📄 সত্যের শক্তি
আদ দাউস গোত্রের সরদার তুফাইল ইবন আমর মক্কায় এলেন। তিনি ছিলেন কবি। বিজ্ঞতার জন্যেও বিখ্যাত। মক্কাবাসীরা নগরীর গেটে তাঁকে স্বাগত জানাল।
মক্কার সরদাররা তুফাইল ইবন আমরকে মুহাম্মাদ (সা)-এর সাথে দেখা না করার জন্যে সাবধান করে দিল। তারা জানাল, মুহাম্মাদ (সা)-এর কথা মক্কায় ভীষণ বিশৃংখলার সৃষ্টি করছে। সর্বত্র সে একটা খারাপ আবহাওয়া সৃষ্টি করছে।
তদনুসারে তুফাইল ইবন আমর মহানবী (সা)-এর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে লাগলেন। কখনও তিনি মহানবীর (সা) মুখোমুখি হলে চোখ বুঁজতেন এবং কান বন্ধ করতেন।
ঘটনাক্রমে একদিন যখন মহানবী (সা) কাবায় নামায পড়ছিলেন, তখন তাঁর কণ্ঠ নিঃসৃত কুরআন শরীফের কতগুলো আয়াত তুফাইলের কানে প্রবেশ করল। আয়াতগুলো তাঁর হৃদয়ে দারুণ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করল। কবি তুফাইল মহানবীর (সা) পিছু পিছু তাঁর বাড়ী গেলেন এবং তাঁকে ঐ আয়াতগুলো পুনরায় পাঠ করতে বলেন। মহানবী (সা) ঐ আয়াতগুলো পাঠ করলেন।
অভিভূত তুফাইল ইবন আমর সংগে সংগে ইসলাম গ্রহণ করেন।
📄 জাদুকর জামাদের কুরআন শোনা
জামাদ নামে ইয়ামেনের একজন কুখ্যাত যাদুকর মক্কায় এলো। সে কুরাইশদের আশ্বাস দিল মুহাম্মাদ (সা)-এর উপর দুষ্ট দেবতার যে আছর তা সে ছাড়িয়ে দেবে। কুরাইশরা খুব খুশী হলো।
জামাদ মহানবী (সা)-এর কাছে গিয়ে হাযির হলো এবং বলল যে, সে তাকে ভালো করে দেবে। মহানবী (সা) তাকে বললেন, তাহলে আগে আমার কিছু কথা শুনুন। তারপর মহানবী (সা) কুরআন থেকে কয়েকটি আয়াত পাঠ করলেন। জামাদ আয়াতগুলো শুনে চমৎকৃত হলো এবং আয়াতগুলো পুনরায় পাঠ করার জন্যে অনুরোধ করল।
মহানবী (সা) আয়াতগুলো দ্বিতীয়বার যখন পাঠ সমাপ্ত করলেন, তখন জামাদ চিৎকার করে বলে উঠল, "আমি বহু ভবিষ্যদ্বক্তা, যাদুকর ও কবির কথা শুনেছি, কিন্তু আল্লাহ সাক্ষী, এই কথাগুলোর কোন তুলনা নেই। অতলগভীর এই কথাগুলো।"
তারপর সে বলল, "হে মুহাম্মাদ, আপনার হাত এগিয়ে দিন। আমি আপনার আনুগত্যের শপথ করছি।”
📄 পোকা ধ্বংস করল বয়কটের দলিল
নববী ষষ্ঠ সনে কুরাইশরা মহানবী ও তাঁর গোত্রকে বয়কট করে সকলকে এক সাথে ধ্বংস করে ফেলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। এজন্য মক্কার সকল গোত্র একত্রিত হয়ে একটি দলিল সম্পাদন করল। দলিলে বলা হল: "মক্কার কোন ব্যক্তি বনু হাশিম গোত্রের সাথে আত্মীয়তা করবে না, তাদের কাছে কোন বস্তু ক্রয়-বিক্রয় করবে না, তাদের কাছে খাদ্য প্রেরণ করবে না। যতদিন পর্যন্ত তারা অর্থাৎ বনু হাশিম রাসূলকে (সা) হত্যার জন্য কুরাইশদের হাতে সমর্পণ না করবে ততদিন পর্যন্ত এই চুক্তি বলবৎ থাকবে।”
মহানবী বনু হাশিমের সমস্ত লোকজনসহ শি'আবে আবুতালিব গিরি- উপত্যকায় আশ্রয় গ্রহণ করলেন। সুদীর্ঘ তিন বছর তাঁরা অবরুদ্ধ অবস্থায় এই উপত্যকায় অবস্থান করলেন। এই বন্দী জীবন এত কঠোর ছিল যে, জঠরজ্বালা নিবারণের জন্য তাদেরকে গাছের পাতা খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করতে হয়েছে। সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস এক দিনের ঘটনা বলেছেন: সেদিন রাত্রিতে তিনি একটি শুকনা চামড়া আগুনে ঝলসিয়ে ক্ষুধার জ্বালা নিবারণ করেছিলেন।
ছোট ছোট শিশুরা যখন ক্ষুৎপিপাসায় কাতর হয়ে চীৎকার করত, তখন বাহির থেকে কুরাইশরা তা শুনে আনন্দে নৃত্য করত। আবার কোন কোন সহৃদয় ব্যক্তি এতে দুঃখিত হত।
একদিন হযরত খাদীজার (রা) ভ্রাতুষ্পুত্র হাকিম ইবনে হিযام স্বীয় দানের মাধ্যমে হযরত খাদীজার (রা) নিকট সামান্য পরিমাণ গম পাঠাচ্ছিল। কিন্তু পথের মধ্যে আবু জাহল তা দেখতে পেয়ে ছিনিয়ে নেবার উপক্রম করলে ঘটনাক্রমে আবুল বুখতারি সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। তিনি যদিও কাফির ছিলেন, তবু অন্তরে তাঁর দয়ামায়া ছিল। তিনি বললেন, ফুফুর কাছে সামান্য খাবার পাঠাচ্ছে তাতে তুমি বাধা দিচ্ছ কেন?
ধীরে ধীরে খোদ কুরাইশদের মধ্যেই চুক্তিভঙ্গের জন্য আন্দোলন শুরু হয়ে গেল। হিশাম ইবনে আমর নামক জনৈক ব্যক্তি বনু হাশিমের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ছিলেন এবং স্বীয় গোত্রের মধ্যেও অত্যন্ত বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসাবে পরিচিত ছিলেন। তিনি গোপনে গোপনে তাদের কাছে খাদ্য পাঠাতেন। তিনিই একদিন আবদুল মুত্তালিবের দৌহিত্র যুহাইরের নিকট গমন করে বললেন, "কি হে যুহাইর! তোমার কি পছন্দ হয় যে, তুমি প্রচুর পরিমাণে পানাহার করবে ও যাবতীয় আনন্দ উপভোগ করবে, আর তোমার মামার ভাগ্যে এক দানাও জুটবে না।
যুহাইর বললেন, "কি করব? আমি একা, যদি আমাকে সমর্থন করবার মত একজন লোকও পেতাম, তাহলে ঐ অন্যায় চুক্তিপত্র অবশ্যই ছিঁড়ে ফেলতাম।” হিশাম বললেন, "আমি তোমার সাথে আছি।”
অতঃপর তারা উভয়ে মিলে মুত'ইম ইবনে আদির কাছে উপস্থিত হলেন। অপরদিকে আবুল বুখতারি ইবনে হিশাম এবং যুম'আ ইবনুল আসওয়াদও তাঁদেরকে সমর্থন দান করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন। একদিন সকলে মিলে কা'বার অংগনে গমন করলেন। সেখানে যুহাইর সমবেত জনতাকে সম্বোধনপূর্বক জিজ্ঞাসা করলেন,
"হে মক্কাবাসীগণ! এটা কেমন কথা যে, আমরা সুখে-শান্তিতে দিন যাপন করব, আর বনু হাশিমদের ভাগ্যে সামান্য খাবারও জুটবে না? খোদার কসম! এই অন্যায় চুক্তিপত্র ছিঁড়ে না ফেলা পর্যন্ত আমি শান্ত হব না।” এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে আবু জাহল দাঁড়িয়ে ঘোষণা করল, "সাবধান, এই চুক্তিপত্রের বিরুদ্ধে কাকেও কিছু করতে দেয়া হবে না।” যুম'আ দাঁড়িয়ে পড়লেন, "তুমি মিথ্যাবাদী। এই চুক্তিপত্র সম্পাদনের সময় আমরা রাজি ছিলাম না।"
ঘুম'আর কথা শেষ হতেই আবুল বুখতারি দাঁড়িয়ে বলল, "কি ছাইভস্ম লেখা হয়েছে এতে, আমরা মোটেও খুশী নই, ওসব লেখা-টেখা আমরা মানিও না।” বুখতারি থামতেই মুতইম লাফিয়ে উঠে বলল, "তোমরা দু'জন ঠিকই বলেছ। ভিন্ন কথা যে বলবে, সে-ই হবে মিথ্যাবাদী।” হিশাম তাকে সমর্থন করল।
আবু জাহল বলল, মনে হয় তোমরা আগে-ভাগে জোট বেঁধে এসেছ।
এসব বাক-বিতন্ডার মধ্যে মুতইম লাফ দিয়ে উঠে কা'বার দেওয়াল থেকে বয়কটের দলিলটি নামিয়ে আনল ছিঁড়ে ফেলার জন্যে।
কিন্তু ছিঁড়ে ফেলতে হলো না। আল্লাহর পোকা-সৈনিকরা অনেক আগেই ধ্বংস করেছিল অন্যায় দলিলটিকে। দেখা গেল দলিলের সব শব্দ, সব কথা পোকায় খেয়ে ফেলেছে, অক্ষত রয়েছে একমাত্র 'বিসমিকা আল্লাহুম্মা' শব্দ।
📄 মযলুম চাইলেন যালিমরা বেঁচে থাকুক
মহানবী ধর্ম প্রচারের জন্য তায়েফ গমন স্থির করলেন। মহানবী ভেবেছিলেন, সুজলা সুফলা শস্য-শ্যামলা তায়েফের মানুষের মন হয়তো আরও নরম পাওয়া যাবে।
মহানবী তায়েফ চললেন। তায়েফের প্রধান গোত্র ছিল বনু সাকিফ। আবদইয়ালিল, মাসউদ ও হাবিব নামে তিনভাই ছিল সে গোত্রের প্রধান। মহানবী প্রথমে তাদের কাছে গেলেন, আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত দিলেন তাদেরকে। তারা দাওয়াত তো গ্রহণ করলই না বরং তাকে নানা রকমের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে জর্জরিত করলো।
তারা যখন দাওয়াত কবুল করলো না, তখন মহানবী তাদেরকে নিরপেক্ষ থাকতে অনুরোধ করলেন যাতে করে তাদের মত দ্বারা সাধারণ মানুষ প্রভাবিত হতে না পারে।
কিন্তু উল্টোই করল তারা। লেলিয়ে দিল ছেলে-ছোকরা ও দাসদের। মহানবী রাস্তায় বের হলেই তারা তাঁর পেছনে পেছনে ছুটতো, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করতো, পাথর ছুড়তো।
এর মধ্যেই মহানবী সত্যের আহবান তায়েফের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে লাগলেন। পথের দু'ধার থেকে তাঁর পা লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করা হতে লাগলো। রক্ত রঞ্জিত হয়ে গেল তাঁর পা। চলতে না পেরে মাঝে মাঝে তিনি বসে পড়তেন। লোকরা তাঁকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে আবার সেই আগের মতই পাথর নিক্ষেপ করতো। এভাবে ক্রমে তাঁর জীবন সংশয় দেখা দিল।
অবশেষে মহানবী মক্কায় ফেরার সিদ্ধান্ত নিলেন। এই সময় অত্যাচার আরও ভীষণ আকার ধারণ করল। একদিন তারা পাথরের আঘাতে আঘাতে তাঁর দেহ জর্জরিত করে তুললো। সর্বাঙ্গ থেকে রক্তের ধারা গড়িয়ে পড়তে লাগল। এক সময় অবসন্ন হয়ে পড়ে গেলেন মহানবী। ক্লান্ত অবসন্ন দেহটা নিয়ে মহানবী ঢুকে পড়লেন একটি আংগুর বাগানে।
দেহের প্রবাহিত রক্ত জুতায় প্রবেশ করে পায়ের সাথে জমাট বেঁধে গিয়েছিল। জুতা খুলতে খুবই কষ্ট হলো তাঁর। ওযু করে মহানবী বিশ্ব-জগতের মালিক প্রভুর উদ্দেশ্যে নামাযে তন্ময় হয়ে গেলেন। নামায শেষে প্রভুর উদ্দেশ্যে তিনি দু'টি প্রার্থনার হাত উত্তোলন করলেন। কি প্রার্থনা করলেন তিনি? তিনি কি নিজের কষ্ট লাঘবের জন্য দোয়া করলেন? নাকি তিনি তায়েফবাসীদের জন্য বদদোয়া করলেন? না তিনি এ সবের কিছুই করেননি। তিনি প্রভুর সমীপে দু'টি হাত তুলে বললেন, "হে আমার আল্লাহ, তোমাকে ডাকছি। নিজের এই দুর্বলতা, নিরুপায় অবস্থা সম্বন্ধে তোমার কাছেই অভিযোগ পেশ করছি। হে পরম দয়াময়, তুমিই যে দুর্বলের বল। প্রভূহে, তোমার সন্তোষই আমার একমাত্র কাম্য। তোমার সন্তোষ পেলে এসকল বিপদ-আপদের কোন পরওয়াই করিনা।"
মহানবী মক্কায় ফিরে চলেন। যখন তিনি তায়েফ ছাড়ছিলেন, তখন আল্লাহর নির্দেশে পাহাড়ের ফিরিশতা এসে তায়েফবাসীদেরকে পাহাড় চাপা দিয়ে মেরে ফেলার অনুমতি চাইলেন। মহানবী (সা) বললেন, 'আমি চাই তারা বেঁচে থাকুক। তাদের বংশধরগণ তো ইসলাম গ্রহণ করতে পারে।'