📘 আমি বারো মাস তোমায় ভালবাসি 📄 ভালোবাসার পরীক্ষা

📄 ভালোবাসার পরীক্ষা


ভালোবাসার পরীক্ষা

ভালোবাসার এই পরীক্ষা কম-বেশি করে আল্লাহর সব বান্দাকেই দিতে হয়েছে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ, স্ত্রী-পুত্র পরিত্যাগ, কিশোর পুত্রকে কুরবানী করার নির্দেশ দানের মাধ্যমে আল্লাহ ইব্রাহিম (আঃ)-কে পরীক্ষা করেছেন। বিভিন্ন পদ্ধতিতে নবী-রাসূল সবাইকেই ভালোবাসার পরীক্ষা দিতে হয়েছে। সাহাবীদের দিতে হয়েছে। যেই আল্লাহ এবং তার রাসূলকে ভালোবাসার দাবী করবে, তাকেই পরীক্ষা দিতে হবে।

ভালোবাসার তিনটি পর্যায়-অন্তরে ভালোবাসা, মুখে স্বীকার করা আর কার্যে তার প্রমাণ দেয়া। অন্তরে ভালোবাসলে আর মুখে স্বীকার করলেই আল্লাহ সেই ভালোবাসা কবুল করেন না। রাসূল (সঃ) এর পূর্ণ আনুগত্য এবং জিহাদ ফি-সাবিলিল্লাহ বা ইসলামী আন্দোলনে পরিপূর্ণ শরীক হয়ে সেই ভালোবাসার প্রমাণ দিতে হবে।

হযরত কা’ব অন্তরে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসতেন মুখে স্বীকার করতেন শুধু বাস্তবে প্রমাণ দিতে একবার গাফলতি করেছিলেন। তারপরই তার উপর আসে কঠিন পরীক্ষা। বুদ্ধিমান বিচক্ষণ হযরত কা’ব (রাঃ) বুঝতে পেরেছিলেন একবার গাফলতি করে যে সর্বনাশ করেছি-সেই সর্বনাশের মাত্রা আর বৃদ্ধি করা যাবে না। তাই তো নিজের ভুল স্বীকার করে মাথা পেতে নিয়েছেন কঠিন দণ্ড। এক চুলও বিচ্যুতি হননি আদর্শ থেকে। নিজের ধন-সম্পদ নজরানা দিয়েছেন কাফফারা স্বরূপ।

📘 আমি বারো মাস তোমায় ভালবাসি 📄 ইবলিশের ধোকা

📄 ইবলিশের ধোকা


ইবলিশের ধোকা : আমাদের জন্য শত্রু, চিরশত্রু ইবলিশ

ইবলিশের একমাত্র কাজই হলো আদম সন্তানকে পথভ্রষ্ট করা। সে তার দায়িত্ব পালনে কখনো গাফলতি করে না। সেই ইবলিশ শয়তান আমাদের ইবাদাতকে বিদ’আতে পরিণত করার জন্য সর্বক্ষণ সচেষ্ট।

রাসূল (সঃ) বলেছেন-“তোমরা সকল নতুন সৃষ্ট বিষয়সমূহ থেকে দূরে থাকবে। কারণ সকল নতুন সৃষ্ট বিষয়ই বিদ’আত। আর প্রতিটি বিদ’আতই হচ্ছে পথ ভ্রষ্টতা।” (মুসনাদে আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)

ইবলিশের ধোকার পদ্ধতিই হলো মানুষকে জান্নাতের লোভ দেখিয়ে এমন কাজ করার প্ররোচনা দেয় যা তাকে জাহান্নামে নিয়ে ছাড়ে।

হযরত আদম ও হাওয়া (আঃ)-কে সে জান্নাতে থাকার লোভ দেখিয়েই আল্লাহর হুকুম অমান্য করিয়ে ছিল। সেই শয়তানের ওয়াসওয়াসায় আজও আদম হাওয়ার সন্তানেরা শিরক বিদ’আতীতে জড়িয়ে যায়। শয়তান তো দুই প্রকার। জ্বীন শয়তান আর মানুষ শয়তান। উভয় শয়তানই এই কাজে তৎপর। যেসব কাজ রাসূল (সঃ) করেন নি সেই সব কাজকে সওয়াবের কাজ হিসাবে প্রচার করে মুসলিম সমাজকে বিদ’আতের জালে এমনভাবে জড়িয়ে ফেলেছে যে এর বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলে এক শ্রেণীর মুসলমান নামধারি মানুষই হইচৈ করে ওঠে।

শয়তান বিদ’আতীতে তাদেরই জড়াতে পারে যারা রাসূল (সঃ)-এর রেখে যাওয়া ‘দুটি জিনিস’ যা তিনি শক্ত করে ধরে রাখতে বলেছিলেন তা শক্ত করে ধরে রাখে নি। কুরআন ও সুন্নাহ থেকে তারা বহুদূরে সরে গেছে।

রাসূল (সঃ) যেভাবে কুরআন পড়তে বলেছেন সেভাবে কুরআন পড়ে না। তারা না বুঝে সুর করে দুলে দুলে কুরআন তেলাওয়াত করে আর খতমের পর খতম করে। আর বখসে দেয় কবরবাসী আত্মীয়-স্বজনের প্রতি।

আর রাসূল (সঃ) বলেছেন-“কুরআনে পাঁচ ধরনের আয়াত আছে। হালাল, হারাম, মুহকাম মুতাশাবিহ ও আমছাল।

তোমরা হালালকে হালাল জেনে গ্রহণ করবে। হারামকে বর্জন করবে। মুহকাম অনুযায়ী আমল করবে। মুতাশাবিহের ওপর ঈমান আনবে। আর আমছাল থেকে উপদেশ গ্রহণ করবে। লোকেরা বলল-হে আল্লাহর রাসূল! মুহকাম, মুতাশাবিহ ও আমছাল আমাদের বুঝিয়ে দিন। রাসূল (সঃ) বললেন-“মুহকাম আয়াত ঐসব আয়াত যা স্পষ্ট হুকুম-আহকাম সম্বলিত পড়লেই বুঝা যায়। অতএব তোমরা সেই অনুযায়ী কাজ করবে। মুতাশাবিহ হচ্ছে ঐসব রূপক আয়াত যা স্পষ্ট বুঝা যায় না। যেমন-আরশ, কুরসি, ফেরেশতা এমনি আরো যেসব কথা আমাদের বুঝে আসে না তার উপর ঈমান আনবে।

আমছাল হচ্ছে ঐসব আয়াত পুরানো দিনের ঘটনা তুলে উপদেশ দেয়া হয়েছে। যেমন-আদজাতি, সামুদ জাতির কাহিনী। ফেরাউনের স্ত্রী খাঁটি মুমিন আর লুত (আঃ) স্ত্রী পাক্কা কাফের। এমনি আরো অনেক উপদেশমূলক কাহিনী আছে। এইসব আমছাল আয়াত। এইসব আয়াত থেকে উপদেশ নিতে হবে।” রাসূল (সঃ)এর উপরোক্ত হাদিস অনুযায়ী কুরআন পড়লে কুরআন থেকে হেদায়েত পাওয়া সম্ভব। ইবলিশ শয়তান আর মানুষ শয়তান কোনো শয়তানই তাকে গোমরাহ করতে পারবে না।

কিন্তু ইবলিশ অনেক মানুষকেই তার অনুসারী করে ফেলেছে। তারা অর্থসহ বুঝে-সুঝে কুরআন পড়তে চায় না। এদেরই শয়তান বিদ’আতীতে জড়াতে পারে। কুফরি করাতে পারে।

বুখারী শরীফের একদম শেষ হাদিসটি হলো “এমন একটি বাক্য আছে যা রাব্বুল আলামীনের কাছে অত্যন্ত পছন্দনীয়। মুখে উচ্চারণ করতে সহজ কিন্তু মিজানে সবচেয়ে ভারী হবে। বাক্যটি হলো সুবহানাল্লাহি অবিহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আজিম।” (এই দোয়াটি বেশি বেশি করে পড়া উচিত।)

এই হাদিসটির আগের হাদিস হলো, রাসূল (সঃ) বলেছেন-“আমার উম্মাতের মধ্যে এমন কিছু মানুষ আছে যারা কুরআন সুললিত কণ্ঠে পড়বে কিন্তু তা তাদের কণ্ঠনালী অতিক্রম করবে না। (অর্থাৎ অন্তরে প্রবেশ করবে না) এরা আমার দ্বীন থেকে বের হয়ে গেছে।”

যারা কুরআনের অর্থ বুঝে পড়ে না তাদেরই তো অন্তরে প্রবেশ করে না কুরআনের বাণী। আর ইবলিশ তাদেরকেই দিয়েই পারে একটার পর একটা বিদ’আতী করাতে। তা আবার ইবাদতের নামে। (আমার লেখা বিদ’আতের বেড়াজালে ইবাদাত’ বইটি পড়ার অনুরোধ করছি।

📘 আমি বারো মাস তোমায় ভালবাসি 📄 নফল ইবাদত

📄 নফল ইবাদত


নফল ইবাদত

নফল শব্দের অর্থ অতিরিক্ত। ফরজের পরে যা কিছু করা হয় তাই অতিরিক্ত। যা করলে সওয়াব আছে না করলে গুনাহ নেই।

একটি বিখ্যাত হাদীসে কুদসীতে আছে। “নফল ইবাদতের মাধ্যমে বান্দাহ আমার নিকটবর্তী হয়ে যায়। এভাবে সে আমার প্রিয় হয়ে ওঠে। এমনকি এক সময় আসে যখন আমি তার কান হয়ে যাই যা দিয়ে সে শোনে। আমি তার চোখ হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে।”

অর্থাৎ বান্দাহ তখন এমন একটা পর্যায়ে আসে যে আল্লাহর অপছন্দনীয় কাজ সে করে না, শোনে না, দেখেও না। যা কিছু আল্লাহ পছন্দ করে তাই সে করে। আর আখেরাতে আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভের আশা পোষণ করে। দিনরাত সর্বক্ষণ সে আল্লাহকেই ভালোবাসে।

কিন্তু নফল ইবাদতের নামে কিছু মানুষ এমন সব কাজ করে, এমন সব নামাজ পড়ে যার উল্লেখ কুরআন, হাদিস, রাসূলুল্লাহর জীবনী, সাহাবাদের জীবনী কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

বার চান্দের ফজিলত, নেক আমল, মকসুদুল মুমিনীন প্রভৃতি পুস্তকে তা আবার এমন সবিস্তারে বর্ণনা করা হয়েছে যে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হবেই। এইসব গ্রন্থ প্রণেতাদের ওপর আল্লাহ রহম করুন। হেদায়েত দান করুন। জানি না কি উদ্দেশ্যে তারা এইসব বিদ’আতী কথাবার্তা লিখেছেন। যা হাদিস না তাই হাদিস বলে চালিয়ে দিয়েছেন।

অথচ রাসূল (সঃ) বলেছেন, “যা আমার কথা নয় তাই যদি কেউ আমার নামে বলে সে যেন জাহান্নামে তার ঘর তৈরি করে নিল।”

এইসব গ্রন্থ প্রণেতার বিভিন্ন মাসের, দিনের, রাতের হরেক রকম নামাজ এবং নামাজের সে সব নিয়ম লিখেছেন-অবাক হতে হয় এসব তারা পেলেন কোথায়?

‘মকসুদুল মুমিনীন’ বইখানিতে ইবাদতের নামে এমন সব উদ্ভট কথা ও কাজের কথা বলা হয়েছে যার সাথে কুরআন এবং হাদিসের নূন্যতম সম্পর্ক নেই। তাহলে এইসব বিদ’আতী আমল করে কিভাবে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের ভালোবাসা পাওয়া যাবে?

কিছু ইবাদাত আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তায়ালা অবশ্য পালনীয় বা ফরজ করে দিয়েছেন। যা না করলে কবীরা গুনাহ এবং অস্বীকার করলে কাফের হয়ে যেতে হয়। যেমন-প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ রমজানের এক মাস রোজা, মালদার হলে বছরে একবার মালের জাকাত, জীবনে একবার হজ্ব, পর্দা বা হিজাব পরিধান করা ইত্যাদি। আর কিছু ইবাদাত আছে যা না করলে কোন গুনাহ নেই কিন্তু করলে আল্লাহ পাক অত্যন্ত খুশী হন। ফরজ ইবাদতের পর সাধ্যমত নফল সালাত, সিয়াম, দান-সাদকাহ করলে আল্লাহ বান্দার উপর অতিরিক্ত খুশি হন। তাঁর নৈকট্য হাসিল করা যায়।

📘 আমি বারো মাস তোমায় ভালবাসি 📄 নফল নামাযের ব্যাপারেও তেমনি

📄 নফল নামাযের ব্যাপারেও তেমনি


নফল নামাজের ব্যাপারেও তেমনি

প্রতিদিন অবশ্য পালনীয় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। আল্লাহর কাছে অত্যন্ত পছন্দের নামাজ 'তাহাজ্জুদ' এই নামাজ বা সালাত আদায় করার আলাদা কোনো নিয়ম নেই। নির্দিষ্ট কোনো সুরা ও নেই। অন্যান্য সুন্নাত নামাজের মতোই। রাতের শেষ প্রহরে এই নামাজের সময়। রাসূল (সঃ) এর জন্য তাহাজ্জুদ ওয়াজিব ছিল। আমাদের জন্য নফল। দুই দুই রাকাত করে দুই, চার, ছয়, কিংবা আট রাকাআত পড়ে তার পর বিতর পড়তে পারি। সুরা ফাতিহার সাথে যে কোন সূরা মিলিয়ে এই নামাজ পড়া যায়। রাসূল (সঃ) তাহাজ্জুদ নামাজ বড় বড় সুরা দিয়ে পড়তেন। এক হাদিসে উল্লেখ আছে একদিন রাসূল (সঃ)-কে মসজিদে নববীতে তাহাজ্জুদ নামাজরত অবস্থায় দেখে এক সাহাবী তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে গেলেন নামাজ পড়ার জন্য। রাসূল (সঃ) তখন সুরা বাকারা পড়ছিলেন, সাহাবী মনে করলেন বাকারার পড়ার নিশ্চয়ই রুকুতে যাবেন। কিন্তু সুরা বাকারা শেষ করে আল্লাহর রাসূল সূরা আল ইমরান ধরলেন। সাহাবী মনে করলেন সূরা আল ইমরান শেষ করে অবশ্যই রুকুতে যাবেন। রাসূল (সঃ) কিন্তু সূরা আল ইমরান শেষ করে যখন আল্লাহর রাসূল সূরা নিসা পড়তে শুরু করলেন সাহাবী তখন আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। পেছন থেকে সরে এলেন। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে কখনও রাসূল (সঃ) এর দু'খানা পা ফুলে যেত।

আমরা অত বড় সূরা দিয়ে পড়তে না পারলেও আমাদের জানা ছোট ছোট একাধিক সূরা মিলিয়ে রাকাত বড় করতে পারি।

এই নামাজেও সময় আল্লাহর তরফ থেকে ঘোষক ঘোষণা করতে থাকে— গুনাহ মাফ চাওয়ার মতো কেউ আছ কি? আল্লাহ গুনাহ মাফ করে দেবেন। তওবা করার মতো কেউ আছ কি? আল্লাহ তার তওবা কবুল করে নেবেন। অসুস্থ কেউ আছ কি? আল্লাহ তাকে সুস্থতা দান করবেন। অভুক্ত কেউ আছ কি? আল্লাহ তাকে রিজিক দান করবেন। এইভাবে সকাল পর্যন্ত চলতে থাকে।

সারা দুনিয়া যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন যারা আল্লাহকে ভালোবেসে এবং ভালোবাসা পাওয়ার আশায় দাঁড়িয়ে থাকে রুকু সেজদা করে তাদের নিশ্চয়ই আল্লাহ ভালোবাসেন।

তিনি তো বলেছেন, যে আমার দিকে এক পা আসে আমি তার দিকে দশ পা যাই। যে আমার দিকে হেঁটে আসে আমি তার দিকে দৌড়ে যাই।

আসুন ফরজ ইবাদতের পর বিভিন্ন নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহকে ভালোবাসি দিনে-রাতে সর্বক্ষণ।

ফন্ট সাইজ
15px
17px