📄 বারো মাসের নফল ইবাদত
বারো মাসের নফল ইবাদত
মাহে রমজানের এক মাস দিনে রাতে ফরজ নফল ইবাদতের মাধ্যমে প্রচুর সওয়াব অর্জনের পর বাকী এগার মাস তাকে ভুলে থাকলে তো চলবে না। বারো মাস রাসূল (সঃ) এর দেখানো, শেখানো পদ্ধতি অনুযায়ী আমল করে আসুন বারো মাস তাঁকে ভালোবাসি।
বার মাসের নফল ইবাদত : শাওয়াল মাসের ছয় রোজার মতো অন্যান্য মাসেও রাসূল (সঃ) রোজা করেছেন এবং অন্যকেও করতে বলেছেন।
মহররম মাস : হিজরী সালের প্রথম মাস মহররম মাস। এ মাসের দশ তারিখকে বলে আশুরা। এই দিনে আল্লাহর রাসূল রোজা রাখতেন এবং অন্যদেরকেও রোজা রাখার উৎসাহ দিতেন। রমজান মাসের রোজা ফরজ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এই রোজা রাসূল (সঃ) উপর ফরজ ছিল। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমি নবী করীম (সঃ)-কে (মাহে রমজান ভিন্ন) এই দিন বাদে অন্য কোনো দিনকে অধিক ফজিলতের বলে মনে করে রোজা রাখতে দেখিনি। (বুখারী মুসলিম)
আমীর মুয়াবিয়া একবার মিশরে দাঁড়িয়ে বললেন, “হে মদীনাবাসী! তোমাদের আলেমগণ কোথায়? আমি রাসূল (সঃ)-কে বলতে শুনেছি-এটি আশুরার দিন। আল্লাহ তোমাদের উপর এ দিনের রোজা ফরজ করেন নি। আমি রোজা রেখেছি তাই যার ইচ্ছা রোজা রাখতে পারে আর যার ইচ্ছা না-ও রাখতে পারে। (সহীহ বুখারী)
আর একবার এক ইহুদী আশুরার দিন রোজা আছে শুনে রাসূল (সঃ) বললেন-“তোমরা এ দিনে রোজা রাখ নাকি?
ইহুদি বলল, হ্যাঁ। এই দিনে আমরা রোজা রাখি। এটা পবিত্র দিন। এদিনে আল্লাহ তায়ালা দুশমন থেকে বনী ইসরাইলকে নাজাত দিয়েছেন। তাই মূসা (আঃ) এদিনে রোজা রেখেছেন।
নবী করীম (সঃ) বললেন-“তোমাদের তুলনায় মুসা (আঃ)-এর বেশি হকদার আমি। আগামী বছর থেকে এই সময় দুটি রোজা রাখব।”
সেই দিন থেকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এবং তাঁর সাহাবীরাও মহররম মাসে দুটি করে রোজা রাখতেন। অর্থাৎ মাসের ৯ ও ১০ দুটি রোজা আর আইয়ামে বিজের (মাসের ১৩, ১৪, ১৫) রোজা রাখতেন। তার মানে আমরা মহররম মাসে পাঁচটি রোজা রাখতে পারি। এই পাঁচটি রোজা ছাড়া মহররম মাসের অন্য কোনো আমল নির্ভরযোগ্য কোনো হাদিস গ্রন্থে উল্লেখ নেই। এছাড়া আর যা কিছু করা হয়। যেমন—
* তাজিয়া মিছিল বের করা।
* মাতম করা।
* খিচুড়ি রান্না করা।
* মসজিদে মিলাদ করা।
* বিশেষ পদ্ধতিতে নফল নামাজ পড়া।
এসবই বিদ’আত। আল্লাহ আমাদের বিদ’আতী আমল থেকে রক্ষা করুন। আমীন!
সফর মাস : সফর মাসে আইয়ামে বিজের রোজা ছাড়া আর কোনো রোজা নেই। এই মাসে চাঁদের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখের রোজা কয়টি ভালোবাসার নিদর্শন স্বরূপ করতে পারি। যা করতে পারলে সারা মাস রোজা রাখার সওয়াব পাওয়া যাবে। তবে কারো ফরজ ভাঙ্গা রোজা কিংবা মানতের রোজা থাকলে সে অবশ্যই এই রোজাগুলো করতে পারবে।
রবিউল আউয়াল মাস : এ মাস রাসূল (সঃ)-এর জন্ম এবং মৃত্যু মাস। তথাপি আইয়ামে বিজের রোজা ছাড়া এ মাসে কোনো রোজা নেই।
রবিউসসানি, জমাদিউল আউয়াল, জমাদিউসসানি এই মাসগুলোতেও আইয়ামে বিজের রোজাই একমাত্র নফল রোজা।
রজব মাস : এই মাসের ২৭ তারিখে রাসূল (সঃ)-এর মিরাজ সংঘটিত হয়েছিল। রজব মাস শুরু হলেই রাসূল (সঃ) এই দোয়াটি পড়তেন। “হে আল্লাহ! আমাদের জন্য রজব ও শাবান মাসে বরকত দান করুন এবং আমাদের রমজান মাস পর্যন্ত পৌঁছে দিন। রজব মাসেও আইয়ামে বিজের রোজা ছাড়া অন্য কোনো রোজার কথা নবী করীম (সঃ) বলেননি তাহাজ্জুদ ছাড়া অন্য কোনো নামাজের কথাও বলেননি।
শাবান মাস : শাবান মাস রমজান মাসের ইবাদতের প্রস্তুতির মাস। শাবান মাস পরলেই রাসূল (সঃ) বলতেন-“হে আল্লাহ! আমাদের জন্য শাবান মাসে বরকত দান করুন এবং আমাদের রমজান মাসে পৌঁছে দিন।
হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন-“অন্যান্য মাসের তুলনায় (রমজান বাদে) শাবান মাসের রোজা রাসূল (সঃ)-এর নিকট অধিক প্রিয় ছিল। কয়েকটি দিন বাদে রাসূল (সঃ) শাবান মাসের প্রায় পুরা মাসই রোজা রাখতেন।”
অবশ্য উম্মতকে বলেছেন-“শাবানের ১৫ তারিখের পর আর রোজা রেখ না।’ শাবান মাস যে বরকতময় মাস। এ মাসে রাসূল (সঃ) বেশি করে সিয়াম পালন করতেন। এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমরাও এ মাসে বেশি করে নফল সিয়াম পালন করতে পারি। এই বছরের জন্য এই মাসের ১৫ তারিখ শেষ নফল সিয়াম। এই রাতে নফল সালাত আদায় ও নিঃসন্দেহে সওয়াবের কাজ। আর নফল সালাত তো প্রতি রাতের জন্যই সওয়াবের আমল। কিন্তু তাই বলে শাবান মাসের ১৫ তারিখে শবে বরাত উপলক্ষে বিশেষ নিয়মে কোনো নফল নামাজের কথা সহী হাদিস কিংবা ফিকাহের কিতাবেও উল্লেখ নাই।
অতএব ভিত্তিহীন মনগড়া ইবাদাত আমরা কেন করব? রাসূল (সঃ) যে কাজ যেভাবে করতে বলেছেন, আমাদের সেইভাবেই সেই কাজ করতে হবে। তাহলেই তা হবে ইবাদাত। আর তখনই পাওয়া যাবে আল্লাহর ভালোবাসা। সেই ইবাদাতের কথা জানতে হলে আমাদের বেশি বেশি করে আল কুরআন আল-হাদিস পড়তে হবে। বিদ’আতী ফাসেকী থেকে দূরে থাকতে হবে।
রমজান মাস : বছরের শ্রেষ্ঠতম মাস রমজান। এ মাসে প্রতিটি ভালো কাজের প্রতিদান সত্তর থেকে সাত হাজার গুণ বৃদ্ধি করা হয়। এই মাসটি পুরাপুরিই সওয়াবের মাস। নেকীর মাস। আত্মশুদ্ধির মাস। কুরআন নাযিলের মাস। নিজেকে আদর্শ মানুষ রূপে এবং আল্লাহর খাঁটি বান্দা রূপে গড়ে তোলার মাস। এ মাসেই একটি রাত ‘লায়লাতুল কদর’ যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। অর্থাৎ হাজার মাস ইবাদাত করলে আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তায়ালাকে যতখানি খুশি করা যায়, এই এক রাতে তার চেয়েও বেশি তাঁর সন্তোষ হাসিল করা যায়।
শাওয়াল মাস : আল্লাহর সন্তুষ্টি আশা করা কোন কাজ আমাদের আপাতঃ দৃষ্টিতে যত ক্ষুদ্রই মনে হোক না কেন। আল্লাহ পাকের কাছে তা মোটেও ক্ষুদ্র নয়। তিনি বান্দার সেই ক্ষুদ্র আমলকে সাত থেকে সাত শত গুণ বৃদ্ধি করে আমলনামায় লিপিবদ্ধ করার নির্দেশ দেন ফেরেশতাদের রমজানের রোজা ফরজ রোজা। অবশ্য পালনীয় রোজা। ইচ্ছা করে ছেড়ে দিলে কবীরা গুনাহ। অস্বীকার করলে কাফির হয়ে যাবে। এ রোজা বিনা কারণে ছাড়লে কঠিন গোনাহের এবং কঠিন শাস্তির ঘোষণা দেওয়া আছে। এই রোজার সাথে জড়িয়ে আছে-মহান প্রভুর অসন্তুষ্টির ভয়। শাস্তির ভয়, ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাওয়ার ভয়।
আর শাওয়াল মাসের রোজা তো নফল মানে ঐচ্ছিক রোজা। আল্লাহ পাকের ভয়ে নয়, ভালোবেসে রোজা। প্রেমের রোজা, মহব্বতের রোজা, অতিরিক্ত করুনা পাওয়ার আশায় রোজা।
মনে করুন আপনার দুইজন কাজের লোক আছে। প্রথম জন আপনার তরফ থেকে নির্ধারিত সব কাজই করে অবসর সময় ঘুমায়। না হয় কোথাও বেড়াতে যায়। আর একজন আছে সেও নিষ্ঠার সাথে কাজ করে এবং অবসর সময়ে আপনার খেদমতে নিয়োজিত থাকতে চায়। আপনি প্রথম জনকে বেতন দেবেন কারণ যে তার প্রতি নির্ধারিত যে দায়িত্ব আছে তা সঠিকভাবে সম্পাদন করেছে। কিন্তু দ্বিতীয় জনকে বেতনের পরেও অতিরিক্ত কিছু দিতে আপনার ইচ্ছে করবে। সে যদি আপনার অতিরিক্ত খেদমত না করত তাহলে আপনি তার প্রতি অসন্তুষ্ট হতেন না কিন্তু কাজটা করার কারণে আপনি তার প্রতি অতিরিক্ত সন্তুষ্ট হয়েছেন। নফল ইবাদতগুলোও তেমনি। না করলে গুনাহ নেই কিন্তু করলে আল্লাহ পাক অতিরিক্ত খুশি হন। প্রমাণ হয় আপনি আল্লাহ পাককে শুধু ভয়ই পান না ভালোবাসেন।
হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূল (সঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি রমজানের সিয়াম পালনের পর শাওয়াল মাসের ছয়দিন সিয়াম পালন করল সে যেন সারা বছর সিয়াম পালন করল।”
হাদিসে বলা হয়েছে প্রতিটি নেক কাজ দশ গুণ বৃদ্ধি পায়। সেই হিসাবে রমজানের ত্রিশ রোজাকে দশগুণ করলে তিনশত দিনের রোজা হয়। তার সাথে শাওয়াল মাসের ছয় দিনের দশগুণ ষাট দিন। এই তিনশত ষাট দিন রোজা রাখার সমতুল্য হয়ে গেল। উল্লেখিত হাদিসের আলোকে শাওয়ালের ছয় রোজা তো রমজানের সমমর্যাদা পেয়ে যায়।
হযরত আশরাফ আলী থানভী (রহঃ) বলেন-“শাওয়ালের চাঁদের ঈদের দিন বাদ দিয়ে ছয়টি রোজা রাখা অন্যান্য নফল রোজা অপেক্ষা অধিক সওয়াব।” আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক বলেন, “প্রতি মাসে তিন দিন রোজা রাখার মত শাওয়ালের রোজাও মোস্তাহাব। কোন কোন হাদিসে এই রোজা রমজানের পর পরই রাখার কথা উল্লেখ রয়েছে।”
আমাদের দেশে একদল মুসলমান আছে যারা শাওয়াল মাসের ছয় রোজাকে বলে সাক্ষী রোজা। এই ছয় রোজা নাকি সাক্ষ্য দেবে যে আমি রমজানের ৩০ রোজা করেছি। তাদের অভিমত এই যে, ছয় রোজা না করলে রমজানের রোজার কোন মূল্য নেই। এতে তো রমজানের রোজার চেয়েও এর দাম বেশি হয়ে গেল। একথা ঠিক নয়। আর একদল আছে নফল রোজাকে তারা মোটেও গুরুত্ব দেয় না। তাদের ভাষ্য ফরজই ঠিকমত হয় না আবার নফল। এই ছয় রোজাকে তারা একেবারেই অপ্রয়োজন মনে করে। এই দুই দল লোকই ভ্রান্তির প্রান্ত সীমায় বাস করছে। নফল ইবাদতকে ফরজের উপর দাম দেওয়া যাবে না। সেই কাজের লোকের উদাহরণটা আবার পেশ করছি। লোকটি যদি তার উপর দেওয়া নির্ধারিত কাজগুলো না করে মনিবের অতিরিক্ত খেদমত করতে আসে তাহলে মনিব কি তার প্রতি সন্তুষ্ট হবে? মনিব তো তখন উল্টো রাগান্বিতই হবেন।
ফরজ বাদ দিয়া নফলেরও ঐ পরিণতি। আল্লাহকে খুশি করতে হলে ফরজ ইবাদতগুলো বান্দার প্রতি ন্যস্ত নির্ধারিত অবশ্য পালনীয় দায়িত্বগুলো আগে সম্পাদন করতে হবে। এটা অবশ্যই পালনীয় দায়িত্বের মধ্যে শুধু নামাজ রোজাই নয় আরও অনেক দায়িত্ব আছে। যেমন—(১) পর্দা করা ফরজ। (২) বাবা মায়ের সাথে ভাল ব্যবহার করা ফরজ। (৩) প্রতিবেশীর হকের প্রতি খেয়াল রাখা ফরজ। এমনি আরও অনেক ফরজ আছে যা কুরআন পাকে বিস্তারিতভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। কুরআন অর্থসহ বুঝে পড়াই হলো সব ফরজের বড় ফরজ। এই ফরজটা সঠিকভাবে আদায় করতে পারলেই আমরা ফরজ নফলের পার্থক্য ও গুরুত্ব বুঝতে পারব।
অতএব ফরজ বাদ দিয়ে নয়। ফরজের যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে তার সাথে নফল ইবাদতগুলো করতে হবে। আবার যারা নফল ইবাদতকে মোটেও গুরুত্ব দেয় না তারাও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিচ্ছেন না। আল্লাহ পাকের নৈকট্য লাভ করতে হলে ফরজের পাশাপাশি অবশ্যই নফল করতে হবে।
sারা বছরই নফল রোজা রাখা যায়। তার মধ্যে শাওয়ালের এই ছয় রোজা বিশেষ গুরুত্ব রাখে। এক মাস রোজা রাখার পর বান্দা যখন ক্লান্ত শ্রান্ত তখনও আল্লাহকে খুশি করার সামান্যতম সুযোগও বান্দা ছাড়ে না। এটাই প্রমাণ হয় এই ছয় রোজার দ্বারা। আল্লাহর রেজামন্দি হাসিলের জন্য শাওয়াল মাসের ছয় রোজার গুরুত্ব অপরিসীম। তাই আসুন আমরা রমজানের রোজার পর পরই শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রেখে পূর্ণ এক বছর রোজা রাখার সওয়াব অর্জন করি।
আল্লাহ পাক বলেন-“যে ক্ষুদ্রতম ভাল কাজ করবে তাও সে দেখতে পাবে।” (সূরা যিলযাল)
আল্লাহ পাক আমাদের ছোট বড় সর্ব প্রকার ভাল কাজ করার তৌফিক দান করুন। আমীন!
জিলকদ মাস : এ মাসে নির্দিষ্ট কোনো রোজা নেই। আইয়ামে বিজের রোজার মাধ্যমে সারা মাসের সওয়াব পেতে পারি। আইয়ামে বিজের রোজা তো মাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখ। কেউ যদি এই নির্দিষ্ট তারিখে রোজা না রাখতে পারে সে মাসের যে কোন দিন এই তিনটি রোজা রাখতে পারবে।
জিলহজ্জ মাস : জিলকদ মাসের পর তিনটি নিয়ামত নিয়ে আসে জিলহজ্জ মাস। এ মাসের প্রথম ৯ দিন নফল রোজার দিন বিশেষভাবে ৯ তারিখ। এই দিনকে বলে আরাফাহ দিবস। এই দিনটি ক্ষমার দিন। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন-“আরাফার দিন আল্লাহ যত অধিক সংখ্যক লোককে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন যা আর কোনো দিন দেন না। সে দিন তিনি বান্দার অতি নিকটবর্তী হয়ে যান এবং ফেরেশতাদের সাথে গর্ব করতে থাকেন। (মুসলিম)
এ দিনের রোজা সম্পর্কে রাসূল (সঃ) বলেন, “এ দিনে রোজা রাখলে পিছনের এক বছরের এবং সামনের এক বছরের গুনাহ মাফ হয়ে যায়। তবে এ দিন হজ্ব পালনকারীরা রোজা রাখবে না।
প্রথম নিয়ামত : এ মাস হজ্বের মাস? এ মাসের ৮, ৯, ১০, ১১, ১২ তারিখে হজ্ব সম্পন্ন হয়। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি অন্যতম স্তম্ভ এই হজ্ব। সারা বিশ্বের মুসলমানদের অন্তরে এই সময় আল্লাহ প্রেমের সাড়া পড়ে যায়। পবিত্র ইচ্ছা নিয়ে যখন সে হজ্বের সফরে যাবার জন্য তৈরি হয় তখন তার স্বভাব প্রকৃতি সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যায়। তার অন্তরে এই সময় আল্লাহ প্রেমের উদ্দীপনা স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে ওঠে। তার মনে তখন নেক ও পবিত্র ধারা ছাড়া অন্য কিছুই জাগতে পারে না। সে পূর্বে করা গুনাহ থেকে তওবা করে। সকলের কাছে ভুলত্রুটির ক্ষমা চায়। পরের হক নষ্ট করে থাকলে তা আদায় করে। আসল কথা হলো এটি একটি বিশাল সংশোধনী কোর্সের মাস। রাসূল (সঃ) বলেন-“যার হজ্ব ফরজ হয়েছে সে যদি হজ্বে না যায় তাহলে সে ইহুদি হয়ে মরল না নাসারা হয়ে মরল তা আমার দেখার বিষয় নয়।”
দ্বিতীয় নিয়ামত : এ মাস কুরবানীর মাস সূরা কাওসারে আল্লাহ বলেন-“তোমার রবের জন্য সালাত আদায় কর এবং কুরবানী করো।” আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বান্দা যখন কুরবানী করে আল্লাহ তখন অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন। হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূল (সঃ) বলেন-“কুরবানীর দিন মানুষ যে কাজ করে তার মধ্যে আল্লাহর নিকট সর্বাধিক পছন্দনীয় হচ্ছে রক্ত প্রবাহিত করা। (কুরবানী করা) কিয়ামতের দিন তা নিজের শিং, পশম ও ক্ষুরসহ উপস্থিত হবে। কুরবানীর পশুর রক্ত জমিনে পড়ার পূর্বেই আল্লাহর কাছে এক বিশেষ মর্যাদায় পৌঁছে যায়। অতএব তোমরা আনন্দিত মনে কুরবানী করো।” আর এক বর্ণনায় রাসূল (সঃ) বলেছেন-“কুরবানীকারীর জন্য প্রতিটি পশমের বিনিময়ে সওয়াব রয়েছে।” তবে স্মরণ রাখতে হবে লোক দেখানো কিংবা গৌরব প্রদর্শন বা গোশত খাওয়ার নিয়তে যেন কুরবানী না হয়।
তৃতীয় নিয়ামত : জিলহজ্জ মাস দ্বিতীয় ঈদের মাস ঈদের দিন আনন্দের দিন কিন্তু তারও একটা সীমা আছে। মুসলমানের ঈদ তো ইবাদাত। ঈদের নামাজের মাধ্যমে এই উৎসবের সূচনা। গরীবের হক আদায়ের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। ঈদের আনন্দ থেকে তারা যেন বাদ না পরে।
৯ই জিলহজ্জ থেকে ১১ই জিলহজ্জ পর্যন্ত রাসূল (সঃ) নিম্নোক্ত তাকবীর পড়তেন-“আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার। লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।”
আল্লাহ সবচেয়ে বড়, আল্লাহ সবচেয়ে মহান, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আল্লাহ মহান, আল্লাহ সর্বোচ্চ এবং সকল প্রশংসা তাঁর।
আসুন আমরা এই দোয়া পড়ি। আল্লাহর বড়ত্ব ও একত্ব স্বীকার করি, অন্তরে বিশ্বাস করি। সমস্ত সত্তা দিয়ে ভালোবাসি আর কুরবানীর মাধ্যমে তার প্রমাণ দেই। বিভিন্ন মাসের এই সব নফল রোজা ছাড়াও রাসূল (সঃ) সোমবার আর বৃহস্পতিবার রোজা রাখা পছন্দ করতেন।
ফরজ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পরে সর্বোত্তম নামাজ তা হলো তাহাজ্জুদের নামাজ নির্জন নিরিবিলিতে রাতের শেষ প্রহরে তাহাজ্জুদের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়। যে নৈকট্য বান্দার জন্য আল্লাহকে একমাত্র রব মানতে বাধ্য করে তোলে।
ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) বলেন-“ইবাদাত হলো চরম সীমার বিনয় ও ভালোবাসা সমষ্টির নাম।
এই চরম সীমার বিনয় ও ভালোবাসা যাদের মধ্যে আছে তারাই মুত্তাকী, তারাই মহসিন। তাই তো আল কুরআনের পাতায় পাতায় দেখি আল্লাহ মুত্তাকীদের ভালোবাসেন। আল্লাহ মহসিনদের ভালোবাসেন। আল্লাহ তাওবাহকারীদের ভালোবাসেন। এসব আয়াতে এ কথাই বুঝা যায় যে সত্যিকরের মুমিন ব্যক্তিকে আল্লাহ ভালোবাসেন। আর তাদেরকেই বলেন-
يَايَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ - ارْجِعِي إِلَى رَبِّكِ رَاضِيَةً مَّরْضِيَّةً - فَادْখُلِي فِي عِبُدِي - وَادْخُلِي جَنَّتِي -
হে প্রশান্ত আত্মা! তোমার রবের দিকে চল এমন অবস্থায় যে (ভাল পরিণতির জন্য) তুমি সন্তুষ্ট এবং তোমার রবের নিকট প্রিয় পাত্র। আমার নেক বান্দাদের মধ্যে শামিল হও। এবং প্রবেশ করো আমার জান্নাতে। (সূরা ফজর : ২৭-৩০)
প্রভু আমাকে তোমার নেক বান্দাদের মধ্যে শামিল করে নাও। নাফসে মুতমাইন্নাহর অন্তর্ভুক্ত করো। আমি শুধু তোমাকেই ভালোবাসি। ফজর থেকে এশা আমি তোমাকেই ভালোবাসি নির্জন রাতের শেষ প্রহরের তাহাজ্জুদে আমি তোমাকেই ভালোবাসি। শুক্র থেকে বৃহস্পতি পর্যন্ত আমি তোমাকেই ভালোবাসি। মহররম থেকে জিলহজ্জ বারো মাস আমি তোমাকেই ভালোবাসি।
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِيْنَ -
নিশ্চয়ই আমার নামাজ আমার কুরবানী আমার জীবন আমার মৃত্যু সব মহান রাব্বুল আলামীনের জন্য।
এই হাওয়ার কন্যাটি শুধুই তোমার।