📘 আমাদের সোনালী অতীত 📄 আঙুল যখন পানির ফোয়ারা

📄 আঙুল যখন পানির ফোয়ারা


ইমাম বুখারি জাবের বিন আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর সূত্রে বর্ণনা করেছেন, আমরা হুদাইবিয়াতে নবিজির সাথে ছিলাম। অজু করার জন্য নবিজির সামনে একটি পানপাত্র এগিয়ে দেয়া হলো।

জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, সাহাবিগণ নবিজির সামনে গিয়ে ভীড় করল। নবিজি জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমাদের কী হয়েছে?' তাঁরা বললেন, 'পুরো এলাকায় পান করা এবং অজু করার জন্য কেবল আপনার সামনে রাখা পানিটুকুই রয়েছে।' কারণ, তখন ছিল শীতকাল। তাঁদের মক্কায় প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয়েছে।

জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর হাত পাত্রে প্রবেশ করালেন। জাবের বলেন, আল্লাহর কসম, আমি দেখলাম যে, নবিজির আঙুলের মাঝ দিয়ে পানির ফোয়ারা ছুটেছে। আল্লাহর কসম, আমরা ময়দানের সমস্ত পাত্র পূর্ণ করে নিলাম, পান করলাম, অজু করলাম। বলা হলো, 'আপনারা কত জন ছিলেন?' তিনি বললেন, 'আমরা ছিলাম ১৪০০ জন।'

টিকাঃ
৪২. সহিহ বুখারি: ১৩/৫৬; মিশকাত: ৩/২৭৯১।

ইমাম বুখারি জাবের বিন আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর সূত্রে বর্ণনা করেছেন, আমরা হুদাইবিয়াতে নবিজির সাথে ছিলাম। অজু করার জন্য নবিজির সামনে একটি পানপাত্র এগিয়ে দেয়া হলো।

জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, সাহাবিগণ নবিজির সামনে গিয়ে ভীড় করল। নবিজি জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমাদের কী হয়েছে?' তাঁরা বললেন, 'পুরো এলাকায় পান করা এবং অজু করার জন্য কেবল আপনার সামনে রাখা পানিটুকুই রয়েছে।' কারণ, তখন ছিল শীতকাল। তাঁদের মক্কায় প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয়েছে।

জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর হাত পাত্রে প্রবেশ করালেন। জাবের বলেন, আল্লাহর কসম, আমি দেখলাম যে, নবিজির আঙুলের মাঝ দিয়ে পানির ফোয়ারা ছুটেছে। আল্লাহর কসম, আমরা ময়দানের সমস্ত পাত্র পূর্ণ করে নিলাম, পান করলাম, অজু করলাম।

বলা হলো, 'আপনারা কত জন ছিলেন?'

তিনি বললেন, 'আমরা ছিলাম ১৪০০ জন।' [৪২]

টিকাঃ
৪২. সহিহ বুখারি: ১৩/৫৬; মিশকাত: ৩/২৭৯১।

📘 আমাদের সোনালী অতীত 📄 রোগের শিফা

📄 রোগের শিফা


ইমাম বুখারি রহমাতুল্লাহি আলাইহি সহিহ বুখারি শরিফে বর্ণনা করেছেন, ইহুদি আবু রাফে তার দুর্ভেদ্য দুর্গে অবস্থান করত। সে সর্বদা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নানাভাবে কষ্ট দিত। কখনো ঘাতক পাঠিয়ে হত্যা করার অপচেষ্টা করত, কখনো গায়িকা-নর্তকী কিনে এনে তাদের দিয়ে নবিজির কুৎসা রটনা করে, তাঁকে তুচ্ছ করে এবং গালি দিয়ে গান গাওয়ার জন্য নিযুক্ত করত। এভাবে সর্বপ্রকার কষ্টই সে নবিজির প্রতি প্রয়োগ করার অপচেষ্টা করত।

একদিন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাহাবিদের বললেন, 'আবু রাফে থেকে কে আমাকে মুক্ত করবে?' তখন আবদুল্লাহ ইবনে আতিক বললেন, 'আমি, হে আল্লাহর রাসুল।'

আবদুল্লাহ বিন আতিক বলেন, আমি তাকে হত্যা করতে গেলাম। আমরা রাতের বেলা চলতাম এবং দিনের বেলা আত্মগোপন করে থাকতাম। আমরা সবার অগোচরে দুর্গের নিকট পৌঁছে গেলাম। এই দুর্ভেদ্য দুর্গের কেবল একটি গেট ছিল, যা দিনে মাত্র দু-বার খোলা হতো। একবার সকালে, যেন কৃষক এবং রাখালেরা বের হয়ে যেতে পারে, তারপর বন্ধ করা হতো। দ্বিতীয়বার সন্ধ্যায়, যেন তারা প্রবেশ করতে পারে। প্রহরী তাদের একেকজন করে পরিচয় নিয়ে বের করত এবং প্রবেশ করাত। প্রহরীর চোখ ফাঁকি দিয়ে অচেনা কারও প্রবেশ করা অসম্ভব। সাহাবিগণ সেখানে গিয়ে পেরেশান হয়ে গেলেন, কীভাবে ভেতরে প্রবেশ করবেন!

আবদুল্লাহ বিন আতিক তাঁর সাথিদের বললেন, 'তোমাদের অবস্থানে বসে থাকো। আমি এগিয়ে গিয়ে দারোয়ানকে খুঁজে ভেতরে প্রবেশ করার কোনো উপায় অন্বেষণ করি।' সুতরাং আবদুল্লাহ দরজার কাছে চলে গেলেন। প্রহরী ছিল খুব চতুর ও সতর্ক। কেউ ভেতরে ঢুকলেই তাকে দেখত এবং চেনার চেষ্টা করত, কে সে!

আবদুল্লাহ ভেতরে প্রবেশ করার জন্য সুযোগের সন্ধানে থাকলেন। সূর্যাস্তের সময় লোকজন তাদের জীবজন্তু এবং প্রাণীগুলো নিয়ে ফিরে এল এবং সেগুলো দুর্গের গোয়ালে ঢুকিয়ে দিয়ে গেল। দুর্গবাসী কয়েকজন ইহুদি তাদের একটি গাধা খুঁজে পাচ্ছিল না। তাই গাধা খোঁজার জন্য আগুনের মশাল নিয়ে বের হলো। এটা ছিল সূর্য অস্ত যাওয়ার পরের ঘটনা। তারা গাধাটি খুঁজছিল।

আবদুল্লাহ দুর্গের নিকটেই ছিলেন। তিনি বলেন, ভয় লাগছিল, হয়তো প্রহরী চিনে ফেলবে। তাই এমনভাবে মাথা নিচু করলেন, যেন তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারছেন। ইহুদিরা তাদের গাধাটি খুঁজে পেয়ে দুর্গের দিকে ফিরে চলল। তারপর দারোয়ান ডাকল, 'যে ঢুকতে চাও ঢুকে পড়ো।'

এরপর প্রহরী চিৎকার করে আবদুল্লাহকে বলল, 'তুমিও ঢুকলে ঢুকে পড়ো, আমি গেট লাগিয়ে দেবো। আবদুল্লাহ ইহুদিদের দুর্গে ঢুকে পড়লেন। তারপর লুকানোর জন্য ভেতরে নিরাপদ স্থান খুঁজতে থাকলেন। গেটের কাছেই গাধার আস্তাবল পেলেন, তিনি সেখানেই লুকিয়ে থাকলেন।

যখন লোকজন আপন আপন স্থানে চলে গেল, আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু খুঁজতে শুরু করলেন, প্রহরী দুর্গের চাবিগুলো কোথায় রেখেছে। প্রহরী চাবিগুলো নির্ধারিত স্থানে লুকিয়ে রাখার কিছুক্ষণের মধ্যেই লোকজন বাতিগুলো নিভিয়ে নীরব হয়ে গেল। আবদুল্লাহ চাবিগুলো হাতে নিয়ে ভেতর থেকে দুর্গের গেট খুললেন এবং সামান্য অংশ খোলা রাখলেন।

চাঁদনি রাত ছিল। দুর্গের অভ্যন্তরীণ মানুষের ঘরগুলোর দরজার কাছ দিয়ে অতিক্রম করলেন এবং সবগুলো ঘরের দরজা বাহির থেকে বন্ধ করে দিলেন। এগুলো ছিল আবু রাফে ইহুদির সাথিদের ঘর।

আবদুল্লাহ বলেন, একপর্যায়ে আমি আবু রাফের ঘর পর্যন্ত পৌঁছে গেলাম। তার ঘর ছিল উঁচুতে। মই বা সিঁড়ি ছাড়া সেখানে উঠা যেত না। আমি আবু রাফের আওয়াজ শুনতে পেলাম। সে তার কিছু সাথির সাথে গল্প করছিল। আমার মনে হলো, তাদের সংখ্যা ১০-১৫ জন হবে। বিভিন্ন বিষয়ে পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র করছিল। বাতিগুলো জ্বলছিল। এতগুলো মানুষের সাথে মোকাবিলা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই আমি এমন স্থানে বসে পড়লাম, যেখানে তারা দেখতে পায়নি এবং বাতিগুলো নেভানোর প্রতিক্ষায় থাকলাম।

আবু রাফে তার সাথিদের সাথে দীর্ঘরাত পর্যন্ত গল্প করল। একসময় তার সাথিরা আপন আপন ঘরে ফিরে গেল। আমি যখন এটা দেখলাম, সেখানে উঠলাম এবং খুব সন্তর্পণে আগের ঘরের দরজাগুলো খুলতে খুলতে আবু রাফের ঘরের দিকে এগিয়ে চললাম। যখনই আমি কোনো দরজা খুলেছি ভেতর থেকে তালা লাগিয়ে দিয়েছি। যেন রক্ষীরা জানতে পারলেও তাদের এখানে পৌঁছতে বিলম্ব হয়ে যায়।

আমি সিঁড়ি দিয়ে উঠে যখন আবু রাফের ঘরের দরজার কাছে এলাম এবং আলতোভাবে দরজাটা খুললাম। তখন ভেতর ছিল পুরো আঁধারে ঢাকা, বাতিগুলো ছিল নির্বাপিত। ইতিহাসবিদদের বর্ণনামতে, আবদুল্লাহ ইবনে আতিকের দৃষ্টিশক্তি ছিল দুর্বল। তাই তিনি বুঝতে পারলেন না যে, আবু রাফে কোথায়? চোখ ছিল দুর্বল আর আঁধার ছিল কঠিন! আবদুল্লাহ বিন আতিক বলেন, আমি কৌশল করে তাকে ডাক দিলাম, 'আবু রাফে!'

আবু রাফে ডাকের সাথে সর্তক হয়েই জিজ্ঞেস করল, 'কে?' আবু রাফের আওয়াজকে টার্গেট করে আমি এগিয়ে গেলাম এবং তলোয়ার দিয়ে আঘাত করলাম। আবু রাফে আহত হলো; কিন্তু তলোয়ার তাকে পূর্ণরূপে ঘায়েল করতে পারেনি। তাই সে মরেনি। আবু রাফে এই বলে চিৎকার দিলো, 'ঘরের ভেতর একটি লোক আমাকে তলোয়ার দ্বারা আঘাত করেছে।' আমি তলোয়ার হাতে আবারও এগিয়ে গেলাম এবং তলোয়ার দিয়ে দ্বিতীয়বার হামলা করলাম। কিন্তু এবারও সে নিহত হলো না। আবু রাফে আবারও খুব জোরে চিৎকার করল। আমি খুব দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম।

বাড়ির ভেতর নড়াচড়া শুরু হয়ে গেছে। রক্ষীরাও জাগ্রত হয়েছে। আবু রাফে দুর্বল হয়ে পড়েছে। আমি আবারও তার দিকে এগিয়ে গেলাম এবং আওয়াজ পরিবর্তন করে মৃদু স্বরে তাকে বললাম, 'কী হয়েছে আবু রাফে, আমরা কি প্রহরীকে ডাকব?' আবু রাফে বলল, 'হ্যাঁ।'

আবু রাফের আওয়াজ লক্ষ করে আমি আবারও এগিয়ে গেলাম এবং তলোয়ার এবার তার বুকের ওপর রেখে চাপ দিলাম। যার কারণে তলোয়ার তার পিঠ ভেদ করে বের হয়ে গেল। আবদুল্লাহ বলেন, আমি তার পিঠের হাড়ের শব্দ শুনতে পেলাম, যাতে বুঝতে পারলাম যে, সে মারা গেছে।

এবার আঁধারের মাঝেই আমি দরজার দিকে মনোনিবেশ করলাম। রক্ষীরাও সতর্ক হয়ে গেছে, লোকজন চলাফেরা শুরু করেছে। আবদুল্লাহ দরজা পেয়েই দ্রুত একটার পর একটা দরজা খুলে সিঁড়ির কাছে চলে এলেন এবং খুব দ্রুত নামতে আরম্ভ করলেন। একসময় ধারণা করলেন, সিঁডি শেষ হয়ে গেছে, তাই লাফ দিলেন, কিন্তু পড়ে গেলেন মাটিতে। ফলে তাঁর পায়ের নলা ভেঙে গেল। পাগড়ি খুলে পায়ের নলা বাঁধলেন এবং এক পায়ে ভর করে দুর্গের দরজার দিকে চলতে লাগলেন। তিনি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দুর্গ থেকে বের হয়ে সাথিদের পর্যন্ত পৌঁছে গেলেন। তাঁরা অস্থির হয়ে আবদুল্লাহর অপেক্ষা করছিলেন।

তাঁদের বললেন, 'তোমরা গিয়ে নবিজিকে সুসংবাদ দাও; আমি আবু রাফের মৃত্যুর ঘোষণা হওয়ার আগ পর্যন্ত এখান থেকে যাব না।' জাহালাতের যুগে নিয়ম ছিল, তাদের বংশের সম্ভ্রান্ত কোনো লোক যখন মারা যেত, সকালবেলা কোনো উঁচু ঘরের ছাদে উঠে একজন ঘোষক ঘোষণা করত, 'অমুক মারা গেছে।' সেই সাথে মৃতের শানে কিছু কবিতাও আবৃত্তি করা হতো। আবদুল্লাহ মূলত এমন ঘোষণার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন, 'আবু রাফে সত্যিই নিহত হয়েছে।'

আবদুল্লাহর সাথিরা চলে গেলেন এবং আবদুল্লাহর জন্য একটি বাহন রেখে গেলেন। সকাল হলে ঠিকই একজন ঘোষক উঁচু ঘরের ছাদে উঠল। আবদুল্লাহ দুর্গের বাইরে থেকে ঘোষকের সেখানে উঠা দেখছিলেন। ঘোষক ঘোষণা করল, 'হে লোকসকল, আমি তোমাদের হিজাজের ব্যবসায়ী আবু রাফের মৃত্যুর সংবাদ দিচ্ছি।' আবদুল্লাহ ঘোষণা শোনে খুশি হলেন এবং তাঁর সাথিদের পিছু পিছু রওয়ানা করলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট পৌঁছার পূর্বেই তিনি সাথিদের পেয়ে গেলেন। যখন তাঁরা নবিজির দরবারে পৌঁছলেন, আবদুল্লাহ চিৎকার করে বলে উঠলেন, 'মুক্তি! মুক্তি! আল্লাহ তাআলা আবু রাফেকে হত্যা করেছেন।'

আবদুল্লাহর পায়ের নলা ভাঙা ছিল। তাই তিনি খুঁড়িয়ে হাঁটছিলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তাঁর পা ভাঙা দেখলেন, বললেন, 'তোমার পা এগিয়ে দাও।' আবদুল্লাহ পা এগিয়ে দিলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর পায়ে হাতের ছোঁয়া দিলেন। তিনি ভাঙা রোগের পূর্ণ শিফা পেয়ে গেলেন। লোকজন তাকিয়ে এই দৃশ্য দেখছিল। নবিজির হাত তখনো আবদুল্লাহর পা থেকে পৃথক হয়নি, তিনি এমনভাবে দাঁড়ালেন, যেন কখনো কোনো সমস্যাই হয়নি। এটা ছিল নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতের একটি প্রমাণ।

ইমাম বুখারি রহমাতুল্লাহি আলাইহি সহিহ বুখারি শরিফে বর্ণনা করেছেন, ইহুদি আবু রাফে তার দুর্ভেদ্য দুর্গে অবস্থান করত। সে সর্বদা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নানাভাবে কষ্ট দিত। কখনো ঘাতক পাঠিয়ে হত্যা করার অপচেষ্টা করত, কখনো গায়িকা-নর্তকী কিনে এনে তাদের দিয়ে নবিজির কুৎসা রটনা করে, তাঁকে তুচ্ছ করে এবং গালি দিয়ে গান গাওয়ার জন্য নিযুক্ত করত। এভাবে সর্বপ্রকার কষ্টই সে নবিজির প্রতি প্রয়োগ করার অপচেষ্টা করত।

একদিন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাহাবিদের বললেন, 'আবু রাফে থেকে কে আমাকে মুক্ত করবে?'

তখন আবদুল্লাহ ইবনে আতিক বললেন, 'আমি, হে আল্লাহর রাসুল।'

আবদুল্লাহ বিন আতিক বলেন, আমি তাকে হত্যা করতে গেলাম। আমরা রাতের বেলা চলতাম এবং দিনের বেলা আত্মগোপন করে থাকতাম। আমরা সবার অগোচরে দুর্গের নিকট পৌঁছে গেলাম। এই দুর্ভেদ্য দুর্গের কেবল একটি গেট ছিল, যা দিনে মাত্র দু-বার খোলা হতো। একবার সকালে, যেন কৃষক এবং রাখালেরা বের হয়ে যেতে পারে, তারপর বন্ধ করা হতো। দ্বিতীয়বার সন্ধ্যায়, যেন তারা প্রবেশ করতে পারে। প্রহরী তাদের একেকজন করে পরিচয় নিয়ে বের করত এবং প্রবেশ করাত। প্রহরীর চোখ ফাঁকি দিয়ে অচেনা কারও প্রবেশ করা অসম্ভব। সাহাবিগণ সেখানে গিয়ে পেরেশান হয়ে গেলেন, কীভাবে ভেতরে প্রবেশ করবেন!

আবদুল্লাহ বিন আতিক তাঁর সাথিদের বললেন, 'তোমাদের অবস্থানে বসে থাকো। আমি এগিয়ে গিয়ে দারোয়ানকে খুঁজে ভেতরে প্রবেশ করার কোনো উপায় অন্বেষণ করি।'

সুতরাং আবদুল্লাহ দরজার কাছে চলে গেলেন। প্রহরী ছিল খুব চতুর ও সতর্ক। কেউ ভেতরে ঢুকলেই তাকে দেখত এবং চেনার চেষ্টা করত, কে সে!

আবদুল্লাহ ভেতরে প্রবেশ করার জন্য সুযোগের সন্ধানে থাকলেন। সূর্যাস্তের সময় লোকজন তাদের জীবজন্তু এবং প্রাণীগুলো নিয়ে ফিরে এল এবং সেগুলো দুর্গের গোয়ালে ঢুকিয়ে দিয়ে গেল। দুর্গবাসী কয়েকজন ইহুদি তাদের একটি গাধা খুঁজে পাচ্ছিল না। তাই গাধা খোঁজার জন্য আগুনের মশাল নিয়ে বের হলো। এটা ছিল সূর্য অস্ত যাওয়ার পরের ঘটনা। তারা গাধাটি খুঁজছিল।

আবদুল্লাহ দুর্গের নিকটেই ছিলেন। তিনি বলেন, ভয় লাগছিল, হয়তো প্রহরী চিনে ফেলবে। তাই এমনভাবে মাথা নিচু করলেন, যেন তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারছেন। ইহুদিরা তাদের গাধাটি খুঁজে পেয়ে দুর্গের দিকে ফিরে চলল। তারপর দারোয়ান ডাকল, 'যে ঢুকতে চাও ঢুকে পড়ো।'

এরপর প্রহরী চিৎকার করে আবদুল্লাহকে বলল, 'তুমিও ঢুকলে ঢুকে পড়ো, আমি গেট লাগিয়ে দেবো। আবদুল্লাহ ইহুদিদের দুর্গে ঢুকে পড়লেন। তারপর লুকানোর জন্য ভেতরে নিরাপদ স্থান খুঁজতে থাকলেন। গেটের কাছেই গাধার আস্তাবল পেলেন, তিনি সেখানেই লুকিয়ে থাকলেন।

যখন লোকজন আপন আপন স্থানে চলে গেল, আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু খুঁজতে শুরু করলেন, প্রহরী দুর্গের চাবিগুলো কোথায় রেখেছে। প্রহরী চাবিগুলো নির্ধারিত স্থানে লুকিয়ে রাখার কিছুক্ষণের মধ্যেই লোকজন বাতিগুলো নিভিয়ে নীরব হয়ে গেল। আবদুল্লাহ চাবিগুলো হাতে নিয়ে ভেতর থেকে দুর্গের গেট খুললেন এবং সামান্য অংশ খোলা রাখলেন। চাঁদনি রাত ছিল। দুর্গের অভ্যন্তরীণ মানুষের ঘরগুলোর দরজার কাছ দিয়ে অতিক্রম করলেন এবং সবগুলো ঘরের দরজা বাহির থেকে বন্ধ করে দিলেন। এগুলো ছিল আবু রাফে ইহুদির সাথিদের ঘর।

আবদুল্লাহ বলেন, একপর্যায়ে আমি আবু রাফের ঘর পর্যন্ত পৌঁছে গেলাম। তার ঘর ছিল উঁচুতে। মই বা সিঁড়ি ছাড়া সেখানে উঠা যেত না। আমি আবু রাফের আওয়াজ শুনতে পেলাম। সে তার কিছু সাথির সাথে গল্প করছিল। আমার মনে হলো, তাদের সংখ্যা ১০-১৫ জন হবে। বিভিন্ন বিষয়ে পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র করছিল। বাতিগুলো জ্বলছিল। এতগুলো মানুষের সাথে মোকাবিলা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই আমি এমন স্থানে বসে পড়লাম, যেখানে তারা দেখতে পায়নি এবং বাতিগুলো নেভানোর প্রতিক্ষায় থাকলাম।

আবু রাফে তার সাথিদের সাথে দীর্ঘরাত পর্যন্ত গল্প করল। একসময় তার সাথিরা আপন আপন ঘরে ফিরে গেল। আমি যখন এটা দেখলাম, সেখানে উঠলাম এবং খুব সন্তর্পণে আগের ঘরের দরজাগুলো খুলতে খুলতে আবু রাফের ঘরের দিকে এগিয়ে চললাম। যখনই আমি কোনো দরজা খুলেছি ভেতর থেকে তালা লাগিয়ে দিয়েছি। যেন রক্ষীরা জানতে পারলেও তাদের এখানে পৌঁছতে বিলম্ব হয়ে যায়।

আমি সিঁড়ি দিয়ে উঠে যখন আবু রাফের ঘরের দরজার কাছে এলাম এবং আলতোভাবে দরজাটা খুললাম। তখন ভেতর ছিল পুরো আঁধারে ঢাকা, বাতিগুলো ছিল নির্বাপিত। ইতিহাসবিদদের বর্ণনামতে, আবদুল্লাহ ইবনে আতিকের দৃষ্টিশক্তি ছিল দুর্বল। তাই তিনি বুঝতে পারলেন না যে, আবু রাফে কোথায়? চোখ ছিল দুর্বল আর আঁধার ছিল কঠিন! আবদুল্লাহ বিন আতিক বলেন, আমি কৌশল করে তাকে ডাক দিলাম, 'আবু রাফে!'

আবু রাফে ডাকের সাথে সর্তক হয়েই জিজ্ঞেস করল, 'কে?'

আবু রাফের আওয়াজকে টার্গেট করে আমি এগিয়ে গেলাম এবং তলোয়ার দিয়ে আঘাত করলাম। আবু রাফে আহত হলো; কিন্তু তলোয়ার তাকে পূর্ণরূপে ঘায়েল করতে পারেনি। তাই সে মরেনি। আবু রাফে এই বলে চিৎকার দিলো, 'ঘরের ভেতর একটি লোক আমাকে তলোয়ার দ্বারা আঘাত করেছে।' আমি তলোয়ার হাতে আবারও এগিয়ে গেলাম এবং তলোয়ার দিয়ে দ্বিতীয়বার হামলা করলাম। কিন্তু এবারও সে নিহত হলো না। আবু রাফে আবারও খুব জোরে চিৎকার করল। আমি খুব দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম।

বাড়ির ভেতর নড়াচড়া শুরু হয়ে গেছে। রক্ষীরাও জাগ্রত হয়েছে। আবু রাফে দুর্বল হয়ে পড়েছে। আমি আবারও তার দিকে এগিয়ে গেলাম এবং আওয়াজ পরিবর্তন করে মৃদু স্বরে তাকে বললাম, 'কী হয়েছে আবু রাফে, আমরা কি প্রহরীকে ডাকব?'

আবু রাফে বলল, 'হ্যাঁ।'

আবু রাফের আওয়াজ লক্ষ করে আমি আবারও এগিয়ে গেলাম এবং তলোয়ার এবার তার বুকের ওপর রেখে চাপ দিলাম। যার কারণে তলোয়ার তার পিঠ ভেদ করে বের হয়ে গেল। আবদুল্লাহ বলেন, আমি তার পিঠের হাড়ের শব্দ শুনতে পেলাম, যাতে বুঝতে পারলাম যে, সে মারা গেছে।

এবার আঁধারের মাঝেই আমি দরজার দিকে মনোনিবেশ করলাম। রক্ষীরাও সতর্ক হয়ে গেছে, লোকজন চলাফেরা শুরু করেছে। আবদুল্লাহ দরজা পেয়েই দ্রুত একটার পর একটা দরজা খুলে সিঁড়ির কাছে চলে এলেন এবং খুব দ্রুত নামতে আরম্ভ করলেন। একসময় ধারণা করলেন, সিঁডি শেষ হয়ে গেছে, তাই লাফ দিলেন, কিন্তু পড়ে গেলেন মাটিতে। ফলে তাঁর পায়ের নলা ভেঙে গেল। পাগড়ি খুলে পায়ের নলা বাঁধলেন এবং এক পায়ে ভর করে দুর্গের দরজার দিকে চলতে লাগলেন। তিনি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দুর্গ থেকে বের হয়ে সাথিদের পর্যন্ত পৌঁছে গেলেন। তাঁরা অস্থির হয়ে আবদুল্লাহর অপেক্ষা করছিলেন।

তাঁদের বললেন, 'তোমরা গিয়ে নবিজিকে সুসংবাদ দাও; আমি আবু রাফের মৃত্যুর ঘোষণা হওয়ার আগ পর্যন্ত এখান থেকে যাব না।' জাহালাতের যুগে নিয়ম ছিল, তাদের বংশের সম্ভ্রান্ত কোনো লোক যখন মারা যেত, সকালবেলা কোনো উঁচু ঘরের ছাদে উঠে একজন ঘোষক ঘোষণা করত, 'অমুক মারা গেছে।' সেই সাথে মৃতের শানে কিছু কবিতাও আবৃত্তি করা হতো। আবদুল্লাহ মূলত এমন ঘোষণার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন, 'আবু রাফে সত্যিই নিহত হয়েছে।'

আবদুল্লাহর সাথিরা চলে গেলেন এবং আবদুল্লাহর জন্য একটি বাহন রেখে গেলেন। সকাল হলে ঠিকই একজন ঘোষক উঁচু ঘরের ছাদে উঠল। আবদুল্লাহ দুর্গের বাইরে থেকে ঘোষকের সেখানে উঠা দেখছিলেন। ঘোষক ঘোষণা করল, 'হে লোকসকল, আমি তোমাদের হিজাজের ব্যবসায়ী আবু রাফের মৃত্যুর সংবাদ দিচ্ছি।' আবদুল্লাহ ঘোষণা শোনে খুশি হলেন এবং তাঁর সাথিদের পিছু পিছু রওয়ানা করলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট পৌঁছার পূর্বেই তিনি সাথিদের পেয়ে গেলেন। যখন তাঁরা নবিজির দরবারে পৌঁছলেন, আবদুল্লাহ চিৎকার করে বলে উঠলেন, 'মুক্তি! মুক্তি! আল্লাহ তাআলা আবু রাফেকে হত্যা করেছেন।'

আবদুল্লাহর পায়ের নলা ভাঙা ছিল। তাই তিনি খুঁড়িয়ে হাঁটছিলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তাঁর পা ভাঙা দেখলেন, বললেন, 'তোমার পা এগিয়ে দাও।' আবদুল্লাহ পা এগিয়ে দিলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর পায়ে হাতের ছোঁয়া দিলেন। তিনি ভাঙা রোগের পূর্ণ শিফা পেয়ে গেলেন। লোকজন তাকিয়ে এই দৃশ্য দেখছিল। নবিজির হাত তখনো আবদুল্লাহর পা থেকে পৃথক হয়নি, তিনি এমনভাবে দাঁড়ালেন, যেন কখনো কোনো সমস্যাই হয়নি। এটি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতের একটি প্রমাণ। [৪৩]

টিকাঃ
৪৩. সহিহ বুখারি: ৫/৩৭৩।

📘 আমাদের সোনালী অতীত 📄 চোখ আপন স্থানে ফিরে গেল

📄 চোখ আপন স্থানে ফিরে গেল


একযুদ্ধে আবু কাতাদা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে লক্ষ্য করে শত্রুবাহিনী তির নিক্ষেপ করে। তিরটি তাঁর চোখে বিদ্ধ হয়ে চোখ কোটর থেকে বের হয়ে আসে এবং কিছু রগ, গোশতের সাথে ঝুলে থাকে। কিছু সাথি এসে বলল, 'হে আবু কাতাদা, আল্লাহ তাআলা তোমাকে এর বদলা দেবেন, তোমার চোখ তো শেষ হয়ে গেছে, তাঁরা গোশত কেটে চোখটি বের করতে চাইলেন।

আবু কাতাদা রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁদের বললেন, 'সাথিরা, এমন করো না।' তাঁরা বলল, 'তাহলে কী হবে?' আবু কাতাদা বললেন, 'আমাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিয়ে চলো।' সুতরাং তাঁরা আবু কাতাদাকে নিয়ে নবিজির সামনে হাজির হলেন।

আবু কাতাদা বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমার চোখ!' নবিজি বললেন, 'যদি চাও তোমার চোখ পূর্বের মতো করে দেওয়া হবে। আর যদি চাও ধৈর্য ধরো, আল্লাহ তাআলা তোমাকে জান্নাতে এর বিনিময় দেবেন।'

আবু কাতাদা বললেন, 'আমাকে আমার স্ত্রীরা ভালোবাসে। আমি ভয় করছি, যদি আমার চোখ না থাকে, তাহলে স্ত্রীরা আমার প্রতি রাগ করবে। অতএব হে আল্লাহর রাসুল, আমার চোখ ভালো করে দিন, পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দিন। আর আল্লাহ চাইলে জান্নাতে এর প্রতিদান পেয়ে যাব ইনশাআল্লাহ।' বর্ণনাকারী বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কথা শোনে হাসলেন এবং তাঁর চোখ কোটরে ঢুকিয়ে দিয়ে আল্লাহর কাছে দুআ করলেন। চোখ সাথে সাথে ভালো হয়ে যায়।

বর্ণনাকারী বলেন, যখন তিনি চোখ তুলে তাকালেন সুস্থ চোখ খুলে গেল। তাকে কেউ দেখলে বুঝতেই পারত না যে, কোন্ চোখ আহত হয়েছিল।

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিগণকে নিয়ে খায়বারের যুদ্ধে গেলেন। খায়বার দুর্গের অবরোধ দীর্ঘতর হতে থাকল। দুর্গগুলো বিজয় তাঁদের জন্য সহজ হচ্ছিল না। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিগণকে বললেন, 'আগামীকাল পতাকা এমন একজনের হাতে দিব, যাঁর হাতে আল্লাহ তাআলা বিজয় দান করবেন। সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে ভালোবাসে। আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলও তাঁকে ভালোবাসেন।' সকালবেলা সবাই নবিজির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন; প্রত্যেকের আকাঙ্ক্ষা ছিল, পতাকা তাকে দেওয়া হোক।

সবার অপেক্ষার পালা শেষ করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ডাকলেন—'আলি বিন আবু তালিব কোথায়?' সবাই জবাব দিলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আলির উভয় চোখ অসুস্থ। তাঁর চোখে প্রচণ্ড ব্যথা। তাঁর পুরো চোখ ফুলে গেছে, তিনি কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ডেকে পাঠালেন।

সাহাবিগণ আলির হাত ধরে নবিজির সামনে এনে বসিয়ে দিলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর উভয় চোখে থুথু মোবারক লাগিয়ে দিলেন এবং দুআ করলেন। মুহূর্তেই আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর উভয় চোখ ভালো হয়ে গেল। মনে হলো কোনো ব্যথাই ছিল না। অতঃপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর হাতে যুদ্ধের পতাকা দিলেন। আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তারা আমাদের মতো হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত যুদ্ধ করতেই থাকব।'

নবিজি বললেন-

انْفُذْ عَلَى رِسْلِكَ حَتَّى تَنْزِلَ بِسَاحَتِهِمْ ثُمَّ ادْعُهُمْ إِلَى الْإِسْلَامِ وَأَخْبِرْهُمْ بِمَا يَجِبُ عَلَيْهِمْ فَوَاللَّهِ لَأَنْ يَهْدِيَ اللَّهُ بِكَ رَجُلًا خَيْرٌ لَكَ مِنْ أَنْ يَكُونَ لَكَ حُمْরُ النَّعَمِ .

'তাদের এলাকায় প্রবেশ করার পূর্ব পর্যন্ত খুব ধীরে ধীরে কাজ করবে। তারপর তাদের ইসলামের প্রতি আহ্বান করবে এবং তাদের করণীয় সম্পর্কে অবহিত করবে। আল্লাহর শপথ, যদি আল্লাহ তাআলা তোমার মাধ্যমে কাউকে হেদায়াত দান করেন, তাহলে তা তোমার জন্য লাল উটের চেয়েও কল্যাণকর হবে।

📘 আমাদের সোনালী অতীত 📄 পূর্বসূরিদের রমজান

📄 পূর্বসূরিদের রমজান


ইমাম সালেহ ইবরাহিম বিন হানিয়ি বার্ধক্যে পৌঁছা পর্যন্ত অধিকহারে রোজা রাখতেন। তিনি মরণরোগে আক্রান্ত হলেন। আসরের পর তাঁর মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তাঁর হেঁচকি শুরু হয়েছিল, থুথু নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল এবং জিহ্বা শুকিয়ে গিয়েছিল। পুত্রের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, 'বেটা, আমি পিপাসার্ত।' তখন তাঁর ছেলে পানি নিয়ে এল। পানি তাঁর মুখের কাছে দেওয়ার পর তিনি ঠোঁট বন্ধ করে ফেললেন; বললেন, 'সূর্য ডুবেছে কি?' পুত্র বলল, 'না।' তখন পানির পাত্র মুখ থেকে সরিয়ে ফেললেন। ছেলে পানি পান করার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকল আর তিনি নিষেধ করতে থাকলেন। তাই পুত্র মাগরিবের আজানের অপেক্ষা করতে থাকল। শায়খ কিছুক্ষণ চুপ থেকে পড়লেন-
لِمِثْلِ هَذَا فَلْيَعْمَلِ الْعَامِلُونَ.
'এরূপ সাফল্যের জন্য সাধকদের সাধনা করা উচিত।' [সুরা সাফফাত : ৬১]

তিনি কালিমায়ে শাহাদাত পড়তে পড়তে ইনতেকাল করলেন। নাফিসা বিনতে হাসান। পবিত্র ঘরের একজন সতী নারী। তিনি অধিকহারে রোজা রাখতেন। তিনি যখন বৃদ্ধ হলেন, তাঁর হাড় শুকিয়ে গেল। যখন তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হতে যাচ্ছিলেন, তখনও তিনি রোজাদার ছিলেন। তাঁর কঠিন মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হলো। তাঁর সন্তানরা জোরপূর্বক তাঁর মুখে পানির ফোঁটা দিতে চাচ্ছিল। তিনি সন্তানদের দিকে তাকালেন, তাঁর ঠোঁটযুগল সংকুচিত হয়ে গেছে, জিহ্বা ভারী হয়ে এসেছে। এমতাবস্থায় সন্তানদের বললেন, 'আশ্চর্য! আমি আজ ৩০ বছর ধরে আল্লাহর কাছে দুআ করছি, “তুমি রোজা অবস্থায় আমাকে মৃত্যু দিয়ো।” আর আমি এখন রোজা অবস্থায় থেকেও রোজা ভাঙব? এটা হতে পারে না।' এরপর তিনি কুরআন কারিম তেলাওয়াত শুরু করলেন। দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন এই আয়াতে পৌঁছে—
قُلْ لِمَنْ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ قُلْ لِلَّهِ كَتَبَ عَلَى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ.
'বলো, আকাশ ও জমিনসমূহে যা আছে তা কার? বলো, আল্লাহর। তিনি নিজের ওপর রহমত লিখে নিয়েছেন।' [সুরা আনআম : ১২]

হ্যাঁ, তাঁরা ছিলেন নেককার ও সৎকর্মশীল। তাঁরা তাঁদের প্রতিপালককে ভালোবেসেছেন, তাই প্রতিপালকও তাঁদের ভালোবেসেছেন। তাঁরা আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করতে চেয়েছেন, আল্লাহ তাআলাও নৈকট্য দান করেছেন।

ইমাম ইবনু আবি আদি বলেন, দাউদ ইবনু আবি হিন্দ সুদীর্ঘ ৪০ বছর এক দিন রোজা রাখতেন, এক দিন রোজা ছাড়তেন। কিন্তু বিষয়টি তাঁর পরিবারের কেউ জানত না। জিজ্ঞেস করা হলো, 'কীভাবে এটা সম্ভব হয়েছে?' বললেন, 'তিনি মুচি ছিলেন। প্রতিদিন খাবার নিয়ে বাড়ি থেকে দোকানের দিকে যেতেন। যদি রোজা না রাখতেন, খানা খেয়ে নিতেন। আর রোজা রাখলে, পথে কোনো মিসকিনকে দান করে দিতেন। সন্ধ্যায় বাড়ি এসে পরিবারের সাথে খাবার খেতেন।'

আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা অধিকহারে রোজা রাখতেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তিনি বলেছেন, 'দুনিয়া থেকে আমার বিদায়ের সময় কেবল তিনটা জিনিস ছুটে যাওয়ার আফসোস করছি-
প্রথম কঠিন দিনে পিপাসার্ত না থাকার আফসোস। অর্থাৎ এমন দিনে রোজা ছেড়ে দেওয়ার আফসোস, যেদিন তীব্র রোদ ও গরমের কারণে প্রচণ্ড পিপাসা লাগে। তিনি বলেন, প্রথমত কঠিন দিনের রোজা ছাড়ার আফসোস, শেষরাতে আল্লাহর ইবাদত না করার আফসোস এবং আমার জীবদ্দশায় সামনে আসা বিদ্রোহী হাজ্জাজের দলের বিরুদ্ধে জিহাদ না করার আফসোস।

হ্যাঁ, আমাদের পূর্বসূরিগণ রোজার প্রতি খুব যত্নবান থাকতেন এবং এটাকেই জান্নাতের পাথেয় বানাতেন। রোজার ফরজ বিধানের আল্লাহপ্রদত্ত হেকমত তাঁরা অনুধাবন করতে পারতেন। আর বর্তমানে! রোজা তো অনেক মানুষই রাখে; কিন্তু এমন মানুষ খুব কমই আছে, যারা রোজার মহত্ব অনুধাবন করতে পারে।

ইমাম সালেহ ইবরাহিম বিন হানিয়ি বার্ধক্যে পৌঁছা পর্যন্ত অধিকহারে রোজা রাখতেন। তিনি মরণরোগে আক্রান্ত হলেন। আসরের পর তাঁর মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তাঁর হেঁচকি শুরু হয়েছিল, থুথু নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল এবং জিহ্বা শুকিয়ে গিয়েছিল। পুত্রের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, 'বেটা, আমি পিপাসার্ত।' তখন তাঁর ছেলে পানি নিয়ে এল। পানি তাঁর মুখের কাছে দেওয়ার পর তিনি ঠোঁট বন্ধ করে ফেললেন; বললেন, 'সূর্য ডুবেছে কি?' পুত্র বলল, 'না।' তখন পানির পাত্র মুখ থেকে সরিয়ে ফেললেন। ছেলে পানি পান করার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকল আর তিনি নিষেধ করতে থাকলেন। তাই পুত্র মাগরিবের আজানের অপেক্ষা করতে থাকল।

শায়খ কিছুক্ষণ চুপ থেকে পড়লেন-

لِمِثْلِ هَذَا فَلْيَعْمَلِ الْعَامِلُونَ. 'এরূপ সাফল্যের জন্য সাধকদের সাধনা করা উচিত।' [সুরা সাফফাত : ৬১]

তিনি কালিমায়ে শাহাদাত পড়তে পড়তে ইনতেকাল করলেন। নাফিসা বিনতে হাসান। পবিত্র ঘরের একজন সতী নারী। তিনি অধিকহারে রোজা রাখতেন। তিনি যখন বৃদ্ধ হলেন, তাঁর হাড় শুকিয়ে গেল। যখন তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হতে যাচ্ছিলেন, তখনও তিনি রোজাদার ছিলেন। তাঁর কঠিন মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হলো। তাঁর সন্তানরা জোরপূর্বক তাঁর মুখে পানির ফোঁটা দিতে চাচ্ছিল। তিনি সন্তানদের দিকে তাকালেন, তাঁর ঠোঁটযুগল সংকুচিত হয়ে গেছে, জিহ্বা ভারী হয়ে এসেছে। এমতাবস্থায় সন্তানদের বললেন, 'আশ্চর্য! আমি আজ ৩০ বছর ধরে আল্লাহর কাছে দুআ করছি, “তুমি রোজা অবস্থায় আমাকে মৃত্যু দিয়ো।” আর আমি এখন রোজা অবস্থায় থেকেও রোজা ভাঙব? এটা হতে পারে না।' এরপর তিনি কুরআন কারিম তেলাওয়াত শুরু করলেন। দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন এই আয়াতে পৌঁছে—

قُلْ لِمَنْ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ قُلْ لِلَّهِ كَتَبَ عَلَى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ.

'বলো, আকাশ ও জমিনসমূহে যা আছে তা কার? বলো, আল্লাহর। তিনি নিজের ওপর রহমত লিখে নিয়েছেন।' [সুরা আনআম : ১২]

হ্যাঁ, তাঁরা ছিলেন নেককার ও সৎকর্মশীল। তাঁরা তাঁদের প্রতিপালককে ভালোবেসেছেন, তাই প্রতিপালকও তাঁদের ভালোবেসেছেন। তাঁরা আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করতে চেয়েছেন, আল্লাহ তাআলাও নৈকট্য দান করেছেন। ইমাম ইবনু আবি আদি বলেন, দাউদ ইবনু আবি হিন্দ সুদীর্ঘ ৪০ বছর এক দিন রোজা রাখতেন, এক দিন রোজা ছাড়তেন। কিন্তু বিষয়টি তাঁর পরিবারের কেউ জানত না। জিজ্ঞেস করা হলো, 'কীভাবে এটা সম্ভব হয়েছে?' বললেন, 'তিনি মুচি ছিলেন। প্রতিদিন খাবার নিয়ে বাড়ি থেকে দোকানের দিকে যেতেন। যদি রোজা না রাখতেন, খানা খেয়ে নিতেন। আর রোজা রাখলে, পথে কোনো মিসকিনকে দান করে দিতেন। সন্ধ্যায় বাড়ি এসে পরিবারের সাথে খাবার খেতেন।'

আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা অধিকহারে রোজা রাখতেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তিনি বলেছেন, 'দুনিয়া থেকে আমার বিদায়ের সময় কেবল তিনটা জিনিস ছুটে যাওয়ার আফসোস করছি- প্রথম কঠিন দিনে পিপাসার্ত না থাকার আফসোস। অর্থাৎ এমন দিনে রোজা ছেড়ে দেওয়ার আফসোস, যেদিন তীব্র রোদ ও গরমের কারণে প্রচণ্ড পিপাসা লাগে। তিনি বলেন, প্রথমত কঠিন দিনের রোজা ছাড়ার আফসোস, শেষরাতে আল্লাহর ইবাদত না করার আফসোস এবং আমার জীবদ্দশায় সামনে আসা বিদ্রোহী হাজ্জাজের দলের বিরুদ্ধে জিহাদ না করার আফসোস। হ্যাঁ, আমাদের পূর্বসূরিগণ রোজার প্রতি খুব যত্নবান থাকতেন এবং এটাকেই জান্নাতের পাথেয় বানাতেন। রোজার ফরজ বিধানের আল্লাহপ্রদত্ত হেকমত তাঁরা অনুধাবন করতে পারতেন। আর বর্তমানে! রোজা তো অনেক মানুষই রাখে; কিন্তু এমন মানুষ খুব কমই আছে, যারা রোজার মহত্ব অনুধাবন করতে পারে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px