📘 আমরা সেই জাতি > 📄 হারিসের শাহাদাত দিয়ে শুরু হলো রক্তরঞ্জিত পথের

📄 হারিসের শাহাদাত দিয়ে শুরু হলো রক্তরঞ্জিত পথের


মক্কার ঘরে ঘরে এখন তাওহীদের দাওয়াত মুখ্য আলোচনার বিষয়। এই আলোচনার মধ্য দিয়ে ইসলামের দাওয়াত মক্কার সমাজ-জীবনের গভীর থেকে গভীরে প্রবেশ করতে লাগল। সেই সাথে বিস্তার ঘটতে লাগল প্রতিক্রিয়ারও। ইসলামের ধীরগতি বিস্তার আবু লাহাবদের দৃষ্টি এড়ালো না। শক্তির জোরে বাধা দেয়ার একটা মানসিকতা তাদের মধ্যে দানা বেঁধে উঠল। কিন্তু আল্লাহর নবী এই ইবলিসী প্রতিক্রিয়ার প্রতি ভূক্ষেপ করবেন কেন? হকের দাওয়াত অবিরাম পৌঁছিয়েই চলতে হবে- মানুষের ঘরে ঘরে প্রতিটি কানে কানে।
মহানবী সাফা পর্বতে দাঁড়িয়ে দাওয়াত দিয়েছেন। কিন্তু সমাজের মিলন কেন্দ্র আল্লাহর ঘর কা'বায় গিয়ে মানুষের কাছে তাঁর দাওয়াত পৌঁছানো হয়নি এখনও।
একদিন কতিপয় মুসলিম সাথী নিয়ে তিনি কা'বায় এলেন। সেখানে অনেক মানুষ- কা'বার চারদিকের বাসিন্দা। সবাই নবীর (সা) স্বজন-স্বগোত্র। মহানবী (সা) সেখানে হাজির হয়ে ইসলামের কথা, তাওহীদের দাওয়াত উচ্চারণ করছিলেন। প্রতিক্রিয়ার আগুন জ্বলে উঠল সংগে সংগেই।
প্রথমে কানা-কানি, তারপর শোরগোল। প্রতিক্রিয়ার শক্তি এই প্রথমবারের মত সংঘবদ্ধভাবে নবীর (সা) উপর দৈহিক আক্রমণের ঔদ্ধত্য নিয়ে ছুটে এল। খাদীজার সন্তান (পূর্বস্বামীর) তরুণ মুসলিম হারিস ইবনে আবিহালাহ তাদের সামনে দাঁড়ালেন। প্রতিবাদ করলেন। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সমস্ত ক্রোধ গিয়ে তাঁর উপর পড়ল। আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হলেন হারিস। তাঁর দেহের লাল রক্তের স্রোত রঞ্জিত করলো কাবার চত্বরকে। হারিস শহীদ হলেন- ইসলামের প্রথম শহীদ।
আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার ছোট্ট কাফিলা এই প্রথম এক জীবনের কুরবানী দিল। শুরু হলো প্রতিক্রিয়ার সাথে সেই চিরন্তনী সংঘাত আর রক্তরঞ্জিত পথযাত্রার।

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 তাহলে মুহাম্মদের যাদু তোমাকেও ধরেছে

📄 তাহলে মুহাম্মদের যাদু তোমাকেও ধরেছে


কুরাইশ প্রধানরা শলাপরামর্শ করে ঠিক করল মুহাম্মাদকে তার বাঞ্ছিত কিছু দিয়ে নিরস্ত্র করাই বুদ্ধিমানের কাজ। সকলে মিলে মক্কার বিখ্যাত ধনী ও সর্দার উৎত্তাকে দূত হিসাবে ঠিক করল।
সে সময় মহানবী (সা) কাবা গৃহে একাকী বসেছিলেন। এই সুযোগে কুরাইশ প্রধানদের দূত হিসেবে উৎবা এসে তাঁর কাছে উপবেশন করলেন। তারপর রাসূসুল্লাহকে (সা) লক্ষ্য করে নরম সুরে বলতে লাগলেন, 'দেখ বাছা, তুমি আমাদের পর নও, কিন্তু যে বিপ্লব নিয়ে আসছ তা কি, তুমি জান। পূর্ব-পুরুষের ধর্ম থেকে আমাদের বিচ্ছিন্ন করে নতুন এক অভিনব ধর্ম সৃষ্টি করছ ....। এরূপ করার উদ্দেশ্য কি আজ তুমি আমাকে খুলে বল। ধন যদি চাও তাহলে আমরা তোমার পদপ্রান্তে স্বর্ণ ও রৌপ্যের স্তূপ এনে দেব। সম্মান যদি চাও তাহলে আমরা সকলে এক বাক্যে তোমাকে প্রধান হিসাবে মেনে নেব। রাজত্ব করার আকাংখা যদি থাকে তাহলে আমাদের বল, তোমাকে গোটা আরবের অধিপতি পদে অভিষিক্ত করব। সব কিছুর বিনিময়ে তোমার কাছে আমাদের শুধু প্রার্থনা তোমার ঐ অভিনব ধর্মের কথা তুমি একেবারে তুলে যাও।”
উৎবার দীর্ঘ বক্তব্য শেষ হলে মহানবী (সা) হা-মীম আস্ সাজদাহ সূরা থেকে পাঠ করতে শুরু করলেনঃ "হা-মীম, দয়ালু করুণাময়ের পক্ষ থেকে এই গ্রন্থ, যার বাণীগুলি বিজ্ঞ লোকদের জন্য স্পষ্ট আরবী ভাষায় বিশদরূপে বিবৃত হয়েছে এবং যা (পুণ্যের পুরস্কারের) সুসংবাদ দান করে ও পাপের (দন্ড সম্বন্ধে) সতর্ক করে থাকে। অনন্তর তাদের অধিকাংশই মুখ ফিরিয়ে নিল, তারা (উপদেশ) শ্রবণ (গ্রহণ) করে না। তারা বলে, যে (তাওহীদের) দিকে আমাদেরকে আহবান করছে, আমরা তার ধারণা করতে পারিনা, তোমার কথা আমাদের কর্ণে প্রবেশও করে না। আর আমাদের ও তোমার মধ্যে একটা যবনিকা পড়ে আছে। অতএব তুমি চেষ্টা করতে থাক, আমরা চেষ্টায় রইলাম।"
এইভাবে মহানবী (সা) সূরার পাঁচটি রুকু তেলাওয়াত করলেন। অবশেষে সিজদার আয়াতে এসে সিজদা করে তেলাওয়াত শেষ করলেন।
উৎবা মন্ত্রমুগ্ধের মত সবকিছু শুনলেন। কুরআনের সুললিত ছন্দ ও কথা তাঁকে একেবারে অভিভূত করল। এত সম্পদ, এত সম্মান, এত বড় রাজ সিংহাসনের লোভ এমন অবলিলাক্রমে প্রত্যাখ্যান করতে দেখে উৎবা স্তম্ভিত হলেন। তিনি আনন্দ ও বিষাদে পূর্ণ এক মানসিক অবস্থা নিয়ে কুরাইশ সর্দারদের মজলিসে গিয়ে উপস্থিত হলেন। সকলের সাগ্রহ প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, "সেখানে যা' শুনলাম আল্লাহর শপথ তেমন আর কখনও শুনিনি, আল্লাহর শপথ, ভাষার দিক দিয়ে তা' কখনই কবির রচনা নয় এবং ভাবের দিক দিয়ে কখনই তা' যাদুমন্ত্র নয়। হে কুরাইশ সমাজ, আমার উপদেশ, এই ব্যক্তি যা' করে করুক তা' নিয়ে তোমরা আর গন্ডগোল করো না।"
উৎবার কথা কুরাইশ প্রধানদের চমকে দিল। তারা বলে উঠল, 'তাহলে মুহাম্মদের যাদু তোমার উপরও কাজ করতে শুরু করেছে!'

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 বিদ্রূপ ও বৈরিতার ঝড়ে অটল পাহাড় মহানবী

📄 বিদ্রূপ ও বৈরিতার ঝড়ে অটল পাহাড় মহানবী


কুরাইশ প্রধানরা ঠিক করল, মুহাম্মাদকে (সা) সমাবেশে হাজির করে সকলে মিলে তাকে বুঝাতে হবে, বুঝাপড়া তার সাথে একটা করে ফেলতে হবে। এই সিদ্ধান্ত অনুসারে মহানবীর কাছে একজন দূত পাঠানো হলো।
দূত গিয়ে মহানবীকে কুরাইশ দরবারে হাজির হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে বলল, 'আপনার স্বজাতীয় ভদ্রজনরা আপনার সাথে দু' একটা কথা বলতে চান'।
মহানবী এ খবর পাওয়ার পর বিন্দুমাত্র দ্বিধা করলেন না। উপস্থিত হলেন গিয়ে কুরাইশ দরবারে। শত্রু সমাবেশে তিনি হাজির হয়েছেন, এনিয়ে চিন্তার সামান্য লেשও তাঁর মধ্যে ছিল না। আরও অনেকের কাছে তিনি আল্লাহর দাওয়াত পৌঁছাতে পারবেন, এই মুহূর্তে এই আনন্দই তাঁর কাছে বড়।
কুরাইশ প্রধানরা উৎবার মত তাঁকে লক্ষ্য করে বলতে লাগল, "সম্মান, সম্পদ, সিংহাসন যা চাও দিতে প্রস্তুত আছি। তুমি আমাদের উপদেশ গ্রহণ কর, ইত্যাদি।
তাদের সব কথা শুনে মহানবী বললেন, "আমি আপনাদের কাছে সম্পদের ভিখারী নই, রাজা হবার আকাঙ্খা আমার নেই। প্রকৃত কথা এই যে, আল্লাহ সত্য ও জ্ঞানের আলোক দিয়ে ইহ-পরকালের মুক্তির পথ দেখানোর জন্য আমাকে আপনাদের কাছে পাঠিয়েছেন। এই বাণী গ্রহণ করলে এর দ্বারা আপনারাই ইহ-পরকালে সুফল পাবেন। আর যদি একে অস্বীকার করেন আমি ধৈর্য ধারণ করে থাকব- আল্লাহর যা ইচ্ছা তাই হবে।”
অনুরোধে-প্রলোভনে কোন ফল হলো না দেখে কুরাইশ প্রধানরা মহানবীকে ভীষণ ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করতে লাগল। কই, তোমার আল্লাহকে বলে আমাদের মরুভূমিতে ইরাকের ন্যায় নদ-নদী করে দাও দেখি, সুজলা-সুফলা করে দাও দেখি। অন্ততঃ তোমার জন্য কিছু কর। তোমার আল্লাহ দেবাত্মাকে তোমার সহচর করে দিক, বৃহৎ প্রাসাদ, স্বর্ণ-রৌপ্যের ভান্ডার তোমার জন্য এনে দিক, ইত্যাদি।
তাদের সব কথার উত্তরে মহানবী ধীর স্বরে বললেন, "এই পার্থিব ধন- সম্পদের জন্য আমি প্রার্থনা করতে পারি না, তা আমার কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত নয়।
আমি বিশ্ববাসীর কাছে এক মহাসত্যের প্রচারক রূপে প্রেরিত হয়েছি।"
পর পর ব্যর্থতায় এবং মহানবীর অচল-অটল দৃঢ়তায় কুরাইশ প্রধানরা ভীষণভাবে ক্ষেপে গেল। তারা কঠোর ভাষায় বলল, "মুহাম্মাদ, আমাদের সব কথা তোমাকে বলে দিয়েছি। অতঃপর সাবধান, নিশ্চিতরূপে স্মরণ রেখো আমরা আর তোমাকে অধর্মের কথাগুলো প্রচার করতে দেব না- দেহে প্রাণ থাকতে না। এতে হয় আমরা ধ্বংস হব, না হয় তুমি।” এই কথার পর সভাক্ষেত্রে হট্টগোল শুরু হয়ে গেল। নানা দিক থেকে অসহ্য বিদ্রূপ বাণ বর্ষিত হতে লাগল। কিন্তু কোন কিছুই মহানবীর মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারলো না। 'আপন কর্তব্য সম্পন্ন হয়েছে'- এমন প্রসন্নতা নিয়ে মহানবী ধীর পদক্ষেপে অটল পাহাড়ের ন্যায় সভা ক্ষেত্র থেকে চলে এলেন।

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 সত্যের শক্তি

📄 সত্যের শক্তি


আদ দাউস গোত্রের সরদার তুফাইল ইবন আমর মক্কায় এলেন। তিনি ছিলেন কবি। বিজ্ঞতার জন্যেও বিখ্যাত। মক্কাবাসীরা নগরীর গেটে তাঁকে স্বাগত জানাল।
মক্কার সরদাররা তুফাইল ইবন আমরকে মুহাম্মাদ (সা)-এর সাথে দেখা না করার জন্যে সাবধান করে দিল। তারা জানাল, মুহাম্মাদ (সা)-এর কথা মক্কায় ভীষণ বিশৃংখলার সৃষ্টি করছে। সর্বত্র সে একটা খারাপ আবহাওয়া সৃষ্টি করছে।
তদনুসারে তুফাইল ইবন আমর মহানবী (সা)-এর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে লাগলেন। কখনও তিনি মহানবীর (সা) মুখোমুখি হলে চোখ বুঁজতেন এবং কান বন্ধ করতেন।
ঘটনাক্রমে একদিন যখন মহানবী (সা) কাবায় নামায পড়ছিলেন, তখন তাঁর কণ্ঠ নিঃসৃত কুরআন শরীফের কতগুলো আয়াত তুফাইলের কানে প্রবেশ করল। আয়াতগুলো তাঁর হৃদয়ে দারুণ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করল। কবি তুফাইল মহানবীর (সা) পিছু পিছু তাঁর বাড়ী গেলেন এবং তাঁকে ঐ আয়াতগুলো পুনরায় পাঠ করতে বলেন। মহানবী (সা) ঐ আয়াতগুলো পাঠ করলেন।
অভিভূত তুফাইল ইবন আমর সংগে সংগে ইসলাম গ্রহণ করেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00