📄 পাথরের পোকা
আল্লাহর কুদরত এবং তাঁর বিস্ময়কর ক্ষমতা প্রকাশের গল্প। আমাদের বোধ ও বিশ্বাসকে শানিত করার গল্প।
রিযিকের মালিক আল্লাহ। তিনি তাঁর মাখলুককে যে কোনো জায়গায় বসিয়ে রিযিক পৌঁছাতে পারেন। এটা তাঁর কুদরত এবং ক্ষমতার আয়ত্বে। নিম্নের গল্পটি আমাদের ঈমানকে তাজা করবে আশা করি।
আমাদের এক বন্ধু ভ্রমণে বের হলেন। সাথে তার স্ত্রী-সন্তানদেরও নিলেন। এক জায়গায় এক পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছে পাহাড়ে চড়লেন। পাহাড়ের উপর এক গোলাকৃতির সুন্দর মসৃণ পাথর দেখে খুবই বিস্মিত ও চমকিত হলেন। হাতে উঠিয়ে দেখেন, তা অত্যন্ত মসৃণ এবং মোলায়েম। রংটাও খুব চমৎকার। কেউ যেন তা নিজ হাতে সযত্নে গড়ে রেখেছে। বাচ্চারা পীড়াপীড়ি করল তা নিয়ে নেওয়ার জন্য। অবশেষে ভ্রমণের স্মৃতি স্বরূপ নিয়ে নিলেন। এবং তা এনে ঘরের শো-কেসে সাজিয়ে রাখলেন।
দুই বছর পরের কথা। আমাদের বন্ধু পাথরটি হাতে নিয়ে পরখ করছিলেন এবং বিস্মিত হচ্ছিলেন যে, পাথরটি দুবছর পূর্বে যেমন ছিল এখনো তেমনই আছে। এতে কোনো ধরনের কোনো পরিবর্তন আসেনি।
না ময়লা হয়েছে।
না পুরাতন ভাব ধরেছে।
তিনি মনে মনে বলতে লাগলেন, 'হে আল্লাহ তুমি কেমন পাথর বানিয়ে রেখেছ! সত্যিই তুমি অসীম ক্ষমতার মালিক।'
তিনি পাথরটি হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছেন আর আল্লাহর কুদরত নিয়ে ভাবছেন। এমন সময় হঠাৎ পাথরটি তার হাত থেকে নিচে পড়ে গেল। ফ্লোরে পড়ার সাথে সাথে পাথরটি ভেঙ্গে গেল এবং কয়েক টুকরা হয়ে গেল। তিনি এতে খুব বিমর্ষ হলেন কিন্তু পরক্ষণেই আবার একটি দৃশ্য দেখে অবাক বিস্ময়ে তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল।
তিনি দেখতে পেলেন, পাথরটির মাঝখানে একটি ছিদ্র মতো ছিল তা থেকে একটি পোকা বের হয়ে হেঁটে যাচ্ছে। যে হয়তো দীর্ঘ দিন যাবত পাথরের ভেতর জীবন কাটাচ্ছিল। সুবহানাল্লাহ!
শিক্ষা:
বলুন তো, বন্ধ পাথরের ভেতর কোন্ সত্ত্বা তাকে রিযিক দিচ্ছিলেন?
একটি বন্ধ পাথর যার চার পাশে কোনো ছিদ্র নেই, ভেতরে প্রবেশের কোনো রাস্তা নেই কিন্তু মাঝখানে একটি ফাঁকা জায়গা সেখানে একটি পোকা বসে বসে রিযিক পাচ্ছে, বছরের পর বছর যাবৎ বসবাস করছে, বের হওয়ারও কোনো পথ নেই। আলো-বাতাস ঢোকারও কোনো রাস্তা নেই। তবুও সে জীবিত এবং সুস্থ। পাথর ভেঙ্গে যাওয়াতে বের হয়েছে এবং দিব্যি হেঁটে চলে গেল।
এটা কোন্ সত্ত্বার কাজ?
তিনিই আমাদের স্রষ্টা মহান আল্লাহ।
অতএব, তাঁকে চিনুন এবং তাঁর ক্ষমতা সম্পর্কে চিন্তা করে তাঁর কাছে নিজেকে সর্মপণ করুন। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমীন।
একটি ঘোষণা
হযরত আবু হুরায়রা রাদি. থেকে বর্ণিত আছে, রসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিন একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা করে দেবে যে, বুদ্ধিমান লোকেরা কোথায়?
মানুষ জিজ্ঞেস করবে, 'বুদ্ধিমান কারা?'
উত্তর দেওয়া হবে, 'ওই সমস্ত লোক বুদ্ধিমান, যারা দাঁড়ানো, বসা ও শোয়া অবস্থায় আল্লাহর যিকির করত (অর্থাৎ সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করত) এবং যারা আসমান ও জমিনের সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা-ফিকির করত এবং বলত, “হে পরওয়ারদেগার, তুমি এইসব অনর্থক সৃষ্টি করোনি। আমরা তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করি। সুতরাং তুমি আমাদের জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করো।'
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তারপর তাদের জন্য একটি ঝাণ্ডা তৈরি করা হবে, যার পেছনে তারা যেতে থাকবে এবং তাদের বলা হবে যে, অনন্তকালের জন্য তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করো। [আত-তারগীব ওয়াত তারহীব]
শিক্ষা:
একবার হযরত আবু যর রাদি. রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে উপদেশ চাইলে তিনি তঁকে উপদেশ হিসেবে বলেন, 'যতক্ষণ না বুদ্ধিমান লোকের বুদ্ধি লোপ পায়, সে নিজের সময়কে ভাগ করে নেয় :
* এক ভাগ তার পালনকর্তার ইবাদত ও মুনাজাতের জন্য।
* এক ভাগ নফসের মুহাসাবা ও আত্মসমালোচনার জন্য।
* এক ভাগ আল্লাহ তাআলার কারিগরী ও তার সৃষ্টির মধ্যে চিন্তা-ভাবনার জন্য।
* এক ভাগ খাওয়া-দাওয়া ও অন্যান্য প্রয়োজনের জন্য হওয়া চাই।
# বুদ্ধিমান ব্যক্তির উচিত, সে যেন শুধু তিনটি কাজের উদ্দেশ্যে সফর করে :
* আখেরাতের সম্বল জমা করার উদ্দেশ্যে।
* অথবা জীবিকা নির্বাহের উদ্দেশ্যে।
* অথবা কোনো হালাল আনন্দ উপভোগের উদ্দেশ্যে।
# বুদ্ধিমান ব্যক্তির আরও তিনটি কাজ করা উচিত :
* সমসাময়িক পরিস্থিতির প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা
* নিজের অবস্থার প্রতি মনোযোগী থাকা।
* আপন জিহ্বাকে হেফাযত করা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে এমন বুদ্ধিমান হওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন।
📄 একটি দু‘আর গল্প
মূসা আলাইহিস সালাম ও আল্লাহর মাঝে কথোপকথনের গল্প।
একবার আল্লাহ তা'আলা হযরত মূসা আলাইহিস সালামের প্রতি অহী পাঠালেন যে, 'হে মূসা! তোমাকে কি এমন আমলের কথা বলব-যে আমল করলে সারা পৃথিবীর সমস্ত সৃষ্টিজীব তোমার জন্য মাগফেরাতের দু'আ করবে?'
হযরত মূসা আলাইহিস সালাম তৎক্ষণাৎ বললেন, 'হে আল্লাহ! অবশ্যই বলুন, সে আমল কোনটি?'
আল্লাহ তা'আলা বললেন, 'সৃষ্টিজীব থেকে তুমি যে কষ্ট পাও তার উপর সবর ও ধৈর্য অবলম্বন করলে সারা পৃথিবীর সমস্ত সৃষ্টিজীব তোমার জন্য মাগফেরাতের দু'আ করবে।'
শিক্ষা:
প্রকৃতপক্ষেই সবর বা ধৈর্য এমনই এক মহৎগুণ যার দ্বারা সৃষ্টিজীবের দু'আর সাথে সাথে আল্লাহর সাহায্যও পাওয়া যায়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন-
إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصُّبِرِينَ
"নিশ্চয় ধৈর্যশীলদের সাথে আল্লাহ আছেন (তথা আল্লাহর সাহায্য আছে।)” [সূরা বাকারা, আয়াত: ১৫৩]
📄 আমরা দুজনে জান্নাতি
দুজন জান্নাতি মানুষের গল্প। রাতের আধারে স্বামী-স্ত্রীর একান্ত আলাপচারিতার গল্প।
জনৈক কবি ছিলেন খুব কালো কিন্তু তার স্ত্রী ছিল খুবই সুন্দরী। একদিন কবি তার স্ত্রীর সাথে রাতের নির্জন পরিবেশে বসে গল্প করছিলেন। গল্পের এক ফাঁকে স্বামী তার স্ত্রীর সুন্দর চেহারার দিকে তাকিয়ে খুব আনন্দ প্রকাশ করলেন। তখন স্ত্রী বলল, 'আমরা দুজনেই জান্নাতি।'
স্ত্রীর এমন মন্তব্যে স্বামী বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি এতটা নিশ্চিন্ত মনে কিভাবে বলতে পারলে আমরা জান্নাতি?'
স্ত্রী বলল, 'আমি যখন আপনাকে দেখি তখন ধৈর্য অবলম্বন করি আর আপনি যখন আমাকে দেখেন তখন আপনি মহান আল্লাহর কাছে আমার মতো এমন সুন্দরী স্ত্রী পাওয়ার কারণে শুকরিয়া আদায় করেন আর ধৈর্য ও শোকর উভয়টার বিনিময় হলো জান্নাত।' সুবহানাল্লাহ!
শিক্ষা: প্রকৃতপক্ষেই ধৈর্য ও শোকর মহান আল্লাহর জান্নাতকে অবধারিত করে দেয়।
আসুন না, আমরাও এভাবে শোকর ও ধৈর্যাবলম্বন করে করে জান্নাতি হই!
📄 অমূল্য উপদেশ
হযরত হাসসান ইবনে আতিয়্যাহ রহ. বলেন, হযরত আবু দারদা রা. লোকদের উপদেশ দিতে গিয়ে বলতেন:
• তোমরা ততক্ষণ কল্যাণের উপর থাকবে, যতক্ষণ তোমাদের ভালো লোকদের মহব্বত করবে এবং হক কথা বলা হলে তোমরা তা বুঝতে সক্ষম হবে। কারণ, যে হক কথাকে বুঝে, সে তার উপর আমলকারীর সমতুল্য গণ্য হয়।
• তোমরা লোকদের উপর এমন কাজের দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ো না, যার দায়িত্ব (আল্লাহর পক্ষ থেকে) তাদের উপর চাপানো হয়নি।
• যে কাজের উপর তাদের রব হিসাব গ্রহণ করবেন না, তোমরা তাদের কাছ থেকে এমন কাজের উপর হিসাব গ্রহণ করো-এটা উচিত নয়।
• হে আদম সন্তান, তুমি নিজের ব্যাপারে চিন্তা করো। কেননা, যে ব্যক্তি লোকদের মধ্যে পরিলক্ষিত দোষ তালাশে লাগবে, তার দুঃখ দীর্ঘ হবে এবং তার রাগ কখনও ঠাণ্ডা হবার নয়।
• আল্লাহর ইবাদত এমনভাবে করো, যেন তুমি তাকে দেখছ।
• নিজেদের মৃত লোকদের মধ্যে গণ্য করো।
• জেনে রেখো, অল্প সম্পদ যা তোমাদের প্রয়োজনপূরণে যথেষ্ট হয়, তা এমন অধিক সম্পদ থেকে উত্তম, যা তোমাদের আল্লাহ থেকে গাফেল করে দেয়।
• এও জেনে রেখো, নেকী কখনও পুরোনো হবে না এবং গুনাহ কখনও ভুলে যাওয়া হবে না। ৫
টিকাঃ
৫. আবু নুআইম ফিল হুলইয়া, ১/২১০, ২১১, ২১২, ২১৫, ২১৬, ২১৭, ২১৮, ২২০, ২২৩, ২২৪; বায়হাকী, শুআবুল ঈমান; কান্য, ৮/২২৪; ইবনে কাসীর, ৩/৩৪১।