📄 মহানবীর দর্শন ঘাতককে করল বিহবল
মহানবী হিজরাত করছেন মদীনা। চলছেন পথ ধরে। পূর্ব দিগন্ত তখনও সফেদ হয়ে উঠেনি। তিনটি উট এবং চার জন মানুষের (মহানবী, আবুবকর এবং আবদুল্লাহ ইবনে উরাইকাত ছাড়াও আমের এই কাফিলায় শামিল ছিলেন।) ছোট্ট কাফিলা মদীনার পথে চলছে। আবু বকরের কাছ থেকে কেনা 'কাছওয়া' নামক উটে মহানবী, আমের এবং হযরত আবু বকর আসীন আবু বকরের উটে এবং আবদুল্লাহ ইবনে উরাইকাত তাঁর নিজস্ব উটে। দ্রুত পথ অতিক্রম করছে কাফিলাটি। ডাইনে লোহিত সাগর, বামে অন্তহীন পাহাড়ের শ্রেণী, মাঝখানের মরুপথ ধরে এগিয়ে চলছে কাফিলা।
যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করা সত্ত্বেও মহানবীর কাফিলা সওর গিরিগুহা থেকে বের হলে যাত্রার দৃশ্য একজন পল্লীবাসী আরবের চোখে পড়ে গেল। ঐ আরব তার গোত্রের এক জমায়েতে গিয়ে এই খবর দিয়ে বলল, 'আমার মনে হচ্ছে ওদেরকেই কুরাইশরা খুঁজছে। মহানবী ও আবু বকরকে হত্যা করতে পারলে একশ' উট পাওয়া যাবে।'- এ খবর এ পল্লীতেও এসেছিল। সুতরাং ঐ খবরটি শোনার সংগে সংগে বৈঠকে উপস্থিত সুরাকা নামক জনৈק যুবক গোটা পুরস্কার নিজে হাত করার লোভে বলল, 'না না তারা সে লোক নয়। আমি জানি তারা অমুক অমুক লোক, উট খুঁজতে বেরিয়েছে।' সুরাকার কথা সকলে সত্য বলে ধরে নিয়ে যখন অন্য আলোচনায় মশুগুল হয়ে পড়ল, তখন সুরাকা ধীরে ধীরে মজলিস থেকে বের হয়ে এল। তারপর অস্ত্র-সজ্জিত হয়ে বলবান ঘোড়া নিয়ে মহানবী এবং আবু বকরকে হত্যার জন্য বেরিয়ে পড়ল।
দেরী সহ্য হচ্ছিল না সুরাকার। উঁচু নিচু পাথর পথে তীর বেগে ঘোড়া ছুটালো সুরাকা। দূরে দেখতে পেল সেই কাফিলাকে। সুরাকার ঘোড়ার গতি আরও বেড়ে গেল। কিন্তু ঘোড়া মারাত্মকভাবে পা পিছলে পড়তে পড়তে বেঁচে গেল। সুরাকার মনে ভীষণভাবে খোঁচা লাগল। লক্ষ্যের সাফল্য সম্পর্কে তার মনে সন্দেহের দোলা লাগল। সে আরবীয় রীতি অনুসারে তীর দিয়ে লটারী করল। তাতে না সূচক জবাব পেয়ে সে ভীষণ দমে গেল। কিন্তু তা মুহূর্তের জন্য। তারপর লটারী ভুল হয়েছে ধরে নিয়ে সে আবার তীরবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
আবু বকরের সন্ধানী চোখ এই সময় সুরাকাকে দেখতে পেল। তিনি উদ্বিগ্নভাবে নবীকে বললেন, "দেখুন, আততায়ী এবার আমাদের ধরে ফেলেছে।”
নিরুদ্বিগ্ন কণ্ঠে আবু বকরকে সান্ত্বনা দিয়ে মহানবী বললেন, "ভীত হয়ো না আবু বকর, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।”
তীর বেগে ছুটেছে সুরাকার ঘোড়া। কাফিলাকে সে ধরে ফেলেছে প্রায়। বাঁধনহীন উৎসাহ উত্তেজনায় সুরাকা তখন উন্মত্ত। চলার পথে সুরাকার ঘোড়া আবার দুর্ঘটনায় পড়ল। এবার ঘোড়ার দু'টি পা মাটিতে দেবে গেল। পা দু'টি তোলার অনেক চেষ্টা করল সুরাকা, কিন্তু পারল না। এই সময় আগের লটারীর ফল তার মনে পড়ল। মনটা তার ভীষণ দমে গেল। আবার তীর বের করে সতর্কতার সাথে সেই লটারীই পুনরায় করল। কিন্তু এবারও সেই উত্তর 'না'।
সুরাকার মন এবার ভীতি অনুভব করল। অপর দিকে মহানবীর অবিচল, নিরুদ্বিগ্ন এবং শান্ত সৌম্য অবস্থা সুরাকাকে বিহবল করে তুলল। সুরাকা নিজেই বলেছে, তখনকার অবস্থা দেখে আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাল, মুহাম্মাদ নিশ্চয়ই জয়যুক্ত হবেন।
সুরাকা যখন ভীত-বিহবলতায় কাতর, তখন তার ঘোড়া নিজেকে উদ্ধারের জন্য অবিরাম চিৎকার করছে ও পা ছুড়ছে। এই অবস্থায় সুরাকা নবীর কাফিলাকে উদ্দেশ্য করে বলল, "হে মক্কার সওয়ারগণ, একটু দাঁড়াও। আমি সুরাকা, আমার কিছু কথা আছে, কোন অনিষ্টের ভয় নেই।”
সুরাকা অতঃপর নবীর কাছে পৌঁছে নিজের সব কথা খুলে বলে আরজ করল, "আমার খাদ্য সম্ভার ও অস্ত্র-শস্ত্র আপনারা গ্রহণ করুন।"
মহানবী তার দান গ্রহণ না করে মিষ্টি কথায় বললেন, 'এ সবের কোন আবশ্যকতা আমাদের নেই। আমাদের কথা কাউকে বলে না দিলেই উপকৃত হব।'
সুরাকা তখন আরজ করল, "আমার জন্য আপনি একটা পরওয়ানা লিখে দিন, যা প্রদর্শন করে আমি উপকৃত হতে পারব।” মহানবী আমেরকে বলে চামড়ায় ঐ ধরনের একটি পরওয়ানা লিখে দিলেন।
অতঃপর সুরাকা ফিরে গেল। মহানবীর কাফিলা আবার যাত্রা করল মদীনার পথে।
📄 আবু মা’বাদ না দেখেই চিনলেন মহানবীকে (সা)
মদীনার পথে দানশীল ও পরহিতৈষী আবু মা'বাদের আশ্রম। ছোট তাঁবু আর একপাল মেষ নিয়ে তার সংসার। শ্রান্ত-ক্লান্ত পথিকদের তাঁরা আশ্রয় দেন। সাধ্যমত খাদ্য ও পানীয় দিয়ে পথিকদের তাঁরা সেবা করেন। মহানবীর (সা) কাফিলাও গিয়ে সেখানে হাজির হলো।
আবু মা'বাদ তখন গৃহে ছিলেন না, মেষ চরাতে গেছেন দূর প্রান্তরে। আবু মা'বাদের স্ত্রী উম্মে মা'বাদকে জিজ্ঞাসা করা হলো, কিছু খাদ্য-পানীয় কিনতে পাওয়া যাবে কিনা।
উম্মে মা'বাদ খুবই দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, 'না, কোন খাবার নেই। থাকলে মূল্য দিতে হতো না। আমি নিজেই ওগুলো হাজির করতাম।”
উম্মে মা'বাদের তাঁবুর পাশে শীর্ণকায় একটা ছাগী শুয়ে ছিল। মহানবী (সা) উম্মে মা'বাদকে বললেন, "ঐ ছাগী দোহন করে দুধ নেয়া যেতে পারে কি?”
উম্মে মা'বাদ আনন্দের সাথেই বললেন, 'ছাগীটি শীর্ণ দুর্বল বলে পালের সাথে যায়নি। যদি স্তনে তার দুধ থাকে তাহলে নিতে পারেন।'
মহানবী বিসমিল্লাহ বলে দুধ দোহন শুরু করলেন। যে দুধ পাওয়া গেল তা কাফিলার সদস্যদের পরিতৃপ্তির জন্য যথেষ্ট হলো।
মহানবীসহ কাফিলার সদস্যগণ নিজেরা খেয়ে কিছুটা দুধ গৃহকর্তার জন্য রেখে দিলেন।
প্রয়োজন সেরে উম্মে মা'বাদকে ধন্যবাদ দিয়ে মহানবীর কাফিলা আবার মদীনার পথে যাত্রা করল। মহানবী (সা) চলে যাবার অল্পক্ষণ পরেই আবু মা'বাদ মেষ পাল নিয়ে বাড়ী ফিরলেন। তিনি বাটিতে টাটকা দুধ দেখে এ দুধ কোত্থেকে এল জিজ্ঞাসা করলেন।
উম্মে মা'বাদ মহানবীর কাফিলার আগমন, শীর্ণকায় ছাগী থেকে দুধ দোহনসহ সব ঘটনা খুলে বললেন। কাফিলার লোকদেরও বর্ণনা দিলেন উম্মে মা'বাদ। বেদুইন জীবনের মুক্ত মন নিয়ে সহজ-সাবলীল ভংগিতে মহানবীর যে বর্ণনা উম্মে মা'বাদ দিয়েছিলেন তা এখানে তুলে ধরছি।
"তাঁর উজ্জ্বল বদনকান্তি, প্রফুল্ল মুখশ্রী, অতি ভদ্র ও নম্র ব্যবহার। তাঁর উদরে স্ফীতি নেই, মস্তকে খালিত্য নেই। সুন্দর, সুদর্শন। সুবিস্তৃত কৃষ্ণবর্ণ নয়নযুগল, কেশ দীর্ঘ ঘনসন্নিবেশিত। তাঁর স্বর গম্ভীর। গ্রীবা উচ্চ। নয়নযুগলে যেন প্রকৃতি নিজেই কাজল দিয়ে রেখেছে। চোখের পুতুলি দুইটি সদা উজ্জ্বল, ঢল ঢল। ভ্রূযুগল নাতিসূক্ষ্ণ, পরস্পর সংযোজিত। স্বতঃকুঞ্চিত ঘন কেশদাম।
মৌনাবলম্বন করলে তাঁর বদন মণ্ডল থেকে গুরুগম্ভীর ভাবের অভিব্যক্তি হতে থাকে। আবার কথা বললে মনপ্রাণ মোহিত হয়ে যায়। দূর থেকে দেখলে কেমন মোহন কেমন মনোমুগ্ধকর সে রূপরাশি, নিকটে এলে কত মধুর কত সুন্দর তাঁর প্রকৃতি। ভাষা অতি মিষ্ট ও প্রাঞ্জল, তাতে ত্রুটি নেই, অতিরিক্ততা নেই, বাক্যগুলি যেন মুক্তার হার। তাঁর দেহ এত খর্ব নহে যা দর্শনে ক্ষুদ্রত্বের ভাব মনে আসে বা এমন দীর্ঘ নহে নয়ন যা দেখতে বিরক্তি বোধ করে, তিনি নাতিদীর্ঘ নাতিখর্ব। পুষ্টি ও পুলকে সে দেহ যেন কুসুমিত নববিটপীর সদ্য পল্লবিত নবীন প্রশাখা। সে মুখশ্রী বড় সুন্দর, বড় সুদর্শন ও সুমহান। তাঁর সঙ্গীরা সর্বদাই তাঁকে বেষ্টন করে থাকে। তাঁরা তাঁর কথা আগ্রহ সহকারে শ্রবণ করে এবং তাঁর আদেশ উৎফুল্ল চিত্তে পালন করে।”
স্ত্রীর মুখে এই বর্ণনা শুনে আবু মা'বাদ উত্তেজিত স্বরে বলে উঠলেন, “আল্লাহর শপথ, ইনি নিশ্চয় কুরাইশদের সেই ব্যক্তি যাঁর সম্পর্কে আমরা সত্য-মিথ্যা অনেক কিছু শ্রবণ করেছি। হায় আমার অদৃষ্ট, আমি অনুপস্থিত ছিলাম। উপস্থিত থাকলে আমি তাঁর আশ্রয় নিতাম, আমি বলছি, সুযোগ পেলে এখনও তা করব।”
📄 মহানবী (সা) ও মুসলিমদের প্রতি এক শহীদের বাণী
উহুদের যুদ্ধে নবী করীম (সা) হযরত সা'দ ইবনে রাবী কেমন আছেন জানতে না পেরে একজন সাহাবীকে তাঁর সন্ধানে পাঠালেন। তিনি প্রথমে শহীদদের মধ্যে তাকে তালাশ করলেন, না পেয়ে জীবিতদের মধ্যে ডেকে বেড়াতে লাগলেন। কিন্তু নিরাশ হয়ে বললেন, সা'দ ইবন রাবীর সংবাদ লওয়ার জন্যে নবী করীম (সা) আমাকে পাঠিয়েছেন।
তখন এক স্থান হতে একটি অতি ক্ষীণ স্বর শোনা গেল। তিনি ঐ স্বর লক্ষ্য করে গিয়ে দেখলেন, সা'দ নিহতদের মধ্যে পড়ে আছেন এবং জীবনের এক আধটি নিঃশ্বাস মাত্র তাঁর বাকী আছে।
সাহাবী নিকটে গেলে হযরত সা'দ বললেন, নবী (সা)কে সালাম জানিয়ে বলো, আল্লাহ তা'আলা কোন নবীকে তাঁর উম্মাতের তরফ থেকে শ্রেষ্ঠতম যে পুরস্কার দান করেছেন, আল্লাহ যেন আমার তরফ থেকে তাঁকে তার চেয়ে উত্তম পুরস্কার দান করেন। আর مسلمانوں আমার এ বাণী পৌঁছিয়ে দিও যে, তাদের একটি প্রাণী জীবিত থাকতে যদি কাফিররা নবী করীম (সা) এর নিকটে আসতে পারে, তবে তাদের মুক্তির জন্যে আল্লাহর কাছে কোন ওযরই থাকবে না। এ কথা বলেই তিনি শহীদ হয়ে গেলেন।
📄 জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর মহানবী শত্রুদেরই মঙ্গল চাইলেন
উহুদের যুদ্ধক্ষেত্র। মহানবী (সা) স্বয়ং সৈনিকদের ব্যূহ সাজিয়েছেন। পাহাড়ের গলিপথে পাহারা বসিয়েছিলেন এবং যার যা দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন।
কিন্তু প্রাথমিক বিজয় মুসলিম সৈনিকদের আত্মহারা করে দিয়েছিল, দায়িত্বের কথা তারা ভুলে গিয়েছিল। পাহাড়ের গলিপথ রক্ষার দায়িত্ব যাদের উপর ছিল, তারা সরে এসেছিল সেখান থেকে। ফলে পেছন থেকে আক্রান্ত হওয়ায় বিপর্যয় নেমে আসে মুসলিম বাহিনীতে।
অনেক সাহাবী শহীদ হলেন। আহত হলেন আরও অনেক। স্বয়ং মহানবী (সা) মারাত্মকভাবে আহত হলেন। পাথরের আঘাতে তাঁর কপালে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হলো। লৌহ শিরস্ত্রাণ তাঁর ঢুকে গিয়েছিল সেই ক্ষতে। দাঁতও তাঁর ভেঙ্গে গিয়েছিল। তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন।
পাহাড়ের এক চূড়ায় সাহাবীরা তাঁকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল। তিনি জ্ঞান ফিরে পেয়ে চোখ খুলে চাইলেন। রক্ত মুছে ফেললেন মুখমন্ডল থেকে। তারপর তিনি প্রথম যে কথা বললেন তা ছিল এই,
"হে আল্লাহ, আমার লোকদের সত্য পথে ফিরিয়ে আনুন। তারা জানে না তারা কি করছে।”