📄 উহুদ প্রান্তরের প্রথম শহীদ
উহুদ যুদ্ধ সমাগত। মদীনার এক পর্ণ কুটিরে যুদ্ধসাজে সেজেছেন হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন হারাম। হাসি যেন তাঁর মুখ থেকে উপচে পড়ছে। যুদ্ধে বেরুবার আগে তিনি পুত্র জাবিরকে ডেকে বললেন, "পুত্র! আমার অন্তর বলছে, এ যুদ্ধে আমিই সর্বপ্রথম শাহাদাত বরণ করব।” কথা বলার সময় তাঁর মুখে যে হাসি, তা দেখে মনে হবে যেন তিনি ঈদের আনন্দে শামিল হতে যাচ্ছেন।
উহুদ যুদ্ধের কঠিন সময়। ভীষণ যুদ্ধ চলছে। হযরত আব্দুল্লাহর কথাই সত্য হলো। তিনি উসামা ইবনে আওয়ার ইবন উবাই এর হাতে শাহাদাত বরণ করলেন। তাঁর রক্তাক্ত দেহ লুটিয়ে পড়ল উহুদের ময়দানে। হযরত আব্দুল্লাহ আগেই ভীষণভাবে ক্ষত বিক্ষত হয়েছিলেন। তারপর প্রাণহীন তাঁর দেহ যখন লুটিয়ে পড়ল মাটিতে তখনও তাঁর উপর চললো নিপীড়ন। বিকৃত করা হলো তাঁর দেহ। মুখে তাঁর তখনও কিন্তু সেই বেহেস্তী হাসি। আঘাতে আঘাতে বিকৃত তাঁর দেহের দিকে চেয়েই চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠল হযরত আব্দুল্লাহর মেয়ে ফাতিমা। মহানবী (সা) সেদিকে চেয়ে তাকে সান্ত্বনার সূরে বললেন, "জানাযা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ফিরিশতারা তাকে ছায়া দান করছে।”
পাহাড়ঘেরা উহুদের এক প্রান্তে আরও একজন শহীদের সাথে তাঁকে দাফন করা হলো। ছ'মাস পর তাঁর পুত্র জাবির তাঁকে সে কবর থেকে তুলে অন্য আর এক কবরে দাফন করে দিলেন। সে
সময়ও তাঁর দেহ ছিল অবিকৃত। মনে হয়েছিল যেন আজই তাঁকে দাফন করা হয়েছে।
উহুদ যুদ্ধের বেশ কিছু দিন পরের এক ঘটনা। এক দিন হযরত আব্দুল্লাহর পুত্র হযরত জাবিরকে কাছে পেয়ে মহানবী (সা) উহুদ যুদ্ধের প্রথম শহীদ তাঁর পিতা সম্পর্কে একটি শুভ সংবাদ দিলেন। বললেন, "আল্লাহ পর্দা ছাড়া সরাসরি কারো সাথে কথা বলেন না। কিন্তু তোমার পিতার সাথে সরাসরি কথা বলেছেন।, 'যা চাও তাই দেয়া হবে।' তোমার পিতা উত্তরে বললেন, 'আমার আশা, আর একবার দুনিয়াতে গিয়ে শহীদ হয়ে আসি।' আল্লাহ জবাব দিলেন, 'যে দুনিয়া থেকে একবার আসে, আর ফিরে যেতে পারে না।' অতঃপর তোমার পিতা তাঁর সম্পর্কে ওহী চেয়েছিলেন। সে ওহী আমার কাছে এসেছেঃ "যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে মৃত বলোনা, বরং তারা জীবিত।”
📄 আবদুল্লাহ ও সা’দের অভিলাষ
উহুদের যুদ্ধ ক্ষেত্র। যুদ্ধের আগের দিন সন্ধ্যা। হযরত আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ গিয়ে সা'দ ইবন রাবীকে বলল, "চল আমরা একত্রে দোয়া করি। আমি দোয়া করব, তুমি 'আমীন' বলবে। আবার তুমি দোয়া করবে, আমি 'আমীন' বলব।”
প্রথমেই প্রার্থনা করলেন হযরত সা'দ। তিনি দু'টি হাত উর্ধে তুলে বললেন, "হে আল্লাহ, আগামী কালের যুদ্ধে এক ভীষণ যোদ্ধা আমাকে জুটিয়ে দিন তাকে যেন যুদ্ধে পরাজিত করে আমি গাজী হতে পারি আর তার পরিত্যক্ত মাল-সম্ভার আমি লাভ করি।” সা'দের এ প্রার্থনায় আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ 'আমীন' বললেন। তারপর জাহাশের পালা। জাহাশ দু'টি হাত তুলে মহা প্রভুর দরবারে সানুনয় প্রার্থনা জানালেন, "হে আল্লাহ, আগামী কাল যুদ্ধে আমাকে অতি বড় এক শত্রুর মুখোমুখি করুন। আমি যেন সর্বশক্তি দিয়ে তার মুকাবিলা করি এবং অবশেষে যেন শাহাদাতের অমৃত স্বাদ লাভ করতে পারি। শত্রুরা যেন আমার নাক-কান কেটে নেয়। পরে কিয়ামাতের দিন আমি যখন আপনার সমীপে উপস্থিত হবো, তখন আপনি জিজ্ঞেস করবেন, 'আব্দুল্লাহ, তোমার নাক-কান কেন কাটা গেছে?' তখন আমি উত্তর দেবো, 'হে আল্লাহ, আপনার এবং আপনার রাসূলের রাস্তায় কাটা গেছে। তখন আপনি বলবেন, "হ্যাঁ, সত্যিই আমার রাস্তায় কাটা গেছে।” আবদুল্লাহর প্রার্থনা শেষে সা'দ 'আমীন' বললেন।
পরের দিন উহুদের ঘোরতর যুদ্ধে তাঁদের প্রার্থনা অনুসারেই ঘটনা ঘটল। সা'দ গাজী হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে এলেন। কিন্তু হযরত আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ তাঁর প্রার্থনা মুতাবিক শহীদ হলেন।
সন্ধ্যার সময় যখন শহীদের লাশগুলোর সন্ধান করা হলো, তখন দেখা গেল, যুদ্ধক্ষেত্রের কেন্দ্রভূমিতে আবদুল্লাহ শহীদ হয়ে পড়ে আছেন। তাঁর নাক-কান কাটা। তাঁর হাতে তখনও তরবারি ধরা। কিন্তু শহীদের সে তরবারির অর্ধাংশ ভাঙা।
📄 পিতা, পুত্র, স্বামীহারা এক মহিলা
উহুদের যুদ্ধে রাসূলের (সা) বহু প্রিয় সাথী নিহত হলেন। সত্যের জন্য অকুণ্ঠিত চিত্তে তাঁরা প্রাণ দিয়েছেন। সত্যের আহ্বান তাঁদের উদ্বুদ্ধ করেছে অম্লান বদনে সকল দুঃখ কষ্ট সহ্য করে প্রাণের শিখা অনির্বাণ জ্বালিয়ে রাখতে। মৃত্যু তাঁদের অমর লোকের সঙ্গীত শুনায়। এ সংগীতে সত্যের পরম আনন্দ তাঁরা লাভ করে। শত বিপদ আপদ শত মৃত্যু পার হয়ে তাঁরা লাভ করেন জীবনের পূর্ণতা। উহুদের যুদ্ধ নবীন মুসলিমদের এই সুযোগ দান করেছিল, মৃত্যুকে বরণ করে অমৃতকে তাঁরা লাভ করেছিলেন। সে এক চরম পরীক্ষার দিন। সংবাদ রটে গেল, এই যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা) শহীদ হয়েছেন। কিন্তু তাঁকে সেদিন তাঁর প্রিয় অনুচরগণ মানব দেহের প্রাচীর তুলে রক্ষা করেছিলেন।
রাসূলের (সা) মিথ্যা মৃত্যু সংবাদে একজন আনসার মহিলা ছুটে চললো মাঠের দিকে। এক জন লোককে দেখে সে জিজ্ঞাসা করলো, "রাসূল কি অবস্থায় আছেন?”
লোকটি জানে রাসূল নিরাপদে আছেন, তাই প্রশ্নের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সে বলল "তোমার পিতা শহীদ হয়েছেন।” মুহূর্তে বিবর্ণ হয়ে উঠলো তাঁর মুখ। নিজকে সংযত করে মহিলাটি জিজ্ঞাসা করল, "রাসূল কেমন আছেন, তিনি কি জীবিত?”
"তোমার ভাইও নিহত হয়েছে।”
মহিলা আবার সেই একই প্রশ্ন ব্যাকুল কন্ঠে জিজ্ঞাসা করল। তখন সে আবার বলল, "তোমার স্বামীও শহীদ হয়েছেন।”
সকল শক্তি একত্র করে মহিলা তিক্ত স্বরে বলল, "আমার কোন পরমাত্মীয় মারা গেছে তা আমি জিজ্ঞাসা করছিনে, আমাকে শুধু বল আল্লাহর নবী মুহাম্মাদ কেমন আছেন?” লোকটি উত্তর দিলেন,, "তিনি নিরাপদেই আছেন।” মুহূর্তে মহিলাটির বিবর্ণ মুখে আনন্দের আভাস দেখা দিল। উল্লসিত হয়ে সে বললো, "আত্মীয় বন্ধুদের প্রাণদান তবে ব্যর্থ হয়নি।”
ব্যর্থ হয় না। কোন দিনই ব্যর্থ হয় না। একটি প্রাণের একটি পবিত্র জীবনের আত্মাহুতি সত্যের আলোক শিখা, সত্যের উদাত্তবাণীকে আরও তীব্রতর আরও জ্যোতির্ময় করে তোলে।
মৃত্যু ভয় যাদের নেই, সাহস ও অটল বিশ্বাস যাদের বুকে, তাদের জয় সুনিশ্চিত। ইসলামের প্রাথমিক যুগে একদল বিশ্বাসী ও নির্ভীক মুসলমান সকল বাধা-বিপত্তি ও মৃত্যু ভয়কে তুচ্ছ করেছিল বলেই ইসলামের প্রতিষ্ঠা সুদৃঢ় হয়েছে। আশার বাণী, শান্তির বাণী প্রচারিত হয়েছে। আটলান্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের বক্ষদেশ পর্যন্ত এর প্রতিষ্ঠার বুনিয়াদ গড়ে উঠেছে শহীদী রক্তের পুণ্য স্রোতধারার উপর। ইসলাম একটি অজেয় শক্তি। অন্যায়, অন্ধকার ও অন্ধ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদ।
📄 খন্দকের এক শহীদ
খন্দক যুদ্ধ তখন শুরু হয়ে গেছে। মদীনার আউস গোত্রাধিপতি সা'দ ইবন মায়াজ যুদ্ধ সাজে সজ্জিত হয়ে রণাঙ্গনে যাচ্ছেন। বনু হারেসার দুর্গের পাশ দিয়ে যাবার সময় দুর্গের উপরে উপবিষ্ট সা'দের মা বললেন, "বাছা, তুমি তো পিছনে পড়ে গেছ, যাও তাড়াতাড়ি।”
যুদ্ধকালে মারাত্মকভাবে তীরবিদ্ধ হলেন মায়াজ। যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা তাঁর পক্ষে আর সম্ভব হলোনা। মহানবী (সা) তাঁকে তাড়াতাড়ি মসজিদের সন্নিকটবর্তী এক তাঁবুতে নিয়ে এলেন। মায়াজ আর যুদ্ধে যেতে পারলেন না। তাঁর অবস্থা ক্রমেই খারাপ হতে লাগল। কিন্তু নিজের দিকে তাঁর কোন খেয়াল নেই, তাঁর বড় চিন্তা, ইসলামের শত্রুর বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধ করতে পারছেন না। আর একটি চিন্তা তাঁর মনকে আকুল করে তুলছিল, তিনি যদি এ আঘাতে মারাই যান, তাহলে ইসলাম বৈরী কুরাইশদের চরম শিক্ষা দেয়ার ঘোরতর যুদ্ধগুলোতে তিনি আর শরীক থাকতে পারবেন না। মায়াজ আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানালেন, "হে আল্লাহ, কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ যদি অবশিষ্ট থাকে তবে আমাকে জীবিত রাখুন। তাদের সাথে যুদ্ধ করতে আমার খুব সাধ জাগে, কারণ তারা আপনার রাসূলকে কষ্ট দিয়েছে, তাঁর প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছে এবং মক্কা থেকে বহিষ্কার করে দিয়েছে। আর যদি কোন যুদ্ধ না থাকে, তবে এ আঘাতেই যেন আমার শাহাদাত লাভ হয়।” খন্দক যুদ্ধের পর কুরাইশদের সাথে প্রকৃত অর্থে আর কোন যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি। মক্কা
বিজয়ের সময় ছোট খাট সংঘর্ষ ছাড়া বড় রকমের কোন যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি।
খন্দক যুদ্ধ শেষ হলো, হযরত মায়াজ আর সেরে উঠলেন না। শাহাদাতের দিকে তিনি এগিয়ে চললেন। মসজিদে নববীর তাঁবুতেই তখনও তিনি থাকেন। শাহাদাতের পরম মুহূর্ত একদিন ঘনিয়ে এল তাঁর। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন হযরত মায়াজ। সংবাদ পেয়ে মহানবী (সা) ছুটে এসে মায়াজের মাথা কোলে তুলে নিলেন। সৌম্য শান্ত, পরম ধৈর্যের প্রতীক আবু বকর (রা) তাঁর মৃতদেহের পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলে উঠলেন, "আমার কোমর ভেংগে গেছে।”
মহানবী (সা) আবু বকরকে (রা) সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, "এরূপ কথা বলা চলে না, আবু বকর।” সিংহ হৃদয় হযরত উমার (রা) মায়াজের পাশে বসে অঝোরে কাঁদছিলেন। সংবাদ শুনে মায়াজের মা ছুটে এলেন। তাঁর চোখে অশ্রু, কিন্তু মুখে তিনি বললেন, "বীরত্ব, ধৈর্য ও দৃঢ়তার মধ্য দিয়ে সা'দ সৌভাগ্যশালী হয়েছে।”