📄 সেই কাগজের টুকরাটি
আমাদের বিশ্বাসের গল্প। জীবনে পরিবর্তন আনার গল্প।
প্রখ্যাত বুযুর্গ হযরত জাফর ইবনে সুলাইমান রহ. বলেন, আমি একবার হযরত মালেক ইবনে দিনার রহ.-এর সাথে বসরায় যাচ্ছিলাম। একটি বড় শানদার অট্টালিকার নিকট দিয়ে অতিক্রম করলাম, যার নির্মাণ কাজ চলছিল। একজন যুবক বসে রাজমিস্ত্রীদেরকে নির্দেশ দিচ্ছিল যে, এখানে এ রকম হবে, আর ওখানে এইরকম হবে।
মালেক ইবনে দিনার রহ. ওই যুবককে দেখে বলতে লাগলেন- 'এই যুবকটি কত সুন্দর ও সুশ্রী অথচ কি কাজের মধ্যে জড়িয়ে আছে, এই নির্মাণ কাজে তার কত মনোযোগ! আমার মন চাচ্ছে, আল্লাহ্ তা'আলার নিকট এই যুবকের জন্য দু'আ করি। তিনি যেন তাকে এই সব ঝামেলা হতে মুক্ত করে আপন মুখলেস বান্দা বানিয়ে নেন। কত ভালো হয় যদি সে জান্নাতের যুবকদের মধ্যে হয়ে যায়!'
হে জাফর! চলো আমরা ওই যুবকের কাছে যাই।
হযরত জাফর ইবনে সুলাইমান রহ বলেন, আমরা ওই যুবকের কাছে গেলাম। তাকে সালাম দিলাম। সে সালামের জবাব দিল। সে মালেক বিন দিনার রহ. সম্পর্কে জানত কিন্তু তাকে চিনত না। কিছুক্ষণ পর চিনতে পেরে দাঁড়িয়ে গেল এবং বলল, 'হযরত, কি মনে করে তাশরীফ আনলেন?'
হযরত মালেক রহ. বললেন, 'তুমি তোমার এই বাড়ির নির্মাণ কাজে কী পরিমাণ অর্থ খরচ করার ইচ্ছা করেছ?'
সে বলল, 'এক লক্ষ দেরহাম।' (তথা এক লক্ষ রৌপ্য মুদ্রা)।
হযরত মালেক রহ. বললেন, 'তুমি যদি এই এক লক্ষ দেরহাম আমাকে দিয়ে দাও তবে আমি তোমার জন্য জান্নাতে একটি বাড়ির জিম্মা নিচ্ছি। আর তা এই বাড়ি হতে অনেক গুণ উত্তম হরে।
সেখানে অনেক খাদেম থাকবে। আনতনয়না হুর-পরী থাকবে। আর তাতে লাল ইয়াকুতের তাঁবু ও গম্বুজ হবে। তার উপর মুক্তা জড়ানো থাকবে। তার মাটি জাফরানের হবে। তার মসলা হবে মেশকের।
যার সুগন্ধি ছড়াতে থাকবে। তা কখনও পুরাতন হবে না। নষ্ট হবে না।
আর তা কোনো মিস্ত্রি বানাবে না; বরং আল্লাহ্ তা'আলার 'কুন' (হয়ে যাও) হুকুমের দ্বারা তৈরি হয়ে যাবে।'
যুবক বলল, 'আজ রাতটা আমাকে চিন্তা করার জন্য সময় দিন। আর আপনি আগামিকাল সকালে আসুন। তখন আমি'এ বিষয়ে আপনাকে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাব।'
হযরত মালেক রহ. তাকে সময় দিয়ে এলেন।
রাতভর ওই যুবক চিন্তায় কাটাল। শেষ রাতে খুব বিনয়ের সাথে কল্যাণকর সিদ্ধান্তের জন্য দু'আ করল।
সকাল হলে আমরা দুজন তার বাড়িতে গেলাম। যুবক দরজার বাইরে বসে আমাদের অপেক্ষা করছিল। হযরত মালেক রহ.-কে দেখে খুব খুশি হলো। হযরত মালেক রহ. বললেন, 'গতকালের বিষয় সম্পর্কে তুমি কী সিদ্ধান্ত নিয়েছ?'
যুবক বলল, 'আপনি কাল যে জিনিসের ওয়াদা করেছেন, তা কি আপনি পুরা করবেন?'
হযরত মালেক রহ. বললেন, 'অবশ্যই।'
যুবক সাথে সাথে এক লক্ষ দেরহামের থলেটি আমাদের সামনে রেখে দিল এবং দোয়াত, কলমও এনে রাখল।'
হযরত মালেক রহ. একটি চিঠি লিখলেন, তাতে 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম' লিখার পর লিখলেন, "এটা একটি অঙ্গীকারনামা। এই মর্মে যে, মালেক ইবনে দিনার অমুক ব্যক্তির নিকট হতে এই জিম্মা নিয়েছে যে, তার এই মহলের পরিবর্তে আল্লাহ্ তা'আলার নিকট এইরূপ মহল যার গুণাবলি উপরে বর্ণনা করা হয়েছে (উল্লিখিত মহলের গুণাবলি লিখার পর), সে পাবে। বরং তা হতেও অনেক বেশি উত্তম ও উন্নত মহল পাবে। যা অতি উত্তম ছায়াতে আল্লাহ্ তা'আলার নিকটে হবে।'
এই চিঠি লিখে তাকে দিয়ে দিলেন এবং এক লক্ষ দেরহাম তার নিকট হতে নিয়ে চলে এলেন।
জাফর রহ. বলেন, সন্ধ্যার পর হযরত মালেক রহ.-এর নিকট সেই এক লক্ষ দিরহাম হতে এই পরিমাণও বাকি ছিল না যে, একবেলা খাওয়ার কাজ চলতে পারে। অর্থাৎ সব দিরহাম তিনি গরিব ও এতিমদের মাঝে বণ্টন করে দেন।
এই ঘটনার পর চল্লিশ দিনও অতিবাহিত হয়নি, একদিন হযরত মালেক রহ. ফজর নামাজ হতে অবসর হলেন, তখন মসজিদের মেহরাবে একটি কাগজের টুকরা পড়ে থাকতে দেখলেন। তা ওই কাগজের টুকরাই ছিল যা মালেক রহ. ওই যুবককে লিখে দিয়েছিলেন। তার অপর পৃষ্ঠায় কালি ছাড়া লিখা ছিল যে,
"এটা আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ হতে মালেক ইবনে দিনারের জিম্মার মুক্তিদান পত্র। তুমি ওই যুবকের জন্য যে বাড়ির জিম্মা নিয়েছিলে, আমি পুরাপুরিভাবে তাকে তা দান করে দিয়েছি এবং তা হতে সত্তরগুণ বেশি দিয়েছি।"
হযরত মালেক রহ. পত্রটি পড়ে আশ্চর্যান্বিত হলেন।
অতঃপর আমরা সেই যুবকের বাড়ি গেলাম। সেখানে তার বাড়ির উপর কালো পতাকা ছিল। (যা শোকের আলামত হিসাবে হয়তো লাগান হয়েছিল) এবং কান্নাকাটির আওয়াজ আসছিল। আমরা জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, গতকাল সে যুবকের ইন্তেকাল হয়ে গেছে। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, তাকে কে গোসল দিয়েছে?
গোসলদাতাকে ডেকে আনা হলো। আমরা যুবকের গোসল ও কাফনের অবস্থা জিজ্ঞেস করলাম।
সে বলল, এই যুবক মৃত্যুর পূর্বে আমাকে একটি কাগজের টুকরা দিয়েছিল এবং বলেছিল যে, যখন তুমি আমাকে গোসল করিয়ে কাফন পরাবে, তখন এই কাগজটি তার ভেতর রেখে দিয়ো! আমি তাকে গোসল করালাম, কাফন পড়ালাম এবং সেই কাগজটি তার শরীর এবং কাফনের সাথে রেখে দিলাম। হযরত মালেক রহ. তার নিকট হতে কাগজটি বের করে তাকে দেখালেন।
সে বলল, 'এটাই ওই কাগজ। ওই মহান সত্তার কসম, যিনি তাকে মৃত্যু দিয়েছেন, এই কাগজটি আমি নিজে তার কাফনের ভেতর রেখেছিলাম।'
এই ঘটনা দেখে অন্য এক যুবক উঠল এবং বলতে লাগল, 'হে মালেক রহ.! আপনি আমার নিকট হতে দুই লক্ষ দেরহাম গ্রহণ করুন এবং আমাকেও একটি কাগজ লিখে দিন।'
হযরত মালেক রহ. বললেন, 'সেই কথা অনেক দূরে চলে গেছে। এখন হতে পারে না। আল্লাহ্ তা'আলা যা চান, তা করেন।'
এরপর যখনই মালেক রহ. ওই যুবকের আলোচনা করতেন, তখনই কাঁদতেন এবং তার জন্য দু'আ করতেন। [সূত্র: রওজ: শায়খুল হাদীস যাকারিয়া রহ.: ফাযায়েলে ছাদাকাত-২]
হযরত আনাস রাদি. বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, 'বহু এলোমেলো চুলওয়ালা ধূলি ধূসরিত, পুরাতন চাদরওয়ালা, মানুষের দরজা হতে বিতাড়িত এমন লোক রয়েছে, যদি তারা আল্লাহর উপর (ভরসা করে) কোনো কসম করে বসে, তাহলে আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই তার কসম পূরণ করে দেন। হাদীসটির সনদ সহীহ। [তাবারানী, মাজমাউয যাওয়ায়েদ-১/৪৬৬]
সুতরাং এই হাদীসের আলোকে আলাচ্য ঘটনার বাস্তবতা দিবোলোকের ন্যায় স্পষ্ট প্রমাণীত হয়। এখন বিশ্বাসের বিষয় আমাদের।
শিক্ষা:
এই ঘটনা থেকে ধনী লোকদের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। আর আখেরাতের ওই অট্টালিকাকে দুনিয়ার এই সামান্য অট্টালিকার উপর প্রাধান্য দেওয়া বুদ্ধিমান ধনীদেরই কাজ। তবে বিল্ডিং নির্মাণ করা নাজায়েয নয় বরং জায়েয। কিন্তু কেউ যদি মোটামোটি থাকার জায়গার ব্যবস্থা করে বাকি টাকা আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে গরিবদেরকে দান করে দেয়, তবে অবশ্যই আল্লাহ্ তা'আলা তার জন্য জান্নাতের মধ্যে উঁচু উঁচু অট্টালিকা নির্মাণ করে রাখবেন।
বাণী:
“হে গাফেল! মৃত্যুর পূর্বে নিজ পাথেয় ও সম্বল সঞ্চয় কর এবং মৃত্যুর জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাক." [খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী রহ.]
📄 এসো জান্নাতি হই
হযরত আনাস রাদি. বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা নিজেদের ব্যাপারে আমার জন্য ছয়টি বিষয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করো, আমি তোমাদের জন্য জান্নাতের দায়িত্ব গ্রহণ করছি:
১। যখন তোমাদের মধ্যে কেউ কথা বলবে, মিথ্যা বলবে না।
২। যখন ওয়াদা করবে, তা ভঙ্গ করবে না।
৩। যখন কারও নিকট আমানত রাখা হয়, খেয়ানত করবে না।
৪। নিজের দৃষ্টি অবনত রাখবে। অর্থাৎ যেসব বস্তু দেখতে নিষেধ করা হয়েছে, সেগুলোর প্রতি যেন দৃষ্টি না পড়ে।
৫। নিজ হাতকে (অন্যায় মারপিট ইত্যাদি থেকে) বিরত রাখবে।
৬। নিজের লজ্জাস্থানের হেফাজত করবে। [মাজমাউয যাওয়ায়েদ, ১০/৫৪১]
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কিছু শর্তের বিনিময়ে জান্নাতের জিম্মাদারী নিচ্ছেন তাহলে আসুন না, আমরা প্রতিজ্ঞা করি-
* আমরা আজ থেকে মিথ্যা বলব না। * ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করব না। * কারো সাথে কখনো খেয়ানত বা বিশ্বাসঘাতকতা করব না। * অপাত্রে দৃষ্টিপাত করব না। তথা নারীদের প্রতি কিংবা শশ্রুবিহীন ছেলেদের প্রতি কু-দৃষ্টি করব না। * অন্যায়ভাবে কাউকে মারপিট করব না। এবং * নিজের লজ্জাস্থানকে যিনা-ব্যভিচার থেকে পুরাপুরি হেফাযত করব।
আসুন, এসব বিধি-নিষেধ পালন করে আমরাও জান্নাতি হই। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।
📄 ক্ষমার বদলে ক্ষমা
হযরত থানবি রহ. বলেন, এক লোকের স্ত্রী একটি বিরাট ভুল করে ফেলল। এতে তার এত বড় ক্ষতি হলো যে, সে ইচ্ছে করলে তাকে তালাক দিয়ে দিতে পারত এবং সে তালাকের উপযুক্তও ছিল। কিন্তু সে তাকে আল্লাহর বান্দী মনে করে ক্ষমা করে দিল এবং তাকে তালাক দেওয়া থেকে বিরত রইল।
কয়েক বছর পর সে মারা গেলে তার এক বন্ধু তাকে স্বপ্নে দেখল। স্বপ্নে দেখে বন্ধু তাকে জিজ্ঞেস করল, 'ভাই! তুমি কী অবস্থায় আছ এবং তোমার সাথে কেমন আচরণ করা হয়েছে?'
সে বলল, 'আল্লাহ তা'আলা আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।'
বন্ধু জিজ্ঞেস করল, 'কিসের অসিলায় তোমাকে ক্ষমা করা হলো?'
সে বলল, 'এমনই একটি বিষয় যা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম।- বিষয়টি এই ছিল যে, একবার আমার স্ত্রী বিরাট এক ভুল করে ফেলল, আমি ইচ্ছা করলে তাকে শাস্তি দিতে পারতাম এবং তালাকও দিতে পারতাম কিন্তু আমি তাকে আল্লাহর বান্দী মনে করে ক্ষমা করে দিলাম। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
تو نے اسے میرے بندی سمجھ کر معاف کر دیا تھا آج میں نے تجھے اپنا بندہ سمجھ کر معاف کر دیتا ہوں
'তুমি তাকে আমার বান্দী মনে করে ক্ষমা করে দিয়েছিলে আজ আমি তোমাকে আমার বান্দা মনে করে ক্ষমা করে দিলাম।' সুবহানাল্লাহ।
শিক্ষা: এটাকেই বলে ক্ষমার বদলে ক্ষমা। এমন ক্ষমা সবার ভাগ্যেই জুটতে পারে। যদি আমরা এমন হতে পারি এবং মানুষকে আল্লাহর জন্য ক্ষমা করতে পারি।
আর মহান আল্লাহর ক্ষমার অর্থই তাঁর জান্নাতের অধিকারী হওয়া। কেননা, আল্লাহ তাআলা যাকে ক্ষমা করবেন তাকেই জান্নাতে পাঠাবেন।
তাই আসুন না, আমরাও মানুষকে ক্ষমা করার মাধ্যমে আল্লাহর ক্ষমা লাভ করে জান্নাতি হই।
📄 সত্যের জয়
আমাদের এক বন্ধু ছিল উকিল। ওকালতি এমন এক পেশা যে, সারা দুনিয়ার যত ধরনের মিথ্যা আছে তা সেখানে প্রয়োগ করা হয়।
কিন্তু বিশ্বাস করুন, তিনি ওকালতিও অব্যাহত রেখেছেন আবার জীবনের গতিও বদলে দিয়েছেন।
তার স্ত্রী ছিল একজন ডাক্তার। উকিল সাহেব আল্লাহওয়ালাদের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে নিলেন আর আল্লাহ তা'আলাও তার মনের অবস্থা বদলে দিলেন।
তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন, 'আমি আজকের পর কখনো মিথ্যা বলব না।' অথচ মিথ্যা ছাড়া ওকালতিতে কোনো পয়সা নেই। কিন্তু তার দৃঢ় বিশ্বাস আমার আল্লাহ আমাকে সত্যের উপরই রিযিক দেবেন।
লোকেরা বলল, 'তোমার মাথা ঠিক আছে কি? সত্য কথায় তোমার ওকালতি চলবে না।'
তিনি বলতেন, 'ওকালতি চলুক আর না চলুক কিন্তু সত্য ঠিকই চলবে। আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেছি, আর কখনো মিথ্যা বলব না।'
সুতরাং তিনি একদিন তার অফিসে এসে লোকদের সাথে একথা বলে দিলেন যে, 'আমি শুধু ওই মামলা-ই গ্রহণ করব যা সত্য; মিথ্যা কোনো মামলা গ্রহণ করব না।'
লোকদেরকে এটাও বলে দিলেন যে, মামলা মিথ্যা হলে আমাকে জানাবেন অন্যথায় শুনানির সময় যদি আমি জানতে পারি মামলা মিথ্যা তাহলে আমি তখন আপনার বিরুদ্ধাচরণ করব। আর যদি সত্য হয় তাহলে দৃঢ়তার সাথে আপনার পক্ষপাতিত্ব করব।
লোকেরা তখন তার থেকে আল্লাহর পানাহ চেয়ে দৌড়ে পালাল এবং অন্য উকিলদের কাছে চলে গেল।
এখন এই উকিল সাহেবের অফিস খালি, সারাদিন তিনি একা একা বসে থাকছেন; কোনো কাজ আসছে না। এভাবে কয়েকমাস কেটে গেল। লোকদের মধ্যে চর্চা হতে লাগল যে- অমুক উকিল পাগল হয়ে গেছে।
তার বুদ্ধিসুদ্ধি সব উড়ে গেছে।
হয়তো কোনো মোল্লারা তার মাথা নষ্ট করে দিয়েছে।
ভালো একজন উকিল ছিল; কিন্তু তার মাথা নষ্ট করে দিয়েছে।
আল্লাহর বান্দা দৃঢ় ও সত্য ছিল। বলত, 'আমি মিথ্যা বলে রুজি উপার্জন করব না। মহান আল্লাহ আমাকে সত্যের উপরই রিযিক দেবেন।'
এভাবে একবছর কেটে গেল কিন্তু কোনো কাজ তার হাতে এলো না। যেহেতু স্ত্রী ডাক্তার ছিলেন তাই তার বেতনে সংসার কোনো রকম চলতে লাগল। স্ত্রীও জ্ঞানী এবং দ্বীনি বোধসম্পন্ন ছিল।
একদিন স্ত্রী স্বামীকে বলল, 'আপনি যখন মিথ্যা বলা ছেড়ে দিয়েছেন তাহলে ওকালতি পেশাও ছেড়ে দিন এবং ব্যবসাকে পেশা হিসেবে ধরে নিন। আপনি সত্যই বলবেন এবং সততার সাথে যতটুকু সম্ভব ব্যবসা করবেন। আল্লাহ তার মধ্যেই বরকত দেবেন।'
উকিল সাহেব বললেন, 'না, বলবও সত্য এবং করবও ওকালতি।'
খুব ভালো এবং আমার দু'আ ও সহযোগীতা রইল আপনার জন্য; আল্লাহ তা'আলা আপনাকে সফলতা দান করুন, এই বলে স্ত্রী ক্ষ্যান্ত হয়ে গেল।
ওকিল সাহেব এক বছর পর্যন্ত দৈনিক অফিসে আসতেন আর পাখার নিচে বসে পত্রিকা পড়ে দিন কাটিয়ে সন্ধ্যায় বাসায় চলে যেতেন।
একবার জজের কাছে এই সংবাদ পৌঁছল যে, অমুক উকিল মিথ্যা মামলা গ্রহণ করে না এবং সে মিথ্যা মামলা নেবে না বলে প্রতিজ্ঞা করেছে। দরিদ্রতা সহ্য করছে এবং বলছে, 'মরে যাব তবু সত্য ছাড়ব না।'
সকল জজ তার এমন প্রতিজ্ঞায় খুবই প্রভাবিত হলো। সময়ের সাথে সাথে লোকদের অন্তরে তার প্রতি ভালোবাসা তৈরি হতে লাগল। সে নিজেই বলেছে, 'আমার এক বছর পরীক্ষার ছিল।'
দ্বিতীয় বছর শুরু হলো তো তাবলীগ জামাতের লোকেরা, তাসাউফ ও সুলুকের লোকেরা এবং মাদরাসাওয়ালারাও জানতে পারল যে, অমুক উকিল মিথ্যা মামলা নেয় না শুধু সত্য মামলাই গ্রহণ করে। সুতরাং তারা চিন্তা করতে লাগল যে, আমাদের মামলা তো সত্য সুতরাং টাকা-পয়সা যা-ই লাগুক আমরা তার কাছেই আমাদের মামলা নিয়ে যাব। এভাবে তার কাছে মামলা আসতে শুরু করল। যে-ই আসত সত্য মামলা নিয়ে আসত। উকিল সাহেব মামলা নিয়ে কোর্টে হাযির হতেন আর তা পক্ষে ফায়সালা হয়ে যেত। তৃতীয় মামলা এলো তো তা-ও তার পক্ষে ফায়সালা হয়ে গেল। কিছুদিন গত হওয়ার পর জজ সাহেবরা পরস্পর মিলে পরামর্শ করলেন যে, এই উকিল যেই মামলাই নিয়ে আসেন তা তো সত্য সুতরাং তাকে আমাদের বেশি প্রশ্ন না করাই ভালো। সুতরাং উকিল সাহেব মামলা নিয়ে আদালতে যেতেন আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই জজ তার পক্ষে ফায়সালা দিয়ে দিতেন।
এবার ধনী ও সম্পদশালীদের যাদের মামলা সত্য তারাও চিন্তা করতে লাগল, আমাদের মামলাও তো সত্য সুতরাং আমরাও তার কাছেই যাচ্ছি না কেন। এখন ধনী ও সম্পদশালীরাও আসতে লাগল। ফলে তার টাকাও বেশি উপার্জন হতে লাগল।
যখন উকিল সাহেব মিথ্যা বলতেন তখন এক মাসে তার আয় ছিল বিশ হাজার টাকা আর এখন যখন মিথ্যা ছেড়ে সত্য বলতে লাগলেন তো তার প্রতি মাসে আয় হতে লাগল চল্লিশ হাজার টাকা।
সত্য বলার কারণে আল্লাহ তা'আলা তাকে দ্বিগুণ রিযিকের ব্যাবস্থা করে দিলেন। সুবহানাল্লাহ।
কিছুদিন পূর্বে কয়েকজন উকিলের জজ হওয়ার পরীক্ষা হলো এতে আমাদের ওই বন্ধু উকিল সফল হলেন এবং এখন জজ হয়ে গেলেন।
একদিন এমন ছিল যে, এই উকিল সাহেবই জজের সামনে দাঁড়িয়ে মিথ্যা বলতে থাকতেন আর আজ যখন সত্য বলা শুরু করলেন তো আল্লাহ তা'আলা তাকে বিচারকের চেয়ারে বসিয়ে দিলেন।
প্রথমে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে যেতেন আজ আল্লাহ তা'আলা তাকে আরাম চেয়ারে বসিয়ে দিলেন। এখন চেয়ারে আরামে বসে হুকুম জারি করেন আর তা মানুষ সাগ্রহে মেনে নেয়।
শিক্ষা:
আমার বন্ধুগণ! আসুন, আমরা সমস্ত সৃষ্টিজীব থেকে আমাদের দৃষ্টি সরিয়ে এক আল্লাহর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করি।
উকিল সাহেব যেভাবে আল্লাহর উপর ভরসা করে কাজ শুরু করেছেন এভাবে আমরাও আল্লাহর উপর ভরসা করে সত্যের উপর চলার প্রতিজ্ঞা করি। হাদীস শরীফে এসেছে-
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'নিশ্চয় সত্যবাদিতা পুণ্য ও কল্যাণের পথপ্রদর্শন করে। আর পুণ্য জান্নাতে নিয়ে যায়। মানুষ সত্য বলতে থাকে। অবশেষে সে আল্লাহর কাছে সিদ্দীক হিসেবে গণ্য হয়। মিথ্যা পাপাচারের পথ দেখায়। পাপাচার জাহান্নামে নিয়ে যায়। মানুষ মিথ্যা বলতে থাকে। অবশেষে আল্লাহর কাছে সে মিথ্যাবাদী হিসেবে গণ্য হয়।' [সহীহ বুখারী হাদীস নং-৬০৯৩; সহীহ মুসলিম হাদীস নং-২৬০৭]
আজ কোনো মাকে জিজ্ঞেস করুন, 'আপনার সন্তান কি হবে?' কোনো মা বলবেন, 'আমার ছেলে ডাক্তার হবে।' কোনো মা বলবেন, 'আমার ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হবে।' কোনো মা বলবেন, 'আমার ছেলে পাইলট হবে।' কোনো মা বলবেন, 'আমার ছেলে ব্যরিস্টার হবে।' কোনো মা বলবেন, 'আমার ছেলে সচিব হবে।' কোনো মা বলবেন, 'আমার ছেলে সৈনিক হবে।' কিন্তু কোনো মা কি এমন আছেন যিনি বলবেন- আমার ছেলে বড় আলেম হবে। আমার ছেলে মুহাদ্দিস হবে। আমার ছেলে হাদীসের ইমাম হবে। আমার ছেলে বড় মুফতি হবে। আমার ছেলে কুরআনের তাফসীরকারক বা মুফাস্স্সির হবে। আমার ছেলে মুবাল্লিগ হবে। দেশ-বিদেশে দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে ঘুরে বেড়াবে। আমার ছেলে দ্বীনের মুজাহিদ হবে?
আমি আপনাদের একটি প্রশ্ন করছি, মনোযোগ দিয়ে শুনুন। পরে বলতে পারবেন না যে, আমাদেরকে কেউ বুঝায়নি। রসূলের মিম্বরে বসে আছি। আল্লাহর কিতাব আমার হাতে। আল্লাহর ঘরে বসে আছি। আমাকে একটি কথা বলুন-
আপনারা কখনো দেখেছেন-কি? কোনো আলেম যার ইলম অনুযায়ী আমলও আছে এমন কেউ ক্ষুধা, পীপাসায় কাতরাতে কাতরাতে মারা গেছে? কিংবা খাবারের অভাবে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছে? কিংবা কেউ বেকার হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে? শুনুন, বহু পিএইচডিওয়ালা, বহু ডিগ্রিওয়ালা এবং বহু ইঞ্জিনিয়ারিং পড়নেওয়ালাকে চাকরীর অভাবে, টাকা-পয়সা ও খাবারের অভাবে পেরেশানী হয়ে ঘুরতে দেখা গেছে এবং মরতেও দেখা গেছে।
আমাদের ছেলেরা আলেম হলে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে সেখান থেকে রিযিক দেবেন যেখান থেকে নবী আলাইহিস সালামগণকে রিযিক দেওয়া হতো। আল্লাহ তা'আলা বলেন- وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ 'যে আল্লাহর উপর ভরসা করে আল্লাহ্-ই তার জন্য যথেষ্ট।' [সূরা তালাক, আয়াত: ৩]