📄 ভয়ংকর ছোমাযা মহানবীর অতিথি হলো
বনু হানিফা আরবের একটা বিখ্যাত গোত্র। মক্কা ও ইয়েমেনের মধ্যপথ ইয়ামামায় তাদের বাস। একটা অভিযানকালে বনু হানিফার একজন প্রধান ব্যক্তি ছোমামা ইবনে ওছাল মুসলমানদের হাতে বন্দী হলেন।
তাকে আনা হল মদীনায়।
খুব বিপজ্জনক বন্দী ছোমামা।
তাকে মসজিদের একটা থামে বেঁধে রাখা হয়েছে।
খবর পাওয়ার পর মহানবী (সা) তার কাছে এলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, 'ছোমামা, তোমার প্রতি কিরূপ ব্যবহার করা হবে বলে মনে করছ?' ছোমামা উত্তরে বলল, "ভালই মনে করছি। আমি খুনের অপরাধী, আপনি ইচ্ছা করলে আমাকে হত্যা করতে পারেন। তবে আপনার কাছে আমি প্রতিশোধের বদলে ক্ষমা লাভ করার আশা করি। আপনি দেখবেন, আমি কত কৃতজ্ঞ, কত ভদ্র। আর বিনিময় হিসাবে অর্থ গ্রহণ করতে চাইলে বলুন, যা চাইবেন দিতে প্রস্তুত আছি।'
কোন প্রতিশ্রুতি না দিয়ে মহানবী (সা) তাকে নিজের মেহমান হিসাবে গ্রহণ করলেন এবং নিজ বাড়ীতে নিয়ে গেলেন।
রাতে মহানবী (সা) ছোমামাকে খাবার দিলেন। মহানবীর পরিবারের সব খাবার সে একাই শেষ করল।
পরদিন সকালে মহানবী (সা) তাকে বললেন, 'ছোমামা, আমি তোমাকে ক্ষমা করলাম, তুমি এখন মুক্ত।'
মুক্তির এই বার্তা পেয়েই মসজিদের নিকটস্থ ক্ষুদ্র জলাশয়টিতে গোসল করল ছোমামা। তারপর মহানবীর (সা) খেদমতে হাজির হয়ে উচ্চস্বরে কলেমায়ে শাহাদাত পাঠ করে সত্য ধর্মে প্রবেশ করলেন।
কিছুদিন মদীনায় অবস্থানের পর ছোমামা ফিরে গেলেন তাঁর স্বদেশে। তাঁর একক প্রচারেই অল্পকালের মধ্যে বনু হানিফার সকল মানুষ ইসলামে দীক্ষিত হলো।
📄 মহানবীর চির বিদায়ের প্রস্তুতি
একাদশ হিজরী সাল।
বিদায় হজ্ব শেষে মহানবী (সা) মদীনায় ফিরেছেন। ফিরবার পর পৃথিবীর সমস্ত কাজ-কাম সমাধা করার জন্যে মহানবী ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। যেন তিনি কোন মহাযাত্রার আয়োজন শুরু করে দিয়েছেন।
হজ্ব থেকে প্রত্যাবর্তনের পথেই তাঁর প্রিয় সাহাবীদের কবরগাহ্ জান্নাতুল বাকিতে রাতের একটা দীর্ঘ সময় তিনি কাটিয়ে দিয়েছেন। তিনি তাঁর সাহাবীদের জন্যে দোয়া করেছেন এবং তাঁদের কাছে বিদায় নিয়েছেন।
জান্নাতুল বাকি থেকে ফিরে আসার পর সফর মাসের শেষার্ধের প্রথমভাগে মহানবীর মধ্যে পীড়ার সূত্রপাত ঘটলো।
বিখ্যাত সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলছেন, ইন্তিকালের একমাস আগেই হযরত তাঁর মৃত্যু সংবাদ সকলকে জানিয়েছিলেন।
মহানবী (সা) অসুস্থ হয়ে পড়ার পর যেন সেই চির বিদায়ের মহাসময়টাই ঘনিয়ে এলো।
এ সময় একদিন মহানবী (সা) আয়েশা সিদ্দিকা (রা)-এর বাড়ীতে সবাইকে ডাকলেন।
সকলে উপস্থিত হলে মহানবী (সা) বললেন,
"হে লোক সকল, তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহ্ তোমাদের উপর রহম করুন। তাঁর সাহায্য ও শক্তিবলে তোমরা জীবনের কর্মসময়ে জয়যুক্ত ও কল্যাণমণ্ডিত হও। তিনি তোমাদের মহত্ত্ব দান করুন, সৎপথ প্রদর্শন করুন এবং সততা অর্জনের শক্তি দান করুন। তাঁর আশ্রয়ে তোমরা নিরাপদ থাক।
আমি তোমাদেরকে আল্লাহর নামে ধর্মভীরু হবার অছিয়ত করছি। তোমাদেরকে আমি তাঁরই মঙ্গল-হাতে সমর্পণ করে যাচ্ছি। আমি তোমাদেরকে আল্লাহর ন্যায়দণ্ড সম্বন্ধে বিশেষরূপে সতর্ক করে বলছি যে, সাবধান, কোন দেশের কোন জাতির উপর অন্যায় আচরণ করো না, এতে তোমরা তাঁর (আল্লাহর) বিদ্রোহী বলে গণ্য হবে। আল্লাহ আমাকে ও তোমাদেরকে বলছেন, "পরকালের পরম শান্তির নিবাস আমি সে সকল লোকদের জন্য (নির্ধারিত) করব যারা পৃথিবীতে আত্মম্ভরিতা করতে ও বিশৃংখলা সৃষ্টি করতে চায় না। সংযমশীল লোকেরাই পরিণামে কল্যাণ লাভ করে থাকে।" তোমরা ভবিষ্যতে যেসব বিজয় লাভ করবে তা আমি দেখতে পাচ্ছি। তোমরা আমার পর মুশরিক হয়ে যাবে, সে আশংকাও আমার নেই। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে, আমার পর তোমরা ধন-সম্পদের মায়ামোহে মুগ্ধ না হয়ে পড়, এ নিয়ে তোমরা পরস্পর রক্তপাত ঘটাতে প্রবৃত্ত না হও এবং সে অপকর্মের অবশ্যম্ভাবী প্রতিফলস্বরূপ পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ন্যায় তোমরা বিধ্বস্ত হয়ে না যাও।
তোমরা আমার অনুপস্থিত সাহাবীদের আমার সালাম পৌঁছে দেবে। আর আজ থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যারা আমার প্রচারিত দ্বীনের অনুসরণ করবে, তোমাদের মাধ্যমে তাদের প্রতিও আমার সালাম অনন্ত-অফুরন্ত দোয়া।"
📄 মহানবীর এক গল্পে আবু বকর (রা) কাঁদলেন
মহানবীর (সা) চির বিদায়ের পাঁচ দিন আগের কথা। সেদিন মহানবীর (সা) পীড়ার তীব্রতা খুবই বৃদ্ধি পেল। রোগ-যন্ত্রণায় তিনি অস্থির।
কিন্তু এর মধ্যেও তিনি তাঁর শেষ কথাগুলো মানুষকে জানাবার জন্য ব্যস্ত। তিনি সেখানে উপস্থিত মুসলিম নর-নারীদের উদ্দেশ্য করে বললেন,
"তোমাদের আগের জাতিগুলো তাদের পরলোকগত নবী ও বুজুর্গদের কবরগুলোকে উপাসনালয়ে পরিণত করেছে। সাবধান! তোমরা যেন এই মহাপাপে নিজেদের লিপ্ত করো না। খৃস্টান ও ইহুদীরা এই পাপে অভিশপ্ত হয়েছে। দেখ, আমি নিষেধ করছি আমি আমার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। আমি তোমাদেরকে সুস্পষ্টভাবে নিষেধ করে যাচ্ছি, সাবধান আমার কবরকে সিজদাগাহ বানাবে না। আমার এই চরম অনুরোধ অমান্য করলে তজ্জন্য তোমরাই আল্লাহর নিকট দায়ী হবে। হে আল্লাহ, আমার কবরকে 'পূজাস্থলে' পরিণত করতে দিও না।"
আর একদিনের কথা।
অসুস্থ মহানবী (সা) মসজিদের মিম্বরে আরোহণ করলেন। সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, "আল্লাহ তাঁর একজন দাসকে দুনিয়ার সমস্ত সম্পদ দান করলেন। কিন্তু সে দাস তা গ্রহণ না করে আল্লাহকে গ্রহণ করলো।"
এই কথা শ্রবণ করে আবুবকর (রা) কাঁদতে শুরু করলেন।
আবুবকর (রা)-এর কান্না দেখে অনেকে বলাবলি করতে লাগল, বৃদ্ধের হঠাৎ আজ কি হলো! আল্লাহর নবী একজন লোকের গল্প বলছেন, আর উনি কেঁদে আকুল হচ্ছেন!
এ যে ছিল মহানবীর আশু বিদায়ের ইঙ্গিত, তা অনেকেই বুঝতে পারেননি।
📄 ‘এই শেষ ভ্রাতৃবর্গ, এই শেষ’
সেদিন মহানবী (সা)-এর পীড়ার ১১তম দিন।
অসুস্থতা সত্ত্বেও এতদিন মহানবী (সা) মসজিদে নববীর নামাযের জামায়াতে নিজেই ইমামতি করে এসেছিলেন। আজকেও তিনি উঠেছেন নামাযের জন্যে। ওজু করতে লাগলেন।
মাথা ঘুরতে লাগল তাঁর।
পরপর তিনবার চেষ্টা করেও তিনি পারলেন না ওজু করতে।
ক'দিন ধরে তাঁর ব্যাধির তীব্রতা ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছিল। খাইবারের সেই ইহুদীনির খাওয়ানো বিষের জ্বালাও মারাত্মক হয়ে উঠেছিল। আজ অবশেষে তিনি পারছেন না সাহাবীদের সাথে নামাযে শরিক হতে।
জামায়াতে উপস্থিত সাহাবীদের তিনি বলে পাঠালেন, 'আবু বকরকে নামাযে ইমামতি করতে বলো।'
আবু বকরকে নবীর স্থানে ইমামতিতে দাঁড়াতে দেখে সাহাবীরা ধৈর্য আর রাখতে পারলেন না। কান্নায় আকুল হলেন সবাই।
এর মধ্যেই ধৈর্যের মহাপ্রতীক আবু বকর (রা) নামাযের ইমামতি শুরু করে দিলেন। এ সময় মহানবী (সা) একটু আরামবোধ করলেন।
সঙ্গে সঙ্গেই তিনি দু'জন আত্মীয়ের কাঁধে ভর দিয়ে মসজিদে এলেন।
আবু বকরের ইমামতিতে তখন নামায চলছিল।
মহানবী (সা)-কে জায়গা ছেড়ে দেবার জন্যে সরে দাঁড়াচ্ছিলেন আবু বকর (রা)। মহানবী (সা) তাঁকে নিষেধ করলেন এবং মহানবী (সা) আবু বকরের পাশে বসে নামায পড়লেন।
নামাযের পর মহানবী (সা) ফিরে বসে সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বললেন, 'হে মুসলিমগণ, আমি তোমাদেরকে আল্লাহর হাতে সমর্পণ করে যাচ্ছি। তাঁর আশ্রয় ও তাঁর সাহায্যের কাছে তোমাদের সঁপে দিচ্ছি। আল্লাহই তোমাদের রক্ষা করবেন। তোমরা নিষ্ঠা, ভক্তি ও সততার সাথে তাঁর আদেশ পালন করতে থেকো। তাহলে তিনি তোমাদের রক্ষা করবেন। এই শেষ ভ্রাতৃবর্গ, এই শেষ।'