📘 আমাদের সোনালী অতীত 📄 চোখ আপন স্থানে ফিরে গেল

📄 চোখ আপন স্থানে ফিরে গেল


একযুদ্ধে আবু কাতাদা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে লক্ষ্য করে শত্রুবাহিনী তির নিক্ষেপ করে। তিরটি তাঁর চোখে বিদ্ধ হয়ে চোখ কোটর থেকে বের হয়ে আসে এবং কিছু রগ, গোশতের সাথে ঝুলে থাকে। কিছু সাথি এসে বলল, 'হে আবু কাতাদা, আল্লাহ তাআলা তোমাকে এর বদলা দেবেন, তোমার চোখ তো শেষ হয়ে গেছে, তাঁরা গোশত কেটে চোখটি বের করতে চাইলেন।

আবু কাতাদা রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁদের বললেন, 'সাথিরা, এমন করো না।' তাঁরা বলল, 'তাহলে কী হবে?' আবু কাতাদা বললেন, 'আমাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিয়ে চলো।' সুতরাং তাঁরা আবু কাতাদাকে নিয়ে নবিজির সামনে হাজির হলেন।

আবু কাতাদা বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমার চোখ!' নবিজি বললেন, 'যদি চাও তোমার চোখ পূর্বের মতো করে দেওয়া হবে। আর যদি চাও ধৈর্য ধরো, আল্লাহ তাআলা তোমাকে জান্নাতে এর বিনিময় দেবেন।'

আবু কাতাদা বললেন, 'আমাকে আমার স্ত্রীরা ভালোবাসে। আমি ভয় করছি, যদি আমার চোখ না থাকে, তাহলে স্ত্রীরা আমার প্রতি রাগ করবে। অতএব হে আল্লাহর রাসুল, আমার চোখ ভালো করে দিন, পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দিন। আর আল্লাহ চাইলে জান্নাতে এর প্রতিদান পেয়ে যাব ইনশাআল্লাহ।' বর্ণনাকারী বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কথা শোনে হাসলেন এবং তাঁর চোখ কোটরে ঢুকিয়ে দিয়ে আল্লাহর কাছে দুআ করলেন। চোখ সাথে সাথে ভালো হয়ে যায়।

বর্ণনাকারী বলেন, যখন তিনি চোখ তুলে তাকালেন সুস্থ চোখ খুলে গেল। তাকে কেউ দেখলে বুঝতেই পারত না যে, কোন্ চোখ আহত হয়েছিল।

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিগণকে নিয়ে খায়বারের যুদ্ধে গেলেন। খায়বার দুর্গের অবরোধ দীর্ঘতর হতে থাকল। দুর্গগুলো বিজয় তাঁদের জন্য সহজ হচ্ছিল না। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিগণকে বললেন, 'আগামীকাল পতাকা এমন একজনের হাতে দিব, যাঁর হাতে আল্লাহ তাআলা বিজয় দান করবেন। সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে ভালোবাসে। আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলও তাঁকে ভালোবাসেন।' সকালবেলা সবাই নবিজির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন; প্রত্যেকের আকাঙ্ক্ষা ছিল, পতাকা তাকে দেওয়া হোক।

সবার অপেক্ষার পালা শেষ করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ডাকলেন—'আলি বিন আবু তালিব কোথায়?' সবাই জবাব দিলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আলির উভয় চোখ অসুস্থ। তাঁর চোখে প্রচণ্ড ব্যথা। তাঁর পুরো চোখ ফুলে গেছে, তিনি কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ডেকে পাঠালেন।

সাহাবিগণ আলির হাত ধরে নবিজির সামনে এনে বসিয়ে দিলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর উভয় চোখে থুথু মোবারক লাগিয়ে দিলেন এবং দুআ করলেন। মুহূর্তেই আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর উভয় চোখ ভালো হয়ে গেল। মনে হলো কোনো ব্যথাই ছিল না। অতঃপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর হাতে যুদ্ধের পতাকা দিলেন। আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তারা আমাদের মতো হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত যুদ্ধ করতেই থাকব।'

নবিজি বললেন-

انْفُذْ عَلَى رِسْلِكَ حَتَّى تَنْزِلَ بِسَاحَتِهِمْ ثُمَّ ادْعُهُمْ إِلَى الْإِسْلَامِ وَأَخْبِرْهُمْ بِمَا يَجِبُ عَلَيْهِمْ فَوَاللَّهِ لَأَنْ يَهْدِيَ اللَّهُ بِكَ رَجُلًا خَيْرٌ لَكَ مِنْ أَنْ يَكُونَ لَكَ حُمْরُ النَّعَمِ .

'তাদের এলাকায় প্রবেশ করার পূর্ব পর্যন্ত খুব ধীরে ধীরে কাজ করবে। তারপর তাদের ইসলামের প্রতি আহ্বান করবে এবং তাদের করণীয় সম্পর্কে অবহিত করবে। আল্লাহর শপথ, যদি আল্লাহ তাআলা তোমার মাধ্যমে কাউকে হেদায়াত দান করেন, তাহলে তা তোমার জন্য লাল উটের চেয়েও কল্যাণকর হবে।

📘 আমাদের সোনালী অতীত 📄 পূর্বসূরিদের রমজান

📄 পূর্বসূরিদের রমজান


ইমাম সালেহ ইবরাহিম বিন হানিয়ি বার্ধক্যে পৌঁছা পর্যন্ত অধিকহারে রোজা রাখতেন। তিনি মরণরোগে আক্রান্ত হলেন। আসরের পর তাঁর মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তাঁর হেঁচকি শুরু হয়েছিল, থুথু নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল এবং জিহ্বা শুকিয়ে গিয়েছিল। পুত্রের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, 'বেটা, আমি পিপাসার্ত।' তখন তাঁর ছেলে পানি নিয়ে এল। পানি তাঁর মুখের কাছে দেওয়ার পর তিনি ঠোঁট বন্ধ করে ফেললেন; বললেন, 'সূর্য ডুবেছে কি?' পুত্র বলল, 'না।' তখন পানির পাত্র মুখ থেকে সরিয়ে ফেললেন। ছেলে পানি পান করার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকল আর তিনি নিষেধ করতে থাকলেন। তাই পুত্র মাগরিবের আজানের অপেক্ষা করতে থাকল। শায়খ কিছুক্ষণ চুপ থেকে পড়লেন-
لِمِثْلِ هَذَا فَلْيَعْمَلِ الْعَامِلُونَ.
'এরূপ সাফল্যের জন্য সাধকদের সাধনা করা উচিত।' [সুরা সাফফাত : ৬১]

তিনি কালিমায়ে শাহাদাত পড়তে পড়তে ইনতেকাল করলেন। নাফিসা বিনতে হাসান। পবিত্র ঘরের একজন সতী নারী। তিনি অধিকহারে রোজা রাখতেন। তিনি যখন বৃদ্ধ হলেন, তাঁর হাড় শুকিয়ে গেল। যখন তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হতে যাচ্ছিলেন, তখনও তিনি রোজাদার ছিলেন। তাঁর কঠিন মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হলো। তাঁর সন্তানরা জোরপূর্বক তাঁর মুখে পানির ফোঁটা দিতে চাচ্ছিল। তিনি সন্তানদের দিকে তাকালেন, তাঁর ঠোঁটযুগল সংকুচিত হয়ে গেছে, জিহ্বা ভারী হয়ে এসেছে। এমতাবস্থায় সন্তানদের বললেন, 'আশ্চর্য! আমি আজ ৩০ বছর ধরে আল্লাহর কাছে দুআ করছি, “তুমি রোজা অবস্থায় আমাকে মৃত্যু দিয়ো।” আর আমি এখন রোজা অবস্থায় থেকেও রোজা ভাঙব? এটা হতে পারে না।' এরপর তিনি কুরআন কারিম তেলাওয়াত শুরু করলেন। দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন এই আয়াতে পৌঁছে—
قُلْ لِمَنْ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ قُلْ لِلَّهِ كَتَبَ عَلَى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ.
'বলো, আকাশ ও জমিনসমূহে যা আছে তা কার? বলো, আল্লাহর। তিনি নিজের ওপর রহমত লিখে নিয়েছেন।' [সুরা আনআম : ১২]

হ্যাঁ, তাঁরা ছিলেন নেককার ও সৎকর্মশীল। তাঁরা তাঁদের প্রতিপালককে ভালোবেসেছেন, তাই প্রতিপালকও তাঁদের ভালোবেসেছেন। তাঁরা আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করতে চেয়েছেন, আল্লাহ তাআলাও নৈকট্য দান করেছেন।

ইমাম ইবনু আবি আদি বলেন, দাউদ ইবনু আবি হিন্দ সুদীর্ঘ ৪০ বছর এক দিন রোজা রাখতেন, এক দিন রোজা ছাড়তেন। কিন্তু বিষয়টি তাঁর পরিবারের কেউ জানত না। জিজ্ঞেস করা হলো, 'কীভাবে এটা সম্ভব হয়েছে?' বললেন, 'তিনি মুচি ছিলেন। প্রতিদিন খাবার নিয়ে বাড়ি থেকে দোকানের দিকে যেতেন। যদি রোজা না রাখতেন, খানা খেয়ে নিতেন। আর রোজা রাখলে, পথে কোনো মিসকিনকে দান করে দিতেন। সন্ধ্যায় বাড়ি এসে পরিবারের সাথে খাবার খেতেন।'

আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা অধিকহারে রোজা রাখতেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তিনি বলেছেন, 'দুনিয়া থেকে আমার বিদায়ের সময় কেবল তিনটা জিনিস ছুটে যাওয়ার আফসোস করছি-
প্রথম কঠিন দিনে পিপাসার্ত না থাকার আফসোস। অর্থাৎ এমন দিনে রোজা ছেড়ে দেওয়ার আফসোস, যেদিন তীব্র রোদ ও গরমের কারণে প্রচণ্ড পিপাসা লাগে। তিনি বলেন, প্রথমত কঠিন দিনের রোজা ছাড়ার আফসোস, শেষরাতে আল্লাহর ইবাদত না করার আফসোস এবং আমার জীবদ্দশায় সামনে আসা বিদ্রোহী হাজ্জাজের দলের বিরুদ্ধে জিহাদ না করার আফসোস।

হ্যাঁ, আমাদের পূর্বসূরিগণ রোজার প্রতি খুব যত্নবান থাকতেন এবং এটাকেই জান্নাতের পাথেয় বানাতেন। রোজার ফরজ বিধানের আল্লাহপ্রদত্ত হেকমত তাঁরা অনুধাবন করতে পারতেন। আর বর্তমানে! রোজা তো অনেক মানুষই রাখে; কিন্তু এমন মানুষ খুব কমই আছে, যারা রোজার মহত্ব অনুধাবন করতে পারে।

ইমাম সালেহ ইবরাহিম বিন হানিয়ি বার্ধক্যে পৌঁছা পর্যন্ত অধিকহারে রোজা রাখতেন। তিনি মরণরোগে আক্রান্ত হলেন। আসরের পর তাঁর মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তাঁর হেঁচকি শুরু হয়েছিল, থুথু নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল এবং জিহ্বা শুকিয়ে গিয়েছিল। পুত্রের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, 'বেটা, আমি পিপাসার্ত।' তখন তাঁর ছেলে পানি নিয়ে এল। পানি তাঁর মুখের কাছে দেওয়ার পর তিনি ঠোঁট বন্ধ করে ফেললেন; বললেন, 'সূর্য ডুবেছে কি?' পুত্র বলল, 'না।' তখন পানির পাত্র মুখ থেকে সরিয়ে ফেললেন। ছেলে পানি পান করার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকল আর তিনি নিষেধ করতে থাকলেন। তাই পুত্র মাগরিবের আজানের অপেক্ষা করতে থাকল।

শায়খ কিছুক্ষণ চুপ থেকে পড়লেন-

لِمِثْلِ هَذَا فَلْيَعْمَلِ الْعَامِلُونَ. 'এরূপ সাফল্যের জন্য সাধকদের সাধনা করা উচিত।' [সুরা সাফফাত : ৬১]

তিনি কালিমায়ে শাহাদাত পড়তে পড়তে ইনতেকাল করলেন। নাফিসা বিনতে হাসান। পবিত্র ঘরের একজন সতী নারী। তিনি অধিকহারে রোজা রাখতেন। তিনি যখন বৃদ্ধ হলেন, তাঁর হাড় শুকিয়ে গেল। যখন তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হতে যাচ্ছিলেন, তখনও তিনি রোজাদার ছিলেন। তাঁর কঠিন মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হলো। তাঁর সন্তানরা জোরপূর্বক তাঁর মুখে পানির ফোঁটা দিতে চাচ্ছিল। তিনি সন্তানদের দিকে তাকালেন, তাঁর ঠোঁটযুগল সংকুচিত হয়ে গেছে, জিহ্বা ভারী হয়ে এসেছে। এমতাবস্থায় সন্তানদের বললেন, 'আশ্চর্য! আমি আজ ৩০ বছর ধরে আল্লাহর কাছে দুআ করছি, “তুমি রোজা অবস্থায় আমাকে মৃত্যু দিয়ো।” আর আমি এখন রোজা অবস্থায় থেকেও রোজা ভাঙব? এটা হতে পারে না।' এরপর তিনি কুরআন কারিম তেলাওয়াত শুরু করলেন। দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন এই আয়াতে পৌঁছে—

قُلْ لِمَنْ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ قُلْ لِلَّهِ كَتَبَ عَلَى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ.

'বলো, আকাশ ও জমিনসমূহে যা আছে তা কার? বলো, আল্লাহর। তিনি নিজের ওপর রহমত লিখে নিয়েছেন।' [সুরা আনআম : ১২]

হ্যাঁ, তাঁরা ছিলেন নেককার ও সৎকর্মশীল। তাঁরা তাঁদের প্রতিপালককে ভালোবেসেছেন, তাই প্রতিপালকও তাঁদের ভালোবেসেছেন। তাঁরা আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করতে চেয়েছেন, আল্লাহ তাআলাও নৈকট্য দান করেছেন। ইমাম ইবনু আবি আদি বলেন, দাউদ ইবনু আবি হিন্দ সুদীর্ঘ ৪০ বছর এক দিন রোজা রাখতেন, এক দিন রোজা ছাড়তেন। কিন্তু বিষয়টি তাঁর পরিবারের কেউ জানত না। জিজ্ঞেস করা হলো, 'কীভাবে এটা সম্ভব হয়েছে?' বললেন, 'তিনি মুচি ছিলেন। প্রতিদিন খাবার নিয়ে বাড়ি থেকে দোকানের দিকে যেতেন। যদি রোজা না রাখতেন, খানা খেয়ে নিতেন। আর রোজা রাখলে, পথে কোনো মিসকিনকে দান করে দিতেন। সন্ধ্যায় বাড়ি এসে পরিবারের সাথে খাবার খেতেন।'

আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা অধিকহারে রোজা রাখতেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তিনি বলেছেন, 'দুনিয়া থেকে আমার বিদায়ের সময় কেবল তিনটা জিনিস ছুটে যাওয়ার আফসোস করছি- প্রথম কঠিন দিনে পিপাসার্ত না থাকার আফসোস। অর্থাৎ এমন দিনে রোজা ছেড়ে দেওয়ার আফসোস, যেদিন তীব্র রোদ ও গরমের কারণে প্রচণ্ড পিপাসা লাগে। তিনি বলেন, প্রথমত কঠিন দিনের রোজা ছাড়ার আফসোস, শেষরাতে আল্লাহর ইবাদত না করার আফসোস এবং আমার জীবদ্দশায় সামনে আসা বিদ্রোহী হাজ্জাজের দলের বিরুদ্ধে জিহাদ না করার আফসোস। হ্যাঁ, আমাদের পূর্বসূরিগণ রোজার প্রতি খুব যত্নবান থাকতেন এবং এটাকেই জান্নাতের পাথেয় বানাতেন। রোজার ফরজ বিধানের আল্লাহপ্রদত্ত হেকমত তাঁরা অনুধাবন করতে পারতেন। আর বর্তমানে! রোজা তো অনেক মানুষই রাখে; কিন্তু এমন মানুষ খুব কমই আছে, যারা রোজার মহত্ব অনুধাবন করতে পারে।

📘 আমাদের সোনালী অতীত 📄 ইহুদি এবং সুযোগ-বঞ্চনা

📄 ইহুদি এবং সুযোগ-বঞ্চনা


আল্লাহ তাআলা ইহুদিদের কাছে মুসা আলাইহিস সালামকে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে ইহুদিদের সুসংবাদ দিয়েছেন। তারপর এসেছেন ইসা আলাইহিস সালাম, তিনিও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে তাদের সুসংবাদ দিয়েছেন। তাঁদের সকলের প্রতি সর্বোত্তম শান্তি এবং রহমত বর্ষিত হোক।

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আবির্ভূত হয়েছিলেন, তখন চোখের পলকেও তারা নবিজির সত্যতার ব্যাপারে কোনো অভিযোগ করেনি। তারা জানত, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই সেই শেষনবি, মুসা আলাইহিস সালাম যাঁর আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন। তারা এটাও জানত, তাদের উভয়কালীন মুক্তি ইসলাম কবুল করার মাঝেই। তারা এ-ও জানত যে, তারা তাদের দ্বীন বিকৃত এবং ভেজালযুক্ত করে ফেলেছে; এতসত্ত্বেও তারা কেবল অহংকার এবং বিদ্বেষবশত ইসলাম অস্বীকার করেছে। সময় যত গড়াচ্ছিল, দিন ও বছর যত অতীত হচ্ছিল সত্যকে বোঝা সত্ত্বেও তার অনুসরণের ব্যাপারে তাদের প্রত্যেকের ভেতর দুর্বলতা সৃষ্টি হচ্ছিল।

অনুগ্রহপূর্বক খন্দকের যুদ্ধের সময়ে ইহুদিদের অবস্থার দিকে তাকান! কুরাইশবাহিনী এবং তাদের সাহায্যকারীরা যখন মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে তাদের সৈন্য প্রস্তুত করল এবং মদিনার দিকে যাত্রা করল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবিগণ পেরেশান হয়ে গেলেন, কী করবেন! তখন তাঁরা প্রত্যক্ষ করলেন, মদিনা তিন দিক থেকে পাহাড়-বেষ্টিত। সুতরাং মুসলিমরা বুঝতে পারলেন যে, কাফিররা কেবল এক দিক থেকেই মদিনার ওপর আক্রমণ করতে পারবে, সেটা হলো সমতলভূমি। তাই কাফিরদের গতিরোধ করার জন্য মুসলিমরা মদিনার প্রবেশপথে পরিখা খনন করলেন। কাফিররা মদিনার নিকট পৌঁছে যখন পরিখা দেখল, হতভম্ব ও পেরেশান হয়ে গেল; কীভাবে তারা মুসলিমদের পরাভূত করবে! তাই পরিখার ওপারেই ক্যাম্প স্থাপন করল; মদিনায় প্রবেশ করতে পারল না।

ওদিকে মদিনায় ইহুদিদের কয়েকটি গোত্র ছিল, তাদের মধ্যে একটি হলো বনু কুরাইজা। তারা তাদের দুর্গে অবস্থান করছিল। তাদের মাঝে এবং নবিজির মাঝে চুক্তি হয়েছিল যে, তারা পরস্পর যুদ্ধে জড়াবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্যও করবে না। কিন্তু ইহুদিরা স্বভাবত প্রতারক, ধোঁকাবাজ, দুর্নীতিপরায়ণ। যখন তারা মক্কার কাফিরদের যৌথবাহিনীর শক্তি এবং মুসলিমদের কষ্ট দেখল, তারা মনে করল, এটাই ইসলামের শেষ। সুতরাং প্রতিশ্রুতি ও চুক্তি ভঙ্গ করল এবং কাফিরদের নিকট সংবাদ পাঠাল যে, তারা তাদের যেকোনোভাবে সাহায্য করবে। এখানেই শেষ নয়; তারা যখন মুসলিমদের পরিখার নিকট যুদ্ধে লিপ্ত দেখল, মদিনার অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়ল এবং মুসলিমদের বাড়িঘরের ওপর বাঁকা দৃষ্টি দিতে আরম্ভ করল, যেখানে নারী ও শিশুরা অবস্থান করছিল।

একপর্যায়ে তারা হাসান বিন সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহুর দায়িত্বে থাকা দুর্গের নিকট পৌঁছে গেল। সেখানে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীগণ ছাড়াও আরও কিছু মুমিন রমণী এবং শিশু অবস্থান করছিল। যদি আল্লাহ তাআলা তাদের চক্রান্তকে নস্যাৎ না করতেন, তাহলে তারা সেখানে আক্রমণ করে এবং তাদের হত্যা করে শোকের আবহ সৃষ্টি করেছিল প্রায়! তখনো মুসলিমদের ওপর যুদ্ধ চেপেই ছিল এবং ইহুদিরা তাদের দুর্গে অবস্থান করে দূর থেকে কাফিরদের সাহায্য করছিল।

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবিগণের ওপর কয়েকটা দিন খুব কঠিন অতিক্রম হলো। তাঁদের চোখগুলো বাঁকা হয়ে পড়েছিল এবং প্রাণ হয়েছিল ওষ্ঠাগত! এমন সময় আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করলেন। মুসলিম সেনাবাহিনীকে শক্তি দান করলেন, কাফিরদের যৌথবাহিনীকে একাই পরাভূত করলেন এবং কুরাইশের কাফিররা মক্কার দিকে পালিয়ে গেল। তারপর আল্লাহ তাআলা ইহুদিদের চক্রান্ত নস্যাৎ করলেন। মুসলিমরা তাদের দুর্গগুলো অবরোধ করে বসলেন। ইহুদিরা তাদের প্রতারণা ও ধোঁকাবাজির কারণে কার্যত শাস্তির উপযুক্ত হয়ে গিয়েছিল।

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনু কুরাইজার ইহুদিদের নিকট গেলেন এবং তাদের দুর্গের বাইরে মোর্চা স্থাপন করলেন। তাদের প্রস্তাব দেওয়া হলো, আত্মসমর্পণ করো। তারা অস্বীকার করল। ফলে তাদের অবরোধ করে রাখা হলো। অবরোধ এক দিন, দুদিন, তিন দিন করতে করতে এক সপ্তাহ, দু সপ্তাহ পার হয়ে গেল। এভাবে অবরোধ দীর্ঘ ২৫ দিন গত হলো।

অতঃপর অবরোধ যখন তাদের কাবু করে ফেলল, আল্লাহ তাআলা তাদের হৃদয়ে ভয় ঢুকিয়ে দিলেন। তারা দেখল, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের শিক্ষা দিতে বদ্ধপরিকর, তখন তারা বৈঠকে বসল। তাদের মধ্য থেকে তাদের নেতা কাআব বিন আসাদ দাঁড়িয়ে বলল, 'হে ইহুদিরা, তোমরা দেখছই যে, তোমরা কেমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছ! আমি তোমাদের সামনে তিনটি প্রস্তাব দিচ্ছি, তোমরা যেটি মন চায় গ্রহণ করতে পারো।'

তারা বলল, 'সেগুলো কী কী?' সে বলল, 'আমরা এই লোকটির আনুগত্য করব, তাকে সত্যায়ন করব এবং তার প্রতি ইমান আনয়ন করব। আল্লাহর শপথ, তোমাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, তিনি আল্লাহর প্রেরিত নবি। তিনি সেই রাসুল, যার কথা তোমরা তোমাদের কিতাবে পড়েছ। তাহলে তোমরা তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ, তোমাদের সন্তান এবং তোমাদের স্ত্রী সবকিছুর নিরাপত্তা পাবে।'

তখন তারা একে অন্যের দিকে চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল এবং ভরা অহংকার নিয়ে বলল, 'আমরা তাওরাতের বিধান ছাড়ব না এবং তাওরাত ব্যতীত অন্যকিছু গ্রহণ করব না।' কাআব বলল, 'তোমরা যখন এটা অস্বীকার করছ, তাহলে দ্বিতীয় প্রস্তাবটি ভেবে দেখো, সে আমাদের হত্যা করবে। ভয় কেবল নারী ও শিশুদের। অতএব আমরা নিজেরাই আমাদের নারী ও শিশুদের হত্যা করব, তারপর মুহাম্মদ ও তার সাথিদের সামনে বের হব। সকলেই থাকব অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। এমন কোনো জিনিস রেখে যাব না, যার কারণে ভয় সৃষ্টি হবে। এভাবে চলবে আমাদের এবং মুহাম্মদের মাঝে আল্লাহর ফায়সালা হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। যদি আমরা ধ্বংস হই ধ্বংস হব, আমাদের পিছে কোনো বংশ রেখে যাব না। যদি আমরা বিজয়ী হই, তাহলে অবশ্যই জীবনে নারী-শিশু পাব।'

সকলেই হুল্লোড় দিয়ে উঠল এবং বলল, 'আমরা কি এই মিসকিনদের হত্যা করব? এ রকম জীবনের কী মূল্য আছে?' কাআব বলল, 'যদি এই প্রস্তাবকেও অস্বীকার করো, তাহলে তৃতীয় ও শেষ প্রস্তাবটি হলো, সাপ্তাহিক রাত। সে রাতে মুহাম্মদ এবং তার সাহাবিরা নিরাপদ মনে করে অপ্রস্তুত থাকবে। কারণ, আমাদের ধর্মে সেদিন কারও প্রতি আক্রমণ করার বিধান নেই। এই ভেবে মুহাম্মদ ও তার সাথিরা নিশ্চিন্তে থাকবে। তখন তাদের প্রতি হামলে পড়ব, হয়তো আমরা মুহাম্মদ এবং তার সাথিদের ধোঁকা দিতে পারব।'

তারা বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করতে থাকল। কেউ বলল, 'আমরা কি সাপ্তাহিক রাতটা নষ্ট করব এবং সে রাতে এমন কলঙ্কের ইতিহাস রচনা করব, যা আমাদের পূর্বপুরুষেরা করেনি? তুমি কি জানো না, এই সাপ্তাহিক রাতের বিধান উপেক্ষা করার কারণে একদল লোক কীভাবে বানরে রূপান্তর হয়েছিল!' কাআব কিছুক্ষণ চুপ থাকল এবং এই কাপুরুষদের ব্যাপারে ভাবতে লাগল, যে তাদের মাথায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার কোনো যোগ্যতাই নেই। অবস্থাকে পাল্টে দেওয়ার কোনো শক্তিও নেই। কোনো স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার অবস্থাও নেই। সত্যের দিকে ফিরে যাওয়ার সৎসাহসও নেই। তারপর বলল, 'হে ইহুদি সমাজ, তোমাদের কেউ মায়ের পেট থেকে জন্মগ্রহণ করার পর থেকে এ পর্যন্ত কোনো বিষয়ে দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেনি!'

আল্লাহ তাআলা ইহুদিদের কাছে মুসা আলাইহিস সালামকে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে ইহুদিদের সুসংবাদ দিয়েছেন। তারপর এসেছেন ইসা আলাইহিস সালাম, তিনিও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে তাদের সুসংবাদ দিয়েছেন। তাঁদের সকলের প্রতি সর্বোত্তম শান্তি এবং রহমত বর্ষিত হোক।

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আবির্ভূত হয়েছিলেন, তখন চোখের পলকেও তারা নবিজির সত্যতার ব্যাপারে কোনো অভিযোগ করেনি। তারা জানত, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই সেই শেষনবি, মুসা আলাইহিস সালাম যাঁর আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন। তারা এটাও জানত, তাদের উভয়কালীন মুক্তি ইসলাম কবুল করার মাঝেই। তারা এ-ও জানত যে, তারা তাদের দ্বীন বিকৃত এবং ভেজালযুক্ত করে ফেলেছে; এতসত্ত্বেও তারা কেবল অহংকার এবং বিদ্বেষবশত ইসলাম অস্বীকার করেছে। সময় যত গড়াচ্ছিল, দিন ও বছর যত অতীত হচ্ছিল সত্যকে বোঝা সত্ত্বেও তার অনুসরণের ব্যাপারে তাদের প্রত্যেকের ভেতর দুর্বলতা সৃষ্টি হচ্ছিল।

অনুগ্রহপূর্বক খন্দকের যুদ্ধের সময়ে ইহুদিদের অবস্থার দিকে তাকান! কুরাইশবাহিনী এবং তাদের সাহায্যকারীরা যখন মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে তাদের সৈন্য প্রস্তুত করল এবং মদিনার দিকে যাত্রা করল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবিগণ পেরেশান হয়ে গেলেন, কী করবেন! তখন তাঁরা প্রত্যক্ষ করলেন, মদিনা তিন দিক থেকে পাহাড়-বেষ্টিত। সুতরাং মুসলিমরা বুঝতে পারলেন যে, কাফিররা কেবল এক দিক থেকেই মদিনার ওপর আক্রমণ করতে পারবে, সেটা হলো সমতলভূমি। তাই কাফিরদের গতিরোধ করার জন্য মুসলিমরা মদিনার প্রবেশপথে পরিখা খনন করলেন।

কাফিররা মদিনার নিকট পৌঁছে যখন পরিখা দেখল, হতভম্ব ও পেরেশান হয়ে গেল; কীভাবে তারা মুসলিমদের পরাভূত করবে! তাই পরিখার ওপারেই ক্যাম্প স্থাপন করল; মদিনায় প্রবেশ করতে পারল না। ওদিকে মদিনায় ইহুদিদের কয়েকটি গোত্র ছিল, তাদের মধ্যে একটি হলো বনু কুরাইজা। তারা তাদের দুর্গে অবস্থান করছিল। তাদের মাঝে এবং নবিজির মাঝে চুক্তি হয়েছিল যে, তারা পরস্পর যুদ্ধে জড়াবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্যও করবে না।

কিন্তু ইহুদিরা স্বভাবত প্রতারক, ধোঁকাবাজ, দুর্নীতিপরায়ণ। যখন তারা মক্কার কাফিরদের যৌথবাহিনীর শক্তি এবং মুসলিমদের কষ্ট দেখল, তারা মনে করল, এটাই ইসলামের শেষ। সুতরাং প্রতিশ্রুতি ও চুক্তি ভঙ্গ করল এবং কাফিরদের নিকট সংবাদ পাঠাল যে, তারা তাদের যেকোনোভাবে সাহায্য করবে। এখানেই শেষ নয়; তারা যখন মুসলিমদের পরিখার নিকট যুদ্ধে লিপ্ত দেখল, মদিনার অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়ল এবং মুসলিমদের বাড়িঘরের ওপর বাঁকা দৃষ্টি দিতে আরম্ভ করল, যেখানে নারী ও শিশুরা অবস্থান করছিল।

একপর্যায়ে তারা হাসান বিন সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহুর দায়িত্বে থাকা দুর্গের নিকট পৌঁছে গেল। সেখানে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীগণ ছাড়াও আরও কিছু মুমিন রমণী এবং শিশু অবস্থান করছিল। যদি আল্লাহ তাআলা তাদের চক্রান্তকে নস্যাৎ না করতেন, তাহলে তারা সেখানে আক্রমণ করে এবং তাদের হত্যা করে শোকের আবহ সৃষ্টি করেছিল প্রায়! তখনো মুসলিমদের ওপর যুদ্ধ চেপেই ছিল এবং ইহুদিরা তাদের দুর্গে অবস্থান করে দূর থেকে কাফিরদের সাহায্য করছিল।

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবিগণের ওপর কয়েকটা দিন খুব কঠিন অতিক্রম হলো। তাঁদের চোখগুলো বাঁকা হয়ে পড়েছিল এবং প্রাণ হয়েছিল ওষ্ঠাগত! এমন সময় আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করলেন। মুসলিম সেনাবাহিনীকে শক্তি দান করলেন, কাফিরদের যৌথবাহিনীকে একাই পরাভূত করলেন এবং কুরাইশের কাফিররা মক্কার দিকে পালিয়ে গেল। তারপর আল্লাহ তাআলা ইহুদিদের চক্রান্ত নস্যাৎ করলেন। মুসলিমরা তাদের দুর্গগুলো অবরোধ করে বসলেন। ইহুদিরা তাদের প্রতারণা ও ধোঁকাবাজির কারণে কার্যত শাস্তির উপযুক্ত হয়ে গিয়েছিল।

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনু কুরাইজার ইহুদিদের নিকট গেলেন এবং তাদের দুর্গের বাইরে মোর্চা স্থাপন করলেন। তাদের প্রস্তাব দেওয়া হলো, আত্মসমর্পণ করো। তারা অস্বীকার করল। ফলে তাদের অবরোধ করে রাখা হলো। অবরোধ এক দিন, দুদিন, তিন দিন করতে করতে এক সপ্তাহ, দু সপ্তাহ পার হয়ে গেল। এভাবে অবরোধ দীর্ঘ ২৫ দিন গত হলো। অতঃপর অবরোধ যখন তাদের কাবু করে ফেলল, আল্লাহ তাআলা তাদের হৃদয়ে ভয় ঢুকিয়ে দিলেন। তারা দেখল, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের শিক্ষা দিতে বদ্ধপরিকর, তখন তারা বৈঠকে বসল। তাদের মধ্য থেকে তাদের নেতা কাআব বিন আসাদ দাঁড়িয়ে বলল, 'হে ইহুদিরা, তোমরা দেখছই যে, তোমরা কেমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছ! আমি তোমাদের সামনে তিনটি প্রস্তাব দিচ্ছি, তোমরা যেটি মন চায় গ্রহণ করতে পারো।'

তারা বলল, 'সেগুলো কী কী?' কাআব বলল, 'আমরা এই লোকটির আনুগত্য করব, তাকে সত্যায়ন করব এবং তার প্রতি ইমান আনয়ন করব। আল্লাহর শপথ, তোমাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, তিনি আল্লাহর প্রেরিত নবি। তিনি সেই রাসুল, যার কথা তোমরা তোমাদের কিতাবে পড়েছ। তাহলে তোমরা তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ, তোমাদের সন্তান এবং তোমাদের স্ত্রী সবকিছুর নিরাপত্তা পাবে।' তখন তারা একে অন্যের দিকে চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল এবং ভরা অহংকার নিয়ে বলল, 'আমরা তাওরাতের বিধান ছাড়ব না এবং তাওরাত ব্যতীত অন্যকিছু গ্রহণ করব না।'

কাআব বলল, 'তোমরা যখন এটা অস্বীকার করছ, তাহলে দ্বিতীয় প্রস্তাবটি ভেবে দেখো, সে আমাদের হত্যা করবে। ভয় কেবল নারী ও শিশুদের। অতএব আমরা নিজেরাই আমাদের নারী ও শিশুদের হত্যা করব, তারপর মুহাম্মদ ও তার সাথিদের সামনে বের হব। সকলেই থাকব অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। এমন কোনো জিনিস রেখে যাব না, যার কারণে ভয় সৃষ্টি হবে। এভাবে চলবে আমাদের এবং মুহাম্মদের মাঝে আল্লাহর ফায়সালা হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। যদি আমরা ধ্বংস হই ধ্বংস হব, আমাদের পিছে কোনো বংশ রেখে যাব না। যদি আমরা বিজয়ী হই, তাহলে অবশ্যই জীবনে নারী-শিশু পাব।' সকলেই হুল্লোড় দিয়ে উঠল এবং বলল, 'আমরা কি এই মিসকিনদের হত্যা করব? এ রকম জীবনের কী মূল্য আছে?'

কাআব বলল, 'যদি এই প্রস্তাবকেও অস্বীকার করো, তাহলে তৃতীয় ও শেষ প্রস্তাবটি হলো, সাপ্তাহিক রাত। সে রাতে মুহাম্মদ এবং তার সাহাবিরা নিরাপদ মনে করে অপ্রস্তুত থাকবে। কারণ, আমাদের ধর্মে সেদিন কারও প্রতি আক্রমণ করার বিধান নেই। এই ভেবে মুহাম্মদ ও তার সাথিরা নিশ্চিন্তে থাকবে। তখন তাদের প্রতি হামলে পড়ব, হয়তো আমরা মুহাম্মদ এবং তার সাথিদের ধোঁকা দিতে পারব।' তারা বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করতে থাকল। কেউ বলল, 'আমরা কি সাপ্তাহিক রাতটা নষ্ট করব এবং সে রাতে এমন কলঙ্কের ইতিহাস রচনা করব, যা আমাদের পূর্বপুরুষেরা করেনি? তুমি কি জানো না, এই সাপ্তাহিক রাতের বিধান উপেক্ষা করার কারণে একদল লোক কীভাবে বানরে রূপান্তর হয়েছিল!' কাআব কিছুক্ষণ চুপ থাকল এবং এই কাপুরুষদের ব্যাপারে ভাবতে লাগল, যে তাদের মাথায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার কোনো যোগ্যতাই নেই। অবস্থাকে পাল্টে দেওয়ার কোনো শক্তিও নেই। কোনো স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার অবস্থাও নেই। সত্যের দিকে ফিরে যাওয়ার সৎসাহসও নেই। তারপর বলল, 'হে ইহুদি সমাজ, তোমাদের কেউ মায়ের পেট থেকে জন্মগ্রহণ করার পর থেকে এ পর্যন্ত কোনো বিষয়ে দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেনি!'

📘 আমাদের সোনালী অতীত 📄 মুসাইলামাতুল কাজ্জাব

📄 মুসাইলামাতুল কাজ্জাব


১০ হিজরি সাল। জাজিরাতুল আরবের নজদের অন্তর্গত ইয়ামামায় আত্মপ্রকাশ করল ভণ্ডনবি মুসাইলামাতুল কাজ্জাব। সে দাবি করল, 'আমি নবি ও রাসুল এবং আমার প্রতিও কুরআন অবতীর্ণ হয়।' তার উপর অবতীর্ণ কুরআনের আয়াত হিসেবে এই বাক্যগুলো পড়ত—
والطاحنات طحنا والعاجنات عجনা والخابزات خبزا والثادرات ثরদা - واللاقمাত لقমা .
'ভালোভাবে চাক্কি পেষণকারিণীর শপথ, ভালোভাবে খামিরা তৈরিকারিণীর শপথ, ভালোভাবে রুটি তৈরিকারিণীর শপথ, ভালোভাবে দুধদায়িনীর শপথ, ভালোভাবে লোকমাদানকারিণীর শপথ।'
এভাবে উল্টাপাল্টা বেহুদা বাক্য তৈরি করে করে প্রচার করত এবং বলত, এগুলোও কুরআন। তার এমন অসার কথা শুনে সমাজের লোকজন তাকে তিরস্কার করল। কেবল বোকা রাখালেরা তার অনুসারী হলো এবং একদল সমর্থক ও সৈন্য তৈরি হলো। এতে সে আত্মঅহমিকায় আক্রান্ত হলো। সে নবিজির কাছে চিঠি পাঠাল—
'আল্লাহর রাসুল মুসাইলামার পক্ষ থেকে আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদের প্রতি। আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। আমি নবুওয়াতের ক্ষেত্রে আপনার অংশীদার হয়েছি। জমিনের অর্ধেক আমাদের আর অর্ধেক কুরাইশের। কিন্তু কুরাইশরা সীমালঙ্ঘনকারী জাতি।'
নবিজিকে চিঠি পাঠ করে শুনানো হলো। আল্লাহর প্রতি তার দুঃসাহস দেখে নবিজি বিস্মিত হলেন। চিঠির জবাবে লেখা হলো—
'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে মিথ্যাবাদী মুসাইলামার প্রতি। যে ব্যক্তি হেদায়াত অনুসরণ করে তার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। জমিনের অধিপতি আল্লাহ তাআলা। বান্দাদের মধ্যে তিনি যাকে চান তার উত্তরাধিকারী করেন। আর উত্তম পরিণাম কেবল মুত্তাকিদের জন্য।'

তারপর নবিজি সাহাবিগণের দিকে তাকিয়ে একজন বিচক্ষণ দুঃসাহসী মুজাহিদ খুঁজছিলেন, যাকে মুসাইলামার কাছে চিঠি দিয়ে পাঠাবেন। পরিশেষে হজরত হাবিব বিন জায়েদকে নির্বাচন করেন। তিনি ছিলেন টগবগে যুবক। প্রবৃত্তির কারণে দ্বীনের সেবাকে ত্যাগ করেননি কখনো, কোনো স্বাদআহ্লাদের কারণে প্রতিপালককে ভুলে জানি্ন। তার কলব ইসলামের সত্যায়ন ও ইমানে ভরপুর। তিনি রাত কাটান তাসবিহ পড়ে এবং কুরআন তিলাওয়াত করে।
নবিজির হাত থেকে হাবিব বিন জায়েদ চিঠি গ্রহণ করলেন এবং মদিনা থেকে ইয়ামামার উদ্দেশে যাত্রা করলেন। এক হাজার মাইলেরও অধিক পথ অতিক্রম করে তিনি মুসাইলামাতুল কাজ্জাবের কাছে পৌঁছুলেন। মুসাইলামার হাতে নবিজির চিঠি দিলেন। চিঠি পড়ে মুসাইলামা ক্রুদ্ধ ও অস্থির হয়ে পড়ল। সে তার সাথিদের জমায়েত করে হজরত হাবিব বিন জায়েদকে তার সামনে দাঁড় করিয়ে এই চিঠি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ আরম্ভ করল—
হাবিব: চিঠি পাঠিয়েছেন আল্লাহর রাসুল, সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
মুসাইলামা: তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল?
হাবিব: হ্যাঁ, আমি সাক্ষ্য দিই, নিশ্চয় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসুল।
মুসাইলামা: তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, আমিও আল্লাহর রাসুল?
হাবিব: উপহাসমূলক বললেন, আমার কানে কি সমস্যা হলো নাকি, আচ্ছা তুমি কী যেন বললে? তোমার কথা কে শোনে!
মুসাইলামা: আবার জিজ্ঞেস করল, তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল?
হাবিব: হ্যাঁ, আমি সাক্ষ্য দিই, নিশ্চয় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসুল।
মুসাইলামা: তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, আমিও আল্লাহর রাসুল?
হাবিব: আমি কিছু শুনতে পাচ্ছি না।
মুসাইলামা প্রশ্নগুলো পুনরাবৃত্তি করলে হজরত হাবিব বিন জায়েদ পূর্বের মতোই জবাব দিলেন।

হজরত হাবিবের জবাব শুনে মুসাইলামা ক্ষিপ্ত হলো। জল্লাদকে ডেকে হজরত হাবিবের শরীরে আঘাত করার নির্দেশ দিলো। তারপর মুসাইলামা বারবার একই প্রশ্ন করছিল, হজরত হাবিবও একই জবাব দিচ্ছিলেন। মুসাইলামার ক্রোধও পূর্বের চেয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এবার মুসাইলামা নির্দেশ দিলো, হাবিবের মুখ খুলে জিহ্বা কেটে ফেলো। সুতরাং সৈন্যরা তাকে ধরে মুখ খুললো এবং হজরত হাবিব বিন জায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর জিহ্বা কেটে ফেলল। তাকে মুসাইলামার সামনে দাঁড় করালো, তখন হজরত হাবিবের পবিত্র মুখ থেকে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল।
মুসাইলামা চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল, তুমি কি সাক্ষ্য দাও, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল? হজরত হাবিব রাদিয়াল্লাহু আনহু মাথা দ্বারা ইশারা করে বললেন, হ্যাঁ, আমি সাক্ষ্য দিই, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসুল। এবার মুসাইলামা জিজ্ঞেস করল, তুমি কি সাক্ষ্য দাও, আমি আল্লাহর রাসুল? হজরত হাবিব মাথা দিয়ে ইশারা করে বললেন, না।

মুসাইলামা জল্লাদকে ডেকে নির্দেশ দিলে সে হজরত হাবিবের হাত কাটল, তারপর পা কাটল, নাক শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করল, কান আলাদা করে ফেলল, এভাবে শরীর টুকরো টুকরো করতে থাকল। তার শরীরের মাংসগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়েছিল, রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল স্রোতের গতিতে। হজরত হাবিব জমিনের উপর ছটফট করছিলেন এবং যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন, একসময় আল্লাহর ডাকে সাড়া দিলেন। নিথর হয়ে পড়ে থাকল তার লাশ। হ্যাঁ, তার জিহ্বা কেটেছে, শরীর টুকরো টুকরো করেছে, হাড্ডিগুলো ভেঙেছে আর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তিনি সবকিছু সহ্য করেছেন।

কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ তাআলা সামনে তাকে দণ্ডায়মান করা হবে এবং আল্লাহ তাআলা তাকে জিজ্ঞেস করবেন, হে আমার বান্দা–তোমার জিহ্বা কেন কাটা হয়েছে? কেন তোমার নাক কাটা হয়েছে? তোমার হাত কেন শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে? তোমার শরীরের রক্ত কেন প্রবাহিত করা হয়েছে? হজরত হাবিব জবাব দিবেন, হে সমগ্র জগতের প্রতিপালক, এসব কিছু তোমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য মেনে নিয়েছি, তুমি যদি রাজি হয়ে যাও, আঘাতের এসব যন্ত্রণা কিছুই নয়। হে জগতের প্রতিপালক, তোমার বড়ত্বের কারণেই এসব সহ্য করেছি। তোমার জন্যই কষ্ট আনন্দে পরিণত হয়েছে, ধৈর্য স্বাদে পরিণত হয়েছে, কান্না শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে, রক্ত মিশক আর সুগন্ধিতে পরিবর্তিত হয়েছে। হে আমার প্রতিপালক, দুনিয়াতে যদি কষ্ট দাও, কিয়ামতের দিন আমার চেহারাকে জ্যোতির্ময় করো।

তখন এই বান্দার সাক্ষাতে আল্লাহ তাআলা খুশি হবেন, তার কষ্টকে নেয়ামত দ্বারা পাল্টে দেবেন, তার মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন, তার পদস্খলন ক্ষমা করবেন, প্রতিপালক তাকে ডেকে কানে কানে বলবেন, হে আমার বান্দা আজ জান্নাতের যে প্রান্তে মনে চায় ঘুরে বেড়াও। আজ এমন নেয়ামত তোমাকে দেব, যার সাথে কখনো কোনো কষ্ট যোগ হবে না। এমন রাজ্য তোমাকে দান করব, যেখানে তোমার কোনো অংশীদার থাকবে না। প্রতিটি দরজা দিয়ে ফেরেশতাগণ তোমাকে সম্ভাষণ জানাতে যাবে, তোমার সামনে নেয়ামতের ভাণ্ডার রয়েছে, যা মনে চায় নিয়ে নাও। আমার কাছে আরও রয়েছে, রয়েছে অফুরন্ত, রয়েছে সুখশান্তি এবং সৌভাগ্যের আধার।

إِنَّ أَصْحُبَ الْجَنَّةِ الْيَوْمَ فِي شُغُلٍ فَكِهُوْনَ، هُمْ وَ أَزْوَاجُهُمْ فِي ظلْلٍ عَلَى الْأَرَائِكِ مُتَّكِوْনَ. لَهُمْ فِيهَا فَاكِهَةٌ وَلَهُمْ مَّا يَدَّعُوْনَ، سَلْمٌ قَوْلًا مِّنْ رَّبٍّ رَّحِيمٍ .
'এদিন জান্নাতিরা আনন্দে মশগুল থাকবে। তারা এবং তাদের স্ত্রীরা উপবিষ্ট থাকবে ছায়াময় পরিবেশে আসনে হেলান দিয়ে। সেখানে তাদের জন্যে থাকবে ফল-মূল এবং যা চাইবে। করুণাময় পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাদের বলা হবে 'সালাম'।' [সুরা ইয়াসিন, আয়াত ৫৫-৫৮]
তিনি দয়াময় প্রতিপালক। কলবের জীবন হলো তার ভালোবাসা। অন্তরের প্রশান্তি হলো তার মারিফাত। শরীরের শান্তি হলো তার ইবাদত। রুহের খোরাক হলো তার খেদমত। জিহ্বার পূর্ণতা হলো তার প্রশংসা ও জিকিরআজ-কার, জিহ্বার সম্মান হলো আল্লাহর দাসত্ব এবং কৃতজ্ঞতা।

১০ হিজরি সাল। জাজিরাতুল আরবের নজদের অন্তর্গত ইয়ামামায় আত্মপ্রকাশ করল ভণ্ডনবি মুসাইলামাতুল কাজ্জাব। সে দাবি করল, 'আমি নবি ও রাসুল এবং আমার প্রতিও কুরআন অবতীর্ণ হয়। তার উপর অবতীর্ণ কুরআনের আয়াত হিসেবে এই বাক্যগুলো পড়ত—

والطاحنات طحنا والعاجنات عجنا والخابزات خبزا والثادرات ثردا - واللاقمات لقما .

'ভালোভাবে চাক্কি পেষণকারিণীর শপথ, ভালোভাবে খামিরা তৈরিকারিণীর শপথ, ভালোভাবে রুটি তৈরিকারিণীর শপথ, ভালোভাবে দুধদায়িনীর শপথ, ভালোভাবে লোকমাদানকারিণীর শপথ।'

এভাবে উল্টাপাল্টা বেহুদা বাক্য তৈরি করে করে প্রচার করত এবং বলত, এগুলোও কুরআন। তার এমন অসার কথা শুনে সমাজের লোকজন তাকে তিরস্কার করল। কেবল বোকা রাখালেরা তার অনুসারী হলো এবং একদল সমর্থক ও সৈন্য তৈরি হলো। এতে সে আত্মঅহমিকায় আক্রান্ত হলো। সে নবিজির কাছে চিঠি পাঠাল—

'আল্লাহর রাসুল মুসাইলামার পক্ষ থেকে আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদের প্রতি। আপনার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। আমি নবুওয়াতের ক্ষেত্রে আপনার অংশীদার হয়েছি। জমিনের অর্ধেক আমাদের আর অর্ধেক কুরাইশের। কিন্তু কুরাইশরা সীমালঙ্ঘনকারী জাতি।'

নবিজিকে চিঠি পাঠ করে শুনানো হলো। আল্লাহর প্রতি তার দুঃসাহস দেখে নবিজি বিস্মিত হলেন। চিঠির জবাবে লেখা হলো—

'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে মিথ্যাবাদী মুসাইলামার প্রতি। যে ব্যক্তি হেদায়াত অনুসরণ করে তার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। জমিনের অধিপতি আল্লাহ তাআলা। বান্দাদের মধ্যে তিনি যাকে চান তার উত্তরাধিকারী করেন। আর উত্তম পরিণাম কেবল মুত্তাকিদের জন্য।'

তারপর নবিজি সাহাবিগণের দিকে তাকিয়ে একজন বিচক্ষণ দুঃসাহসী মুজাহিদ খুঁজছিলেন, যাকে মুসাইলামার কাছে চিঠি দিয়ে পাঠাবেন। পরিশেষে হজরত হাবিব বিন জায়েদকে নির্বাচন করেন। তিনি ছিলেন টগবগে যুবক। প্রবৃত্তির কারণে দ্বীনের সেবাকে ত্যাগ করেননি কখনো, কোনো স্বাদআহ্লাদের কারণে প্রতিপালককে ভুলে জানি, তার কলব ইসলামের সত্যায়ন ও ইমানে ভরপুর। তিনি রাত কাটান তাসবিহ পড়ে এবং কুরআন তিলাওয়াত করে। নবিজির হাত থেকে হাবিব বিন জায়েদ চিঠি গ্রহণ করলেন এবং মদিনা থেকে ইয়ামামার উদ্দেশে যাত্রা করলেন। এক হাজার মাইলেরও অধিক পথ অতিক্রম করে তিনি মুসাইলামাতুল কাজ্জাবের কাছে পৌঁছুলেন। মুসাইলামার হাতে নবিজির চিঠি দিলেন। চিঠি পড়ে মুসাইলামা ক্রুদ্ধ ও অস্থির হয়ে পড়ল। সে তার সাথিদের জমায়েত করে হজরত হাবিব বিন জায়েদকে তার সামনে দাঁড় করিয়ে এই চিঠি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ আরম্ভ করল—

হাবিব: চিঠি পাঠিয়েছেন আল্লাহর রাসুল, সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

মুসাইলামা : তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল?

হাবিব : হ্যাঁ, আমি সাক্ষ্য দিই, নিশ্চয় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসুল।

মুসাইলামা : তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, আমিও আল্লাহর রাসুল?

হাবিব : উপহাসমূলক বললেন, আমার কানে কি সমস্যা হলো নাকি, আচ্ছা তুমি কী যেন বললে? তোমার কথা কে শোনে!

মুসাইলামা : আবার জিজ্ঞেস করল, তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল?

হাবিব: হ্যাঁ, আমি সাক্ষ্য দিই, নিশ্চয় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসুল।

মুসাইলামা : তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, আমিও আল্লাহর রাসুল?

হাবিব: আমি কিছু শুনতে পাচ্ছি না।

মুসাইলামা প্রশ্নগুলো পুনরাবৃত্তি করলে হজরত হাবিব বিন জায়েদ পূর্বের মতোই জবাব দিলেন। হজরত হাবিবের জবাব শুনে মুসাইলামা ক্ষিপ্ত হলো। জল্লাদকে ডেকে হজরত হাবিবের শরীরে আঘাত করার নির্দেশ দিলো। তারপর মুসাইলামা বারবার একই প্রশ্ন করছিল, হজরত হাবিবও একই জবাব দিচ্ছিলেন। মুসাইলামার ক্রোধও পূর্বের চেয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এবার মুসাইলামা নির্দেশ দিলো, হাবিবের মুখ খুলে জিহ্বা কেটে ফেলো। সুতরাং সৈন্যরা তাকে ধরে মুখ খুললো এবং হজরত হাবিব বিন জায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর জিহ্বা কেটে ফেলল। তাকে মুসাইলামার সামনে দাঁড় করালো, তখন হজরত হাবিবের পবিত্র মুখ থেকে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল।

মুসাইলামা চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল, তুমি কি সাক্ষ্য দাও, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল? হজরত হাবিব রাদিয়াল্লাহু আনহু মাথা দ্বারা ইশারা করে বললেন, হ্যাঁ, আমি সাক্ষ্য দিই, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসুল। এবার মুসাইলামা জিজ্ঞেস করল, তুমি কি সাক্ষ্য দাও, আমি আল্লাহর রাসুল? হজরত হাবিব মাথা দিয়ে ইশারা করে বললেন, না।

মুসাইলামা জল্লাদকে ডেকে নির্দেশ দিলে সে হজরত হাবিবের হাত কাটল, তারপর পা কাটল, নাক শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করল, কান আলাদা করে ফেলল, এভাবে শরীর টুকরো টুকরো করতে থাকল। তার শরীরের মাংসগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়েছিল, রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল স্রোতের গতিতে। হজরত হাবিব জমিনের উপর ছটফট করছিলেন এবং যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন, একসময় আল্লাহর ডাকে সাড়া দিলেন। নিথর হয়ে পড়ে থাকল তার লাশ। হ্যাঁ, তার জিহ্বা কেটেছে, শরীর টুকরো টুকরো করেছে, হাড্ডিগুলো ভেঙেছে আর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তিনি সবকিছু সহ্য করেছেন। কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ তাআলার সামনে তাকে দণ্ডায়মান করা হবে এবং আল্লাহ তাআলা তাকে জিজ্ঞেস করবেন, হে আমার বান্দা–তোমার জিহ্বা কেন কাটা হয়েছে? কেন তোমার নাক কাটা হয়েছে? তোমার হাত কেন শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে? তোমার শরীরের রক্ত কেন প্রবাহিত করা হয়েছে? হজরত হাবিব জবাব দিবেন, হে সমগ্র জগতের প্রতিপালক, এসব কিছু তোমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য মেনে নিয়েছি, তুমি যদি রাজি হয়ে যাও, আঘাতের এসব যন্ত্রণা কিছুই নয়।

হে জগতের প্রতিপালক, তোমার বড়ত্বের কারণেই এসব সহ্য করেছি। তোমার জন্যই কষ্ট আনন্দে পরিণত হয়েছে, ধৈর্য স্বাদে পরিণত হয়েছে, কান্না শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে, রক্ত মিশক আর সুগন্ধিতে পরিবর্তিত হয়েছে। হে আমার প্রতিপালক, দুনিয়াতে যদি কষ্ট দাও, কিয়ামতের দিন আমার চেহারাকে জ্যোতির্ময় করো। তখন এই বান্দার সাক্ষাতে আল্লাহ তাআলা খুশি হবেন, তার কষ্টকে নেয়ামত দ্বারা পাল্টে দেবেন, তার মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন, তার পদস্খলন ক্ষমা করবেন, প্রতিপালক তাকে ডেকে কানে কানে বলবেন, হে আমার বান্দা আজ জান্নাতের যে প্রান্তে, মনে চায় ঘুরে বেড়াও। আজ এমন নেয়ামত তোমাকে দেব, যার সাথে কখনো কোনো কষ্ট যোগ হবে না। এমন রাজ্য তোমাকে দান করব, যেখানে তোমার কোনো অংশীদার থাকবে না। প্রতিটি দরজা দিয়ে ফেরেশতাগণ তোমাকে সম্ভাষণ জানাতে যাবে, তোমার সামনে নেয়ামতের ভাণ্ডার রয়েছে, যা মনে চায় নিয়ে নাও। আমার কাছে আরও রয়েছে, রয়েছে অফুরন্ত, রয়েছে সুখশান্তি এবং সৌভাগ্যের আধার।—

আহ! কী সুন্দর হবে সেই সাক্ষাৎকার! ইহকাল ও পরকালের মালিকের সাথে! আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-

إِنَّ أَصْحُبَ الْجَنَّةِ الْيَوْمَ فِي شُغُلٍ فَكِهُوْنَ، هُمْ وَ أَزْوَاجُهُمْ فِي ظلْلٍ عَلَى الْأَرَائِكِ مُتَّكِوْنَ. لَهُمْ فِيهَا فَاكِهَةٌ وَلَهُمْ مَّا يَدَّعُوْنَ، سَلْمُ قَوْلًا مِّنْ رَّبِّ رَّحِيمٍ .

'এদিন জান্নাতিরা আনন্দে মশগুল থাকবে। তারা এবং তাদের স্ত্রীরা উপবিষ্ট থাকবে ছায়াময় পরিবেশে আসনে হেলান দিয়ে। সেখানে তাদের জন্যে থাকবে ফল-মূল এবং যা চাইবে। করুণাময় পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাদের বলা হবে 'সালাম'।' [সুরা ইয়াসিন, আয়াত ৫৫-৫৮]

তিনি দয়াময় প্রতিপালক। কলবের জীবন হলো তার ভালোবাসা। অন্তরের প্রশান্তি হলো তার মারিফাত। শরীরের শান্তি হলো তার ইবাদত। রুহের খোরাক হলো তার খেদমত। জিহ্বার পূর্ণতা হলো তার প্রশংসা ও জিকির আজ-কার, জিহ্বার সম্মান হলো আল্লাহর দাসত্ব এবং কৃতজ্ঞতা।

ফন্ট সাইজ
15px
17px