📘 আমাদের সোনালী অতীত 📄 পূর্বসূরিদের রমজান

📄 পূর্বসূরিদের রমজান


ইমাম সালেহ ইবরাহিম বিন হানিয়ি বার্ধক্যে পৌঁছা পর্যন্ত অধিকহারে রোজা রাখতেন। তিনি মরণরোগে আক্রান্ত হলেন। আসরের পর তাঁর মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তাঁর হেঁচকি শুরু হয়েছিল, থুথু নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল এবং জিহ্বা শুকিয়ে গিয়েছিল। পুত্রের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, 'বেটা, আমি পিপাসার্ত।' তখন তাঁর ছেলে পানি নিয়ে এল। পানি তাঁর মুখের কাছে দেওয়ার পর তিনি ঠোঁট বন্ধ করে ফেললেন; বললেন, 'সূর্য ডুবেছে কি?' পুত্র বলল, 'না।' তখন পানির পাত্র মুখ থেকে সরিয়ে ফেললেন। ছেলে পানি পান করার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকল আর তিনি নিষেধ করতে থাকলেন। তাই পুত্র মাগরিবের আজানের অপেক্ষা করতে থাকল। শায়খ কিছুক্ষণ চুপ থেকে পড়লেন-
لِمِثْلِ هَذَا فَلْيَعْمَلِ الْعَامِلُونَ.
'এরূপ সাফল্যের জন্য সাধকদের সাধনা করা উচিত।' [সুরা সাফফাত : ৬১]

তিনি কালিমায়ে শাহাদাত পড়তে পড়তে ইনতেকাল করলেন। নাফিসা বিনতে হাসান। পবিত্র ঘরের একজন সতী নারী। তিনি অধিকহারে রোজা রাখতেন। তিনি যখন বৃদ্ধ হলেন, তাঁর হাড় শুকিয়ে গেল। যখন তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হতে যাচ্ছিলেন, তখনও তিনি রোজাদার ছিলেন। তাঁর কঠিন মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হলো। তাঁর সন্তানরা জোরপূর্বক তাঁর মুখে পানির ফোঁটা দিতে চাচ্ছিল। তিনি সন্তানদের দিকে তাকালেন, তাঁর ঠোঁটযুগল সংকুচিত হয়ে গেছে, জিহ্বা ভারী হয়ে এসেছে। এমতাবস্থায় সন্তানদের বললেন, 'আশ্চর্য! আমি আজ ৩০ বছর ধরে আল্লাহর কাছে দুআ করছি, “তুমি রোজা অবস্থায় আমাকে মৃত্যু দিয়ো।” আর আমি এখন রোজা অবস্থায় থেকেও রোজা ভাঙব? এটা হতে পারে না।' এরপর তিনি কুরআন কারিম তেলাওয়াত শুরু করলেন। দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন এই আয়াতে পৌঁছে—
قُلْ لِمَنْ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ قُلْ لِلَّهِ كَتَبَ عَلَى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ.
'বলো, আকাশ ও জমিনসমূহে যা আছে তা কার? বলো, আল্লাহর। তিনি নিজের ওপর রহমত লিখে নিয়েছেন।' [সুরা আনআম : ১২]

হ্যাঁ, তাঁরা ছিলেন নেককার ও সৎকর্মশীল। তাঁরা তাঁদের প্রতিপালককে ভালোবেসেছেন, তাই প্রতিপালকও তাঁদের ভালোবেসেছেন। তাঁরা আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করতে চেয়েছেন, আল্লাহ তাআলাও নৈকট্য দান করেছেন।

ইমাম ইবনু আবি আদি বলেন, দাউদ ইবনু আবি হিন্দ সুদীর্ঘ ৪০ বছর এক দিন রোজা রাখতেন, এক দিন রোজা ছাড়তেন। কিন্তু বিষয়টি তাঁর পরিবারের কেউ জানত না। জিজ্ঞেস করা হলো, 'কীভাবে এটা সম্ভব হয়েছে?' বললেন, 'তিনি মুচি ছিলেন। প্রতিদিন খাবার নিয়ে বাড়ি থেকে দোকানের দিকে যেতেন। যদি রোজা না রাখতেন, খানা খেয়ে নিতেন। আর রোজা রাখলে, পথে কোনো মিসকিনকে দান করে দিতেন। সন্ধ্যায় বাড়ি এসে পরিবারের সাথে খাবার খেতেন।'

আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা অধিকহারে রোজা রাখতেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তিনি বলেছেন, 'দুনিয়া থেকে আমার বিদায়ের সময় কেবল তিনটা জিনিস ছুটে যাওয়ার আফসোস করছি-
প্রথম কঠিন দিনে পিপাসার্ত না থাকার আফসোস। অর্থাৎ এমন দিনে রোজা ছেড়ে দেওয়ার আফসোস, যেদিন তীব্র রোদ ও গরমের কারণে প্রচণ্ড পিপাসা লাগে। তিনি বলেন, প্রথমত কঠিন দিনের রোজা ছাড়ার আফসোস, শেষরাতে আল্লাহর ইবাদত না করার আফসোস এবং আমার জীবদ্দশায় সামনে আসা বিদ্রোহী হাজ্জাজের দলের বিরুদ্ধে জিহাদ না করার আফসোস।

হ্যাঁ, আমাদের পূর্বসূরিগণ রোজার প্রতি খুব যত্নবান থাকতেন এবং এটাকেই জান্নাতের পাথেয় বানাতেন। রোজার ফরজ বিধানের আল্লাহপ্রদত্ত হেকমত তাঁরা অনুধাবন করতে পারতেন। আর বর্তমানে! রোজা তো অনেক মানুষই রাখে; কিন্তু এমন মানুষ খুব কমই আছে, যারা রোজার মহত্ব অনুধাবন করতে পারে।

ইমাম সালেহ ইবরাহিম বিন হানিয়ি বার্ধক্যে পৌঁছা পর্যন্ত অধিকহারে রোজা রাখতেন। তিনি মরণরোগে আক্রান্ত হলেন। আসরের পর তাঁর মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তাঁর হেঁচকি শুরু হয়েছিল, থুথু নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল এবং জিহ্বা শুকিয়ে গিয়েছিল। পুত্রের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, 'বেটা, আমি পিপাসার্ত।' তখন তাঁর ছেলে পানি নিয়ে এল। পানি তাঁর মুখের কাছে দেওয়ার পর তিনি ঠোঁট বন্ধ করে ফেললেন; বললেন, 'সূর্য ডুবেছে কি?' পুত্র বলল, 'না।' তখন পানির পাত্র মুখ থেকে সরিয়ে ফেললেন। ছেলে পানি পান করার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকল আর তিনি নিষেধ করতে থাকলেন। তাই পুত্র মাগরিবের আজানের অপেক্ষা করতে থাকল।

শায়খ কিছুক্ষণ চুপ থেকে পড়লেন-

لِمِثْلِ هَذَا فَلْيَعْمَلِ الْعَامِلُونَ. 'এরূপ সাফল্যের জন্য সাধকদের সাধনা করা উচিত।' [সুরা সাফফাত : ৬১]

তিনি কালিমায়ে শাহাদাত পড়তে পড়তে ইনতেকাল করলেন। নাফিসা বিনতে হাসান। পবিত্র ঘরের একজন সতী নারী। তিনি অধিকহারে রোজা রাখতেন। তিনি যখন বৃদ্ধ হলেন, তাঁর হাড় শুকিয়ে গেল। যখন তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হতে যাচ্ছিলেন, তখনও তিনি রোজাদার ছিলেন। তাঁর কঠিন মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হলো। তাঁর সন্তানরা জোরপূর্বক তাঁর মুখে পানির ফোঁটা দিতে চাচ্ছিল। তিনি সন্তানদের দিকে তাকালেন, তাঁর ঠোঁটযুগল সংকুচিত হয়ে গেছে, জিহ্বা ভারী হয়ে এসেছে। এমতাবস্থায় সন্তানদের বললেন, 'আশ্চর্য! আমি আজ ৩০ বছর ধরে আল্লাহর কাছে দুআ করছি, “তুমি রোজা অবস্থায় আমাকে মৃত্যু দিয়ো।” আর আমি এখন রোজা অবস্থায় থেকেও রোজা ভাঙব? এটা হতে পারে না।' এরপর তিনি কুরআন কারিম তেলাওয়াত শুরু করলেন। দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন এই আয়াতে পৌঁছে—

قُلْ لِمَنْ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ قُلْ لِلَّهِ كَتَبَ عَلَى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ.

'বলো, আকাশ ও জমিনসমূহে যা আছে তা কার? বলো, আল্লাহর। তিনি নিজের ওপর রহমত লিখে নিয়েছেন।' [সুরা আনআম : ১২]

হ্যাঁ, তাঁরা ছিলেন নেককার ও সৎকর্মশীল। তাঁরা তাঁদের প্রতিপালককে ভালোবেসেছেন, তাই প্রতিপালকও তাঁদের ভালোবেসেছেন। তাঁরা আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করতে চেয়েছেন, আল্লাহ তাআলাও নৈকট্য দান করেছেন। ইমাম ইবনু আবি আদি বলেন, দাউদ ইবনু আবি হিন্দ সুদীর্ঘ ৪০ বছর এক দিন রোজা রাখতেন, এক দিন রোজা ছাড়তেন। কিন্তু বিষয়টি তাঁর পরিবারের কেউ জানত না। জিজ্ঞেস করা হলো, 'কীভাবে এটা সম্ভব হয়েছে?' বললেন, 'তিনি মুচি ছিলেন। প্রতিদিন খাবার নিয়ে বাড়ি থেকে দোকানের দিকে যেতেন। যদি রোজা না রাখতেন, খানা খেয়ে নিতেন। আর রোজা রাখলে, পথে কোনো মিসকিনকে দান করে দিতেন। সন্ধ্যায় বাড়ি এসে পরিবারের সাথে খাবার খেতেন।'

আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা অধিকহারে রোজা রাখতেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তিনি বলেছেন, 'দুনিয়া থেকে আমার বিদায়ের সময় কেবল তিনটা জিনিস ছুটে যাওয়ার আফসোস করছি- প্রথম কঠিন দিনে পিপাসার্ত না থাকার আফসোস। অর্থাৎ এমন দিনে রোজা ছেড়ে দেওয়ার আফসোস, যেদিন তীব্র রোদ ও গরমের কারণে প্রচণ্ড পিপাসা লাগে। তিনি বলেন, প্রথমত কঠিন দিনের রোজা ছাড়ার আফসোস, শেষরাতে আল্লাহর ইবাদত না করার আফসোস এবং আমার জীবদ্দশায় সামনে আসা বিদ্রোহী হাজ্জাজের দলের বিরুদ্ধে জিহাদ না করার আফসোস। হ্যাঁ, আমাদের পূর্বসূরিগণ রোজার প্রতি খুব যত্নবান থাকতেন এবং এটাকেই জান্নাতের পাথেয় বানাতেন। রোজার ফরজ বিধানের আল্লাহপ্রদত্ত হেকমত তাঁরা অনুধাবন করতে পারতেন। আর বর্তমানে! রোজা তো অনেক মানুষই রাখে; কিন্তু এমন মানুষ খুব কমই আছে, যারা রোজার মহত্ব অনুধাবন করতে পারে।

📘 আমাদের সোনালী অতীত 📄 ইহুদি এবং সুযোগ-বঞ্চনা

📄 ইহুদি এবং সুযোগ-বঞ্চনা


আল্লাহ তাআলা ইহুদিদের কাছে মুসা আলাইহিস সালামকে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে ইহুদিদের সুসংবাদ দিয়েছেন। তারপর এসেছেন ইসা আলাইহিস সালাম, তিনিও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে তাদের সুসংবাদ দিয়েছেন। তাঁদের সকলের প্রতি সর্বোত্তম শান্তি এবং রহমত বর্ষিত হোক।

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আবির্ভূত হয়েছিলেন, তখন চোখের পলকেও তারা নবিজির সত্যতার ব্যাপারে কোনো অভিযোগ করেনি। তারা জানত, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই সেই শেষনবি, মুসা আলাইহিস সালাম যাঁর আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন। তারা এটাও জানত, তাদের উভয়কালীন মুক্তি ইসলাম কবুল করার মাঝেই। তারা এ-ও জানত যে, তারা তাদের দ্বীন বিকৃত এবং ভেজালযুক্ত করে ফেলেছে; এতসত্ত্বেও তারা কেবল অহংকার এবং বিদ্বেষবশত ইসলাম অস্বীকার করেছে। সময় যত গড়াচ্ছিল, দিন ও বছর যত অতীত হচ্ছিল সত্যকে বোঝা সত্ত্বেও তার অনুসরণের ব্যাপারে তাদের প্রত্যেকের ভেতর দুর্বলতা সৃষ্টি হচ্ছিল।

অনুগ্রহপূর্বক খন্দকের যুদ্ধের সময়ে ইহুদিদের অবস্থার দিকে তাকান! কুরাইশবাহিনী এবং তাদের সাহায্যকারীরা যখন মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে তাদের সৈন্য প্রস্তুত করল এবং মদিনার দিকে যাত্রা করল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবিগণ পেরেশান হয়ে গেলেন, কী করবেন! তখন তাঁরা প্রত্যক্ষ করলেন, মদিনা তিন দিক থেকে পাহাড়-বেষ্টিত। সুতরাং মুসলিমরা বুঝতে পারলেন যে, কাফিররা কেবল এক দিক থেকেই মদিনার ওপর আক্রমণ করতে পারবে, সেটা হলো সমতলভূমি। তাই কাফিরদের গতিরোধ করার জন্য মুসলিমরা মদিনার প্রবেশপথে পরিখা খনন করলেন। কাফিররা মদিনার নিকট পৌঁছে যখন পরিখা দেখল, হতভম্ব ও পেরেশান হয়ে গেল; কীভাবে তারা মুসলিমদের পরাভূত করবে! তাই পরিখার ওপারেই ক্যাম্প স্থাপন করল; মদিনায় প্রবেশ করতে পারল না।

ওদিকে মদিনায় ইহুদিদের কয়েকটি গোত্র ছিল, তাদের মধ্যে একটি হলো বনু কুরাইজা। তারা তাদের দুর্গে অবস্থান করছিল। তাদের মাঝে এবং নবিজির মাঝে চুক্তি হয়েছিল যে, তারা পরস্পর যুদ্ধে জড়াবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্যও করবে না। কিন্তু ইহুদিরা স্বভাবত প্রতারক, ধোঁকাবাজ, দুর্নীতিপরায়ণ। যখন তারা মক্কার কাফিরদের যৌথবাহিনীর শক্তি এবং মুসলিমদের কষ্ট দেখল, তারা মনে করল, এটাই ইসলামের শেষ। সুতরাং প্রতিশ্রুতি ও চুক্তি ভঙ্গ করল এবং কাফিরদের নিকট সংবাদ পাঠাল যে, তারা তাদের যেকোনোভাবে সাহায্য করবে। এখানেই শেষ নয়; তারা যখন মুসলিমদের পরিখার নিকট যুদ্ধে লিপ্ত দেখল, মদিনার অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়ল এবং মুসলিমদের বাড়িঘরের ওপর বাঁকা দৃষ্টি দিতে আরম্ভ করল, যেখানে নারী ও শিশুরা অবস্থান করছিল।

একপর্যায়ে তারা হাসান বিন সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহুর দায়িত্বে থাকা দুর্গের নিকট পৌঁছে গেল। সেখানে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীগণ ছাড়াও আরও কিছু মুমিন রমণী এবং শিশু অবস্থান করছিল। যদি আল্লাহ তাআলা তাদের চক্রান্তকে নস্যাৎ না করতেন, তাহলে তারা সেখানে আক্রমণ করে এবং তাদের হত্যা করে শোকের আবহ সৃষ্টি করেছিল প্রায়! তখনো মুসলিমদের ওপর যুদ্ধ চেপেই ছিল এবং ইহুদিরা তাদের দুর্গে অবস্থান করে দূর থেকে কাফিরদের সাহায্য করছিল।

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবিগণের ওপর কয়েকটা দিন খুব কঠিন অতিক্রম হলো। তাঁদের চোখগুলো বাঁকা হয়ে পড়েছিল এবং প্রাণ হয়েছিল ওষ্ঠাগত! এমন সময় আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করলেন। মুসলিম সেনাবাহিনীকে শক্তি দান করলেন, কাফিরদের যৌথবাহিনীকে একাই পরাভূত করলেন এবং কুরাইশের কাফিররা মক্কার দিকে পালিয়ে গেল। তারপর আল্লাহ তাআলা ইহুদিদের চক্রান্ত নস্যাৎ করলেন। মুসলিমরা তাদের দুর্গগুলো অবরোধ করে বসলেন। ইহুদিরা তাদের প্রতারণা ও ধোঁকাবাজির কারণে কার্যত শাস্তির উপযুক্ত হয়ে গিয়েছিল।

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনু কুরাইজার ইহুদিদের নিকট গেলেন এবং তাদের দুর্গের বাইরে মোর্চা স্থাপন করলেন। তাদের প্রস্তাব দেওয়া হলো, আত্মসমর্পণ করো। তারা অস্বীকার করল। ফলে তাদের অবরোধ করে রাখা হলো। অবরোধ এক দিন, দুদিন, তিন দিন করতে করতে এক সপ্তাহ, দু সপ্তাহ পার হয়ে গেল। এভাবে অবরোধ দীর্ঘ ২৫ দিন গত হলো।

অতঃপর অবরোধ যখন তাদের কাবু করে ফেলল, আল্লাহ তাআলা তাদের হৃদয়ে ভয় ঢুকিয়ে দিলেন। তারা দেখল, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের শিক্ষা দিতে বদ্ধপরিকর, তখন তারা বৈঠকে বসল। তাদের মধ্য থেকে তাদের নেতা কাআব বিন আসাদ দাঁড়িয়ে বলল, 'হে ইহুদিরা, তোমরা দেখছই যে, তোমরা কেমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছ! আমি তোমাদের সামনে তিনটি প্রস্তাব দিচ্ছি, তোমরা যেটি মন চায় গ্রহণ করতে পারো।'

তারা বলল, 'সেগুলো কী কী?' সে বলল, 'আমরা এই লোকটির আনুগত্য করব, তাকে সত্যায়ন করব এবং তার প্রতি ইমান আনয়ন করব। আল্লাহর শপথ, তোমাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, তিনি আল্লাহর প্রেরিত নবি। তিনি সেই রাসুল, যার কথা তোমরা তোমাদের কিতাবে পড়েছ। তাহলে তোমরা তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ, তোমাদের সন্তান এবং তোমাদের স্ত্রী সবকিছুর নিরাপত্তা পাবে।'

তখন তারা একে অন্যের দিকে চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল এবং ভরা অহংকার নিয়ে বলল, 'আমরা তাওরাতের বিধান ছাড়ব না এবং তাওরাত ব্যতীত অন্যকিছু গ্রহণ করব না।' কাআব বলল, 'তোমরা যখন এটা অস্বীকার করছ, তাহলে দ্বিতীয় প্রস্তাবটি ভেবে দেখো, সে আমাদের হত্যা করবে। ভয় কেবল নারী ও শিশুদের। অতএব আমরা নিজেরাই আমাদের নারী ও শিশুদের হত্যা করব, তারপর মুহাম্মদ ও তার সাথিদের সামনে বের হব। সকলেই থাকব অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। এমন কোনো জিনিস রেখে যাব না, যার কারণে ভয় সৃষ্টি হবে। এভাবে চলবে আমাদের এবং মুহাম্মদের মাঝে আল্লাহর ফায়সালা হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। যদি আমরা ধ্বংস হই ধ্বংস হব, আমাদের পিছে কোনো বংশ রেখে যাব না। যদি আমরা বিজয়ী হই, তাহলে অবশ্যই জীবনে নারী-শিশু পাব।'

সকলেই হুল্লোড় দিয়ে উঠল এবং বলল, 'আমরা কি এই মিসকিনদের হত্যা করব? এ রকম জীবনের কী মূল্য আছে?' কাআব বলল, 'যদি এই প্রস্তাবকেও অস্বীকার করো, তাহলে তৃতীয় ও শেষ প্রস্তাবটি হলো, সাপ্তাহিক রাত। সে রাতে মুহাম্মদ এবং তার সাহাবিরা নিরাপদ মনে করে অপ্রস্তুত থাকবে। কারণ, আমাদের ধর্মে সেদিন কারও প্রতি আক্রমণ করার বিধান নেই। এই ভেবে মুহাম্মদ ও তার সাথিরা নিশ্চিন্তে থাকবে। তখন তাদের প্রতি হামলে পড়ব, হয়তো আমরা মুহাম্মদ এবং তার সাথিদের ধোঁকা দিতে পারব।'

তারা বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করতে থাকল। কেউ বলল, 'আমরা কি সাপ্তাহিক রাতটা নষ্ট করব এবং সে রাতে এমন কলঙ্কের ইতিহাস রচনা করব, যা আমাদের পূর্বপুরুষেরা করেনি? তুমি কি জানো না, এই সাপ্তাহিক রাতের বিধান উপেক্ষা করার কারণে একদল লোক কীভাবে বানরে রূপান্তর হয়েছিল!' কাআব কিছুক্ষণ চুপ থাকল এবং এই কাপুরুষদের ব্যাপারে ভাবতে লাগল, যে তাদের মাথায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার কোনো যোগ্যতাই নেই। অবস্থাকে পাল্টে দেওয়ার কোনো শক্তিও নেই। কোনো স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার অবস্থাও নেই। সত্যের দিকে ফিরে যাওয়ার সৎসাহসও নেই। তারপর বলল, 'হে ইহুদি সমাজ, তোমাদের কেউ মায়ের পেট থেকে জন্মগ্রহণ করার পর থেকে এ পর্যন্ত কোনো বিষয়ে দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেনি!'

আল্লাহ তাআলা ইহুদিদের কাছে মুসা আলাইহিস সালামকে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে ইহুদিদের সুসংবাদ দিয়েছেন। তারপর এসেছেন ইসা আলাইহিস সালাম, তিনিও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে তাদের সুসংবাদ দিয়েছেন। তাঁদের সকলের প্রতি সর্বোত্তম শান্তি এবং রহমত বর্ষিত হোক।

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আবির্ভূত হয়েছিলেন, তখন চোখের পলকেও তারা নবিজির সত্যতার ব্যাপারে কোনো অভিযোগ করেনি। তারা জানত, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই সেই শেষনবি, মুসা আলাইহিস সালাম যাঁর আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন। তারা এটাও জানত, তাদের উভয়কালীন মুক্তি ইসলাম কবুল করার মাঝেই। তারা এ-ও জানত যে, তারা তাদের দ্বীন বিকৃত এবং ভেজালযুক্ত করে ফেলেছে; এতসত্ত্বেও তারা কেবল অহংকার এবং বিদ্বেষবশত ইসলাম অস্বীকার করেছে। সময় যত গড়াচ্ছিল, দিন ও বছর যত অতীত হচ্ছিল সত্যকে বোঝা সত্ত্বেও তার অনুসরণের ব্যাপারে তাদের প্রত্যেকের ভেতর দুর্বলতা সৃষ্টি হচ্ছিল।

অনুগ্রহপূর্বক খন্দকের যুদ্ধের সময়ে ইহুদিদের অবস্থার দিকে তাকান! কুরাইশবাহিনী এবং তাদের সাহায্যকারীরা যখন মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে তাদের সৈন্য প্রস্তুত করল এবং মদিনার দিকে যাত্রা করল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবিগণ পেরেশান হয়ে গেলেন, কী করবেন! তখন তাঁরা প্রত্যক্ষ করলেন, মদিনা তিন দিক থেকে পাহাড়-বেষ্টিত। সুতরাং মুসলিমরা বুঝতে পারলেন যে, কাফিররা কেবল এক দিক থেকেই মদিনার ওপর আক্রমণ করতে পারবে, সেটা হলো সমতলভূমি। তাই কাফিরদের গতিরোধ করার জন্য মুসলিমরা মদিনার প্রবেশপথে পরিখা খনন করলেন।

কাফিররা মদিনার নিকট পৌঁছে যখন পরিখা দেখল, হতভম্ব ও পেরেশান হয়ে গেল; কীভাবে তারা মুসলিমদের পরাভূত করবে! তাই পরিখার ওপারেই ক্যাম্প স্থাপন করল; মদিনায় প্রবেশ করতে পারল না। ওদিকে মদিনায় ইহুদিদের কয়েকটি গোত্র ছিল, তাদের মধ্যে একটি হলো বনু কুরাইজা। তারা তাদের দুর্গে অবস্থান করছিল। তাদের মাঝে এবং নবিজির মাঝে চুক্তি হয়েছিল যে, তারা পরস্পর যুদ্ধে জড়াবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্যও করবে না।

কিন্তু ইহুদিরা স্বভাবত প্রতারক, ধোঁকাবাজ, দুর্নীতিপরায়ণ। যখন তারা মক্কার কাফিরদের যৌথবাহিনীর শক্তি এবং মুসলিমদের কষ্ট দেখল, তারা মনে করল, এটাই ইসলামের শেষ। সুতরাং প্রতিশ্রুতি ও চুক্তি ভঙ্গ করল এবং কাফিরদের নিকট সংবাদ পাঠাল যে, তারা তাদের যেকোনোভাবে সাহায্য করবে। এখানেই শেষ নয়; তারা যখন মুসলিমদের পরিখার নিকট যুদ্ধে লিপ্ত দেখল, মদিনার অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়ল এবং মুসলিমদের বাড়িঘরের ওপর বাঁকা দৃষ্টি দিতে আরম্ভ করল, যেখানে নারী ও শিশুরা অবস্থান করছিল।

একপর্যায়ে তারা হাসান বিন সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহুর দায়িত্বে থাকা দুর্গের নিকট পৌঁছে গেল। সেখানে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীগণ ছাড়াও আরও কিছু মুমিন রমণী এবং শিশু অবস্থান করছিল। যদি আল্লাহ তাআলা তাদের চক্রান্তকে নস্যাৎ না করতেন, তাহলে তারা সেখানে আক্রমণ করে এবং তাদের হত্যা করে শোকের আবহ সৃষ্টি করেছিল প্রায়! তখনো মুসলিমদের ওপর যুদ্ধ চেপেই ছিল এবং ইহুদিরা তাদের দুর্গে অবস্থান করে দূর থেকে কাফিরদের সাহায্য করছিল।

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবিগণের ওপর কয়েকটা দিন খুব কঠিন অতিক্রম হলো। তাঁদের চোখগুলো বাঁকা হয়ে পড়েছিল এবং প্রাণ হয়েছিল ওষ্ঠাগত! এমন সময় আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করলেন। মুসলিম সেনাবাহিনীকে শক্তি দান করলেন, কাফিরদের যৌথবাহিনীকে একাই পরাভূত করলেন এবং কুরাইশের কাফিররা মক্কার দিকে পালিয়ে গেল। তারপর আল্লাহ তাআলা ইহুদিদের চক্রান্ত নস্যাৎ করলেন। মুসলিমরা তাদের দুর্গগুলো অবরোধ করে বসলেন। ইহুদিরা তাদের প্রতারণা ও ধোঁকাবাজির কারণে কার্যত শাস্তির উপযুক্ত হয়ে গিয়েছিল।

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনু কুরাইজার ইহুদিদের নিকট গেলেন এবং তাদের দুর্গের বাইরে মোর্চা স্থাপন করলেন। তাদের প্রস্তাব দেওয়া হলো, আত্মসমর্পণ করো। তারা অস্বীকার করল। ফলে তাদের অবরোধ করে রাখা হলো। অবরোধ এক দিন, দুদিন, তিন দিন করতে করতে এক সপ্তাহ, দু সপ্তাহ পার হয়ে গেল। এভাবে অবরোধ দীর্ঘ ২৫ দিন গত হলো। অতঃপর অবরোধ যখন তাদের কাবু করে ফেলল, আল্লাহ তাআলা তাদের হৃদয়ে ভয় ঢুকিয়ে দিলেন। তারা দেখল, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের শিক্ষা দিতে বদ্ধপরিকর, তখন তারা বৈঠকে বসল। তাদের মধ্য থেকে তাদের নেতা কাআব বিন আসাদ দাঁড়িয়ে বলল, 'হে ইহুদিরা, তোমরা দেখছই যে, তোমরা কেমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছ! আমি তোমাদের সামনে তিনটি প্রস্তাব দিচ্ছি, তোমরা যেটি মন চায় গ্রহণ করতে পারো।'

তারা বলল, 'সেগুলো কী কী?' কাআব বলল, 'আমরা এই লোকটির আনুগত্য করব, তাকে সত্যায়ন করব এবং তার প্রতি ইমান আনয়ন করব। আল্লাহর শপথ, তোমাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, তিনি আল্লাহর প্রেরিত নবি। তিনি সেই রাসুল, যার কথা তোমরা তোমাদের কিতাবে পড়েছ। তাহলে তোমরা তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ, তোমাদের সন্তান এবং তোমাদের স্ত্রী সবকিছুর নিরাপত্তা পাবে।' তখন তারা একে অন্যের দিকে চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল এবং ভরা অহংকার নিয়ে বলল, 'আমরা তাওরাতের বিধান ছাড়ব না এবং তাওরাত ব্যতীত অন্যকিছু গ্রহণ করব না।'

কাআব বলল, 'তোমরা যখন এটা অস্বীকার করছ, তাহলে দ্বিতীয় প্রস্তাবটি ভেবে দেখো, সে আমাদের হত্যা করবে। ভয় কেবল নারী ও শিশুদের। অতএব আমরা নিজেরাই আমাদের নারী ও শিশুদের হত্যা করব, তারপর মুহাম্মদ ও তার সাথিদের সামনে বের হব। সকলেই থাকব অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। এমন কোনো জিনিস রেখে যাব না, যার কারণে ভয় সৃষ্টি হবে। এভাবে চলবে আমাদের এবং মুহাম্মদের মাঝে আল্লাহর ফায়সালা হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। যদি আমরা ধ্বংস হই ধ্বংস হব, আমাদের পিছে কোনো বংশ রেখে যাব না। যদি আমরা বিজয়ী হই, তাহলে অবশ্যই জীবনে নারী-শিশু পাব।' সকলেই হুল্লোড় দিয়ে উঠল এবং বলল, 'আমরা কি এই মিসকিনদের হত্যা করব? এ রকম জীবনের কী মূল্য আছে?'

কাআব বলল, 'যদি এই প্রস্তাবকেও অস্বীকার করো, তাহলে তৃতীয় ও শেষ প্রস্তাবটি হলো, সাপ্তাহিক রাত। সে রাতে মুহাম্মদ এবং তার সাহাবিরা নিরাপদ মনে করে অপ্রস্তুত থাকবে। কারণ, আমাদের ধর্মে সেদিন কারও প্রতি আক্রমণ করার বিধান নেই। এই ভেবে মুহাম্মদ ও তার সাথিরা নিশ্চিন্তে থাকবে। তখন তাদের প্রতি হামলে পড়ব, হয়তো আমরা মুহাম্মদ এবং তার সাথিদের ধোঁকা দিতে পারব।' তারা বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করতে থাকল। কেউ বলল, 'আমরা কি সাপ্তাহিক রাতটা নষ্ট করব এবং সে রাতে এমন কলঙ্কের ইতিহাস রচনা করব, যা আমাদের পূর্বপুরুষেরা করেনি? তুমি কি জানো না, এই সাপ্তাহিক রাতের বিধান উপেক্ষা করার কারণে একদল লোক কীভাবে বানরে রূপান্তর হয়েছিল!' কাআব কিছুক্ষণ চুপ থাকল এবং এই কাপুরুষদের ব্যাপারে ভাবতে লাগল, যে তাদের মাথায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার কোনো যোগ্যতাই নেই। অবস্থাকে পাল্টে দেওয়ার কোনো শক্তিও নেই। কোনো স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার অবস্থাও নেই। সত্যের দিকে ফিরে যাওয়ার সৎসাহসও নেই। তারপর বলল, 'হে ইহুদি সমাজ, তোমাদের কেউ মায়ের পেট থেকে জন্মগ্রহণ করার পর থেকে এ পর্যন্ত কোনো বিষয়ে দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেনি!'

📘 আমাদের সোনালী অতীত 📄 মুসাইলামাতুল কাজ্জাব

📄 মুসাইলামাতুল কাজ্জাব


১০ হিজরি সাল। জাজিরাতুল আরবের নজদের অন্তর্গত ইয়ামামায় আত্মপ্রকাশ করল ভণ্ডনবি মুসাইলামাতুল কাজ্জাব। সে দাবি করল, 'আমি নবি ও রাসুল এবং আমার প্রতিও কুরআন অবতীর্ণ হয়।' তার উপর অবতীর্ণ কুরআনের আয়াত হিসেবে এই বাক্যগুলো পড়ত—
والطاحنات طحنا والعاجنات عجনা والخابزات خبزا والثادرات ثরদা - واللاقمাত لقমা .
'ভালোভাবে চাক্কি পেষণকারিণীর শপথ, ভালোভাবে খামিরা তৈরিকারিণীর শপথ, ভালোভাবে রুটি তৈরিকারিণীর শপথ, ভালোভাবে দুধদায়িনীর শপথ, ভালোভাবে লোকমাদানকারিণীর শপথ।'
এভাবে উল্টাপাল্টা বেহুদা বাক্য তৈরি করে করে প্রচার করত এবং বলত, এগুলোও কুরআন। তার এমন অসার কথা শুনে সমাজের লোকজন তাকে তিরস্কার করল। কেবল বোকা রাখালেরা তার অনুসারী হলো এবং একদল সমর্থক ও সৈন্য তৈরি হলো। এতে সে আত্মঅহমিকায় আক্রান্ত হলো। সে নবিজির কাছে চিঠি পাঠাল—
'আল্লাহর রাসুল মুসাইলামার পক্ষ থেকে আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদের প্রতি। আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। আমি নবুওয়াতের ক্ষেত্রে আপনার অংশীদার হয়েছি। জমিনের অর্ধেক আমাদের আর অর্ধেক কুরাইশের। কিন্তু কুরাইশরা সীমালঙ্ঘনকারী জাতি।'
নবিজিকে চিঠি পাঠ করে শুনানো হলো। আল্লাহর প্রতি তার দুঃসাহস দেখে নবিজি বিস্মিত হলেন। চিঠির জবাবে লেখা হলো—
'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে মিথ্যাবাদী মুসাইলামার প্রতি। যে ব্যক্তি হেদায়াত অনুসরণ করে তার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। জমিনের অধিপতি আল্লাহ তাআলা। বান্দাদের মধ্যে তিনি যাকে চান তার উত্তরাধিকারী করেন। আর উত্তম পরিণাম কেবল মুত্তাকিদের জন্য।'

তারপর নবিজি সাহাবিগণের দিকে তাকিয়ে একজন বিচক্ষণ দুঃসাহসী মুজাহিদ খুঁজছিলেন, যাকে মুসাইলামার কাছে চিঠি দিয়ে পাঠাবেন। পরিশেষে হজরত হাবিব বিন জায়েদকে নির্বাচন করেন। তিনি ছিলেন টগবগে যুবক। প্রবৃত্তির কারণে দ্বীনের সেবাকে ত্যাগ করেননি কখনো, কোনো স্বাদআহ্লাদের কারণে প্রতিপালককে ভুলে জানি্ন। তার কলব ইসলামের সত্যায়ন ও ইমানে ভরপুর। তিনি রাত কাটান তাসবিহ পড়ে এবং কুরআন তিলাওয়াত করে।
নবিজির হাত থেকে হাবিব বিন জায়েদ চিঠি গ্রহণ করলেন এবং মদিনা থেকে ইয়ামামার উদ্দেশে যাত্রা করলেন। এক হাজার মাইলেরও অধিক পথ অতিক্রম করে তিনি মুসাইলামাতুল কাজ্জাবের কাছে পৌঁছুলেন। মুসাইলামার হাতে নবিজির চিঠি দিলেন। চিঠি পড়ে মুসাইলামা ক্রুদ্ধ ও অস্থির হয়ে পড়ল। সে তার সাথিদের জমায়েত করে হজরত হাবিব বিন জায়েদকে তার সামনে দাঁড় করিয়ে এই চিঠি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ আরম্ভ করল—
হাবিব: চিঠি পাঠিয়েছেন আল্লাহর রাসুল, সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
মুসাইলামা: তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল?
হাবিব: হ্যাঁ, আমি সাক্ষ্য দিই, নিশ্চয় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসুল।
মুসাইলামা: তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, আমিও আল্লাহর রাসুল?
হাবিব: উপহাসমূলক বললেন, আমার কানে কি সমস্যা হলো নাকি, আচ্ছা তুমি কী যেন বললে? তোমার কথা কে শোনে!
মুসাইলামা: আবার জিজ্ঞেস করল, তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল?
হাবিব: হ্যাঁ, আমি সাক্ষ্য দিই, নিশ্চয় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসুল।
মুসাইলামা: তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, আমিও আল্লাহর রাসুল?
হাবিব: আমি কিছু শুনতে পাচ্ছি না।
মুসাইলামা প্রশ্নগুলো পুনরাবৃত্তি করলে হজরত হাবিব বিন জায়েদ পূর্বের মতোই জবাব দিলেন।

হজরত হাবিবের জবাব শুনে মুসাইলামা ক্ষিপ্ত হলো। জল্লাদকে ডেকে হজরত হাবিবের শরীরে আঘাত করার নির্দেশ দিলো। তারপর মুসাইলামা বারবার একই প্রশ্ন করছিল, হজরত হাবিবও একই জবাব দিচ্ছিলেন। মুসাইলামার ক্রোধও পূর্বের চেয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এবার মুসাইলামা নির্দেশ দিলো, হাবিবের মুখ খুলে জিহ্বা কেটে ফেলো। সুতরাং সৈন্যরা তাকে ধরে মুখ খুললো এবং হজরত হাবিব বিন জায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর জিহ্বা কেটে ফেলল। তাকে মুসাইলামার সামনে দাঁড় করালো, তখন হজরত হাবিবের পবিত্র মুখ থেকে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল।
মুসাইলামা চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল, তুমি কি সাক্ষ্য দাও, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল? হজরত হাবিব রাদিয়াল্লাহু আনহু মাথা দ্বারা ইশারা করে বললেন, হ্যাঁ, আমি সাক্ষ্য দিই, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসুল। এবার মুসাইলামা জিজ্ঞেস করল, তুমি কি সাক্ষ্য দাও, আমি আল্লাহর রাসুল? হজরত হাবিব মাথা দিয়ে ইশারা করে বললেন, না।

মুসাইলামা জল্লাদকে ডেকে নির্দেশ দিলে সে হজরত হাবিবের হাত কাটল, তারপর পা কাটল, নাক শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করল, কান আলাদা করে ফেলল, এভাবে শরীর টুকরো টুকরো করতে থাকল। তার শরীরের মাংসগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়েছিল, রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল স্রোতের গতিতে। হজরত হাবিব জমিনের উপর ছটফট করছিলেন এবং যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন, একসময় আল্লাহর ডাকে সাড়া দিলেন। নিথর হয়ে পড়ে থাকল তার লাশ। হ্যাঁ, তার জিহ্বা কেটেছে, শরীর টুকরো টুকরো করেছে, হাড্ডিগুলো ভেঙেছে আর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তিনি সবকিছু সহ্য করেছেন।

কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ তাআলা সামনে তাকে দণ্ডায়মান করা হবে এবং আল্লাহ তাআলা তাকে জিজ্ঞেস করবেন, হে আমার বান্দা–তোমার জিহ্বা কেন কাটা হয়েছে? কেন তোমার নাক কাটা হয়েছে? তোমার হাত কেন শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে? তোমার শরীরের রক্ত কেন প্রবাহিত করা হয়েছে? হজরত হাবিব জবাব দিবেন, হে সমগ্র জগতের প্রতিপালক, এসব কিছু তোমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য মেনে নিয়েছি, তুমি যদি রাজি হয়ে যাও, আঘাতের এসব যন্ত্রণা কিছুই নয়। হে জগতের প্রতিপালক, তোমার বড়ত্বের কারণেই এসব সহ্য করেছি। তোমার জন্যই কষ্ট আনন্দে পরিণত হয়েছে, ধৈর্য স্বাদে পরিণত হয়েছে, কান্না শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে, রক্ত মিশক আর সুগন্ধিতে পরিবর্তিত হয়েছে। হে আমার প্রতিপালক, দুনিয়াতে যদি কষ্ট দাও, কিয়ামতের দিন আমার চেহারাকে জ্যোতির্ময় করো।

তখন এই বান্দার সাক্ষাতে আল্লাহ তাআলা খুশি হবেন, তার কষ্টকে নেয়ামত দ্বারা পাল্টে দেবেন, তার মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন, তার পদস্খলন ক্ষমা করবেন, প্রতিপালক তাকে ডেকে কানে কানে বলবেন, হে আমার বান্দা আজ জান্নাতের যে প্রান্তে মনে চায় ঘুরে বেড়াও। আজ এমন নেয়ামত তোমাকে দেব, যার সাথে কখনো কোনো কষ্ট যোগ হবে না। এমন রাজ্য তোমাকে দান করব, যেখানে তোমার কোনো অংশীদার থাকবে না। প্রতিটি দরজা দিয়ে ফেরেশতাগণ তোমাকে সম্ভাষণ জানাতে যাবে, তোমার সামনে নেয়ামতের ভাণ্ডার রয়েছে, যা মনে চায় নিয়ে নাও। আমার কাছে আরও রয়েছে, রয়েছে অফুরন্ত, রয়েছে সুখশান্তি এবং সৌভাগ্যের আধার।

إِنَّ أَصْحُبَ الْجَنَّةِ الْيَوْمَ فِي شُغُلٍ فَكِهُوْনَ، هُمْ وَ أَزْوَاجُهُمْ فِي ظلْلٍ عَلَى الْأَرَائِكِ مُتَّكِوْনَ. لَهُمْ فِيهَا فَاكِهَةٌ وَلَهُمْ مَّا يَدَّعُوْনَ، سَلْمٌ قَوْلًا مِّنْ رَّبٍّ رَّحِيمٍ .
'এদিন জান্নাতিরা আনন্দে মশগুল থাকবে। তারা এবং তাদের স্ত্রীরা উপবিষ্ট থাকবে ছায়াময় পরিবেশে আসনে হেলান দিয়ে। সেখানে তাদের জন্যে থাকবে ফল-মূল এবং যা চাইবে। করুণাময় পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাদের বলা হবে 'সালাম'।' [সুরা ইয়াসিন, আয়াত ৫৫-৫৮]
তিনি দয়াময় প্রতিপালক। কলবের জীবন হলো তার ভালোবাসা। অন্তরের প্রশান্তি হলো তার মারিফাত। শরীরের শান্তি হলো তার ইবাদত। রুহের খোরাক হলো তার খেদমত। জিহ্বার পূর্ণতা হলো তার প্রশংসা ও জিকিরআজ-কার, জিহ্বার সম্মান হলো আল্লাহর দাসত্ব এবং কৃতজ্ঞতা।

১০ হিজরি সাল। জাজিরাতুল আরবের নজদের অন্তর্গত ইয়ামামায় আত্মপ্রকাশ করল ভণ্ডনবি মুসাইলামাতুল কাজ্জাব। সে দাবি করল, 'আমি নবি ও রাসুল এবং আমার প্রতিও কুরআন অবতীর্ণ হয়। তার উপর অবতীর্ণ কুরআনের আয়াত হিসেবে এই বাক্যগুলো পড়ত—

والطاحنات طحنا والعاجنات عجنا والخابزات خبزا والثادرات ثردا - واللاقمات لقما .

'ভালোভাবে চাক্কি পেষণকারিণীর শপথ, ভালোভাবে খামিরা তৈরিকারিণীর শপথ, ভালোভাবে রুটি তৈরিকারিণীর শপথ, ভালোভাবে দুধদায়িনীর শপথ, ভালোভাবে লোকমাদানকারিণীর শপথ।'

এভাবে উল্টাপাল্টা বেহুদা বাক্য তৈরি করে করে প্রচার করত এবং বলত, এগুলোও কুরআন। তার এমন অসার কথা শুনে সমাজের লোকজন তাকে তিরস্কার করল। কেবল বোকা রাখালেরা তার অনুসারী হলো এবং একদল সমর্থক ও সৈন্য তৈরি হলো। এতে সে আত্মঅহমিকায় আক্রান্ত হলো। সে নবিজির কাছে চিঠি পাঠাল—

'আল্লাহর রাসুল মুসাইলামার পক্ষ থেকে আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদের প্রতি। আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। আমি নবুওয়াতের ক্ষেত্রে আপনার অংশীদার হয়েছি। জমিনের অর্ধেক আমাদের আর অর্ধেক কুরাইশের। কিন্তু কুরাইশরা সীমালঙ্ঘনকারী জাতি।'

নবিজিকে চিঠি পাঠ করে শুনানো হলো। আল্লাহর প্রতি তার দুঃসাহস দেখে নবিজি বিস্মিত হলেন। চিঠির জবাবে লেখা হলো—

'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে মিথ্যাবাদী মুসাইলামার প্রতি। যে ব্যক্তি হেদায়াত অনুসরণ করে তার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। জমিনের অধিপতি আল্লাহ তাআলা। বান্দাদের মধ্যে তিনি যাকে চান তার উত্তরাধিকারী করেন। আর উত্তম পরিণাম কেবল মুত্তাকিদের জন্য।'

তারপর নবিজি সাহাবিগণের দিকে তাকিয়ে একজন বিচক্ষণ দুঃসাহসী মুজাহিদ খুঁজছিলেন, যাকে মুসাইলামার কাছে চিঠি দিয়ে পাঠাবেন। পরিশেষে হজরত হাবিব বিন জায়েদকে নির্বাচন করেন। তিনি ছিলেন টগবগে যুবক। প্রবৃত্তির কারণে দ্বীনের সেবাকে ত্যাগ করেননি কখনো, কোনো স্বাদআহ্লাদের কারণে প্রতিপালককে ভুলে জানি, তার কলব ইসলামের সত্যায়ন ও ইমানে ভরপুর। তিনি রাত কাটান তাসবিহ পড়ে এবং কুরআন তিলাওয়াত করে। নবিজির হাত থেকে হাবিব বিন জায়েদ চিঠি গ্রহণ করলেন এবং মদিনা থেকে ইয়ামামার উদ্দেশে যাত্রা করলেন। এক হাজার মাইলেরও অধিক পথ অতিক্রম করে তিনি মুসাইলামাতুল কাজ্জাবের কাছে পৌঁছুলেন। মুসাইলামার হাতে নবিজির চিঠি দিলেন। চিঠি পড়ে মুসাইলামা ক্রুদ্ধ ও অস্থির হয়ে পড়ল। সে তার সাথিদের জমায়েত করে হজরত হাবিব বিন জায়েদকে তার সামনে দাঁড় করিয়ে এই চিঠি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ আরম্ভ করল—

হাবিব: চিঠি পাঠিয়েছেন আল্লাহর রাসুল, সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

মুসাইলামা : তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল?

হাবিব : হ্যাঁ, আমি সাক্ষ্য দিই, নিশ্চয় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসুল।

মুসাইলামা : তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, আমিও আল্লাহর রাসুল?

হাবিব : উপহাসমূলক বললেন, আমার কানে কি সমস্যা হলো নাকি, আচ্ছা তুমি কী যেন বললে? তোমার কথা কে শোনে!

মুসাইলামা : আবার জিজ্ঞেস করল, তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল?

হাবিব: হ্যাঁ, আমি সাক্ষ্য দিই, নিশ্চয় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসুল।

মুসাইলামা : তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, আমিও আল্লাহর রাসুল?

হাবিব: আমি কিছু শুনতে পাচ্ছি না।

মুসাইলামা প্রশ্নগুলো পুনরাবৃত্তি করলে হজরত হাবিব বিন জায়েদ পূর্বের মতোই জবাব দিলেন। হজরত হাবিবের জবাব শুনে মুসাইলামা ক্ষিপ্ত হলো। জল্লাদকে ডেকে হজরত হাবিবের শরীরে আঘাত করার নির্দেশ দিলো। তারপর মুসাইলামা বারবার একই প্রশ্ন করছিল, হজরত হাবিবও একই জবাব দিচ্ছিলেন। মুসাইলামার ক্রোধও পূর্বের চেয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এবার মুসাইলামা নির্দেশ দিলো, হাবিবের মুখ খুলে জিহ্বা কেটে ফেলো। সুতরাং সৈন্যরা তাকে ধরে মুখ খুললো এবং হজরত হাবিব বিন জায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর জিহ্বা কেটে ফেলল। তাকে মুসাইলামার সামনে দাঁড় করালো, তখন হজরত হাবিবের পবিত্র মুখ থেকে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল।

মুসাইলামা চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল, তুমি কি সাক্ষ্য দাও, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল? হজরত হাবিব রাদিয়াল্লাহু আনহু মাথা দ্বারা ইশারা করে বললেন, হ্যাঁ, আমি সাক্ষ্য দিই, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসুল। এবার মুসাইলামা জিজ্ঞেস করল, তুমি কি সাক্ষ্য দাও, আমি আল্লাহর রাসুল? হজরত হাবিব মাথা দিয়ে ইশারা করে বললেন, না।

মুসাইলামা জল্লাদকে ডেকে নির্দেশ দিলে সে হজরত হাবিবের হাত কাটল, তারপর পা কাটল, নাক শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করল, কান আলাদা করে ফেলল, এভাবে শরীর টুকরো টুকরো করতে থাকল। তার শরীরের মাংসগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়েছিল, রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল স্রোতের গতিতে। হজরত হাবিব জমিনের উপর ছটফট করছিলেন এবং যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন, একসময় আল্লাহর ডাকে সাড়া দিলেন। নিথর হয়ে পড়ে থাকল তার লাশ। হ্যাঁ, তার জিহ্বা কেটেছে, শরীর টুকরো টুকরো করেছে, হাড্ডিগুলো ভেঙেছে আর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তিনি সবকিছু সহ্য করেছেন। কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ তাআলার সামনে তাকে দণ্ডায়মান করা হবে এবং আল্লাহ তাআলা তাকে জিজ্ঞেস করবেন, হে আমার বান্দা–তোমার জিহ্বা কেন কাটা হয়েছে? কেন তোমার নাক কাটা হয়েছে? তোমার হাত কেন শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে? তোমার শরীরের রক্ত কেন প্রবাহিত করা হয়েছে? হজরত হাবিব জবাব দিবেন, হে সমগ্র জগতের প্রতিপালক, এসব কিছু তোমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য মেনে নিয়েছি, তুমি যদি রাজি হয়ে যাও, আঘাতের এসব যন্ত্রণা কিছুই নয়।

হে জগতের প্রতিপালক, তোমার বড়ত্বের কারণেই এসব সহ্য করেছি। তোমার জন্যই কষ্ট আনন্দে পরিণত হয়েছে, ধৈর্য স্বাদে পরিণত হয়েছে, কান্না শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে, রক্ত মিশক আর সুগন্ধিতে পরিবর্তিত হয়েছে। হে আমার প্রতিপালক, দুনিয়াতে যদি কষ্ট দাও, কিয়ামতের দিন আমার চেহারাকে জ্যোতির্ময় করো। তখন এই বান্দার সাক্ষাতে আল্লাহ তাআলা খুশি হবেন, তার কষ্টকে নেয়ামত দ্বারা পাল্টে দেবেন, তার মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন, তার পদস্খলন ক্ষমা করবেন, প্রতিপালক তাকে ডেকে কানে কানে বলবেন, হে আমার বান্দা আজ জান্নাতের যে প্রান্তে, মনে চায় ঘুরে বেড়াও। আজ এমন নেয়ামত তোমাকে দেব, যার সাথে কখনো কোনো কষ্ট যোগ হবে না। এমন রাজ্য তোমাকে দান করব, যেখানে তোমার কোনো অংশীদার থাকবে না। প্রতিটি দরজা দিয়ে ফেরেশতাগণ তোমাকে সম্ভাষণ জানাতে যাবে, তোমার সামনে নেয়ামতের ভাণ্ডার রয়েছে, যা মনে চায় নিয়ে নাও। আমার কাছে আরও রয়েছে, রয়েছে অফুরন্ত, রয়েছে সুখশান্তি এবং সৌভাগ্যের আধার।—

আহ! কী সুন্দর হবে সেই সাক্ষাৎকার! ইহকাল ও পরকালের মালিকের সাথে! আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-

إِنَّ أَصْحُبَ الْجَنَّةِ الْيَوْمَ فِي شُغُلٍ فَكِهُوْنَ، هُمْ وَ أَزْوَاجُهُمْ فِي ظلْلٍ عَلَى الْأَرَائِكِ مُتَّكِوْنَ. لَهُمْ فِيهَا فَاكِهَةٌ وَلَهُمْ مَّا يَدَّعُوْنَ، سَلْمُ قَوْلًا مِّنْ رَّبِّ رَّحِيمٍ .

'এদিন জান্নাতিরা আনন্দে মশগুল থাকবে। তারা এবং তাদের স্ত্রীরা উপবিষ্ট থাকবে ছায়াময় পরিবেশে আসনে হেলান দিয়ে। সেখানে তাদের জন্যে থাকবে ফল-মূল এবং যা চাইবে। করুণাময় পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাদের বলা হবে 'সালাম'।' [সুরা ইয়াসিন, আয়াত ৫৫-৫৮]

তিনি দয়াময় প্রতিপালক। কলবের জীবন হলো তার ভালোবাসা। অন্তরের প্রশান্তি হলো তার মারিফাত। শরীরের শান্তি হলো তার ইবাদত। রুহের খোরাক হলো তার খেদমত। জিহ্বার পূর্ণতা হলো তার প্রশংসা ও জিকির আজ-কার, জিহ্বার সম্মান হলো আল্লাহর দাসত্ব এবং কৃতজ্ঞতা।

📘 আমাদের সোনালী অতীত 📄 উবাইদুল্লাহ বিন জাহাশ

📄 উবাইদুল্লাহ বিন জাহাশ


যদি আপনি পাপাচারী এবং নৈরাজ্যবাদীদের সংশ্রবের আবশ্যিক পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চান, তাহলে উবাইদুল্লাহ বিন জাহাশের দিকে তাকান। তিনি ছিলেন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিসের সদস্য। ইসলামের কারণে মক্কায় যারা সীমাহীন নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন তিনিও তাদের একজন। পরবর্তী সময়ে তিনি মুসলমানদের সাথে ইথিওপিয়ায় হিজরত করেন। নিজের পরিবার, শহর, বাড়ি-ঘর সবকিছু আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করেন। তার সাথে তার স্ত্রী হজরত উম্মে হাবিবা রাদিয়াল্লাহু আনহাও ছিলেন।

তিনি অধিকাংশ সময় খ্রিষ্টানদের সাথে ওঠাবসা করতেন এবং মুসলমানদের কাছ থেকে দূরে দূরে থাকতেন। এভাবে ধীরে ধীরে তার অবস্থা বিগড়ে যেতে থাকে। একদিন তার স্ত্রী হজরত উম্মে হাবিবাকে বলে বসলেন, আমি বিভিন্ন ধর্ম নিয়ে গবেষণা করেছি। খ্রিষ্টধর্মকেই আমার কাছে সবচেয়ে উত্তম মনে হয়েছে।
তার এমন কথা শুনে হজরত উম্মে হাবিবা আঁতকে উঠলেন এবং বললেন, হায় আল্লাহ, এটা তুমি কী বলছ! আল্লাহকে ভয় করো। কিন্তু তিনি স্ত্রীর কথায় ভ্রুক্ষেপ করলেন না। একদিন ইসলাম ত্যাগ করে কাফির হয়ে গেলেন। তারপর থেকে বুকে ক্রুস ঝুলালেন। মদের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়লেন। খ্রিষ্টানদের সাথে চলাফেরা করতে থাকলেন এবং কুফরির উপরই মারা গেলেন।

হে আল্লাহ আপনার কাছে মৃত্যু পর্যন্ত দ্বীনের উপর বহাল থাকার আবেদন করছি। হেদায়াতের উপর টিকে থাকার সবচেয়ে বড় উপায় হলো সংশ্রব। আল্লাহ তাআলা মুমিন নর-নারীকে নেককার নারী-পুরুষের সংশ্রব অবলম্বন করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং পাপাচারীদের সংশ্রব থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। কুরআন কারিমে ইরশাদ হয়েছে-
وَاتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِنْ كِتَابِ رَبِّكَ، لَا مُبَدِّلَ لِكَلِمَتِهِ، وَ لَنْ تَجِدَ مِنْ دُوْنِهِ مُلْتَحَدًا. وَ اصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِينَ يَدْعُوْنَ رَبَّهُمْ بِالْغَدُوةِ وَ الْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ وَلَا تَعْدُ عَيْنَكَ عَنْهُمْ، تُرِيدُ زِينَةَ الْحَيُوةِ الدُّنْيَا، وَلَا تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَه عَنْ ذِكْرِنَا وَ اتَّبَعَ هَوْنَهُ وَ كَانَ أَمْرُه فُرُطًا .
'আপনার প্রতি আপনার পালনকর্তার যে কিতাব প্রত্যাদিষ্ট করা হয়েছে তা পাঠ করুন। তার বাক্য পরিবর্তন করার কেউ নেই। তাকে ব্যতীত আপনি কখনোই কোনো আশ্রয়স্থল পাবেন না। আপনি নিজেকে তাদের সংসর্গে আবদ্ধ রাখুন যারা সকাল সন্ধ্যায় তাদের পালনকর্তাকে তার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে আহ্বান করে এবং আপনি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য কামনা করে তাদের থেকে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে দেবেন না। যার মনকে আমার স্মরণ থেকে গাফেল করে দিয়েছি, যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কার্যকলাপ হচ্ছে সীমা অতিক্রম করা, আপনি তার আনুগত্য করবেন না।' [সুরা কাহাফ, আয়াত ২৭-২৮]

আর যেই কাজটি মুমিনের দ্বীনকে আরও বেশি শক্তিশালী করে, দ্বীনের উপর অবিচল থাকতে সাহায্য করে, তা হলো দ্বীনকে অন্যের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে, নিজে পাপাচারীদের অন্তরে রেখাপাত করার চেষ্টা করবে, নিজেকে তাদের রঙে রঙিন করা যাবে না। একজনকে উপদেশ দেবে, আরেকজনকে কিছু মাসআলা শেখাবে, সৎকাজের আদেশ করবে, অসৎকাজ থেকে বারণ করবে। উপকারী পদ্ধতিতে দ্বীনের পথে মানুষকে ডাকবে, প্রভাববিস্তারকারী কিতাব রচনা করে ডাকবে, কার্যকর উপদেশের মাধ্যমে ডাকবে। এভাবে কাজ করলে ইমান আরও বৃদ্ধি পাবে, ইমানের উপর অবিচল থাকার শক্তি বৃদ্ধি হবে।

উঁচু উঁচু পাহাড় এবং মজবুত উপত্যকাগুলোর দিকে তাকান, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবিগণের দিকে তাকান। হজরত আবু বকরের দিকে তাকান, আল্লাহর দিকে তার দাওয়াতের আবেগের কথা চিন্তা করুন। তিনি কত দৃঢ়ভাবে দ্বীনের প্রতি অবিচল ছিলেন!
ইবনু সাআদ 'তাবাকাতে ইবনু সাআদ' এ উল্লেখ করেছেন, তবারানি 'আর-রিয়াজুন- নাহিরাহ' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার প্রথম যুগে মক্কায় গোপনে গোপনে ইসলামের দিকে আহ্বান করতেন। মুসলমানরা তাদের দ্বীন গোপন রাখত। যখন মুসলমানদের সংখ্যা ৩৮ জনে পৌঁছল, তখন হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু নবিজিকে প্রকাশ্যে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার প্রতি উৎসাহিত করলেন।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাব দিলেন, আবু বকর, আমরা তো সংখ্যায় খুব কম। হজরত আবু বকরকে নবিজি অনুপ্রাণিত করছিলেন, আলোচনা করতে করতে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে হারামের দিকে গেলেন। সাহাবিগণও তার সাথে মসজিদে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে নিজ নিজ পরিচিতজনদের সাথে বসলেন। হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বক্তৃতা করার জন্য সামনে দাঁড়ালেন। আল্লাহর দ্বীনের প্রতি আহ্বানকারী তিনিই ইসলামের ইতিহাসের প্রথম বক্ত।

মুশরিকরা যখন দেখল, আবু বকর তাদের প্রভুদের সমালোচনা করছেন, তাদের দ্বীনকে ছোট করছেন, তারা হজরত আবু বকর এবং মুসলমানদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারা মসজিদের বিভিন্ন কোণে সাহাবিগণকে কঠিনভাবে মারতে লাগল, আর হজরত আবু বকর চিৎকার করে দ্বীনের দাওয়াত দিতে থাকলেন। এবার একদল মুশরিক গিয়ে হজরত আবু বকরকে ঘিরে ধরে প্রহার করতে লাগল। তিনি জমিনে লুটিয়ে পড়লেন। তখন তাঁর বয়স ছিল প্রায় ৫০। শরীর ছিল দুর্বল। এবার ফাসেক উতবা বিন রবিয়া তার দিকে এগিয়ে এল এবং তার পেট ও বুকের উপর উঠে পদদলিত করতে লাগল, চামড়ার তৈরি জুতা দ্বারা প্রহার করতে লাগল এবং চেহারায় আঘাত করতে থাকল। ফলে জুতার সাথে তার চেহারার মাংস লেগে গেল, রক্ত প্রবাহিত হতে লাগল। চেহারা আর নাক কোথায় বোঝা যাচ্ছিল না। হজরত আবু বকর অত্যাচারের মুখে একসময় অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। বনু তামিম গোত্রের লোকেরা সাহায্য করতে এগিয়ে এল এবং কাফেরদের প্রতিরোধ করল। তাকে বাড়িতে নিয়ে গেল। তারা প্রায় নিশ্চিত ছিল, আবু বকর মারা গেছেন। তার পিতা এবং কওমের লোকজন শিয়রে বসে কথা বলার চেষ্টা করছিল, কিন্তু তিনি কোনো সাড়া দিচ্ছিলেন না।

এভাবে অজ্ঞান অবস্থায় দিন শেষ হয়ে এল। দিনের শেষপ্রহরে জ্ঞান ফিরে পেয়ে চোখ খুলে প্রথমেই তার মুখ থেকে উচ্চারিত হয়েছিল, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেমন আছেন?'
হজরত আবু বকরের এমন আচরণে তার পিতা ক্ষুব্ধ হলেন এবং তাকে গালিগালাজ আরম্ভ করলেন। তারপর সেখান থেকে বের হয়ে গেলেন। হজরত আবু বকরের মা এসে শিয়রে বসলেন। প্রিয় পুত্রকে কিছু পানাহার করানোর চেষ্টা করতে লাগলেন এবং পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন, কিন্তু হজরত আবু বকর এই বলে মাকে বাধা দিচ্ছিলেন যে, 'রাসুলের কী অবস্থা?' মা বললেন, আল্লাহর কসম, আমি তোমার সাথির সংবাদ জানি না। হজরত আবু বকর মাকে বললেন, তুমি উম্মে জামিল বিনতে খাত্তাবের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করো। হজরত উম্মে জামিল মুসলমান হয়েছিলেন, কিন্তু ইসলাম গোপন রেখেছিলেন।

হজরত আবু বকরের মা উম্মে জামিলের কাছে গিয়ে বললেন, আমার ছেলে আবু বকর তোমার কাছে মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। উম্মে জামিল বললেন, আমি আবু বকরকে চিনি না, মুহাম্মদকেও চিনি না। তবে আপনি চাইলে আমি আপনার সাথে আপনার পুত্রের কাছে যেতে পারি। মা বললেন, ঠিক আছে চলুন। সুতরাং উম্মে জামিল হজরত আবু বকরের মার সাথে রওয়ানা হলেন। আবু বকরের কাছে গিয়ে দেখলেন তিনি বিছানায় পড়া, চেহারা বীভৎস হয়ে আছে, শরীর থেকে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। এমন দৃশ্য দেখে তিনি কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, আল্লাহর কসম নিশ্চয় ফাসেক ও কাফেররা আপনার এই অবস্থা করেছে। আমি আশা করছি, আল্লাহ তাআলা আপনার পক্ষ থেকে এর প্রতিশোধ নিবেন। হজরত আবু বকর তার দিকে তাকালেন এবং অনেক কষ্ট করে জিজ্ঞেস করলেন, উম্মে জামিল, আল্লাহর রাসুল কেমন আছেন?
উম্মে জামিল বললেন, আপনার মা শুনছেন।
আবু বকর: তিনি কোনো সমস্যার কারণ নন।
উম্মে জামিল: তিনি নিরাপদে সুস্থ আছেন।
আবু বকর: কোথায় আছেন?
উম্মে জামিল: আবুল আরকামের বাড়িতে।

এবার হজরত আবু বকরের মা বললেন, তোমার সাথির সংবাদ তো পেয়েছ, এখন কিছু খেয়ে নাও। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি রাসুলের সাথে সাক্ষাৎ করার পূর্বে কোনো খাবার ও পানির স্বাদ গ্রহণ করবো না। উম্মে জামিল এবং তার মা তাকে সান্ত্বনা দিতে থাকলেন। তারপর যখন রাতের আঁধার নেমে এল, লোকজনের চলাফেরা বন্ধ হয়ে গেল, তখন তিনি উঠার চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না। তখন হজরত উম্মে জামিল এবং মায়ের কাঁধে ভর করে বাড়ি থেকে বের হলেন। তারা দু'জন হজরত আবু বকরকে নিয়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গেলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে দেখামাত্র জড়িয়ে ধরলেন এবং তাকে চুমু খেলেন; সাহাবিগণও আবু বকরকে চুমু খেলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত আবু বকরের অবস্থা দেখে খুব কষ্ট পেলেন।

হজরত আবু বকর বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনার প্রতি আমার পিতামাতা কুরবান হোক আমার কিছুই হয়নি, কেবল ফাসেক কাফেররা আমার চেহারায় আঘাত করে বীভৎস করে দিয়েছে। তারপর বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, এই আমার মা, তার সন্তানের জন্য ফিদা। আপনি বরকতময় মানুষ, তাকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করুন, আল্লাহর কাছে তার জন্য দোয়া করুন। হয়ত আপনার অসিলায় আল্লাহ তাআলা তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করবেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানালেন এবং তার জন্য দোয়া করলেন। আলহামদুলিল্লাহ, আবু বকরের মা ইসলাম গ্রহণ করলেন।
হজরত আবু বকরের এই তামান্না এবং প্রচেষ্টার প্রথম ফল হলো, আল্লাহ তাআলা তাকে ইসলামের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ও অবিচল রেখেছেন।

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ইন্তেকাল করলেন, কিছু কিছু মানুষ তার মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ করতে লাগল। হজরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং ঘোষণা করলেন, যে বলবে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মারা গেছেন, তাকে হত্যা করে ফেলবো। তখন হজরত আবু বকর মিম্বরে আরোহণ করে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বললেন, যে মুহাম্মদের ইবাদত করত, সে যেন জেনে রাখে, মুহাম্মদ মারা গেছেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদত করত, সে যেন বিশ্বাস করে, আল্লাহ তাআলা চিরঞ্জীব, তাঁর কোনো মৃত্যু নেই।
এরপর মক্কার আশপাশের কিছু মানুষ মুরতাদ হয়ে গেল। হজরত আবু বকর মাথা উঁচু করে তাদের সামনে দাঁড়ালেন এবং ইসলামের শক্তি ফিরিয়ে আনলেন।

ইসলামের দিকে আহ্বানের এই আবেগের বদৌলতেই তাঁর হাতে ৩০ জনের অধিক সাহাবি ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তাদের ছয়জন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত। সুতরাং সকল মুসলমান নরনারী-র করণীয় হলো, যখনই কারও প্রবৃত্তির চাহিদা মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে, কিংবা অন্তরে পাষণ্ডতা অনুভব করবে, অথবা ইবাদতে অলসতা অনুভূত হবে, হারাম কাজের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হবে, সাথে সাথে কোনো কল্যাণকামী মুসলিম ভাইয়ের কাছে গিয়ে তার সমস্যাগুলো খুলে বলবে, তাহলে সমাধান পাওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ।
আমাদের পূর্বসূরিগণ একে অপরকে বলতেন, আসুন কিছুক্ষণ ইমানের চর্চা করি।

তিরমিজি এবং নাসায়ি সহিহ সনদে বর্ণনা করেছেন, হজরত মারসাদ বিন আবু মারসাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু গোপনে মদিনা থেকে মক্কায় যেতেন। যেসব ঘর-বাড়িতে মুসলমানরা বন্দি হয়ে আছেন তাদের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করতেন এবং মদিনায় নিয়ে আসতেন।
এভাবে একরাতে তিনি মক্কায় গেলেন এবং একবন্দির সাথে নির্ধারিত স্থানে মিলিত হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তিনি সেদিকেই যাচ্ছিলেন। হঠাৎ পথে মক্কার এক পতিতা নারীর সাথে সাক্ষাৎ হলো, যার নাম ছিল ইনাক। জাহেলি যুগে দু'জনের মাঝে বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল। তাকে দেখামাত্র হজরত মারসাদ দেয়ালের ছায়ায় লুকিয়ে গেলেন। কিন্তু পতিতাও তাকে দেখতে পেয়ে তার দিকে এগিয়ে এল। পতিতা কাছে গিয়ে তাকে দেখেই চিনতে পারে এবং জিজ্ঞেস করে, মারসাদ?
মারসাদ: হ্যাঁ, আমি মারসাদ।
পতিতা: তোমাকে শুভেচ্ছা স্বাগতম। আজ রাতে আমার কাছেই থাকবে।
মারসাদ: আল্লাহ তাআলা ব্যভিচার হারাম করেছেন।
পতিতা : তুমি আমাকে ব্যবহার করবে নাকি আমি তোমাকে বাধ্য করবো?
মারসাদ: কোনোটিই না।
পতিতা চিৎকার করে ডাকতে আরম্ভ করল, ওহে তাঁবুবাসী, এই যে, এই লোকটি তোমাদের বন্দিদের নিয়ে যেতে এসেছে।

হজরত মারসাদ ভয়ে পালাতে লাগলেন। আট জন কাফের তার পিছু ধাওয়া করল। তিনি একবাগানে ঢুকে একটি গর্তের ভেতর আত্মগোপন করলেন। হজরত মারসাদের পিছু পিছু ধাওয়াকারীরাও প্রবেশ করল। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের চোখে পর্দা ফেলে দিলেন। হজরত মারসাদকে না-পেয়ে তারা ফিরে গেল। হজরত মারসাদ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সেখান থেকে বের হলেন। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেই সাথির কাছে গেলেন, যাকে মুক্ত করে মদিনায় নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। সেখানে গিয়ে তাকে সওয়ারিতে উঠিয়ে মক্কা থেকে বের হলেন। তারপর শরীরের বাঁধনগুলো খুলে দিয়ে দু'জনে মদিনায় ফিরে এলেন।
তারা মদিনায় পৌঁছে গেলেন। কিন্তু ঐ নারীর কথা হজরত মারসাদের বারবার স্মরণ হতে লাগল। তিনি সহ্য করতে পারছিলেন না। বাধ্য হয়ে নবিজির কাছে গেলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, ইনাকের সাথে আমার বিয়ের ব্যবস্থা করুন, আমি তাকে বিয়ে করতে চাই। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিষয়টি এড়িয়ে গেলেন। মারসাদ আবারও বললেন, আমি ইনাককে বিয়ে করতে চাই। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চুপ থাকলেন। ইতোমধ্যেই আল্লাহ তাআলা আয়াত অবতীর্ণ করলেন-
الزَّانِي لَا يَنْكِحُ إِلَّا زَانِيَةً أَوْ مُشْرِكَةً ۖ وَ الزَّانِيَةُ لَا يَنْكِحُهَا إِلَّا زَانٍ أَوْ مُشْرِكٌ، وَ حُرِّمَ ذَلِكَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ .
'ব্যভিচারী পুরুষ কেবল ব্যভিচারী নারী অথবা মুশরিক নারীকেই বিয়ে করে এবং ব্যভিচারী নারীকে কেবল ব্যভিচারী মুশরিক পুরুষই বিয়ে করে এবং মুমিনদের জন্যে তাদের হারাম করা হয়েছে।' [সুরা নূর, আয়াত: ৩]
অতঃপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ডেকে বললেন, মারসাদ ব্যভিচারী পুরুষ কেবল ব্যভিচারী নারী অথবা মুশরিক নারীকেই বিয়ে করে এবং ব্যভিচারী নারীকে কেবল ব্যভিচারী মুশরিক পুরুষই বিয়ে করে, অতএব তুমি তাকে বিয়ে করো না। আল্লাহ তাআলা হজরত মারসাদের প্রতি রাজি হয়ে গেলেন। তিনি চিন্তা করলেন, কীভাবে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এমন আবেদনের ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব। এভাবে চিন্তা করতে করতে তার হৃদয় থেকে শয়তানের কুমন্ত্রণা দূর হয়ে গেল।

'হিলয়া' গ্রন্থে আবু নুয়াইম আমর বিন মাইমুন বিন মিহরান থেকে উল্লেখ করেছেন, তিনি বলেন, আমার পিতা বৃদ্ধ বয়সে তার চোখ দৃষ্টিহীন হওয়ার পর আমাকে বললেন, আমাকে হাসান বসরির কাছে নিয়ে চলো। আমি তাকে নিয়ে হাসান বসরির সাক্ষাতে যাত্রা করলাম। সেখানে গিয়ে বাবা হজরত হাসান বসরিকে বললেন, হে আবু সাইদ, আমি হৃদয়ে নোংরামী অনুভব করছি, আমাকে মুক্ত করো। হজরত হাসান বসরি তখন এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন-
أَفَرَعَيْتَ إِنْ مَّতَّعْنَهُمْ سِنِينَ، ثُمَّ جَاءَهُمْ মَّا كَانُوْا يُوْعَدُوْنَ، مَا أَغْنى عَنْهُمْ مَّا كَانُوا يُمَتَّعُوْنَ .
'আপনি ভেবে দেখুন তো, যদি আমি তাদের বছরের পর বছর ভোগ-বিলাস করতে দেই, অতঃপর যে বিষয়ে তাদের ওয়াদা দেওয়া হয়েছিল, তা তাদের কাছে এসে পড়ে, তখন তাদের ভোগ-বিলাস তাদের কি উপকারে আসবে?' [সুরা শুআরা, আয়াত ২০৭]
উল্লিখিত আয়াত শুনে আমার পিতা কাঁদতে কাঁদতে পড়ে গেলেন এবং জমিনে পা আছড়াতে লাগলেন, ঠিক যেভাবে জবাইকৃত বকরি ছটফট করতে থাকে। হজরত হাসান বসরিও তার সাথে কাঁদতে লাগলেন এবং দীর্ঘ দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে কাঁদতে থাকলেন। ইতোমধ্যেই দাসী এসে বলল, আপনারা শায়েখকে ক্লান্ত করে ফেলেছেন, এখান থেকে দ্রুত চলে যান। আমি বাবার হাত ধরে তাকে নিয়ে বের হয়ে এলাম। যখন আমরা রাস্তা দিয়ে চলতে লাগলাম, তখন বাবা আমার বুকে থাবা মেরে বললেন, বেটা, তিনি আমার সামনে যেই আয়াত পড়েছেন, যদি তুমি বুঝতে, তোমার হৃদয়েও ক্ষত সৃষ্টি হতো।

টিকাঃ
৪৪. আসসুনানুল কুবরা লিল বাইহাকি, ৭/১৫৩।

যদি আপনি পাপাচারী এবং নৈরাজ্যবাদীদের সংশ্রবের আবশ্যিক পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চান, তাহলে উবাইদুল্লাহ বিন জাহাশের দিকে তাকান। তিনি ছিলেন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিসের সদস্য। ইসলামের কারণে মক্কায় যারা সীমাহীন নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন তিনিও তাদের একজন। পরবর্তী সময়ে তিনি মুসলমানদের সাথে ইথিওপিয়ায় হিজরত করেন। নিজের পরিবার, শহর, বাড়ি-ঘর সবকিছু আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করেন। তার সাথে তার স্ত্রী হজরত উম্মে হাবিবা রাদিয়াল্লাহু আনহাও ছিলেন।

তিনি অধিকাংশ সময় খ্রিষ্টানদের সাথে ওঠাবসা করতেন এবং মুসলমানদের কাছ থেকে দূরে দূরে থাকতেন। এভাবে ধীরে ধীরে তার অবস্থা বিগড়ে যেতে থাকে। একদিন তার স্ত্রী হজরত উম্মে হাবিবাকে বলে বসলেন, আমি বিভিন্ন ধর্ম নিয়ে গবেষণা করেছি। খ্রিষ্টধর্মকেই আমার কাছে সবচেয়ে উত্তম মনে হয়েছে। তাঁর এমন কথা শুনে হজরত উম্মে হাবিবা আঁতকে উঠলেন এবং বললেন, হায় আল্লাহ, এটা তুমি কী বলছ! আল্লাহকে ভয় করো। কিন্তু তিনি স্ত্রীর কথায় ভ্রুক্ষেপ করলেন না। একদিন ইসলাম ত্যাগ করে কাফির হয়ে গেলেন। তারপর থেকে বুকে ক্রুস ঝুলালেন। মদের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়লেন। খ্রিষ্টানদের সাথে চলাফেরা করতে থাকলেন এবং কুফরির উপরই মারা গেলেন।

হে আল্লাহ আপনার কাছে মৃত্যু পর্যন্ত, দ্বীনের উপর বহাল থাকার আবেদন করছি। হেদায়াতের উপর টিকে থাকার সবচেয়ে বড় উপায় হলো সংশ্রব। আল্লাহ তাআলা মুমিন নর-নারীকে নেককার নারী-পুরুষের সংশ্রব অবলম্বন করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং পাপাচারীদের সংশ্রব থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। কুরআন কারিমে ইরশাদ হয়েছে-

'আপনার প্রতি আপনার পালনকর্তার যে কিতাব প্রত্যাদিষ্ট করা হয়েছে তা পাঠ করুন। তার বাক্য পরিবর্তন করার কেউ নেই। তাকে ব্যতীত আপনি কখনোই কোনো আশ্রয়স্থল পাবেন না। আপনি নিজেকে তাদের সংসর্গে আবদ্ধ রাখুন যারা সকাল সন্ধ্যায় তাদের পালনকর্তাকে তার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে আহ্বান করে এবং আপনি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য কামনা করে তাদের থেকে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে দেবেন না। যার মনকে আমার স্মরণ থেকে গাফেল করে দিয়েছি, যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কার্যকলাপ হচ্ছে সীমা অতিক্রম করা, আপনি তার আনুগত্য করবেন না।' [সুরা কাহাফ, আয়াত ২৭-২৮]

আর যেই কাজটি মুমিনের দ্বীনকে আরও বেশি শক্তিশালী করে, দ্বীনের উপর অবিচল থাকতে সাহায্য করে, তা হলো দ্বীনকে অন্যের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে, নিজে পাপাচারীদের অন্তরে রেখাপাত করার চেষ্টা করবে, নিজেকে তাদের রঙে রঙিন করা যাবে না। একজনকে উপদেশ দেবে, আরেকজনকে কিছু মাসআলা শেখাবে, সৎকাজের আদেশ করবে, অসৎকাজ থেকে বারণ করবে। উপকারী পদ্ধতিতে দ্বীনের পথে মানুষকে ডাকবে, প্রভাববিস্তারকারী কিতাব রচনা করে ডাকবে, কার্যকর উপদেশের মাধ্যমে ডাকবে। এভাবে কাজ করলে ইমান আরও বৃদ্ধি পাবে, ইমানের উপর অবিচল থাকার শক্তি বৃদ্ধি হবে।

উঁচু উঁচু পাহাড় এবং মজবুত উপত্যকাগুলোর দিকে তাকান, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবিগণের দিকে তাকান। হজরত আবু বকরের দিকে তাকান, আল্লাহর দিকে তার দাওয়াতের আবেগের কথা চিন্তা করুন। তিনি কত দৃঢ়ভাবে দ্বীনের প্রতি অবিচল ছিলেন!

ইবনু সাআদ 'তাবাকাতে ইবনু সাআদ' এ উল্লেখ করেছেন, তবারানি 'আর-রিয়াজুন- নাহিরাহ' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার প্রথম যুগে মক্কায় গোপনে গোপনে ইসলামের দিকে আহ্বান করতেন। মুসলমানরা তাদের দ্বীন গোপন রাখত। যখন মুসলমানদের সংখ্যা ৩৮ জনে পৌঁছল, তখন হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু নবিজিকে প্রকাশ্যে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার প্রতি উৎসাহিত করলেন।

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাব দিলেন, আবু বকর, আমরা তো সংখ্যায় খুব কম। হজরত আবু বকরকে নবিজি অনুপ্রাণিত করছিলেন, আলোচনা করতে করতে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে হারামের দিকে গেলেন। সাহাবিগণও তার সাথে মসজিদে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে নিজ নিজ পরিচিতজনদের সাথে বসলেন। হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বক্তৃতা করার জন্য সামনে দাঁড়ালেন। আল্লাহর দ্বীনের প্রতি আহ্বানকারী তিনিই ইসলামের ইতিহাসের প্রথম বক্ত।

মুশরিকরা যখন দেখল, আবু বকর তাদের প্রভুদের সমালোচনা করছেন, তাদের দ্বীনকে ছোট করছেন, তারা হজরত আবু বকর এবং মুসলমানদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারা মসজিদের বিভিন্ন কোণে সাহাবিগণকে কঠিনভাবে মারতে লাগল, আর হজরত আবু বকর চিৎকার করে দ্বীনের দাওয়াত দিতে থাকলেন। এবার একদল মুশরিক গিয়ে হজরত আবু বকরকে ঘিরে ধরে প্রহার করতে লাগল। তিনি জমিনে লুটিয়ে পড়লেন। তখন তাঁর বয়স ছিল প্রায় ৫০। শরীর ছিল দুর্বল।

এবার ফাসেক উতবা বিন রবিয়া তার দিকে এগিয়ে এল এবং তার পেট ও বুকের উপর উঠে পদদলিত করতে লাগল, চামড়ার তৈরি জুতা দ্বারা প্রহার করতে লাগল এবং চেহারায় আঘাত করতে থাকল। ফলে জুতার সাথে তার চেহারার মাংস লেগে গেল, রক্ত প্রবাহিত হতে লাগল। চেহারা আর নাক কোথায় বোঝা যাচ্ছিল না। হজরত আবু বকর অত্যাচারের মুখে একসময় অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। বনু তামিম গোত্রের লোকেরা সাহায্য করতে এগিয়ে এল এবং কাফেরদের প্রতিরোধ করল। তাকে বাড়িতে নিয়ে গেল। তারা প্রায় নিশ্চিত ছিল, আবু বকর মারা গেছেন। তার পিতা এবং কওমের লোকজন শিয়রে বসে কথা বলার চেষ্টা করছিল, কিন্তু তিনি কোনো সাড়া দিচ্ছিলেন না। এভাবেই অজ্ঞান অবস্থায় দিন শেষ হয়ে এল। দিনের শেষপ্রহরে জ্ঞান ফিরে পেয়ে চোখ খুলে প্রথমেই তার মুখ থেকে উচ্চারিত হয়েছিল, 'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেমন আছেন?'

হজরত আবু বকরের এমন আচরণে তার পিতা ক্ষুব্ধ হলেন এবং তাকে গালিগালাজ আরম্ভ করলেন। তারপর সেখান থেকে বের হয়ে গেলেন। হজরত আবু বকরের মা এসে শিয়রে বসলেন। প্রিয় পুত্রকে কিছু পানাহার করানোর চেষ্টা করতে লাগলেন এবং পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন, কিন্তু হজরত আবু বকর এই বলে মাকে বাধা দিচ্ছিলেন যে, 'রাসুলের কী অবস্থা?' মা বললেন, আল্লাহর কসম, আমি তোমার সাথির সংবাদ জানি না। হজরত আবু বকর মাকে বললেন, তুমি উম্মে জামিল বিনতে খাত্তাবের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করো। হজরত উম্মে জামিল মুসলমান হয়েছিলেন, কিন্তু ইসলাম গোপন রেখেছিলেন।

হজরত আবু বকরের মা উম্মে জামিলের কাছে গিয়ে বললেন, আমার ছেলে আবু বকর তোমার কাছে মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। উম্মে জামিল বললেন, আমি আবু বকরকে চিনি না, মুহাম্মদকেও চিনি না। তবে আপনি চাইলে আমি আপনার সাথে আপনার পুত্রের কাছে যেতে পারি। মা বললেন, ঠিক আছে চলুন। সুতরাং উম্মে জামিল হজরত আবু বকরের মার সাথে রওয়ানা হলেন। আবু বকরের কাছে গিয়ে দেখলেন তিনি বিছানায় পড়া, চেহারা বীভৎস হয়ে আছে, শরীর থেকে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। এমন দৃশ্য দেখে তিনি কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, আল্লাহর কসম নিশ্চয় ফাসেক ও কাফেররা, আপনার এই অবস্থা করেছে। আমি আশা করছি, আল্লাহ তাআলা আপনার পক্ষ থেকে এর প্রতিশোধ নিবেন। হজরত আবু বকর তার দিকে তাকালেন এবং অনেক কষ্ট করে জিজ্ঞেস করলেন, উম্মে জামিল, আল্লাহর রাসুল কেমন আছেন? উম্মে জামিল বললেন, আপনার মা শুনছেন।

আবু বকর: তিনি কোনো সমস্যার কারণ নন।
উম্মে জামিল: তিনি নিরাপদে সুস্থ আছেন।
আবু বকর: কোথায় আছেন?
উম্মে জামিল: আবুল আরকামের বাড়িতে।

এবার হজরত আবু বকরের মা বললেন, তোমার সাথির সংবাদ তো পেয়েছ, এখন কিছু খেয়ে নাও। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি রাসুলের সাথে সাক্ষাৎ করার পূর্বে কোনো খাবার ও পানির স্বাদ গ্রহণ করবো না। উম্মে জামিল এবং তার মা তাকে সান্ত্বনা দিতে থাকলেন। তারপর যখন রাতের আঁধার নেমে এল, লোকজনের চলাফেরা বন্ধ হয়ে গেল, তখন তিনি উঠার চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না। তখন হজরত উম্মে জামিল এবং মায়ের কাঁধে ভর করে বাড়ি থেকে বের হলেন। তারা দু'জন হজরত আবু বকরকে নিয়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গেলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে দেখামাত্র জড়িয়ে ধরলেন এবং তাকে চুমু খেলেন; সাহাবিগণও আবু বকরকে চুমু খেলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত আবু বকরের অবস্থা দেখে খুব কষ্ট পেলেন।

হজরত আবু বকর বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনার প্রতি আমার পিতামাতা- কুরবান হোক আমার কিছুই হয়নি, কেবল ফাসেক কাফেররা আমার চেহারায় আঘাত করে বীভৎস করে দিয়েছে। তারপর বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, এই আমার মা, তার সন্তানের জন্য ফিদা। আপনি বরকতময় মানুষ, তাকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করুন, আল্লাহর কাছে তার জন্য দোয়া করুন। হয়ত আপনার অসিলায় আল্লাহ তাআলা তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করবেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানালেন এবং তার জন্য দোয়া করলেন। আলহামদুলিল্লাহ, আবু বকরের মা ইসলাম গ্রহণ করলেন। হজরত আবু বকরের এই তামান্না এবং প্রচেষ্টার প্রথম ফল হলো, আল্লাহ তাআলা তাকে ইসলামের উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ও অবিচল রেখেছেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ইন্তেকাল করলেন, কিছু কিছু মানুষ তার মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ করতে লাগল। হজরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং ঘোষণা করলেন, যে বলবে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মারা গেছেন, তাকে হত্যা করে ফেলবো। তখন হজরত আবু বকর মিম্বরে আরোহণ করে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বললেন, যে মুহাম্মদের ইবাদত করত, সে যেন জেনে রাখে, মুহাম্মদ মারা গেছেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদত করত, সে যেন বিশ্বাস করে, আল্লাহ তাআলা চিরঞ্জীব, তাঁর কোনো মৃত্যু নেই।

এরপর মক্কার আশপাশের কিছু মানুষ মুরতাদ হয়ে গেল। হজরত আবু বকর মাথা উঁচু করে তাদের সামনে দাঁড়ালেন এবং ইসলামের শক্তি ফিরিয়ে আনলেন। ইসলামের দিকে আহ্বানের এই আবেগের বদৌলতেই তাঁর হাতে ৩০ জনের অধিক সাহাবি ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তাদের ছয়জন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত।

সুতরাং সকল মুসলমান নরনারী-র করণীয় হলো, যখনই কারও প্রবৃত্তির চাহিদা মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে, কিংবা অন্তরে পাষণ্ডতা অনুভব করবে, অথবা ইবাদতে অলসতা অনুভূত হবে, হারাম কাজের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হবে, সাথে সাথে কোনো কল্যাণকামী মুসলিম ভাইয়ের কাছে গিয়ে তার সমস্যাগুলো খুলে বলবে, তাহলে সমাধান পাওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ। আমাদের পূর্বসূরিগণ একে অপরকে বলতেন, আসুন কিছুক্ষণ ইমানের চর্চা করি।

তিরমিজি এবং নাসায়ি সহিহ সনদে বর্ণনা করেছেন, হজরত মারসাদ বিন আবু মারসাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু গোপনে মদিনা থেকে মক্কায় যেতেন। যেসব ঘর-বাড়িতে মুসলমানরা বন্দি হয়ে আছেন তাদের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করতেন এবং মদিনায় নিয়ে আসতেন। এভাবে একরাতে তিনি মক্কায় গেলেন এবং একবন্দির সাথে নির্ধারিত স্থানে মিলিত হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তিনি সেদিকেই যাচ্ছিলেন। হঠাৎ পথে মক্কার এক পতিতা নারীর সাথে সাক্ষাৎ হলো, যার নাম ছিল ইনাক। জাহেলি যুগে দু'জনের মাঝে বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল। তাকে দেখামাত্র হজরত মারসাদ দেয়ালের ছায়ায় লুকিয়ে গেলেন। কিন্তু পতিতাও তাকে দেখতে পেয়ে তার দিকে এগিয়ে এল। পতিতা কাছে গিয়ে তাকে দেখেই চিনতে পারে এবং জিজ্ঞেস করে, মারসাদ?

মারসাদ: হ্যাঁ, আমি মারসাদ।
পতিতা: তোমাকে শুভেচ্ছা স্বাগতম। আজ রাতে আমার কাছেই থাকবে।
মারসাদ: আল্লাহ তাআলা ব্যভিচার হারাম করেছেন।
পতিতা : তুমি আমাকে ব্যবহার করবে নাকি আমি তোমাকে বাধ্য করবো?
মারসাদ: কোনোটিই না।

পতিতা চিৎকার করে ডাকতে আরম্ভ করল, ওহে তাঁবুবাসী, এই যে, এই লোকটি তোমাদের বন্দিদের নিয়ে যেতে এসেছে। হজরত মারসাদ ভয়ে পালাতে লাগলেন। আট জন কাফের তার পিছু ধাওয়া করল। তিনি একবাগানে ঢুকে একটি গর্তের ভেতর আত্মগোপন করলেন। হজরত মারসাদের পিছু পিছু ধাওয়াকারীরাও প্রবেশ করল। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাদের চোখে পর্দা ফেলে দিলেন। হজরত মারসাদকে না-পেয়ে তারা ফিরে গেল। হজরত মারসাদ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সেখান থেকে বের হলেন। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেই সাথির কাছে গেলেন, যাকে মুক্ত করে মদিনায় নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। সেখানে গিয়ে তাকে সওয়ারিতে উঠিয়ে মক্কা থেকে বের হলেন। তারপর শরীরের বাঁধনগুলো খুলে দিয়ে দু'জনে মদিনায় ফিরে এলেন।

তারা মদিনায় পৌঁছে গেলেন। কিন্তু ঐ নারীর কথা হজরত মারসাদের বারবার স্মরণ হতে লাগল। তিনি সহ্য করতে পারছিলেন না। বাধ্য হয়ে নবিজির কাছে গেলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, ইনাকের সাথে আমার বিয়ের ব্যবস্থা করুন, আমি তাকে বিয়ে করতে চাই। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিষয়টি এড়িয়ে গেলেন। মারসাদ আবারও বললেন, আমি ইনাককে বিয়ে করতে চাই। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চুপ থাকলেন। ইতোমধ্যেই আল্লাহ তাআলা আয়াত অবতীর্ণ করলেন-

الزَّانِي لَا يَنْكِحُ إِلَّا زَانِيَةً أَوْ مُشْرِكَةً ۖ وَ الزَّانِيَةُ لَا يَنْكِحُهَا إِلَّا زَانٍ أَوْ مُشْرِكٌ، وَ حُرِّمَ ذَلِكَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ .

'ব্যভিচারী পুরুষ কেবল ব্যভিচারী নারী অথবা মুশরিক নারীকেই বিয়ে করে এবং ব্যভিচারী নারীকে কেবল ব্যভিচারী মুশরিক পুরুষই বিয়ে করে এবং মুমিনদের জন্যে তাদের হারাম করা হয়েছে।' [সুরা নূর, আয়াত: ৩]

অতঃপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ডেকে বললেন, মারসাদ ব্যভিচারী পুরুষ কেবল ব্যভিচারী নারী অথবা মুশরিক নারীকেই বিয়ে করে এবং ব্যভিচারী নারীকে কেবল ব্যভিচারী মুশরিক পুরুষই বিয়ে করে, অতএব তুমি তাকে বিয়ে করো না। আল্লাহ তাআলা হজরত মারসাদের প্রতি রাজি হয়ে গেলেন। তিনি চিন্তা করলেন, কীভাবে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এমন আবেদনের ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব। এভাবে চিন্তা করতে করতে তার হৃদয় থেকে শয়তানের কুমন্ত্রণা দূর হয়ে গেল। [৪৪]

'হিলয়া' গ্রন্থে আবু নুয়াইম আমর বিন মাইমুন বিন মিহরান থেকে উল্লেখ করেছেন, তিনি বলেন, আমার পিতা বৃদ্ধ বয়সে তার চোখ দৃষ্টিহীন হওয়ার পর আমাকে বললেন, আমাকে হাসান বসরির কাছে নিয়ে চলো। আমি তাকে নিয়ে হাসান বসরির সাক্ষাতে যাত্রা করলাম। সেখানে গিয়ে বাবা হজরত হাসান বসরিকে বললেন, হে আবু সাইদ, আমি হৃদয়ে নোংরামী অনুভব করছি, আমাকে মুক্ত করো। হজরত হাসান বসরি তখন এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন-

أَفَرَعَيْتَ إِنْ مَّتَّعْنَهُمْ سِنِينَ، ثُمَّ جَاءَهُمْ مَّا كَانُوْا يُوْعَدُوْنَ، مَا أَغْنى عَنْهُمْ مَّا كَانُوا يُمَتَّعُوْنَ .

'আপনি ভেবে দেখুন তো, যদি আমি তাদের বছরের পর বছর ভোগ-বিলাস করতে দেই, অতঃপর যে বিষয়ে তাদের ওয়াদা দেওয়া হয়েছিল, তা তাদের কাছে এসে পড়ে, তখন তাদের ভোগ-বিলাস তাদের কি উপকারে আসবে?' [সুরা শুআরা, আয়াত ২০৭]

উল্লিখিত আয়াত শুনে আমার পিতা কাঁদতে কাঁদতে পড়ে গেলেন এবং জমিনে পা আছড়াতে লাগলেন, ঠিক যেভাবে জবাইকৃত বকরি ছটফট করতে থাকে। হজরত হাসান বসরিও তার সাথে কাঁদতে লাগলেন এবং দীর্ঘ দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে কাঁদতে থাকলেন। ইতোমধ্যেই দাসী এসে বলল, আপনারা শায়েখকে ক্লান্ত করে ফেলেছেন, এখান থেকে দ্রুত চলে যান। আমি বাবার হাত ধরে তাকে নিয়ে বের হয়ে এলাম। যখন আমরা রাস্তা দিয়ে চলতে লাগলাম, তখন বাবা আমার বুকে থাবা মেরে বললেন, বেটা, তিনি আমার সামনে যেই আয়াত পড়েছেন, যদি তুমি বুঝতে, তোমার হৃদয়েও ক্ষত সৃষ্টি হতো।

টিকাঃ
৪৪. আসসুনানুল কুবরা লিল বাইহাকি, ৭/১৫৩।

ফন্ট সাইজ
15px
17px