📄 সুমাইয়া বিনতে খাইয়াতের বিস্ময়কর গল্প
তিনি নিকৃষ্ট আবু জাহেলের ক্রীতদাসী ছিলেন। আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে ইসলাম প্রেরণ করলে—তিনি, তাঁর স্বামী এবং সন্তান সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন থেকেই তাদের উপর আবু জাহেলের পরীক্ষা শুরু হলো, তাঁদের বিভিন্নভাবে কষ্ট দেওয়া আরম্ভ করল। তাঁদের প্রখর রোদে খোলা প্রান্তরে বেঁধে রাখত, যেন ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় তাঁদের প্রাণবায়ু ওষ্ঠাগত হয়।
একদিন তাঁদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছিল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁদের শরীর দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল। পিপাসার তাড়নায় তাঁদের ঠোঁটগুলো ফেটে গেছে। বেত্রাঘাতে তাঁদের শরীরের চামড়াগুলো কয়লার মতো কালো হয়ে গেছে। তদুপরি ওপর থেকে সূর্যের তাপ তাদের প্রজ্জ্বলিত করছিল। তাঁদের এমন অবস্থা দেখে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুব ব্যথিত হলেন। বললেন— صَبْرًا يَا آلَ يَاسَر ، فَإِنَّ مَوْعِدَكُمْ الْجَنَّةُ . 'হে ইয়াসিরের পরিবার, ধৈর্যধারণ করো। তোমাদের ঠিকানা জান্নাত।'
নবিজির এই আওয়াজ তাঁদের কানে যাওয়া-মাত্র কলিজাগুলো আনন্দে নেচে উঠল, যেন এই সুসংবাদ শুনে তাঁদের হৃদয়গুলো উড়তে লাগল। ইতোমধ্যেই হঠাৎ করে এই উম্মাতের ফেরাউন আবু জাহেল এল এবং রাগে গজগজ করতে করতে তাঁদের প্রতি জুলুমের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিলো। অত্যাচার করছিল আর বলছিল, 'মুহাম্মদ এবং তার রবকে গালি দাও!' কিন্তু আবু জাহেলের এই অত্যাচার তাঁদের ইমান, অবিচলতা এবং ধৈর্য কেবল বাড়িয়েই চলছিল। ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে এই নরাধম সুমাইয়ার দিকে মনোযোগ দিলো; তাঁর লজ্জাস্থানে বর্শা দ্বারা আঘাত করল! সুমাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহার ক্ষতস্থান থেকে রক্ত প্রবাহিত হতে থাকল, তাঁর শরীরের মাংস খুলে পড়ল, তিনি তীব্র ব্যথায় চিৎকার করতে থাকলেন, আর্তনাদ করতে থাকলেন, তাঁর স্বামী ও সন্তান পাশেই বাঁধা অবস্থায় এই দৃশ্য দেখছিলেন। আবু জাহেল গালি দিচ্ছিল আর বিভিন্ন কুফরি মন্তব্য করছিল। সুমাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহা আবু জাহেলের কথার জবাব দিচ্ছিলেন আর আল্লাহর নামে তাকবির বলছিলেন। আবু জাহেল অস্ত্র দিয়ে তাঁর শরীরের মাংস কাটছিল। একসময় সুমাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহা নিথর হয়ে পড়ে গেলেন। শাহাদাতের অমীয় সুধা পানে তিনি ধন্য হলেন।
হ্যাঁ, তিনি শহিদ হয়েছেন! তাঁর মৃত্যুর দৃশ্য কি নান্দনিক ছিল! তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন এমন অবস্থায়, যখন তাঁর প্রতিপালক তাঁর ওপর সন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি অবিচল থেকেছেন নিজ ধর্মের ওপর। তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন; কিন্তু শরীরের চামড়ার পরোয়া করেননি, আত্মসমর্পণ করে এই অত্যাচার বন্ধ করার পরোয়া না করে দ্বীনের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন।
আর আজকের যুবতিরা! হায়! কিঞ্চিৎ কষ্ট হলেই অস্থির হয়ে পড়ে। সোজা পথ থেকে ছিটকে পড়ে। অথচ তাদের একটি বেত্রাঘাতও করা হয়নি, কোনো শাস্তির ভয়ও দেখানো হয়নি। তদুপরি নিজেদের কান নষ্ট করছে গান শুনে শুনে, চোখ নষ্ট করছে ফ্লিম ও কৌতুক দেখে, অস্তিত্বকে নষ্ট করছে বেগানা ছেলেদের সাথে আলাপচারিতা করে, ইজ্জত-আব্রুকে বিনষ্ট করছে যৌনাচারিদের সঙ্গ দিয়ে।
হ্যাঁ, একসময় নারীরা কষ্টে ধৈর্যধারণ করত। কঠিন কষ্টেও তারা বিচলিত হতো না। লোহার প্রহার, স্বামী ও সন্তানের বিচ্ছেদ সবকিছুই দ্বীনের মহব্বতে এবং সমগ্র জগতের প্রতিপালকের বড়ত্বের সামনে মেনে নিত। তারা কখনো কোনোভাবেই দ্বীনের কোনো বিষয় থেকে কিঞ্চিৎ পরিমাণ সরে দাঁড়াত না, হিজাব পরিহার করত না, ইজ্জত-আব্রু কলঙ্কিত করত না। প্রয়োজনে জীবন দিতেও প্রস্তুত থাকত। তারা সর্বদা একটি চিন্তায় সময় অতিবাহিত করত-কীভাবে ইসলামের সেবা করব! দ্বীনের জন্য নিজেদের মাল-সম্পদ, সময় এবং জীবন পর্যন্ত তারা উৎসর্গ করত। সর্বদা দ্বীনের কল্যাণ কামনা এবং ইমান পাকাপোক্ত করত।
টিকাঃ
১৯. সহিহ বুখারি ৩৫৮/১৪:; সহিহ মুসলিম: ১৩৪৯৯/।
তিনি নিকৃষ্ট আবু জাহেলের ক্রীতদাসী ছিলেন। আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে ইসলাম প্রেরণ করলে—তিনি, তাঁর স্বামী এবং সন্তান সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন থেকেই তাদের উপর আবু জাহেলের পরীক্ষা শুরু হলো, তাঁদের বিভিন্নভাবে কষ্ট দেওয়া আরম্ভ করল। তাঁদের প্রখর রোদে খোলা প্রান্তরে বেঁধে রাখত, যেন ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় তাঁদের প্রাণবায়ু ওষ্ঠাগত হয়।
একদিন তাঁদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছিল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁদের শরীর দিয়ে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল। পিপাসার তাড়নায় তাঁদের ঠোঁটগুলো ফেটে গেছে। বেত্রাঘাতে তাঁদের শরীরের চামড়াগুলো কয়লার মতো কালো হয়ে গেছে। তদুপরি ওপর থেকে সূর্যের তাপ তাদের প্রজ্জ্বলিত করছিল। তাঁদের এমন অবস্থা দেখে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুব ব্যথিত হলেন। বললেন— صَبْرًا يَا آلَ يَاسَر ، فَإِنَّ مَوْعِدَكُمْ الْجَنَّةُ . 'হে ইয়াসিরের পরিবার, ধৈর্যধারণ করো। তোমাদের ঠিকানা জান্নাত।'
নবিজির এই আওয়াজ তাঁদের কানে যাওয়া-মাত্র কলিজাগুলো আনন্দে নেচে উঠল, যেন এই সুসংবাদ শুনে তাঁদের হৃদয়গুলো উড়তে লাগল। ইতোমধ্যেই হঠাৎ করে এই উম্মাতের ফেরাউন আবু জাহেল এল এবং রাগে গজগজ করতে করতে তাঁদের প্রতি জুলুমের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিলো। অত্যাচার করছিল আর বলছিল, 'মুহাম্মদ এবং তার রবকে গালি দাও!' কিন্তু আবু জাহেলের এই অত্যাচার তাঁদের ইমান, অবিচলতা এবং ধৈর্য কেবল বাড়িয়েই চলছিল। ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে এই নরাধম সুমাইয়ার দিকে মনোযোগ দিলো; তাঁর লজ্জাস্থানে বর্শা দ্বারা আঘাত করল!
সুমাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহার ক্ষতস্থান থেকে রক্ত প্রবাহিত হতে থাকল, তাঁর শরীরের মাংস খুলে পড়ল, তিনি তীব্র ব্যথায় চিৎকার করতে থাকলেন, আর্তনাদ করতে থাকলেন, তাঁর স্বামী ও সন্তান পাশেই বাঁধা অবস্থায় এই দৃশ্য দেখছিলেন। আবু জাহেল গালি দিচ্ছিল আর বিভিন্ন কুফরি মন্তব্য করছিল। সুমাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহা আবু জাহেলের কথার জবাব দিচ্ছিলেন আর আল্লাহর নামে তাকবির বলছিলেন। আবু জাহেল অস্ত্র দিয়ে তাঁর শরীরের মাংস কাটছিল। একসময় সুমাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহা নিথর হয়ে পড়ে গেলেন। শাহাদাতের অমীয় সুধা পানে তিনি ধন্য হলেন।
হ্যাঁ, তিনি শহিদ হয়েছেন! তাঁর মৃত্যুর দৃশ্য কি নান্দনিক ছিল! তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন এমন অবস্থায়, যখন তাঁর প্রতিপালক তাঁর ওপর সন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি অবিচল থেকেছেন নিজ ধর্মের ওপর। তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন; কিন্তু শরীরের চামড়ার পরোয়া করেননি, আত্মসমর্পণ করে এই অত্যাচার বন্ধ করার পরোয়া না করে দ্বীনের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন।
আর আজকের যুবতিরা! হায়! কিঞ্চিৎ কষ্ট হলেই অস্থির হয়ে পড়ে। সোজা পথ থেকে ছিটকে পড়ে। অথচ তাদের একটি বেত্রাঘাতও করা হয়নি, কোনো শাস্তির ভয়ও দেখানো হয়নি। তদুপরি নিজেদের কান নষ্ট করছে গান শুনে শুনে, চোখ নষ্ট করছে ফ্লিম ও কৌতুক দেখে, অস্তিত্বকে নষ্ট করছে বেগানা ছেলেদের সাথে আলাপচারিতা করে, ইজ্জত-আব্রুকে বিনষ্ট করছে যৌনাচারিদের সঙ্গ দিয়ে।
হ্যাঁ, একসময় নারীরা কষ্টে ধৈর্যধারণ করত। কঠিন কষ্টেও তারা বিচলিত হতো না। লোহার প্রহার, স্বামী ও সন্তানের বিচ্ছেদ সবকিছুই দ্বীনের মহব্বতে এবং সমগ্র জগতের প্রতিপালকের বড়ত্বের সামনে মেনে নিত। তারা কখনো কোনোভাবেই দ্বীনের কোনো বিষয় থেকে কিঞ্চিৎ পরিমাণ সরে দাঁড়াত না, হিজাব পরিহার করত না, ইজ্জত-আব্রু কলঙ্কিত করত না। প্রয়োজনে জীবন দিতেও প্রস্তুত থাকত। তারা সর্বদা একটি চিন্তায় সময় অতিবাহিত করত-কীভাবে ইসলামের সেবা করব! দ্বীনের জন্য নিজেদের মাল-সম্পদ, সময় এবং জীবন পর্যন্ত তারা উৎসর্গ করত। সর্বদা দ্বীনের কল্যাণ কামনা এবং ইমান পাকাপোক্ত করত।
টিকাঃ
১৯. সহিহ বুখারি ৩৫৮/১৪:; সহিহ মুসলিম: ১৩৪৯৯/।
📄 উম্মে শারিক গাজিয়া আনসারি
মক্কা মুকাররমায় যারা প্রথমদিকে ইসলাম গ্রহণ করেছেন, উম্মে শারিক গাজিয়া আনসারি তাঁদের অন্যতম। তিনি যখন অনুধাবন করতে পারলেন, কাফিররা সংগঠিত হচ্ছে এবং মুসলিমরা দুর্বল। তখন কাফিরদের ইসলামের দাওয়াতের দিকে অনুপ্রাণিত করলেন। এতে তাঁর ইমান আরও মজবুত হলো। তাঁর কাছে প্রতিপালকের শান আরও বড় হয়ে পরিস্ফুটিত হলো। এরপর তিনি কুরাইশি নারীদের ইসলামের দাওয়াত দেওয়া আরম্ভ করলেন এবং প্রতিমাপূজা থেকে দূরে রাখতে সচেষ্ট হলেন। একপর্যায়ে তাঁর বিষয়টি মক্কার কাফিরদের সামনে প্রকাশিত হয়ে গেল। ফলে কাফিররা অনেক রেগে গেল।
কাফিররা উম্মে শারিককে বলল, 'যদি তোমার কওমের লোকেরা আমাদের মিত্র না হতো, তাহলে তোমার সাথে এমন এমন আচরণ করতাম, কিন্তু তোমাকে আমরা মক্কা থেকে বহিষ্কার করে তোমার কওমের কাছে পাঠাচ্ছি।' সুতরাং তারা উম্মে শারিককে শোকোজ করে একটি উটে উঠিয়ে দিলো। তাঁকে কষ্ট দেওয়ার জন্য হাওদার ব্যবস্থাও করল না এবং কোনো প্রকার কাপড়ও দিলো না। এরপর পানাহার ছাড়া সম্পূর্ণ অভুক্ত অবস্থায় লাগাতার তিন দিন তাঁকে সফর করালো। তৃষ্ণা ও ক্ষুধায় তাঁর জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে গিয়েছিল।
তারা উম্মে শারিককে প্রচণ্ড ঘৃণাভরে দেখত। যখন কোনো মনজিলে যাত্রাবিরতি করত, তাকে রোদে বেঁধে রাখত আর নিজেরা গাছের ছায়ায় বসত। একবার পথিমধ্যে যাত্রাবিরতি করল। তাঁকে উট থেকে নামালো এবং রোদের মাঝে বেঁধে রাখল। তখন তিনি তাদের কাছে পানি চাইলেন; কিন্তু তারা পানি দিলো না।
তিনি পিপাসায় কাতরাচ্ছিলেন। হঠাৎ বুকের ওপর কোনো বস্তুর শীতলতা অনুভব করলেন। তিনি হাত দিয়ে সেটি ধরে দেখতে পেলেন, সেটা একটি পানির বালতি। সেখান থেকে তিনি সামান্য পান করলেন। তারপর বালতিটি তাঁর কাছ থেকে টেনে উপরের দিকে নেওয়া হলো। বালতিটি আবার এল। তিনি বালতিটি পেয়ে আবার পান করলেন, তারপর বালতিটি তুলে নেওয়া হলো। আবার বালতিটি এল। তিনি আবারও বালতিটি ধরে পান করলেন। এভাবে কয়েকবার হলো। বর্ণিত আছে, এরপর তিনি সেই পানি দ্বারা গোসল করেছেন এবং কাপড় ধুয়েছেন।
যখন কাফিররা জাগ্রত হলো এবং তাঁর শরীরে পানির চিহ্ন দেখতে পেল এবং তাঁকে দেখতে পেল প্রফুল্ল ও সুন্দর আকৃতিতে। তারা বিস্মিত হলো, এভাবে বাঁধা অবস্থায় কীভাবে তিনি পানির কাছে গেলেন! কাফিররা তাঁকে জিজ্ঞেস করল, 'তুমি কি বাঁধন খুলে আমাদের পানীয় থেকে পান করেছ?'
উম্মে শারিক বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের পানি থেকে পান করিনি; বরং আমার কাছে আকাশ থেকে একটি বালতি এসেছে। আমি সেখান থেকে পান করেছি।' বর্ণিত আছে, কাফিররা তখন একে অন্যের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল, যদি সে সত্যবাদী হয়, তাহলে অবশ্যই তার দ্বীন আমাদের দ্বীনের চেয়ে উত্তম। তখন কাফিররা তাদের পানপাত্রগুলো খুলে দেখল, সব আপন অবস্থায় রয়েছে। এটা দেখে উম্মে শারিকের সফরসাথি সকল কাফিরই ইসলাম গ্রহণ করল। তারা তাঁকে ছেড়ে দিলো এবং তাঁর সাথে উত্তম আচরণ করল।
তাদের ইসলাম গ্রহণের মূল কারণ হলো উম্মে শারিকের ধৈর্য, তাঁর অবিচলতা এবং ইমানের ওপর তাঁর দৃঢ়তা। উম্মে শারিক এমন অবস্থায় কিয়ামতের মাঠে উপস্থিত হবেন যে, তাঁর আমলনামায় বহু নর-নারীর ইসলাম গ্রহণের সাওয়াব লেখা থাকবে, যারা তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছেন।
হ্যাঁ, ইতিহাস উম্মে শারিকের পরিচয় এভাবেই দিয়েছে।
মক্কা মুকাররমায় যারা প্রথমদিকে ইসলাম গ্রহণ করেছেন, উম্মে শারিক গাজিয়া আনসারি তাঁদের অন্যতম। তিনি যখন অনুধাবন করতে পারলেন, কাফিররা সংগঠিত হচ্ছে এবং মুসলিমরা দুর্বল। তখন কাফিরদের ইসলামের দাওয়াতের দিকে অনুপ্রাণিত করলেন। এতে তাঁর ইমান আরও মজবুত হলো। তাঁর কাছে প্রতিপালকের শান আরও বড় হয়ে পরিস্ফুটিত হলো। এরপর তিনি কুরাইশি নারীদের ইসলামের দাওয়াত দেওয়া আরম্ভ করলেন এবং প্রতিমাপূজা থেকে দূরে রাখতে সচেষ্ট হলেন। একপর্যায়ে তাঁর বিষয়টি মক্কার কাফিরদের সামনে প্রকাশিত হয়ে গেল। ফলে কাফিররা অনেক রেগে গেল।
কাফিররা উম্মে শারিককে বলল, 'যদি তোমার কওমের লোকেরা আমাদের মিত্র না হতো, তাহলে তোমার সাথে এমন এমন আচরণ করতাম, কিন্তু তোমাকে আমরা মক্কা থেকে বহিষ্কার করে তোমার কওমের কাছে পাঠাচ্ছি।' সুতরাং তারা উম্মে শারিককে শোকোজ করে একটি উটে উঠিয়ে দিলো। তাঁকে কষ্ট দেওয়ার জন্য হাওদার ব্যবস্থাও করল না এবং কোনো প্রকার কাপড়ও দিলো না। এরপর পানাহার ছাড়া সম্পূর্ণ অভুক্ত অবস্থায় লাগাতার তিন দিন তাঁকে সফর করালো। তৃষ্ণা ও ক্ষুধায় তাঁর জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে গিয়েছিল।
তারা উম্মে শারিককে প্রচণ্ড ঘৃণাভরে দেখত। যখন কোনো মনজিলে যাত্রাবিরতি করত, তাকে রোদে বেঁধে রাখত আর নিজেরা গাছের ছায়ায় বসত। একবার পথিমধ্যে যাত্রাবিরতি করল। তাঁকে উট থেকে নামালো এবং রোদের মাঝে বেঁধে রাখল। তখন তিনি তাদের কাছে পানি চাইলেন; কিন্তু তারা পানি দিলো না।
তিনি পিপাসায় কাতরাচ্ছিলেন। হঠাৎ বুকের ওপর কোনো বস্তুর শীতলতা অনুভব করলেন। তিনি হাত দিয়ে সেটি ধরে দেখতে পেলেন, সেটা একটি পানির বালতি। সেখান থেকে তিনি সামান্য পান করলেন। তারপর বালতিটি তাঁর কাছ থেকে টেনে উপরের দিকে নেওয়া হলো। বালতিটি আবার এল। তিনি বালতিটি পেয়ে আবার পান করলেন, তারপর বালতিটি তুলে নেওয়া হলো। আবার বালতিটি এল। তিনি আবারও বালতিটি ধরে পান করলেন। এভাবে কয়েকবার হলো। বর্ণিত আছে, এরপর তিনি সেই পানি দ্বারা গোসল করেছেন এবং কাপড় ধুয়েছেন।
যখন কাফিররা জাগ্রত হলো এবং তাঁর শরীরে পানির চিহ্ন দেখতে পেল এবং তাঁকে দেখতে পেল প্রফুল্ল ও সুন্দর আকৃতিতে। তারা বিস্মিত হলো, এভাবে বাঁধা অবস্থায় কীভাবে তিনি পানির কাছে গেলেন! কাফিররা তাঁকে জিজ্ঞেস করল, 'তুমি কি বাঁধন খুলে আমাদের পানীয় থেকে পান করেছ?'
উম্মে শারিক বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের পানি থেকে পান করিনি; বরং আমার কাছে আকাশ থেকে একটি বালতি এসেছে। আমি সেখান থেকে পান করেছি।' বর্ণিত আছে, কাফিররা তখন একে অন্যের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল, যদি সে সত্যবাদী হয়, তাহলে অবশ্যই তার দ্বীন আমাদের দ্বীনের চেয়ে উত্তম। তখন কাফিররা তাদের পানপাত্রগুলো খুলে দেখল, সব আপন অবস্থায় রয়েছে। এটা দেখে উম্মে শারিকের সফরসাথি সকল কাফিরই ইসলাম গ্রহণ করল। তারা তাঁকে ছেড়ে দিলো এবং তাঁর সাথে উত্তম আচরণ করল। তাদের ইসলাম গ্রহণের মূল কারণ হলো উম্মে শারিকের ধৈর্য, তাঁর অবিচলতা এবং ইমানের ওপর তাঁর দৃঢ়তা। উম্মে শারিক এমন অবস্থায় কিয়ামতের মাঠে উপস্থিত হবেন যে, তাঁর আমলনামায় বহু নর-নারীর ইসলাম গ্রহণের সাওয়াব লেখা থাকবে, যারা তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছেন।
📄 কথা বলা বাঘ
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের শুরু-যুগের ঘটনা। এক-রাখাল মদিনার কোনো উপত্যকায় বকরি চরাত। একদিন একবাঘ বকরি পালের উপর হামলা করে বকরি নিয়ে পালাতে শুরু করে। রাখালও নাছোড়বান্দা, বাঘকে তাড়া করে তার কাছ থেকে বকরি ছিনিয়ে আনে। বাঘ আবার ফিরে এসে ওত পেতে থাকল এবং সুযোগ বুঝে আরেকটি বকরির উপর আক্রমণ করল। রাখাল এবারও তার বকরি ছুটিয়ে নিয়ে আসে। তারপর বাঘটি রাখালের দিকে তাকিয়ে বলল, 'তুমি কি আল্লাহকে ভয় করো না? আমার কাছ থেকে আমার রিজিক ছিনিয়ে নাও, অথচ আল্লাহ তাআলাই তা আমাকে দিয়েছেন!'
রাখাল বলল, 'আশ্চর্য বাঘ! আমার বকরিপালের উপর আক্রমণ করে আবার আমার সাথে কথা বলছে!'
বাঘ বলল, 'আমি কি তোমাকে এর চেয়েও বিস্ময়কর কিছু বলব না?'
'এর চেয়েও বিস্ময়কর? কী সেটা?'
'হ্যাঁ, বলছি; দুই মরুভূমির মাঝে খেজুরবাগান-সমৃদ্ধ ভূমিতে একজন লোক আছে। সে তোমাকে অতীত এবং ভবিষ্যতের কথা বলে দেবে।' অর্থাৎ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তারপর বাঘ আপন পথে চলে গেল।
রাখাল তার বকরিগুলো হাঁকিয়ে নিয়ে চলে এল। অতঃপর মদিনায় এসে বকরিরগুলো একটি গোয়ালে একত্র করল। তারপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ঘটনার বিবরণ জানাল। নবিজি একসাহাবিকে নির্দেশ দিলে তিনি মানুষের মাঝে ঘোষণা করলেন, 'আসসালাতু জামিয়াতুন- (নামাজ আরম্ভ হচ্ছে)।'
লোকজন মসজিদে একত্র হলো। তারা জানে না, কেন নবিজি তাদের ডেকেছেন! নবিজি তাদের সামনে এলেন। তারা সকলেই নবিজির সামনে নীরব হয়ে বসে ছিলেন। গ্রাম্যরাখালও তাদের মাঝে বসে ছিল।
নবিজি রাখালকে বললেন, 'তুমি এদের ঘটনাটি বলো।' রাখাল কথা বলতে লাগল এবং বাঘের ঘটনাটিও বলল। রাখাল বিশেষ ভঙ্গিতে কথা বলছিল আর লোকজন মনোযোগসহ তার কথা শুনছিল। নবিজিও চুপচাপ শুনছিলেন। রাখাল যখন তার কথা শেষ করল, তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'সে সত্যই বলেছে।'
তারপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ ، لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى تُكَلِّمَ السِّبَاعُ الْإِنْسَ ، وَحَتَّى تُكَلَّمَ الرَّجُلَ عَذَبَةُ سَوْطِهِ ، وَشِرَاكُ نَعْلِهِ، وَتُخْبِرَهُ فَخِذُهُ بِمَا أَحْدَثَ أَهْلُهُ مِنْ بَعْدِهِ
'আল্লাহর শপথ, ততক্ষণ কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ হিংস্র প্রাণী মানুষের সাথে কথা না বলবে, যতক্ষণ মানুষের সাথে তার তাজা চাবুক কথা না বলবে, যতক্ষণ তার জুতার ফিতা তার সাথে কথা না বলবে এবং যতক্ষণ তার উরু তাকে বলে না দেবে যে, তার অবর্তমানে তার পরিবারের মানুষ কী করেছে।
টিকাঃ
২০. তিরমিজি: ৮/৯৫।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের শুরু-যুগের ঘটনা। এক-রাখাল মদিনার কোনো উপত্যকায় বকরি চরাত। একদিন একবাঘ বকরি পালের উপর হামলা করে বকরি নিয়ে পালাতে শুরু করে। রাখালও নাছোড়বান্দা, বাঘকে তাড়া করে তার কাছ থেকে বকরি ছিনিয়ে আনে। বাঘ আবার ফিরে এসে ওত পেতে থাকল এবং সুযোগ বুঝে আরেকটি বকরির উপর আক্রমণ করল। রাখাল এবারও তার বকরি ছুটিয়ে নিয়ে আসে। তারপর বাঘটি রাখালের দিকে তাকিয়ে বলল, 'তুমি কি আল্লাহকে ভয় করো না? আমার কাছ থেকে আমার রিজিক ছিনিয়ে নাও, অথচ আল্লাহ তাআলাই তা আমাকে দিয়েছেন!'
রাখাল বলল, 'আশ্চর্য বাঘ! আমার বকরিপালের উপর আক্রমণ করে আবার আমার সাথে কথা বলছে!'
বাঘ বলল, 'আমি কি তোমাকে এর চেয়েও বিস্ময়কর কিছু বলব না?'
'এর চেয়েও বিস্ময়কর? কী সেটা?'
'হ্যাঁ, বলছি; দুই মরুভূমির মাঝে খেজুরবাগান-সমৃদ্ধ ভূমিতে একজন লোক আছে। সে তোমাকে অতীত এবং ভবিষ্যতের কথা বলে দেবে।' অর্থাৎ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তারপর বাঘ আপন পথে চলে গেল।
রাখাল তার বকরিগুলো হাঁকিয়ে নিয়ে চলে এল। অতঃপর মদিনায় এসে বকরিরগুলো একটি গোয়ালে একত্র করল। তারপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ঘটনার বিবরণ জানাল। নবিজি একসাহাবিকে নির্দেশ দিলে তিনি মানুষের মাঝে ঘোষণা করলেন, 'আসসালাতু জামিয়াতুন- (নামাজ আরম্ভ হচ্ছে)।'
লোকজন মসজিদে একত্র হলো। তারা জানে না, কেন নবিজি তাদের ডেকেছেন! নবিজি তাদের সামনে এলেন। তারা সকলেই নবিজির সামনে নীরব হয়ে বসে ছিলেন। গ্রাম্যরাখালও তাদের মাঝে বসে ছিল। নবিজি রাখালকে বললেন, 'তুমি এদের ঘটনাটি বলো।' রাখাল কথা বলতে লাগল এবং বাঘের ঘটনাটিও বলল। রাখাল বিশেষ ভঙ্গিতে কথা বলছিল আর লোকজন মনোযোগসহ তার কথা শুনছিল। নবিজিও চুপচাপ শুনছিলেন। রাখাল যখন তার কথা শেষ করল, তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'সে সত্যই বলেছে।'
তারপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ ، لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى تُكَلِّمَ السِّبَاعُ الْإِنْسَ ، وَحَتَّى تُكَلَّمَ الرَّجُلَ عَذَبَةُ سَوْطِهِ ، وَشِرَاكُ نَعْلِهِ، وَتُخْبِرَهُ فَخِذُهُ بِمَا أَحْدَثَ أَهْلُهُ مِنْ بَعْدِهِ 'আল্লাহর শপথ, ততক্ষণ কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ হিংস্র প্রাণী মানুষের সাথে কথা না বলবে, যতক্ষণ মানুষের সাথে তার তাজা চাবুক কথা না বলবে, যতক্ষণ তার জুতার ফিতা তার সাথে কথা না বলবে এবং যতক্ষণ তার উরু তাকে বলে না দেবে যে, তার অবর্তমানে তার পরিবারের মানুষ কী করেছে।
এটা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতের প্রমাণগুলোর মধ্য থেকে একটি। অনেক সৃষ্টিই তাঁর নবুওয়াতের সাক্ষ্য প্রদান করেছে।
টিকাঃ
২০. তিরমিজি: ৮/৯৫।
📄 হায় মিসকিন!
দুজন লোক মদিনায় আগমন করে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে প্রবেশ করল। তারা নবিজিকে বলল, 'আমাদের সাথে চলুন, যদি অস্বীকার করেন, তাহলে কিসরা আপনাকে ধ্বংস করে দেবেন, আপনার কওম ধ্বংস করবেন এবং আপনার শহর উজার করে ফেলবেন।'
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের দিকে তাকালেন। তারা উভয়ে দাড়ি মুণ্ডিয়ে মোচ রেখে দিয়েছিল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের চেহারার দিকে তাকাতে বিরক্তবোধ করছিলেন। তাদের বললেন, 'তোমাদের ধ্বংস হোক! কে তোমাদের এমন কাজের নির্দেশ দিয়েছে?'
তারা বলল, 'আমাদের প্রতিপালক কিসরা আমাদের এই নির্দেশ দিয়েছেন।'
তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করলেন, 'কিন্তু আমার প্রতিপালক আমাকে দাড়ি লম্বা করার এবং মোচ খাটো করার নির্দেশ দিয়েছেন।' এরপর তাদের বললেন, 'তোমরা যাও, বিশ্রাম নাও। আগামী সকালের অপেক্ষায় থাকো। সকালে আমার সাথে সাক্ষাৎ করবে।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ওহি এল, 'আল্লাহ তাআলা কিসরার পুত্রকে তার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছেন, পুত্র পিতাকে হত্যা করেছে।'
পর দিন সকালে লোক দুজন নবিজির দরবারে এল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বললেন, 'আমার প্রতিপালক তোমাদের প্রতিপালকের ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে তাকে হত্যা করেছেন। তার রক্ত তার জবাইয়ের স্থলে সময়ের অপেক্ষা করছে। অর্থাৎ এইমাত্র সে মারা গেছে। সেখান থেকে তার তাজা রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে।'
তাদের কাছে বিষয়টি খুব অস্বাভাবিক মনে হলো। তারা জিজ্ঞেস করল, 'আপনি কি জানেন, কী বলছেন আপনি? আমরা কি এটা আপনার কাছ থেকে লিখে নেব এবং এ ব্যাপারে আমাদের সম্রাটকে অবহিত করব?'
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, 'হ্যাঁ, তোমরা অবশ্যই আমার ব্যাপারে তাকে অবহিত করবে। আর তাকে বলবে, আমার দ্বীন এবং আমার রাজত্ব সে পর্যন্ত পৌঁছবে, যে পর্যন্ত কিসরার রাজত্ব পৌঁছেছে। এমনকি মোজা পরিধানকারী এবং নগ্নপদে বিচরণকারীদের শেষসীমা পর্যন্ত পৌঁছে যাবে।
'তাকে আরও বলবে, যদি সে ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে তার দখলে যা আছে তাকে দান করব এবং তাকে তার দেশবাসীর রাজা বানাব।'
তারা উভয়ে নবিজির দরবার থেকে বের হয়ে ইয়ামেনের উদ্দেশে যাত্রা করল এবং বাজানের কাছে পৌঁছে ঘটনার বিবরণ জানাল। ইয়ামেন থেকে পারস্যের দীর্ঘ দূরত্বের কারণে তাদের কাছে তখনো সম্রাটের মৃত্যুর সংবাদ পৌঁছেনি। বাজান বলল, 'আল্লাহর শপথ, এটা কোনো বাদশাহর কথা নয়। সে যেভাবে বলেছে তাতে তো তাকে নবিই মনে করছি। সে যা বলেছে, আমরা তা অবশ্যই দেখব। সে যা বলেছে, যদি সত্য হয়, তাহলে তাকে সত্যিই আল্লাহর প্রেরিত রাসুল মানতেই হবে। যদি এমন না হতো, তাহলে তার মতামত আমাদের মতোই হতো।'
খুব বেশি সময় অতিবাহিত হয়নি, বাজানের কাছে কিসরার পুত্র শিরবিয়ার পত্র এসে পৌঁছল। তাতে জানানো হয়েছে, 'শিরবিয়া হলো বর্তমান বাদশাহ এবং বর্তমান বাদশাহর আনুগত্য করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।' তারপর বাজান কিসরার মৃত্যুর সময় নিয়ে চিন্তা করল। দেখা গেল, সেটি ঠিক সেই মুহূর্ত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ওই দুজনকে তার মৃত্যুর সংবাদ দিয়েছিলেন। সুতরাং বাজান বলল, 'নিশ্চয় তিনি আল্লাহর রাসুল।' এরপর বাজান ইসলাম গ্রহণ করে এবং তাঁর সাথে ইয়ামেনবাসীও ইসলাম গ্রহণ করে।
দুজন লোক মদিনায় আগমন করে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে প্রবেশ করল। তারা নবিজিকে বলল, 'আমাদের সাথে চলুন, যদি অস্বীকার করেন, তাহলে কিসরা আপনাকে ধ্বংস করে দেবেন, আপনার কওম ধ্বংস করবেন এবং আপনার শহর উজার করে ফেলবেন।'
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের দিকে তাকালেন। তারা উভয়ে দাড়ি মুণ্ডিয়ে মোচ রেখে দিয়েছিল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের চেহারার দিকে তাকাতে বিরক্তবোধ করছিলেন। তাদের বললেন, 'তোমাদের ধ্বংস হোক! কে তোমাদের এমন কাজের নির্দেশ দিয়েছে?' তারা বলল, 'আমাদের প্রতিপালক কিসরা আমাদের এই নির্দেশ দিয়েছেন।'
তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করলেন, 'কিন্তু আমার প্রতিপালক আমাকে দাড়ি লম্বা করার এবং মোচ খাটো করার নির্দেশ দিয়েছেন।' এরপর তাদের বললেন, 'তোমরা যাও, বিশ্রাম নাও। আগামী সকালের অপেক্ষায় থাকো। সকালে আমার সাথে সাক্ষাৎ করবে।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ওহি এল, 'আল্লাহ তাআলা কিসরার পুত্রকে তার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছেন, পুত্র পিতাকে হত্যা করেছে।'
পর দিন সকালে লোক দুজন নবিজির দরবারে এল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বললেন, 'আমার প্রতিপালক তোমাদের প্রতিপালকের ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে তাকে হত্যা করেছেন। তার রক্ত তার জবাইয়ের স্থলে সময়ের অপেক্ষা করছে। অর্থাৎ এইমাত্র সে মারা গেছে। সেখান থেকে তার তাজা রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে।'
তাদের কাছে বিষয়টি খুব অস্বাভাবিক মনে হলো। তারা জিজ্ঞেস করল, 'আপনি কি জানেন, কী বলছেন আপনি? আমরা কি এটা আপনার কাছ থেকে লিখে নেব এবং এ ব্যাপারে আমাদের সম্রাটকে অবহিত করব?' নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, 'হ্যাঁ, তোমরা অবশ্যই আমার ব্যাপারে তাকে অবহিত করবে। আর তাকে বলবে, আমার দ্বীন এবং আমার রাজত্ব সে পর্যন্ত পৌঁছবে, যে পর্যন্ত কিসরার রাজত্ব পৌঁছেছে। এমনকি মোজা পরিধানকারী এবং নগ্নপদে বিচরণকারীদের শেষসীমা পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। 'তাকে আরও বলবে, যদি সে ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে তার দখলে যা আছে তাকে দান করব এবং তাকে তার দেশবাসীর রাজা বানাব।'
তারা উভয়ে নবিজির দরবার থেকে বের হয়ে ইয়ামেনের উদ্দেশে যাত্রা করল এবং বাজানের কাছে পৌঁছে ঘটনার বিবরণ জানাল। ইয়ামেন থেকে পারস্যের দীর্ঘ দূরত্বের কারণে তাদের কাছে তখনো সম্রাটের মৃত্যুর সংবাদ পৌঁছেনি। বাজান বলল, 'আল্লাহর শপথ, এটা কোনো বাদশাহর কথা নয়। সে যেভাবে বলেছে তাতে তো তাকে নবিই মনে করছি। সে যা বলেছে, আমরা তা অবশ্যই দেখব। সে যা বলেছে, যদি সত্য হয়, তাহলে তাকে সত্যিই আল্লাহর প্রেরিত রাসুল মানতেই হবে। যদি এমন না হতো, তাহলে তার মতামত আমাদের মতোই হতো।'
খুব বেশি সময় অতিবাহিত হয়নি, বাজানের কাছে কিসরার পুত্র শিরবিয়ার পত্র এসে পৌঁছল। তাতে জানানো হয়েছে, 'শিরবিয়া হলো বর্তমান বাদশাহ এবং বর্তমান বাদশাহর আনুগত্য করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।' তারপর বাজান কিসরার মৃত্যুর সময় নিয়ে চিন্তা করল। দেখা গেল, সেটি ঠিক সেই মুহূর্ত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ওই দুজনকে তার মৃত্যুর সংবাদ দিয়েছিলেন। সুতরাং বাজান বলল, 'নিশ্চয় তিনি আল্লাহর রাসুল।' এরপর বাজান ইসলাম গ্রহণ করে এবং তাঁর সাথে ইয়ামেনবাসীও ইসলাম গ্রহণ করে।