📄 আবু মা’বাদ না দেখেই চিনলেন মহানবীকে (সা)
মদীনার পথে দানশীল ও পরহিতৈষী আবু মা'বাদের আশ্রম। ছোট তাঁবু আর একপাল মেষ নিয়ে তার সংসার। শ্রান্ত-ক্লান্ত পথিকদের তাঁরা আশ্রয় দেন। সাধ্যমত খাদ্য ও পানীয় দিয়ে পথিকদের তাঁরা সেবা করেন। মহানবীর (সা) কাফিলাও গিয়ে সেখানে হাজির হলো।
আবু মা'বাদ তখন গৃহে ছিলেন না, মেষ চরাতে গেছেন দূর প্রান্তরে। আবু মা'বাদের স্ত্রী উম্মে মা'বাদকে জিজ্ঞাসা করা হলো, কিছু খাদ্য-পানীয় কিনতে পাওয়া যাবে কিনা।
উম্মে মা'বাদ খুবই দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, 'না, কোন খাবার নেই। থাকলে মূল্য দিতে হতো না। আমি নিজেই ওগুলো হাজির করতাম।”
উম্মে মা'বাদের তাঁবুর পাশে শীর্ণকায় একটা ছাগী শুয়ে ছিল। মহানবী (সা) উম্মে মা'বাদকে বললেন, "ঐ ছাগী দোহন করে দুধ নেয়া যেতে পারে কি?”
উম্মে মা'বাদ আনন্দের সাথেই বললেন, 'ছাগীটি শীর্ণ দুর্বল বলে পালের সাথে যায়নি। যদি স্তনে তার দুধ থাকে তাহলে নিতে পারেন।'
মহানবী বিসমিল্লাহ বলে দুধ দোহন শুরু করলেন। যে দুধ পাওয়া গেল তা কাফিলার সদস্যদের পরিতৃপ্তির জন্য যথেষ্ট হলো।
মহানবীসহ কাফিলার সদস্যগণ নিজেরা খেয়ে কিছুটা দুধ গৃহকর্তার জন্য রেখে দিলেন।
প্রয়োজন সেরে উম্মে মা'বাদকে ধন্যবাদ দিয়ে মহানবীর কাফিলা আবার মদীনার পথে যাত্রা করল। মহানবী (সা) চলে যাবার অল্পক্ষণ পরেই আবু মা'বাদ মেষ পাল নিয়ে বাড়ী ফিরলেন। তিনি বাটিতে টাটকা দুধ দেখে এ দুধ কোত্থেকে এল জিজ্ঞাসা করলেন।
উম্মে মা'বাদ মহানবীর কাফিলার আগমন, শীর্ণকায় ছাগী থেকে দুধ দোহনসহ সব ঘটনা খুলে বললেন। কাফিলার লোকদেরও বর্ণনা দিলেন উম্মে মা'বাদ। বেদুইন জীবনের মুক্ত মন নিয়ে সহজ-সাবলীল ভংগিতে মহানবীর যে বর্ণনা উম্মে মা'বাদ দিয়েছিলেন তা এখানে তুলে ধরছি।
"তাঁর উজ্জ্বল বদনকান্তি, প্রফুল্ল মুখশ্রী, অতি ভদ্র ও নম্র ব্যবহার। তাঁর উদরে স্ফীতি নেই, মস্তকে খালিত্য নেই। সুন্দর, সুদর্শন। সুবিস্তৃত কৃষ্ণবর্ণ নয়নযুগল, কেশ দীর্ঘ ঘনসন্নিবেশিত। তাঁর স্বর গম্ভীর। গ্রীবা উচ্চ। নয়নযুগলে যেন প্রকৃতি নিজেই কাজল দিয়ে রেখেছে। চোখের পুতুলি দুইটি সদা উজ্জ্বল, ঢল ঢল। ভ্রূযুগল নাতিসূক্ষ্ণ, পরস্পর সংযোজিত। স্বতঃকুঞ্চিত ঘন কেশদাম।
মৌনাবলম্বন করলে তাঁর বদন মণ্ডল থেকে গুরুগম্ভীর ভাবের অভিব্যক্তি হতে থাকে। আবার কথা বললে মনপ্রাণ মোহিত হয়ে যায়। দূর থেকে দেখলে কেমন মোহন কেমন মনোমুগ্ধকর সে রূপরাশি, নিকটে এলে কত মধুর কত সুন্দর তাঁর প্রকৃতি। ভাষা অতি মিষ্ট ও প্রাঞ্জল, তাতে ত্রুটি নেই, অতিরিক্ততা নেই, বাক্যগুলি যেন মুক্তার হার। তাঁর দেহ এত খর্ব নহে যা দর্শনে ক্ষুদ্রত্বের ভাব মনে আসে বা এমন দীর্ঘ নহে নয়ন যা দেখতে বিরক্তি বোধ করে, তিনি নাতিদীর্ঘ নাতিখর্ব। পুষ্টি ও পুলকে সে দেহ যেন কুসুমিত নববিটপীর সদ্য পল্লবিত নবীন প্রশাখা। সে মুখশ্রী বড় সুন্দর, বড় সুদর্শন ও সুমহান। তাঁর সঙ্গীরা সর্বদাই তাঁকে বেষ্টন করে থাকে। তাঁরা তাঁর কথা আগ্রহ সহকারে শ্রবণ করে এবং তাঁর আদেশ উৎফুল্ল চিত্তে পালন করে।”
স্ত্রীর মুখে এই বর্ণনা শুনে আবু মা'বাদ উত্তেজিত স্বরে বলে উঠলেন, “আল্লাহর শপথ, ইনি নিশ্চয় কুরাইশদের সেই ব্যক্তি যাঁর সম্পর্কে আমরা সত্য-মিথ্যা অনেক কিছু শ্রবণ করেছি। হায় আমার অদৃষ্ট, আমি অনুপস্থিত ছিলাম। উপস্থিত থাকলে আমি তাঁর আশ্রয় নিতাম, আমি বলছি, সুযোগ পেলে এখনও তা করব।”
📄 মহানবী (সা) ও মুসলিমদের প্রতি এক শহীদের বাণী
উহুদের যুদ্ধে নবী করীম (সা) হযরত সা'দ ইবনে রাবী কেমন আছেন জানতে না পেরে একজন সাহাবীকে তাঁর সন্ধানে পাঠালেন। তিনি প্রথমে শহীদদের মধ্যে তাকে তালাশ করলেন, না পেয়ে জীবিতদের মধ্যে ডেকে বেড়াতে লাগলেন। কিন্তু নিরাশ হয়ে বললেন, সা'দ ইবন রাবীর সংবাদ লওয়ার জন্যে নবী করীম (সা) আমাকে পাঠিয়েছেন।
তখন এক স্থান হতে একটি অতি ক্ষীণ স্বর শোনা গেল। তিনি ঐ স্বর লক্ষ্য করে গিয়ে দেখলেন, সা'দ নিহতদের মধ্যে পড়ে আছেন এবং জীবনের এক আধটি নিঃশ্বাস মাত্র তাঁর বাকী আছে।
সাহাবী নিকটে গেলে হযরত সা'দ বললেন, নবী (সা)কে সালাম জানিয়ে বলো, আল্লাহ তা'আলা কোন নবীকে তাঁর উম্মাতের তরফ থেকে শ্রেষ্ঠতম যে পুরস্কার দান করেছেন, আল্লাহ যেন আমার তরফ থেকে তাঁকে তার চেয়ে উত্তম পুরস্কার দান করেন। আর مسلمانوں আমার এ বাণী পৌঁছিয়ে দিও যে, তাদের একটি প্রাণী জীবিত থাকতে যদি কাফিররা নবী করীম (সা) এর নিকটে আসতে পারে, তবে তাদের মুক্তির জন্যে আল্লাহর কাছে কোন ওযরই থাকবে না। এ কথা বলেই তিনি শহীদ হয়ে গেলেন।
📄 জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর মহানবী শত্রুদেরই মঙ্গল চাইলেন
উহুদের যুদ্ধক্ষেত্র। মহানবী (সা) স্বয়ং সৈনিকদের ব্যূহ সাজিয়েছেন। পাহাড়ের গলিপথে পাহারা বসিয়েছিলেন এবং যার যা দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন।
কিন্তু প্রাথমিক বিজয় মুসলিম সৈনিকদের আত্মহারা করে দিয়েছিল, দায়িত্বের কথা তারা ভুলে গিয়েছিল। পাহাড়ের গলিপথ রক্ষার দায়িত্ব যাদের উপর ছিল, তারা সরে এসেছিল সেখান থেকে। ফলে পেছন থেকে আক্রান্ত হওয়ায় বিপর্যয় নেমে আসে মুসলিম বাহিনীতে।
অনেক সাহাবী শহীদ হলেন। আহত হলেন আরও অনেক। স্বয়ং মহানবী (সা) মারাত্মকভাবে আহত হলেন। পাথরের আঘাতে তাঁর কপালে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হলো। লৌহ শিরস্ত্রাণ তাঁর ঢুকে গিয়েছিল সেই ক্ষতে। দাঁতও তাঁর ভেঙ্গে গিয়েছিল। তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন।
পাহাড়ের এক চূড়ায় সাহাবীরা তাঁকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল। তিনি জ্ঞান ফিরে পেয়ে চোখ খুলে চাইলেন। রক্ত মুছে ফেললেন মুখমন্ডল থেকে। তারপর তিনি প্রথম যে কথা বললেন তা ছিল এই,
"হে আল্লাহ, আমার লোকদের সত্য পথে ফিরিয়ে আনুন। তারা জানে না তারা কি করছে।”
📄 কিন্তু উমার, আমি যে শান্তির বার্তাবাহক
হুদাইবিয়া সন্ধির শর্তগুলো স্থির হয়েছে, কিন্তু স্বাক্ষর তখনও হয়নি। এমন সময় মক্কার একজন মুসলমান পালিয়ে হুদাইবিয়ায় মুসলমানদের কাছে পৌঁছল। নাম আবু জান্দাল। সে ইসলাম গ্রহণ করায় মক্কাবাসীরা তার ওপর অমানুষিক অত্যাচার চালিয়ে আসছে। হুদাইবিয়ায় মুসলমানদের আসার কথা শুনে সে বন্দীদশা থেকে কোন রকমে পালিয়ে এসেছে। তার দেহে নির্মম আঘাতের চিহ্নগুলো জ্বলজ্বল করছে। সে মহানবী (সা)-এর কাছে আশ্রয়ের আবেদন জানাল।
মহানবীর দরবারে উপস্থিত কুরাইশ নেতা সাহল বলল, 'সন্ধির শর্ত অনুযায়ী এই লোককে অবিলম্বে মক্কায় ফেরত পাঠাতে হবে।' উত্তরে একজন মুসলিম বলল 'সন্ধি এখনও স্বাক্ষর হয়নি, সুতরাং এ লোককে ফেরত দিতে এখনই আমরা বাধ্য নই।' সাহল বলল, 'যদিও সন্ধি এদিক থেকে অসম্পূর্ণ তবু সন্ধির শর্ত সম্পর্কে আমরা একমত হয়ে গেছি। সুতরাং লোকটিকে অবশ্যই আমাদের হাতে ফেরত দিতে হবে।'
মহানবী (সা) গম্ভীরভাবে বসেছিলেন, অবশেষে তিনি সাহলকে বললেন, 'ঠিক আছে, তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হবে।'
তারপর তিনি আবু জান্দালের দিকে স্নেহদৃষ্টি তুলে বললেন, 'আবু জান্দাল, ফিরে যাও, আল্লাহর নামে ধৈর্য ধারণ কর। আল্লাহই তোমার মুক্তির একটা ব্যবস্থা করবেন।'
ক্রন্দনরত আবু জান্দাল মুসলমানদের সামনে দিয়ে মক্কায় চলে গেল। তার কান্না অস্থির করে তুলল মুসলমানদের।
উমার (রা) আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি মহানবীর (সা) সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। অদম্য আবেগে গোটা দেহ কাঁপছিল তাঁর। বললেন, 'হে রাসূল, আপনি কি আল্লাহর সত্যিকার রাসূল নন?'
মহানবী (সা) বললেন, 'নিশ্চয় আমি আল্লাহর রাসূল।' উমার (রা) বললেন, 'আমরা হকের উপর আছি, তারা নাহক পথে আছে এটা কি সত্য?'
মহানবী (সা) বললেন, 'অবশই সত্য।' উমার (রা) বললেন, 'তাহলে কেন আপনি অপমানকর সন্ধির অমর্যাদাকেই ধরে রাখতে চাইছেন? আমার আবেদন, সন্ধির শর্ত থেকে আমাদের মুক্তি দিন। তলোয়ারই ফায়সালা করুক।'
মহানবী (সা) হেসে বললেন, 'কিন্তু উমার, আমি যে শান্তির বার্তাবাহক। ধৈর্য ধর। তুমি যাকে অমর্যাদাকর বলছ, তার মধ্যেই করুণাময় আল্লাহ এক মহাপুরস্কার লুক্কায়িত রেখেছেন, যা সামনেই দেখতে পাবে' এই বলে মহানবী (সা) সন্ধিপত্রে তাঁর সীলমোহর লাগালেন এবং তা তুলে দিলেন সাহল-এর হাতে।