📄 হে মুমিনগণ, তোমরাই বিজয়ী
আমার প্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ, আপনাদের সামনে দারুণ একটি আয়াত উপস্থাপন করতে যাচ্ছি। প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহ তাআলার প্রতিটি আয়াতই দারুণ। তবে এই আয়াতটি মহা অনুগ্রহশীল প্রভুর একটি বিশেষ গুপ্তধন, পরম করুণাময় সত্তার বিশেষ অনুদান।
وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنْتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ
'তোমরা হীনবল হয়ো না এবং দুঃখিতও হয়ো না; তোমরাই বিজয়ী হবে, যদি তোমরা মুমিন হও।'
তোমরা কি জানো, হে মুসলিমগণ, আয়াতটি কখন নাজিল হয়েছিল?
এই আয়াত নাজিল হয়েছিল উহুদ যুদ্ধে পরাজয়ের পরে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের জানিয়ে দিতে চেয়েছেন যে, গৌরব ও শ্রেষ্ঠত্ব সাময়িক পরাজয়ের দ্বারা প্রভাবিত হয় না। এ দুটি বিষয় চক্ষুষ্মান বিজয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। নির্ভর করে না প্রত্যক্ষ কর্তৃত্বের ওপরও। এ আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের এও জানিয়ে দিয়েছেন যে, সময় আবর্তিত হতে থাকে এবং ইতিহাস বারে বারে তার রূপ পাল্টায়। আজ আমাদের সময় তো কাল ওদের সময়—এভাবে ঘুরতে থাকে সময়ের চাকা। তবে সময়ের শেষ পর্বটি হবে মুমিনদের বিজয় ও কর্তৃত্বের, ইনশাআল্লাহ।
হে মুমিনগণ, হে আল্লাহর বান্দাগণ!
• তোমরাই বিজয়ী। কারণ তোমরা যাঁর ইবাদত করো, তিনি ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই। তিনি সকল দোষত্রুটি ও দুর্বলতার ঊর্ধ্বে।
وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُعْجِزَهُ مِنْ شَيْءٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ إِنَّهُ كَانَ عَلِيمًا قَدِيرًا
'আল্লাহ এমন নন যে, আকাশমণ্ডলী এবং পৃথিবীর কোনো কিছুই তাঁকে অক্ষম করতে পারে; তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।
• তোমরাই বিজয়ী। কারণ তোমরা যাঁর আদর্শ অনুসরণ করো, তিনি হচ্ছেন সর্বশেষ নবি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, রাসুলগণের নেতা মুহাম্মাদ। তাঁর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা কুফরের প্রভাব মিটিয়েছেন, তাঁকে কেন্দ্র করে সকল সত্যান্বেষীদের একীভূত করেছেন এবং তাঁর মাধ্যমেই নবুওয়তের ধারা সমাপ্ত করেছেন।
• তোমরাই বিজয়ী। কারণ তোমরা যে কিতাবকে নিজেদের জীবনবিধান মনে করো, তা হচ্ছে সেই কুরআন, যাতে আছে তোমাদের আগের ও পরের সকল সংবাদ এবং তোমাদের জীবন পরিচালনা করার সুন্দর নীতিমালা। যে জালিমরা এই কিতাবের বিরোধিতা করবে, আল্লাহ তাদের ধ্বংস করবেন। যারা এই কিতাবের বাইরে জ্ঞান আহরণ করবে, তারা পথহারা হবে। এটি আল্লাহর শক্ত রজ্জু, দীপ্তিময় আলো, উপকারী শিফা। যে তাকে আঁকড়ে ধরে, সে সুরক্ষিত থাকে। যে তার দিকনির্দেশনা মেনে চলে, সে মুক্তি পায়। কেউ পথভ্রষ্ট হলে এ কিতাব তাকে সরল পথের দিশা দেয়। এ কিতাবের প্রতি মুগ্ধতার কোনো শেষ নেই। বারবার পড়লেও কোনোদিন বিরক্তি আসে না।
• তোমরাই বিজয়ী। কারণ তোমাদের ধর্ম হচ্ছে ইসলাম—যা দ্বীন ও দুনিয়া, দেহ ও আত্মা এবং মন ও বিবেকের সমন্বিত জীবনদর্শন। এই ধর্মে এমন কিছু নেই, যা আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করে দেননি।
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
'আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।'
• তোমরাই বিজয়ী। কারণ তোমাদের মাঝে আছে পূর্ণাঙ্গ নৈতিকতা। রাসুল ইরশাদ করেছেন:
إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الْأَخْلَاقِ
'আমি তো নৈতিক চরিত্রের পূর্ণতা-দানের উদ্দেশ্যে প্রেরিত হয়েছি।'
• তোমরাই বিজয়ী। কারণ তোমাদের পরস্পরের মাঝে আছে সুদৃঢ় সম্পর্ক ও হৃদ্যতা।
لَوْ أَنْفَقْتَ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا مَا أَلَّفْتَ بَيْنَ قُلُوبِهِمْ وَلَكِنَّ اللهَ أَلَّفَ بَيْنَهُمْ إِنَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
'পৃথিবীর যাবতীয় সম্পদ ব্যয় করলেও তুমি তাদের হৃদয়ে সম্প্রীতি স্থাপন করতে পারতে না; কিন্তু আল্লাহ তাদের মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপন করেছেন। নিশ্চয়ই তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। '
• তোমরাই বিজয়ী। কারণ তোমাদের হৃদয়ে আছে প্রশান্তি ও নিশ্চিন্ততা।
وَمَا جَعَلَهُ اللَّهُ إِلَّا بُشْرَى وَلِتَطْمَئِنَّ بِهِ قُلُوبُكُمْ وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
'আল্লাহ তা করেন কেবল শুভ সংবাদ দেওয়ার জন্য এবং এ উদ্দেশ্যে যে, যাতে তোমাদের চিত্ত প্রশান্তি লাভ করে। এবং সাহায্য তো শুধু আল্লাহর নিকট হতেই আসে। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’
• তোমরাই বিজয়ী। কেননা তোমাদের প্রতিশ্রুত ঠিকানা হচ্ছে জান্নাত।
إِنَّهُ كَانَ فَرِيقٌ مِنْ عِبَادِي يَقُولُونَ رَبَّنَا آمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا وَأَنْتَ خَيْرُ الرَّاحِمِينَ - فَاتَّخَذْتُمُوهُمْ سِخْرِيًّا حَتَّى أَنْسَوْكُمْ ذِكْرِي وَكُنْتُمْ مِنْهُمْ تَضْحَكُونَ - إِنِّي جَزَيْتُهُمُ الْيَوْمَ بِمَا صَبَرُوا أَنَّهُمْ هُمُ الْفَائِزُونَ
'আমার বান্দাদের মধ্যে একদল ছিল, যারা বলত, “হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা ইমান এনেছি, আপনি আমাদের ক্ষমা করুন এবং দয়া করুন; আপনি তো শ্রেষ্ঠ দয়ালু।” কিন্তু তাদের নিয়ে তোমরা এত ঠাট্টা-বিদ্রুপ করতে যে, তা তোমাদেরকে আমার কথা ভুলিয়ে দিয়েছিল। তোমরা তো তাদের নিয়ে হাসি-ঠাট্টাই করতে। আমি আজ তাদেরকে তাদের ধৈর্যের কারণে এমনভাবে পুরস্কৃত করলাম যে, তারাই হলো সফলকাম।'
হে ধৈর্যশীল মুমিনগণ, তোমরাই বিজয়ী হবে, তোমরাই সফলকাম হবে, ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
৫০. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১৩৯।
৫১. সুরা ফাতির, ৩৫:৪৪।
৫২. সুরা আল-মায়িদা, ৫: ৩।
৫৩. আস-সুনানুল কুবরা লিল-বাইহাকি : ২০৭৮২।
৫৪. সুরা আল-আনফাল, ৮: ৬৩।
৫৫. সুরা আল-আনফাল, ৮: ১০।
৫৬. সুরা আল-মুমিনুন, ২৩ : ১০৯-১১১।
📄 পরিশিষ্ট
আমার প্রিয় দ্বীনি ভাই ও বন্ধু, হে মুসলিম, হে আল্লাহর বান্দা!
তোমাকে পাথর ও গাছপালাও ডেকে ডেকে বলে, হে মুসলিম, হে আল্লাহর বান্দা!
অশ্রু মুছে ফেলো। দুর্বলতা, সংকীর্ণতা কাটিয়ে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াও। জেনে রাখো, সামনের দিনগুলো তোমারই হবে, অন্য কারও নয়। ভবিষ্যৎ পৃথিবী তোমার ধর্মের অনুকূল হবে, অন্য কোনো ধর্মের নয়। আর সর্বাবস্থায় উত্তম পরিণাম তো মুত্তাকিদের জন্যই। জেনে রাখো, কষ্ট করলে ফল মেলে আর সবুরে মেওয়া ফলে। ধৈর্য ধরো, হতাশ হোয়ো না, বিশ্বাস হারিও না। অবশ্যই বিজয় আসবে। কারণ, কষ্টের মাঝে নিহিত থাকে স্বস্তি।
মনে রাখবে, রাত যত গভীর হয়, সুবহে সাদিক তত নিকটে চলে আসে। তিমির অমানিশার বিভীষিকাময় রাত পেরিয়ে ফজরের আগমন ঘটে। যতক্ষণ তুমি আল্লাহকে সাহায্য করবে, ততক্ষণ তিনিও তোমাকে সহযোগিতা করবেন। যতক্ষণ তুমি তাঁর সাথে থাকবে, তিনিও তোমার সাথে আছেন। যদি তুমি তাঁর পথে জিহাদ করো, তিনি অবশ্যই তোমাকে তাঁর সিরাতে মুসতাকিমের ওপর অটল-অবিচল রাখবেন।
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ
যারা আমার জন্য জিহাদ করে, আমি তাদেরকে অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করব। আল্লাহ অবশ্যই সৎকর্মপরায়ণদের সঙ্গে থাকেন।
فَسَتَذْكُرُونَ مَا أَقُولُ لَكُمْ وَأُفَوِّضُ أَمْرِي إِلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ بَصِيرٌ بِالْعِبَادِ
'আমি তোমাদের যা বলছি, তোমরা তা অচিরেই স্মরণ করবে এবং আমি আমার ব্যাপার আল্লাহর ওপর অর্পণ করছি; আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি সবিশেষ দৃষ্টি রাখেন।
পরিশেষে বলি, মহান আল্লাহ যতটুকু তাওফিক দিয়েছেন ততটুকু বলার চেষ্টা করেছি। ভুলত্রুটির জন্য তাঁর কাছেই ক্ষমা চাই। আমার জন্য, আপনাদের জন্য, সবার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আল্লাহ তাআলা আপনাদের সকলকে উত্তম প্রতিদান দান করুন (আমিন)।
টিকাঃ
৫৭. সুরা আল-আনকাবুত, ২৯ : ৬৯।
৫৮. সুরা গাফির, ৪০ : ৪৪।