেন মহানবী (সা)।
তাদের একজন রাফে নিজেকে বড় করে তোলার জন্যে পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে ভর করে উঁচু হয়ে নিজের বড়ত্বকে প্রমাণ করতে চাইল।
সবাই বললো, রাফে একজন উৎকৃষ্ট তীরন্দাজ। সকলের অনুরোধে মহানবী (সা) তাকে বাহিনীতে শামিল করলেন।
এটা দেখে আরেক বালক সামরা ইবনে জোন্দা ছুটে এলো মহানবীর কাছে। অভিমানী কন্ঠে বললো, 'কুস্তিতে রাফেকে আমি হারিয়ে দিয়ে থাকি। সে যুদ্ধের অনুমতি পেলো, আর আমাকে ফিরে যেতে হচ্ছে!'
বালকের এই অভিমানে আনন্দ পেলেন মহানবী (সা)। হাসিমুখে আদর করে বললেন, লড়ো দেখি কুস্তি রাফের সাথে।
সত্যই মল্লযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো দুই বালকের মধ্যে।
জিতে গেলো অভিমানী সামরা।
মহানবী (সা) হেসে বললেন সামরাকে, বেশ তোমাকেও যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হলো।
এই সোনার টুকরোরাই, ঈমানের এই জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গরাই পরবর্তীকালে অর্ধেক পৃথিবীর উপর ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন করেছিল।