📄 জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর মহানবী শত্রুদেরই মঙ্গল চাইলেন
উহুদের যুদ্ধক্ষেত্র। মহানবী (সা) স্বয়ং সৈনিকদের ব্যূহ সাজিয়েছেন। পাহাড়ের গলিপথে পাহারা বসিয়েছিলেন এবং যার যা দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন।
কিন্তু প্রাথমিক বিজয় মুসলিম সৈনিকদের আত্মহারা করে দিয়েছিল, দায়িত্বের কথা তারা ভুলে গিয়েছিল। পাহাড়ের গলিপথ রক্ষার দায়িত্ব যাদের উপর ছিল, তারা সরে এসেছিল সেখান থেকে। ফলে পেছন থেকে আক্রান্ত হওয়ায় বিপর্যয় নেমে আসে মুসলিম বাহিনীতে।
অনেক সাহাবী শহীদ হলেন। আহত হলেন আরও অনেক। স্বয়ং মহানবী (সা) মারাত্মকভাবে আহত হলেন। পাথরের আঘাতে তাঁর কপালে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হলো। লৌহ শিরস্ত্রাণ তাঁর ঢুকে গিয়েছিল সেই ক্ষতে। দাঁতও তাঁর ভেঙ্গে গিয়েছিল। তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন।
পাহাড়ের এক চূড়ায় সাহাবীরা তাঁকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল। তিনি জ্ঞান ফিরে পেয়ে চোখ খুলে চাইলেন। রক্ত মুছে ফেললেন মুখমন্ডল থেকে। তারপর তিনি প্রথম যে কথা বললেন তা ছিল এই,
"হে আল্লাহ, আমার লোকদের সত্য পথে ফিরিয়ে আনুন। তারা জানে না তারা কি করছে।”
📄 কিন্তু উমার, আমি যে শান্তির বার্তাবাহক
হুদাইবিয়া সন্ধির শর্তগুলো স্থির হয়েছে, কিন্তু স্বাক্ষর তখনও হয়নি। এমন সময় মক্কার একজন মুসলমান পালিয়ে হুদাইবিয়ায় মুসলমানদের কাছে পৌঁছল। নাম আবু জান্দাল। সে ইসলাম গ্রহণ করায় মক্কাবাসীরা তার ওপর অমানুষিক অত্যাচার চালিয়ে আসছে। হুদাইবিয়ায় মুসলমানদের আসার কথা শুনে সে বন্দীদশা থেকে কোন রকমে পালিয়ে এসেছে। তার দেহে নির্মম আঘাতের চিহ্নগুলো জ্বলজ্বল করছে। সে মহানবী (সা)-এর কাছে আশ্রয়ের আবেদন জানাল।
মহানবীর দরবারে উপস্থিত কুরাইশ নেতা সাহল বলল, 'সন্ধির শর্ত অনুযায়ী এই লোককে অবিলম্বে মক্কায় ফেরত পাঠাতে হবে।' উত্তরে একজন মুসলিম বলল 'সন্ধি এখনও স্বাক্ষর হয়নি, সুতরাং এ লোককে ফেরত দিতে এখনই আমরা বাধ্য নই।' সাহল বলল, 'যদিও সন্ধি এদিক থেকে অসম্পূর্ণ তবু সন্ধির শর্ত সম্পর্কে আমরা একমত হয়ে গেছি। সুতরাং লোকটিকে অবশ্যই আমাদের হাতে ফেরত দিতে হবে।'
মহানবী (সা) গম্ভীরভাবে বসেছিলেন, অবশেষে তিনি সাহলকে বললেন, 'ঠিক আছে, তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হবে।'
তারপর তিনি আবু জান্দালের দিকে স্নেহদৃষ্টি তুলে বললেন, 'আবু জান্দাল, ফিরে যাও, আল্লাহর নামে ধৈর্য ধারণ কর। আল্লাহই তোমার মুক্তির একটা ব্যবস্থা করবেন।'
ক্রন্দনরত আবু জান্দাল মুসলমানদের সামনে দিয়ে মক্কায় চলে গেল। তার কান্না অস্থির করে তুলল মুসলমানদের।
উমার (রা) আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি মহানবীর (সা) সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। অদম্য আবেগে গোটা দেহ কাঁপছিল তাঁর। বললেন, 'হে রাসূল, আপনি কি আল্লাহর সত্যিকার রাসূল নন?'
মহানবী (সা) বললেন, 'নিশ্চয় আমি আল্লাহর রাসূল।' উমার (রা) বললেন, 'আমরা হকের উপর আছি, তারা নাহক পথে আছে এটা কি সত্য?'
মহানবী (সা) বললেন, 'অবশই সত্য।' উমার (রা) বললেন, 'তাহলে কেন আপনি অপমানকর সন্ধির অমর্যাদাকেই ধরে রাখতে চাইছেন? আমার আবেদন, সন্ধির শর্ত থেকে আমাদের মুক্তি দিন। তলোয়ারই ফায়সালা করুক।'
মহানবী (সা) হেসে বললেন, 'কিন্তু উমার, আমি যে শান্তির বার্তাবাহক। ধৈর্য ধর। তুমি যাকে অমর্যাদাকর বলছ, তার মধ্যেই করুণাময় আল্লাহ এক মহাপুরস্কার লুক্কায়িত রেখেছেন, যা সামনেই দেখতে পাবে' এই বলে মহানবী (সা) সন্ধিপত্রে তাঁর সীলমোহর লাগালেন এবং তা তুলে দিলেন সাহল-এর হাতে।
📄 একটা খেজুর মহানবীকে রাতে ঘুমাতে দিলনা
মহানবী (সা) বিত্তের মধ্যে থেকেও ছিলেন নিঃস্ব। এক বিশাল সাম্রাজ্যের মালিক হয়েও তিনি ছিলেন দরিদ্র। মৃত্যুর দিন তাঁর গৃহাঙ্গন ছিল অন্ধকার, বাতিতে তেল ছিলনা। ভাঁড়ারে কোন খাবার ছিলনা, ঋণের দায়ে তাঁর বর্মটি ছিল বন্ধক দেয়া।
তিনি নিঃস্ব ছিলেন কারণ রাষ্ট্রের সম্পত্তি অর্থাৎ জনগণের সম্পদে তিনি হাত দিতেন না। সাদাকা জাতীয় দানকে তিনি নিজের জন্যে হারাম মনে করতেন।
একদিনের ঘটনা। একদিন রাতে মহানবী (সা)-কে নিদ্রাহীন দেখা গেল। তিনি অশান্তভাবে বিছানায় গড়াগড়ি দিচ্ছিলেন।
তাঁর সহধর্মিনী জিজ্ঞেস করলেন, "হে আল্লাহর রাসূল, সারা রাত আপনি ঘুমোননি।”
মহানবী (সা) উত্তরে বললেন, 'আমি পথে এক জায়গায় একটা খেজুর পেয়ে তুলে নিয়েছিলাম এবং খেয়ে ফেলেছিলাম এই ভেবে যে, হয়তো ওটা পচে নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু এখন আমার ভয় হচ্ছে খেজুরটা যদি সাদাকার জিনিস হয়ে থাকে?”
📄 ফাতিমার আবদার, মহানবীর কম্পিত কণ্ঠস্বর
সমগ্র আরব তখন মহানবীর (সা) করতলে। প্রভূত সম্পদ তখন জমা হয়েছে মদীনার নববী রাষ্ট্রে।
এমনি একদিন মহানবীর (সা) একমাত্র জীবিত সন্তান আদরের দুলালী ফাতিমা (রা) এলেন তাঁর কাছে।
মহানবী (সা) দাঁড়িয়ে দু'হাত বাড়িয়ে তাঁকে স্বাগত জানালেন। সস্নেহে তাঁকে পাশে বসালেন। রুমাল দিয়ে মেয়ের মুখের ঘর্মবিন্দু মুছে দিলেন। তারপর কুশল জিজ্ঞাসা করলেন মেয়ের।
কুশল বিনিময়ের পর ফাতিমা (রা) বিষণ্ণভাবে বললেন, 'আব্বাজান, অনেক লোক আমার বাড়িতে। আমরা দু'জন, তিন ছেলে, চারজন ভাতিজা এবং অতিথিদের স্রোত। আমাকে একাই রান্নাবান্না করতে হয়, সবদিক দেখাশুনা করতে হয়। আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি, আমি শুনেছি, বন্দী অনেক মেয়ে এসেছে। যদি একটি মেয়ে আমাকে দেন, খুব উপকার হয় আমার।'
মহানবী (সা) কম্পিত কণ্ঠে বললেন, 'প্রিয় কন্যা আমার, যে সম্পদ এবং বন্দীদের তুমি দেখছ সবই মুসলিম জনসাধারণের। আমি এ সবের খাজাঞ্চি মাত্র। আমার কাজ হলো এগুলো সংরক্ষণ করা এবং যথার্থ প্রাপকদের তা দিয়ে দেয়া। তুমি সেই প্রাপকদের একজন নও। সুতরাং এখান থেকে আমি তোমাকে কিছুই দিতে পারি না। প্রিয় কন্যা, এই দুনিয়া কঠোর সংগ্রামের ক্ষেত্র। তুমি তোমার কাজ করে যাও। যখন ক্লান্ত হবে, আল্লাহকে স্মরণ করবে এবং তাঁর সাহায্য চাইবে। তিনিই তোমাকে শক্তি যোগাবেন।'