📄 সাপের মুখে লোহার লাগাম
মন্দ চরিত্রের এক ধোপার গল্প।
এক ধোপা-সে সকল মন্দগুণের আকর ছিল। একবার একদল লোক এসে হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করল, 'হযরত! এই ধোপার স্বভাব অসামান্য খারাপ। মানুষের কাপড় বদলে ফেলে। ধোকা দেয়। আপনি তার জন্য বদ দু'আ করে দিন যেন তার মৃত্যু হয় আর আমরাও তার অনিষ্ট থেকে মুক্তি পাই।'
হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর দরবারে বদ্ দু'আ করলেন, 'হে আল্লাহ্! তুমি তার থেকে তোমার দায়িত্ব তুলে নাও। অর্থাৎ তাকে তোমার রহমত ও অভিভাবকত্ব থেকে আলাদা করে দাও!'
এই দু'আ করার পর তিনি সকলকেই জানিয়ে দিলেন যে, 'এর বয়স শুধু আজকের দিন বাকি। সে আর বাঁচতে পারবে না। তার জীবন লীলা আজই সাঙ্গ হয়ে যাবে।'
তারা তো শুনে আশ্বস্ত এবং ধরেই নিয়েছে ধোপা এবার শেষ।
এদিকে ধোপা তার দৈনন্দিন কর্মসূচি মোতাবেক দিবসের খাবার তিনটি রুটি নিয়ে ঘাটের দিকে যাচ্ছিল। পথে এক ভিক্ষুক এসে হাত পাতল। বলল, 'আমি খুবই ক্ষুধার্ত আমাকে একটি রুটি দান করুন।'
ধোপা তার তিনটি রুটি থেকে একটি রুটি ভিক্ষুককে দিয়ে দিল। ভিক্ষুক একটি রুটি হাতে পেয়ে দু'আ করল- 'আল্লাহ্ পাক তোমার অতীত দিনের সকল পাপ মাফ করে দিন এবং তোমার অন্তরকে পবিত্র করে দিন।'
ধোপার কাছে ভিক্ষুকের দু'আ খুবই ভালো লাগল। সে দ্বিতীয় রুটিটিও তাকে দান করে দিল। এবার ভিক্ষুক এই বলে দু'আ করল- 'আল্লাহ্ তোমার আগ-পর সকল গুনাহ্ মাফ করে দিন।' এ কথা শুনে ধোপা তাকে তৃতীয় রুটিটিও দান করে দিল। তখন ভিক্ষুক দু'আ করল-
'আল্লাহ্ তা'আলা তোমাকে সকল প্রকার আসমানি বিপদ থেকে রক্ষা করুন এবং তোমার জন্য বেহেশতে একটি মহল তৈরি করে দিন।'
এদিকে সকলেই অপেক্ষমান ধোপার অবস্থা দেখার জন্য। বিকালে সবাই বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করল, ধোপা তার বস্ত্রসামগ্রীসহ ঘাট থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ ও নিরাপদ অবস্থায় ফিরে আসছে। এ অবস্থা দেখে সকলেই ছুটে এলো হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের এর খেদমতে। এসে আরয করল, 'হে আল্লাহ্ নবী! ধোপারতো কিছুই হলো না। আপনার অঙ্গীকার পূর্ণ হলো না।'
হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম বললেন, 'তাকে আমার কাছে ডেকে আন। তার অবস্থা আমি দেখি।'
আদেশ মতো ধোপাকে ডেকে আনা হলো। হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আজ তুমি কী কাজ করেছ? কী নেক আমল করেছ শুনি।'
ধোপা বলল, 'হে আল্লাহ্ নবী! পথে একজন ক্ষুধার্ত ভিক্ষুক পেয়েছিলাম, সে আমার কাছে কিছু চাইলে আমার কাছে তিনটি রুটি ছিল তিনটি রুটিই আমি তাকে দিয়ে দিয়েছি। সে আমার প্রতিটি রুটির বিনিময়ে একটি করে সুন্দর দু'আ করেছে।'
হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম বললেন, ঠিক আছে, তোমার কাপড়ের গাট্টি খোল!'
ধোপা তার কাপড়ের গাট্টি খুলল, তখন সকলে অবাক হয়ে দেখল, তার মধ্যে একটি কৃষ্ণবর্ণ বিষাক্ত সাপ। তার মুখে লোহার লাগাম আঁটা।
হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম সাপকে ডাকলেন, 'আস্তয়াদ!'
সাপ বলল, 'লাব্বাইক ইয়া রুহুল্লাহ্! আমি উপস্থিত হে আল্লাহর প্রিয়নবী!' হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম শোধালেন, 'আল্লাহ্ তা'আলা কি তোকে এই ধোপাকে ধ্বংস করার জন্য পাঠাননি?'
সাপ বলল, 'হ্যাঁ, আল্লাহ্ তা'আলা তো এই আদেশই দিয়েছেন। আমাকে বলা হয়েছিল, "অমুক নামের এক ধোপা অমুক ঝর্নায় কাপড় ধোয়ার জন্য গিয়েছে। তাকে গিয়ে দংশন কর।" আমি এই উদ্দেশ্যেই তার গাঁটুরিতে আশ্রয় নিয়েছিলাম সুযোগের অপেক্ষায়। কিন্তু সে যখন- সক্কা দিয়েছে, ক্ষুধার্ত ভিক্ষুককে হালাল খাবার দান করেছে-তখন ভিক্ষুক তার জন্য দু'আ করেছে। আল্লাহ্ তা'আলা তার দু'আ কবুল করেছেন। একজন ফিরিশতা আসমান থেকে নেমে এসেছেন। তার হাতে একটি লোহার লাগাম ছিল। তিনি আমার মুখে ওটা পড়িয়ে দিয়েছেন। ফলে আমি আমার দায়িত্ব পালন করতে অপারগ হয়ে গেছি।'
সাপের বিবরণ শুনে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম বললেন, 'হে ধোপা! তুমি এখন নতুন করে আমল করা শুরু করো। আল্লাহ্ তা'আলা তোমার দানের বরকতে তোমার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। তোমার হায়াতেও বরকত দান করেছেন।
আল্লাহ্ পথে যদি শুকনো রুটিও দাও বিষাক্ত সাপের দশংন থেকে বেঁচে যাবে।
শিক্ষা: পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, দানে বিপদ দূর হয়। এই ঘটনা থেকে আমাদের ঈমান ও বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করতে পারি এবং বেশি বেশি আল্লাহর রাস্তায় দান করার অভ্যাস তৈরি করতে পারি। এতে আমাদের যেমন বিপদ দূর হবে তেমনি আমরা জান্নাতেরও অধিকারী হতে পারব। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমীন।
📄 যদি জান্নাতী হতে চাও
জান্নাত আমাদের সকল মুমিনের কামনা-বাসনার প্রধান কেন্দ্র। পৃথিবীতে কে এমন আছে, যে জান্নাতে যেতে চায় না? পরকালীন জান্নাতী জীবন কামনা করে না? কিন্তু সে জান্নাত পাওয়ার জন্য প্রয়োজন শিরকমুক্ত ঈমান ও শিরকমুক্ত ইবাদত।
# হযরত মুআয বিন জাবাল রাদি. বলেন, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'হে মুআয! তুমি কি জানো, বান্দাগণের উপর আল্লাহ তা'আলার কি হক? আর আল্লাহ তা'আলার উপর বান্দাগণের কি হক?'
আমি বললাম, আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রসূলই ভালো জানেন।
তিনি বললেন, 'বান্দাগণের উপর আল্লাহ তা'আলার হক হলো, তারা তাঁর ইবাদত করবে ও তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না। আর আল্লাহ তা'আলার উপর বান্দাগণের হক হলো, তিনি বান্দাগণকে শাস্তি দেবেন না।' (অর্থাৎ বিনা আযাবে তাদেরকে জান্নাত দান করবেন।) (সহিহ মুসলিম, হাদীস-১৫৪)
# হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহ রাদি, বলেন, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার সাথে এমন অবস্থায় মিলিত হবে যে, তাঁর সাথে কাউকে শরিক করেনি তাহলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।'
'আর যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার সাথে এমন অবস্থায় মিলিত হবে যে, সে তাঁর সাথে কাউকে শরিক করেছে, তাহলে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।' (সহিহ মুসলিম, হাদীস-২৮০।
হযরত উসমান রাদি. বলেন, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যে ব্যক্তির এমন অবস্থায় মৃত্যু আসে যে, সে নিশ্চিতভাবে জানে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, তাহলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।' (সহিহ মুসলিম, হাদীস-১৪৫)
তাই বলব, যদি জান্নাতী হতে চাও, শিরকমুক্ত ঈমান বানাও।
📄 জান্নাত যাদের ডাকছে
হযরত আবু হুরায়রা রাদি. থেকে বর্ণিত আছে, রসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
১। যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় (যে কোনো বস্তুর) দুই জোড়া খরচ করবে, তাকে জান্নাতের সকল দরজা দিয়ে ডাকা হবে। তাকে ডেকে বলবে, হে আল্লাহর বান্দা, এই দরজা তোমার জন্য উত্তম।
২। নামাযীকে নামাযের দরজা আহ্বান করবে। তাকে ডেকে বলবে, হে আল্লাহর বান্দা, এই দরজা তোমার জন্য উত্তম।
৩। যে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে, তাকে জিহাদের দরজা আহ্বান করবে। তাকে ডেকে বলবে, হে আল্লাহর বান্দা, এই দরজা তোমার জন্য উত্তম।
৪। রোযাদারকে রোযার জন্য নির্ধারিত বিশেষ দরজা অর্থাৎ রাইয়্যান দরজা আহ্বান করবে। তাকে ডেকে বলবে, হে আল্লাহর বান্দা, এই দরজা তোমার জন্য উত্তম।
৫। যে দান-খয়রাত করবে, তাকে দানের দরজা আহ্বান করবে। তাকে ডেকে বলবে, হে আল্লাহর বান্দা, এই দরজা তোমার জন্য উত্তম।
হযরত আবু বকর রাদি. বলেন, 'হে আল্লাহর রসূল, আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান হোক! নিশ্চয় এমন কোনো ব্যক্তিও হবে, যাকে সকল দরজা থেকে জান্নাতে প্রবেশের জন্য আহ্বান জানানো হবে?'
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'হ্যাঁ, অবশ্যই। আর আমি আশা করি, সেই ব্যক্তি তুমিই হবে।' [সহীহ বুখারী, হাদীস নং-১৮৯৭]
এমনগুণ অর্জন করলে আমরাও কিন্তু এই সুসংবাদের অধীকারী হতে পারি। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমীন।