📄 অমূল্য উপদেশ
হযরত হাসসান ইবনে আতিয়্যাহ রহ. বলেন, হযরত আবু দারদা রা. লোকদের উপদেশ দিতে গিয়ে বলতেন:
• তোমরা ততক্ষণ কল্যাণের উপর থাকবে, যতক্ষণ তোমাদের ভালো লোকদের মহব্বত করবে এবং হক কথা বলা হলে তোমরা তা বুঝতে সক্ষম হবে। কারণ, যে হক কথাকে বুঝে, সে তার উপর আমলকারীর সমতুল্য গণ্য হয়।
• তোমরা লোকদের উপর এমন কাজের দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ো না, যার দায়িত্ব (আল্লাহর পক্ষ থেকে) তাদের উপর চাপানো হয়নি।
• যে কাজের উপর তাদের রব হিসাব গ্রহণ করবেন না, তোমরা তাদের কাছ থেকে এমন কাজের উপর হিসাব গ্রহণ করো-এটা উচিত নয়।
• হে আদম সন্তান, তুমি নিজের ব্যাপারে চিন্তা করো। কেননা, যে ব্যক্তি লোকদের মধ্যে পরিলক্ষিত দোষ তালাশে লাগবে, তার দুঃখ দীর্ঘ হবে এবং তার রাগ কখনও ঠাণ্ডা হবার নয়।
• আল্লাহর ইবাদত এমনভাবে করো, যেন তুমি তাকে দেখছ।
• নিজেদের মৃত লোকদের মধ্যে গণ্য করো।
• জেনে রেখো, অল্প সম্পদ যা তোমাদের প্রয়োজনপূরণে যথেষ্ট হয়, তা এমন অধিক সম্পদ থেকে উত্তম, যা তোমাদের আল্লাহ থেকে গাফেল করে দেয়।
• এও জেনে রেখো, নেকী কখনও পুরোনো হবে না এবং গুনাহ কখনও ভুলে যাওয়া হবে না। ৫
টিকাঃ
৫. আবু নুআইম ফিল হুলইয়া, ১/২১০, ২১১, ২১২, ২১৫, ২১৬, ২১৭, ২১৮, ২২০, ২২৩, ২২৪; বায়হাকী, শুআবুল ঈমান; কান্য, ৮/২২৪; ইবনে কাসীর, ৩/৩৪১।
📄 একটি ইচ্ছার গল্প
সামান্য অছিলায় আল্লাহর পক্ষ থেকে বিরাট পুরস্কার দানের গল্প।
আল্লাহ পাক বড় দয়ালু। তিনি সামান্যতে অনেক দান করেন। বান্দা ছোট থেকে ছোট কোনো নেকীর কাজের ইচ্ছা করলেও তিনি বান্দাকে নেকী দিয়ে দেন। কাজ না করেও শুধু কাজ করার ইচ্ছা করার দ্বারা পৃথিবীতে কেউ কোনোদিন কাউকে কোনো মুজুরী দেবে না কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দয়া অফুরন্ত তাই তিনি নেকী দিতে কৃপণতা করেন না। নিম্নের হাদীসটি পড়ুন আর চিন্তা করুন। মহান আল্লাহ কত মহান এবং কত উদার।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদি. বর্ণনা করেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা নেকী ও গুনাহ সম্পর্কে একটি সিদ্ধান্ত ফেরেশতাদের লিখে দিয়েছেন। অতঃপর এর স্বরূপ বর্ণনা করে বলেছেন:
* যে ব্যক্তি নেক কাজের ইচ্ছা করল, অতঃপর কোনো কারণে কাজটি করতে পারল না, তার জন্য আল্লাহ তা'আলা পূর্ণ একটি নেকী লিখে দেন।
* আর যদি নিয়ত করার পর ওই কাজটি সম্পন্ন করে, তাহলে তার জন্য দশ থেকে সাতশ পর্যন্ত, বরং তা থেকেও কয়েক গুণ বেশি নেকী লিখে দেন।
* আর যে ব্যক্তি কোনো গুনাহের ইচ্ছা করল অতঃপর তা থেকে বিরত হয়ে গেল, তার জন্যও আল্লাহ তা'আলা একটি পূর্ণ নেকী লিখে দেন (কেননা, তার গুনাহ্ থেকে বিরত হওয়া আল্লাহ তা'আলার ভয়ের কারণে হয়েছে)।
* আর যদি ইচ্ছা করার পর সেই গুনাহ সম্পন্ন করে ফেলে, তাহলে আল্লাহ তা'আলা তার জন্য (মাত্র) একটি গুনাহ-ই লেখেন। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৬৪৯১]
📄 নেকী বিক্রয়
পৃথিবী থেকে জান্নাতের প্রাসাদ দেখার গল্প।
এক শহরের কাজী ছিলেন বড় সম্পদশালী। মোহররম মাসের দশ তারিখে কাজী সাহেবের ঘরের দরজায় এক ভিক্ষুক এসে বলল, 'আল্লাহ্ পাক আপনার ইজ্জত সম্মানে বরকত দান করুন; আমি একজন গরিব মানুষ, বাল বাচ্চা নিয়ে বড় কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। আজ আশুরার দিনের উসিলায় আপনার নিকট কিছু সাহায্য চাচ্ছি। আমাকে দশ সের রুটি, পাঁচ সের গোস্ত এবং দুইটি দেরহাম দান করুন।'
কাজী সাহেব তাকে যোহরের সময় আসতে বললেন, সে যোহরের সময় এলে তাকে আবার আসরের সময় আসতে বলা হলো।
ফকির আবার আসরের সময় এলো। কিন্তু এইবারও তাকে কিছুই দেওয়া হলো না। কাজী সাহেবের এই আচরণে ফকির মনে বড় কষ্ট পেল। সে মনে মনে বলল, 'প্রথমবারেই নিষেধ করলে আমাকে বার বার কষ্ট করতে হতো না।' অতঃপর সে দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সাহায্যের আশায় পথে পথে ঘুরতে লাগল। কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরির পর সে এক খ্রিষ্টানের সাক্ষাত পেল এবং তাকে বলল, 'আশুরার দিনের বরকতে আমাকে কিছু সাহায্য কর।'
খ্রিষ্টান আশুরার দিনের বরকত জানতে চাইলে ফকির এই বিষয়ে কিছু বয়ান করল। ফকিরের বয়ান শুনে খ্রিষ্টান লোকটি খুব প্রভাবান্বিত হলো। সে বলল, 'তুমি বড় মূল্যবান দিবসের অছিলা দিয়েছ। এখন বল, তোমার কী প্রয়োজন?'
ফকির রুটি, গোস্ত ও দেরহামের আবেদন করল।
খ্রিষ্টান লোকটি তাকে দশ ধামা আটা, একশত মন গোশত এবং বিশটি দেরহাম দান করে বলল, 'তুমি যত দিন জীবিত থাকবে তোমার পরিবারের জন্য প্রতি আশুরায় এই বরাদ্দ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হলো।'
এদিকে ওই কাজী সাহেব রাতে স্বপ্নে দেখলেন, কে যেন তাকে বলল, 'উপরের দিকে তাকাও।' তিনি উপরের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, একটি বিরাট সুন্দর মহল। মহলটির একটি ইট স্বর্ণের এবং একটি ইট রূপার। তার পাশেই লাল ইয়াকুত দ্বারা নির্মিত অপর মহলটি এত সুন্দর ও ঝকঝকে যে, বাহির হতে তার ভেতরের সকল বস্তু দেখা যায় এবং ভেতর হতেও বাহিরের সকল কিছু দেখা যায়।
কাজী সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, 'হে পরওয়ারদেগার! এত সুন্দর মহল তুমি কার জন্য নির্মাণ করেছ?'
বলা হলো-
"তুমি যদি ফকিরের প্রার্থনা পূরণ করতে তাহলে এই মহল তোমাকেই দান করা হতো। কিন্তু তুমি ফকিরকে বিমুখ করে ফিরিয়ে দিয়েছ। এখন এই মহল অমুক খ্রিষ্টানকে দান করা হবে।"
ঘুম হতে জাগ্রত হয়ে কাজী সাহেব বড় পেরেশান হলেন। ঘুরে ঘুরে সেই খ্রিষ্টানের বাড়ি সন্ধান করে তার বাড়ি গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি গতকাল পুণ্যের কী কাজ করেছিলে?'
খ্রিষ্টান বলল, 'তুমি আমাকে এই কথা জিজ্ঞেস করছ কেন?'
জবাবে কাজী সাহেব গতরাতের দেখা সেই স্বপ্নটি খুলে বললেন। অতঃপর তিনি প্রস্তাব দিলেন, এক লক্ষ দেরহামের বিনিময়ে তোমার সেই নেকী আমার নিকট বিক্রয় কর।
খ্রিষ্টান শান্ত কণ্ঠে জবাব দিল- 'এক লক্ষ কেন, যদি গোটা পৃথিবীর শূন্যস্থান দেরহাম দ্বারা পূর্ণ করে আমাকে তার মালিক বানিয়ে দেওয়া হয় তবুও আমি সেই নেকী বিক্রয় করব না। যে আল্লাহ্ এত বড় দয়ালু, সামান্য আমলের বিনিময়ে তিনি এত বেশি দান করেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ এক এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রসূল। আর ইসলাম আল্লাহ্ পাকের মনোনিত একমাত্র দ্বীন।'
এই বলে সেই খ্রিষ্টান সাথে সাথে মুসলমান হয়ে গেল। সুবহানাল্লাহ!
শিক্ষা: কোনো মনীষী বলেন,
• ভিক্ষুকের উপর কখনো বিরক্ত হবে না। কেননা, এতেই তোমার সম্মান যে, সর্বদা তোমার নিকট সাহায্য প্রার্থনা হতে থাকবে।
• কোনো ভিক্ষুকের চেহারা মলিন করে ফিরিয়ে দেবে না। যেই দিন তুমি কোনো ভিক্ষুকের চাহিদা পূরণ করবে, সে দিনটিই তোমার জীবনের "শুভ দিন।"
• স্মরণ রেখো! জীবনের সকল কিছু শেষ হয়ে যাওয়ার পরও এমন একটি সংবাদ ও কীর্তি যেন তোমার জন্য অবশিষ্ট থাকে যা তোমাকে খুশি করবে। তোমার চেহারাই তোমার দানশীলতার পরিচয় বহন করবে। আর (ভিক্ষুকের প্রার্থনায়) মুখ মলিন করা কৃপণের আলামত।
📄 শুভ্র দাড়িওয়ালা
মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের রিযিকের বিস্ময়কর ফায়সালার গল্প।
হাকীম আনসারী নামের একজন আল্লাহওয়ালা লোক ছিলেন। তিনি নক্শবন্দী তরীকার সাথে সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন সেই সুবাদে দু'আ নেওয়ার জন্য মাঝে মধ্যে তার কাছে যাওয়া হতো। একবার তিনি একটি বিস্ময়কর ঘটনা শোনান।
তিনি বলেন, ঘটনাটি আমি নিজে প্রত্যক্ষ করেছি। ঘটনাটি হলো, আমাদের এই এলাকারই এক লোকের তার স্ত্রীর সাথে মনোমালিন্য হয়ে গেল। পরস্পর ঝগড়া চলছিল আর এমন সময়ই তাদের বাড়িতে মেহমান এসে হাযির। স্বামী তাকে বৈঠকখানায় বসিয়ে স্ত্রীকে এসে বললেন, মেহমান এসেছে, খাবার তৈরি কর।
স্ত্রী গোস্বার হালতে ছিল। রাগে কটমট করে বলল, না তোমার জন্য খাবার রান্না হবে না মেহমানের জন্য।
স্বামী বড় পেরেশان হলেন কিন্তু কিছু না বলে নিরবে মেহমানের কাছে গিয়ে মেহমানের খোঁজখবর করলেন। এই সময় তার মনে খেয়াল এলো যে, স্ত্রী রান্না না করলেও আমদের প্রতিবেশী তো আছে আর তার মনমানসিকতাও অনেক ভালো। তার কাছে যাই না কেন? নিশ্চয় তিনি সহযোগীতা করবেন। সুতরাং তিনি তার প্রতিবেশীর কাছে গেলেন এবং বললেন, আমার স্ত্রী অসুস্থ এর মধ্যে মেহমান এসেছেন আপনি কিছু রুটি তরকারী পাকিয়ে দিন। প্রতিবেশী তার প্রস্তাব সানন্দে গ্রহণ করে নিল। সুতরাং তিনি প্রশান্ত মনে এসে মেহমানের সাথে বসে গল্পে লিপ্ত হলেন।
কিছুক্ষণ পর মেহমান ঠাণ্ডা পানি পান করতে চাইলেন। সে ঠাণ্ডা পানি আনার জন্য ঘরের ভেতরমহলে প্রবেশ করলেন। ভেতরে প্রবেশ করেই দেখলেন, স্ত্রী অঝোরে কাঁদছে। স্বামী বেচারা অবাক হলেন যে, এই বাঘিনীর চোখে আবার পানি!
শুধালেন, কী ব্যাপার? কাঁদছ কেন?
স্বামীর কণ্ঠ শুনে সে তার কান্না আরও বাড়িয়ে দিল। কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল, আমাকে ক্ষমা করে দিন।
স্বামী বুঝে নিলেন, নিশ্চয় কিছু একটা ঘটেছে নতুবা এত সহজে সে ক্ষমা চাওয়ার পাত্রী নয়।
স্বামী বললেন, আগে তো বল কী হয়েছে?
স্ত্রীর একই কথা, আগে বলুন, আপনি আমাকে ক্ষমা করেছেন কি না? তারপর আমি ঘটনা বলব।
স্বামী বেচারা অপরাগ হয়ে বলে দিলেন, ঠিক আছে যাও, যা কিছু হয়েছে আমি ওই সবকিছু মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দিলাম এবং তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম।
এবার স্ত্রী বলল, আপনি এসে যখন মেহমানের জন্য খানা পাকাতে বললেন, আর আমি বলে দিলাম 'না আপনার জন্য খানা রান্না হবে না মেহমানের জন্য।' তখন আপনি চলে গেলেন। কিন্তু পরক্ষণেই আমি চিন্তা করলাম, ঝগড়া তো আপনার আমার মাঝে মেহমানের সাথে তো এর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। সুতরাং তাকে কেন আমাদের কারণে খালি মুখে থাকতে হবে? এই চিন্তা করে আমি উঠে রান্নাঘরে গেলাম। সেখানে প্রবেশ করেই দেখি এক শুভ্র দাড়িওয়ালা আমাদের আটার পাত্র থেকে আটা বের করে নিচ্ছে। আমি এই দৃশ্য দেখে ভয় পেয়ে গেলাম। এমন সময় সে আমাকে অবাক করে দিয়ে বলে উঠল, 'হে গৃহিনী! পেরেশানা হয়ো না, এটা তোমাদের মেহমানের অংশ যা তোমাদের আটার মধ্যে মিলিত ছিল। কিন্তু এখন যেহেতু তা তোমাদের প্রতিবেশীর ঘরে রান্না হচ্ছে তাই তার অংশটুকু এখান থেকে নিয়ে নেওয়া হচ্ছে।' সুবহানাল্লাহ!
শিক্ষা: মনে রাখবেন, মেহমান আসার আগেই আল্লাহ তা'আলা তার রিযিক আপনার ঘরে পৌঁছে দেন।
তাই ঘরে কোনো মেহমান এলে কখনো মেহমানের আপ্যায়ন করতে অস্বীকার করা কিংবা কৃপণতা করা উচিত নয়।