📄 যে মৃত্যু বিজয় আনে
আরবের আগুন ঝরা মধ্যাহ্ন। ঊর্ধ্বাকাশ থেকে মরু-সূর্য যেন আগুন বৃষ্টি করছে। মরুর লু' হাওয়া আগুনের দাব-দাহ নিয়ে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে চারদিক। এমনি সময়ে আগুন ঝরা মরুভূমির বুকে নির্যাতন চলছে এক নারীর উপর- সুমাইয়ার উপর। ইসলাম প্রচারের শুরুতেই যাঁরা রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহী ওয়া সাল্লাম) আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন, সুমাইয়া তাঁদের একজন। সুমাইয়ার নারী দেহ ভংগুর, স্পর্শকাতর কিন্তু আত্মা তাঁর অজেয়। বক্ষে তাঁর বিশ্বাস- ঈমানের দুর্জয় শক্তি ও সাহস। সে প্রাণ বহ্নি নির্বাপিত হবার মত নয়।
সুমাইয়ার উপর এ নির্যাতন কেন? কেন তাঁকে এই প্রখর মধ্যাহ্নে সূর্যের বহ্নিতলে ক্রুর নির্যাতন চালানো হচ্ছে?
তাঁর অপরাধ এক আল্লাহকে প্রভু হিসেবে স্বীকার করেছেন, যুগ যুগ ধরে পূজ্য লাত, ওজ্জা- হোবলদের বিরোধীতা করেছেন, তাঁর জীবন-মৃত্যুর সবকিছুই নিবেদন করেছেন আল্লাহর নামে। অমানুষিক নির্যাতনেও সুমাইয়া অচল-অটল। তাঁর দেহ নির্যাতন- নিপিড়নে জর্জরিত হোক, তাঁর কোমল দেহ পুড়ে ছাই হয়ে যাক, তবু অসত্যের কাছে, অত্যাচারের কাছে তাঁর অমর আত্মা কখনো নতি স্বীকার করবে না। এত কষ্ট দিয়েও শত্রুর মন টললো না। ইসলামের শত্রু আবু জাহল সুমাইয়ার অবিচল নিষ্ঠা, অপূর্ব সাহস-সহিষ্ণুতা ও দৃঢ়তা দেখে অস্থির হয়ে তাঁর দিকে বর্শা ছুঁড়ে মারল। বর্শা গিয়ে সুমাইয়ার নিম্নাংগ ভেদ করলো। সুমাইয়ার
দেহ ভূলুণ্ঠিত হয়ে পড়ল। তাঁর মৃত্যুজয়ী আত্মা চলে গেল জান্নাতে। দু'মুঠো মাটির দেহ তাঁর পেছনে পড়ে রইলো। আত্মা তাঁর আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেল।
সুমাইয়ার পবিত্র রক্তে আরবের মাটি রঞ্জিত হলো-সেই রক্তে উত্তপ্ত হলো ভবিষ্যতের শত সহস্র শাহাদাত-আত্মত্যাগের বীজ।
সত্যের জন্য উৎসর্গিত প্রাণ যাঁর, মৃত্যুতে তাঁর কিসের ভয়, কিসের শংকা। সুমাইয়ার কন্যা হযরত উমামার উপরও চলল অকথ্য নির্যাতন। তপ্তবালুর উপর-পাথরের উপর তাঁকে জোর করে শুইয়ে রাখা হতো। উত্তপ্ত মরুর সূর্য প্রখর কিরণে তাকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতো। মধ্যাহ্নে ঘন্টার পর ঘন্টা তাঁকে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো উন্মুক্ত মরুপ্রান্তরে। উষ্ণ লু-হাওয়া তাঁর সর্বাঙ্গ ঝলসে দিত-আত্মা তবু নতি স্বীকার করেনি। অসত্যের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আত্মশক্তি চালিয়েছে তার অবিশ্রান্ত দুঃসাহসী সংগ্রাম-দুঃখ জয়। মৃত্যুজয়ী আত্মা সগৌরবে তুলে ধরেছে- দিকে দিকে মেলে দিয়েছে সত্যের জয় পতাকা।
📄 বড় লাভের ব্যবসা করলে, সুহাইব
নবুওয়াতের তখন একদম শিশুকাল। নবুওয়াতের বাতি জ্বলছে। জ্বলছে মক্কার ছোট গন্ডির মধ্যে। জাহিলিয়াতের অন্ধকার এ আলোক শিখাকে গলাটিপে মারার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় রত। কিন্তু নবুওয়াতের আলোক শিখা যে আলোক শিশুদের তৈরী করেছে, তারা জগৎ জোড়া সহনশীলতা নিয়ে নীরবে আত্মরক্ষা করে চলেছে।
এ ধরনেরই এক আলোক-শিশু হযরত সুহাইব (রা)। অত্যাচারের ষ্টিম রোলার চলছে তাঁর উপর। চরম সহনশীলতার প্রতীক সুহাইব সব অত্যাচার, সব নির্যাতন সয়ে যাচ্ছেন নীরবে। আল্লাহর এ সৈনিকদের উপর এ অমানুষিক নির্যাতন কেমন করে কত দিন আর সয়ে যাবেন মহানবী (সা)। তাঁর প্রাণ কেঁদে উঠল। সকলের মত সুহাইবকেও মহানবী (সা) একদিন মক্কা থেকে হিজরাত করার নির্দেশ দিলেন। নির্দেশের সংগে সংগেই সুহাইব সিদ্ধান্ত নিলেন, হিজরাতের। মহানবীর (সা) নির্দেশের কাছে, ইসলামের জন্য ত্যাগ স্বীকারের কাছে স্বদেশের মায়া, স্বীয় সহায় সম্পদের মায়া মুহূর্তে উবে গেল। কাউকে কিছু না বলে একদিন হিজরাতের উদ্দেশ্যে বের হলেন সুহাইব। সাথে পরিধানের পোশাক টুকুও আত্মরক্ষার জন্য কিছু অস্ত্র ছাড়া আর কিছুই নেই। সুহাইবের এ যাত্রা ধরা পড়ে গেল কুরাইশ চরদের চোখে। সংবাদ পেয়ে ছুটে এল একদল কুরাইশ। তারা সুহাইবকে জোর করে ধরে নিয়ে যেতে চায় মক্কায়। সুহাইব মক্কার বাইরে গিয়ে দল পাকাবে, মুসলমানদের দল ভারি করবে কুরাইশরা তা হতে দেবে কেন? কিন্তু সুহাইব একাই রুখে
দাঁড়ালেন কুরাইশ দলটির বিরুদ্ধে। বললেন, "তোমরা জান, আমি তোমাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ তীরন্দাজ। আমার হাতে একটি তীর থাকা পর্যন্ত তোমরা কেউ আমাকে স্পর্শ করতে পারবে না। তীর ফুরিয়ে গেলে তরবারি আছে। তরবারি ভেঙে গেলে কিংবা হাতছাড়া হলে তারপর তোমরা আমাকে যা খুশি করতে পার। এত কিছুর চেয়ে বরং ভালো, তোমরা মক্কায় আমার যা কিছু মাল-সম্পদ আছে সব নিয়ে নাও, আর আমি চলে যাই।” কুরাইশদল অর্থের সন্ধান পেয়ে সুহাইবকে ধরার বিপদপূর্ণ ঝুঁকি না নেয়াই যুক্তিযুক্ত মনে করল। তারা পথ ধরল মক্কার আর সব বিসর্জন দিয়ে, মাতৃভূমির মায়া কাটিয়ে রিক্ত-নিঃস্ব সুহাইব অনিশ্চিতের পথে পাড়ি জমালেন। এদের সম্পর্কেই আল কুরআন বলছেঃ "এমনও লোক আছে যারা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য নিজের জীবনটাকে কিনে নেয়, আল্লাহ নিজের বান্দাদের উপর সর্বদাই দয়াশীল।”
মহানবীর (সা) হিজরতের পর মদীনার সন্নিকটবর্তী পল্লীর একটি দিন। নবীর (সা) সাথে সাক্ষাত ঘটল সুহাইবের। নবী তাঁকে কাছে ডেকে বললেন, "বড় লাভের ব্যবসাই করলে, সুহাইব।”
সুহাইবকে উঁচু মর্যাদা দিতো সকলেই। হযরত উমার (রা) তাঁর মুমুর্ষ অবস্থায় অছিয়ত করেছিলেন তাঁর জানাযার নামায যেন সুহাইবের দ্বারা পড়ান হয়।
📄 এই নাও তোমাদের গচ্ছিত ধন
সেদিন গভীর নিশীথে মহানবী (সা) হিজরত করেছেন। তাঁর ঘরে তাঁর বিছানায় শুয়ে আছেন হযরত আলী (রা)। মহানবীর কাছে গচ্ছিত রাখা কিছু জিনিস মালিকদের ফেরত দেবার জন্য মহানবী (সা) হযরত আলীকে (রা) রেখে গেছেন। হযরতকে হত্যা করতে আসা কুরাইশরা আলীকে মহানবী মনে করে সারারাত পাহারা দিয়ে কাটালো। ভোরে তারা হযরতের শয্যায় আলীকে দেখে ক্রোধে ফেটে পড়লো। তারা হযরত আলীকে তরবারির খোঁচায় জাগিয়ে বললো, "এই, মুহাম্মাদ কোথায়?”
নির্ভীক তরুণ হযরত আলী উত্তর দিলেন, "আমি সারারাত ঘুমিয়েছি, আর তোমরা পাহারা দিয়েছো। সুতরাং আমার চেয়ে তোমরাই সেটা ভালো জান।”
হযরত আলীর উত্তর তাদের ক্রোধে ঘৃতাহুতি দিল। তারা তাঁকে শাসিয়ে বলল, "মুহাম্মাদের সন্ধান তাড়াতাড়ি বল, নতুবা তোর রক্ষা নেই।”
হযরত আলীও কঠোর কন্ঠে বললেন, "আমি কি তোমাদের চাকর যে তোমাদের শত্রুর গতিবিধি লক্ষ্য রেখেছি? কেন তোমরা আমাকে বিরক্ত করছো?” একটু থেমে আলী কয়েকজনের নাম ধরে ডেকে বললেন, "তোমরা আমার সাথে এস। তোমাদের জন্য শুভ সংবাদ আছে।” কথা শেষ করে হযরত আলী পথ ধরলেন।
যাদের নাম উল্লেখ করলেন তিনি, তারাও তাঁর পিছু পিছু চললো। তাদের হাতে উলংগ তরবারি। তাদের মনে একটি ক্ষীণ
আশা, হয়ত হযরত আলী তাদেরকে মুহাম্মাদের (সা) সন্ধান দিতে নিয়ে চলেছেন।
হযরত আলী এক গৃহদ্বারে গিয়ে দাঁড়ালেন। পিছনে ফিরে ওদের বললেন, "দাঁড়াও, আমি নিয়ে আসছি।” বলে তিনি ভেতরে চলে গেলেন। পেছনের কয়েকজনের অন্তরে তখন 'কি হবে না হবে' অপরিসীম দোলা। তাদের মনে আশঙ্কাও। উলংগ তরবারি হাতে তারা পরিস্থিতি মুকাবিলার জন্য প্রস্তুত।
এমন সময় হযরত আলী বেরিয়ে এলেন। তাঁর হাতে কয়েকটি ধন-রত্নের তোড়া। তিনি তাদের সামনে উপস্থিত হয়ে ধন-রত্নের তোড়া তাদের সামনে ধরে বললেন, "নাও, তোমরা নাকি বহুদিন পূর্বে তোমাদের ধন-রত্নাদি হযরত মুহাম্মাদের (সা) কাছে গচ্ছিত রেখেছিলে? ভেবেছিলে, গচ্ছিত ধন আর পাবেনা। আজ তিনি তোমাদের অত্যাচারেই দেশত্যাগী হয়েছেন। কিন্তু তোমাদের গচ্ছিত সম্পদ তোমাদের হাতে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করে গেছেন। এই নাও তোমাদের গচ্ছিত ধন।”
এই কুরাইশরা যে এত শত্রুতার পরও তাদের ধন-রত্ন ফিরে পাবে, সে কথা কল্পনাও করেনি। তাই তারা বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে পরস্পর বলাবলি করতে লাগলঃ 'সত্যই কি আল-আমীনের ন্যায় বিশ্বাসী ও সত্যবাদী লোক বিশ্বে আর নেই? তবে কি তিনি সত্য পথেই আছেন? আমরাই ভ্রান্ত পথে আছি? তাঁকে আঘাতের পর আঘাত দিয়ে পেয়েছি নিঃস্বার্থ প্রেমের আহবান-মানুষ হবার উপদেশ। আজ তাঁর প্রাণ নিতে এসেছিলাম, প্রাণ দিতে না পেরে দিয়ে গেলেন গচ্ছিত ধন-রত্ন? আহ! মুহাম্মাদ (সা) যদি আমাদের ধর্মদ্রোহী না হতেন, তাঁর পদানত দাস হয়ে থাকতেও আমাদের কিছু মাত্র আপত্তি ছিলনা।'
📄 পতাকাবাহী মুসয়াব
মুসআব। ধনীর দুলাল মুসআব। প্রাচুর্যের মধ্যে যাঁর জীবন গড়ে উঠেছে সেই মুসআব সত্যের পথ দুঃখের পথ গ্রহণ করে ফকির হলেন। সহায় নেই, সম্বল নেই, আত্মীয়স্বজন তাঁর প্রতি বিরূপ। একমাত্র সম্বল-একমাত্র পাথেয় তাঁর আল্লাহর প্রেম, সত্যের বাণী।
তাঁকে বন্দী করে রাখা হলো। বেপরোয়া নির্যাতন চালানো হলো তাঁর দেহ ও মনের উপর। বন্দীর শৃংখল ভেঙ্গে একদিন তিনি চলে গেলেন সুদূর আবিসিনিয়ায় অন্যান্য মুসলিম মুহাজিরদের সাথে। বহুদিন পর তিনি এলেন মদীনায়। তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল অশেষ দারিদ্র, দুঃখ-কষ্ট, কিন্তু অদম্য তাঁর প্রাণশক্তি। পরনে ভালো কাপড় নেই, শতছিন্ন একটি পোষাক কোন মতে তাঁর দেহের আবরু রক্ষা করছে। এমনি ভাবে একদিন একটিমাত্র বস্ত্রে কোনরূপে দেহ ঢাকতে ঢাকতে তিনি পথ চলছেন? হযরত মুহাম্মাদ (সা) তাঁর এই দুর্দশা নীরবে চেয়ে দেখছিলেন, তাঁর মনে পড়ে গেল মুসআবের ঐশ্বর্যপূর্ণ বিলাসী জীবনের কথা। কত সুখে, আরাম-আয়েশের মধ্যে তাঁর জীবন কেটেছে। আর আজ? রাসূলের (সা) চোখে অশ্রু দেখা দিল।
উহুদের যুদ্ধক্ষেত্র। একদিকে মুষ্টিমেয় বিশ্বাসী মুসলমান, অন্যদিকে মক্কার কুরাইশগণ। তুমুল যুদ্ধ চলছে। মুসলমানদের পতাকাবাহী মুসআব। কুরাইশদের প্রচন্ড আক্রমণে মুসলমানদের এক সংকটময় মুহূর্ত দেখা দিয়েছে-বিশ্বাসের চরম পরীক্ষা। নির্ভীক মুসআব ইসলামের পতাকা হস্তে যুদ্ধের প্রচন্ডতা অগ্রাহ্য করে দাঁড়িয়ে আছেন। একজন শত্রুর আঘাতে তাঁর দক্ষিণ হস্ত
কেটে পড়ে গেল। বাম হাত দিয়ে তিনি পতাকা ধরে রাখলেন। সে হাতও কাটা গেল। দু'হাতের অবশিষ্টাংশ দিয়ে মুসআব প্রাণপণে ইসলামের পতাকা বুকে ধরে রাখলেন। এ পতাকা নমিত হতে পারে না, যতক্ষণ প্রাণ আছে, ততক্ষণ তা অসম্ভব। অশান্ত মরুবাত্যায় তখন গর্বভরে নিশান উড়ছে। এ নিশান অবহেলিত হতে পারে না। শত ঝড় ঝঞ্চা বয়ে যাক, মৃত্যুর অশ্রান্ত গর্জন শুনা যাক, তবু সত্যের পতাকা নমিত লাঞ্ছিত হতে পারে না। কখনও না, প্রাণ গেলেও না। অকস্মাৎ একটি তীর এসে মুসআবের বক্ষ ভেদ করে গেল। শহীদী রক্তে মরুর বক্ষ রঞ্জিত করে তিনি হলেন মৃত্যুঞ্জয়ী, আত্মা তাঁর লাভ করলো অমরত্বের অনির্বচনীয় আস্বাদ।