📄 নির্জান জঙ্গলে
আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে সামান্য রুটি সদকা করার পুরস্কারের বিস্ময়কর গল্প।
বনি ইসরাঈলের এক নারী নিজ শিশুপুত্রকে কোলে নিয়ে জঙ্গল পাড়ি দিচ্ছিল। হঠাৎ একটি নেকড়ে এসে তার উপর আক্রমণ করল। মহিলাটি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে এক পাশে সরে গেল এবং সে এমনভাবে কেঁপে উঠল যে, তার কোল থেকে শিশুটি মাটিতে পড়ে গেল। নেকড়েটি তখন তার শিশুকে মুখে নিয়ে নিল এবং দৌড়ে জঙ্গলের ভেতর চলে যেতে উদ্যত হলো। এই দৃশ্য দেখে মহিলাটির হৃদয় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাওয়ার অবস্থা হলো সে তখন চিৎকার জুড়ে দিল। তার আহাজারিতে পুরো জঙ্গল যেন কেঁপে উঠল। এমন সময় হঠাৎ বৃক্ষের আড়াল থেকে এক সুঠাম যুবক নেকড়ের সামনে এসে দাঁড়াল। হঠাৎ কোনো লোক সামনে চলে আসায় নেকড়েটিও ঘাবড়ে গেল ফলে তার মুখ থেকে শিশুটি পড়ে গেল। সুঠাম দেহের বিরাট আকারের এক যুবককে দেখে নেকড়েটি যেন খুব ভয়-ই পেয়ে গেল এবং বাচ্চাটি রেখেই সে জঙ্গলে পালিয়ে গেল।
যুবক বাচ্চাটাকে উঠিয়ে মায়ের কোলে তুলে দিল।
মা তখন জিজ্ঞেস করল, 'কে তুমি, বাবা? এই নির্জন অরণ্যে আমাকে এভাবে আচানক সাহায্য করতে এলে?'
যুবক বলল, 'আমি একজন ফেরেশতা। আল্লাহ তা'আলা আমাকে তোমার সহযোগীতা করার জন্য পাঠিয়েছেন। আর তার কারণ হলো, একদিন তুমি তোমার ঘরে বসে রুটি খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলে এবং রুটি হাতে নিয়ে তা মুখে দিতে উদ্যত হয়েছিলে ঠিক এমন সময় একজন ভিক্ষুক তোমার কাছে আল্লাহর ওয়াস্তে রুটি চাইল। অথচ তোমার কাছে খাওয়ার জন্য ওই একটি রুটিই ছিল কিন্তু তুমি চিন্তা করলে, 'আল্লাহর নামের প্রার্থীকে আমি কিভাবে ফিরিয়ে দেব?'
সুতরাং তুমি ওই রুটিটি নিজে না খেয়ে ভিক্ষুককে দিয়ে দিয়েছিলে। ওই দানের বরকতে আল্লাহ তা'আলা আজ তোমার সাহায্যের জন্য আমাকে পাঠিয়েছেন।' সুবহানাল্লাহ!
শিক্ষা:
দান-সদকা একটা মহৎ আমল। এর বিনিময় দুনিয়াতেও পাওয়া যায় আবার পরকালেও পাওয়া যায়।
১। তাই প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তোমরা দানের ব্যাপারে তাড়াতাড়ি করবে। কেননা, বিপদাপদ দানকে অতিক্রম করতে পারে না।' (অর্থাৎ দান বিপদাপদকে দূর করে দেয়।) (মেশকাতুল মাসাবীহ-১৬৭ পৃঃ)
২। হযরত আবু হুরায়রা রাদি. বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: দাতা ব্যক্তি আল্লাহরও নিকটে, জান্নাতেরও নিকটে, মানুষেরও নিকটে অথচ জাহান্নাম থেকে দূরে এবং কৃপণ ব্যক্তি আল্লাহ থেকেও দূরে, জান্নাত থেকেও দূরে, মানুষ থেকেও দূরে অথচ জাহান্নামের নিকটে। নিশ্চয় মূর্খ দাতা কৃপণ সাধক অপেক্ষা আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়। [তিরমিযী: মেশকাত হাদীস-১৭৭৫]
৩। হযরত আবু হুরায়রা রাদি. বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: দানশীলতা জান্নাতের একটি বৃক্ষস্বরূপ। যে ব্যক্তি দানশীল সে যেন তার একটি শাখা ধরেছে আর শাখা তাকে ছাড়বে না, যে পর্যন্ত না তাকে জান্নাতে পৌঁছে দেয়। আর কৃপণতা হচ্ছে দোযখের একটি বৃক্ষ। যে ব্যক্তি কৃপণ সে যেন তার একটি শাখা ধরেছে আর শাখা তাকে ছাড়বে না, যে পর্যন্ত না তাকে দোযখে পৌছে দেয়। [বায়হাকী শোআবুল ঈমান: মেশকাত হাদীস-১৭৯২]
৪। হযরত আবু হুরায়রা রাদি. বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: যে ব্যক্তি কোনো জিনিসের এক জোড়া আল্লাহর রাস্তায় দান করবে, তাকে (কিয়ামতের দিন) জান্নাতের সকল দরজা থেকে আহ্বান করা হবে অথচ জান্নাতের দরজা রয়েছে অনেক। [কিয়দাংশ বুখারী, মুসলিম: মেশকাত হাদীস-১৭৯৬]
📄 পরের কল্যাণে
প্রত্যেক মুসলিম যেন পরের কল্যাণে দান করে নিজ ধন আনন্দিত প্রাণে। দানের সামর্থ্য যদি না-ই থাকে তার, আয় করে করবে সে নিজ উপকার; বাকিটা করবে দান প্রার্থীদের মাঝে, এভাবে সে-ধন যেন লাগে হীত-কাজে। এমন সামর্থ্য যদি সে ব্যক্তি না রাখে- নিজ খরচের পর কিছুই না থাকে; তাহলে অভাবী আর নিপীড়িত জনে, সহায়তা করবে সে হৃষ্ট-ফুল্ল মনে। তা-ও যদি করতে সে না হয় সক্ষম, করবে না কারো ক্ষতি-সেটাই উত্তম; তার জন্য তা-ই হবে সাদকার সমান- সূক্ষ্ণ বিচারক আল্লাহ বড় দয়াবান! ইনসাফ কায়েম করা দু'জনের মাঝে, সত্যকথা বলা-যাতে পুরস্কার আছে; বিষাক্ত কন্টক আর পাথরের কণা, রাস্তা থেকে দূর করা ময়লা-আবর্জনা; প্রশ্নের জবাব দেওয়া বিনম্র শদ্ধায়, অথবা মদদ করা সামান তোলায়- এ-সকলই গণ্য হয় আমলে সাদকায়। [একাধিক হাদীস অবলম্বনে : কবি ফররুখ আহমদ]
📄 বাগানের ভেতর কুকুর
কুকুরের প্রতি দয়ার একটি অসাধারণ গল্প।
হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে জাফর রাদি. একবার একটি ময়দান দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। পথে একটি বাগান পড়ল। একজন হাবশী গোলাম সে বাগানে কাজ করছিল। তার জন্য রুটি আনা হলো এবং তার সঙ্গে একটি কুকুরও বাগানে চলে এলো। কুকুরটি ওই গোলামের নিকট এসে দাঁড়াল। গোলাম কাজ করতে করতে একটি রুটি ওই কুকুরের সামনে ফেলে দিল। কুকুর
রুটিটি খেয়ে দাঁড়িয়ে রইল। গোলাম দ্বিতীয় এবং পরবর্তীতে তৃতীয় রুটিটিও কুকুরের সামনে ফেলে দিল। সর্বমোট তিনটি রুটি ছিল আর তিনটি রুটিই কুকুরকে খেতে দিয়ে দিল।
হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে জাফর রাদি, দাঁড়িয়ে গভীর দৃষ্টিতে তা দেখছিলেন। যখন তিনটি রুটিই শেষ হয়ে গেল, তখন হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে জাফর রাদি. গোলামকে জিজ্ঞেস করলেন, 'প্রতিদিন তোমার জন্য কয়টি রুটি আসে?'
সে আরজ করল, 'আপনি তো দেখলেনই; তিনটি রুটি আসে।'
তিনি বললেন, 'তবে তিনটি রুটিই কেন কুকুরকে দিয়ে দিলে?'
গোলাম বলল, 'জনাব! এখানে কোনো কুকুর নেই। এই অসহায় ক্ষুধার্ত কুকুরটি কোথাও দূর হতে অনেক পথ অতিক্রম করে হয়তো এসেছে। এজন্য আমার ভালো লাগল না যে, তাকে খালি ফিরিয়ে দেই।'
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাফর রাদি. এবার গোলামকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তাহলে আজ তুমি কী খাবে?'
গোলাম বলল, 'একদিন না খেয়ে থাকব, এটা তো তেমন বড় কোনো ব্যাপার নয়।'
হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে জাফর রাদি. মনে মনে চিন্তা করলেন, লোকেরা আমাকে তিরস্কার করে যে, 'তুমি অনেক বেশি দান কর।" অথচ এই গোলাম তো আমার চেয়েও অনেক বেশি দানশীল। এই চিন্তা করে তিনি শহরে ফিরে গেলেন এবং ওই বাগান, গোলাম এবং যে সমস্ত সাজ-সরঞ্জাম বাগানে ছিল সম্পূর্ণকিছু মালিকের নিকট হতে ক্রয় করলেন। সবকিছু ক্রয় করে গোলামকে আজাদ করে দিলেন আর বাগানটি ওই গোলামকে দান করে দিলেন। সুবহানাল্লাহ!
শিক্ষা:
বন্ধুরা! লক্ষ্য করুন, সাধারণ একজন গোলাম হয়েও মানুষ যে প্রাণীটিকে (কুকুরকে) নিকৃষ্ট মনে করে, তার প্রতি সে কতটা দয়ার্দ্র? তিনটি রুটিই নিজে না খেয়ে কুকুরকে দিয়ে দিলেন। অথচ আজ আমাদের চারপাশে কত দরিদ্র এতিম শিশু আমাদের খাদ্যের দিকে চেয়ে থাকে আমরা কি তাদের প্রতি এতটা দয়ার্দ্র হতে পেরেছি?
তাদের অসহায় অবস্থা দেখে কি আমাদের হৃদয় আত্মা সামান্যও কেঁপেছে?"
আমাদের এসব ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত এবং অসহায় এতিমদের প্রতি লক্ষ্য রাখা আমাদের মানবিক ও ইমানি দায়িত্ব।
আর হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে জাফর রাদি.-এর ওই বাগান ক্রয় করা, গোলাম আজাদ করা এবং বাগান দান করে দেওয়া কত বড় দানশীল ব্যক্তির পরিচয়-এর প্রতি দৃষ্টি দিলেও আজ আমরা তাদের তুলনায় অনেক অনেক কৃপণ,।
📄 তারপরও লজ্জাবোধ
বড় মনের মানুষের গল্প।
হযরত ইমাম হাসান রাদি.-এর দরবারে এক ব্যক্তি উপস্থিত হয়ে নিজের প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে কিছু সাহায্য চাইল।
তিনি বললেন, 'তোমার চাওয়ার কারণে আমার উপর যে হক কায়েম হয়ে গেছে তা আমার দৃষ্টিতে অনেক উঁচু। আর তোমাকে আমার যেরূপ সাহায্য করা উচিত তার পরিমাণ আমার দৃষ্টিতে অনেক বেশি। কিন্তু আমার আর্থিক অবস্থা ওই পরিমাণ দান করতে অক্ষম, যা তোমার মর্যাদা উপযোগী হতে পারে। আর আল্লাহ্র রাস্তায় মানুষ যত বেশি হতে বেশি খরচ করে, তা কমই। কিন্তু আমি কি করব, আমার নিকট এত পরিমাণ নেই যা দ্বারা তোমার সওয়ালের শুকরিয়া আদায় হতে পারে। যদি তুমি এর জন্য প্রস্তুত থাক যে, এই মুহূর্তে যা-ই আমার নিকট বিদ্যমান আছে, তা-ই তুমি খুশি মনে কবুল করে নেবে এবং আমাকে এর উপর বাধ্য করবে না যে, আমি ওই পরিমাণ কোথাও হতে সংগ্রহ করি; যা তোমার মর্যাদা উপযোগী হয়, এবং যা তোমার হক হিসাবে আমার উপর ওয়াজিব হয়ে গেছে; তা পূরণ করতে পারি, তাহলে আমি আনন্দের সাথে এখন যা আছে তা সাহায্য করতে রাজি আছি।'
সওয়ালকারী বলল, 'হে আল্লাহ্ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বেটা! আপনি আমাকে যা কিছু দেবেন আমি তা-ই কবুল করে নেব, তার উপর শোকর আদায় করব এবং তা হতে বেশি করতে না পারার কারণে আপনাকে অক্ষম মনে করব।'
একথা শুনে হযরত হাসান রাদি. নিজের খাদেমকে বললেন, 'সেই তিন লক্ষ দেরহামের মধ্যে হতে যা কিছু অবশিষ্ট আছে তা নিয়ে আস।'
সে পঞ্চাশ হাজার দেরহাম নিয়ে এলো, বাকি সব খরচ হয়ে গিয়েছিল। হযরত হাসান রাদি. বললেন, 'পাঁচশত দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) আরও তো কোথাও ছিল।'
খাদেম আরজ করল, 'তা-ও বিদ্যমান আছে।' তিনি বললেন, 'সেগুলোও নিয়ে আস!' যখন এসব আনা হলো তখন সেই সওয়ালকারীকে বললেন, 'কোনো কুলি- মজদুর নিয়ে আস। যে এইগুলিকে তোমার ঘরে পৌঁছে দেবে।' সে দুইজন মজদুর নিয়ে এলো।
হযরত হাসান রাদি. সবকিছু তাদের হাওয়ালা করে দিলেন এবং নিজের শরীরের চাদর খুলে দিয়ে বললেন, এই মজদুরদের তোমার ঘর পর্যন্ত পৌঁছে দেবার পারিশ্রমিকও আমারই দায়িত্ব। সুতরাং এই চাদর বিক্রি করে তাদের পারিশ্রমিক দিয়ে দেবে।
হযরত হাসান রাদি.-এর খাদেমগণ আরজ করল, 'আমাদের নিকট তো এখন খাওয়ার জন্য একটি দেরহামও বাকি নেই। আপনি সবকিছুই দিয়ে দিলেন।'
হযরত হাসান রাদি, বললেন, 'আল্লাহ্ তা'আলার মহান সত্তার নিকট আমি দৃঢ় আশা রাখি যে, তিনি নিজ দয়া ও রহমতে আমাকে এর অনেক সওয়াব দেবেন।' [এহইয়া]
সবকিছু দিয়ে দেওয়ার পর যখন নিজের কাছে কিছুই বাকি রইল না এবং পরিমাণও অত্যন্ত বেশি ছিল এতদসত্ত্বেও এই ব্যাপারে পেরেশানি ও লজ্জা ছিল যে, সওয়ালকারীর হক আদায় হয়নি। [ফাযায়েলে ছাদাকাত-২]
শিক্ষা: সুবহানাল্লাহ্! কেমন ছিল এই মহান ব্যক্তিদের মন, হৃদয়। সামান্য কিছু চাওয়ার বদলে ৫০ হাজার দিরহাম পাঁচশত স্বর্ণমুদ্রা সহসা দান করে দিলেন। আর আজ আমাদের নিকট ভিক্ষুক দশটি টাকা চেয়ে আধাঘণ্টা বা তার কম সময় দাঁড়িয়ে থাকে, অনেকে পেছনে পেছনে ঘুরে, পায়ে ধরে, কিন্তু আমরা কি তাদের হক আদায় করি? হক আদায় করতে না পারলে কি লজ্জিত হই?
হে আল্লাহ্! আমাদেরকে সঠিক জ্ঞান দান করুন। দান করার মনোবল তৈরি করে দিন। আমাদের দরিদ্রতা দূর করে দিন। আর্থিক সংকট দূর করে দিন। আমীন।