📄 বাবলা তলার শপথ
৬ষ্ঠ হিজরীর জিলকদ মাস। হজ্জযাত্রার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে আরবের দিকে দিকে। এই মাস থেকে আগামী তিনমাস মক্কাভূমিতে যুদ্ধ বিগ্রহ বন্ধ থাকবে, ভুলে থাকবে মানুষ তাদের দ্বেষ-দ্বন্দ্বের কথা। এই উপলক্ষে মহানবীও (সা) মক্কায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। ঘোষণা করে দিলেন তাঁর সিদ্ধান্তের কথা। আনন্দ আর উৎসাহের বন্যা বয়ে গেল মদীনায়।
নির্দিষ্ট দিন এলো। যাত্রা করলেন মহানবী (সা)। তিনি তাঁর প্রিয় উট কাসওয়ার পিঠে সমাসীন। সাথে চৌদ্দশ' সাহাবা। যোদ্ধা নয়, তীর্থযাত্রীর বেশ তাদের। সংগে কুরবানীর ৭০টি উট। ছয় বছর আগে মদীনায় প্রবেশ করার পর এই প্রথম তিনি যাত্রা করলেন মক্কার উদ্দেশ্যে কাবা'র পথে।
তিনি মক্কার সন্নিকটবর্তী 'আসফান' নামক স্থানে পৌঁছে শুনতে পেলেন, কুরাইশরা যুদ্ধের জন্য এগিয়ে আসছে। কিন্তু মহানবী (সা) তো কোন যুদ্ধের জন্য আসেননি। তিনি সোজাসুজি কুরাইশদের সম্মুখীন না হয়ে অন্য পথ ধরে মক্কার এক মঞ্জিল দূরে হুদাইবিয়া নামক গ্রামে গিয়ে উপস্থিত। স্থানীয় 'খোজা' গোত্রের দল নেতা বুদাইলের কাছ থেকে তিনি জানতে পারলেন যে, কুরাইশরা তাঁকে কিছুতেই মক্কা প্রবেশ করতে দেবে না, প্রযোজন হলে যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত তারা। মহানবী (সা) বুদাইলকে মক্কায় পাঠিয়ে কুরাইশদেরকে তাঁর শান্তি কামিতা ও আগমনের উদ্দেশ্যের কথা জানালেন। কিন্তু ফল কিছুই হলোনা। মুসলমানদের পর্যবেক্ষণের জন্য
'ওবওয়া' ও 'বেদওয়া' গোত্রের দলনেতাসহ কয়েক ব্যক্তি হুদাইবিয়া গ্রামে এলো। তারাও গিয়ে মহানবীর (সা) সদিচ্ছা সম্পর্কে কুরাইশদেরকে অবহিত করল। কিন্তু তাদের গোঁ দূর হলোনা। মহানবী (সা) তাঁর সদিচ্ছার নিদর্শন হিসেবে তার প্রিয় উট কাসোয়ার পিঠে খিরাশ নামক সাহাবীকে মক্কায় পাঠালেন। কিন্তু তাঁর এ শুভেচ্ছার তারা জবাব দিল মহানবী (সা) উটের ক্ষতি সাধন করে। আর কয়েকটি গোত্রের হস্তক্ষেপে 'খিরাশ' কোন রকমে প্রাণ নিয়ে ফিরে এলেন হুদাইবিয়ায়।
অবশেষে মহানবী (সা) হযরত উসমানকে কুরাইশদের সাথে কথা বলবার জন্য মক্কায় পাঠালেন। আলোচনার ফলাফল জানার জন্য মুসলমানরা হযরত উসমানের আগমণ পথের দিকে চেয়ে রইলেন-গড়িয়ে গেল ঘন্টার পর ঘন্টা। কিন্তু হযরত উসমানের দেখা নেই-দিগন্ত বিস্তৃত শূন্য মরুপথ নির্জন পড়ে আছে সামনে। উদ্বেগ ও আশংকা ছড়িয়ে পড়ল গোটা কাফিলায়। এমন সময় খবর এলঃ হযরত উসমান নিহত হয়েছেন।
শোকের বিদ্যুৎ তরঙ্গ খেলে গেল প্রতিটি মুসলমানের হৃদয়তন্ত্রীতে। বিশিষ্ট সাহাবী মহানবীর (সা) জামাতা, ইসলামের অতন্ত্র সৈনিক হজরত উসমানের শোকে মুহ্যমান মুসলমানদের কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে গেলঃ এ তো উসমানের হত্যা নয়-সত্যের হত্যা। সত্য ও মিথ্যার চিরন্তন বিরোধেরই এ একটা আংশিক প্রকাশ মাত্র। কেন তারা এ আঘাতকে নীরবে সহ্য করে যাবে? উত্তেজনা ও শপথে দৃপ্ত হয়ে উঠলো প্রতিটি মুসলমান।
মহানবীর ((সা) দৃঢ় কন্ঠ ধ্বনিত হলঃ "আমাদেরকে অবশ্যই উসমানের রক্তের বদলা নিতে হবে।” মহানবীর (সা) এ উক্তি হুদাইবিয়ার উপস্থিত ১৪০০ বিশ্বাসীর হৃদয়কে আত্মোৎসর্গের প্রেরণায় আকুল করে তুলল।
মহানবী (সা) একটি বাবলা গাছের নীচে গিয়ে বসলেন। দৃপ্ত শপথে দৃঢ় ১৪০০ সৈনিক একে একে মহানবীর (সা) হাতে হাত রেখে শপথ নিলেন, "হযরত উসমান হত্যার বদলা আমরা নেব। আমরা মরে যাব, তবু লড়াইয়ের মাঠ থেকে পিছু হটব না।”
শত্রু দেশে শত্রু পরিবেষ্টিত অবস্থায় ১৪০০ মুজাহিদ। যুদ্ধের কোন অস্ত্রশস্ত্রই তাঁদের কাছে নেই, আছে শুধু আত্মরক্ষার জন্য একটি করে তরবারি। তবু শত্রুর মুকাবিলা ও অন্যায়ের প্রতিকারেরই শপথ নিলেন তাঁরা। তাঁদের এ শপথের নির্ভরতা ছিল অস্ত্রের উপর নয়-ঈমানের উপর, ঈমানী শক্তির উপর। আর ঈমানের শক্তি অস্ত্র বলের চাইতে বহুগুণে শক্তিশালী, বাবলা গাছের সেই শপথ তা ক্ষণকাল পরেই প্রমাণ করে দিল। প্রমাণ করে দিল, অন্যায়ের প্রতিরোধ আর ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় মুসলমানরা যদি আত্মোৎসর্গিত হয়, তাহলে আল্লাহর সাহায্য কত দ্রুত নেমে আসে।
মুসলমানদের শপথের কথা যথা সময়ে মক্কায় পৌঁছল। কুরাইশ বিবেক এবার চঞ্চল হয়ে উঠল। মুসলমানদের প্রয়োজনীয় যুদ্ধাস্ত্র না থাকলেও এবং তারা নগণ্য সংখ্যক হলেও তাদের ভীষণ শপথের কথা কুরাইশদের ভীত করে তুলল। তারা মুসলমানদের শৌর্য-বীর্য দেখেছে। জেনেছে তারা যে মুসলমানরা না মেরে মারা যায় না। সুতরাং তারা তাদের ভুল সংশোধন করল। বন্দীদশা থেকে ছেড়ে দিল উসমানকে। তার সাথে সাথে কুরাইশরা বাড়িয়ে দিল সন্ধির হাত مسلمانوں কাছে। মহানবীর (সা) সাথে হুদাইবিয়া গ্রামে এসে সাক্ষাত করল কুরাইশ প্রতিনিধিরা।
বারবার প্রতিনিধি প্রেরণ এবং পুনঃপুনঃ অনুরোধ কুরাইশদের যে যুদ্ধতৃষ্ণা মেটাতে পারেনি, পারেনি তাদের যে বিবেক বোধ জাগ্রত করতে, ঈমান দীপ্ত বাবলাতলার শপথ তা সম্ভব করে দিল।
📄 উহুদের হিন্দা ইয়ারমুকে
যেই হিন্দা উহুদ যুদ্ধে শহীদ হামজার কলিজা চিবিয়েছিলেন, সেই হিন্দা ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় লাভের পর নতুন এক জীবনে বিমূর্ত হয়ে উঠলেন। যে রূপে আমরা তাঁকে উহুদ প্রান্তরে দেখেছিলাম তার ঠিক বিপরীত রূপে আমরা তাঁকে দেখি ইয়ারমুক রণক্ষেত্রে।
ইসলামের বিস্ময়কর আবির্ভাব ও অভ্যুথানে পূর্বরোম সাম্রাজ্যের শাসনকর্তা বিচলিত হয়ে পড়েন। রোম সাম্রাজ্যের পাশেই একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের অভ্যুদয় তাঁর অস্তিত্বের জন্য বিশেষ ক্ষতিকর। তাই মুসলিম সাম্রাজ্য ধ্বংস করার জন্য রোমান শাসনকর্তা বিরাট বাহিনী সমাবেশ করলেন ইয়ারমুক প্রান্তরে। মুসলিম বাহিনীও এসে তাদের মুখোমুখি দাঁড়াল। হিন্দা তখন বেঁচে আছেন। তুষার শুভ্র কেশ। জীর্ণ দেহ। বেশ কিছু সংখ্যক মহিলার সংগে তিনি ইয়ারমুক রণাঙ্গনে আসেন।
কাতারে কাতারে মুসলিম সৈন্য অগ্রসর হয়ে চলেছে। যুদ্ধ আরম্ভ হলো। বিপুল রক্তক্ষয়ী সে সংগ্রাম। অপূর্ব সাহস ও বীরত্বের সাথে মুসলিম সৈন্য যুদ্ধ করতে লাগলো। কিন্তু বিপুল শত্রুসৈন্যের সম্মুখে তারা অধিকক্ষণ দাঁড়াতে পারলো না। পেছনে হটতে লাগলো। মুসলিম সৈন্যের পরাজয় আসন্ন হয়ে দেখা দিল। ছত্রভঙ্গ হয়ে তারা তাঁবুর দিকে ছুটতে লাগলো। হঠাৎ রণক্ষেত্রে হিন্দা তাঁর সাথীদের নিয়ে উপস্থিত হলেন। চীৎকার করে তিনি মুসলিম সৈন্যদের সম্বোধন করে বলতে লাগলেন, "কাপুরুষ, কোন মুখে
তোমরা পরাজয় বরণ করে ফিরে আসছো, তোমাদের লজ্জা করেনা? হটে যদি আসতে চাও, তবে এই নাও আমাদের অলংকার, আমাদের মুখাবরণ, তাঁবুতে প্রবেশ কর। আমরা নারীরা তোমাদের অশ্বে আরোহণ করে যুদ্ধ করবো। জয়লাভ করবো।” হিন্দার এই তেজোদীপ্ত উক্তিতে মুহূর্তে যুদ্ধের গতি ফিরে গেল।
নবীন উৎসাহে পূর্ণ তেজে মুসলিম সৈন্য ফিরে দাঁড়ালো। অমিতবিক্রমে রোমান সৈন্যদের উপর আক্রমণ পরিচালনা করল। সেই আক্রমণের বেগ তারা সহ্য করতে পারলো না। শোচনীয় পরাজয় বরণ করল রোমান বাহিনী।
📄 ইকরামা ইবন আবু জাহলের শাহাদাত
ইসলামের মুখর শত্রু ইকরামা ইবন অবু জাহল ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। ইসলাম গ্রহণের আগে একদিন যে 'কট্টর শত্রু ছিল, ইসলাম গ্রহণের পর সে হয়ে উঠল একজন জানবাজ মুজাহিদ। তাঁর প্রাণে জ্বলে উঠল ঈমানের আগুন- শহীদের রক্তবীজ সঞ্চারিত হলো তাঁর প্রাণমূলে। অন্ধকার থেকে আলোয় এসেছেন তিনি। আলোর স্পর্শ তাঁকে পাগল করে তুলেছে। সংগ্রামের প্রাণশক্তি তাঁর প্রাণ জগত থেকে উপছে উঠছে। কিন্তু এ প্রাণশক্তি তিনি রাখবেন কোথায়? শীঘ্রই সুযোগ এল। এল যুদ্ধের ডাক। ইকরামা সাড়া দিলেন সে ডাকে। যুদ্ধে শামিল হলেন ইকরামা ইবন আবু জাহল।
ভীষণ যুদ্ধ চলছে ইয়ারমুকে। সত্যের জন্য, ন্যায়ের জন্য প্রাণের আবেগে ইকরামা প্রাণপণ সংগ্রামে নিরত। বাতিলের রক্তে স্নান করে লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে-শহীদের রক্ত শয্যায়। পাশেই কিছু দূরে ছিলেন মহান সেনানায়ক খালিদ ইবন ওয়ালিদ। তিনি দেখতে পেলেন ভূমি শয্যায় শায়িত ইকরামা ইবন আবু জাহলকে। ঘোড়ার মুখ ফিরিয়ে নিলেন তিনি। ইকরামার কাছে এসে তিনি ঘোড়া থেকে দ্রুত নামলেন। ইকরামার জীবনী শক্তি দ্রুত নিঃশেষ হয়ে আসছিল। খালিদ তাঁর মাথা তুলে নিলেন কোলে। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগে ইকরামা বললেন, "খলীফা উমার আমার শাহাদাত লাভের শক্তিতে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। আজ আমার আনন্দ যে, আমার অন্তরের জীবন্ত বিশ্বাসের প্রমাণস্বরূপ আমি শহীদ হতে চলেছি।” শাহাদাতের আকুল پিয়াসা ইকরামাকে পাগল করে তুলেছিল। সেই پিয়াসা নিয়ে ইকরামা শাহাদাত বরণ করলেন।
📄 চার শহীদের মা
কাদেসিয়া প্রান্তর। পারস্য সম্রাটের সাথে ক্ষুদ্র মুসলিম বাহিনীর এক ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে। তদানীন্তন আরবের সর্বশ্রেষ্ঠা মহিলা কবি খানসা তাঁর চার ছেলে নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে এসেছেন। যুদ্ধ শুরুর পূর্বেই খানসা তাঁর ছেলেদের কাছে ডেকে বলে দিয়েছিলেন, "তোমাদের আমি বহুকষ্টে গর্ভে ধারণ করেছি, বহু দুঃখ বিপদের ভেতর দিয়ে মানুষ করে তুলেছি, এখন আমার কথা শোন, সত্যের জন্য যুদ্ধ করার মহত্বের কথা স্মরণ কর আর স্মরণ কর, কুরআনের নির্দেশ - দুঃখ বিপদের মধ্যে ধৈর্য ধারণে বজ্রসার আদেশ। কাল প্রভাতে সুস্থ মনে শয্যা ত্যাগ করে শংকাহীন চিত্তে সাহসের সঙ্গে যুদ্ধে যোগদান করবে-সর্বাপেক্ষা সাহসী যোদ্ধার সম্মুখীন হবে এবং প্রয়োজন হলে নির্ভীক চিত্তে শহীদ হবে।”
পরদিন খানসার চার ছেলে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং একে একে চার জনই শহীদ হলেন। সংবাদ বীর মাতার কাছে পৌঁছলে তিনি দু'হাত উপরে তুলে বললেন, "আল্লাহ, আমাকে আপনি শহীদের মাতা হবার সৌভাগ্য দান করেছেন, আপনাকে সহস্র ধন্যবাদ।” কোন শোকোচ্ছ্বাস নেই। দুঃখের আবিলতা নেই-এক পরম তৃপ্তিতে মায়ের বুক ভরে গেছে-পুত্ররা তাঁর সত্যের জন্য প্রাণ দিয়েছে। এর চাইতে গৌরবজনক মৃত্যু আর কি হতে পারে!