📄 পাপ করে ফেললে কি করবো?
এখানে তাওবাকারী হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, আমি ছিলাম পথভ্রষ্ট, নামায পড়তাম না, ইসলামের গন্ডির বাইরে ছিলাম, আমি কিছু ভাল কাজও করেছি, এখন তাওবা করার পর এগুলো কি ধরা হবে, নাকি সব হাওয়া হয়ে যাবে?
আপনার প্রশ্নের জবাব হলো, হযরত উরওয়া ইবনে জুবাইর হতে বর্ণিত হাদীসটি। হাকীম ইবনে হিজাম তাকে জানিয়েছেন যে, তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেছেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি জাহেলিয়াতের যুগে দান-খয়রাত, গোলাম মুক্ত করা, আত্মীয় রক্ষা করা ইত্যাদি নেকীর কাজ করতাম। আমি কি এতে নেকী পাব? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “তুমি ইসলাম গ্রহণ করেছো, পূর্বেরগুলোকে উত্তম ভাবেই পাবে।” (বুখারী)
সুতরাং এসব পাপ ক্ষমায় পরিবর্তন করে দেয়া হবে এবং এসব জাহেলিয়াতের যুগের নেকী তাওবার পরে ঠিক রাখা হবে। তাহলে আর কি-ইবা বাকী থাকলো?
পাপ করে ফেললে কি করবো?
আপনি হয়তো বলতে পারেন, যখন আমার দ্বারা পাপ হয়ে যাবে তখন কিভাবে দ্রুত তাওবা করতে পারি? এমন কোন কাজ রয়েছে কি যা পাপ করার সাথে সাথেই করতে পারি?
উত্তর: পাপ থেকে বিরত হয়েই দুটি কাজ করতে হবে:
এক: অন্তঃকরণের কাজ হলো অনুতপ্ত হওয়া এবং এই বলে দৃঢ় সংকল্প নেয়া যে, এ ধরণের কাজ আর করবো না। এটি হবে মূলত আল্লাহর ভয়ের ফলে।
দুই: অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কাজ বিভিন্ন প্রকারের নেকীর কাজ করার মাধ্যমে। এর মধ্যে অন্যতম হলো তাওবার নামায। এর দলীল হলো: হযরত আবু বকর রাযিআল্লাহু তা'আলা আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, কোন মানুষ পাপ করার পর যদি পবিত্রতা অর্জন করে, অতঃপর নামায পড়ে এরপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, তাহলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেবেন। (আসহাবুস সুনান, সহীহ আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব ১/২৮৪) অতঃপর তিনি এ আয়াত পাঠ করেন:
وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَن يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَى مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ (آل عمران: ١٣٥)
“যারা অশ্লীল কাজ করার পর অথবা নিজেদের প্রতি জুলুম করার পর আল্লাহকে স্মরণ করে এরপর নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে, আর আল্লাহ ব্যতীত গুনাহ সমূহ ক্ষমা করতে কেউ সক্ষম নয় এবং তারা নিজেদের কৃতকর্মের উপর অটল থাকে না এবং তারা (গুনাহের বা পাপের উপর অটল থাকার ভীষণ পরিণাম) জানে।” (সূরা আলে-ইমরান: ১৩৫)
অন্যান্য সহীহ বর্ণনায় এসেছে এই দু'রাকাতের গুণাবলীর কথা যা গুনাহ মাফের কারণ হবে তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ:
(১) যে কেউ সুন্দরভাবে অযু করে তার সগীরা গুনাহ মাফ করে দেয়া হয় (কেননা অযু করলে ধৌত অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সগীরা পাপ পানির সাথে অথবা পানির শেষ বিন্দুর সাথে ঝরে পড়ে)
আর উত্তমভাবে অযু হলো: প্রথমে বিসমিল্লাহ বলে শুরু করা এবং শেষে এ দু'আ করা:
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ وَ أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي مِنَ التَّوَّابِينَ وَاجْعَلْنِي مِنَ الْمُتَطَهِّرِينَ، سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ أَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوْبُ إِلَيْكَ"
“আমি সাক্ষ্য দিচিছ যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন সত্য মাবুদ নেই। তিনি একক তাঁর কোন শরীক নেই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ তাঁর বান্দা ও রাসূল। হে আল্লাহ! আমাকে তাওবাকারীদের এবং পবিত্রতা অর্জনকারী ব্যাক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করুন। হে আল্লাহ! আপনার স্তুতির সাথেই আমি আপনার প্রশংসা করছি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি ব্যতীত কোন সত্য মাবুদ নেই। আমি আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং আপনার নিকট তাওবা করছি।”
(২) এতে মনে মনে কোন কথা বলা যাবে না।
(৩) এতে একাগ্রতা ও বিনয়ীভাব আনতে হবে।
(৪) এরপর ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে।
পূর্বোক্ত কাজের ফলাফল:
(ক) পূর্বের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।
(খ) জান্নাত অবধারিত হয়ে যাবে। (সহীহ আততারগীব ১/৯৪-৯৫)
(গ) বেশী বেশী নেকী ও সৎকর্ম করা।
আপনি সহীহ হাদীসে উল্লিখিত এই উদাহরণটি ভালভাবে চিন্তা করে দেখুন! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
((إِنَّ مِثْلَ الَّذِي يَعْمَلُ السَّيِّئَاتِ ثُمَّ يَعْمَلُ الْحَسَنَاتِ كَمَثَلِ رَجُلٍ كَانَتْ عَلَيْهِ دِرْعٌ ضَيِّقَةٌ قَدْ خَنَقَتْهُ ثُمَّ عَمِلَ حَسَنَةً فَانْفَكَّتْ خَلَقَةٌ ثُمَّ عَمِلَ حَسَنَةً أُخْرَى فَانْفَكَّتْ حَلَقَةً أُخْرَى حَتَّى يَخْرُجَ إِلَى الْأَرْضِ)) (مسند الإمام أحمد، والطبراني في الكبير)
“ঐ ব্যক্তির উদাহরণ হলো, যে খারাপ কাজ করে সে সেই ব্যক্তির মত যার গায়ে খুব আটোসাটো লৌহবর্ম চাপান আছে যা তাকে চেপে ধরে রেখেছে, অতঃপর সে একটি নেক কাজ করলে একটি আংটা খুলে গেল, অতঃপর আরেকটি নেক কাজ করলে আরেকটি আংটা খুলে গেল, এভাবে সব খুলে মাটিতে পড়ে যায়”। (মুসনাদে আহমাদ, তরারানী)
সুতরাং নেকী পাপীকে গুনাহের বন্দীখানা থেকে মুক্ত করে তাকে আনুগত্যের প্রশস্ত ময়দানে বের করে নিয়ে আসে। প্রিয় ভাই! নিম্নোক্ত ঘটনা আপনাকে বিষয়টি আরো পরিষ্কার করে দিবে।
হযরত ইবনে মাসউদ রাযিআল্লাহু তা'আলা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বলে, হে আল্লাহর রাসূল! আমি এক মহিলাকে বাগানের ভিতর একাকী পেয়ে সব কিছুই করেছি কিন্তু সহবাস করিনি। চুমা খেয়েছি, তাকে চেপে ধরেছি, এছাড়া আর কিছু করিনি। এখন আপনি আমার ব্যাপারে যা ইচ্ছা করতে পারেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কিছু বললেন না, সুতরাং লোকটি চলে গেল। অতঃপর হযরত উমর রাযিআল্লাহু তা'আলা আনহু বলেন, আল্লাহ লোকটির অবস্থা গোপন রেখেছিলেন যদি সে নিজের কথা গোপন রাখত। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চোখ তুলে তাকালেন এবং বললেন, ওকে আমার কাছে নিয়ে এসো। যখন তাকে ডেকে নিয়ে আসা হলো তখন তাকে এ আয়াত পাঠ করে শুনালেন:
وَأَقِمِ الصَّلَاةَ طَرَفَى النَّهَارِ وَزُلَفًا مِنَ الَّيْلِ إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ ذَلِكَ ذِكْرَى لِلذَّاكِرِينَ ﴾ (سورة هود: ١١٤)
“আপনি নামাজ প্রতিষ্ঠা করুন দিনের দুই প্রান্তে এবং রাতের একটি অংশে। নিশ্চয়ই নেকী গুনাহকে মিটিয়ে দেয়। এটি হলো উপদেশ, উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য।” (সূরা হুদ: ১১৪)
মুয়ায রাযিআল্লাহু তা'আলা আনহু বলেন, অপর বর্ণনায় এসেছে হযরত উমার থেকে তিনি বললেন: হে আল্লাহর রাসুল! এটি কি তার একার জন্য না সকল মানুষের জন্য? তখন তিনি বললেন, বরং সমস্ত মানুষের জন্য। (মুসলিম)
📄 খারাপ লোকেরা আমাকে তাড়া করে চলেছে
আপনি হয়তো বলবেন, আমি তাওবা করতে চাই কিন্তু আমার সঙ্গী-সাথী খারাপ লোকেরা সর্বত্র আমাকে তাড়া করে চলেছে। তারা আমার মধ্যে সামান্য পরিবর্তনের কথা জেনেই প্রচন্ড চাপ ও আক্রমণ শুরু করেছে এবং আমি নিজেকে খুব অসহায় মনে করছি। এখন আমি কি করবো?
আমি আপনাকে বলছি, আপনি সবর (ধৈর্যধারণ) করুন। এটিই হচ্ছে সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলার পদ্ধতি যেন তিনি সত্যবাদীদেরকে মিথ্যাবাদীদের মধ্যে থেকে পৃথক করে দেন এবং ভাল ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য করেদেন।
আপনি যেহেতু পথের শুরুতে পা রেখেছেন, সেহেতু মজবুত থাকুন। এসব মানুষ ও জিন শয়তান একে অপরকে প্ররোচিত করে, যেন আপনাকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিতে পারে। সুতরাং আপনি তাদের আনুগত্য করবেন না। তারা আপনাকে বলবে, এ একটু আবেগী হয়ে উঠেছে, কয়েক দিনের মধ্যে এসব দূর হয়ে যাবে। এটা সাময়িক ব্যাপার। আশ্চর্যের বিষয় হলো তাওবা করার প্রথম দিকে কেউ কেউ তার সঙ্গীকে বলে, খুব সহজেই আবার খারাপ পথে ফিরে আসবে!!
এক ব্যক্তি এক মহিলার মুখের উপর টেলিফোন বন্ধ করে দেয় যেহেতু সে তাওবা করেছে, আর পাপ করতে চায়না। সে মহিলা বেশ কিছু দিন পর আবার যোগাযোগ করে বলে, আশা করি তোমার ঐসব নাক সিটকানো দূর হয়ে গেছে? এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন:
قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ * مَلِكِ النَّاسِ * إِلَهِ النَّاسِ * مِن شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ * الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ * مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ ) (سورة الناس)
“বলুন! আমি আশ্রয় চাচ্ছি মানুষের প্রভূর নিকট, মানুষের মালিকের নিকট, মানুষের মাবুদের নিকট খান্নাস শয়তানের কুমন্ত্রণা হতে। যারা মানুষের বক্ষে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষ ও জিনদের মধ্যে থেকে। (সূরা আন্নাস: ১-৬)
সুতরাং আপনার প্রভূই কি উত্তম নন আনুগত্যের দিক থেকে, নাকি খারাপ লোকদের অনুশোচনা?!
আপনাকে অবশ্যই জেনে রাখতে হবে যে; তারা আপনাকে সর্বত্র তাড়া করে বেড়াবে। তারা সর্বদাই আপনাকে যে কোন ভাবেই হোক খারাপ পথে ফিরয়ে নেয়ার চেষ্টা করবে।
আমাকে এক ব্যক্তি বলে যে, সে তাওবা করার পর তার এক সময়কার দুষ্ট বান্ধবীটি তার ড্রাইভারকে বলতো তুমি ওর পিছনে পিছনে গাড়ী নিয়ে যাও। সে মসজিদে যাবার পথে ঐ বান্ধবী গাড়ীর জানালা দিয়ে কথা বলার চেষ্টা করতো।
তবে ঈমানদার ব্যক্তিকে মহান আল্লাহ রক্ষা করবেন; এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন:
يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ ءَامَنُواْ بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَة (سورة إبراهيم: ٢٧)
“আল্লাহ তাদেরকে দৃঢ় পদ রাখবেন যারা ঈমান এনেছে পবিত্র তাওহীদের বাণীর প্রতি দুনিয়ার ও আখেরাতের জীবনে।” (সূরা ইবরাহীম: ২৭)
তারা চেষ্টা করবে আপনাকে অতীতের কথা স্মরণ করাতে এবং পূর্বের গুনাহকে চাকচিক্যময় করে তুলতে সব রকমের পন্থায়, স্মরণ করে ... ছবি ... চিঠিপত্র ... ইত্যাদির মাধ্যমে। আপনি তাদের কথা শুনবেন না। আপনি সতর্ক থাকবেন যেন তারা আপনাকে ফেতনায় না ফেলতে পারে।
আপনি এখানে বিখ্যাত সাহাবী কা'ব ইবনে মালেকের ঘটনা স্মরণ করুন। তিনি তাবুকের যুদ্ধে না যাওয়ার কারণে যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমস্ত সাহাবীকে তাকে বয়কট করে চলতে বলে ছিলেন, যতক্ষণ না আল্লাহর পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে অনুমতি আসে। তার নিকট গাস্সানের বাদশা চিঠি লিখে এ বলে, 'আমি জানতে পেরেছি যে, আপনার সাথী আপনার সাথে রুঢ় ব্যবহার করেছে। আল্লাহ আপনাকে অপমানিত করবেন না এবং শেষ করেও দিবেন না। সুতরাং আপনার উচিৎ আমাদের সাথে মিলে যাওয়া।' সে কাফের চেয়েছিল এ মুসলমানকে মদীনা থেকে বের করে নিয়ে নিজের দলে টেনে নিতে এবং সে যেন কাফেরের দেশে গিয়ে নষ্ট হয়ে যায়।
এখানে সম্মানিত সাহাবীর ভূমিকা কি? কা'ব বলেন, আমি তা পাঠ করে বললাম এটিও একটি পরীক্ষা, আমি সে চিঠিটি দলা পাকিয়ে চুলার মধ্যে ছুড়ে ফেলে পুড়িয়ে ফেললাম।
আপনিও এই রকম শক্ত হবেন, যে পুরুষ বা মহিলাই আপনাকে লিখবে তা পুড়িয়ে ফেলবেন, যেন তা ছাই হয়ে যায় এবং আপনি স্মরণ করবেন কিভাবে জাহান্নামে পুড়তে হবে সে কথা:
فَاصْبِرْ إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ وَلَا يَسْتَخِفَّنَّكَ الَّذِينَ لَا يُوقِنُونَ ﴾ (سورة الروم : ٦٠)
“অতএব, আপনি ধৈর্যধারণ করুন, নিঃসন্দেহে আল্লাহর ওয়াদা সত্য, আর এই অবিশ্বাসীরা যেন আপনাকে বিপথগামী করতে না পারে।” (আর-রূম: ৬০)
📄 তাওবা করা থেকে ফিরানোর হুমকি
আমি তাওবা করতে চাই কিন্তু আমার পুরাতন বন্ধুরা আমাকে হুমকি দিচ্ছে, তারা আমার কুকীর্তি মানুষের সামনে প্রকাশ করে দিবে এবং আমার গোপনীয় কার্যক্রম প্রকাশ করে দিবে। তাদের নিকট প্রমাণপত্র ও ছবি রয়েছে। আমি আমার মর্যাদার ব্যাপারে ভীত, শংকিত।
আমি বলছি, আপনি শয়তানদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করুন। নিশ্চয় শয়তানদের চক্রান্ত খুবই দুর্বল। যারা আজ আপনার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ এসব শয়তান ও তার দোসরদের চাপ থেমে যাবে অতঃপর খুব শীঘ্রই তারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে এবং মুমিনের ধৈর্য ও দৃঢ়তার সামনে তারা পরাজিত হবেই।
আপনি নিশ্চিত থাকুন যে, আপনি যদি তাদের কথা মত চলেন, তাদের কাছে মাথা নত করেন তাহলে তারা আরো বেশী বেশী প্রমাণ আপনার বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চেষ্টা করবে। সুতরাং পূর্বে ও পরে সর্বাবস্থায় আপনিই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। অতএব তাদের অনুসরণ না করে আল্লাহর সাহায্য চান এবং বলুন:
حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ (سورة آل عمران: ۱۷۳)
“আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম অভিভাবক।” (সূরা আলে ইমরান: ১৭৩) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোন সম্প্রদায়ের ক্ষতির আশংকা করতেন তখন বলতেন:
((اللَّهُمَّ إِنَّا نَجْعَلُكَ فِي نُحُورِهِمْ وَنَعُوذُبِكَ مِنْ شُرُورِهِمْ)) (مسند أحمد، أبو داود، صحيح الجامع)
“হে আল্লাহ! আমি আপনাকে তাদের গলার উপর ছেড়ে দিচ্ছি এবং আপনার নিকট পরিত্রাণ চাচ্ছি তাদের খারাপী থেকে।” (আহমাদ, আবু দাউদ, জামে' সহীহ ৪৫৮২)
একথা সত্য যে, অবস্থানটি খুবই কঠিন ঐ বেচারার জন্য যে তাওবা করেছে, তার সাথে তার খারাপ বন্ধুরা যোগাযোগ করে তাকে হুমকি দিয়ে বলে তোমার কথা আমরা রেকর্ড করে রেখেছি, তোমার ছবিও আমাদের নিকট রয়েছে, তুমি যদি আমাদের সাথে বের না হও তাহলে তোমার পরিবারের নিকট সব ফাঁস করে দিবো! একথা সঠিক যে, আপনার অবস্থান খুবই নাজুক।
দেখুন শয়তানের দোসরদের যুদ্ধ সেই সব গায়ক গায়িকা, নায়িকাদের বিরুদ্ধে যারা তাওবা করেছে। তারা তাদের খারাপ প্রোডাক্টগুলোকে বাজারজাত করে তাদের উপর চাপ দেয়ার জন্য এবং মানসিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টির লক্ষ্যে। কিন্তু আল্লাহ মুত্তাকিদের সাথে রয়েছেন, তাওবাকারীদের সাথে রয়েছেন এবং তিনি মুমিনদের অভিভাবক। তিনি তাদেরকে লাঞ্ছিত করবেন না এবং তাদেরকে ছেড়ে দিবেন না। তাঁর নিকট কোন বান্দা আশ্রয় নেয়ার পর কখনো অপমানিত হয়না। আপনি জেনে রাখুন, নিশ্চয় কঠিন অবস্থার সাথেই সহজ অবস্থা আসে এবং সংকীর্ণতার পরেই প্রশস্ততা আসে।
📄 পাপ আমার জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে
হে তাওবাকারী ভাই!
আপনার জন্য এই ঘটনাটি উল্লেখ করছি যা আমাদের কথার যথার্থতা প্রমাণ করবে। ঘটনাটি হলো, প্রখ্যাত ফেদায়ী (গেরিলা) সাহাবী মারসাদ বিন আবিল মারসাদ আল গানাবীর, যিনি দুর্বল মুসলমানদেরকে মক্কা থেকে গোপনে মদীনায় নিয়ে আসতেন। তিনি মক্কা থেকে দুর্বল বন্দী লোকদের গোপনে মদীনায় পৌছে দেয়ার ব্যবস্থা করতেন।
মক্কায় একজন নষ্টা মহিলা ছিল যার নাম আনাক এবং সে ছিল তার বান্ধবী। তিনি মক্কার একজন বন্দী লোককে ওয়াদা দিয়েছিলেন মদীনায় পৌছে দেয়ার। তিনি বলেন, এক চাঁদনী রাতে আমি মক্কার এক দেয়ালের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। আনাক আমার ছায়া দেখে এগিয়ে আসে এবং বলে, মারসাদ? আমি বললাম হাঁ, মারসাদ। সে বললো, মারহাবা, স্বাগতম, এস আমার কাছে রাত কাটাও। আমি বললাম, হে আনাক! আল্লাহ ব্যভিচারকে হারাম করেছেন। সে তখন চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো, হে তাবুবাসীরা! এই লোকটি তোমাদের বন্দীদেরকে নিয়ে ভাগতে চায়।
তিনি বলেন, আটজন লোক আমার পিছু নেয় এবং আমি তখন খান্দামা পাহাড়ে (মক্কার প্রবেশ পথের একটি পাহাড়) ঢুকে পড়ে এক গুহায় লুকিয়ে যায়, এরা আমার সন্ধানে আমার কাছে এসে পড়ে, কিন্তু আল্লাহ আমাকে এদের থেকে আড়াল করে রাখেন। তিনি বলেন, এরপর তারা ফিরে যায় এবং আমিও ঐ লোকটির নিকট গিয়ে তাকে বহন করে নিয়ে আসি। লোকটি ছিল বেশ ভারী, আমার অনেক কষ্ট হয়ে ছিল। তাকে কিছু দূরে বয়ে নিয়ে গিয়ে তার হাত পায়ের বাঁধন খুলে ফেলি। আমি অনেক কষ্টে তাকে মদীনায় নিয়ে আসি। এরপর আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বলি, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আনাককে বিয়ে করতে পারি? (কথাটি দুবার বললাম) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চুপ করে থাকলেন কোন জবাব দিলেন না। তখন এ আয়াত নাযিল হয়:
الزَّانِي لَا يَنكِحُ إِلَّا زَانِيَةً أَوْ مُشْرِكَةً وَالَّزَانِيَةُ لَا يَنكِحُهَا إِلَّا زَانٍ أَوْ مُشْرِك ﴾ (سورة النور : ٣)
“ব্যভিচারী পুরুষ ব্যভিচারিণী মহিলাকেই বিয়ে করে অথবা মুশরিকা মহিলাকে এবং ব্যভিচারিণী মহিলা ব্যভিচারী পুরুষ অথবা মুশরিক লোককেই বিয়ে করে থাকে।” (সূরা আনূর: ৩)
তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হে মারসাদ! ব্যভিচারী পুরুষই কেবল ব্যভিচারিণীকে অথবা মুশরিকা মহিলাকে বিয়ে করে থাকে এবং ব্যভিচারিণী মহিলাও একমাত্র ব্যভিচারী পুরুষ অথবা মুশরিক লোককে বিয়ে করে থাকে, সুতরাং তুমি তাকে বিয়ে করো না। (তিরমিযী ৩/৮০)
আপনি দেখলেন কিভাবে আল্লাহ তা'আলা ঈমানদারের পক্ষে প্রতিরোধ গড়লেন এবং তিনি মুহসিনদের (সৎকর্ম পরায়ণদের অথবা সৎকর্মশীল লোকদের) সাথে কি আচরণ করলেন? অবস্থা যদি খুবই খারাপ হয় যে, আপনি যা আশংকা করছেন তাই ঘটে আর এর ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজন পড়ে তাহলে আপনি আপনার অবস্থান বর্ণনা করুন, স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিন এবং বলুন, হ্যাঁ, আমি পাপ করতাম। এখন আল্লাহর নিকট তাওবা (প্রত্যাবর্তন) করেছি? এখন তোমরা কি চাও?
আমাদেরকে স্মরণ রাখতে হবে যে, প্রকৃত কেলেঙ্কারী তো হলো আল্লাহর সামনে কিয়ামতের দিনের কেলেঙ্কারী। সেই ভয়ানক দিনে যেদিন একশ, দু'শ, হাজার, দু'হাজার লোকের সমানে নয় বিশ্বের মানুষের সামনে, সমস্ত সৃষ্টিকুলের সামনে, ফেরেশতা, জিন ও ইনসান সবার সামনে হযরত আদম থেকে শুরু করে দুনিয়ার সর্বশেষ মানুষের সামনে।
আসুন আমরা হযরত ইবরাহীম আলাইহি ওয়া সাল্লামের দু'আ পাঠ করি:
وَلَا تُخْزِنِى يَوْمَ يُبْعَثُونَ يَوْمَ لَا يَنفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ ) (سورة الشعراء: ۸۷-۸۹)
“যেদিন সকলকে উত্থাপিত করা হবে সেদিন আমাকে লাঞ্ছিত করো না। যেদিন কোন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কাজে আসবে না। একমাত্র কাজে আসবে যে সঠিক অন্তঃকরণ নিয়ে উপস্থিত হবে।” (সূরা আশশুয়ারা: ৮৭-৮৯)
সংকট মুহূর্তে নবীর শেখানো দু'আ পড়ে নিজেকে হেফাজত করুন:
((اللَّهُمَّ اسْتُرْ عَوْرَاتِنَا وَآمِنْ رَوْعَاتِنَا اللَّهُمَّ اجْعَلْ ثَأْرَنَا عَلَى مَنْ ظَلَمَنَا، وَانْصُرْنَا عَلَى مَنْ بَغَى عَلَيْنَا ، اللَّهُمَّ لَا تُشْمِتْ بِنَا الأَعْدَاءَ وَلَا الْحَاسِدِينَ))
“হে আল্লাহ! আপনি আমাদের ইজ্জত রক্ষা করুন এবং আমাদের নিরাপদ রাখুন। হে আল্লাহ! আমাদের প্রতিশোধ তাদের উপর ফেলুন যারা আমাদের উপর জুলুম করেছে এবং আমাদেরকে সাহায্য করুন তাদের বিরুদ্ধে যারা আমাদের উপর চড়াও করেছে। হে আল্লাহ! আমাদের শত্রুদেরকে ও হিংসুকদেরকে আমাদের বিরুদ্ধে খুশি হতে দিয়েন না।”
আপনি হয়তো বলতে পারেন, আমি অনেক পাপ করেছি এবং আল্লাহর কাছে তাওবা করেছি। কিন্তু আমার পাপ আমাকে তাড়া করে চলেছে। যখন এসব পাপের কথা মনে পড়ে তখন আমার দম বন্ধ হয়ে আসে, আমার জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ে, আরামদায়ক বিছানাও কষ্টদায়ক মনে হয়, চিন্তায় রাত কাটে না, কোন কিছুতেই শান্তি পাই না, আমার শান্তির পথ কোন দিকে?
হে মুসলিম ভাই! আপনাকে বলছি, এই অনুভূতিই সত্যিকার তাওবারই প্রমাণ বহন করে এবং এটিই হলো প্রকৃত পক্ষে অনুতপ্ত হওয়া। অনুতপ্ত হওয়াটাই হলো তাওবা। সুতরাং যা ঘটে গেছে, সে ব্যাপারে আশাবাদী হোন যে, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করে দিবেন এবং আল্লাহর রহমতের ব্যাপারে নিরাশ হবেন না, তার করুণার ব্যাপারে হতাশ হবেন না। মহান আল্লাহ বলেন:
وَمَنَ يَقْنَطُ مِن رَّحْمَةِ رَبِّهِ إِلَّا الضَّالُونَ ﴾ (الحجر: ٥٦)
“পথভ্রষ্ট ব্যক্তিরা ব্যতীত অন্য কেউ আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হয় না।” (সূরা আল-হিজর: ৫৬)