📄 প্রাচ্যবিদ গোষ্ঠী (Orientalists)
এরা ইউরোপীয় পণ্ডিতদের একটি দল, যাদের অধিকাংশের হৃদয় ঘৃণায় পরিপূর্ণ, হিংসা তাদের অধিকাংশের হৃদয় পুড়িয়ে দিয়েছে এবং পরশ্রীকাতরতা তাদের বেশির ভাগ লোককে অন্ধ করে দিয়েছে। ফলে তারা ইসলাম নিয়ে, ইসলামের ইতিহাস, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং ইসলামি জীবনপদ্ধতি সম্পর্কে অধ্যয়ন করতে শুরু করল। তবে ইসলাম অধ্যয়নে তাদের উদ্দেশ্য ইসলামের নির্দেশনা অনুসারে নিজেদের জীবন পরিচালনা করা নয়; বরং এর উদ্দেশ্য হলো, কৌশলে ইসলামকে বিকৃত করা, অপবাদ দেওয়া এবং মুসলিমদের মনে ইসলাম সম্পর্কে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করা। নিজেদের উদ্দেশ্য সফল করার লক্ষ্যে তারা অসংখ্য বই প্রকাশ করেছে এবং বিশ্বব্যাপী তাদের মতবাদ ছড়িয়ে দিয়েছে। অনেক অদূরদর্শী মুসলিমের মনে তাদের বিশ্লেষণ মুগ্ধতা ছড়িয়েছে; ফলে তারা তাদের বিকৃত বিশ্লেষণকেই প্রকৃত ইসলাম মনে করে বসেছে। এভাবে প্রাচ্যবিদরা মুসলিমদের গলার কাঁটা হয়ে ওঠে।
📄 পাশ্চাত্যবাদী গোষ্ঠী (Occidentalists)
প্রাচ্যবিদদের অনুসরণে আরেকটি দল সৃষ্টি হয়েছে, যাদের আমি ‘পাশ্চাত্যবাদী গোষ্ঠী’ বলতে পছন্দ করি। এরা মুসলিমদেরই সন্তান, যারা পশ্চিমাদের দ্বারা প্রলুব্ধ, প্রভাবিত। পাশ্চাত্যের আড়ম্বরপূর্ণ বাহ্যিক রূপ দেখে তাদের মন পাশ্চাত্যপ্রেমে বিভোর। পশ্চিমারা দারুণভাবে সুযোগটি কাজে লাগায়। এ শ্রেণির লোকদের তারা অসৎ উদ্দেশ্যের হাত বাড়িয়ে টেনে নেয়। অতঃপর চোখ ধাঁধিয়ে দিয়ে, মগজধোলাই করে তাদের মনে বসিয়ে দেয় পাশ্চাত্য চিন্তাধারা। এরপর নিজ নিজ দেশে পাঠিয়ে দেয় তাদের। যাতে তারা মুসলিম জাতির সন্তানদের বিভ্রান্ত করতে পারে এবং ইসলাম নিয়ে মুসলিমদের মনে সংশয় বাঁধিয়ে দিতে পারে। তাদের আরেকটি দায়িত্ব হলো মুসলিমদের বোঝানো যে, পশ্চিমাদের অনুসরণ ছাড়া উন্নতি লাভ করা সম্ভব নয়।
এ জন্য তাদের অনেকে বলে, ‘আমাদের রাষ্ট্রসমূহ ততদিন উন্নত হবে না, যতদিন না আমরা ভালো-মন্দ সব দিক দিয়ে লন্ডন-প্যারিসের অনুসরণ করি এবং তাদের ভালো-খারাপ সকল কিছু আমাদের দেশে নিয়ে আসি।’ তাদের একজন হলেন আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা ছাত্র ও কুরআনের হাফিজ। আজহারে পড়া শেষ করে তিনি আরও উচ্চশিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে ফ্রান্স যান। অতঃপর ইসলামি রাষ্ট্রে ফিরে আসেন। এসেই এখানকার ছাত্রদের কুরআনের সমালোচনা করতে শেখাতে শুরু করেছেন। এই আয়াত শক্তিশালী, ওই আয়াত দুর্বল... টাইপের জঘন্য মন্তব্য করে নিজের জ্ঞান জাহির করতে লাগলেন।
كَبُرَتْ كَلِمَةً تَخْرُجُ مِنْ أَفْوَاهِهِمْ إِنْ يَقُولُونَ إِلَّا كَذِبًا
‘তাদের মুখনিঃসৃত বাক্য কী সাংঘাতিক! তারা তো কেবল মিথ্যাই বলে।’৩
তিনি তার ছাত্রদের বলতেন, ‘কুরআনে যে ইবরাহিম ও ইসমাইল-এর অস্তিত্বের কথা বলা হয়েছে, তার মানে এ নয় যে, বাস্তবেও তারা ছিলেন! শুধু কুরআন দিয়ে তাদের অস্তিত্ব প্রমাণ করা অযৌক্তিক; বরং এর পেছনে অবশ্যই বাস্তব প্রমাণ থাকতে হবে!’ তার ছাত্রদের তিনি এও বলতেন যে, ‘মাক্কি আয়াতসমূহের চেয়ে মাদানি আয়াতসমূহ অধিক পরিপক্ব!’ এমনভাবে কুরআন সম্পর্কে মন্তব্য করতেন, যেন তার কাছে ইলমের বিশাল এক সঞ্চয় আছে!
سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يَصِفُونَ
‘তিনি পবিত্র, মহিমান্বিত! এবং তারা যা বলে তিনি তার ঊর্ধ্বে।’৪
তিনি সাহাবিদের নিয়ে বই লিখেছেন। বিশেষ করে, ফিতনার সময়কার সাহাবিদের জীবন নিয়ে প্রচুর লেখালেখি করেছেন। এতে যতটুকু পেরেছেন কোনোরূপ লজ্জা ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই সাহাবিদের চরিত্রে কালিমা লেপনের অপচেষ্টা চালিয়েছেন। এসব ‘সাহসী’ পদক্ষেপের পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি। হয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী! এ সুযোগে কোটি কোটি ছাত্রের মাঝে তার ভয়ংকর দৃষ্টিভঙ্গি ঢুকিয়ে দিতে সফল হয়েছেন। এভাবেই অনেক ‘আজহারি শাইখ’ সেক্যুলারিজমের ভাষ্যকারে পরিণত হয়েছেন—মুসলিম উম্মাহর মনে হতাশা ও নৈরাশ্য সৃষ্টির কাজ সুনিপুণভাবে আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন তারা। ‘আজহারি’ নাম ধারণ করলেও তাদের চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গির সাথে আজহারের চিন্তার রয়েছে সুবিশাল তফাত।
টিকাঃ
৩. সুরা আল-কাহফ, ১৮:৫।
৪. সুরা আল-আনআম, ৬: ১০০।
📄 উপনিবেশবাদী গোষ্ঠী (Colonist)
মুসলিমদের মনে হতাশা সৃষ্টি করা ভয়াবহ এ চক্রান্তে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে উপনিবেশবাদীরা—যারা কয়েক দশক ধরে মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে ও বিশ্বাসে আঘাতের পর আঘাত করে গিয়েছে। বিভিন্ন রঙের, বিভিন্ন ঢঙের জুলুম-অত্যাচারের অনুশীলন করেছে মিশর, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, লেবানন, লিবিয়া, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, মরক্কো, ইয়ামেন, সুদান, ইরাক, কুয়েতসহ সকল মুসলিম রাষ্ট্রের ওপর।
📄 কতিপয় মুসলিম শাসক
এ ষড়যন্ত্রে আরও যাদের হাত আছে, তাদের মধ্যে কতিপয় মুসলিম শাসক অন্যতম—যারা তাদের জাতিদের বুঝিয়েছে যে, বর্তমান বিশ্বের পরাশক্তিদের সাথে কিছুতেই পেরে ওঠা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই তাদের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে নিজেদের আত্মাহুতি দেওয়ার কোনো মানে হয় না। তার চেয়ে বরং তারা যে পথে চলে পার্থিব উন্নতি সাধন করছে, আমাদেরও সে পথে চলা উচিত। কারণ, তারা আমাদের চেয়ে কয়েক বছর নয়, কয়েক শতাব্দী এগিয়ে গেছে!