📄 তোমাদের কাজে আল্লাহ তাআলাও বিস্মিত
একলোক রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বলল, 'আমি ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত।'
লোকটির চোখেমুখে ক্ষুধার চিহ্ন পরিস্ফুটিত ছিল। নবিজি তাঁর একস্ত্রীর ঘরে লোক পাঠালেন কোনো খাবার থাকলে নিয়ে আসার জন্য। সে স্ত্রী জবাব দিলেন, 'আল্লাহর কসম, আমার কাছে পানি ছাড়া কিছুই নেই।' আরেক স্ত্রীর কাছে পাঠালেন, তাঁর কাছে খাওয়ার মতো কিছু আছে কি না? রুটি হোক, খেজুর হোক, দুধ হোক, কিছু হলেই চলবে। কিন্তু তিনিও পূর্বের স্ত্রীর মতোই জবাব দিলেন, 'ওই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন, আমার কাছে পানি ছাড়া কিছু নেই।'
আরেক স্ত্রীর ঘরে পাঠালেন, সেখানে না পেয়ে আরেক স্ত্রীর কাছে পাঠালেন, সেখানে না পেয়ে আরেক স্ত্রীর ঘরে পাঠালেন। এভাবে সবার ঘর থেকে একই জবাব এল, 'তাঁদের কাছে পানি ছাড়া কিছু নেই।' এবার নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, 'আজ রাতের জন্য কে আছে, লোকটির মেহমানদারি করবে?'
অধিকাংশ সাহাবিগণের অবস্থা নবিজির ঘরের অবস্থার মতোই ছিল। যদি তাঁরা দুপুরের খানা পেতেন রাতের খানা পেতেন না, রাতের খানা পেলে সকালের খানা পেতেন না। তাই সাহাবিগণও চুপ থাকলেন। লোকটি মেজবানের খোঁজে সাহাবিগণের দিকে তাকিয়ে ছিল, সে যে নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেহমান।
একজন আনসারি সাহাবি দাঁড়িয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমি তার মেহমানদারি করব।' এরপর আনসারি সাহাবি মেহমানকে সাথে নিয়ে নিজের বাড়ির দিকে রওয়ানা হলেন। ঘরে প্রবেশ করে স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, 'ঘরে খাবারের কিছু আছে কি?'
স্ত্রী জবাব দিলেন, 'বাচ্চাদের খাবার ছাড়া কিছুই নেই। কেবল বাচ্চাদের জন্য আজকের রাতের খাবারটুকু রয়েছে। তা-ও হয়তো তৃপ্তিসহ প্রতিজনের হবে না।'
পরিস্থিতি ছিল কঠিন, কিন্তু তাঁর হৃদয়ে চলছিল অন্য জল্পনা-কল্পনা।
তিনি স্ত্রীকে বললেন, 'কোনো বাহানায় বাচ্চাদের রাতের খাবার না খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও। আর শোনো, যখন মেহমান খাবারের জন্য দস্তরখানে বসে যাবে, তখন তুমি বাতি ঠিক করার বাহানায় বাতিটা নিভিয়ে দেবে এবং এমন ভান করবে যে, আমরাও মেহমানের সাথে খাচ্ছি।' যেই কথা সেই কাজ। তাঁরা মেহমানের সাথে অন্ধকারে খেতে বসলেন। আনসারি সাহাবি এবং তাঁর স্ত্রী খাওয়ার আওয়াজ করে জিহ্বা নাড়াচ্ছিলেন আর মেহমান খানা খাচ্ছিল।
খাওয়া শেষ হলো। রাসুলের মেহমান পরিতৃপ্ত হয়ে চলে গেল। আনসারি সাহাবি সকালবেলা নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাজির হলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে দেখেই বললেন- قَدْ عَجِبَ اللهِ مِنْ صَنِيعِكُمَا بِضَيْفِكُمَا اللَّيْلَةَ 'রাতের বেলা মেহমানের সাথে তোমাদের দুজনের আচরণ দেখে আল্লাহ তাআলাও বিস্মিত হয়েছেন।'
ঐশী সংবাদ তাঁদের এই অকৃত্রিম অতিথি-আপ্যায়নের বিষয়টি প্রকাশ করে দিলো।
একলোক রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বলল, 'আমি ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত।'
লোকটির চোখেমুখে ক্ষুধার চিহ্ন পরিস্ফুটিত ছিল। নবিজি তাঁর একস্ত্রীর ঘরে লোক পাঠালেন কোনো খাবার থাকলে নিয়ে আসার জন্য। সে স্ত্রী জবাব দিলেন, 'আল্লাহর কসম, আমার কাছে পানি ছাড়া কিছুই নেই।' আরেক স্ত্রীর কাছে পাঠালেন, তাঁর কাছে খাওয়ার মতো কিছু আছে কি না? রুটি হোক, খেজুর হোক, দুধ হোক, কিছু হলেই চলবে। কিন্তু তিনিও পূর্বের স্ত্রীর মতোই জবাব দিলেন, 'ওই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন, আমার কাছে পানি ছাড়া কিছু নেই।'
আরেক স্ত্রীর ঘরে পাঠালেন, সেখানে না পেয়ে আরেক স্ত্রীর কাছে পাঠালেন, সেখানে না পেয়ে আরেক স্ত্রীর ঘরে পাঠালেন। এভাবে সবার ঘর থেকে একই জবাব এল, 'তাঁদের কাছে পানি ছাড়া কিছু নেই।' এবার নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, 'আজ রাতের জন্য কে আছে, লোকটির মেহমানদারি করবে?'
অধিকাংশ সাহাবিগণের অবস্থা নবিজির ঘরের অবস্থার মতোই ছিল। যদি তাঁরা দুপুরের খানা পেতেন রাতের খানা পেতেন না, রাতের খানা পেলে সকালের খানা পেতেন না। তাই সাহাবিগণও চুপ থাকলেন। লোকটি মেজবানের খোঁজে সাহাবিগণের দিকে তাকিয়ে ছিল, সে যে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেহমান।
একজন আনসারি সাহাবি দাঁড়িয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমি তার মেহমানদারি করব।' এরপর আনসারি সাহাবি মেহমানকে সাথে নিয়ে নিজের বাড়ির দিকে রওয়ানা হলেন। ঘরে প্রবেশ করে স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, 'ঘরে খাবারের কিছু আছে কি?'
স্ত্রী জবাব দিলেন, 'বাচ্চাদের খাবার ছাড়া কিছুই নেই। কেবল বাচ্চাদের জন্য আজকের রাতের খাবারটুকু রয়েছে। তা-ও হয়তো তৃপ্তিসহ প্রতিজনের হবে না।'
পরিস্থিতি ছিল কঠিন, কিন্তু তাঁর হৃদয়ে চলছিল অন্য জল্পনা-কল্পনা। তিনি স্ত্রীকে বললেন, 'কোনো বাহানায় বাচ্চাদের রাতের খাবার না খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও। আর শোনো, যখন মেহমান খাবারের জন্য দস্তরখানে বসে যাবে, তখন তুমি বাতি ঠিক করার বাহানায় বাতিটা নিভিয়ে দেবে এবং এমন ভান করবে যে, আমরাও মেহমানের সাথে খাচ্ছি।' যেই কথা সেই কাজ। তাঁরা মেহমানের সাথে অন্ধকারে খেতে বসলেন। আনসারি সাহাবি এবং তাঁর স্ত্রী খাওয়ার আওয়াজ করে জিহ্বা নাড়াচ্ছিলেন আর মেহমান খানা খাচ্ছিল।
খাওয়া শেষ হলো। রাসুলের মেহমান পরিতৃপ্ত হয়ে চলে গেল। আনসারি সাহাবি সকালবেলা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাজির হলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে দেখেই বললেন- قَدْ عَجِبَ اللهِ مِنْ صَنِيعِكُمَا بِضَيْفِكُمَا اللَّيْلَةَ 'রাতের বেলা মেহমানের সাথে তোমাদের দুজনের আচরণ দেখে আল্লাহ তাআলাও বিস্মিত হয়েছেন।'
ঐশী সংবাদ তাঁদের এই অকৃত্রিম অতিথি-আপ্যায়নের বিষয়টি প্রকাশ করে দিলো।
📄 উলঙ্গ করে ফেলব
হাতেব ইবনে আবি বালতাআ রাদিয়াল্লাহu আনহু। অন্যতম মুহাজির সাহাবি। নিজের পরিবার, সন্তান এবং সম্পদ মক্কায় রেখে আল্লাহর রাস্তায় হিজরত করে মদিনায় এসেছেন। তিনি ছিলেন মুহাজিরগণের প্রথম সারির সদস্য। এমনকি হক ও বাতিলের মাঝে পার্থক্যকারী যুদ্ধ বদরের জিহাদেও তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন।
মুশরিকদের নিয়ন্ত্রণে মক্কায় ছেড়ে আসা সন্তান ও পরিবার নিয়ে তিনি খুব চিন্তা করতেন। সেখানে তাদের কোনো সহযোগী ছিল না, ছিল না কোনো হিতৈষী। হাতেব নিজেও কুরাইশ বংশের ছিলেন না; বরং তাদের মিত্র ছিলেন। কুরাইশদের মাঝে থাকতেন; কিন্তু কুরাইশদের সদস্য ছিলেন না।
অন্যান্য মুহাজির সাহাবি, যাঁরা মক্কায় নিজেদের পরিবার রেখে এসেছেন, সবারই কমবেশ আত্মীয়-স্বজন মক্কায় ছিল। তারা তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করত এবং সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করত। সুতরাং হাতেব সর্বদা পরিবারের জন্য চিন্তা করতেন; চিন্তা থেকেই কুরাইশদের জন্য বিভিন্ন প্রকার উপঢৌকন পাঠাতেন এবং তাদের জন্য সেবামূলক কাজ করতেন, যেন পরিবারের লোকজন তাদের কাছে একটু সহমর্মিতা পায় এবং নিরাপদে থাকে।
কয়েক বছর কেটে গেছে। নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরাইশ কাফিরদের সাথে হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তি করেছেন। কিন্তু কুরাইশরা খুব দ্রুতই চুক্তি ভঙ্গ করে ফেলে। ফলে নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি সাহাবিগণকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ প্রদান করলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাচ্ছিলেন, কোনোক্রমেই যেন এই সংবাদ কুরাইশদের কানে না পৌঁছে। আগাম সংবাদ পেয়ে তারা যেন প্রস্তুতি গ্রহণ করতে না পারে। এতে উভয় দলের মধ্যে ভয়ংকর সংঘর্ষের আশঙ্কা থাকবে না। যুদ্ধ এবং কোনো রক্তপাত ছাড়াই মক্কা বিজয় হবে। তাই নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় প্রতিপালকের কাছে দুআ করলেন— اللَّهُمَّ عَمِّ عَلَيْهِمْ খবারানা 'হে আল্লাহ, তাদের ওপর আমাদের সংবাদ গোপন রাখো।
কয়েকদিন পার হয়ে গেল, সংবাদটি গোপনই ছিল। হাতেব রাদিয়াল্লাহu আনহু মনে করলেন, কুরাইশদের সুদৃষ্টি লাভ করার এটি একটি মোক্ষম সময়। সুতরাং তিনি নবিজির যুদ্ধ সম্পর্কে কুরাইশদের অবহিত করে একটি চিঠি লিখলেন। তারপর চিঠিটি মদিনায় অবস্থানকারী মক্কার একনারীর কাছে দিয়ে দিলেন এবং তাকে নির্দেশ দিয়ে বললেন, 'চিঠিটি মক্কাবাসীর কাছে পৌঁছে দেবে।' মহিলাটি খুব দ্রুত মদিনা ত্যাগ করল, কিন্তু আল্লাহ তাআলা নবিজিকে বিষয়টি জানিয়ে দিলেন।
কুরাইশের কাছে পৌঁছার পূর্বেই চিঠিটি হস্তগত করা ছিল অতীব জরুরি। অতএব চিঠিটি উদ্ধার করার জন্য আলি, জুবাইর এবং মিকদাদ রাদিয়াল্লাহu আনহুমকে পাঠানো হলো। সাথে সাথে তাঁদের সেই স্থান সম্পর্কেও জানিয়ে দেওয়া হলো, যেখানে গিয়ে মহিলাকে অবশ্যই পাওয়া যাবে।
রাসুল সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের বলে দিলেন, 'তোমরা রওয়ানা হয়ে যাও। রওজায়ে খাখ নামক স্থানে গিয়ে একজন আরোহীকে পাবে। উটের ওপর একজন নারী থাকবে, তার কাছেই চিঠিটা রয়েছে।'
তিন সাহসী বাহাদুর যাত্রা করলেন এবং কথামতো মহিলাকে পেয়ে গেলেন। তাঁরা বললেন, 'তোমার সাথে থাকা চিঠিটি বের করো।'
মহিলা বলল, 'আমার কাছে কোনো চিঠি নেই।' তিন সাহাবি মহিলার বাহনসহ সবকিছু তল্লাশি করলেন, কিন্তু তার সাথে এমন কিছুই পেলেন না।
তখন আলি রাদিয়াল্লাহu আনহু বললেন, 'আল্লাহর শপথ, আমাদের মিথ্যা বলা হয়নি। আল্লাহর শপথ, হয়তো তুমি চিঠি বের করবে, নচেৎ আমরা তোমার কাপড় খুলে ফেলব।' আলি বুঝতে পেরেছিলেন, মহিলা চিঠিটি এমন স্থানে লুকিয়ে রেখেছে, যেখানে তল্লাশি করা সম্ভব নয়। মহিলা যখন বুঝতে পারল, সে ধরা খেয়ে গেছে এবং স্বীকার না করে কোনোভাবেই সেখান থেকে পালাতে পারবে না, তখন বলল, 'তোমরা একটু দূরে যাও।' তারা একটু দূরে গেলেন। তখন সে মাথা থেকে ওড়না খুলে চুলের খোপার ভেতর থেকে চিঠিটি বের করল। সাহাবিগণ চিঠি উদ্ধার করে নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ফিরে গেলেন।
নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম পত্রটি খুললেন, অপ্রত্যাশিতভাবে তাতে লেখা ছিল—'হাতেব ইবনু আবু বালতাআর পক্ষ থেকে মক্কার মুশরিকদের প্রতি...।' সেখানে নবিজির কিছু কিছু নির্দেশনা সম্পর্কে লেখা ছিল।
হাতেব ইবনু আবু বালতাআ রাদিয়াল্লাহu আনহু মজলিসেই বসা ছিলেন। তিনি নিজেই পত্রটি পড়ে নবিজিকে শোনাচ্ছিলেন। সাহাবিগণ বিস্মিত হয়ে শুনছিলেন আর ভাবছিলেন, হাতেব কীভাবে নবিজির যুদ্ধ সম্পর্কে কাফিরদের অবহিত করার পরিকল্পনা করতে পারে!
এই প্রথমবার সাহাবিগণের মাঝে এমন অপ্রত্যাশিত আচরণ পরিলক্ষিত হলো। নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাতেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'হাতেব, কী এটা?'
সকলের দৃষ্টি তখন হাতেবের দিকে। যেন তাঁকে খেয়ে ফেলবে। হাতেব বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমার ব্যাপারে দ্রুত কোনো ফায়সালা করবেন না।'
'মূল ঘটনা হলো, আমি কুরাইশদের মাঝে থাকতাম; কিন্তু আমি তাদের কেউ ছিলাম না। আমাদের সাথি মুহাজিরদের অনেক আত্মীয়-স্বজন এবং হিতৈষী মক্কায় রয়েছে। যেহেতু তাদের সাথে আমার বংশীয় সম্পর্ক নেই, তাই ভাবলাম, তাদের সাথে কোনো মাধ্যমে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক সৃষ্টি করব এবং সেই সুবাদে তাদের সাথে আন্তরিকতাপূর্ণ ব্যবহার করব।'
'হে আল্লাহর রাসুল, কুফুরিবশত এমনটি আমি করিনি। আমি দ্বীন থেকে ফিরেও যাইনি। ইমানের পর কুফুরির প্রতি রাজি হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না।' এরপর হাতেব রাদিয়াল্লাহu আনহু চুপ হয়ে গেলেন। নবিজিও চুপ থাকলেন। মজলিসের সবাই এমন নীরব-নিস্তব্ধ হয়ে গেছে যে, মনে হচ্ছে তাদের মাথার ওপর পাখি বসতে পারবে। অতঃপর নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুই শব্দের মাধ্যমে নিজের মন্তব্য পেশ করে বললেন, 'নিশ্চয় হাতেব সত্য বলেছে।'
উমর রাদিয়াল্লাহu আনহু নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলেন না। তিনি বলে উঠলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে অনুমতি দিন, এই মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দিই।'
প্রত্যুত্তরে নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করলেন, 'হাতেব বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। তুমি কি জানো না, আল্লাহ তাআলা বদরের মুজাহিদদের সম্পর্কে কী বলেছেন? আল্লাহ তাআলা তাঁদের লক্ষ্য করে বলেছেন- اعْمَلُوا مَا شِئْتُمْ فَقَدْ غَفَرْتُ لَكُمْ 'তোমরা যা চাও করো, তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি। সুতরাং আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করেছেন- يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ 'হে মুমিনরা, তোমরা আমার শত্রু এবং তোমাদের শত্রুকে বন্ধু বানিয়ো না।' [সুরা মুমতাহিনা: ১]
তো হাতেব সম্পর্কে নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অবহিত কে করল? যে স্থানে নিশ্চিতভাবে মহিলাকে পাওয়া যাবে, তার সংবাদ নবিজি কোথায় পেলেন? প্রকৃতপক্ষে ঐশী সাহায্য এবং ওহির মাধ্যমে নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম এগুলো খুব ভালোভাবে জানতে পারতেন।
টিকাঃ
২১. মুজামুল কাবির লিত্তাবারানি: ১৭/২৪৯।
২২. সহিহ বুখারি: ১০/ ১৯৪।
হাতেব ইবনে আবি বালতাআ রাদিয়াল্লাহু আনহু। অন্যতম মুহাজির সাহাবি। নিজের পরিবার, সন্তান এবং সম্পদ মক্কায় রেখে আল্লাহর রাস্তায় হিজরত করে মদিনায় এসেছেন। তিনি ছিলেন মুহাজিরগণের প্রথম সারির সদস্য। এমনকি হক ও বাতিলের মাঝে পার্থক্যকারী যুদ্ধ বদরের জিহাদেও তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন।
মুশরিকদের নিয়ন্ত্রণে মক্কায় ছেড়ে আসা সন্তান ও পরিবার নিয়ে তিনি খুব চিন্তা করতেন। সেখানে তাদের কোনো সহযোগী ছিল না, ছিল না কোনো হিতৈষী। হাতেব নিজেও কুরাইশ বংশের ছিলেন না; বরং তাদের মিত্র ছিলেন। কুরাইশদের মাঝে থাকতেন; কিন্তু কুরাইশদের সদস্য ছিলেন না। অন্যান্য মুহাজির সাহাবি, যাঁরা মক্কায় নিজেদের পরিবার রেখে এসেছেন, সবারই কমবেশ আত্মীয়-স্বজন মক্কায় ছিল। তারা তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করত এবং সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করত।
সুতরাং হাতেব সর্বদা পরিবারের জন্য চিন্তা করতেন; চিন্তা থেকেই কুরাইশদের জন্য বিভিন্ন প্রকার উপঢৌকন পাঠাতেন এবং তাদের জন্য সেবামূলক কাজ করতেন, যেন পরিবারের লোকজন তাদের কাছে একটু সহমর্মিতা পায় এবং নিরাপদে থাকে।
কয়েক বছর কেটে গেছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরাইশ কাফিরদের সাথে হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তি করেছেন। কিন্তু কুরাইশরা খুব দ্রুতই চুক্তি ভঙ্গ করে ফেলে। ফলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি সাহাবিগণকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ প্রদান করলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাচ্ছিলেন, কোনোক্রমেই যেন এই সংবাদ কুরাইশদের কানে না পৌঁছে। আগাম সংবাদ পেয়ে তারা যেন প্রস্তুতি গ্রহণ করতে না পারে। এতে উভয় দলের মধ্যে ভয়ংকর সংঘর্ষের আশঙ্কা থাকবে না। যুদ্ধ এবং কোনো রক্তপাত ছাড়াই মক্কা বিজয় হবে। তাই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় প্রতিপালকের কাছে দুআ করলেন— اللَّهُمَّ عَمِّ عَلَيْهِمْ خَبَرَنَا 'হে আল্লাহ, তাদের ওপর আমাদের সংবাদ গোপন রাখো।
কয়েকদিন পার হয়ে গেল, সংবাদটি গোপনই ছিল। হাতেব রাদিয়াল্লাহু আনহু মনে করলেন, কুরাইশদের সুদৃষ্টি লাভ করার এটি একটি মোক্ষম সময়। সুতরাং তিনি নবিজির যুদ্ধ সম্পর্কে কুরাইশদের অবহিত করে একটি চিঠি লিখলেন। তারপর চিঠিটি মদিনায় অবস্থানকারী মক্কার একনারীর কাছে দিয়ে দিলেন এবং তাকে নির্দেশ দিয়ে বললেন, 'চিঠিটি মক্কাবাসীর কাছে পৌঁছে দেবে।' মহিলাটি খুব দ্রুত মদিনা ত্যাগ করল, কিন্তু আল্লাহ তাআলা নবিজিকে বিষয়টি জানিয়ে দিলেন।
কুরাইশের কাছে পৌঁছার পূর্বেই চিঠিটি হস্তগত করা ছিল অতীব জরুরি। অতএব চিঠিটি উদ্ধার করার জন্য আলি, জুবাইর এবং মিকদাদ রাদিয়াল্লাহু আনহুমকে পাঠানো হলো। সাথে সাথে তাঁদের সেই স্থান সম্পর্কেও জানিয়ে দেওয়া হলো, যেখানে গিয়ে মহিলাকে অবশ্যই পাওয়া যাবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের বলে দিলেন, 'তোমরা রওয়ানা হয়ে যাও। রওজায়ে খাখ নামক স্থানে গিয়ে একজন আরোহীকে পাবে। উটের ওপর একজন নারী থাকবে, তার কাছেই চিঠিটা রয়েছে।'
তিন সাহসী বাহাদুর যাত্রা করলেন এবং কথামতো মহিলাকে পেয়ে গেলেন। তাঁরা বললেন, 'তোমার সাথে থাকা চিঠিটি বের করো।'
মহিলা বলল, 'আমার কাছে কোনো চিঠি নেই।' তিন সাহাবি মহিলার বাহনসহ সবকিছু তল্লাশি করলেন, কিন্তু তার সাথে এমন কিছুই পেলেন না। তখন আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহর শপথ, আমাদের মিথ্যা বলা হয়নি। আল্লাহর শপথ, হয়তো তুমি চিঠি বের করবে, নচেৎ আমরা তোমার কাপড় খুলে ফেলব।' আলি বুঝতে পেরেছিলেন, মহিলা চিঠিটি এমন স্থানে লুকিয়ে রেখেছে, যেখানে তল্লাশি করা সম্ভব নয়। মহিলা যখন বুঝতে পরল, সে ধরা খেয়ে গেছে এবং স্বীকার না করে কোনোভাবেই সেখান থেকে পালাতে পারবে না, তখন বলল, 'তোমরা একটু দূরে যাও।' তারা একটু দূরে গেলেন। তখন সে মাথা থেকে ওড়না খুলে চুলের খোপার ভেতর থেকে চিঠিটি বের করল। সাহাবিগণ চিঠি উদ্ধার করে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ফিরে গেলেন।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পত্রটি খুললেন, অপ্রত্যাশিতভাবে তাতে লেখা ছিল—'হাতেব ইবনু আবু বালতাআর পক্ষ থেকে মক্কার মুশরিকদের প্রতি...।' সেখানে নবিজির কিছু কিছু নির্দেশনা সম্পর্কে লেখা ছিল। হাতেব ইবনু আবু বালতাআ রাদিয়াল্লাহু আনহু মজলিসেই বসা ছিলেন। তিনি নিজেই পত্রটি পড়ে নবিজিকে শোনাচ্ছিলেন। সাহাবিগণ বিস্মিত হয়ে শুনছিলেন আর ভাবছিলেন, হাতেব কীভাবে নবিজির যুদ্ধ সম্পর্কে কাফিরদের অবহিত করার পরিকল্পনা করতে পারে!
এই প্রথমবার সাহাবিগণের মাঝে এমন অপ্রত্যাশিত আচরণ পরিলক্ষিত হলো। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাতেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'হাতেব, কী এটা?'
সকলের দৃষ্টি তখন হাতেবের দিকে। যেন তাঁকে খেয়ে ফেলবে। হাতেব বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমার ব্যাপারে দ্রুত কোনো ফায়সালা করবেন না।'
'মূল ঘটনা হলো, আমি কুরাইশদের মাঝে থাকতাম; কিন্তু আমি তাদের কেউ ছিলাম না। আমাদের সাথি মুহাজিরদের অনেক আত্মীয়-স্বজন এবং হিতৈষী মক্কায় রয়েছে। যেহেতু তাদের সাথে আমার বংশীয় সম্পর্ক নেই, তাই ভাবলাম, তাদের সাথে কোনো মাধ্যমে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক সৃষ্টি করব এবং সেই সুবাদে তাদের সাথে আন্তরিকতাপূর্ণ ব্যবহার করব।'
'হে আল্লাহর রাসুল, কুফুরিবশত এমনটি আমি করিনি। আমি দ্বীন থেকে ফিরেও যাইনি। ইমানের পর কুফুরির প্রতি রাজি হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না।' এরপর হাতেব রাদিয়াল্লাহু আনহু চুপ হয়ে গেলেন। নবিজিও চুপ থাকলেন। মজলিসের সবাই এমন নীরব-নিস্তব্ধ হয়ে গেছে যে, মনে হচ্ছে তাদের মাথার ওপর পাখি বসতে পারবে। অতঃপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুই শব্দের মাধ্যমে নিজের মন্তব্য পেশ করে বললেন, 'নিশ্চয় হাতেব সত্য বলেছে।'
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলেন না। তিনি বলে উঠলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে অনুমতি দিন, এই মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দিই।'
प्रत्युত্তরে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করলেন, 'হাতেব বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। তুমি কি জানো না, আল্লাহ তাআলা বদরের মুজাহিদদের সম্পর্কে কী বলেছেন? আল্লাহ তাআলা তাঁদের লক্ষ্য করে বলেছেন- ‘তোমরা যা চাও করো, তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি।’ সুতরাং আল্লাহ তাআলা অবতীর্ণ করেছেন- ‘হে মুমিনরা, তোমরা আমার শত্রু এবং তোমাদের শত্রুকে বন্ধু বানিয়ো না।’ [সুরা মুমতাহিনা: ১]
তো হাতেব সম্পর্কে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অবহিত কে করল? যে স্থানে নিশ্চিতভাবে মহিলাকে পাওয়া যাবে, তার সংবাদ নবিজি কোথায় পেলেন? প্রকৃতপক্ষে ঐশী সাহায্য এবং ওহির মাধ্যমে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এগুলো খুব ভালোভাবে জানতে পারতেন।
টিকাঃ
২১. মুজামুল কাবির লিত্তাবারানি: ১৭/২৪৯।
২২. সহিহ বুখারি: ১০/ ১৯৪।
📄 সাইপ্রাসদ্বীপ পর্যন্ত সামুদ্রিক যুদ্ধ
নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ফুফু উম্মে হারাম বিনতে মিলহান রাদিয়াল্লাহu আনহার সাক্ষাতে যেতেন এবং তাঁর ঘরে খাবার খেতেন। তাঁর স্বামী ছিলেন উবাদাহ বিন সামিত রাদিয়াল্লাহu আনহু। তিনি নবিজির সাক্ষাতে আনন্দিত হতেন। এভাবে একদিন নবিজি তাঁর বাড়িতে গেলেন, সেখানে খাবার খেলেন। তারপর তার বাড়িতেই বিশ্রাম করার জন্য শয়ন করলে চোখে নিদ্রা চলে আসে। তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুম থেকে জেগে হাসতে থাকেন।
ফুফু বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনি হাসছেন কেন?'
নবিজি বললেন- نَاسٌ مِنْ أُمَّتِي عُرِضُوا عَلَيَّ غُزَاةٌ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يَرْكَبُونَ ثَبَجَ هَذَا الْبَحْرِ مُلُوكًا عَلَى الْأَسِرَّةِ أَوْ مِثْلَ الْمُلُوكِ عَلَى الْأَسِرَّةِ .
'আমার উম্মাতের কিছু মানুষকে আল্লাহর পথে যুদ্ধের জন্য উপস্থাপন করা হবে। তারা এই সমুদ্রের বড় অংশ পর্যন্ত আরোহণ করবে পরিবারের রাজা হয়ে বা রাজার মতো হয়ে।
পরিবারের রাজা হয়ে! উম্মে হারাম উদগ্রীব হয়ে শুনতে চাইলেন, 'তারা কারা হবে?' এরপর নবিজিকে জিজ্ঞেস করলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর কাছে দুআ করুন, তিনি যেন আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন।' রাসুল সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জন্য দুআ করলেন। নবিজি বিছানায় মাথা রেখে আবার ঘুমিয়ে গেলেন। তারপর জেগে উঠে আবারও হাসছিলেন।
উম্মে হারাম জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি হাসছেন কেন, হে আল্লাহর রাসুল?'
রাসুল সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথমবারের মতোই বললেন-
نَاسُ مِنْ أُمَّتِي عُرِضُوا عَلَيَّ غُزَاةً فِي سَبِيلِ اللَّهِ يَرْكَبُونَ ثَبَجَ هَذَا الْبَحْرِ مُلُوكًا عَلَى الْأَسِرَّةِ أَوْ مِثْلَ الْمُلُوكِ عَلَى الْأَسِرَّةِ .
'আমার উম্মাতের কিছু মানুষকে আল্লাহর পথে যুদ্ধের জন্য উপস্থাপন করা হবে। তারা এই সমুদ্রের বড় অংশ পর্যন্ত আরোহণ করবে পরিবারের রাজা হয়ে বা রাজার মতো হয়ে।'
উম্মে হারাম নবিজিকে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর কাছে দুআ করুন, যেন তিনি আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন।'
নবিজি বললেন, 'তুমি আগের দলের অন্তর্ভুক্ত হবে।'
বহুবছর পার হয়ে গেল। নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন। অতঃপর চার খলিফা খিলাফতের আসনে অধিষ্ঠিত হলেন এবং দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন। তারপর যখন খলিফা মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহu আনহুর খিলাফতকাল এল, তখন উম্মে হারাম বিনতে মিলহান রাদিয়াল্লাহu আনহা সমুদ্র ভ্রমণে গেলেন। যখন তিনি জাহাজ থেকে নেমে সওয়ারিতে আরোহণ করলেন, তা থেকে পড়ে গেলেন এবং মারা গেলেন। রাদিয়াল্লাহu আনহা ওয়া আনহুম আজমাইন।
টিকাঃ
২৩. সহিহ বুখারি: ৯/৩৫২; সহিহ মুসলিম: ১০/২৩।
২৪. সহিহ বুখারি: ৯/৩৫২; সহিহ মুসলিম: ১০/২৩।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ফুফু উম্মে হারাম বিনতে মিলহান রাদিয়াল্লাহু আনহার সাক্ষাতে যেতেন এবং তাঁর ঘরে খাবার খেতেন। তাঁর স্বামী ছিলেন উবাদাহ বিন সামিত রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি নবিজির সাক্ষাতে আনন্দিত হতেন। এভাবে একদিন নবিজি তাঁর বাড়িতে গেলেন, সেখানে খাবার খেলেন। তারপর তার বাড়িতেই বিশ্রাম করার জন্য শয়ন করলে চোখে নিদ্রা চলে আসে। তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুম থেকে জেগে হাসতে থাকেন।
ফুফু বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনি হাসছেন কেন?'
নবিজি বললেন- ‘আমার উম্মাতের কিছু মানুষকে আল্লাহর পথে যুদ্ধের জন্য উপস্থাপন করা হবে। তারা এই সমুদ্রের বড় অংশ পর্যন্ত আরোহণ করবে পরিবারের রাজা হয়ে বা রাজার মতো হয়ে।’
পরিবারের রাজা হয়ে! উম্মে হারাম উদগ্রীব হয়ে শুনতে চাইলেন, 'তারা কারা হবে?' এরপর নবিজিকে জিজ্ঞেস করলেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর কাছে দুআ করুন, তিনি যেন আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জন্য দুআ করলেন। নবিজি বিছানায় মাথা রেখে আবার ঘুমিয়ে গেলেন। তারপর জেগে উঠে আবারও হাসছিলেন।
উম্মে হারাম জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি হাসছেন কেন, হে আল্লাহর রাসুল?'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথমবারের মতোই বললেন- ‘আমার উম্মাতের কিছু মানুষকে আল্লাহর পথে যুদ্ধের জন্য উপস্থাপন করা হবে। তারা এই সমুদ্রের বড় অংশ পর্যন্ত আরোহণ করবে পরিবারের রাজা হয়ে বা রাজার মতো হয়ে।’
উম্মে হারাম নবিজিকে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর কাছে দুআ করুন, যেন তিনি আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন।'
নবিজি বললেন, 'তুমি আগের দলের অন্তর্ভুক্ত হবে।'
বহুবছর পার হয়ে গেল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন। অতঃপর চার খলিফা খিলাফতের আসনে অধিষ্ঠিত হলেন এবং দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন। তারপর যখন খলিফা মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহুর খিলাফতকাল এল, তখন উম্মে হারাম বিনতে মিলহান রাদিয়াল্লাহু আনহা সমুদ্র ভ্রমণে গেলেন। যখন তিনি জাহাজ থেকে নেমে সওয়ারিতে আরোহণ করলেন, তা থেকে পড়ে গেলেন এবং মারা গেলেন। রাদিয়াল্লাহু আনহা ওয়া আনহুম আজমাইন।
টিকাঃ
২৩. সহিহ বুখারি: ৯/৩৫২; সহিহ মুসলিম: ১০/২৩।
২৪. সহিহ বুখারি: ৯/৩৫২; সহিহ মুসলিম: ১০/২৩।
📄 চাঁদ দু’ভাগ হয়ে গেল
কাফিরদের ইসলামের প্রতি আহ্বান করার ক্ষেত্রে নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব ধরনের কৌশলই অবলম্বন করলেন। তারা বরাবর নবিজিকে মিথ্যারোপ করতে থাকল এবং নানা প্রকার আপত্তি উত্থাপন করে তর্ক-বিতর্ক করতে থাকল। হঠাৎ একদিন নবিজিকে তারা বলল, 'আমাদের সামনে চাঁদ বিদীর্ণ করে দেখাও!' নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহকে ডাকলেন, সাহায্য চেয়ে দুআ করলেন। হঠাৎ চাঁদ দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল!
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহu আনহু বলেন, 'আমি নবিজির কাছ থেকে বের হওয়ার পূর্বেই মক্কায় চাঁদ দ্বিখণ্ডিত দেখেছি; এক খণ্ড আবি কুবাইস পাহাড়ে এবং আরেক খণ্ড সুওয়াইদা পাহাড়ে পড়তে দেখেছি।'
কাফিররাও এটা দেখল। তাদের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। কিন্তু শয়তান তাদের ওপর বিজয়ী হলো। তারা বলল, 'এটা জাদু, মুহাম্মদ তোমাদের ওপর জাদু করেছে।' তারা তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে বের হয়ে গেল। তারপর বলল, 'তোমরা সফর ফেরত লোকদের জিজ্ঞেস করো। যদি তারা সেই দেশগুলোতেও চাঁদ তোমাদের মতো বিদীর্ণ হতে দেখে, তাহলে বুঝবে, মুহাম্মদ সত্যই বলেছে। আর যদি এমনটি না হয়ে থাকে, তাহলে বুঝবে, এটা জাদু। কারণ, সব মানুষকে জাদুগ্রস্ত করা সম্ভব নয়।'
তারপর প্রথম পর্যটকদল যখন মক্কায় এসে পৌঁছল, কুরাইশরা তাদের জিজ্ঞেস করল, 'তোমরা কি চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হতে দেখেছ?'
তারা বলল, 'হ্যাঁ, অমুক রাতে আমরা এ রকম হতে দেখেছি।' তারপর অবশিষ্ট পর্যটকদের কাছে গেল, প্রত্যেকেই একই রকম জবাব দিলো। তবুও কুরাইশরা মিথ্যারোপ করল এবং অহংকারবশত বলল, 'মুহাম্মদ সব মানুষকেই জাদু করেছে।'
তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তাআলা এই মুজিজাকে কেন্দ্র করে কুরআন কারিমের এই আয়াতগুলো নাজিল করেন—
'কেয়ামত আসন্ন, চাঁদ বিদীর্ণ হয়েছে। তারা যদি কোনো নিদর্শন দেখে তবে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে, “এটা তো চিরাগত জাদু।” তারা মিথ্যারোপ করছে এবং নিজেদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করছে। প্রত্যেক কাজ যথাসময়ে স্থিরকৃত হয়। তাদের কাছে এমন সংবাদ এসে গেছে, যাতে সাবধানবাণী রয়েছে। এটা পরিপূর্ণ জ্ঞান, তবে সতর্ককারীগণ তাদের কোনো উপকারে আসে না। অতএব, আপনি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন। যেদিন আহ্বানকারী আহ্বান করবে এক অপ্রিয় পরিণামের দিকে, তারা তখন অবনমিত নেত্রে কবর থেকে বের হবে বিক্ষিপ্ত পঙ্গপাল সদৃশ। তারা আহ্বানকারীর দিকে দৌড়াতে থাকবে। কাফিররা বলবে, “এটা কঠিন দিন।”” [সুরা কামার : ১-৮]
বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, বর্তমান আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা বিশেষভাবে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়া নিয়ে গবেষণা করছে। তারা প্রমাণ পেয়েছে যে, ইতোপূর্বে চাঁদ দুই ভাগে বিদীর্ণ হয়েছিল।
টিকাঃ
৩৯. সহিহ বুখারি: ১১/৪৪৭১।
কাফিরদের ইসলামের প্রতি আহ্বান করার ক্ষেত্রে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব ধরনের কৌশলই অবলম্বন করলেন। তারা বরাবর নবিজিকে মিথ্যারোপ করতে থাকল এবং নানা প্রকার আপত্তি উত্থাপন করে তর্ক-বিতর্ক করতে থাকল। হঠাৎ একদিন নবিজিকে তারা বলল, 'আমাদের সামনে চাঁদ বিদীর্ণ করে দেখাও!' নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহকে ডাকলেন, সাহায্য চেয়ে দুআ করলেন। হঠাৎ চাঁদ দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল!
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আমি নবিজির কাছ থেকে বের হওয়ার পূর্বেই মক্কায় চাঁদ দ্বিখণ্ডিত দেখেছি; এক খণ্ড আবি কুবাইস পাহাড়ে এবং আরেক খণ্ড সুওয়াইদা পাহাড়ে পড়তে দেখেছি।'
কাফিররাও এটা দেখল। তাদের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। কিন্তু শয়তান তাদের ওপর বিজয়ী হলো। তারা বলল, 'এটা জাদু, মুহাম্মদ তোমাদের ওপর জাদু করেছে।' তারা তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে বের হয়ে গেল। তারপর বলল, 'তোমরা সফর ফেরত লোকদের জিজ্ঞেস করো। যদি তারা সেই দেশগুলোতেও চাঁদ তোমাদের মতো বিদীর্ণ হতে দেখে, তাহলে বুঝবে, মুহাম্মদ সত্যই বলেছে। আর যদি এমনটি না হয়ে থাকে, তাহলে বুঝবে, এটা জাদু। কারণ, সব মানুষকে জাদুগ্রস্ত করা সম্ভব নয়।'
তারপর প্রথম পর্যটকদল যখন মক্কায় এসে পৌঁছল, কুরাইশরা তাদের জিজ্ঞেস করল, 'তোমরা কি চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হতে দেখেছ?' তারা বলল, 'হ্যাঁ, অমুক রাতে আমরা এ রকম হতে দেখেছি।' তারপর অবশিষ্ট পর্যটকদের কাছে গেল, প্রত্যেকেই একই রকম জবাব দিলো। তবুও কুরাইশরা মিথ্যারোপ করল এবং অহংকারবশত বলল, 'মুহাম্মদ সব মানুষকেই জাদু করেছে।'
তৎক্ষণাৎ আল্লাহ তাআলা এই মুজিজাকে কেন্দ্র করে কুরআন কারিমের এই আয়াতগুলো নাজিল করেন— ‘কেয়ামত আসন্ন, চাঁদ বিদীর্ণ হয়েছে। তারা যদি কোনো নিদর্শন দেখে তবে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে, “এটা তো চিরাগত জাদু।” তারা মিথ্যারোপ করছে এবং নিজেদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করছে। প্রত্যেক কাজ যথাসময়ে স্থিরকৃত হয়। তাদের কাছে এমন সংবাদ এসে গেছে, যাতে সাবধানবাণী রয়েছে। এটা পরিপূর্ণ জ্ঞান, তবে সতর্ককারীগণ তাদের কোনো উপকারে আসে না। অতএব, আপনি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন। যেদিন আহ্বানকারী আহ্বান করবে এক অপ্রিয় পরিণামের দিকে, তারা তখন অবনমিত নেত্রে কবর থেকে বের হবে বিক্ষিপ্ত পঙ্গপাল সদৃশ। তারা আহ্বানকারীর দিকে দৌড়াতে থাকবেন। কাফিররা বলবে, “এটা কঠিন দিন।”’ [সুরা কামার : ১-৮]
বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, বর্তমান আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা বিশেষভাবে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়া নিয়ে গবেষণা করছে। তারা প্রমাণ পেয়েছে যে, ইতোপূর্বে চাঁদ দুই ভাগে বিদীর্ণ হয়েছিল।