📄 বিদ্রূপ ও বৈরিতার ঝড়ে অটল পাহাড় মহানবী
কুরাইশ প্রধানরা ঠিক করল, মুহাম্মাদকে (সা) সমাবেশে হাজির করে সকলে মিলে তাকে বুঝাতে হবে, বুঝাপড়া তার সাথে একটা করে ফেলতে হবে। এই সিদ্ধান্ত অনুসারে মহানবীর কাছে একজন দূত পাঠানো হলো।
দূত গিয়ে মহানবীকে কুরাইশ দরবারে হাজির হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে বলল, 'আপনার স্বজাতীয় ভদ্রজনরা আপনার সাথে দু' একটা কথা বলতে চান'।
মহানবী এ খবর পাওয়ার পর বিন্দুমাত্র দ্বিধা করলেন না। উপস্থিত হলেন গিয়ে কুরাইশ দরবারে। শত্রু সমাবেশে তিনি হাজির হয়েছেন, এনিয়ে চিন্তার সামান্য লেשও তাঁর মধ্যে ছিল না। আরও অনেকের কাছে তিনি আল্লাহর দাওয়াত পৌঁছাতে পারবেন, এই মুহূর্তে এই আনন্দই তাঁর কাছে বড়।
কুরাইশ প্রধানরা উৎবার মত তাঁকে লক্ষ্য করে বলতে লাগল, "সম্মান, সম্পদ, সিংহাসন যা চাও দিতে প্রস্তুত আছি। তুমি আমাদের উপদেশ গ্রহণ কর, ইত্যাদি।
তাদের সব কথা শুনে মহানবী বললেন, "আমি আপনাদের কাছে সম্পদের ভিখারী নই, রাজা হবার আকাঙ্খা আমার নেই। প্রকৃত কথা এই যে, আল্লাহ সত্য ও জ্ঞানের আলোক দিয়ে ইহ-পরকালের মুক্তির পথ দেখানোর জন্য আমাকে আপনাদের কাছে পাঠিয়েছেন। এই বাণী গ্রহণ করলে এর দ্বারা আপনারাই ইহ-পরকালে সুফল পাবেন। আর যদি একে অস্বীকার করেন আমি ধৈর্য ধারণ করে থাকব- আল্লাহর যা ইচ্ছা তাই হবে।”
অনুরোধে-প্রলোভনে কোন ফল হলো না দেখে কুরাইশ প্রধানরা মহানবীকে ভীষণ ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করতে লাগল। কই, তোমার আল্লাহকে বলে আমাদের মরুভূমিতে ইরাকের ন্যায় নদ-নদী করে দাও দেখি, সুজলা-সুফলা করে দাও দেখি। অন্ততঃ তোমার জন্য কিছু কর। তোমার আল্লাহ দেবাত্মাকে তোমার সহচর করে দিক, বৃহৎ প্রাসাদ, স্বর্ণ-রৌপ্যের ভান্ডার তোমার জন্য এনে দিক, ইত্যাদি।
তাদের সব কথার উত্তরে মহানবী ধীর স্বরে বললেন, "এই পার্থিব ধন- সম্পদের জন্য আমি প্রার্থনা করতে পারি না, তা আমার কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত নয়।
আমি বিশ্ববাসীর কাছে এক মহাসত্যের প্রচারক রূপে প্রেরিত হয়েছি।"
পর পর ব্যর্থতায় এবং মহানবীর অচল-অটল দৃঢ়তায় কুরাইশ প্রধানরা ভীষণভাবে ক্ষেপে গেল। তারা কঠোর ভাষায় বলল, "মুহাম্মাদ, আমাদের সব কথা তোমাকে বলে দিয়েছি। অতঃপর সাবধান, নিশ্চিতরূপে স্মরণ রেখো আমরা আর তোমাকে অধর্মের কথাগুলো প্রচার করতে দেব না- দেহে প্রাণ থাকতে না। এতে হয় আমরা ধ্বংস হব, না হয় তুমি।” এই কথার পর সভাক্ষেত্রে হট্টগোল শুরু হয়ে গেল। নানা দিক থেকে অসহ্য বিদ্রূপ বাণ বর্ষিত হতে লাগল। কিন্তু কোন কিছুই মহানবীর মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারলো না। 'আপন কর্তব্য সম্পন্ন হয়েছে'- এমন প্রসন্নতা নিয়ে মহানবী ধীর পদক্ষেপে অটল পাহাড়ের ন্যায় সভা ক্ষেত্র থেকে চলে এলেন।
📄 সত্যের শক্তি
আদ দাউস গোত্রের সরদার তুফাইল ইবন আমর মক্কায় এলেন। তিনি ছিলেন কবি। বিজ্ঞতার জন্যেও বিখ্যাত। মক্কাবাসীরা নগরীর গেটে তাঁকে স্বাগত জানাল।
মক্কার সরদাররা তুফাইল ইবন আমরকে মুহাম্মাদ (সা)-এর সাথে দেখা না করার জন্যে সাবধান করে দিল। তারা জানাল, মুহাম্মাদ (সা)-এর কথা মক্কায় ভীষণ বিশৃংখলার সৃষ্টি করছে। সর্বত্র সে একটা খারাপ আবহাওয়া সৃষ্টি করছে।
তদনুসারে তুফাইল ইবন আমর মহানবী (সা)-এর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে লাগলেন। কখনও তিনি মহানবীর (সা) মুখোমুখি হলে চোখ বুঁজতেন এবং কান বন্ধ করতেন।
ঘটনাক্রমে একদিন যখন মহানবী (সা) কাবায় নামায পড়ছিলেন, তখন তাঁর কণ্ঠ নিঃসৃত কুরআন শরীফের কতগুলো আয়াত তুফাইলের কানে প্রবেশ করল। আয়াতগুলো তাঁর হৃদয়ে দারুণ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করল। কবি তুফাইল মহানবীর (সা) পিছু পিছু তাঁর বাড়ী গেলেন এবং তাঁকে ঐ আয়াতগুলো পুনরায় পাঠ করতে বলেন। মহানবী (সা) ঐ আয়াতগুলো পাঠ করলেন।
অভিভূত তুফাইল ইবন আমর সংগে সংগে ইসলাম গ্রহণ করেন।
📄 জাদুকর জামাদের কুরআন শোনা
জামাদ নামে ইয়ামেনের একজন কুখ্যাত যাদুকর মক্কায় এলো। সে কুরাইশদের আশ্বাস দিল মুহাম্মাদ (সা)-এর উপর দুষ্ট দেবতার যে আছর তা সে ছাড়িয়ে দেবে। কুরাইশরা খুব খুশী হলো।
জামাদ মহানবী (সা)-এর কাছে গিয়ে হাযির হলো এবং বলল যে, সে তাকে ভালো করে দেবে। মহানবী (সা) তাকে বললেন, তাহলে আগে আমার কিছু কথা শুনুন। তারপর মহানবী (সা) কুরআন থেকে কয়েকটি আয়াত পাঠ করলেন। জামাদ আয়াতগুলো শুনে চমৎকৃত হলো এবং আয়াতগুলো পুনরায় পাঠ করার জন্যে অনুরোধ করল।
মহানবী (সা) আয়াতগুলো দ্বিতীয়বার যখন পাঠ সমাপ্ত করলেন, তখন জামাদ চিৎকার করে বলে উঠল, "আমি বহু ভবিষ্যদ্বক্তা, যাদুকর ও কবির কথা শুনেছি, কিন্তু আল্লাহ সাক্ষী, এই কথাগুলোর কোন তুলনা নেই। অতলগভীর এই কথাগুলো।"
তারপর সে বলল, "হে মুহাম্মাদ, আপনার হাত এগিয়ে দিন। আমি আপনার আনুগত্যের শপথ করছি।”
📄 পোকা ধ্বংস করল বয়কটের দলিল
নববী ষষ্ঠ সনে কুরাইশরা মহানবী ও তাঁর গোত্রকে বয়কট করে সকলকে এক সাথে ধ্বংস করে ফেলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। এজন্য মক্কার সকল গোত্র একত্রিত হয়ে একটি দলিল সম্পাদন করল। দলিলে বলা হল: "মক্কার কোন ব্যক্তি বনু হাশিম গোত্রের সাথে আত্মীয়তা করবে না, তাদের কাছে কোন বস্তু ক্রয়-বিক্রয় করবে না, তাদের কাছে খাদ্য প্রেরণ করবে না। যতদিন পর্যন্ত তারা অর্থাৎ বনু হাশিম রাসূলকে (সা) হত্যার জন্য কুরাইশদের হাতে সমর্পণ না করবে ততদিন পর্যন্ত এই চুক্তি বলবৎ থাকবে।”
মহানবী বনু হাশিমের সমস্ত লোকজনসহ শি'আবে আবুতালিব গিরি- উপত্যকায় আশ্রয় গ্রহণ করলেন। সুদীর্ঘ তিন বছর তাঁরা অবরুদ্ধ অবস্থায় এই উপত্যকায় অবস্থান করলেন। এই বন্দী জীবন এত কঠোর ছিল যে, জঠরজ্বালা নিবারণের জন্য তাদেরকে গাছের পাতা খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করতে হয়েছে। সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস এক দিনের ঘটনা বলেছেন: সেদিন রাত্রিতে তিনি একটি শুকনা চামড়া আগুনে ঝলসিয়ে ক্ষুধার জ্বালা নিবারণ করেছিলেন।
ছোট ছোট শিশুরা যখন ক্ষুৎপিপাসায় কাতর হয়ে চীৎকার করত, তখন বাহির থেকে কুরাইশরা তা শুনে আনন্দে নৃত্য করত। আবার কোন কোন সহৃদয় ব্যক্তি এতে দুঃখিত হত।
একদিন হযরত খাদীজার (রা) ভ্রাতুষ্পুত্র হাকিম ইবনে হিযام স্বীয় দানের মাধ্যমে হযরত খাদীজার (রা) নিকট সামান্য পরিমাণ গম পাঠাচ্ছিল। কিন্তু পথের মধ্যে আবু জাহল তা দেখতে পেয়ে ছিনিয়ে নেবার উপক্রম করলে ঘটনাক্রমে আবুল বুখতারি সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। তিনি যদিও কাফির ছিলেন, তবু অন্তরে তাঁর দয়ামায়া ছিল। তিনি বললেন, ফুফুর কাছে সামান্য খাবার পাঠাচ্ছে তাতে তুমি বাধা দিচ্ছ কেন?
ধীরে ধীরে খোদ কুরাইশদের মধ্যেই চুক্তিভঙ্গের জন্য আন্দোলন শুরু হয়ে গেল। হিশাম ইবনে আমর নামক জনৈক ব্যক্তি বনু হাশিমের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ছিলেন এবং স্বীয় গোত্রের মধ্যেও অত্যন্ত বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসাবে পরিচিত ছিলেন। তিনি গোপনে গোপনে তাদের কাছে খাদ্য পাঠাতেন। তিনিই একদিন আবদুল মুত্তালিবের দৌহিত্র যুহাইরের নিকট গমন করে বললেন, "কি হে যুহাইর! তোমার কি পছন্দ হয় যে, তুমি প্রচুর পরিমাণে পানাহার করবে ও যাবতীয় আনন্দ উপভোগ করবে, আর তোমার মামার ভাগ্যে এক দানাও জুটবে না।
যুহাইর বললেন, "কি করব? আমি একা, যদি আমাকে সমর্থন করবার মত একজন লোকও পেতাম, তাহলে ঐ অন্যায় চুক্তিপত্র অবশ্যই ছিঁড়ে ফেলতাম।” হিশাম বললেন, "আমি তোমার সাথে আছি।”
অতঃপর তারা উভয়ে মিলে মুত'ইম ইবনে আদির কাছে উপস্থিত হলেন। অপরদিকে আবুল বুখতারি ইবনে হিশাম এবং যুম'আ ইবনুল আসওয়াদও তাঁদেরকে সমর্থন দান করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন। একদিন সকলে মিলে কা'বার অংগনে গমন করলেন। সেখানে যুহাইর সমবেত জনতাকে সম্বোধনপূর্বক জিজ্ঞাসা করলেন,
"হে মক্কাবাসীগণ! এটা কেমন কথা যে, আমরা সুখে-শান্তিতে দিন যাপন করব, আর বনু হাশিমদের ভাগ্যে সামান্য খাবারও জুটবে না? খোদার কসম! এই অন্যায় চুক্তিপত্র ছিঁড়ে না ফেলা পর্যন্ত আমি শান্ত হব না।” এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে আবু জাহল দাঁড়িয়ে ঘোষণা করল, "সাবধান, এই চুক্তিপত্রের বিরুদ্ধে কাকেও কিছু করতে দেয়া হবে না।” যুম'আ দাঁড়িয়ে পড়লেন, "তুমি মিথ্যাবাদী। এই চুক্তিপত্র সম্পাদনের সময় আমরা রাজি ছিলাম না।"
ঘুম'আর কথা শেষ হতেই আবুল বুখতারি দাঁড়িয়ে বলল, "কি ছাইভস্ম লেখা হয়েছে এতে, আমরা মোটেও খুশী নই, ওসব লেখা-টেখা আমরা মানিও না।” বুখতারি থামতেই মুতইম লাফিয়ে উঠে বলল, "তোমরা দু'জন ঠিকই বলেছ। ভিন্ন কথা যে বলবে, সে-ই হবে মিথ্যাবাদী।” হিশাম তাকে সমর্থন করল।
আবু জাহল বলল, মনে হয় তোমরা আগে-ভাগে জোট বেঁধে এসেছ।
এসব বাক-বিতন্ডার মধ্যে মুতইম লাফ দিয়ে উঠে কা'বার দেওয়াল থেকে বয়কটের দলিলটি নামিয়ে আনল ছিঁড়ে ফেলার জন্যে।
কিন্তু ছিঁড়ে ফেলতে হলো না। আল্লাহর পোকা-সৈনিকরা অনেক আগেই ধ্বংস করেছিল অন্যায় দলিলটিকে। দেখা গেল দলিলের সব শব্দ, সব কথা পোকায় খেয়ে ফেলেছে, অক্ষত রয়েছে একমাত্র 'বিসমিকা আল্লাহুম্মা' শব্দ।