📘 আমরা সেই জাতি > 📄 নববী এক মোজেজা

📄 নববী এক মোজেজা


রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস, আবিসিনিয়ার সম্রাট নাজ্জাসীর কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর পর পারস্যের সম্রাট খসরু পারভেজের দরবারে চিঠি দিয়ে দূত প্রেরণ করলেন মহানবী (সা)।
মহানবীর চিঠি কোন সম্রাটের দরবারে যে অমর্যাদার শিকার হয়নি, সেটাই ঘটল পারস্যে। সম্রাট খসরু চিঠি পেয়ে ক্রোধে জ্বলে উঠলেন এবং চিঠি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেললেন। শুধু তাই নয়, ইয়ামেনে তাঁর শাসনকর্তাকে লিখে পাঠালেন, চিঠি পাওয়া মাত্র মদীনায় গিয়ে মুহাম্মাদকে গ্রেফতার করে পারস্য সম্রাটের দরবারে পাঠানো হোক।
চিঠি পেয়ে ইয়ামেনের শাসনকর্তা 'বাজান' গ্রেফতারী পরওয়ানা ও উপযুক্ত সৈন্যসহ দু'জন রাজ-কর্মচারীকে মদীনা পাঠালেন।
রাজকর্মচারীদ্বয় যথাসময়ে মদীনায় মহানবীর দরবারে পৌঁছলেন। গ্রেফতারী পরওয়ানা দেখিয়ে তাদের একজন মহানবীকে বললেন, স্বেচ্ছায় ত্বরিত হাজির হলে গভর্নর সাহেব তার পক্ষে ভাল সুপারিশ করতে পারেন। মহানবী (সা) তাদের সাথে কিছু কথাবার্তা বলে তাদেরকে পরদিন সকালে আসতে বললেন।
পরদিন সকালে ওরা এলেন।
মহানবী ওদের বললেন, 'খসরু পারভেজ নিহত। তাঁর ছেলে শেরওয়াহ তাকে হত্যা করে সিংহাসন দখল করেছে। যাও, তোমরা ফিরে গিয়ে 'বাজান'-কে এই সংবাদ দাও। নিশ্চয় জেন, ইসলাম শীঘ্রই খসরু পারভেজের সিংহাসনের উপর অধিকার বিস্তার করবে। আর 'বাজান'-কে বলো, সে ইসলাম গ্রহণ করলে তাকে তার পদে বহাল রাখব।
রাজকর্মচারীদ্বয় এই অবিশ্বাস্য সংবাদ শুনে স্তম্ভিত ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ছুটল ইয়ামেনে তাদের শাসনকর্তা 'বাজান'-এর কাছে।
ইয়ামেনের শাসনকর্তা 'বাজান' তাঁর কর্মচারীর কাছে সবশুনে উদ্বেগ ও বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বলল, এমন স্পষ্ট অনাবিল ভবিষ্যদ্বাণী তো বাইবেলে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। এ ভবিষ্যদ্বাণী যদি সত্য হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে বুঝব যে, মুহাম্মাদ যথার্থই আল্লাহর নবী। ঠিক আছে কয়দিন অপেক্ষা করা যাক, পারস্য থেকে কোন খবর আসে কিনা।
খুব শীঘ্রই 'বাজান'-এর উন্মুখ অপেক্ষার অবসান ঘটল। 'বাজান'-এর কাছে পারস্যের নতুন সম্রাট শেরওয়াহের ফরমান এল। যাতে বলা হলো- 'খসরুকে তার অন্যায় আচরণের জন্যে হত্যা করে আমি সিংহাসনে অধিপতি হয়েছি। ইয়ামেনবাসীকে আমার আনুগত্য স্বীকারে বাধ্য করবে। আর মক্কার সেই ব্যক্তি সম্পর্কে আমার দ্বিতীয় আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত কিছু করবে না।'
ফরমান পড়ার পর আর কালবিলম্ব না করে ইয়ামেনের শাসনকর্তা 'বাজান' ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং অল্পকাল পরেই ছুটলেন মদীনায় মহানবীর মহাদর্শন লাভের আকুল বাসনায়। কিন্তু তাঁর বাসনা অতৃপ্তই রয়ে গেল। পথিমধ্যে তিনি শহীদ হলেন গুপ্ত ঘাতকের হাতে।

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 প্রথম দিগ্বিজয়ী বাহিনীর প্রতি মহানবী

📄 প্রথম দিগ্বিজয়ী বাহিনীর প্রতি মহানবী


বাসরার রাজার কাছে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে দূত উমাইর ইবনে হারেসকে প্রেরণ করেন মহানবী (সা)।
পথে 'মুতা' নামক স্থানে একজন খৃস্টান আঞ্চলিক শাসনকর্তা শুরাহবিল উমাইরকে বন্দী করে তাকে হাত-পা কেটে অশেষ কষ্ট দিয়ে হত্যা করল। শুধু 'দূত' হত্যাই নয়, সে লক্ষাধিক সৈন্য যোগাড় করে মদীনা আক্রমণের দুরভিসন্ধি আঁটতে লাগল। রোম সম্রাটের কাছ থেকেও আশু সাহায্যের ঘোষণা সে পেয়ে গেল।
'দূত' হত্যার খবর এবং খৃস্টানদের সমরায়োজনের কথা মহানবীর কাছে পৌঁছলে মহানবী (সা) সঙ্গে সঙ্গেই তিন হাজার সৈন্যের একটা বাহিনী মুতায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।
এই বাহিনীর সেনাপতির দায়িত্ব দিলেন যায়েদ ইবনে হারেসাকে। তিনি বলে দিলেন, যায়েদ নিহত হলে আলীর ভাই বীরবর জাফর সেনাপতি হবেন। আর জাফর নিহত হলে সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করবেন আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা। মহানবীর আশংকা শুধু আশংকা নয়, এক দেদীপ্যমান সত্য। সুতরাং বাহিনীটি যে কি ভয়াবহ এক যুদ্ধের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে তা আঁচ করা বাকী রইল না মহানবীর কথা থেকে।
তাই বোধ হয় মদীনার অধিবাসীরা এই যুদ্ধযাত্রাকে খুবই গুরুত্ব দিল। সেনাদলের যাত্রার সময় মহানবী (সা) স্বয়ং এবং মদীনার অধিবাসী মুসলমানরা মদীনার বাইরে 'বিদা উপত্যকা' পর্যন্ত বাহিনীটির সাথে সাথে হেঁটে এল।
বিদায়ের প্রাক্কালে মহানবী (সা) মুসলিম বাহিনী যাতে কোন অবস্থাতেই নীতিভ্রষ্ট না হয়, কোন বাড়াবাড়ির আশ্রয় যাতে না নেয়, আল্লাহর উপর ভয় ও ভরসাকেই যাতে সর্বাবস্থায় পাথেয় মনে করে, সে জন্যে বিদায়ী উপদেশ হিসেবে বললেন: 'আমি তোমাদেরকে সর্বদা আল্লাহকে ভয় করে চলবার উপদেশ দিচ্ছি। প্রত্যেক সহচর মুসলমানের সাথে সদ্ব্যবহার করার উপদেশ দান করছি। আল্লাহর নামে যুদ্ধযাত্রা কর এবং সিরিয়ায় তোমাদের ও আল্লাহর শত্রুদের মুকাবিলা কর।
তোমরা যে দেশে যাচ্ছ সেখানকার মাঠে সাধু-সন্ন্যাসীদেরকে নিভৃত সাধনায় মগ্ন থাকতে দেখবে। সাবধান! তাদের কাজে কোন প্রকার বিঘ্ন সৃষ্টি করবে না। সাবধান! একটি স্ত্রীলোক, একটি বালক বা বালিকা, একজন বৃদ্ধও যেন কোনক্রমে তোমাদের হাতে নিহত না হয়। সাবধান! শত্রুপক্ষের একটি বৃক্ষও ছেদন করবে না, একটি বাড়ীও নষ্ট করবে না।'
এই প্রথমবারের মত মুসলিমরা আরব ভূখণ্ডের বাইরে যুদ্ধযাত্রা করছে। যাদের বিরুদ্ধে তাদের এই যুদ্ধযাত্রা তারা সংখ্যা ও সজ্জায় অনেক বড়। কিন্তু তবু সৈনিকরা বুঝল, যথেচ্ছা চলার এক ইঞ্চি সুযোগও তাদের থাকল না। আর আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সাহায্য লাভের এই তো উপায়!

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 মহানবীর চিঠি পড়ে কেঁদে ফেললেন মানজার

📄 মহানবীর চিঠি পড়ে কেঁদে ফেললেন মানজার


আরব উপদ্বীপের পূর্ব উপকূলে পারস্য উপসাগরের পানির উপর দাঁড়ানো বাহরাইন।
বাহরাইনের শাসক তখন মানজার ইবনে ছাভী।
ইসলামের দাওয়াত নিয়ে মহানবী (সা)-এর একটা চিঠি তাঁর কাছে পৌঁছল।
ইসলামের উত্থান ও এর গতিধারা সম্পর্কে আগে থেকেই খবর রাখছিলেন তিনি। ইয়ামেনের শাসনকর্তা 'বাজান'-এর খবরও তাঁর কাছে ছিল। পারস্য সম্রাট মহানবী (সা)-কে ধরতে পাঠিয়ে নিজেই ধরাধাম থেকে বিদায় নিলেন, তাও তিনি জানতেন।
মহানবীর চিঠি পেয়ে মানজার সঙ্গে সঙ্গেই ইসলাম গ্রহণ করলেন। বাহরাইনের আরব বাসিন্দারাও তাঁর সাথে সাথে ইসলাম গ্রহণ করলো।
কিন্তু রাজ্যের ইহুদী ও অগ্নিপূজকরা ইসলাম গ্রহণ করলো না।
বাহরাইনের শাসক মানজার ইবনে ছাভী একে ভালোভাবে নিলেন না। শাসক যাকে ভালো মনে করলেন, প্রজা তাকে ভালো মনে করলো না। এটা সেই যুগের শাসকদের হজম করা কঠিন ছিল। মানজারও কিছু প্রজার এই ঔদ্ধত্য হজম করতে পারলেন না। তবে মহানবীর হুকুম ছাড়া কিছু না করার সিদ্ধান্ত তিনি নিলেন।
প্রয়োজনীয় নির্দেশ লাভের জন্যে মানজার লিখলেন মহানবীর (সা) কাছে।
মানজারের সিদ্ধান্ত এবং মহানবীর কাছে তাঁর লিখার বিষয়টা ইহুদী ও অগ্নিপূজকরা জানতে পারলো। তারা উদ্বিগ্ন হলো তাদের ভবিষ্যত নিয়ে।
যথাসময়ে মহানবী (সা)-এর চিঠি এলো মানজারের কাছে। অত্যন্ত আদবের সাথে চিঠি খুলে পড়তে লাগলেন তিনি
"ধর্ম সম্বন্ধে কোন জোর-জবরদস্তি করা অধর্ম। যে ব্যক্তি উপদেশ গ্রহণ করে, সে তো কেবল নিজেরই কল্যাণ সাধন করে থাকে। যারা ইহুদী বা পারসিক ধর্মে থাকতে চায়, তাদেরকে যিজিয়া দিতে হবে মাত্র। এর অতিরিক্ত অন্য কোন বিষয়ে তাদের উপর তোমার আর কোন অধিকার থাকবে না।"
চিঠি পড়ে মহানবী (সা)-এর দয়া ও মহানুভবতায় কেঁদে ফেললেন মানজার। কত বড় দয়ার সাগর তিনি? বিধর্মী প্রজাদের পক্ষ হয়ে মানজারকেই তিনি শাসন করেছেন।
এই খবর ইহুদী এবং অগ্নিপূজক প্রজাদেরকেও অভিভূত করলো। এতদিন তারা পারস্য সম্রাট ও তাদের কর্মচারীদের অমানুষিক অত্যাচারে একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। এক যিজিয়ার বিনিময়ে সব কর ও যুলুম থেকে রেহাই পেয়ে তারা মহানবী (সা)-এর নামে সকলে জয়ধ্বনি করতে লাগলো। ইসলাম গ্রহণের হার তাদের মধ্যে দ্রুত বেড়ে চললো।

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 মহানবী আবারও অভয় দিলেন

📄 মহানবী আবারও অভয় দিলেন


রাহমাতুল্লিল আলামীন মহানবী (সা) রক্তপাত চান না। মক্কা প্রবেশেও তিনি রক্তপাত এড়াতে চাইলেন।
এ লক্ষ্যেই তিনি একটা পাহাড়ের শীর্ষে বসে চারদিকে নজর রাখলেন কোথায় কি ঘটে তা দেখার জন্যে।
হঠাৎ মক্কার এক উপত্যকা-পথে সকালের রোদে উত্তোলিত তরবারির ঝিলিক দেখতে পেলেন মহানবী (সা)। ঐ উপত্যকা পথে হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনীর একটা দল মক্কায় প্রবেশ করছে। মহানবী (সা) উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন।
সঙ্গে সঙ্গেই তিনি খালিদকে হাজির করার নির্দেশ দিলেন কৈফিয়ত দেয়ার জন্যে।
খালিদ হাজির হলেন। নিবেদন করলেন বিনীতিভাবে, 'আমি আপনার আদেশ পালনে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু কুরাইশদের দলটাকে কোনোভাবেই নিরস্ত্র করা যায়নি। তারা আমাদেরকে আক্রমণ করে এবং দু'জন মুসলিম সৈন্যকে হত্যা করে। তখন বাধ্য হয়ে আমাদেরকেও অস্ত্র বের করতে হয়।'
এই সময় মহানবী (সা) আরও খবর পেলেন, কুরাইশ-প্রধানরা পরামর্শ করে কুরাইশ ও অন্যান্য অনুগত গোত্রের দুর্দান্ত ও গুণ্ডা শ্রেণীর বহুসংখ্যক লোকদের বিভিন্ন স্থানে মুসলমানদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়। ঠিক হয় যে, তারা সুবিধা করতে পারলে সবাই একযোগে মুসলমানদের আক্রমণ করবে। আর যদি তারা ব্যর্থ হয়, তাহলে যে অভয় তারা মহানবীর কাছ থেকে পেয়েছে, তার অধীনে তারা আত্মরক্ষা করবে।
কুরাইশদের অকারণ সৈন্য সমাবেশের মধ্যেও মহানবী এরই প্রমাণ পেলেন। কুরাইশদের এই ষড়যন্ত্র টের পেয়ে মহানবী (সা) আনসার রেজিমেন্টকে সতর্ক থাকতে এবং সকালে ছাফা পর্বতের পাদমূলে সমবেত হতে আদেশ দিলেন।
মহানবী (সা) দেখাতে চাইলেন মুসলমানরা প্রস্তুত আছে, অতএব কুরাইশদের কোন ষড়যন্ত্র কাজে আসবে না।
কুরাইশরাও শীঘ্র এটা বুঝতে পারলো এবং ষড়যন্ত্র বাদ দিয়ে নিজেদের ভবিষ্যত ভেবে ব্যাকুল হয়ে উঠলো।
আবু সুফিয়ান আবার ছুটলো মহানবীর (সা) কাছে। আর্তনাদ করে আবার সেই আগের মতই বলল, 'মুহাম্মাদ, কুরাইশদের এই দলকে তুমি যদি ধ্বংস কর, তাহলে আজ থেকে কুরাইশদের নাম-নিশানা বিলুপ্ত হয়ে যাবে।'
কুরাইশরা সর্বশেষেও যে অপরাধ করলো তাতেও মহানবী (সা) তাদের জন্যে ভয়াবহ শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারতেন। কিন্তু মহানবী (সা) তো এসেছেন মানুষকে মানুষ বানাবার জন্যে, তাদের শাস্তি দেবার জন্য নয়।
মহানবী (সা) আবু সুফিয়ানকে বললেন, যাও, আবার অভয় দিলাম, তোমাদের পুনরায় ক্ষমা করলাম। যা বলেছিলাম সেই অনুসারে কাজ কর গিয়ে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00