📘 আমরা অজেয় অনিবার্য বিজয়ের হাতছানি > 📄 চতুর্থ বাস্তবতা : কুরআন-হাদিসের সুসংবাদ

📄 চতুর্থ বাস্তবতা : কুরআন-হাদিসের সুসংবাদ


'হে মুসলিম সম্প্রদায়, যারা নিজেদের প্রতিপালক নিয়ে গৌরবান্বিত...
যাকে তোমরা প্রতিপালক বলে বিশ্বাস করো, তিনি মহান, মহীয়ান ও মহিমান্বিত প্রভু। তিনি পরম করুণাময়, মহানুভব, পরম স্নেহপরায়ণ মাবুদ। তিনি তাঁর মহিমান্বিত কিতাবে তোমাদের সুসংবাদ জানিয়ে বলেন:
وَكَانَ حَقًّا عَلَيْنَا نَصْرُ الْمُؤْمِنِينَ
'মুমিনদের সাহায্য করা আমার দায়িত্ব।'
কী দারুণ সুসংবাদ! ওয়াল্লাহি, পবিত্র কুরআনে এটি ছাড়া যদি অন্য কোনো সুসংবাদসুলভ আয়াত নাও থাকত, এই একটি আয়াতই যথেষ্ট হতো! স্বয়ং সর্বশক্তিমান প্রভু মুসলিমদের সাহায্য করার দায়িত্ব নিয়েছেন এবং রীতিমতো ঘোষণা দিয়ে তা নিজের ওপর আবশ্যক করে নিয়েছেন! এর চেয়ে বড় সুসংবাদ আর কী হতে পারে!?

তদুপরি, এ সাহায্য কেবল আখিরাতে মুসলিমদের জান্নাতদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আখিরাতের মতো দুনিয়াতেও তিনি মুসলিমদের সাহায্য করবেন। তিনি বলেন:
إِنَّا لَتَنْصُرُ رُسُلَنَا وَالَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ يَقُومُ الْأَشْهَادُ
'নিশ্চয় আমি আমার রাসুলদের ও মুমিনদের সাহায্য করব দুনিয়ার জীবনে এবং যেদিন সাক্ষীগণ দণ্ডায়মান হবে।'
আল্লাহর সাফ ওয়াদা, তিনি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জাহানে মুমিনদের সাহায্য করবেন। যদি মুমিনরা সত্যিকার অর্থে মুমিন হয়, তাহলে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তাদের সহযোগিতা করবেন। তিনি যা ওয়াদা দিয়েছেন, তা অবশ্যই পালন করবেন। কারণ তিনি কক্ষনো ওয়াদার বরখেলাফ করেন না। আরেক আয়াতে তিনি বলেন:
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَى لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُمْ مِنْ بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا وَمَنْ كَفَرَ بَعْدَ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
'তোমাদের মধ্যে যারা ইমান আনে এবং সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, তিনি অবশ্যই তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন, যেমন প্রতিনিধিত্ব দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই তাদের জন্য প্রতিষ্ঠিত করবেন তাদের দ্বীনকে, যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়ভীতির পরিবর্তে তাদের অবশ্যই নিরাপত্তা দান করবেন। তারা আমার ইবাদত করবে, আমার সাথে সাথে কোনোকিছু শরিক করবে না। অতঃপর যারা অকৃতজ্ঞ হবে, তারা তো সত্যত্যাগী।'
আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, যদি মুমিনরা ইমান, সৎকর্ম ও ইখলাসপূর্ণ ইবাদত আঁকড়ে ধরে এবং শিরক থেকে মুক্ত থাকে, তাহলে পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব লাভ করবে তারা। দ্বীনের বিজয় হবে। ভয়ভীতি বিতাড়িত হয়ে শান্তি ও নিরাপত্তার আগমন ঘটবে। এ কিন্তু সাধারণ কোনো মানুষের ওয়াদা নয়; বরং ভূমণ্ডল ও নভোমণ্ডলের একচ্ছত্র অধিপতি, রাজাধিরাজ, মহা শক্তিধর, প্রতাপশালী সত্তার দেওয়া অঙ্গীকার।

হে মুসলিমগণ,
বনু নাজির যুদ্ধের এই বিস্ময়কর ও গৌরবময় চিত্রের প্রতি নজর বুলাও, যেখানে আল্লাহ বলছেন:
هُوَ الَّذِي أَخْرَجَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ مِنْ دِيَارِهِمْ لِأَوَّلِ الْحَشْرِ مَا ظَنَنْتُمْ أَنْ يَخْرُجُوا
'তিনিই কিতাবিদের মধ্যে যারা কাফির তাদেরকে প্রথমবার সমবেতভাবে তাদের আবাসভূমি থেকে বিতাড়িত করেছিলেন। তোমরা কল্পনাও কর নাই যে, তারা নির্বাসিত হবে।'
অর্থাৎ তোমরা যুদ্ধরত মুমিনরা যখন দেখতে পেয়েছিলে তাদের দুর্গসমূহের প্রতিরোধ ক্ষমতা ও সুদৃঢ়তা, তখন মনে করেছিলে যে, ইহুদিদের পরাজিত করা অসম্ভব। وَظَنُّوا 'এবং তারা মনে করেছিল', অর্থাৎ ইহুদিরা মনে করেছিল أَنَّهُمْ مَانِعَتُهُمْ حُصُونُهُمْ مِنَ اللَّهِ 'তাদের দুর্গগুলো তাদের রক্ষা করবে আল্লাহ থেকে।'
কিন্তু ফলাফল কী হয়েছিল?
فَأَتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ حَيْثُ لَمْ يَحْتَسِبُوا وَقَذَفَ فِي قُلُوبِهِمُ الرُّعْبَ يُخْرِبُونَ بُيُوتَهُمْ بِأَيْدِيهِمْ وَأَيْدِي الْمُؤْمِنِينَ
'আল্লাহর শাস্তি এমন এক দিক থেকে আসলো, যা ছিল ওদের ধারণাতীত এবং তাদের অন্তরে তা ত্রাসের সঞ্চার করল। ওরা ধ্বংস করে ফেলল নিজেদের বাড়ি-ঘর নিজেদের হাতে এবং মুমিনদের হাতেও।'
অতঃপর পুরো ঘটনার ওপর মনোযোগ আকর্ষণ করে আল্লাহ বলেন:
فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الْأَبْصَارِ
'অতএব হে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিগণ, তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো।'
এই পুরো ঘটনা তুলে ধরার উদ্দেশ্য হলো, যাতে আমরা এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি। কারণ কুরআন ইতিহাসগ্রন্থ নয়। এটি একটি মহান কিতাব, যা আমাদের সামনে জীবনচলার পথ স্পষ্ট করে এবং সিরাতে মুসতাকিম (সরল পথ) দেখিয়ে দেয়।

হে মুসলিমগণ, যারা নিজেদের রাসুলকে নিয়ে গর্বিত...
তোমরা কি শোননি, সহিহ মুসলিমে সাওবান (রাঃ) বর্ণিত একটি হাদিসে তোমাদের প্রিয় রাসুল ﷺ কী বলেছেন? তিনি বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ زَوَى لِي الْأَرْضَ، فَرَأَيْتُ مَشَارِقَهَا وَمَغَارِبَهَا، وَإِنَّ أُمَّتِي سَيَبْلُغُ مُلْكُهَا مَا زُوِيَ لِي مِنْهَا
‘আল্লাহ তাআলা গোটা পৃথিবীকে আমার সামনে সংকুচিত করে দিলেন। ফলে আমি তার পূর্ব-পশ্চিম গোটা অঞ্চল দেখতে পেলাম। আর আমার উম্মতের রাজত্ব পৃথিবীর ওই পর্যন্ত পৌঁছবে, যে পর্যন্ত সংকুচিত করে আমাকে দেখানো হয়েছে।'
হ্যাঁ, আমার প্রিয় ভাইয়েরা, অচিরেই মুসলিমদের রাজত্ব পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়বে, পূর্ব-পশ্চিমের যত অর্থ হতে পারে সকল অর্থে।
অনুরূপভাবে ইমাম আহমাদ, তাবারানি ও ইবনে হিব্বান (রাহিমাহুমুল্লাহ) তামিম দারি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমি রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি:
لَيَبْلُغَنَّ هَذَا الْأَمْرُ مَا بَلَغَ اللَّيْلُ وَالنَّهَارُ، وَلَا يَتْرُكُ اللَّهُ بَيْتَ مَدَرٍ وَلَا وَبَرٍ إِلَّا أَدْخَلَهُ اللهُ هَذَا الدِّينَ، بِعِزَّ عَزِيزٍ أَوْ بِذُلَّ ذَلِيلٍ، عِزَّا يُعِزُّ اللَّهُ بِهِ الْإِسْلَامَ، وَذُلَّا يُذِلُّ اللَّهُ بِهِ الْكُفْرَ
'অবশ্যই এই বিষয় (ইসলাম) পৌঁছে যাবে যতটুকু দিন ও রাত পৌঁছায় (অর্থাৎ পুরো পৃথিবীতে)। প্রতিটি পাথরের (শহরের) বাড়ি ও পশমের (গ্রামের) বাড়িতে আল্লাহ তাআলা এ ধর্মকে প্রবেশ করাবেন। (অর্থাৎ শহর ও গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে ইসলাম প্রবেশ করবে।) হয়তো সম্মানিতের সম্মানের মাধ্যমে অথবা লাঞ্ছিতের লাঞ্ছনার মাধ্যমে। এমন সম্মান, যার দ্বারা আল্লাহ ইসলামকে সম্মানিত করবেন এবং এমন অসম্মান, যার দ্বারা আল্লাহ কুফরিকে লাঞ্ছিত করবেন।' (অর্থাৎ সব বাড়িতে ইসলাম ঢুকে পড়বে। কিছু বাড়ির লোকজন ইসলাম কবুল করার মাধ্যমে ইসলামকে নিজেদের বাড়িতে প্রবেশ করাবে আর সম্মানিত হবে। আর কিছু বাড়ির লোকেরা কুফরের ওপর অটল থাকবে; কিন্তু ইসলামের কর্তৃত্ব তাদের বাড়িতে অবশ্যই ঢুকবে; ফলে তাদেরকে লাঞ্ছিত হয়ে জিজিয়া দিতে হবে।)
এ হচ্ছে সত্যবাদী ও সত্যায়িত মহামানব মুহাম্মাদ ﷺ-এর ওয়াদা, যাঁর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনের ভাষ্য:
وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى - إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى
'এবং সে মনগড়া কথা বলে না। তা (তার কথা) তো ওহি, যা তার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়।'
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদিসটি গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়ুন আর বিশ্বের ঘটনাপ্রকৃতির সাথে মিলিয়ে দেখুন:
আবু কুবাইল বলেন, ‘আমরা আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আস-এর পাশে ছিলাম। তখন তাঁকে প্রশ্ন করা হলো, “কনস্টান্টিনোপল ও রোম—এ দুই শহরের মধ্যে কোনটি সর্বপ্রথম মুসলিমদের হস্তগত হবে?” তিনি আংটাবিশিষ্ট একটি সিন্দুক আনালেন। সেখান থেকে একটি কিতাব বের করে বললেন, “একদা আমরা রাসুল-এর পাশে বসে লিখছিলাম, এমন সময় তাঁকে কেউ প্রশ্ন করল, “কনস্টান্টিনোপল ও রোম—এ দুই শহরের মধ্যে কোনটি সর্বপ্রথম মুসলিমরা বিজয় করবে?” তিনি উত্তর দিলেন, হিরাক্লিয়াসের শহর (কনস্টান্টিনোপল) প্রথমে বিজিত হবে।”

কনস্টান্টিনোপল ছিল তৎকালীন রোমান সাম্রাজ্যের উত্তর প্রান্তের রাজধানী। বর্তমানে তার নাম ইস্তাম্বুল। রোমের নাম এখনো রোমই আছে। যা ইতালির রাজধানী। রাসুল ﷺ-এর যুগে তা রোমান সাম্রাজ্যের পশ্চিম প্রান্তের রাজধানী ছিল। এ দুই শহর ছিল খ্রিষ্টানদের শক্ত ঘাঁটি। হাদিসে প্রশ্নের ধরন থেকে বোঝা যায়, সাহাবিগণ আগে থেকেই জানতেন, এ দুই নগরী মুসলিমরা বিজয় করবে। তবে প্রথমে কোনটি হস্তগত হবে, সে ব্যাপারে প্রশ্ন করলেন। উত্তরে রাসুল জানালেন, প্রথমে কনস্টান্টিনোপল বিজয় হবে। হয়েছেও তা-ই।
আটশ বছরেরও অধিক সময় পর রাসুল ﷺ-এর সেই ভবিষ্যৎদ্বাণী সত্য প্রমাণিত হয়েছে। ২০ জুমাদাল উলা ৮৫৭ হিজরিতে উসমানি তরুণ মুজাহিদ মুহাম্মাদ আল-ফাতিহ-এর হাত ধরে কনস্টান্টিনোপল মুসলিমদের অধিকারভুক্ত হয়। অচিরেই দ্বিতীয় সুসংবাদও সত্য প্রমাণিত হবে অবশ্যই। ইনশাআল্লাহ সেদিন খুব দূরে নয়, যেদিন মুসলিমরা বিজয়ী বেশে ইতালির রাজধানী রোমে প্রবেশ করবে। এই হাদিস সম্পর্কে আমার দুটি মন্তব্য আছে:
প্রথম মন্তব্য: কিছু আলিম মনে করেন যে, মুসলিমরা রোম বিজয় করবে মানে সেখানে ইসলামের প্রতি দাওয়াহর পথ সুগম হবে এবং সেখানে ইসলামি প্রতিষ্ঠান ও মসজিদ প্রতিষ্ঠা হবে। তারা জিহাদের মাধ্যমে রোম বিজয়কে অসম্ভব মনে করেন। কিন্তু হাদিস কোনোভাবেই তাদের দাবিকে সমর্থন করে না। বরং আমি জিহাদবিহীন দাওয়াহর মাধ্যমে রোম বিজয় করার ধারণাকে মনস্তাত্ত্বিক পরাজয় মনে করি। যারা এমনটা মনে করেন তাদের ধারণা হলো, মুসলিম বাহিনী কখনো ইতালির মতো শক্তিধর রাষ্ট্রের সাথে পেরে উঠবে না। তাই রাসুল ﷺ-এর ভবিষ্যদ্বাণীকে দাওয়াহ বলে ব্যাখ্যা করেন তারা! কিন্তু হাদিসের ভাষ্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, এ বিজয় হবে জিহাদের মাধ্যমে। কারণ একই হাদিসে কনস্টান্টিনোপলের কথা বলা হয়েছে, যা একের পর এক রক্তক্ষয়ী জিহাদের মাধ্যমে বিজিত হয়েছে। রোমও একই পদ্ধতিতে বিজয় হবে। দুটির কথা রাসুল ﷺ একই হাদিসে বলেছেন। কিছু দিন পর সময়ই তা প্রমাণ করবে ইনশাআল্লাহ।
দ্বিতীয় মন্তব্য: মুহাম্মাদ ফাতিহ কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের পর রোম বিজয়ের জন্য সৈন্য প্রস্তুত করেছিলেন রাসুল ﷺ-এর ভবিষ্যদ্বাণী পরিপূর্ণ করার জন্য। কিন্তু তিনি এ যাত্রায় সফল হননি। এ জন্য যদি আমি আনন্দ প্রকাশ করি, আপনারা কি খুব বেশি বিস্মিত হবেন? হলে হতে পারেন, আমি কিন্তু সত্যিই আনন্দিত! বরং রোম বিজয়ে মুহাম্মাদ আল-ফাতিহকে সফল না করার জন্য আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি! কেন আমার এই বিস্ময়কর অবস্থান? কারণ রোম অবিজিত থাকার কল্যাণে রাসুল ﷺ-এর ভবিষ্যদ্বাণী আমাদের হৃদয়ে আশা ধরে রেখেছে। আমাদের মনে এখনো জাগরূক রেখেছে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন। আমাদের গর্ব করার মতো, স্বপ্ন দেখার মতো যে আর কিছুই নেই! আমরা তো কেবল আমাদের পূর্বপুরুষদের কৃতিত্ব নিয়েই গর্ব করি! কিন্তু রোম এখনো অবিজিত থাকার কারণে আমরা বলতে পারি, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনার দেখানো পথে চলে আমরাও অবতীর্ণ হব জিহাদের ময়দানে। হে মুহাম্মাদ আল-ফাতিহ, আপনি যা অসম্পূর্ণ রেখে গিয়েছেন, আমরা তা পূর্ণতা-দানে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ব ইনশাআল্লাহ!’

টিকাঃ
১৭. সুরা আর-রুম, ৩০ : ৪৭।
১৮. সুরা গাফির, ৪০ : ৫১।
১৯. সূরা আন-নূর, ২৪: ৫৫।
২০. সুরা আল-হাশর, ৫৯: ২।
২১. সহিহু মুসলিম: ২৮৮৯।
২২. মুসনাদু আহমাদ: ১৬৯৫৭, সহিহু ইবনি হিব্বান : ৬৬৯৯।
২৩. সুরা আন-নাজম, ৫৩: ৩-৪।
২৪. আলবানি এটিকে ‘সহিহ’ বলেছেন।
২৫. মুসনাদু আহমাদ: ৬৬৪৫।

'হে মুসলিম সম্প্রদায়, যারা নিজেদের প্রতিপালক নিয়ে গৌরবান্বিত...
যাকে তোমরা প্রতিপালক বলে বিশ্বাস করো, তিনি মহান, মহীয়ান ও মহিমান্বিত প্রভু। তিনি পরম করুণাময়, মহানুভব, পরম স্নেহপরায়ণ মাবুদ। তিনি তাঁর মহিমান্বিত কিতাবে তোমাদের সুসংবাদ জানিয়ে বলেন:
وَكَانَ حَقًّا عَلَيْنَا نَصْرُ الْمُؤْمِنِينَ
'মুমিনদের সাহায্য করা আমার দায়িত্ব।'
কী দারুণ সুসংবাদ! ওয়াল্লাহি, পবিত্র কুরআনে এটি ছাড়া যদি অন্য কোনো সুসংবাদসুলভ আয়াত নাও থাকত, এই একটি আয়াতই যথেষ্ট হতো! স্বয়ং সর্বশক্তিমান প্রভু মুসলিমদের সাহায্য করার দায়িত্ব নিয়েছেন এবং রীতিমতো ঘোষণা দিয়ে তা নিজের ওপর আবশ্যক করে নিয়েছেন! এর চেয়ে বড় সুসংবাদ আর কী হতে পারে!?

তদুপরি, এ সাহায্য কেবল আখিরাতে মুসলিমদের জান্নাতদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আখিরাতের মতো দুনিয়াতেও তিনি মুসলিমদের সাহায্য করবেন। তিনি বলেন:
إِنَّا لَتَنْصُرُ رُسُلَنَا وَالَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ يَقُومُ الْأَشْهَادُ
'নিশ্চয় আমি আমার রাসুলদের ও মুমিনদের সাহায্য করব দুনিয়ার জীবনে এবং যেদিন সাক্ষীগণ দণ্ডায়মান হবে।'
আল্লাহর সাফ ওয়াদা, তিনি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জাহানে মুমিনদের সাহায্য করবেন। যদি মুমিনরা সত্যিকার অর্থে মুমিন হয়, তাহলে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তাদের সহযোগিতা করবেন। তিনি যা ওয়াদা দিয়েছেন, তা অবশ্যই পালন করবেন। কারণ তিনি কক্ষনো ওয়াদার বরখেলাফ করেন না। আরেক আয়াতে তিনি বলেন:
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَى لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُمْ مِنْ بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا وَمَنْ كَفَرَ بَعْدَ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
'তোমাদের মধ্যে যারা ইমান আনে এবং সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, তিনি অবশ্যই তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন, যেমন প্রতিনিধিত্ব দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই তাদের জন্য প্রতিষ্ঠিত করবেন তাদের দ্বীনকে, যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়ভীতির পরিবর্তে তাদের অবশ্যই নিরাপত্তা দান করবেন। তারা আমার ইবাদত করবে, আমার সাথে সাথে কোনোকিছু শরিক করবে না। অতঃপর যারা অকৃতজ্ঞ হবে, তারা তো সত্যত্যাগী।'
আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, যদি মুমিনরা ইমান, সৎকর্ম ও ইখলাসপূর্ণ ইবাদত আঁকড়ে ধরে এবং শিরক থেকে মুক্ত থাকে, তাহলে পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব লাভ করবে তারা। দ্বীনের বিজয় হবে। ভয়ভীতি বিতাড়িত হয়ে শান্তি ও নিরাপত্তার আগমন ঘটবে। এ কিন্তু সাধারণ কোনো মানুষের ওয়াদা নয়; বরং ভূমণ্ডল ও নভোমণ্ডলের একচ্ছত্র অধিপতি, রাজাধিরাজ, মহা শক্তিধর, প্রতাপশালী সত্তার দেওয়া অঙ্গীকার।

হে মুসলিমগণ,
বনু নাজির যুদ্ধের এই বিস্ময়কর ও গৌরবময় চিত্রের প্রতি নজর বুলাও, যেখানে আল্লাহ বলছেন:
هُوَ الَّذِي أَخْرَجَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ مِنْ دِيَارِهِمْ لِأَوَّلِ الْحَشْرِ مَا ظَنَنْتُمْ أَنْ يَخْرُجُوا
'তিনিই কিতাবিদের মধ্যে যারা কাফির তাদেরকে প্রথমবার সমবেতভাবে তাদের আবাসভূমি থেকে বিতাড়িত করেছিলেন। তোমরা কল্পনাও কর নাই যে, তারা নির্বাসিত হবে।'
অর্থাৎ তোমরা যুদ্ধরত মুমিনরা যখন দেখতে পেয়েছিলে তাদের দুর্গসমূহের প্রতিরোধ ক্ষমতা ও সুদৃঢ়তা, তখন মনে করেছিলে যে, ইহুদিদের পরাজিত করা অসম্ভব। وَظَنُّوا 'এবং তারা মনে করেছিল', অর্থাৎ ইহুদিরা মনে করেছিল أَنَّهُمْ مَانِعَتُهُمْ حُصُونُهُمْ مِنَ اللَّهِ 'তাদের দুর্গগুলো তাদের রক্ষা করবে আল্লাহ থেকে।'
কিন্তু ফলাফল কী হয়েছিল?
فَأَتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ حَيْثُ لَمْ يَحْتَسِبُوا وَقَذَفَ فِي قُلُوبِهِمُ الرُّعْبَ يُخْرِبُونَ بُيُوتَهُمْ بِأَيْدِيهِمْ وَأَيْدِي الْمُؤْمِنِينَ
'আল্লাহর শাস্তি এমন এক দিক থেকে আসলো, যা ছিল ওদের ধারণাতীত এবং তাদের অন্তরে তা ত্রাসের সঞ্চার করল। ওরা ধ্বংস করে ফেলল নিজেদের বাড়ি-ঘর নিজেদের হাতে এবং মুমিনদের হাতেও।'
অতঃপর পুরো ঘটনার ওপর মনোযোগ আকর্ষণ করে আল্লাহ বলেন:
فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الْأَبْصَارِ
'অতএব হে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিগণ, তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো।'
এই পুরো ঘটনা তুলে ধরার উদ্দেশ্য হলো, যাতে আমরা এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি। কারণ কুরআন ইতিহাসগ্রন্থ নয়। এটি একটি মহান কিতাব, যা আমাদের সামনে জীবনচলার পথ স্পষ্ট করে এবং সিরাতে মুসতাকিম (সরল পথ) দেখিয়ে দেয়।

হে মুসলিমগণ, যারা নিজেদের রাসুলকে নিয়ে গর্বিত...
তোমরা কি শোননি, সহিহ মুসলিমে সাওবান (রাঃ) বর্ণিত একটি হাদিসে তোমাদের প্রিয় রাসুল ﷺ কী বলেছেন? তিনি বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ زَوَى لِي الْأَرْضَ، فَرَأَيْتُ مَشَارِقَهَا وَمَغَارِبَهَا، وَإِنَّ أُمَّتِي سَيَبْلُغُ مُلْكُهَا مَا زُوِيَ لِي مِنْهَا
‘আল্লাহ তাআলা গোটা পৃথিবীকে আমার সামনে সংকুচিত করে দিলেন। ফলে আমি তার পূর্ব-পশ্চিম গোটা অঞ্চল দেখতে পেলাম। আর আমার উম্মতের রাজত্ব পৃথিবীর ওই পর্যন্ত পৌঁছবে, যে পর্যন্ত সংকুচিত করে আমাকে দেখানো হয়েছে।'
হ্যাঁ, আমার প্রিয় ভাইয়েরা, অচিরেই মুসলিমদের রাজত্ব পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়বে, পূর্ব-পশ্চিমের যত অর্থ হতে পারে সকল অর্থে।
অনুরূপভাবে ইমাম আহমাদ, তাবারানি ও ইবনে হিব্বান (রাহিমাহুমুল্লাহ) তামিম দারি (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমি রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি:
لَيَبْلُغَنَّ هَذَا الْأَمْرُ مَا بَلَغَ اللَّيْلُ وَالنَّهَارُ، وَلَا يَتْرُكُ اللَّهُ بَيْتَ مَدَرٍ وَلَا وَبَرٍ إِلَّا أَدْخَلَهُ اللهُ هَذَا الدِّينَ، بِعِزَّ عَزِيزٍ أَوْ بِذُلَّ ذَلِيلٍ، عِزَّا يُعِزُّ اللَّهُ بِهِ الْإِسْلَامَ، وَذُلَّا يُذِلُّ اللَّهُ بِهِ الْكُفْرَ
'অবশ্যই এই বিষয় (ইসলাম) পৌঁছে যাবে যতটুকু দিন ও রাত পৌঁছায় (অর্থাৎ পুরো পৃথিবীতে)। প্রতিটি পাথরের (শহরের) বাড়ি ও পশমের (গ্রামের) বাড়িতে আল্লাহ তাআলা এ ধর্মকে প্রবেশ করাবেন। (অর্থাৎ শহর ও গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে ইসলাম প্রবেশ করবে।) হয়তো সম্মানিতের সম্মানের মাধ্যমে অথবা লাঞ্ছিতের লাঞ্ছনার মাধ্যমে। এমন সম্মান, যার দ্বারা আল্লাহ ইসলামকে সম্মানিত করবেন এবং এমন অসম্মান, যার দ্বারা আল্লাহ কুফরিকে লাঞ্ছিত করবেন।' (অর্থাৎ সব বাড়িতে ইসলাম ঢুকে পড়বে। কিছু বাড়ির লোকজন ইসলাম কবুল করার মাধ্যমে ইসলামকে নিজেদের বাড়িতে প্রবেশ করাবে আর সম্মানিত হবে। আর কিছু বাড়ির লোকেরা কুফরের ওপর অটল থাকবে; কিন্তু ইসলামের কর্তৃত্ব তাদের বাড়িতে অবশ্যই ঢুকবে; ফলে তাদেরকে লাঞ্ছিত হয়ে জিজিয়া দিতে হবে।)
এ হচ্ছে সত্যবাদী ও সত্যায়িত মহামানব মুহাম্মাদ ﷺ-এর ওয়াদা, যাঁর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনের ভাষ্য:
وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى - إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى
'এবং সে মনগড়া কথা বলে না। তা (তার কথা) তো ওহি, যা তার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়।'
মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদিসটি গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়ুন আর বিশ্বের ঘটনাপ্রকৃতির সাথে মিলিয়ে দেখুন:
আবু কুবাইল বলেন, ‘আমরা আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আস-এর পাশে ছিলাম। তখন তাঁকে প্রশ্ন করা হলো, “কনস্টান্টিনোপল ও রোম—এ দুই শহরের মধ্যে কোনটি সর্বপ্রথম মুসলিমদের হস্তগত হবে?” তিনি আংটাবিশিষ্ট একটি সিন্দুক আনালেন। সেখান থেকে একটি কিতাব বের করে বললেন, “একদা আমরা রাসুল-এর পাশে বসে লিখছিলাম, এমন সময় তাঁকে কেউ প্রশ্ন করল, “কনস্টান্টিনোপল ও রোম—এ দুই শহরের মধ্যে কোনটি সর্বপ্রথম মুসলিমরা বিজয় করবে?” তিনি উত্তর দিলেন, হিরাক্লিয়াসের শহর (কনস্টান্টিনোপল) প্রথমে বিজিত হবে।”

কনস্টান্টিনোপল ছিল তৎকালীন রোমান সাম্রাজ্যের উত্তর প্রান্তের রাজধানী। বর্তমানে তার নাম ইস্তাম্বুল। রোমের নাম এখনো রোমই আছে। যা ইতালির রাজধানী। রাসুল ﷺ-এর যুগে তা রোমান সাম্রাজ্যের পশ্চিম প্রান্তের রাজধানী ছিল। এ দুই শহর ছিল খ্রিষ্টানদের শক্ত ঘাঁটি। হাদিসে প্রশ্নের ধরন থেকে বোঝা যায়, সাহাবিগণ আগে থেকেই জানতেন, এ দুই নগরী মুসলিমরা বিজয় করবে। তবে প্রথমে কোনটি হস্তগত হবে, সে ব্যাপারে প্রশ্ন করলেন। উত্তরে রাসুল জানালেন, প্রথমে কনস্টান্টিনোপল বিজয় হবে। হয়েছেও তা-ই।
আটশ বছরেরও অধিক সময় পর রাসুল ﷺ-এর সেই ভবিষ্যৎদ্বাণী সত্য প্রমাণিত হয়েছে। ২০ জুমাদাল উলা ৮৫৭ হিজরিতে উসমানি তরুণ মুজাহিদ মুহাম্মাদ আল-ফাতিহ-এর হাত ধরে কনস্টান্টিনোপল মুসলিমদের অধিকারভুক্ত হয়। অচিরেই দ্বিতীয় সুসংবাদও সত্য প্রমাণিত হবে অবশ্যই। ইনশাআল্লাহ সেদিন খুব দূরে নয়, যেদিন মুসলিমরা বিজয়ী বেশে ইতালির রাজধানী রোমে প্রবেশ করবে। এই হাদিস সম্পর্কে আমার দুটি মন্তব্য আছে:
প্রথম মন্তব্য: কিছু আলিম মনে করেন যে, মুসলিমরা রোম বিজয় করবে মানে সেখানে ইসলামের প্রতি দাওয়াহর পথ সুগম হবে এবং সেখানে ইসলামি প্রতিষ্ঠান ও মসজিদ প্রতিষ্ঠা হবে। তারা জিহাদের মাধ্যমে রোম বিজয়কে অসম্ভব মনে করেন। কিন্তু হাদিস কোনোভাবেই তাদের দাবিকে সমর্থন করে না। বরং আমি জিহাদবিহীন দাওয়াহর মাধ্যমে রোম বিজয় করার ধারণাকে মনস্তাত্ত্বিক পরাজয় মনে করি। যারা এমনটা মনে করেন তাদের ধারণা হলো, মুসলিম বাহিনী কখনো ইতালির মতো শক্তিধর রাষ্ট্রের সাথে পেরে উঠবে না। তাই রাসুল ﷺ-এর ভবিষ্যদ্বাণীকে দাওয়াহ বলে ব্যাখ্যা করেন তারা! কিন্তু হাদিসের ভাষ্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, এ বিজয় হবে জিহাদের মাধ্যমে। কারণ একই হাদিসে কনস্টান্টিনোপলের কথা বলা হয়েছে, যা একের পর এক রক্তক্ষয়ী জিহাদের মাধ্যমে বিজিত হয়েছে। রোমও একই পদ্ধতিতে বিজয় হবে। দুটির কথা রাসুল ﷺ একই হাদিসে বলেছেন। কিছু দিন পর সময়ই তা প্রমাণ করবে ইনশাআল্লাহ।
দ্বিতীয় মন্তব্য: মুহাম্মাদ ফাতিহ কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের পর রোম বিজয়ের জন্য সৈন্য প্রস্তুত করেছিলেন রাসুল ﷺ-এর ভবিষ্যদ্বাণী পরিপূর্ণ করার জন্য। কিন্তু তিনি এ যাত্রায় সফল হননি। এ জন্য যদি আমি আনন্দ প্রকাশ করি, আপনারা কি খুব বেশি বিস্মিত হবেন? হলে হতে পারেন, আমি কিন্তু সত্যিই আনন্দিত! বরং রোম বিজয়ে মুহাম্মাদ আল-ফাতিহকে সফল না করার জন্য আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি! কেন আমার এই বিস্ময়কর অবস্থান? কারণ রোম অবিজিত থাকার কল্যাণে রাসুল ﷺ-এর ভবিষ্যদ্বাণী আমাদের হৃদয়ে আশা ধরে রেখেছে। আমাদের মনে এখনো জাগরূক রেখেছে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন। আমাদের গর্ব করার মতো, স্বপ্ন দেখার মতো যে আর কিছুই নেই! আমরা তো কেবল আমাদের পূর্বপুরুষদের কৃতিত্ব নিয়েই গর্ব করি! কিন্তু রোম এখনো অবিজিত থাকার কারণে আমরা বলতে পারি, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনার দেখানো পথে চলে আমরাও অবতীর্ণ হব জিহাদের ময়দানে। হে মুহাম্মাদ আল-ফাতিহ, আপনি যা অসম্পূর্ণ রেখে গিয়েছেন, আমরা তা পূর্ণতা-দানে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ব ইনশাআল্লাহ!’

টিকাঃ
১৭. সুরা আর-রুম, ৩০ : ৪৭।
১৮. সুরা গাফির, ৪০ : ৫১।
১৯. সূরা আন-নূর, ২৪: ৫৫।
২০. সুরা আল-হাশর, ৫৯: ২।
২১. সহিহু মুসলিম: ২৮৮৯।
২২. মুসনাদু আহমাদ: ১৬৯৫৭, সহিহু ইবনি হিব্বান : ৬৬৯৯।
২৩. সুরা আন-নাজম, ৫৩: ৩-৪।
২৪. আলবানি এটিকে ‘সহিহ’ বলেছেন।
২৫. মুসনাদু আহমাদ: ৬৬৪৫।

📘 আমরা অজেয় অনিবার্য বিজয়ের হাতছানি > 📄 পঞ্চম বাস্তবতা : ইতিহাসের বাস্তবতা

📄 পঞ্চম বাস্তবতা : ইতিহাসের বাস্তবতা


রাসুল শুধু কনস্টান্টিনোপল ও রোম—এ দুই শহর বিজয়ের সুসংবাদ দেননি; বরং গোটা বিশ্ব বিজয়ের সুসংবাদ দিয়েছেন, যা আমরা পূর্বে আলোচনা করে এসেছি। এদিকে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রব্বুল আলামিনও মুমিনদের সাহায্য করার ওয়াদা দিয়ে রেখেছেন। আল্লাহর এই ওয়াদা যে সত্য, তার প্রমাণ আমরা ইতিহাসের পাতায় পাতায় দেখতে পাই। কয়েক দিন, কয়েক মাস কিংবা কয়েক বছর নয়; বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আল্লাহ তাআলা প্রকৃত মুমিনদের সাহায্য করেছেন, করে যাচ্ছেন।
এ জন্যই প্রকৃত ইসলামের অনুসারী মুসলিমরা সব সময় বিজয়ী হয়েছেন। কেউ চূড়ান্তভাবে তাদের পরাজয় করতে পারেনি; অথচ সংখ্যায় তারা প্রতিপক্ষের চেয়ে অনেক কম ছিলেন:
• বদর যুদ্ধে অস্ত্রশস্ত্র, রসদপাতি ও সৈন্যসংখ্যায় শত্রুবাহিনীর চেয়ে অনেক পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও মুসলিমরা বিজয় লাভ করেছেন। আল্লাহ তাআলা এ বিজয়ের বিবরণ কীভাবে দিয়েছেন দেখুন:
وَلَقَدْ نَصَرَكُمُ اللهُ بِبَدْرٍ وَأَنْتُمْ أَذِلَّةٌ فَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
‘আর বদরের যুদ্ধে যখন তোমরা হীনবল ছিলে, আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেছেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় করো; যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।’
• ইয়ামামার যুদ্ধে মুসলিমরা মাত্র বারো হাজার সৈন্য দিয়ে কমপক্ষে চল্লিশ হাজার মুরতাদ বাহিনীর ওপর বিজয় লাভ করেছিলেন।
• খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ) মাত্র আঠারো হাজার জানবাজ মুজাহিদ নিয়ে ইরাক বিজয় করেছিলেন। এই স্বল্পসংখ্যক বাহিনী নিয়েই তিনি গুড়িয়ে দিয়েছিলেন একের পর এক পারস্য দুর্গ। পরিচালিত করেছিলেন একনাগাড়ে পনেরোটি হার না মানা যুদ্ধ! অথচ প্রত্যেক যুদ্ধে বিরোধী বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল ষাট হাজারের ওপরে। ফিরাজ যুদ্ধে তাদের সংখ্যা এক লক্ষ বিশ হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছিল!
• কাদিসিয়ার যুদ্ধে মাত্র বত্রিশ হাজার জানবাজ মুজাহিদ হারিয়ে দিয়েছিলেন দুই লক্ষ চল্লিশ হাজারের পারস্য বাহিনীকে! এ যুদ্ধের মাধ্যমে পারস্যের প্রতিপত্তি ও দাপট ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিলেন মুসলিমরা। অসংখ্য পারসিয়ান সেনা কমান্ডার এ যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিলেন।
• নাহাওয়ান্দের যুদ্ধে মুসলিমরা তিরিশ হাজার সৈন্য নিয়ে দেড় লক্ষ সসনীয় সেনাকে পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ আস্বাদন করিয়েছিলেন।
• শোস্টার ঘেরাওয়ে মুসলিমরা তিরিশ হাজার সৈন্য নিয়ে দেড় লক্ষ পারস্য সেনার বিরুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন। ঘেরাওকালে দুপক্ষের মাঝে অন্তত আশিটি খণ্ডযুদ্ধ সংঘটিত হয়। প্রতিবারেই মুসলিমরা বিজয়ী হয়েছিল!
• ইয়ারমুকে উনচল্লিশ হাজার মুসলিম মুজাহিদ হারিয়ে দিয়েছিলেন দুই লক্ষ রোমান সেনাকে।
• মুসলিমদের স্পেন বিজয়ের সময় গোয়াডেলেটের যুদ্ধে মাত্র বারো হাজার মুসলিম মুজাহিদ হারিয়ে দিয়েছিলেন এক লক্ষ স্প্যানিশ গথ সেনাকে।
এমন উদাহরণ হাজার হাজার নয়, লক্ষ লক্ষ আছে। আমি এখানে যা উল্লেখ করেছি, তা ইসলামের সুবিশাল ইতিহাস-ভান্ডারের ছোট ছোট কয়েকটি অংশ মাত্র। বাকিটা ইতিহাসের বইসমূহে রয়ে গেছে। তাই প্রিয় ভাইয়েরা, ইতিহাস পড়ুন। আল্লাহর কসম—যিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই, পৃথিবীর বুকে মুসলিমদের ইতিহাসের মতো সমৃদ্ধ অন্য কোনো ইতিহাস নেই। মুসলিমদের ধর্মের মতো কোনো ধর্ম নেই। মুসলিম বীরদের মতো বীরপুরুষ অন্য কোনো জাতির ছিল না, নেই।

এমনকি মুসলিমদের ইতিহাসে যে পরাজয়গুলো ঘটেছে, তা ছিল সাময়িক। পরাজয়ের পরপরই তারা আরও শক্তিশালী হয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। চলুন, এ ধরনের কয়েকটি ঘটনা দেখে আসি:
• রাসুল ﷺ-এর মৃত্যুর পর মদিনা, মক্কা, তায়িফ ও বাহরাইনের হাজার গ্রাম ছাড়া পুরো আরব উপদ্বীপের লোক মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) হয়ে পড়ে। এ রিদ্দাহ (ধর্মত্যাগ)—যেমনটা কেউ কেউ মনে করেন—কেবল যাকাত অস্বীকার করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং অসংখ্য মানুষ সম্পূর্ণরূপে ইসলাম ছেড়ে দিয়েছিল। তাদের মধ্যে অনেকে মুসলিমদের মাঝে ফিতনা সৃষ্টি করে। অনেকে মুসলিমদের হত্যা করে। এমনকি কেউ কেউ নবুওয়তের দাবিও করে বসে। এদের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়! পুরো আরব উপদ্বীপে ছেয়ে গেল কুফরের ঘোর অমানিশা। এ দেখে অনেক সাহাবি হতাশ হয়ে পড়লেন।
বর্তমানে আমাদের যে পরিস্থিতি, তখনকার পরিস্থিতি তার চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশি কঠিন ছিল। এ জন্যই তো অনেকে আবু বকর (রাঃ)-কে বলেছিলেন, 'হে আল্লাহর রাসুলের প্রতিনিধি, গোটা আরবের সাথে যুদ্ধ করে আমরা পেরে উঠব না। তার চেয়ে বরং আপনি ঘরের ভেতর আবদ্ধ হয়ে থাকুন এবং বদ্ধ ঘরে মৃত্যু অবধি আপনার রবের ইবাদতে মশগুল থাকুন!'
এই যেমন আমরা পুনর্জাগরণকে অসম্ভব মনে করছি, তেমনই তারাও মনে করেছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আবু বকর (রাঃ)-এর মাধ্যমে পুরো মুসলিম উম্মাহর প্রতি চোখ তুলে তাকিয়েছেন। তিনি পশুরাজ সিংহের মতো গর্জে উঠে এমন একটা বাক্য বললেন, যা এখনো যদি মুসলিমরা হৃদয়ের গভীর থেকে উচ্চারণ করতে পারে, পুরো পৃথিবীর নেতৃত্ব আবার তাদের হাতে চলে আসবে। তিনি বললেন, 'দ্বীনের ক্ষতি হবে; অথচ আমি বেঁচে থাকব (কক্ষনো তা হতে পারে না)!?'
আবু বকর (রাঃ)-এর উচ্চারিত এ বাক্যের মাহাত্ম্য ও প্রভাব কেমন ছিল, তা পরবর্তী ইতিহাস প্রমাণ করে। তিনি কারও সাহায্যের পরোয়া না করে একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করেই জিহাদের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন। মুসলিমরাও তাঁকে একা ছেড়ে দেননি। সবাই প্রিয় নেতার পতাকাতলে একত্রিত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন জিহাদে। ফলে পৃথিবী পুনরায় তার রবের আলোয় আলোকিত হলো। পুরো আরব উপদ্বীপ আবার আশ্রয় নিল ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে। তবে আবু বকর এতটুকুতেই ক্ষান্ত হননি, নিলেন ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়া এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। আমার ধারণামতে, ইতিহাসে এর চেয়ে অদ্ভুত ও বিস্ময়কর কোনো সিদ্ধান্ত নেই। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, আরব উপদ্বীপ থেকে দুটি বাহিনী প্রেরণ করবেন। একটি পারস্য সাম্রাজ্য বিজয় করার জন্য, অপরটি রোমান সাম্রাজ্য বিজয় করার জন্য !!
হে পর্বতসম সাহসিকতার আধার, আমরা আপনার এমন সাহসী পদক্ষেপে বিস্ময়ে হতবাক! একটি ছোট রাষ্ট্র, যা সম্প্রতি রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ করে ক্লান্ত-শ্রান্ত। সেই 'ভুঁইফোঁড়' দেশটি বাহিনী পাঠাল তৎকালীন বিশ্বকে দুই ভাগে ভাগ করে নেওয়া প্রবল শক্তিশালী দুই সাম্রাজ্য পারস্য ও রোম বিজয় করার লক্ষ্যে!! আপাতদৃষ্টিতে দেখলে ব্যাপারটি চোখ উল্টিয়ে দেওয়ার মতো আশ্চর্যজনক। কিন্তু যে জাতিকে সহযোগিতা করার দায়িত্ব খোদ মহাবিশ্বের প্রতিপালক নিজের জন্য আবশ্যক করে নিয়েছেন, সে জাতির এমন সাহসী পদক্ষেপে আসলে আশ্চর্যের কিছু নেই।
وَكَانَ حَقًّا عَلَيْنَا نَصْرُ الْمُؤْمِنِينَ
'মুমিনদের সাহায্য করা আমার দায়িত্ব।'
আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের হাতে দুই সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়েছেন। মুসলিমরা রচনা করল একের পর এক হার না মানা বিজয়গাথা। পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা হলো ইনসাফ ও সুশাসন। ভয়, শঙ্কার মেঘ কেটে গিয়ে দৃশ্যমান হলো শান্তি ও নিরাপত্তার নির্মল আকাশ।

• প্রিয় ভাইয়েরা, আপনারা কি স্পেনের তাইফা রাজ্যসমূহের ব্যাপারে শুনেছেন? উমাইয়া খিলাফতের পতনের পর মুসলিম শাসিত স্পেন ছোট ছোট খণ্ডরাজ্যে পরিণত হয়। জনগণের ওপর অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয় পারিশ্রমিকবিহীন শ্রম। সবখানে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বাসঘাতকতা ও নির্লজ্জতা। অনুরূপভাবে মরক্কো, আলজেরিয়া, সেনেগাল ও মৌরিতানিয়ায় তৎকালীন বারবারি গোত্রসমূহের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে ভয়াবহ নৈরাজ্য। চারিদিকে বিস্তৃতি লাভ করে জিনা-ব্যভিচারের স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ! মদে বুঁদ হয়ে পড়ে অধিকাংশ মানুষ! চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, ছিনতাই ও অপহরণে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে সাধারণ লোকেরা। কিন্তু এই অধঃপতন কি স্থায়ী হয়েছিল? না। বরং কয়েক বছরের মধ্যে প্রায় অলৌকিকভাবেই বদলে যায় সমাজের চিত্র! কীভাবে? এক ব্যক্তির জাদুর ছোঁয়ায়! হ্যাঁ, মাত্র একজন ব্যক্তিই বদলে দিলেন দৃশ্যপট! শাইখ আব্দুল্লাহ বিন ইয়াসিন (রহ.)।
তিনি একবুক সাহস ও পূর্ণ ইখলাস নিয়ে নেমে পড়েন দাওয়াহ ইলাল্লাহর ময়দানে। অবিশ্বাস্য ধৈর্য ও পর্বতসম দৃঢ়তা নিয়ে পরিচালিত করেন অসম এক যুদ্ধ। তাঁর ইখলাস চুম্বকের মতো আকর্ষণ করল চারিদিকের সত্যান্বেষী লোকদের। দেখতে ভারী হয়ে উঠল তাঁর দল। এক থেকে দুই, দুই থেকে চার, চার থেকে হাজার, দুই হাজার, দশ হাজারে পৌঁছে গেল তাঁর অনুসারী বাহিনী। তাদের হাত ধরেই বিজিত হতে থাকে একের পর এক শহর। প্রসারিত হয় ইসলামের সুমহান আদর্শ। এভাবেই প্রতিষ্ঠা লাভ করে ইসলামি মুরাবিতিন সাম্রাজ্য। যে লোকগুলো এত দিন ছিল শয়তানের চেয়েও অধম, তারা পরিণত হলো ফেরেশতাতুল্য সোনার মানুষে!
এরপর ইউসুফ বিন তাশফিন ও আবু বকর বিন উমর ইসলাম প্রচারের ধারা অব্যাহত রাখেন। কঠিন ধৈর্যশক্তি ও চেষ্টা-মুজাহাদার মাধ্যমে তারা নিরন্তর দাওয়াহর কাজ চালিয়ে যান। তাদের সে প্রচেষ্টায় বিস্তৃতি লাভ করে ইসলামি সাম্রাজ্য। আফ্রিকার এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চলে ইসলাম প্রতিষ্ঠা লাভ করে!! অবশেষে তাদের নিরন্তর প্রচেষ্টার মাধ্যমে মুসলিম সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে উত্তরে এক লাখ এবং দক্ষিণে পাঁচ লাখে পৌঁছে যায়!!
ফলে মুসলিমদের মুখে আবার ফুটে উঠল স্বস্তির হাসি। তাদের চিত্ত প্রশান্ত হলো এবং অন্তরের ক্ষোভ দূর হয়ে গেল। শিরক ও মুশরিকরা লাঞ্ছিত হলো। ইসলাম ও তার অনুসারীরা সম্মানিত হলো। সাগরাজাসের যুদ্ধে আল্লাহ তাআলা মুসলিম বাহিনীকে বিজয় দান করলেন। তিরিশ হাজার সৈন্যের ইসলামি বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারাল ষাট হাজার স্প্যানিশ গথ!
এমনই ছিল ইসলামের শক্তি। এমনই ছিলেন ইসলামের বীরপুরুষগণ। এমনই ছিল ইসলামি শরিয়াহ। কিন্তু আফসোস, আমরা নিজেদের পরিচয় ভুলে গেছি!

• বেশি দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের কাছের ফিলিস্তিনের খবর নিশ্চয় শুনেছেন। বিগত পঞ্চাশ বছর ধরে তা মুসলিমদের হাতছাড়া বলে অস্থির হবেন না।
আপনারা কি নয়টি ক্রুসেডের কথা শোনেননি? কাফিররা দুইশ বছর ধরে ফিলিস্তিনকে নিজেদের দখলে রেখেছিল। বাইতুল মাকদিস তাদের হাতে ছিল বিরানব্বই বছর। বাইতুল মাকদিসে একদিনেই তারা হত্যা করেছিল সত্তর হাজার মুসলিম! মুসলিমদের রক্তে প্লাবিত হয়েছিল বাইতুল মাকদিসের মাটি!
কিন্তু জানেন কি, তারপর আল্লাহ তাআলা ক্রুসেডারদের সাথে কী আচরণ করেছেন? ইতিহাসের চাকা উল্টে গিয়ে পতন হলো তাদের জালিম দখলদারিত্বের। তরবারি কাঁধে নিয়ে জেগে উঠলেন পবিত্রদেহী, কুরআনপড়ুয়া, একাগ্রে সালাত আদায়কারী একদল জানবাজ মুজাহিদ। আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও ভরসা রেখে তারা ঝাঁপিয়ে পড়লেন জিহাদের ময়দানে। নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া না করে জীবন বাজি রাখলেন নুরুদ্দিন জিনকি, শহিদ নুরুদ্দিন মাহমুদ, সালাহুদ্দিন আইয়ুবি (রহ.)-এর মতো উম্মাহর সিংহপুরুষগণ। ছুটে আসলেন মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে; কিন্তু বিনিময়ে পেয়েছেন সুন্দর ও সম্মানজনক জীবন। তারা ছুটে এসেছিলেন জান্নাতের জন্য নিজেদের সাজাতে, বিনিময়ে জান্নাত তাদের জন্য সজ্জিত হলো! আল্লাহর জন্য তারা সংগ্রামে নেমেছেন, তাই আল্লাহ তাআলা তাদের সাথে থেকেছেন, তাদেরকে দেওয়া ওয়াদা পালন করেছেন এবং তাদের সহযোগিতা করেছেন। কুফফার শক্তিকে একাই ধূলিসাৎ করে দিয়ে বিজয় দান করলেন তাঁর প্রিয় মুসলিম বাহিনীকে। তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তিনি সকল দোষত্রুটি ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে। রচিত হলো হিত্তিনের ইতিহাস এবং হিত্তিন পরবর্তী আরও একাধিক বিজয়ের ইতিহাস—যার অংশ হতে পেরে খোদ ইতিহাস শাস্ত্রও গর্ব করে!
আজ হয়তো বাইতুল মাকদিসে আমাদের কর্তৃত্ব নেই। কিন্তু তা নিয়ে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। অচিরেই জেগে উঠবে উম্মাহর ঘুমন্ত সালাহুদ্দিন আইয়ুবিরা। ইনশাআল্লাহ।

টিকাঃ
২৬. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১২৩।
২৭. সুরা আর-রুম, ৩০: ৪৭।

রাসুল শুধু কনস্টান্টিনোপল ও রোম—এ দুই শহর বিজয়ের সুসংবাদ দেননি; বরং গোটা বিশ্ব বিজয়ের সুসংবাদ দিয়েছেন, যা আমরা পূর্বে আলোচনা করে এসেছি। এদিকে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রব্বুল আলামিনও মুমিনদের সাহায্য করার ওয়াদা দিয়ে রেখেছেন। আল্লাহর এই ওয়াদা যে সত্য, তার প্রমাণ আমরা ইতিহাসের পাতায় পাতায় দেখতে পাই। কয়েক দিন, কয়েক মাস কিংবা কয়েক বছর নয়; বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আল্লাহ তাআলা প্রকৃত মুমিনদের সাহায্য করেছেন, করে যাচ্ছেন।
এ জন্যই প্রকৃত ইসলামের অনুসারী মুসলিমরা সব সময় বিজয়ী হয়েছেন। কেউ চূড়ান্তভাবে তাদের পরাজয় করতে পারেনি; অথচ সংখ্যায় তারা প্রতিপক্ষের চেয়ে অনেক কম ছিলেন:
• বদর যুদ্ধে অস্ত্রশস্ত্র, রসদপাতি ও সৈন্যসংখ্যায় শত্রুবাহিনীর চেয়ে অনেক পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও মুসলিমরা বিজয় লাভ করেছেন। আল্লাহ তাআলা এ বিজয়ের বিবরণ কীভাবে দিয়েছেন দেখুন:
وَلَقَدْ نَصَرَكُمُ اللهُ بِبَدْرٍ وَأَنْتُمْ أَذِلَّةٌ فَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
‘আর বদরের যুদ্ধে যখন তোমরা হীনবল ছিলে, আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেছেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় করো; যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।’
• ইয়ামামার যুদ্ধে মুসলিমরা মাত্র বারো হাজার সৈন্য দিয়ে কমপক্ষে চল্লিশ হাজার মুরতাদ বাহিনীর ওপর বিজয় লাভ করেছিলেন।
• খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ) মাত্র আঠারো হাজার জানবাজ মুজাহিদ নিয়ে ইরাক বিজয় করেছিলেন। এই স্বল্পসংখ্যক বাহিনী নিয়েই তিনি গুড়িয়ে দিয়েছিলেন একের পর এক পারস্য দুর্গ। পরিচালিত করেছিলেন একনাগাড়ে পনেরোটি হার না মানা যুদ্ধ! অথচ প্রত্যেক যুদ্ধে বিরোধী বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল ষাট হাজারের ওপরে। ফিরাজ যুদ্ধে তাদের সংখ্যা এক লক্ষ বিশ হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছিল!
• কাদিসিয়ার যুদ্ধে মাত্র বত্রিশ হাজার জানবাজ মুজাহিদ হারিয়ে দিয়েছিলেন দুই লক্ষ চল্লিশ হাজারের পারস্য বাহিনীকে! এ যুদ্ধের মাধ্যমে পারস্যের প্রতিপত্তি ও দাপট ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিলেন মুসলিমরা। অসংখ্য পারসিয়ান সেনা কমান্ডার এ যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিলেন।
• নাহাওয়ান্দের যুদ্ধে মুসলিমরা তিরিশ হাজার সৈন্য নিয়ে দেড় লক্ষ সসনীয় সেনাকে পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ আস্বাদন করিয়েছিলেন।
• শোস্টার ঘেরাওয়ে মুসলিমরা তিরিশ হাজার সৈন্য নিয়ে দেড় লক্ষ পারস্য সেনার বিরুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন। ঘেরাওকালে দুপক্ষের মাঝে অন্তত আশিটি খণ্ডযুদ্ধ সংঘটিত হয়। প্রতিবারেই মুসলিমরা বিজয়ী হয়েছিল!
• ইয়ারমুকে উনচল্লিশ হাজার মুসলিম মুজাহিদ হারিয়ে দিয়েছিলেন দুই লক্ষ রোমান সেনাকে।
• মুসলিমদের স্পেন বিজয়ের সময় গোয়াডেলেটের যুদ্ধে মাত্র বারো হাজার মুসলিম মুজাহিদ হারিয়ে দিয়েছিলেন এক লক্ষ স্প্যানিশ গথ সেনাকে।
এমন উদাহরণ হাজার হাজার নয়, লক্ষ লক্ষ আছে। আমি এখানে যা উল্লেখ করেছি, তা ইসলামের সুবিশাল ইতিহাস-ভান্ডারের ছোট ছোট কয়েকটি অংশ মাত্র। বাকিটা ইতিহাসের বইসমূহে রয়ে গেছে। তাই প্রিয় ভাইয়েরা, ইতিহাস পড়ুন। আল্লাহর কসম—যিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই, পৃথিবীর বুকে মুসলিমদের ইতিহাসের মতো সমৃদ্ধ অন্য কোনো ইতিহাস নেই। মুসলিমদের ধর্মের মতো কোনো ধর্ম নেই। মুসলিম বীরদের মতো বীরপুরুষ অন্য কোনো জাতির ছিল না, নেই।

এমনকি মুসলিমদের ইতিহাসে যে পরাজয়গুলো ঘটেছে, তা ছিল সাময়িক। পরাজয়ের পরপরই তারা আরও শক্তিশালী হয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। চলুন, এ ধরনের কয়েকটি ঘটনা দেখে আসি:
• রাসুল ﷺ-এর মৃত্যুর পর মদিনা, মক্কা, তায়িফ ও বাহরাইনের হাজার গ্রাম ছাড়া পুরো আরব উপদ্বীপের লোক মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) হয়ে পড়ে। এ রিদ্দাহ (ধর্মত্যাগ)—যেমনটা কেউ কেউ মনে করেন—কেবল যাকাত অস্বীকার করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং অসংখ্য মানুষ সম্পূর্ণরূপে ইসলাম ছেড়ে দিয়েছিল। তাদের মধ্যে অনেকে মুসলিমদের মাঝে ফিতনা সৃষ্টি করে। অনেকে মুসলিমদের হত্যা করে। এমনকি কেউ কেউ নবুওয়তের দাবিও করে বসে। এদের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়! পুরো আরব উপদ্বীপে ছেয়ে গেল কুফরের ঘোর অমানিশা। এ দেখে অনেক সাহাবি হতাশ হয়ে পড়লেন।
বর্তমানে আমাদের যে পরিস্থিতি, তখনকার পরিস্থিতি তার চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশি কঠিন ছিল। এ জন্যই তো অনেকে আবু বকর (রাঃ)-কে বলেছিলেন, 'হে আল্লাহর রাসুলের প্রতিনিধি, গোটা আরবের সাথে যুদ্ধ করে আমরা পেরে উঠব না। তার চেয়ে বরং আপনি ঘরের ভেতর আবদ্ধ হয়ে থাকুন এবং বদ্ধ ঘরে মৃত্যু অবধি আপনার রবের ইবাদতে মশগুল থাকুন!'
এই যেমন আমরা পুনর্জাগরণকে অসম্ভব মনে করছি, তেমনই তারাও মনে করেছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আবু বকর (রাঃ)-এর মাধ্যমে পুরো মুসলিম উম্মাহর প্রতি চোখ তুলে তাকিয়েছেন। তিনি পশুরাজ সিংহের মতো গর্জে উঠে এমন একটা বাক্য বললেন, যা এখনো যদি মুসলিমরা হৃদয়ের গভীর থেকে উচ্চারণ করতে পারে, পুরো পৃথিবীর নেতৃত্ব আবার তাদের হাতে চলে আসবে। তিনি বললেন, 'দ্বীনের ক্ষতি হবে; অথচ আমি বেঁচে থাকব (কক্ষনো তা হতে পারে না)!?'
আবু বকর (রাঃ)-এর উচ্চারিত এ বাক্যের মাহাত্ম্য ও প্রভাব কেমন ছিল, তা পরবর্তী ইতিহাস প্রমাণ করে। তিনি কারও সাহায্যের পরোয়া না করে একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করেই জিহাদের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন। মুসলিমরাও তাঁকে একা ছেড়ে দেননি। সবাই প্রিয় নেতার পতাকাতলে একত্রিত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন জিহাদে। ফলে পৃথিবী পুনরায় তার রবের আলোয় আলোকিত হলো। পুরো আরব উপদ্বীপ আবার আশ্রয় নিল ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে। তবে আবু বকর এতটুকুতেই ক্ষান্ত হননি, নিলেন ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়া এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। আমার ধারণামতে, ইতিহাসে এর চেয়ে অদ্ভুত ও বিস্ময়কর কোনো সিদ্ধান্ত নেই। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, আরব উপদ্বীপ থেকে দুটি বাহিনী প্রেরণ করবেন। একটি পারস্য সাম্রাজ্য বিজয় করার জন্য, অপরটি রোমান সাম্রাজ্য বিজয় করার জন্য !!
হে পর্বতসম সাহসিকতার আধার, আমরা আপনার এমন সাহসী পদক্ষেপে বিস্ময়ে হতবাক! একটি ছোট রাষ্ট্র, যা সম্প্রতি রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ করে ক্লান্ত-শ্রান্ত। সেই 'ভুঁইফোঁড়' দেশটি বাহিনী পাঠাল তৎকালীন বিশ্বকে দুই ভাগে ভাগ করে নেওয়া প্রবল শক্তিশালী দুই সাম্রাজ্য পারস্য ও রোম বিজয় করার লক্ষ্যে!! আপাতদৃষ্টিতে দেখলে ব্যাপারটি চোখ উল্টিয়ে দেওয়ার মতো আশ্চর্যজনক। কিন্তু যে জাতিকে সহযোগিতা করার দায়িত্ব খোদ মহাবিশ্বের প্রতিপালক নিজের জন্য আবশ্যক করে নিয়েছেন, সে জাতির এমন সাহসী পদক্ষেপে আসলে আশ্চর্যের কিছু নেই।
وَكَانَ حَقًّا عَلَيْنَا نَصْرُ الْمُؤْمِنِينَ
'মুমিনদের সাহায্য করা আমার দায়িত্ব।'
আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের হাতে দুই সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়েছেন। মুসলিমরা রচনা করল একের পর এক হার না মানা বিজয়গাথা। পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা হলো ইনসাফ ও সুশাসন। ভয়, শঙ্কার মেঘ কেটে গিয়ে দৃশ্যমান হলো শান্তি ও নিরাপত্তার নির্মল আকাশ।

• প্রিয় ভাইয়েরা, আপনারা কি স্পেনের তাইফা রাজ্যসমূহের ব্যাপারে শুনেছেন? উমাইয়া খিলাফতের পতনের পর মুসলিম শাসিত স্পেন ছোট ছোট খণ্ডরাজ্যে পরিণত হয়। জনগণের ওপর অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয় পারিশ্রমিকবিহীন শ্রম। সবখানে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বাসঘাতকতা ও নির্লজ্জতা। অনুরূপভাবে মরক্কো, আলজেরিয়া, সেনেগাল ও মৌরিতানিয়ায় তৎকালীন বারবারি গোত্রসমূহের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে ভয়াবহ নৈরাজ্য। চারিদিকে বিস্তৃতি লাভ করে জিনা-ব্যভিচারের স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ! মদে বুঁদ হয়ে পড়ে অধিকাংশ মানুষ! চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, ছিনতাই ও অপহরণে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে সাধারণ লোকেরা। কিন্তু এই অধঃপতন কি স্থায়ী হয়েছিল? না। বরং কয়েক বছরের মধ্যে প্রায় অলৌকিকভাবেই বদলে যায় সমাজের চিত্র! কীভাবে? এক ব্যক্তির জাদুর ছোঁয়ায়! হ্যাঁ, মাত্র একজন ব্যক্তিই বদলে দিলেন দৃশ্যপট! শাইখ আব্দুল্লাহ বিন ইয়াসিন (রহ.)।
তিনি একবুক সাহস ও পূর্ণ ইখলাস নিয়ে নেমে পড়েন দাওয়াহ ইলাল্লাহর ময়দানে। অবিশ্বাস্য ধৈর্য ও পর্বতসম দৃঢ়তা নিয়ে পরিচালিত করেন অসম এক যুদ্ধ। তাঁর ইখলাস চুম্বকের মতো আকর্ষণ করল চারিদিকের সত্যান্বেষী লোকদের। দেখতে ভারী হয়ে উঠল তাঁর দল। এক থেকে দুই, দুই থেকে চার, চার থেকে হাজার, দুই হাজার, দশ হাজারে পৌঁছে গেল তাঁর অনুসারী বাহিনী। তাদের হাত ধরেই বিজিত হতে থাকে একের পর এক শহর। প্রসারিত হয় ইসলামের সুমহান আদর্শ। এভাবেই প্রতিষ্ঠা লাভ করে ইসলামি মুরাবিতিন সাম্রাজ্য। যে লোকগুলো এত দিন ছিল শয়তানের চেয়েও অধম, তারা পরিণত হলো ফেরেশতাতুল্য সোনার মানুষে!
এরপর ইউসুফ বিন তাশফিন ও আবু বকর বিন উমর ইসলাম প্রচারের ধারা অব্যাহত রাখেন। কঠিন ধৈর্যশক্তি ও চেষ্টা-মুজাহাদার মাধ্যমে তারা নিরন্তর দাওয়াহর কাজ চালিয়ে যান। তাদের সে প্রচেষ্টায় বিস্তৃতি লাভ করে ইসলামি সাম্রাজ্য। আফ্রিকার এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চলে ইসলাম প্রতিষ্ঠা লাভ করে!! অবশেষে তাদের নিরন্তর প্রচেষ্টার মাধ্যমে মুসলিম সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে উত্তরে এক লাখ এবং দক্ষিণে পাঁচ লাখে পৌঁছে যায়!!
ফলে মুসলিমদের মুখে আবার ফুটে উঠল স্বস্তির হাসি। তাদের চিত্ত প্রশান্ত হলো এবং অন্তরের ক্ষোভ দূর হয়ে গেল। শিরক ও মুশরিকরা লাঞ্ছিত হলো। ইসলাম ও তার অনুসারীরা সম্মানিত হলো। সাগরাজাসের যুদ্ধে আল্লাহ তাআলা মুসলিম বাহিনীকে বিজয় দান করলেন। তিরিশ হাজার সৈন্যের ইসলামি বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারাল ষাট হাজার স্প্যানিশ গথ!
এমনই ছিল ইসলামের শক্তি। এমনই ছিলেন ইসলামের বীরপুরুষগণ। এমনই ছিল ইসলামি শরিয়াহ। কিন্তু আফসোস, আমরা নিজেদের পরিচয় ভুলে গেছি!

• বেশি দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের কাছের ফিলিস্তিনের খবর নিশ্চয় শুনেছেন। বিগত পঞ্চাশ বছর ধরে তা মুসলিমদের হাতছাড়া বলে অস্থির হবেন না।
আপনারা কি নয়টি ক্রুসেডের কথা শোনেননি? কাফিররা দুইশ বছর ধরে ফিলিস্তিনকে নিজেদের দখলে রেখেছিল। বাইতুল মাকদিস তাদের হাতে ছিল বিরানব্বই বছর। বাইতুল মাকদিসে একদিনেই তারা হত্যা করেছিল সত্তর হাজার মুসলিম! মুসলিমদের রক্তে প্লাবিত হয়েছিল বাইতুল মাকদিসের মাটি!
কিন্তু জানেন কি, তারপর আল্লাহ তাআলা ক্রুসেডারদের সাথে কী আচরণ করেছেন? ইতিহাসের চাকা উল্টে গিয়ে পতন হলো তাদের জালিম দখলদারিত্বের। তরবারি কাঁধে নিয়ে জেগে উঠলেন পবিত্রদেহী, কুরআনপড়ুয়া, একাগ্রে সালাত আদায়কারী একদল জানবাজ মুজাহিদ। আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও ভরসা রেখে তারা ঝাঁপিয়ে পড়লেন জিহাদের ময়দানে। নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া না করে জীবন বাজি রাখলেন নুরুদ্দিন জিনকি, শহিদ নুরুদ্দিন মাহমুদ, সালাহুদ্দিন আইয়ুবি (রহ.)-এর মতো উম্মাহর সিংহপুরুষগণ। ছুটে আসলেন মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে; কিন্তু বিনিময়ে পেয়েছেন সুন্দর ও সম্মানজনক জীবন। তারা ছুটে এসেছিলেন জান্নাতের জন্য নিজেদের সাজাতে, বিনিময়ে জান্নাত তাদের জন্য সজ্জিত হলো! আল্লাহর জন্য তারা সংগ্রামে নেমেছেন, তাই আল্লাহ তাআলা তাদের সাথে থেকেছেন, তাদেরকে দেওয়া ওয়াদা পালন করেছেন এবং তাদের সহযোগিতা করেছেন। কুফফার শক্তিকে একাই ধূলিসাৎ করে দিয়ে বিজয় দান করলেন তাঁর প্রিয় মুসলিম বাহিনীকে। তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তিনি সকল দোষত্রুটি ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে। রচিত হলো হিত্তিনের ইতিহাস এবং হিত্তিন পরবর্তী আরও একাধিক বিজয়ের ইতিহাস—যার অংশ হতে পেরে খোদ ইতিহাস শাস্ত্রও গর্ব করে!
আজ হয়তো বাইতুল মাকদিসে আমাদের কর্তৃত্ব নেই। কিন্তু তা নিয়ে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। অচিরেই জেগে উঠবে উম্মাহর ঘুমন্ত সালাহুদ্দিন আইয়ুবিরা। ইনশাআল্লাহ।

টিকাঃ
২৬. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১২৩।
২৭. সুরা আর-রুম, ৩০: ৪৭।

📘 আমরা অজেয় অনিবার্য বিজয়ের হাতছানি > 📄 ষষ্ঠ বাস্তবতা : বিরাজমান বাস্তবতা

📄 ষষ্ঠ বাস্তবতা : বিরাজমান বাস্তবতা


আমার কেবল ইতিহাসেরই ওপর চোখ বুলাচ্ছি কেন? বর্তমান বিরাজমান বাস্তবতায় কি এমন কিছু নেই, যা আমাদের সামনে আল্লাহর ওয়াদাকে সত্যায়ন করে?
আছে, অবশ্যই আছে, আল্লাহর কসম! বিগত চল্লিশ বছর থেকে বর্তমান পর্যন্ত পৃথিবীর ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে দেখুন, আশার আলোয় আলোকিত হয়ে উঠবে আপনার মন!
• মসজিদে মসজিদে নামাজরত লোকদের ওপর দৃষ্টিপাত করুন। কারা ওরা? সংখ্যায় তারা কতজন? একটা সময় ছিল, যখন আমরা শুধু জীবিকার পেছনে ছুটে চলা লোকদের দেখতাম। কিন্তু মসজিদের সংখ্যা যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, বেড়েছে মুসল্লিদের সংখ্যাও—যাদের অধিকাংশই তরুণ, যুবক! এ দৃশ্য কি ইসলামের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের বার্তা বহন করে না?
• হজ ও উমরার দিকে চোখ ফেরান। প্রতিবছর পৃথিবীর সকল প্রান্ত থেকে কোটি কোটি মুসলিম হজ-উমরা করতে মক্কায় আসছেন! জানেন কি, দর্শনার্থী ও তাওয়াফকারী ছাড়া কাবাকে দেখা যাওয়া এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে? বর্তমানে মুসলিম নারী-পুরুষ, যুবক-বৃদ্ধ হজ-উমরার জন্য কতটা পাগলপারা তা নিশ্চয় না জানার কথা নয়!
• মুসলিম মহিলাদের অবস্থার ওপর নজর দিন। বিগত ষাট বছর থেকে তাদের মাঝে পর্দাপ্রিয়তা ও পর্দাপ্রবণতা দারুণভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একটা সময় ছিল, যখন মিশরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হিজাব-পরিহিতা কোনো ছাত্রী দেখা যেত না। সে সময় এখন অতীত হয়ে গেছে। এখন যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে দেখবেন, অর্ধেকের বেশি ছাত্রী হিজাব পরে আছে! খোঁজ নিলে দেখতে পাবেন, লাখ লাখ মুসলিম তরুণী কঠিনভাবে ইসলামের সকল অনুশাসন মেনে চলার চেষ্টা করছে। এ দৃশ্য দেখে আপনার অন্তর থেকে হতাশার কালো মেঘ সরে যাবে।
• লাইব্রেরি, প্রকাশনী ও বইমেলাসমূহে খোঁজ নিন। দেখবেন, এখন ইসলামি বই-পুস্তকই মানুষ বেশি কিনছে! বেস্ট সেলার বইয়ের তালিকায় এখন স্থান পাচ্ছে ইসলামি বই! এভাবে চারিদিকে দ্রুতগতিতে ভিড় জমে উঠছে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে!
• বরং সবখানে ইসলামের প্রভাব এতটা বেড়ে গেছে যে, এখন প্রায় সকল মতের দলসমূহ অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইসলামের নাম ব্যবহার করে জনপ্রিয়তা অর্জনের চেষ্টা করে। কারণ তারা বুঝতে পেরেছে যে, এখন সাধারণ মানুষের মন ইসলাম ও শরিয়াহর দিকে ঝুঁকে পড়েছে।
• এখন ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো তাদের কর্মসূচিতে ইসলামিক থিসিস থাকার ঘোষণা দেয়!!
• সুদভিত্তিক ব্যাংকগুলোও এখন ইসলামি শাখা খুলে বসেছে!
• বিউটি পার্লারগুলোও পর্দানশিন মেয়েদের জন্য আলাদা বিভাগ খুলেছে!
• যে টিভি চ্যানেলগুলো একসময় কেবল নায়ক-নায়িকা ও নৃত্যশিল্পীদের নিয়ে অনুষ্ঠান আয়োজন করত, এখন সেসব চ্যানেলে ইসলামি স্কলারদের আয়োজনে ইসলামি অনুষ্ঠান প্রচার করতে দেখা যায়!

এখন আমরা যতটুকু দেখতে পাচ্ছি, সামনে তা বাড়বে বৈ কমবে না। এবার একটু সামরিক পরিবর্তনের ওপর চোখ বুলাই:
• রাশানদের বিরুদ্ধে আফগান মুসলিমদের বিজয়ের কথা নিশ্চয় শুনেছেন।
فِي بِضْعِ سِنِينَ لِلَّهِ الْأَمْرُ مِنْ قَبْلُ وَمِنْ بَعْدُ وَيَوْمَئِذٍ يَفْرَحُ الْمُؤْمِنُونَ - بِنَصْرِ اللَّهِ يَنْصُرُ مَنْ يَشَاءُ وَهُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ - وَعْدَ اللَّهِ لَا يُخْلِفُ اللهُ وَعْدَهُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
'কয়েক বছরের মধ্যেই। পূর্বের ও পরের ফয়সালা আল্লাহরই। আর সেই দিন মুমিনগণ হর্ষোৎফুল্ল হবে, আল্লাহর সাহায্যে। তিনি যাকে ইচ্ছা সাহায্য করেন; তিনি পরাক্রমশালী, দয়ালু। এটা আল্লাহরই প্রতিশ্রুতি; আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম করেন না; কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না।'
কক্ষনো মনে করবেন যে, রুশ বাহিনী আফগানিস্তানের দুর্গম ও রুক্ষ পাহাড়ের কারণে পরাজিত হয়েছে। বরং তাদের পরাজয়ের কারণ হলো, আল্লাহই তাদের পরাজিত করেছেন। তারা ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেছে, কারণ আল্লাহ তাদের ফিরিয়ে দিয়েছেন। তবে আফগান বাহিনী আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার কারণ হলো, তারা আল্লাহকে দৃঢ়তা ও অবিচলতা দেখাতে পেরেছেন।
• আপনারা কি দেখেননি, ইসরাইলের সৈন্যরা হতদরিদ্র দেশ লেবাননে 'হিজবুল্লাহ'র নেতৃত্বে জনপ্রতিরোধের সামনে থেকে ইঁদুরের পালের মতো পালিয়ে গিয়ে কীভাবে আনন্দে নেচেছে!? গৃহযুদ্ধের এই পরাজয় তাদেরকে অর্থনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দেয়।
• একসময় কয়েকটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ দখল করে নিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও বলশেভিক কমিউনিস্টরা। তিনশ বছরের অধিক সময় ধরে তারা মুসলিমদের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালায়। কুরআন বহন করা অপরাধ বিবেচিত হতো তাদের কাছে। আল্লাহ ও রাসুলের ওপর ইমান আনার 'অপরাধে' তারা যুদ্ধ করত শান্তিপ্রিয় মুসলিমদের বিরুদ্ধে। কিন্তু তাদের সে দাপট স্থায়ী হয়নি। জুলুমের অন্ধকার রজনী কেটে গিয়ে ইনসাফের সূর্য হেসে উঠল। তেজোদীপ্ত মুসলিমরা প্রাণপণ লড়াই করে ডেকে আনে কমিউনিস্ট কাফিরদের চূড়ান্ত পতন! কে করেছেন এসব? নিশ্চয়ই সে আল্লাহই করেছেন, যিনি মুসলিমদের সাহায্য করার ওয়াদা দিয়েছেন।

আরও নিকট অতীতের ওপর চোখ বুলাই এবার...
• আমেরিকার দিকে দেখুন। ষাটের দশকে সেখানে মুসলিমের সংখ্যা ছিল মাত্র কয়েক হাজার। এখন সে সংখ্যা আট মিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে! সত্তরের দশকে আমি একটি আমেরিকান শহরে একটি অ্যাপার্টমেন্টকে মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখেছিলাম। ওই একটি মসজিদই ছিল সে শহরে। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, সেখানে পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে মসজিদের সংখ্যা। বর্তমান ওই একটি শহরেই দশটি মসজিদ আছে!!
• পাশ্চাত্যের মুসলিম সম্প্রদায়ের দিকে তাকান। বর্তমানে সেখানে তাদের নিজস্ব স্কুল আছে, মসজিদ আছে, কেন্দ্র আছে, সংবাদপত্র আছে, একাধিক সংগঠন ও কোম্পানি আছে!
• বর্তমান বিশ্বে দ্রুতগতিতে যে ধর্ম প্রসার লাভ করছে, তা হচ্ছে ইসলাম!
• বর্তমান সময়ে ইন্টারনেটে ইসলামি ওয়েবসাইট ভিজিট করে কয়েক মিলিয়ন মানুষ! শুধু আমেরিকা থেকেই এক মিলিয়নের বেশি মানুষ ইসলামি ওয়েবসাইট ভিজিট করে!
প্রিয় বন্ধুগণ, এসব কি চূড়ান্ত বিজয়ের পূর্বাভাস নয়? এসব কি আমাদের পুনর্জাগরণের স্বপ্ন দেখার জন্য যথেষ্ট নয়?

টিকাঃ
২৮. আলহামদুলিল্লাহ, এখন আমরা আমেরিকার বিরুদ্ধে আফগান মুজাহিদদের বিজয়ও দেখেছি। -অনুবাদক।
২৯. সূরা আর-রুম, ৩০ : ৪-৬।

আমার কেবল ইতিহাসেরই ওপর চোখ বুলাচ্ছি কেন? বর্তমান বিরাজমান বাস্তবতায় কি এমন কিছু নেই, যা আমাদের সামনে আল্লাহর ওয়াদাকে সত্যায়ন করে?
আছে, অবশ্যই আছে, আল্লাহর কসম! বিগত চল্লিশ বছর থেকে বর্তমান পর্যন্ত পৃথিবীর ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে দেখুন, আশার আলোয় আলোকিত হয়ে উঠবে আপনার মন!
• মসজিদে মসজিদে নামাজরত লোকদের ওপর দৃষ্টিপাত করুন। কারা ওরা? সংখ্যায় তারা কতজন? একটা সময় ছিল, যখন আমরা শুধু জীবিকার পেছনে ছুটে চলা লোকদের দেখতাম। কিন্তু মসজিদের সংখ্যা যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, বেড়েছে মুসল্লিদের সংখ্যাও—যাদের অধিকাংশই তরুণ, যুবক! এ দৃশ্য কি ইসলামের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের বার্তা বহন করে না?
• হজ ও উমরার দিকে চোখ ফেরান। প্রতিবছর পৃথিবীর সকল প্রান্ত থেকে কোটি কোটি মুসলিম হজ-উমরা করতে মক্কায় আসছেন! জানেন কি, দর্শনার্থী ও তাওয়াফকারী ছাড়া কাবাকে দেখা যাওয়া এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে? বর্তমানে মুসলিম নারী-পুরুষ, যুবক-বৃদ্ধ হজ-উমরার জন্য কতটা পাগলপারা তা নিশ্চয় না জানার কথা নয়!
• মুসলিম মহিলাদের অবস্থার ওপর নজর দিন। বিগত ষাট বছর থেকে তাদের মাঝে পর্দাপ্রিয়তা ও পর্দাপ্রবণতা দারুণভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একটা সময় ছিল, যখন মিশরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হিজাব-পরিহিতা কোনো ছাত্রী দেখা যেত না। সে সময় এখন অতীত হয়ে গেছে। এখন যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে দেখবেন, অর্ধেকের বেশি ছাত্রী হিজাব পরে আছে! খোঁজ নিলে দেখতে পাবেন, লাখ লাখ মুসলিম তরুণী কঠিনভাবে ইসলামের সকল অনুশাসন মেনে চলার চেষ্টা করছে। এ দৃশ্য দেখে আপনার অন্তর থেকে হতাশার কালো মেঘ সরে যাবে।
• লাইব্রেরি, প্রকাশনী ও বইমেলাসমূহে খোঁজ নিন। দেখবেন, এখন ইসলামি বই-পুস্তকই মানুষ বেশি কিনছে! বেস্ট সেলার বইয়ের তালিকায় এখন স্থান পাচ্ছে ইসলামি বই! এভাবে চারিদিকে দ্রুতগতিতে ভিড় জমে উঠছে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে!
• বরং সবখানে ইসলামের প্রভাব এতটা বেড়ে গেছে যে, এখন প্রায় সকল মতের দলসমূহ অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইসলামের নাম ব্যবহার করে জনপ্রিয়তা অর্জনের চেষ্টা করে। কারণ তারা বুঝতে পেরেছে যে, এখন সাধারণ মানুষের মন ইসলাম ও শরিয়াহর দিকে ঝুঁকে পড়েছে।
• এখন ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো তাদের কর্মসূচিতে ইসলামিক থিসিস থাকার ঘোষণা দেয়!!
• সুদভিত্তিক ব্যাংকগুলোও এখন ইসলামি শাখা খুলে বসেছে!
• বিউটি পার্লারগুলোও পর্দানশিন মেয়েদের জন্য আলাদা বিভাগ খুলেছে!
• যে টিভি চ্যানেলগুলো একসময় কেবল নায়ক-নায়িকা ও নৃত্যশিল্পীদের নিয়ে অনুষ্ঠান আয়োজন করত, এখন সেসব চ্যানেলে ইসলামি স্কলারদের আয়োজনে ইসলামি অনুষ্ঠান প্রচার করতে দেখা যায়!

এখন আমরা যতটুকু দেখতে পাচ্ছি, সামনে তা বাড়বে বৈ কমবে না। এবার একটু সামরিক পরিবর্তনের ওপর চোখ বুলাই:
• রাশানদের বিরুদ্ধে আফগান মুসলিমদের বিজয়ের কথা নিশ্চয় শুনেছেন।
فِي بِضْعِ سِنِينَ لِلَّهِ الْأَمْرُ مِنْ قَبْلُ وَمِنْ بَعْدُ وَيَوْمَئِذٍ يَفْرَحُ الْمُؤْمِنُونَ - بِنَصْرِ اللَّهِ يَنْصُرُ مَنْ يَشَاءُ وَهُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ - وَعْدَ اللَّهِ لَا يُخْلِفُ اللهُ وَعْدَهُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
'কয়েক বছরের মধ্যেই। পূর্বের ও পরের ফয়সালা আল্লাহরই। আর সেই দিন মুমিনগণ হর্ষোৎফুল্ল হবে, আল্লাহর সাহায্যে। তিনি যাকে ইচ্ছা সাহায্য করেন; তিনি পরাক্রমশালী, দয়ালু। এটা আল্লাহরই প্রতিশ্রুতি; আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম করেন না; কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না।'
কক্ষনো মনে করবেন যে, রুশ বাহিনী আফগানিস্তানের দুর্গম ও রুক্ষ পাহাড়ের কারণে পরাজিত হয়েছে। বরং তাদের পরাজয়ের কারণ হলো, আল্লাহই তাদের পরাজিত করেছেন। তারা ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেছে, কারণ আল্লাহ তাদের ফিরিয়ে দিয়েছেন। তবে আফগান বাহিনী আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার কারণ হলো, তারা আল্লাহকে দৃঢ়তা ও অবিচলতা দেখাতে পেরেছেন।
• আপনারা কি দেখেননি, ইসরাইলের সৈন্যরা হতদরিদ্র দেশ লেবাননে 'হিজবুল্লাহ'র নেতৃত্বে জনপ্রতিরোধের সামনে থেকে ইঁদুরের পালের মতো পালিয়ে গিয়ে কীভাবে আনন্দে নেচেছে!? গৃহযুদ্ধের এই পরাজয় তাদেরকে অর্থনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দেয়।
• একসময় কয়েকটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ দখল করে নিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও বলশেভিক কমিউনিস্টরা। তিনশ বছরের অধিক সময় ধরে তারা মুসলিমদের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালায়। কুরআন বহন করা অপরাধ বিবেচিত হতো তাদের কাছে। আল্লাহ ও রাসুলের ওপর ইমান আনার 'অপরাধে' তারা যুদ্ধ করত শান্তিপ্রিয় মুসলিমদের বিরুদ্ধে। কিন্তু তাদের সে দাপট স্থায়ী হয়নি। জুলুমের অন্ধকার রজনী কেটে গিয়ে ইনসাফের সূর্য হেসে উঠল। তেজোদীপ্ত মুসলিমরা প্রাণপণ লড়াই করে ডেকে আনে কমিউনিস্ট কাফিরদের চূড়ান্ত পতন! কে করেছেন এসব? নিশ্চয়ই সে আল্লাহই করেছেন, যিনি মুসলিমদের সাহায্য করার ওয়াদা দিয়েছেন।

আরও নিকট অতীতের ওপর চোখ বুলাই এবার...
• আমেরিকার দিকে দেখুন। ষাটের দশকে সেখানে মুসলিমের সংখ্যা ছিল মাত্র কয়েক হাজার। এখন সে সংখ্যা আট মিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে! সত্তরের দশকে আমি একটি আমেরিকান শহরে একটি অ্যাপার্টমেন্টকে মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখেছিলাম। ওই একটি মসজিদই ছিল সে শহরে। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, সেখানে পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে মসজিদের সংখ্যা। বর্তমান ওই একটি শহরেই দশটি মসজিদ আছে!!
• পাশ্চাত্যের মুসলিম সম্প্রদায়ের দিকে তাকান। বর্তমানে সেখানে তাদের নিজস্ব স্কুল আছে, মসজিদ আছে, কেন্দ্র আছে, সংবাদপত্র আছে, একাধিক সংগঠন ও কোম্পানি আছে!
• বর্তমান বিশ্বে দ্রুতগতিতে যে ধর্ম প্রসার লাভ করছে, তা হচ্ছে ইসলাম!
• বর্তমান সময়ে ইন্টারনেটে ইসলামি ওয়েবসাইট ভিজিট করে কয়েক মিলিয়ন মানুষ! শুধু আমেরিকা থেকেই এক মিলিয়নের বেশি মানুষ ইসলামি ওয়েবসাইট ভিজিট করে!
প্রিয় বন্ধুগণ, এসব কি চূড়ান্ত বিজয়ের পূর্বাভাস নয়? এসব কি আমাদের পুনর্জাগরণের স্বপ্ন দেখার জন্য যথেষ্ট নয়?

টিকাঃ
২৮. আলহামদুলিল্লাহ, এখন আমরা আমেরিকার বিরুদ্ধে আফগান মুজাহিদদের বিজয়ও দেখেছি। -অনুবাদক।
২৯. সূরা আর-রুম, ৩০ : ৪-৬।

📘 আমরা অজেয় অনিবার্য বিজয়ের হাতছানি > 📄 সপ্তম বাস্তবতা : শত্রুদের বাস্তবতা

📄 সপ্তম বাস্তবতা : শত্রুদের বাস্তবতা


প্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ,
কারা আপনাদের প্রতিপক্ষ? কাদের বিরুদ্ধে আপনারা জিহাদ করেন? তারা কি ইহুদি ও তাদের সহযোগী নয়? তাহলে আর ভয় কীসের? কারণ তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন:
ضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الذِّلَّةُ أَيْنَ مَا ثُقِفُوا
‘যেখানেই তাদের পাওয়া গিয়েছে, সেখানেই তারা লাঞ্ছিত হয়েছে।’
لَا يُقَاتِلُونَكُمْ جَمِيعًا إِلَّا فِي قُرًى مُحَصَّنَةٍ أَوْ مِنْ وَرَاءِ جُدُرٍ
‘এরা সকলে সংঘবদ্ধভাবেও তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সমর্থ হবে না; কিন্তু কেবল সুরক্ষিত জনপদের অভ্যন্তরে অথবা দুর্গ-প্রাচীরের অন্তরালে থেকে।’
وَلَتَجِدَنَّهُمْ أَحْرَصَ النَّاسِ عَلَى حَيَاةٍ وَمِنَ الَّذِينَ أَشْرَكُوا
‘তুমি নিশ্চয় তাদেরকে জীবনের প্রতি সকল মানুষ, এমনকি মুশরিক অপেক্ষা অধিক লোভী দেখতে পাবে।’
এই হচ্ছে ইহুদিদের অবস্থা, যাদের আমরা ভয় পাচ্ছি!
أَتَخْشَوْنَهُمْ فَاللَّهُ أَحَقُّ أَنْ تَخْشَوْهُ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ - قَاتِلُوهُمْ يُعَذِّبْهُمُ اللهُ بِأَيْدِيكُمْ وَيُخْزِهِمْ وَيَنْصُرُكُمْ عَلَيْهِمْ وَيَشْفِ صُدُورَ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ - وَيُذْهِبْ غَيْظَ قُلُوبِهِمْ وَيَتُوبُ اللهُ عَلَى مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
'তোমরা কি তাদেরকে ভয় করো? আল্লাহকে ভয় করাই তোমাদের পক্ষে অধিক সমীচীন, যদি তোমরা মুমিন হও। তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করো। তোমাদের হাতে আল্লাহ ওদের শাস্তি দেবেন, ওদের লাঞ্ছিত করবেন, ওদের ওপর তোমাদের বিজয়ী করবেন, মুমিনদের চিত্ত প্রশান্ত করবেন এবং তাদের অন্তরের ক্ষোভ দূর করবেন। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তার প্রতি ক্ষমাপরায়ণ হন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। '

• ইহুদিরা যদি সংখ্যায় অনেক হয় এবং সকল কাফির বাহিনী একযোগ হয়ে তাদের সাহায্য করে, তবুও ভয়ের কোনো কারণ নেই। কারণ তাদের সম্বোধন করে আল্লাহ বলেছেন:
وَلَنْ تُغْنِيَ عَنْكُمْ فِئَتُكُمْ شَيْئًا وَلَوْ كَثُرَتْ وَأَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُؤْمِنِينَ
'আর সংখ্যায় তোমাদের দল অধিক হলেও তোমাদের কোনো কাজে আসবে না। নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের সঙ্গেই রয়েছেন।'
• তাদের সমরপ্রস্তুতি দেখে ভয় পাচ্ছেন? তাদের ব্যাপারে আল্লাহ কী বলেছেন, দেখুন :
قُلْ لِلَّذِينَ كَفَرُوا سَتُغْلَبُونَ وَتُحْشَرُونَ إِلَى جَهَنَّمَ وَبِئْسَ الْمِهَادُ
'যারা কুফরি করে তাদের বলুন, “তোমরা শীঘ্রই পরাভূত হবে এবং তোমাদেরকে একত্রিত করে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। আর তা কত নিকৃষ্ট আবাসস্থল!”
• তাদের ধনসম্পদ দেখে ঘাবড়ে যাচ্ছেন? তাহলে তাদের ব্যাপারে আল্লাহ কী বলেছেন, দেখুন :
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ لِيَصُدُّوا عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ فَسَيُنْفِقُونَهَا ثُمَّ تَكُونُ عَلَيْهِمْ حَسْرَةً ثُمَّ يُغْلَبُونَ وَالَّذِينَ كَفَرُوا إِلَى جَهَنَّمَ يُحْشَرُونَ
'আল্লাহর পথ থেকে লোকদের নিবৃত্ত করার জন্য কাফিররা তাদের ধনসম্পদ ব্যয় করে, তারা ধনসম্পদ ব্যয় করতেই থাকবে; অতঃপর তা তাদের মনস্তাপের কারণ হবে, এর পর তারা পরাভূত হবে এবং যারা কুফরি করেছে, তাদেরকে জাহান্নামে একত্র করা হবে। '
তাদের বুদ্ধি ও শারীরিক গঠন দেখে ভীত হয়ে পড়েছেন? তাহলে তাদের ব্যাপারে আল্লাহ কী বলেছেন, শুনুন :
لَهُمْ قُلُوبٌ لَا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لَا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لَا يَسْمَعُونَ بِهَا أُولَئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ أُولَئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ
'তাদের হৃদয় আছে, কিন্তু তা দ্বারা তারা উপলব্ধি করে না; তাদের চক্ষু আছে, কিন্তু তা দ্বারা তারা দেখে না এবং তাদের কান আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো; বরং তার চেয়েও অধিক বিভ্রান্ত। তারাই গাফিল। '

তবুও কি হে মুসলিমগণ, এই কাফিরদের তোমরা অজেয় মনে করো? তাহলে কয়েকটি চাক্ষুষ প্রমাণ দেখে নাও :
• আমরা তথাকথিত পরাশক্তি অহংকারী আমেরিকাকে ভিয়েতনাম—যা আয়তনে ছোট হওয়ার কারণে মানচিত্রে ঠিকভাবে দেখা যায় না—থেকে ৫৯ হাজার সেনার প্রাণ হারিয়ে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে আসতে দেখেছি। এভাবে সোমালিয়া ও লেবানন থেকেও দখলদারী কাফির বাহিনীকে লাঞ্ছনাকর পরাজয় নিয়ে পালিয়ে আসতে দেখেছি।
• আমরা শক্তিশালী রাশিয়ার চেরনোবিল চুল্লি বিস্ফোরিত হয়ে হাজার হাজার একর ভূমি দূষিত হতে দেখেছি।
• কাফিররা চ্যালেঞ্জার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করার পর গর্বভরে বলেছিল, এর মাধ্যমে তারা পূর্ণতার স্তরে পৌঁছে গিয়েছে! কিন্তু তা দ্বারা উপকৃত হওয়ার আগেই আমরা তা বিস্ফোরিত হতে দেখেছি। পুরো ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই (টার্গেটে আঘাত হানার পূর্বে) তাদেরই চোখের সামনে তা বিস্ফোরিত হয়!
تَعَالَى اللَّهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ
'তারা যাকে শরিক করে, আল্লাহ তা থেকে অনেক ঊর্ধ্বে।'
وَظَنَّ أَهْلُهَا أَنَّهُمْ قَادِرُونَ عَلَيْهَا أَتَاهَا أَمْرُنَا لَيْلًا أَوْ نَهَارًا فَجَعَلْنَاهَا حَصِيدًا كَأَنْ لَمْ تَغْنَ بِالْأَمْسِ
'আর জমিনের অধিকর্তারা ভাবতে লাগল, এগুলো আমাদের হাতে আসবে, হঠাৎ করে তার ওপর আমার নির্দেশ এসে পড়ে রাত্রে কিংবা দিনে। আর আমি তাকে কর্তিত ফসলের এমন শূন্য ভূমিতে পরিণত করি, যেন কালও এখানে কোনো আবাদ ছিল না।'
অনুরূপভাবে আমরা দেখেছি, কীভাবে কাফিররা আল্লাহর কুদরতের সামনে সম্পূর্ণ নিস্তেজ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। কিছুই করার ছিল না তাদের...
• আমরা মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যেই পুরো একটি শহর বন্যায় প্লাবিত হতে দেখেছি। ঘটনাটি ঘটেছিল আমেরিকার বিখ্যাত শহর নিউ অরলিন্সে। ১৯৯৫ সালের মে মাসে।
فَفَتَحْنَا أَبْوَابَ السَّمَاءِ بِمَاءٍ مُنْهَمِرٍ - وَفَجَّرْنَا الْأَرْضَ عُيُونًا فَالْتَقَى الْمَاءُ عَلَى أَمْرٍ قَدْ قُدِرَ
'তখন আমি খুলে দিলাম আকাশের দ্বার প্রবল বারিবর্ষণের মাধ্যমে। এবং ভূমি থেকে প্রবাহিত করলাম প্রস্রবণ। অতঃপর সমুদয় পানি মিলে গেল এক স্থিরীকৃত কাজের জন্য।'
• আমরা দেখেছি, একটি তুষার ঝড় আমেরিকার উন্নত ও আধুনিক শহর নিউইয়র্কে আঘাত হেনে গাড়িসমূহ দাফন করে দিয়েছিল, রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিয়েছিল এবং টানা তিন দিন জীবনযাত্রা বন্ধ করে রেখেছিল!!
• আমরা দেখেছি, একটি হারিকেন বিশাল বিশাল পরিবহন উড়িয়ে তাদের বাড়িঘরের ওপর নিক্ষেপ করছে!! আমরা দেখেছি ঝঞ্ঝাবায়ু নিরবচ্ছিন্ন দুর্ভাগ্যের দিনে, যা মানুষকে উৎখাত করেছিল উন্মূলিত খেজুর কাণ্ডের মতো। বনে-জঙ্গলে গাছপালা উড়তে দেখেছি। নিমিষের মধ্যেই শত শত তাজা প্রাণ ঝরে যেতে দেখেছি। সবই দেখেছি; কিন্তু আফসোস! এসব দেখে আমরা শিক্ষা লাভ করতে পারিনি!

আপনারা কি কাফির সমাজের ভেতরের অবস্থা দেখেছেন? ভেতর থেকে তাদের সমাজ জীর্ণ, অধঃপতিত। তাদের জীবনযাপন খুবই লাঞ্ছনাকর। কেলেঙ্কারিকে তারা পরোয়া করে না। যা ইচ্ছা তা-ই করে বেড়ায়। কামনা তাদের চালিত করে। প্রবৃত্তির বাসনা তাদের নীতিবোধ ও নৈতিকতাকে পরাভূত করে রাখে।
চলুন, একটা জরিপ দেখে নিই, যেখানে আঠারো বছরের নিচের মার্কিন তরুণদের—যারা আর দশ বছর পর তাদের দেশের নেতৃত্বের আসনে বসবে—অবস্থা চিত্রায়িত হয়েছে...
• এই তরুণদের ৫৫% ব্যভিচারের অপরাধে জড়িত। আমেরিকার প্রধান প্রধান শহরে এই হার ৮০% এবং গ্রামাঞ্চলে ৩৩%! তার মানে হলো, আমেরিকার সবচেয়ে সভ্য পরিবেশেও ৩৩% তরুণ ব্যভিচারের অপরাধের সাথে জড়িত! এই জরিপ কেবল অনুর্ধ্ব-১৮ তরুণদের নিয়ে। সব বয়সের মানুষকে নিয়ে করা জরিপে ব্যভিচারীদের হার প্রায় ৯০%!!
• সেখানে প্রতিবছর ৩ লাখ ৫০ হাজার অনুর্ধ্ব-১৮ তরুণী বিয়ে ছাড়াই গর্ভবতী হয়! এটা আনুমানিক ধারণা। বাস্তবে বিয়েবহির্ভূত গর্ভপাতের ঘটনা এর চেয়ে বেশি!
• ২৪% মার্কিন পরিবারে পিতা বলতে কেউ নেই! কারণ মা একাধিক পুরুষের সাথে জিনা করার কারণে কোন সন্তান কার তা জানেই না! অথবা বিবাহ-বিচ্ছেদের কারণে পরিবার পিতাহীন হয়ে পড়েছে।
• ৪০% তরুণ মাদকাসক্ত। অ্যালকোহল সেখানে পানির মতো সহজলভ্য। তাই অ্যালকোহলসেবীদের সংখ্যা গণনা করা মানে কেমন যেন আদমশুমারি করা!!
• মার্কিন শহর ডালাসে মাত্র এক বছরে (১৯৯৮-১৯৯৯) অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৭০ গুণ!!
• আমেরিকায় যেসব কারণে তরুণদের মৃত্যু হয়, তার তৃতীয় স্থানে রয়েছে আত্মহত্যা! অর্থাৎ আগামীর আমেরিকা যাদের হাতে পরিচালিত হবে, তাদের বড় একটি অংশ আত্মহত্যা করে দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছে! হিসাব করে দেখা গেছে, শুধু আমেরিকাতেই প্রতিবছর প্রায় ৩২ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে দুনিয়া ত্যাগ করে!
• সেখানে প্রতি সাত জনের একজন তরুণ জুয়ায় আসক্ত—যাকে রীতিমতো একটি ভয়ংকর রোগ মনে করা হয়।
এই হচ্ছে বর্তমান তথাকথিত পরাশক্তি আমেরিকার অভ্যন্তরীণ অবস্থা, যার ভয়ে আমরা বিনা কারণে তটস্থ হয়ে আছি!!

প্রিয় দ্বীনি ভাই, বন্ধু...
এখনো কি ভেতর থেকে পচে যাওয়া ওই জাতির বিরুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ রয়ে গেছে? নিঃসন্দেহে আমরা সে জাতির বিরুদ্ধে হেসেখেলে জয়লাভ করব, যাদের অধিকাংশই ব্যভিচারী অথবা সমকামী। যে জাতির হৃদয়ে আছে মদ ও নোংরামির প্রতি ভালোবাসা, সে জাতি কোনোভাবেই ইমানি বলে বলীয়ান মুসলিম বাহিনীর সাথে পেরে উঠবে না ইনশাআল্লাহ। দরকার শুধু সাহসের। আমার বিশ্বাস, এতক্ষণে সেই সাহস তোমার হয়েছে।
প্রিয় দ্বীনি ভাই, বন্ধু...
لَا يَغُرَّنَّكَ تَقَلُّبُ الَّذِينَ كَفَرُوا فِي الْبِلَادِ - مَتَاعٌ قَلِيلٌ ثُمَّ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمِهَادُ
'নগরীতে কাফিরদের চালচলন যেন তোমাদেরকে ধোঁকা না দেয়। এটা হলো সামান্য ফায়দা—এরপর তাদের ঠিকানা হবে দোজখ। আর সেটি হলো অতি নিকৃষ্ট অবস্থান।'
وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا سَبَقُوا إِنَّهُمْ لَا يُعْجِزُونَ
'আর কাফিররা যেন কখনো মনে না করে যে, তারা বেঁচে গেছে; কখনো এরা আমাকে পরিশ্রান্ত করতে পারবে না।'

টিকাঃ
৩০. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১১২।
৩১. সুরা আল-হাশর, ৫৯: ১৪।
৩২. সুরা আল-বাকারা, ২: ৯৬।
৩৩. সুরা আত-তাওবা, ৯ : ১৩-১৫।
৩৪. সুরা আল-আনফাল, ৮: ১৯।
৩৫. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১২।
৩৬. সুরা আল-আনফাল, ৮: ৩৬।
৩৭. সুরা আল-আরাফ, ৭: ১৭৯।
৩৮. সুরা আন-নামল, ২৭: ৬৩।
৩৯. সুরা ইউনুস, ১০ : ২৪।
৪০. সুরা আল-কমার, ৫৪: ১১-১২।
৪১. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১৯৬-১৯৭।
৪২. সুরা আল-আনফাল, ৮: ৫৯।

প্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ,
কারা আপনাদের প্রতিপক্ষ? কাদের বিরুদ্ধে আপনারা জিহাদ করেন? তারা কি ইহুদি ও তাদের সহযোগী নয়? তাহলে আর ভয় কীসের? কারণ তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন:
ضُرِبَتْ عَلَيْهِمُ الذِّلَّةُ أَيْنَ مَا ثُقِفُوا
‘যেখানেই তাদের পাওয়া গিয়েছে, সেখানেই তারা লাঞ্ছিত হয়েছে।’
لَا يُقَاتِلُونَكُمْ جَمِيعًا إِلَّا فِي قُرًى مُحَصَّنَةٍ أَوْ مِنْ وَرَاءِ جُدُرٍ
‘এরা সকলে সংঘবদ্ধভাবেও তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সমর্থ হবে না; কিন্তু কেবল সুরক্ষিত জনপদের অভ্যন্তরে অথবা দুর্গ-প্রাচীরের অন্তরালে থেকে।’
وَلَتَجِدَنَّهُمْ أَحْرَصَ النَّاسِ عَلَى حَيَاةٍ وَمِنَ الَّذِينَ أَشْرَكُوا
‘তুমি নিশ্চয় তাদেরকে জীবনের প্রতি সকল মানুষ, এমনকি মুশরিক অপেক্ষা অধিক লোভী দেখতে পাবে।’
এই হচ্ছে ইহুদিদের অবস্থা, যাদের আমরা ভয় পাচ্ছি!
أَتَخْشَوْنَهُمْ فَاللَّهُ أَحَقُّ أَنْ تَخْشَوْهُ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ - قَاتِلُوهُمْ يُعَذِّبْهُمُ اللهُ بِأَيْدِيكُمْ وَيُخْزِهِمْ وَيَنْصُرُكُمْ عَلَيْهِمْ وَيَشْفِ صُدُورَ قَوْمٍ مُؤْمِنِينَ - وَيُذْهِبْ غَيْظَ قُلُوبِهِمْ وَيَتُوبُ اللهُ عَلَى مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
'তোমরা কি তাদেরকে ভয় করো? আল্লাহকে ভয় করাই তোমাদের পক্ষে অধিক সমীচীন, যদি তোমরা মুমিন হও। তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করো। তোমাদের হাতে আল্লাহ ওদের শাস্তি দেবেন, ওদের লাঞ্ছিত করবেন, ওদের ওপর তোমাদের বিজয়ী করবেন, মুমিনদের চিত্ত প্রশান্ত করবেন এবং তাদের অন্তরের ক্ষোভ দূর করবেন। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তার প্রতি ক্ষমাপরায়ণ হন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। '

• ইহুদিরা যদি সংখ্যায় অনেক হয় এবং সকল কাফির বাহিনী একযোগ হয়ে তাদের সাহায্য করে, তবুও ভয়ের কোনো কারণ নেই। কারণ তাদের সম্বোধন করে আল্লাহ বলেছেন:
وَلَنْ تُغْنِيَ عَنْكُمْ فِئَتُكُمْ شَيْئًا وَلَوْ كَثُرَتْ وَأَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُؤْمِنِينَ
'আর সংখ্যায় তোমাদের দল অধিক হলেও তোমাদের কোনো কাজে আসবে না। নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের সঙ্গেই রয়েছেন।'
• তাদের সমরপ্রস্তুতি দেখে ভয় পাচ্ছেন? তাদের ব্যাপারে আল্লাহ কী বলেছেন, দেখুন :
قُلْ لِلَّذِينَ كَفَرُوا سَتُغْلَبُونَ وَتُحْشَرُونَ إِلَى جَهَنَّمَ وَبِئْسَ الْمِهَادُ
'যারা কুফরি করে তাদের বলুন, “তোমরা শীঘ্রই পরাভূত হবে এবং তোমাদেরকে একত্রিত করে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। আর তা কত নিকৃষ্ট আবাসস্থল!”
• তাদের ধনসম্পদ দেখে ঘাবড়ে যাচ্ছেন? তাহলে তাদের ব্যাপারে আল্লাহ কী বলেছেন, দেখুন :
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ لِيَصُدُّوا عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ فَسَيُنْفِقُونَهَا ثُمَّ تَكُونُ عَلَيْهِمْ حَسْرَةً ثُمَّ يُغْلَبُونَ وَالَّذِينَ كَفَرُوا إِلَى جَهَنَّمَ يُحْشَرُونَ
'আল্লাহর পথ থেকে লোকদের নিবৃত্ত করার জন্য কাফিররা তাদের ধনসম্পদ ব্যয় করে, তারা ধনসম্পদ ব্যয় করতেই থাকবে; অতঃপর তা তাদের মনস্তাপের কারণ হবে, এর পর তারা পরাভূত হবে এবং যারা কুফরি করেছে, তাদেরকে জাহান্নামে একত্র করা হবে। '
তাদের বুদ্ধি ও শারীরিক গঠন দেখে ভীত হয়ে পড়েছেন? তাহলে তাদের ব্যাপারে আল্লাহ কী বলেছেন, শুনুন :
لَهُمْ قُلُوبٌ لَا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لَا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لَا يَسْمَعُونَ بِهَا أُولَئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ أُولَئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ
'তাদের হৃদয় আছে, কিন্তু তা দ্বারা তারা উপলব্ধি করে না; তাদের চক্ষু আছে, কিন্তু তা দ্বারা তারা দেখে না এবং তাদের কান আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো; বরং তার চেয়েও অধিক বিভ্রান্ত। তারাই গাফিল। '

তবুও কি হে মুসলিমগণ, এই কাফিরদের তোমরা অজেয় মনে করো? তাহলে কয়েকটি চাক্ষুষ প্রমাণ দেখে নাও :
• আমরা তথাকথিত পরাশক্তি অহংকারী আমেরিকাকে ভিয়েতনাম—যা আয়তনে ছোট হওয়ার কারণে মানচিত্রে ঠিকভাবে দেখা যায় না—থেকে ৫৯ হাজার সেনার প্রাণ হারিয়ে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে আসতে দেখেছি। এভাবে সোমালিয়া ও লেবানন থেকেও দখলদারী কাফির বাহিনীকে লাঞ্ছনাকর পরাজয় নিয়ে পালিয়ে আসতে দেখেছি।
• আমরা শক্তিশালী রাশিয়ার চেরনোবিল চুল্লি বিস্ফোরিত হয়ে হাজার হাজার একর ভূমি দূষিত হতে দেখেছি।
• কাফিররা চ্যালেঞ্জার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করার পর গর্বভরে বলেছিল, এর মাধ্যমে তারা পূর্ণতার স্তরে পৌঁছে গিয়েছে! কিন্তু তা দ্বারা উপকৃত হওয়ার আগেই আমরা তা বিস্ফোরিত হতে দেখেছি। পুরো ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই (টার্গেটে আঘাত হানার পূর্বে) তাদেরই চোখের সামনে তা বিস্ফোরিত হয়!
تَعَالَى اللَّهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ
'তারা যাকে শরিক করে, আল্লাহ তা থেকে অনেক ঊর্ধ্বে।'
وَظَنَّ أَهْلُهَا أَنَّهُمْ قَادِرُونَ عَلَيْهَا أَتَاهَا أَمْرُنَا لَيْلًا أَوْ نَهَارًا فَجَعَلْنَاهَا حَصِيدًا كَأَنْ لَمْ تَغْنَ بِالْأَمْسِ
'আর জমিনের অধিকর্তারা ভাবতে লাগল, এগুলো আমাদের হাতে আসবে, হঠাৎ করে তার ওপর আমার নির্দেশ এসে পড়ে রাত্রে কিংবা দিনে। আর আমি তাকে কর্তিত ফসলের এমন শূন্য ভূমিতে পরিণত করি, যেন কালও এখানে কোনো আবাদ ছিল না।'
অনুরূপভাবে আমরা দেখেছি, কীভাবে কাফিররা আল্লাহর কুদরতের সামনে সম্পূর্ণ নিস্তেজ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। কিছুই করার ছিল না তাদের...
• আমরা মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যেই পুরো একটি শহর বন্যায় প্লাবিত হতে দেখেছি। ঘটনাটি ঘটেছিল আমেরিকার বিখ্যাত শহর নিউ অরলিন্সে। ১৯৯৫ সালের মে মাসে।
فَفَتَحْنَا أَبْوَابَ السَّمَاءِ بِمَاءٍ مُنْهَمِرٍ - وَفَجَّرْنَا الْأَرْضَ عُيُونًا فَالْتَقَى الْمَاءُ عَلَى أَمْرٍ قَدْ قُدِرَ
'তখন আমি খুলে দিলাম আকাশের দ্বার প্রবল বারিবর্ষণের মাধ্যমে। এবং ভূমি থেকে প্রবাহিত করলাম প্রস্রবণ। অতঃপর সমুদয় পানি মিলে গেল এক স্থিরীকৃত কাজের জন্য।'
• আমরা দেখেছি, একটি তুষার ঝড় আমেরিকার উন্নত ও আধুনিক শহর নিউইয়র্কে আঘাত হেনে গাড়িসমূহ দাফন করে দিয়েছিল, রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিয়েছিল এবং টানা তিন দিন জীবনযাত্রা বন্ধ করে রেখেছিল!!
• আমরা দেখেছি, একটি হারিকেন বিশাল বিশাল পরিবহন উড়িয়ে তাদের বাড়িঘরের ওপর নিক্ষেপ করছে!! আমরা দেখেছি ঝঞ্ঝাবায়ু নিরবচ্ছিন্ন দুর্ভাগ্যের দিনে, যা মানুষকে উৎখাত করেছিল উন্মূলিত খেজুর কাণ্ডের মতো। বনে-জঙ্গলে গাছপালা উড়তে দেখেছি। নিমিষের মধ্যেই শত শত তাজা প্রাণ ঝরে যেতে দেখেছি। সবই দেখেছি; কিন্তু আফসোস! এসব দেখে আমরা শিক্ষা লাভ করতে পারিনি!

আপনারা কি কাফির সমাজের ভেতরের অবস্থা দেখেছেন? ভেতর থেকে তাদের সমাজ জীর্ণ, অধঃপতিত। তাদের জীবনযাপন খুবই লাঞ্ছনাকর। কেলেঙ্কারিকে তারা পরোয়া করে না। যা ইচ্ছা তা-ই করে বেড়ায়। কামনা তাদের চালিত করে। প্রবৃত্তির বাসনা তাদের নীতিবোধ ও নৈতিকতাকে পরাভূত করে রাখে।
চলুন, একটা জরিপ দেখে নিই, যেখানে আঠারো বছরের নিচের মার্কিন তরুণদের—যারা আর দশ বছর পর তাদের দেশের নেতৃত্বের আসনে বসবে—অবস্থা চিত্রায়িত হয়েছে...
• এই তরুণদের ৫৫% ব্যভিচারের অপরাধে জড়িত। আমেরিকার প্রধান প্রধান শহরে এই হার ৮০% এবং গ্রামাঞ্চলে ৩৩%! তার মানে হলো, আমেরিকার সবচেয়ে সভ্য পরিবেশেও ৩৩% তরুণ ব্যভিচারের অপরাধের সাথে জড়িত! এই জরিপ কেবল অনুর্ধ্ব-১৮ তরুণদের নিয়ে। সব বয়সের মানুষকে নিয়ে করা জরিপে ব্যভিচারীদের হার প্রায় ৯০%!!
• সেখানে প্রতিবছর ৩ লাখ ৫০ হাজার অনুর্ধ্ব-১৮ তরুণী বিয়ে ছাড়াই গর্ভবতী হয়! এটা আনুমানিক ধারণা। বাস্তবে বিয়েবহির্ভূত গর্ভপাতের ঘটনা এর চেয়ে বেশি!
• ২৪% মার্কিন পরিবারে পিতা বলতে কেউ নেই! কারণ মা একাধিক পুরুষের সাথে জিনা করার কারণে কোন সন্তান কার তা জানেই না! অথবা বিবাহ-বিচ্ছেদের কারণে পরিবার পিতাহীন হয়ে পড়েছে।
• ৪০% তরুণ মাদকাসক্ত। অ্যালকোহল সেখানে পানির মতো সহজলভ্য। তাই অ্যালকোহলসেবীদের সংখ্যা গণনা করা মানে কেমন যেন আদমশুমারি করা!!
• মার্কিন শহর ডালাসে মাত্র এক বছরে (১৯৯৮-১৯৯৯) অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৭০ গুণ!!
• আমেরিকায় যেসব কারণে তরুণদের মৃত্যু হয়, তার তৃতীয় স্থানে রয়েছে আত্মহত্যা! অর্থাৎ আগামীর আমেরিকা যাদের হাতে পরিচালিত হবে, তাদের বড় একটি অংশ আত্মহত্যা করে দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছে! হিসাব করে দেখা গেছে, শুধু আমেরিকাতেই প্রতিবছর প্রায় ৩২ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে দুনিয়া ত্যাগ করে!
• সেখানে প্রতি সাত জনের একজন তরুণ জুয়ায় আসক্ত—যাকে রীতিমতো একটি ভয়ংকর রোগ মনে করা হয়।
এই হচ্ছে বর্তমান তথাকথিত পরাশক্তি আমেরিকার অভ্যন্তরীণ অবস্থা, যার ভয়ে আমরা বিনা কারণে তটস্থ হয়ে আছি!!

প্রিয় দ্বীনি ভাই, বন্ধু...
এখনো কি ভেতর থেকে পচে যাওয়া ওই জাতির বিরুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ রয়ে গেছে? নিঃসন্দেহে আমরা সে জাতির বিরুদ্ধে হেসেখেলে জয়লাভ করব, যাদের অধিকাংশই ব্যভিচারী অথবা সমকামী। যে জাতির হৃদয়ে আছে মদ ও নোংরামির প্রতি ভালোবাসা, সে জাতি কোনোভাবেই ইমানি বলে বলীয়ান মুসলিম বাহিনীর সাথে পেরে উঠবে না ইনশাআল্লাহ। দরকার শুধু সাহসের। আমার বিশ্বাস, এতক্ষণে সেই সাহস তোমার হয়েছে।
প্রিয় দ্বীনি ভাই, বন্ধু...
لَا يَغُرَّنَّكَ تَقَلُّبُ الَّذِينَ كَفَرُوا فِي الْبِلَادِ - مَتَاعٌ قَلِيلٌ ثُمَّ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمِهَادُ
'নগরীতে কাফিরদের চালচলন যেন তোমাদেরকে ধোঁকা না দেয়। এটা হলো সামান্য ফায়দা—এরপর তাদের ঠিকানা হবে দোজখ। আর সেটি হলো অতি নিকৃষ্ট অবস্থান।'
وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا سَبَقُوا إِنَّهُمْ لَا يُعْجِزُونَ
'আর কাফিররা যেন কখনো মনে না করে যে, তারা বেঁচে গেছে; কখনো এরা আমাকে পরিশ্রান্ত করতে পারবে না।'

টিকাঃ
৩০. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১১২।
৩১. সুরা আল-হাশর, ৫৯: ১৪।
৩২. সুরা আল-বাকারা, ২: ৯৬।
৩৩. সুরা আত-তাওবা, ৯ : ১৩-১৫।
৩৪. সুরা আল-আনফাল, ৮: ১৯।
৩৫. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১২।
৩৬. সুরা আল-আনফাল, ৮: ৩৬।
৩৭. সুরা আল-আরাফ, ৭: ১৭৯।
৩৮. সুরা আন-নামল, ২৭: ৬৩।
৩৯. সুরা ইউনুস, ১০ : ২৪।
৪০. সুরা আল-কমার, ৫৪: ১১-১২।
৪১. সুরা আলি ইমরান, ৩: ১৯৬-১৯৭।
৪২. সুরা আল-আনফাল, ৮: ৫৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00