📄 নেতিবাচক মনোভাবাপন্ন মুসলিম
এরা মুসলিমদের বড় একটি দল—যারা সত্যকে জানে; কিন্তু তার জন্য কাজ করে না। ভালোকে চেনে; কিন্তু তার দিকে আহ্বান করে না। মন্দ তাদের কাছে স্পষ্ট; কিন্তু তা থেকে অন্যকে নিষেধ করে না। তারা অপেক্ষায় থাকে, কখন আসমানি কুদরত এসে সবকিছু ঠিকঠাক করে দেবে অথবা পৃথিবীর বুক থেকেই তারা ছাড়া অন্য কোনো দল এসে মুসলিম উম্মাহকে রক্ষা করবে। অন্যের সমালোচনা ছাড়া তাদের খেয়েদেয়ে আর কোনো কাজ নেই। দ্বীনের ঝান্ডা বহন করে যারা কাজ করে যাচ্ছে, পদে পদে তাদের ভুল ধরাই এ শ্রেণির প্রধান কাজ। এই বর্বর শ্রেণির লোকেরা কী করেছে? তারা বড় বড় অনেক অপরাধ করেছে। উদাহরণস্বরূপ এখানে কয়েকটির কথা তুলে ধরলাম:
১. ইতিহাস জালিয়াতি
এটি একটি জঘন্য অপরাধ, যার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা এ ছোট্ট কলেবরে সম্ভব নয়। তারা মিথ্যার পর মিথ্যা বলেছে, লিখেছে। মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তারা সহিহ ও হাসান (বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত) বর্ণনাসমূহ এড়িয়ে আশ্রয় নিয়েছে দুর্বল ও জাল বর্ণনার। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খুঁজে বের করেছে ইতিহাসের গভীরে লুকিয়ে থাকা বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনাসমূহ—যে ধরনের দুর্ঘটনা প্রত্যেক জাতির ইতিহাসে আছে—আর মাটিচাপা দিয়েছে গৌরবময় সুন্দর ইতিহাসকে। তারা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে মুসলিম উম্মাহর নৈতিক, বৈজ্ঞানিক, স্থাপত্য, সামরিক, অর্থনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, সাহিত্য এবং সভ্যতার অন্যান্য সুন্দর দিকগুলো উপেক্ষা করে রাজনীতি ও তার সমস্যার দিকে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে। তারা ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনার ইচ্ছাকৃত ভুল ব্যাখ্যা করেছে এবং জেনেশুনে সম্মানিত ব্যক্তিদের চরিত্রে কালিমা লেপন করেছে। এসবের ফলে ইতিহাস আমাদের কাছে একটি বিকৃত ও কদর্য রূপ নিয়ে উপস্থিত হয়েছে, যাকে নিজেদের ইতিহাস বলে পরিচয় দিতে উম্মাহর অধিকাংশ লোক লজ্জাবোধ করে এবং অনেকেই ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করে। বিশালসংখ্যক লোক মনে করে, যেখানে পূর্ববর্তীদের অবস্থা এমন, সেখানে পরবর্তীদের থেকে কীভাবে কল্যাণের আশা করা যায়!? এবার নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, ইতিহাস জালিয়াতি কেন এত বড় অপরাধ।
২. বাস্তবতা বিকৃতি
প্রাচ্যবিদ প্রভুরা মুসলিমদের উজ্জ্বল ইতিহাসকে মুছে দিয়েছে। আর প্রভুদের অনুসরণে মুসলিমদের বাস্তবতা ও বর্তমানকে মুছে ফেলার দায়িত্ব নিয়েছে পাশ্চাত্যবাদী গোলামেরা। পাশ্চাত্যবাদী মিডিয়া ও তথাকথিত সুশীল সমাজ কোমর বেঁধে উম্মাহর জেগে ওঠার সম্ভাবনা প্রত্যাখান করার এবং উম্মাহর হৃদয়ে নৈরাশ্য জাগিয়ে রাখার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। সহজ করে দিচ্ছে পশ্চিমা মিডিয়ার কাজকে। এর জন্য তারা বিভিন্ন বিষয়ের ভিন্ন ভিন্ন বিকৃত নাম দিয়েছে। ইসলামি অনুশাসন মেনে চলার নাম দিয়েছে সন্ত্রাস-উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদ। পর্দা বিধানের নাম দিয়েছে নারীর প্রতি কঠোরতা। শরিয়াহ আইন বাস্তবায়নকে তারা নামকরণ করেছে পশ্চাৎপদগামিতা-পশ্চাৎপদতা-পশ্চাদমুখিতা-অনুন্নতি। পশ্চিমা দেশে যখন কোনো মুসলিম অপরাধ করে, তখন তারা বলে, ‘মুসলিম অপরাধ করেছে।’ অনুরূপভাবে ইসলামি রাষ্ট্রে কোনো প্র্যাক্টিসিং মুসলিম যদি অপরাধ করে, তখন তার ইসলামি পরিচয়টাকে খুব হাইলাইট করা হয়। পক্ষান্তরে, একই অপরাধ যদি কোনো খ্রিষ্টান করে, তখন শুধু তার নামটাই প্রচার করা হয়, তার ধর্মীয় পরিচয়কে সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়। ১৯৯৫ সালে সংঘটিত আমেরিকার ওকলাহোমা শহরে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ। ঘটনার পর চোখবুজেই তারা বলেছিল, এটা মুসলিমদের কাজ। কিন্তু পরে যখন প্রমাণিত হলো এ ঘটনার মূল হোতা একজন খ্রিষ্টান, তখন তারা অপরাধীর ধর্মীয় পরিচয় বাদ দিয়ে শুধু নাম হাইলাইট করে বলল, ‘টিমোথি ম্যাকভেই বোমা বিস্ফোরণ করেছেন!’ যখন কোনো মুসলিম দোষ করে, তখন তারা বলে, মুসলিম দোষ করেছে। কিন্তু সে একই মুসলিম যদি কোনো ভালো কাজ করে, তখন তার ধর্মীয় পরিচয় গোপন রেখে মিশরীয়, সিরীয়, পাকিস্তানি ইত্যাদি তথাকথিত জাতিগত পরিচয় তুলে ধরা হয়।
এ ছাড়াও গণমাধ্যমে ইসলামের অনুসারীদের অত্যন্ত আপত্তিকর উপায়ে চিত্রায়ণ করা হয়। নাটক-সিনেমায় ইসলামি পরিচয়ধারী লোকদের উপস্থাপন করা হয় অদ্ভুত আকৃতিতে। তাদের চোখ হয় তন্দ্রাচ্ছন্ন। তারা বোকার মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। অকারণে হাসে। তারা হয় অলস, কর্মতৎপরতাহীন। যেন এর মাধ্যমে তারা বোঝাতে চায় যে, কেউ যদি ইসলামের অনুশাসন মেনে চলার চেষ্টা করে, তাকে নাটক-সিনেমায় দেখানো মুসলিম চরিত্রধারী লোকের মতো জ্ঞান-বুদ্ধির দিক থেকে পেছনে পড়ে থাকতে হবে! অনুরূপভাবে প্রায় সব নাটক-সিনেমায় ইসলামপন্থী লোক হিসেবে যাদের তুলে ধরা হয়, তারা সাধারণ আরবিতে কথা না বলে অতি শুদ্ধ আরবিতে কথা বলে। কুরআন-হাদিসের মানের আরবিতে কথা বললে একটা কথা ছিল; কিন্তু তারা কথা বলে উচ্চাঙ্গ সাহিত্যমানের সাধারণের দুর্বোধ্য আরবিতে। ফলে তারা যখন কথা বলে, তখন আশপাশের লোকেরা তাদের কথা বুঝতে না পেরে আশ্চর্য হয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে, হাসি-ঠাট্টা করে! সুবহানাল্লাহ! কী জঘন্য বিদ্রুপাত্মক আচরণ আরবি ভাষার সাথে, যা কিনা গোটা বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোৎকৃষ্ট ভাষা!
৩. পাশ্চাত্যভক্তি
পাশ্চাত্যবাদীরা ইসলামের ইতিহাস ও বাস্তব রূপকে ধ্বংস করার পর আপনার সামনে পাশ্চাত্যের মূল্য এতটাই বাড়িয়ে দিয়েছে যে, যাতে আপনার কাছে পাশ্চাত্যের দাসত্বের লাঞ্ছনা মেনে নেওয়া এবং তাদের অন্ধ অনুকরণ করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় না থাকে। তারা পাশ্চাত্যের অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক শক্তি, সভ্যতা, নৈতিকতা, বুদ্ধিমত্তা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, শিল্প, এমনকি পাশ্চাত্যের ভাষাকেই মহিমান্বিত করে উপস্থাপন করেছে। ফলে মুসলিমদের মাঝে ভয়ানক পাশ্চাত্য-মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ে। এখন একজন মুসলিম নিজের ছেলেকে আরবি শেখানোর চেয়ে ইংরেজি শেখাতে বেশি আগ্রহবোধ করে। অবস্থা এতদূর গড়িয়েছে যে, এখন ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও মুসলিমদেরকে একাধিক ভিনদেশি ভাষা শেখানোর দায়িত্ব হাতে নিয়েছে। এই অজুহাতে যে, পশ্চিমাদের ইসলামের দিকে দাওয়াত দেওয়ার জন্য তো তাদের ভাষা শিখতে হবে!! তা ঠিক আছে; কিন্তু তাই বলে কি নিজের ভাষা বাদ দিয়ে ভিনদেশি ভাষা শিখতে হবে!? ভিনদেশি ভাষা শেখার পেছনে আরেকটি অজুহাত হলো, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য ভালোভাবে ভিনদেশি ভাষা রপ্ত করতে হয়। তাই বলে কি কুরআনের ভাষাকে কম গুরুত্ব দিতে হবে?
প্রতিষ্ঠানসমূহে ভিনদেশি ভাষাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার কারণে অবস্থা এমন হয়ে পড়েছে যে, আপনি যদি আপনার ছেলের আরবি শিক্ষককে আলাদাভাবে বাড়িতেও নিয়ে আসেন, তবুও আপনার ছেলে ওই ভিনদেশি ভাষাকেই বেশি গুরুত্ব দেবে, যেটাকে তার স্কুলে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমি শিশুদের ভিনদেশি ভাষা শিক্ষা দেওয়ার বিরোধিতা করছি না। তারও প্রয়োজন আছে। তবে সবার আগে নিজের ভাষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। এরপর দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ভিনদেশি ভাষা শিখতে সমস্যা নেই। কোনো অবস্থাতেই আমাদের শিশুদের গণিত, ভূগোল, ইতিহাস প্রভৃতি বিষয় ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান বা অন্য কোনো ভিনদেশি ভাষায় শিক্ষা দেওয়া উচিত হবে না। জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখা-প্রশাখা আরবিতেই শিক্ষা দেওয়া বাঞ্ছনীয়। বিষয়টি এতটাই সরল যে, তা গ্রহণ করতে অসুবিধা হয় কেন আমার বুঝে আসে না! পৃথিবীতে এমন কোনো উন্নয়ন-প্রত্যাশী রাষ্ট্র নেই, যে নিজের ভাষাকে অন্য সকল ভাষার ওপর প্রাধান্য দেয় না। আপনি ফ্রান্সে গিয়ে সেখানকার কোনো নাগরিকের সাথে যদি ইংরেজিতে কথা বলেন, সে আপনার কথার উত্তর দিতে না পেরে কোনোরূপ অনুশোচনা করবে না, কারণ সে তার নিজের ভাষা নিয়ে গর্ব অনুভব করে। জার্মানির অবস্থাও একই। সেখানে আপনি থাকতে চাইলে জার্মান ভাষাতেই কথা বলতে হবে।
একটা চমৎকার গল্প শোনাই। আমি স্পেনের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে গিয়েছিলাম আন্দালুসিয়ায় মুসলিমদের ইতিহাসের বিশেষ কিছু ছবির খোঁজে। ওয়াল্লাহি, তাদের কাছে আরবি দূরে থাক, ইংরেজি ভাষায় লিখিত একটি বইও পেলাম না! একমাত্র স্প্যানিশ ছাড়া অন্য কোনো ভাষার বই সেখানে নেই! আমি তাদের বললাম, ‘স্প্যানিশ ভাষা তো মাত্র কয়েকটি দেশে সীমাবদ্ধ। তাই আপনাদের উচিত, এ বইগুলো বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করা; যাতে আমরা নন-স্প্যানিশরা বুঝতে পারি।’ তারা আমাকে উত্তর দিল, ‘আমাদের থেকে যদি কেউ কিছু শিখতে চায়, সে আমাদের ভাষা শিখে নিলেই তো হলো, আমাদের অনুবাদ করে দেওয়ার কী দরকার!?’ নিজেদের ভাষার প্রতি—যা কিনা পৃথিবীর অল্পসংখ্যক মানুষের ভাষা—তাদের মর্যাদাবোধ ও গর্ব দেখে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। পাশ্চাত্যকে মহিমান্বিত করে দেখানোর এই অপরাধ যুবকদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা কমিয়ে দিয়েছে। তাদের মাঝে সৃষ্টি করেছে হীনম্মন্যতা ও সংকল্পের দুর্বলতা। ফলে মুসলিম তরুণরা নিজের দেশ ও পরিবার পেছনে ফেলে পশ্চিমা দেশগুলোতে, আমেরিকা-ইউরোপে পাড়ি জমানোর স্বপ্ন দেখে। যাতে পাশ্চাত্যপ্রেমীদের তথাকথিত পৃথিবীর জান্নাতে বসবাস করতে পারে! এভাবেই উল্লিখিত অপরাধ ও ষড়যন্ত্রের কবলে পড়ে বিশাল সংখ্যক মুসলিম কঠিন হতাশার কালো সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে। কৃত্রিম বাস্তবতার কাছে হার মেনে নিয়ে পশ্চিমা সভ্যতার লেজ ধরে চলতে রাজি হয়ে গেছে! লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ!!