📄 ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার
ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার
আমি তখন মাদারীপুর জেলার রাজৈর থানার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম কিংবা অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী। কিছু দূরে নদীর ওপারে বয়েজ স্কুল। সেই স্কুলের ক্লাস টেনের ফাস্ট বয় আরিফ। আরিফের বাবা যখন মারা যায় তখন আরিফ খুব ছোট। অনেক কষ্টে আরিফের মা আরিফকে লালন-পালন করেছেন। আরিফের বয়স এখন ১৫/১৬ বছর হবে। ইচ্ছে করলে আরিফকে কোথাও কাজে লাগিয়ে দিয়ে আয় রোজগার করাতে পারত। কিন্তু তা না করে নিজে অন্যের বাড়িতে কাজ করে, খেয়ে না খেয়ে আরিফকে মানুষ করার স্বপ্ন দেখেন আরিফের মা। কিন্তু আরিফ মাঝে মাঝে মায়ের সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করে। মা তখন খুব কষ্ট পান। আঁচলে চোখ মোছেন আর চুপ করে থাকেন। নালিশের জায়গা তো নেই। আরিফের বাবা থাকলে না হয় বলা যেতো তোমার ছেলে এমন করল কেন?
একদিন কি নিয়ে কথা কাটাকাটি হতেই আরিফ মাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল কোমরে ব্যথা পেলেন আরিফের মা। স্কুলের হেড মাস্টার যাচ্ছিলেন আরিফদের বাড়ির পাশ দিয়ে। আরিফের মায়ের কান্না শুনে তিনি বাড়ি ঢুকলেন।
হেড স্যারকে দেখে ভীত-সন্ত্রস্ত আরিফ দ্রুত বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলেন। হেড স্যার আরিফের মায়ের কাছে সব শুনলেন। স্কুলে এসে দেখলেন আরিফ আসেনি। নাইন টেনের সব ছেলেদের ডেকে বল্লেন- “আজ তোমাদের কোনো ক্লাস হবে না। তোমরা সবাই আরিফকে খুঁজতে বের হবে। যেভাবে পার তোমরা ওকে আমার সামনে হাজির করো। ছেলেরা সব বের হয়ে গেল আরিফকে খোঁজার জন্য। অল্প সময়ের মধ্যেই ছেলেরা আরিফকে নিয়ে হাজির হলো। হেড স্যার কিছুক্ষণ আরিফের দিকে তাকিয়ে থাকলেন তারপর সদ্য কেনা মাঝারি সাইজের একটা সিলভারের কলসী এক ছেলের হাতে দিয়ে বল্লেন “এই কলসীটায় মাটি ভর্তি করে এনে দড়ি দিয়ে বেঁধে আরিফের গলায় ঝুলিয়ে দে।”
মুহূর্তের মধ্যে ছেলেরা হেড স্যারের হুকুম তামিল করে ফেল্ল। হতভম্ব আরিফ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল। কেউ কেউ হাসতে লাগল। অসম্ভব গম্ভীর হেড স্যার। বল্লেন, “এইভাবে তুই থাকবি। তোর মা এইভাবে দশ মাস ছিল তোকে গর্ভে নিয়ে। তুই দশদিন থাকবি। এইভাবে তুই ক্লাস করবি, পড়বি। বাড়ি যাবি, হাটে বাজারে যাবি। খাওয়া দাওয়া খেলাধুলা সব করবি। যা এখন ক্লাশে যা----।
বিশ ত্রিশ মিনিট যেতে না যেতেই কার কাছে যেন খবর পেয়ে আরিফের মা পাগলের মতো ছুটে এলো। হেড স্যারের কাছে জোড় হাত করে কাঁদতে কাঁদতে বল্ল, “স্যার আমার আরিফকে মাফ করে দেন ও আর কোনো দিন আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করবে না।”
আরিফের মায়ের কথা শুনে হেডস্যারসহ সবাই কাঁদতে লাগলো। হেড স্যার বল্লেন-“আহারে এই দরদী মায়ের সাথে কেও খারাপ ব্যবহার করে?.........
জানিনা এর পরে আরিফ তার মায়ের সাথে কেমন ব্যবহার করেছে?
আমার কথা হলো আমরা সবাই বুঝি মায়ের সাথে ভালো ব্যবহার করা উচিত। মাকে ভালোবাসা উচিত। মায়ের সাথে কেমন আচরণ করতে হবে? তার অনেক দিক-নির্দেশনা রাসূল (সঃ) আমাদের দিয়েছেন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আল-কুরআনে মায়ের সাথে ভালো ব্যবহার নির্দেশ দিয়েছেন।
মায়ের সাথে ভালো ব্যবহার করতে হবে, ভালোবাসতে হবে কারণ :
(১) মা আমাকে গর্ভে ধারণ করেছে।
(২) কষ্টের উপর কষ্ট সহ্য করে প্রসব করেছেন।
(৩) দুগ্ধপান করিয়ে আমাকে বাঁচিয়েছেন।
(৪) অপার স্নেহ-মমতায় আমাকে লালন-পালন করেছেন।
(৫) আমি অসুস্থ হলে রাত জেগে আমার সেবা-যত্ন করেছেন।
(৬) সর্বান্তকরণে আমার কল্যাণ কামনা করেছেন।
(৭) আমার ভবিষ্যৎ সুখের জন্য নিজের সুখ-শান্তি বিসর্জন দিয়েছেন।
(৮) আমাকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন।
(৯) নিজে কষ্ট করে আমাকে শান্তিতে রাখার চেষ্টা করেছেন।
(১০) নিজে না খেয়ে আমাকে খাইয়েছেন।
(১১) এর জন্য কোনো প্রতিদান তিনি চান নি।
আরও অনেক অবদান তার যার প্রতিদান দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। তাই আমার ভালোবাসা পাওয়া তার হক-তাঁর অধিকার। তাকে ভালোবাসা আমার দায়িত্ব আমার কর্তব্য।
কিন্তু কথা হলো-
* আমাকে যিনি মায়ের গর্ভে জন্ম দিলেন।
* সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে আমাকে তৈরী করলেন।
* জন্মের পূর্বেই মায়ের বুকে আমার খাদ্যের ব্যবস্থা করলেন।
* মা-বাবার অন্তরে স্নেহ-মায়া ঢেলে দিলেন।
* আলো দিলেন, বাতাস দিলেন।
* ফল ফসল পানি দিলেন।
* ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন দিলেন।
* ঘর-সংসার, স্বামী সন্তান সুস্থ শরীর, সুষ্ঠু জ্ঞান, সচ্ছলতা, সম্মান, ইজ্জত, মর্যাদা আখেরাতের কল্যাণের জন্য নবী-রাসূল আর কিতাব দিলেন।
* যার দয়া ছাড়া একটা মুহূর্ত টিকে থাকা সম্ভব নয়। সেই মহান দরদী! বিশ্বজাহানের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ সুবহানাল্লাহকে?
সমাজে একটা কথা প্রচলিত আছে। যার নুন খাই তার গুণ গাই। তাহলে যার সব খাই-যার দয়া বিনে উপায় নাই। তাঁর গুণ কি পরিমাণে গাওয়া উচিত? তাঁর আনুগত্য কি পরিমাণ করা উচিত? তারপর আমাদের আল্লাহর কাছেই ফিরে যেতে হবে।
* পৃথিবীতে কৃত আমাদের প্রতিটি কাজের জন্য জবাবদিহি করতে হবে।
* তিনি যেমন পরম দয়ালু তেমনি কঠিন শাস্তিদাতা। ন্যায় বিচারক। তার সামনে সুপারিশ করার মতো কেউ নেই।
* নিজের ইচ্ছা বাস্তবায়ন করতে কারো সাহায্যের তার প্রয়োজন নেই। তিনি অমুখাপেক্ষি।
* তাহলে কি পরিমাণ ভয় তাঁকে করতে হবে? কি পরিমাণ বিশ্বাস স্থাপন তাঁর উপর করা উচিত?
বিশ্বাস বা ঈমানের আর এক নাম ভালোবাসা আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা হতে হবে ভীতি আর বিশ্বাস মিশ্রিত।
📄 আল্লাহকে ভালোবাসার নিদর্শন
আল্লাহকে ভালোবাসার নিদর্শন
قُلْ إِنْ كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالٌ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ - وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ -
“হে নবী! ওদের বল-তোমাদের মাতা-পিতা সন্তান, ভাই, স্বামী-স্ত্রী, আত্মীয়-স্বজন, তোমাদের ধন-সম্পদ যা তোমরা অর্জন করেছ, তোমাদের ঐ ব্যবসা-বাণিজ্য যার মন্দ হয়ে যাবার ভয় করো, তোমাদের সেই ঘর-বাড়ি যা তোমরা পছন্দ করো-এসব যদি তোমাদের নিকট আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা থেকে বেশী প্রিয় হয়ে থাকে তাহলে আল্লাহর চূড়ান্ত ফায়সালা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো।” (সূরা তাওবা : ২৪)
অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তায়ালা তাঁকে ভালোবাসার নিদর্শন হিসাবে দুটি বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন।
(১) রাসূলের প্রতি ভালোবাসা।
(২) জিহাদ ফি-সাবিলিল্লাহ।
📄 রাসূলের (সাঃ) প্রতি ভালোবাসা
রাসূলের প্রতি ভালোবাসা
আল্লাহকে ভালোবাসি একথা বললেই ভালোবাসা হয় না। আল্লাহকে ভালোবাসার প্রমাণই হলো তাঁর রাসূল (সঃ)-এর পূর্ণ আনুগত্য করা।
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ - وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ -
আল্লাহ বলেন-“বলো (হে নবী)! যদি তোমরা সত্যকারভাবে আল্লাহকে ভালোবাসো তবে আমার আনুগত্য করো। আল্লাহ তোমাদের তাঁর প্রিয় বান্দা হিসাবে কবুল করে নেবেন।” (সূরা আল-ইমরান : ৩১)
কারণ নবী (সঃ) তো সেই কাজেরই হুকুম দিয়ে থাকেন এবং নিজেও সেই সব কাজ করেন। যেসব কাজ করতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন বা পছন্দ করেন। আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তায়ালা আল-কুরআনে যা কিছু আদেশ-নিষেধ, উপদেশ দিয়েছেন তার প্রত্যেকটি কাজ রাসূল (সঃ) নিজে বাস্তবে করে দেখিয়েছেন। এইজন্যই তো রাসূল (সঃ) এর চরিত্র কেমন ছিল। জনৈক ব্যক্তির এই প্রশ্নের উত্তরে হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেছিলেন-“তুমি কি কুরআন পড়নি? আল-কুরআনই ছিল রাসূল (সঃ)-এর চরিত্র।
রাসূল (সঃ)-কে ভালোবাসা সম্পর্কে স্বয়ং রাসূল (সঃ) বলেন। সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার জীবন। তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তার নিকট তার সন্তান তার পিতামাতাসহ অন্যান্য মানুষের চেয়ে বেশী প্রিয় না হবো।” (বুখারী, মুসলিম)
আর একটি হাদিসে উল্লেখ রয়েছে-হযরত ওমর (রাঃ) রাসূলুল্লাহকে সম্বোধন করে বললেন-“হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার জীবন ছাড়া আর সকল জিনিস থেকে আপনাকে বেশি ভালোবাসি।
তখন রাসূল (সঃ) ইরশাদ করলেন-“না, হে ওমর! তুমি পাক্কা মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না আমি তোমার নিকট তোমার জীবন থেকেও বেশি প্রিয় হবো।”
একথা শুনেই ওমর উচ্চস্বরে বলে উঠলেন।
“আল্লাহ সাক্ষী, হে রাসূল! আপনি আমার জীবনের চেয়েও আমার নিকট বেশি প্রিয়। (বুখারী, মুসলিম)
তার আদেশ-নিষেধের তোয়াক্কা না করে শুধু মুখে ভালোবাসার দাবী করলেই ভালোবাসা হয় না। একদিন জনৈক সাহাবী এসে বল্লেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনাকে ভালোবাসি। রাসূল (সাঃ) বললেন-“আরো ভাবনা-চিন্তা করে কথা বলো।” সেই ব্যক্তি আবার বলল, “হে রাসূল! আমি ভাবনা-চিন্তা করেই বলছি আপনাকে আমি ভালোবাসি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম বল্লেন, “তাহলে অভাবগ্রস্ত হওয়ার জন্য তৈরি হয়ে যাও। আমাকে যে ভালোবাসে অভাব আর দারিদ্র তার দিকে বানের পানির মতো ছুটে আসে।” (বোখারী)
অর্থাৎ রাসূল (সঃ)-কে যে ভালবাসে, সমস্ত হারাম রুজি-রোজগারের রাস্তা থেকে সে সরে আসে অভাবগ্রস্ত তো সে হবেই। মানুষ সন্তান-সন্ততি, পিতা-মাতা, পরিবার-পরিজনের মহব্বতে এমন সব কাজ করে যা রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্যের পরিপন্থী। আর এই অবস্থায় সে যতই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালামের ভালোবাসার দাবী করুক। তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্যের কাছে কারো মহব্বত ভয় কিংবা অন্য কোনো প্রয়োজন যেন সামনে না থাকে। তাহলেই সে আল্লাহর প্রিয় পাত্র হবে।
নওগাঁ জিলার সাপাহার উপজেলায় স্থানীয় গার্লস স্কুলে একবার সীরাত মাহফিলের আয়োজন করেছিলাম। প্রধান অতিথি ছিলেন তখনকার ইউ.এন.ও সাহেবের স্ত্রী। রাসূল (সঃ) শানে দরুদ পাঠের কথা বলতেই ভদ্র মহিলা কাঁদতে শুরু করলেন। বল্লেন-রাসূলের শানে দরুদ পেশ করার সময় তার কান্না আসে। রাসূলের প্রতি অতিরিক্ত মহব্বতের কারণেই তার কান্না আসে। এ সময় নাকি তিনি নিজেকে সামলাতে পারেন না। আমিও নিজেকে সামলাতে পারলাম না।
বল্লাম-“রাসূলের শানে যখন বেয়াদবি করেন তখন খারাপ লাগে না আপা?
* “বেয়াদপি করি মানে?”
* “আপা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের নির্দেশ মুমিন নারী যখন বাড়ির বাইরে যাবে সে যেন পোশাকের উপর আর একটি পোশাক দেয়। অর্থাৎ সে যেন পর্দা মেনে চলে। তাকে যেন মুসলমান বলে চেনা যায়। কিন্তু আপনি..... তো.........।”
এরপরও ভদ্র মহিলা আত্মপক্ষ সমর্থন করে কিছু তর্ক করলেন। এতো দিন পরে সব মনে নেই।
আমি বুঝি না বিশ্বাস করুন একদম বুঝতে পারিনা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালামের দিক-নির্দেশনার পায়রবি না করে বিভিন্ন বিদ’আতী কর্মকাণ্ডে নিজেদেরকে জড়িয়ে আল-কুরআনের বিধানকে অমান্য করে কিভাবে রাসূল (সঃ)-এর ভালোবাসার দাবী করা যায়?
আর রাসূল (সঃ)-কে ভালোবাসার প্রমাণ দিতে না পারলে কি করে আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়া সম্ভব? কিংবা আল্লাহকে ভালোবাসি এ দাবীই বা কিভাবে করা যায়?
আসুন আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তায়ালা যা কিছু পছন্দ করেন তাই করার চেষ্টা করি। তাঁর পছন্দ অনুযায়ী নিজেকে গড়ে তুলি। তার রঙে রঙিন হই।
صِبْغَةَ اللَّهِ - وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ صِبْغَةً - وَنَحْنُ لَهُ عُبِدُونَ -
“বল! আল্লাহর রঙ ধারন করো তাঁর রঙ থেকে উত্তম রঙ আর কার হতে পারে? এবং বল আমরা তারই দাসত্ব করি। (সূরা বাকারা : ১৩৮)
আমরা পূর্বেই জেনেছি আল্লাহকে ভালোবাসার প্রথম শর্তই হলো রাসূল (সঃ)-এর অনুসরণ বা আনুগত্য করা। আল্লাহকে ভালোবাসার দাবী সেই করতে পারে যে জীবনের প্রতিটি সমস্যার সমাধানে রাসূল (সঃ)-এর নীতির অনুসরণ করেছে।
আনন্দ-বেদনায়, সুখে-দুঃখে, সুস্থতায়-দুঃস্থতায়, শত্রুতায়, মিত্রতায়, সচ্ছলতায়, অসচ্ছলতায়, মুশকিলে আসানে, যুদ্ধে সন্ধিতে, ছোট-বড় প্রতিটি ক্ষেত্রে যে রাসূলকেই অনুসরণ করেছে।
সংসার, পরিবার, প্রতিবেশী, সমাজ, মসজিদ, মক্তব, বাজার, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাষ্ট্র, পররাষ্ট্র এমন কোন দিক নেই যার দিক-নির্দেশনা রাসূল (সঃ) দেন নি। তাঁর অনুসৃত নীতি যে যতখানি আত্মস্থ করতে পেরেছে, বাস্তবায়িত করতে পেরেছে, সে ততখানি আল্লাহকে ভালোবাসার দাবী করতে পারে।
আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তায়ালা বলেন-“রাসূল তোমাদের যা কিছু দেন তা গ্রহণ করো এবং যা থাকে বিরত থাকতে বলেন তা থেকে বিরত থাক। (সূরা হাশর : ৭)
রাসূল (সঃ)-এর পরিচয় এভাবে দেওয়া হয়েছে-“সে সৎ কাজের নির্দেশ দেয় অসৎ কাজ করতে নিষেধ করে। তাদের জন্য পবিত্র জিনিসসমূহ বৈধ করে এবং কলুষ জিনিস সমূহ নিষিদ্ধ করে। (আরাফ : ১৫৭)
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَّسُولٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ -
“আমি রাসূলকে এই উদ্দেশ্যেই পাঠিয়েছি যে আল্লাহর নির্দেশে তার আনুগত্য করা হবে। (আন-নিসা : ৬৪)
রাসূল (সঃ)-এর কাছে কিতাব প্রেরণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন-
بِالْبَيِّنَتِ وَالزُّبُرِ - وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ -
“এবং আমরা তোমার উপর এই যিকির (কুরআন) নাযিল করেছি যাতে লোকদের তুমি তা সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিতে পার। যা তাদের উদ্দেশ্যে নাযিল করা হয়েছে। যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা নাহল : ৪৪)
“আমরা তো তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি যারা এ বিষয়ে মতভেদ করে তাদেরকে সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য। পথ নির্দেশও দয়া স্বরূপ।” (সূরা নাহল : ৬৪)
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا -
রাসূল (সঃ)-এর আনুগত্য মুমিনের জন্য অপরিহার্য। এ বিষয়ে আল্লাহ পাক বলেন-“তোমার প্রতিপালকের শপথ। তারা কখনো মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নিজেদের মধ্যকার পারস্পরিক মত বিরোধের মীমাংসার ভার তোমার উপর অর্পণ না করে অতঃপর তুমি যে সিদ্ধান্ত দেবে সে সম্পর্কে নিজেদের মনে দ্বিধা অনুভব না করে এবং সর্বান্তকরণে তা মেনে নেয়। (সূরা নিসা : ৬৫)
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ - وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَلًا مُّبِينًا -
আবার বলেন-“আল্লাহর রাসূল কোনো বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোনো মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে না। কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করলে সে তো স্পষ্টই পথভ্রষ্ট।” (সূরা আহযাব : ৩৬)
এমনি আরো অনেক আয়াতে রাসূলের অনুসরণকে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা বলে গণ্য করা হয়েছে। অর্থাৎ রাসূল (সঃ) বিরুদ্ধাচরণ করে আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়া যাবে না। আল্লাহর রাসূল যেভাবে, যে কাজ করেছেন ঠিক সেইভাবেই সেই কাজ করতে হবে। তার চেয়ে বেশিও না কমও না।
রাসূল (সঃ) আজ আমাদের মধ্যে নেই কিন্তু তাঁর শিক্ষা, তার দিক-নির্দেশনা অবিকৃত অবস্থায় আমাদের মধ্যে বিদ্যমান। তাঁর জীবিতাবস্থায় তাঁর নির্দেশ মানা মুমিনের জন্য যেমন অপরিহার্য ছিল-তাঁর অবর্তমানেও তাঁর অনুসরণ করা আমাদের জন্য অপরিহার্য। এক চুল এদিক ওদিক করার অবকাশ নেই।
আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার রাসূল (সঃ)-ই একমাত্র মাধ্যম এর কোনো বিকল্প নেই।
* রাসূল (সঃ) বলেন-“আমি তোমাদের কাছে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতদিন তোমরা তা শক্ত করে ধরে থাকবে, পথভ্রষ্ট হবে না। আর তা হলো আল্লাহর কিতাব ও আমার সুন্নাহ।” (বুখারী মুসলিম)
* রাসূল (সঃ) বলেন-“আমার উম্মাতের (অনুসারীর) প্রত্যেকেই জান্নাতে যাবে। তবে যে অস্বীকার করবে সে ছাড়া। লোকেরা বললো, হে আল্লাহর রাসূল কে অস্বীকার করবে?
রাসূল বল্লেন-“যে আমার আনুগত্য করবে জান্নাতে প্রবেশ করবে আর যে আমার অবাধ্য হবে, সেই হবে আমাকে অস্বীকারকারী। (মুয়াত্তা ইমাম মালেক)
* যার মধ্যে তিনটি বিষয় বিদ্যমান থাকবে, সে ঈমানের স্বাদ-আস্বাদন করবে।
(i) আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার নিকট সমগ্র পৃথিবীর চেয়ে বেশি প্রিয় হবে।
(ii) যাকেই ভালোবাসে শুধু আল্লাহর জন্যই ভালোবাসে।
(iii) কুফরী থেকে ফিরে আসার পর আবার কুফরীতে ফিরে যাওয়াকে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে পড়ার মতো অপছন্দ করে। (বুখারী মুসলিম)
📄 জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ
জিহাদ ফি-সাবিলিল্লাহ্ : আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তায়ালাকে ভালোবাসার আর একটি নিদর্শন হলো, জিহাদ ফি-সাবিলিল্লাহ্।
জিহাদ ফি-সাবিলিল্লাহর অর্থ হলো আল্লাহর জমীনে আল্লাহর বিধানকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এবং আল্লাহ অপছন্দনীয় কাজ। কুফর, ফিসক এবং আল্লাহরোহিতা ও নাফরমানিকে মিটিয়ে দেবার জন্য নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে চেষ্টা সাধনা করা।
উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ আল্লাহর রাসূলও জিহাদ ফি-সাবিলিল্লাহ থেকে যারা নিজেদের পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদকে বেশি ভালোবাসে তাদেরকে কঠিন ধমক দিয়েছেন।
* এ ব্যাপারে রাসূল (সঃ) বলেন-“যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাউকে ভালোবেসেছে। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কারো সাথে শত্রুতা করেছে আল্লাহর জন্যই দান করেছে। আবার আল্লাহর কারণেই দান করা থেকে বিরত থেকেছে। সে ব্যক্তি ঈমানকে কানায় কানায় পূর্ণ করেছে। (আবু দাউদ)
* ঈমানের সব চেয়ে মজবুত রজ্জু হলো মানুষ আল্লাহর জন্যই ভালোবাসবে এবং আল্লাহর জন্যই শত্রুতা পোষণ করবে। (বুখারী)
আল্লাহর রাসূলের দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী যারা আল্লাহকে ভালোবাসে আল্লাহও তাদের ভালোবাসেন। বান্দার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। হাদীসে কুদসীতে আছে-
* যে ব্যক্তি আমার দিকে এক বিঘত পরিমাণ এগিয়ে আসে আমি তার দিকে এক হাত এগিয়ে আসি। যে আমার দিকে এক হাত এগিয়ে আসে আমি তার দিকে এক গজ এগিয়ে আসি। যে আমার দিকে হেঁটে আসে আমি তার দিকে দৌড়ে আসি।
জিহাদ ফি-সাবিলিল্লাহ-এর দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করার নামই আল্লাহর দিকে আসা। আল্লাহ তাদের মেহমানদারীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রেখেছেন। আর জিহাদ ফি-সাবিলিল্লাহকে তিনি ব্যবসায়ের সাথে তুলনা করেছেন।
আল্লাহ বলেন-“হে ঈমান আনয়নকারী লোকেরা! আমি কি তোমাদের এমন ব্যবসায়ের কথা বলব, যা তোমাদেরকে পীড়াদায়ক আযাব থেকে রক্ষা করবে?
তোমরা ঈমান আন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি। আর জিহাদ কর আল্লাহর পথে নিজেদের মাল-সম্পদ ও নিজেদের জান-প্রাণ দ্বারা। ইহাই তোমাদের জন্য অতিব উত্তম। যদি তোমরা জান।
আল্লাহ তোমাদের গুনাহখাতা মাফ করে দেবেন। এবং তোমাদের এমন সব বাগানে প্রবেশ করাবেন যে সবের নিচ দিয়ে ঝর্ণা ধারা সদা প্রবাহিত। এবং চিরকাল অবস্থিতির জান্নাতে।
অতীব উত্তম ঘর তোমাদের দান করবেন। ইহা বড় সাফল্য। (সূরা সফ : ১০-১২)