📘 আমরা সেই জাতি > 📄 ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরা আপনাকে চাই’

📄 ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরা আপনাকে চাই’


হুনাইন যুদ্ধের 'মালে গণিমত' (যুদ্ধলব্ধ ধন-সম্পদ) বণ্টন করলেন মহানবী (সা)।
যুদ্ধলব্ধ সব সম্পদই তিনি বণ্টন করলেন ইসলামে নবদীক্ষিত কুরাইশদের মধ্যে। মদীনার আনসাররা কিছুই পেল না।
মদীনার মুনাফিকরা একে একটা মহা সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করল। মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টায় লেগে গেল তারা।
তাদের কুমন্ত্রণায় কতিপয় অদূরদর্শী আনসার যুবক প্রভাবিত হয়ে পড়ল। তারা প্রকাশ্যেই অসন্তোষ প্রকাশ করতে লাগল। অনেক আনসারের মধ্যে এ ভাবনারও সৃষ্টি হলো যে, মহানবী (সা) এবার হয়তো স্বদেশ মক্কাতেই অবস্থান করবেন এবং আমরা তাঁর সেবা করার সুযোগ পাব না।
এসব কথা আনসারদের মধ্যে ব্যাপকভাবে কানাঘুষা হতে লাগল।
বিষয়টা মহানবী (সা) জানতে পারলেন। সকল আনসারকে ডাকলেন তিনি। আনসারদের এ সভায় তিনি প্রশ্ন করলেন, যা তিনি শুনেছেন তা সত্য কিনা? আনসার প্রধানগণ খুবই লজ্জিত ও বিব্রত হলেন। বিনীত কণ্ঠে বললেন তারা, আমাদের দু'একজন যুবকমাত্র এ ধরনের কথা বলেছে, একথা সত্য। সবার একথা নয়।
তাদের কথা শুনার পর মহানবী (সা) গণিমতের মাল বণ্টন বিষয়ে বললেন, 'কুরাইশরা নবদীক্ষিত, বিশেষত তারা যুদ্ধ-বিগ্রহের ফলে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের ক্ষতিপূরণ করে সন্তুষ্ট করার জন্যেই এ ব্যবস্থা আমি করেছিলাম। আর যারা যা প্রত্যাশা করে, তারা তাইতো পায়।' বলে মহানবী (সা) আনসারদের উদ্দেশ্য করে বললেন, আমি তোমাদের জিজ্ঞাসা করছি, তোমরা কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, লোকেরা ছাগল-ভেড়া নিয়ে বাড়ী যাচ্ছে, আর তোমরা রাসূলকে সাথে নিয়ে বাড়ী ফিরছ?'
আনসাররা সানুনয়ে ও ভক্তিগদগদ কণ্ঠে নিবেদন করলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরা আপনাকে চাই। আপনাকে পেয়ে, আপনাকে সেবা করেই আমরা পরিতৃপ্ত ও কৃতার্থ হয়েছি। আমরা যেন এই পরম সম্পদ থেকে বঞ্চিত না হই।'
মহানবী (সা) বললেন, 'জীবনে-মরণে কখনই আনসারদের সাথে তাঁর বিচ্ছেদ হবে না।'

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 ভয়ংকর ছোমাযা মহানবীর অতিথি হলো

📄 ভয়ংকর ছোমাযা মহানবীর অতিথি হলো


বনু হানিফা আরবের একটা বিখ্যাত গোত্র। মক্কা ও ইয়েমেনের মধ্যপথ ইয়ামামায় তাদের বাস। একটা অভিযানকালে বনু হানিফার একজন প্রধান ব্যক্তি ছোমামা ইবনে ওছাল মুসলমানদের হাতে বন্দী হলেন।
তাকে আনা হল মদীনায়।
খুব বিপজ্জনক বন্দী ছোমামা।
তাকে মসজিদের একটা থামে বেঁধে রাখা হয়েছে।
খবর পাওয়ার পর মহানবী (সা) তার কাছে এলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, 'ছোমামা, তোমার প্রতি কিরূপ ব্যবহার করা হবে বলে মনে করছ?' ছোমামা উত্তরে বলল, "ভালই মনে করছি। আমি খুনের অপরাধী, আপনি ইচ্ছা করলে আমাকে হত্যা করতে পারেন। তবে আপনার কাছে আমি প্রতিশোধের বদলে ক্ষমা লাভ করার আশা করি। আপনি দেখবেন, আমি কত কৃতজ্ঞ, কত ভদ্র। আর বিনিময় হিসাবে অর্থ গ্রহণ করতে চাইলে বলুন, যা চাইবেন দিতে প্রস্তুত আছি।'
কোন প্রতিশ্রুতি না দিয়ে মহানবী (সা) তাকে নিজের মেহমান হিসাবে গ্রহণ করলেন এবং নিজ বাড়ীতে নিয়ে গেলেন।
রাতে মহানবী (সা) ছোমামাকে খাবার দিলেন। মহানবীর পরিবারের সব খাবার সে একাই শেষ করল।
পরদিন সকালে মহানবী (সা) তাকে বললেন, 'ছোমামা, আমি তোমাকে ক্ষমা করলাম, তুমি এখন মুক্ত।'
মুক্তির এই বার্তা পেয়েই মসজিদের নিকটস্থ ক্ষুদ্র জলাশয়টিতে গোসল করল ছোমামা। তারপর মহানবীর (সা) খেদমতে হাজির হয়ে উচ্চস্বরে কলেমায়ে শাহাদাত পাঠ করে সত্য ধর্মে প্রবেশ করলেন।
কিছুদিন মদীনায় অবস্থানের পর ছোমামা ফিরে গেলেন তাঁর স্বদেশে। তাঁর একক প্রচারেই অল্পকালের মধ্যে বনু হানিফার সকল মানুষ ইসলামে দীক্ষিত হলো।

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 মহানবীর চির বিদায়ের প্রস্তুতি

📄 মহানবীর চির বিদায়ের প্রস্তুতি


একাদশ হিজরী সাল।
বিদায় হজ্ব শেষে মহানবী (সা) মদীনায় ফিরেছেন। ফিরবার পর পৃথিবীর সমস্ত কাজ-কাম সমাধা করার জন্যে মহানবী ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। যেন তিনি কোন মহাযাত্রার আয়োজন শুরু করে দিয়েছেন।
হজ্ব থেকে প্রত্যাবর্তনের পথেই তাঁর প্রিয় সাহাবীদের কবরগাহ্ জান্নাতুল বাকিতে রাতের একটা দীর্ঘ সময় তিনি কাটিয়ে দিয়েছেন। তিনি তাঁর সাহাবীদের জন্যে দোয়া করেছেন এবং তাঁদের কাছে বিদায় নিয়েছেন।
জান্নাতুল বাকি থেকে ফিরে আসার পর সফর মাসের শেষার্ধের প্রথমভাগে মহানবীর মধ্যে পীড়ার সূত্রপাত ঘটলো।
বিখ্যাত সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলছেন, ইন্তিকালের একমাস আগেই হযরত তাঁর মৃত্যু সংবাদ সকলকে জানিয়েছিলেন।
মহানবী (সা) অসুস্থ হয়ে পড়ার পর যেন সেই চির বিদায়ের মহাসময়টাই ঘনিয়ে এলো।
এ সময় একদিন মহানবী (সা) আয়েশা সিদ্দিকা (রা)-এর বাড়ীতে সবাইকে ডাকলেন।
সকলে উপস্থিত হলে মহানবী (সা) বললেন,
"হে লোক সকল, তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহ্ তোমাদের উপর রহম করুন। তাঁর সাহায্য ও শক্তিবলে তোমরা জীবনের কর্মসময়ে জয়যুক্ত ও কল্যাণমণ্ডিত হও। তিনি তোমাদের মহত্ত্ব দান করুন, সৎপথ প্রদর্শন করুন এবং সততা অর্জনের শক্তি দান করুন। তাঁর আশ্রয়ে তোমরা নিরাপদ থাক।
আমি তোমাদেরকে আল্লাহর নামে ধর্মভীরু হবার অছিয়ত করছি। তোমাদেরকে আমি তাঁরই মঙ্গল-হাতে সমর্পণ করে যাচ্ছি। আমি তোমাদেরকে আল্লাহর ন্যায়দণ্ড সম্বন্ধে বিশেষরূপে সতর্ক করে বলছি যে, সাবধান, কোন দেশের কোন জাতির উপর অন্যায় আচরণ করো না, এতে তোমরা তাঁর (আল্লাহর) বিদ্রোহী বলে গণ্য হবে। আল্লাহ আমাকে ও তোমাদেরকে বলছেন, "পরকালের পরম শান্তির নিবাস আমি সে সকল লোকদের জন্য (নির্ধারিত) করব যারা পৃথিবীতে আত্মম্ভরিতা করতে ও বিশৃংখলা সৃষ্টি করতে চায় না। সংযমশীল লোকেরাই পরিণামে কল্যাণ লাভ করে থাকে।" তোমরা ভবিষ্যতে যেসব বিজয় লাভ করবে তা আমি দেখতে পাচ্ছি। তোমরা আমার পর মুশরিক হয়ে যাবে, সে আশংকাও আমার নেই। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে, আমার পর তোমরা ধন-সম্পদের মায়ামোহে মুগ্ধ না হয়ে পড়, এ নিয়ে তোমরা পরস্পর রক্তপাত ঘটাতে প্রবৃত্ত না হও এবং সে অপকর্মের অবশ্যম্ভাবী প্রতিফলস্বরূপ পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ন্যায় তোমরা বিধ্বস্ত হয়ে না যাও।
তোমরা আমার অনুপস্থিত সাহাবীদের আমার সালাম পৌঁছে দেবে। আর আজ থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যারা আমার প্রচারিত দ্বীনের অনুসরণ করবে, তোমাদের মাধ্যমে তাদের প্রতিও আমার সালাম অনন্ত-অফুরন্ত দোয়া।"

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 মহানবীর এক গল্পে আবু বকর (রা) কাঁদলেন

📄 মহানবীর এক গল্পে আবু বকর (রা) কাঁদলেন


মহানবীর (সা) চির বিদায়ের পাঁচ দিন আগের কথা। সেদিন মহানবীর (সা) পীড়ার তীব্রতা খুবই বৃদ্ধি পেল। রোগ-যন্ত্রণায় তিনি অস্থির।
কিন্তু এর মধ্যেও তিনি তাঁর শেষ কথাগুলো মানুষকে জানাবার জন্য ব্যস্ত। তিনি সেখানে উপস্থিত মুসলিম নর-নারীদের উদ্দেশ্য করে বললেন,
"তোমাদের আগের জাতিগুলো তাদের পরলোকগত নবী ও বুজুর্গদের কবরগুলোকে উপাসনালয়ে পরিণত করেছে। সাবধান! তোমরা যেন এই মহাপাপে নিজেদের লিপ্ত করো না। খৃস্টান ও ইহুদীরা এই পাপে অভিশপ্ত হয়েছে। দেখ, আমি নিষেধ করছি আমি আমার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। আমি তোমাদেরকে সুস্পষ্টভাবে নিষেধ করে যাচ্ছি, সাবধান আমার কবরকে সিজদাগাহ বানাবে না। আমার এই চরম অনুরোধ অমান্য করলে তজ্জন্য তোমরাই আল্লাহর নিকট দায়ী হবে। হে আল্লাহ, আমার কবরকে 'পূজাস্থলে' পরিণত করতে দিও না।"
আর একদিনের কথা।
অসুস্থ মহানবী (সা) মসজিদের মিম্বরে আরোহণ করলেন। সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, "আল্লাহ তাঁর একজন দাসকে দুনিয়ার সমস্ত সম্পদ দান করলেন। কিন্তু সে দাস তা গ্রহণ না করে আল্লাহকে গ্রহণ করলো।"
এই কথা শ্রবণ করে আবুবকর (রা) কাঁদতে শুরু করলেন।
আবুবকর (রা)-এর কান্না দেখে অনেকে বলাবলি করতে লাগল, বৃদ্ধের হঠাৎ আজ কি হলো! আল্লাহর নবী একজন লোকের গল্প বলছেন, আর উনি কেঁদে আকুল হচ্ছেন!
এ যে ছিল মহানবীর আশু বিদায়ের ইঙ্গিত, তা অনেকেই বুঝতে পারেননি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00