📄 খাব্বাবের আকাঙ্খা
একদম প্রাথমিক পর্যায়ে যাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেছেন, খাব্বাব তাঁদের একজন। বোধ হয় ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রে পাঁচ ছয় জনের পরই তাঁর স্থান হবে। তিনি একজন মহিলার কৃতদাস ছিলেন। মহিলাটি ছিল নিষ্ঠুরতার জ্বলন্ত প্রতিমূর্তি। যখন সে জানতে পারলো খাব্বাব ইসলাম গ্রহণ করেছে, তখন তাঁর উপর নির্মম অত্যাচার শুরু হলো। অধিকাংশ সময় তাঁকে নগ্ন দেহে তপ্ত বালুর উপর শুইয়ে রাখা হতো। যার ফলে তাঁর কোমরের গোশত গলে পড়ে গিয়েছিলো। ঐ নিষ্ঠুর রমনী মাঝে মাঝে লোহা গরম করে তাঁর মাথায় দাগ দিত।
অনেকদিন পর হযরত উমারের রাজত্বকালে হযরত উমার একদিন তাঁর উপর নির্যাতনের বিস্তৃত জানতে চাইলেন। খাব্বাব তখন বললেন, "আমার কোমর দেখুন।” হযরত উমার কোমর দেখে আঁৎকে উঠে বললেন, “এমন কোমর তো কোথাও দেখিনি।” উত্তরে খাব্বাব খলিফাকে জানালেন, "আমাকে জ্বলন্ত অঙ্গারের উপর শুইয়ে চেপে ধরে রাখা হতো, ফলে আমার চর্বি ও রক্তে আগুন নিভে যেত।”
এই নির্মম শাস্তি ভোগ করা সত্ত্বেও ইসলামের যখন শক্তি বৃদ্ধি হল এবং মুসলিমদের বিজয় সূচিত হলো, তখন খাব্বাব রোদন করে বলতেন, “খোদা না করুন আমার কষ্টের পুরস্কার দুনিয়াতেই যেন লাভ না হয়।”
মাত্র ৩৬ বছর বয়সে হযরত খাব্বাবের মৃত্যু হয় এবং সাহাবাদের মধ্যে সর্ব প্রথম তিনিই কুবায় কবরস্থ হন। তাঁর মৃত্যুর পর হযরত আলী (রা) তাঁর একদিন তাঁর কবরের পাশদিয়ে যাবার সময় বলেছিলেন, "আল্লাহ খাব্বাবের উপর রহম করুন। তিনি নিজের খুশিতেই মুসলিম হয়েছিলেন। নিজ খুশিতেই হিজরাত করেছিলেন। তিনি সমস্ত জীবন জিহাদে কাটিয়ে দিয়েছিলেন এবং অশেষ নির্যাতন ভোগ করেছিলেন।"
📄 তাওহীদের মহাবাণী গোপন রাখতে পারবো না
হযরত আবুযার আরবের গিফার গোত্রের লোক। মক্কা থেকে অনেক দূরে বাস করেন তিনি। সত্যানুসন্ধি আবুযার শুনলেন মক্কায় একজন নবী আবির্ভূত হয়েছেন। আবুযার মক্কায় গিয়ে তাঁর সাক্ষাত লাভের মনস্থ করলেন। কিন্তু কুরাইশদের শ্যেন দৃষ্টির সামনে তাঁকে খুঁজে বের করে সাক্ষাত করা নিরাপদ নয়। তবু আবুযার মক্কায় চললেন। সত্যসন্ধানী আবুযারকে সত্য প্রচারকের সাক্ষাত যে পেতেই হবে। মক্কায় গিয়ে তিনদিন মৌন অনুসন্ধানের পর আবুযার মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাক্ষাত লাভের সৌভাগ্য অর্জন করলেন। নবীর সাক্ষাত পেয়েই সত্যের জন্য পাগল পারা আবুযার ইসলাম গ্রহণ করলেন। মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবুযারকে উপদেশ দিলেন, “ইসলাম গ্রহণের কথা গোপন রেখে তুমি নীরবে দেশে ফিরে যাও।”
ইসলাম গ্রহণ করে আবুযার কিন্তু আর স্থির থাকতে পারলেন না। যে সত্য গ্রহণের জন্য এতদিন তিনি পাগল প্রায় ছিলেন, সে সত্য প্রচারের জন্য এখন তিনি অস্থির হয়ে উঠলেন। তাঁর মনে কাঁটার মতো বিঁধতে লাগলো। ফুল শয্যায় শয়ন করে কাল কাটাবার জন্য আবুযার ইসলাম গ্রহণ করেন নি কিংবা নিরাপদে মুসলিম হয়ে থাকার বাহবাও তো আবুযারের জন্য নয়। তাহলে আবুযার চুপ করে থাকবে কেন? এই চিন্তা আবুযারকে চুপ থাকতে দিল না,
স্থির হতে দিল না। হযরত আবুযার বিনীতভাবে মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছে নিবেদন করলেন, “তাওহীদের মহাবাণী আমি গোপন রাখতে পারবো না, কাফিরদের মধ্যে গিয়ে চেঁচিয়ে তা ঘোষণা করবো।”
যে আবুযার কাফিরদের ভয়ে মক্কায় মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নাম পর্যন্ত নিতে সাহস করেন নি, সকলের চোখ এড়িয়ে গোপনে তিনদিন ধরে যে আবুযার মহানবীকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খুঁজে ফিরেছেন কালেমা তাওহীদ উচ্চারণের পর সেই আবুযার সমস্ত ভয়-ভীতি, অত্যাচার এমন কি মৃত্যু ভয়ের আশঙ্কাকেও জয় করে নিলেন। কিছুই আর তাঁকে পিছনে টানতে পারলো না। মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছ থেকে হযরত আবুযার ছুটে এলেন কাবার চত্বরে। সেখানে অনেক কুরাইশ জটলা পাকিয়ে বসেছিলো। আবুযার কাবা গৃহের সামনে গিয়ে বজ্র নির্ঘোষে ঘোষণা করলেন, “আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর রাসূল।
হযরত আবুযারের তাওহীদি ঘোষণা বোধ হয় কুরাইশদের হৃদয়ে তীরের মত বিদ্ধ হয়েছিলো। তারা আহত হিংস্র পশুর মত ছুটে এলো আবুযারকে লক্ষ্য করে। সবাই মিলে চারদিক থেকে নির্মম প্রহার শুরু করলো তাঁর উপর। আঘাতে আঘাতে আবুযারের দেহ ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেল। রক্তে ভিজে গেল কাপড়-চোপড়। ঢলে পড়লেন মাটিতে। তিনি মুমূর্ষ।
সেখানে হযরত আব্বাস উপস্থিত ছিলেন। তিনি তখনও মুসলিম না হলেও ভ্রাতুষ্পুত্র মুহাম্মাদকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অত্যন্ত ভালবাসতেন। তিনি মুমূর্ষ আবুযারের দেহকে নিজের দেহ দিয়ে আড়াল করে উন্মাদ প্রায় কুরাইশদের বলতে লাগলেন, “কি সর্বনাশ! এ যে গিফার গোত্রের লোক। সিরিয়া যাবার পথেই এদের নিবাস। এর এভাবে মৃত্যু হলে সিরিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্য করার পথই যে আমাদের বন্ধ হয়ে যাবে।” একথা শুনে কুরাইশদের সম্বিত ফিরে এলো। তাদের মনে হলো, আব্বাস তো ঠিক কথাই বলেছেন। তারা আবুযারকে ছেড়ে দিয়ে সরে দাঁড়ালো।
এ অমানুষিক নিপীড়ন হযরত আবুযারকে সত্যের প্রচার থেকে বিরত রাখতে পারে নি। এই ঘটনার পরও তিনি পর পর দু'দিন কাবার চত্বরে গিয়ে উচ্চ কণ্ঠে তাওহীদের বাণী ঘোষণা করেছেন। অত্যাচার-নিপীড়নেরও পুনরাবৃত্তি হয়েছে। কিন্তু আবুযার সত্যের জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সব কিছুকেই মেনে নিয়েছেন হাসি মুখে। অদ্ভুত শক্তি তাওহীদের। মনে-প্রাণে একবার এ কলেমা পাঠ করলে মানুষের মনে যে শক্তির বন্যা আসে, তার সামনে থেকে জগতের সব অত্যাচার, সব যুল্ম আর তার ভয় তৃণ খণ্ডের মতো ভেসে যায়।
📄 আমি ঠকিনি বন্ধু
মক্কার ধনী উমাইয়া। ধনে-মানে সব দিক দিয়েই কুরাইশদের একজন প্রধান ব্যক্তি সে। প্রাচুর্যের যেমন তার শেষ নেই, ইসলাম বিদ্বেষেও তার কোন জুড়ি নেই। শিশু ইসলামকে ধ্বংসের কোন 'চেষ্টারই সে ত্রুটি করে না। এই ঘোরতর ইসলাম বৈরী উমাইয়ারই একজন ক্রীতদাস ইসলাম গ্রহণ করেছে। তা জানতে পারলো উমাইয়া। জানতে পেরে ক্রোধে ফেটে পড়লো সে। অকথ্য নির্যাতন সে শুরু করলো। প্রহারে জর্জরিত সংজ্ঞাহীন-প্রায় কৃতদাসকে সে নির্দেশ দেয়, “এখনও বলি, মুহাম্মদের ধর্ম ত্যাগ কর। নতুবা তোর রক্ষা নেই।”
কিন্তু তার ক্রীতদাস বিশ্বাসে অটল। শত নির্যাতন করেও তার বিশ্বাসে বিন্দু মাত্র ফাটল ধরানো গেল না। ক্রোধে উন্মাদ হয়ে পড়লো উমাইয়া। শাস্তির আরো কঠোরতর পথ অনুসরণ করল সে।
একদিনের ঘটনা। আরব মরুভূমির মধ্যাহ্ন। আগুনের মত রোদ নামছে আকাশ থেকে। মরুভূমির বালু যেন টগবগিয়ে ফুটছে। উমাইয়া তার ক্রীতদাসকে নির্দয়ভাবে প্রহার করলো। তারপর তাঁকে সূর্যমুখী করে শুইয়ে দেয়া হলো। ভারি পাথর চাপিয়ে দেয়া হলো বুকে। কৃতদাসের মুখে কোন অনুনয়-বিনয় নেই। মনে নেই কোন শংকা। চোথে অশ্রু নেই, মুখে কোন আর্তনাদও নেই। ঊর্ধ্বমুখী তাঁর প্রসন্ন মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে আল্লাহর প্রশংসা ধ্বনি- 'আহাদ', 'আহাদ'।
ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন হযরত আবু বকর (রা)। 'আহাদ' 'আহাদ' শব্দ তাঁর কানে গেল। অনুসন্ধিৎসু হয়ে শব্দ লক্ষ্যে তিনি মরুভূমির বুকে শায়িত ক্রীতদাসের সমীপবর্তী হলেন। উমাইয়াকে দেখে তিনি সব ব্যাপারটাই মনে মনে বুঝে নিলেন। বললেন, "উমাইয়া, আপনাকে তো ধনী ও বিবেচক লোক বলেই জানতাম। কিন্তু আজ প্রমাণ পেলাম, আমার ধারণা ঠিক নয়। দাসটি যদি এতই না পসন্দ, তাকে বিক্রি করে দিলেই পারেন। এমন নির্দয় আচরণ কি মানুষের কাজ।”
হযরত আবু বকরের ঔষধে কাজ হলো। উমাইয়া বললেন, “এত বাহাদুরী দেখাবেন না। দাস আমার এর উপর সদাচার- কদাচার করবার অধিকার আমারই। তা যদি এতই দয়া লেগে থাকে, তবে একে কিনে নিলেই পারেন।"
হযরত আবু বকর (রা) এই সুযোগেরই অপেক্ষা করছিলেন। তিনি চট করে রাজী হয়ে গেলেন। একজন শ্বেতাংগ ক্রীতদাস ও দশটি স্বর্ণ মুদ্রা দিয়ে কিনে নিলেন কৃষ্ণাংগ ক্রীতদাসকে। হযরত আবু বকর (রা) ক্রীতদাসকে মরুভূমির বুক থেকে টেনে তুলে গা থেকে ধুলো ঝেড়ে দিলেন। উমাইয়া বিদ্রুপের হাসি হেসে বললেন, “কেমন বোকা তুমি বলত? এ অকর্মন্য ভৃত্যটাকে একটি সুবর্ণ মুদ্রার বিনিময়েই বিক্রি করে দিতে চেয়েছিলাম। এখন আমার লাভ ও তোমার ক্ষতি দেখে হাসি সম্বরণ করতে পারছিনা।"
আবু বকরও (রা) হেসে বললেন, “আমি ঠকিনি বন্ধু! এ ক্রীতদাসকে কেনার জন্য আমার সমস্ত সম্পত্তি দিতে হলেও আমি কুণ্ঠিত হতাম না। কিন্তু একে আমি ধারণাতীত সস্তা মূল্যে ক্রয় করে নিয়ে চললাম।"
এ দাসটিই ছিলেন বিশ্ব বিশ্রুত বিলাল। ইসলামের প্রথম মুয়াযযিন হযরত বিলাল (রা)।
📄 যে মৃত্যু বিজয় আনে
আরবের আগুন ঝরা মধ্যাহ্ন। ঊর্ধ্বাকাশ থেকে মরু-সূর্য যেন আগুন বৃষ্টি করছে। মরুর লু' হাওয়া আগুনের দাব-দাহ নিয়ে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে চারদিক। এমনি সময়ে আগুন ঝরা মরুভূমির বুকে নির্যাতন চলছে এক নারীর উপর- সুমাইয়ার উপর। ইসলাম প্রচারের শুরুতেই যাঁরা রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহী ওয়া সাল্লাম) আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন, সুমাইয়া তাঁদের একজন। সুমাইয়ার নারী দেহ ভংগুর, স্পর্শকাতর কিন্তু আত্মা তাঁর অজেয়। বক্ষে তাঁর বিশ্বাস- ঈমানের দুর্জয় শক্তি ও সাহস। সে প্রাণ বহ্নি নির্বাপিত হবার মত নয়।
সুমাইয়ার উপর এ নির্যাতন কেন? কেন তাঁকে এই প্রখর মধ্যাহ্নে সূর্যের বহ্নিতলে ক্রুর নির্যাতন চালানো হচ্ছে?
তাঁর অপরাধ এক আল্লাহকে প্রভু হিসেবে স্বীকার করেছেন, যুগ যুগ ধরে পূজ্য লাত, ওজ্জা- হোবলদের বিরোধীতা করেছেন, তাঁর জীবন-মৃত্যুর সবকিছুই নিবেদন করেছেন আল্লাহর নামে। অমানুষিক নির্যাতনেও সুমাইয়া অচল-অটল। তাঁর দেহ নির্যাতন- নিপিড়নে জর্জরিত হোক, তাঁর কোমল দেহ পুড়ে ছাই হয়ে যাক, তবু অসত্যের কাছে, অত্যাচারের কাছে তাঁর অমর আত্মা কখনো নতি স্বীকার করবে না। এত কষ্ট দিয়েও শত্রুর মন টললো না। ইসলামের শত্রু আবু জাহল সুমাইয়ার অবিচল নিষ্ঠা, অপূর্ব সাহস-সহিষ্ণুতা ও দৃঢ়তা দেখে অস্থির হয়ে তাঁর দিকে বর্শা ছুঁড়ে মারল। বর্শা গিয়ে সুমাইয়ার নিম্নাংগ ভেদ করলো। সুমাইয়ার
দেহ ভূলুণ্ঠিত হয়ে পড়ল। তাঁর মৃত্যুজয়ী আত্মা চলে গেল জান্নাতে। দু'মুঠো মাটির দেহ তাঁর পেছনে পড়ে রইলো। আত্মা তাঁর আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেল।
সুমাইয়ার পবিত্র রক্তে আরবের মাটি রঞ্জিত হলো-সেই রক্তে উত্তপ্ত হলো ভবিষ্যতের শত সহস্র শাহাদাত-আত্মত্যাগের বীজ।
সত্যের জন্য উৎসর্গিত প্রাণ যাঁর, মৃত্যুতে তাঁর কিসের ভয়, কিসের শংকা। সুমাইয়ার কন্যা হযরত উমামার উপরও চলল অকথ্য নির্যাতন। তপ্তবালুর উপর-পাথরের উপর তাঁকে জোর করে শুইয়ে রাখা হতো। উত্তপ্ত মরুর সূর্য প্রখর কিরণে তাকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতো। মধ্যাহ্নে ঘন্টার পর ঘন্টা তাঁকে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো উন্মুক্ত মরুপ্রান্তরে। উষ্ণ লু-হাওয়া তাঁর সর্বাঙ্গ ঝলসে দিত-আত্মা তবু নতি স্বীকার করেনি। অসত্যের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আত্মশক্তি চালিয়েছে তার অবিশ্রান্ত দুঃসাহসী সংগ্রাম-দুঃখ জয়। মৃত্যুজয়ী আত্মা সগৌরবে তুলে ধরেছে- দিকে দিকে মেলে দিয়েছে সত্যের জয় পতাকা।