📄 নীরব নিবেদক
আমাকে একভাই ঘটনাটি শুনিয়েছেন। আরবের কয়েকজন যুবক পাশ্চাত্যের কোনো দেশে একবৃদ্ধার ঘর ভাড়া নেয়। ভাড়ার মেয়াদকাল শেষ হয়ে গেলে তারা নম্রতা পরিহার করে এবং এই দলিলে বৃদ্ধার সাথে রূঢ় আচরণ করা শুরু করে যে, বৃদ্ধা একজন কাফের-অমুসলিম। কাফেররা আমাদের সম্পদ ছিনিয়ে নিয়েছে; যেমন আরবকে তারা চুষে খাচ্ছে।
আশ্চর্য! এটা কেমন কথা? কোন বিবেকে তারা এমন কাজ করল? আসলে এটা প্রবৃত্তির চাহিদা এবং ইসলামি সভ্যতার ব্যাপারে অজ্ঞতার ফল ছাড়া কিছুই নয়। ওলামায়ে কেরাম কি আকিদার কিতাবে, ফিকহের কিতাবে অমুসলিমদের সাথে মুসলিমদের আচার-আচরণ, লেনদেন এবং আদব-সভ্যতার অধ্যায় সন্নিবেশিত করেননি? যুদ্ধরত কাফের এবং সাধারণ কাফেরদের সাথে মুসলিমদের আচরণ কেমন হবে, তা কি আমাদের কিতাবাদিতে স্পষ্ট উল্লেখ নেই?
আমরা কীভাবে ইসলাম নিয়ে গর্ব করি, অথচ আমরা নিজেরাই ইসলামি শিষ্টাচার ও সভ্যতা সম্পর্কে অজ্ঞ!
ঘটনার বর্ণনাকারী বলেন, আমি সেই বৃদ্ধার কাছ থেকে ঘর ভাড়া নিতে চাইলে সে পাশ কেটে চলে গেল। বিশেষভাবে যখন জানল যে, আমি মুসলিম তখন পরিষ্কার বলে দিলো, 'ওহ, মুসলিম! তোমরা তো চোর!'
বর্ণনাকারী বলেন, আমি বৃদ্ধাকে এই অপবাদ আরোপের কারণ জিজ্ঞাসা করলাম, 'কেন আপনি মুসলিমদের চোর বলছেন?' জবাবে বৃদ্ধাটি উক্ত যুবকদের ঘটনা বর্ণনা করলেন। বর্ণনাকারী বলেন, এই ঘটনা জানার পর থেকে মুসলিমদের উপর থেকে এই কলঙ্ক দূর করার চিন্তা শুরু করি।
শেষপর্যন্ত অনেক চেষ্টা-প্রচেষ্টা, প্রলোভন এবং অগ্রীম দেওয়ার প্রতিশ্রুতির পর আমাকে ভাড়া দিতে রাজি হয় এবং আমি তাকে ভাড়া বেশি দিতে রাজি হই।
আমি তার বাড়িতে অবস্থান করার পাশাপাশি তার প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়াতে সচেষ্ট হলাম। কখনো নিজেকে ইসলামের ফজিলতপূর্ণ আমল দ্বারা সাজিয়ে তাকে ইসলামি আদর্শ স্মরণ করিয়ে দেওয়ার প্রয়াস চালাতে থাকি এবং তাকে বুঝানোর চেষ্টা করি যে, এটাই হলো ইসলামি সভ্যতা। আমাদের ইসলামধর্ম এমন আখলাক-চরিত্র অর্জনে কেবল উৎসাহিতই করে না; বরং নির্দেশ প্রদান করে।
বর্ণনাকারী বলেন, যখন আমার বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এল, আমাকে নেওয়ার জন্য গাড়ি এল। সেই বৃদ্ধা তখন অশ্রুসিক্ত নয়নে বলছিলেন, 'বেটা, তোমার প্রতি আমার অসিয়ত থাকল, তুমি এই ধর্মের ওপরই মৃত্যুবরণ করবে।' আমি দেখছিলাম, অশ্রু তার গণ্ডদেশ সিক্ত করে বুকের দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে।
তারপর তিনি বললেন, 'হে বেটা, মানুষের সাথে এমন আচরণ করবে, যেন তোমরা বেঁচে থাকলে তোমাদের সম্ভাষণ জানায় আর মারা গেলে তোমাদের জন্য ক্রন্দন করে।'
আমরা ইমানের ন্যায় অমূল্য সম্পদের ভাণ্ডারের অধিকারী। সুতরাং সেটা হতে হবে প্রকৃত ইমান। শুধু ইমানের লেবেল থাকলে হবে না। এমন ইমান হতে হবে, যার মিষ্টতা অন্তরের গভীরে রেখাপাত করে, তারপর এই মিষ্টতা সেই মুসলমানের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। তখন তার কথা, কাজ, গুণাবলি ইমানের স্বাদ আস্বাদন করে। তো প্রকৃত ইমান যখন অর্জিত হবে, তখন তার প্রতিক্রিয়া, আচার-আচরণ, সততা এবং লেনদেনে তা প্রকাশ পাবে।
ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, দক্ষিণ হিন্দুস্থান, সিলান, মালদ্বীপ, চীনের উপকূল, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া এবং মধ্য আফ্রিকায় মুসলিম বণিকদের মাধ্যমে ইসলাম প্রচারিত ও প্রসারিত হয়েছে। তবে তাঁরা ছিলেন সত্যিকারের মুসলিম। টাকা-পয়সার চাকচিক্য তাঁদের প্রভাবিত করতে পারেনি; বরং তাঁদের আচরণ-বিচরণে, তাঁদের নিষ্ঠা এবং সততায় ইসলাম জীবন্ত রূপ ধারণ করেছিল।
তাঁদের এমন অমায়িক চরিত্রে মানুষ বিস্মিত হয়েছিল। মুসলিম বণিকদের সাথে এই চরিত্রের উৎস সম্পর্কে আলোচনা করতে থাকে। পরিশেষে তৃপ্ত হয়ে সেসব লোক সাগ্রহে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে।
তাদের হৃদয়ে অধিক প্রভাব বিস্তারকারী গুণটিই ছিল 'নেককার নেতৃত্বের মাঝে স্বতন্ত্র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য'; বরং সব জায়গায় ইসলাম প্রচারের এটিই ছিল সর্বোচ্চ মাধ্যম।
রাসুল সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিরাত গভীরভাবে লক্ষ করলে এই সত্যটিই ফুটে ওঠে যে, তিনি সর্বাবস্থায় উত্তম চরিত্র ধারণ করেছেন। বিশেষভাবে মানুষকে দ্বীনের পথে দাওয়াত দেওয়ার সময় তাঁর উত্তম চরিত্র প্রস্ফুটিত হয়েছে পূর্ণরূপে। সঙ্গত কারণেই আল্লাহর অনুগ্রহে এবং নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরিত্র মাধুরিতে মুগ্ধ হয়ে মানুষ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে এবং দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে।
একজন সাহাবি ইসলাম গ্রহণ করেই বলেছেন, 'আল্লাহর কসম, পৃথিবীর বুকে আপনার চেয়ে ঘৃণিত কোনো চেহারা আমার কাছে ছিল না, আর এখন আপনার চেহারা আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় চেহারা।'
অন্যজন বলেছেন, 'হে আল্লাহ, আমাকে রহম করুন এবং মুহাম্মদকে রহম করুন। আমাদের সাথে অন্য কাউকে রহম করবেন না।'
তিনি নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামের রহমকে প্রাধান্য দিলেন; তবে নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে আল্লাহ তাআলার রহমত সংকীর্ণ করার উপর ছেড়ে দিলেন না, তাঁর রহম তো সবকিছু পরিব্যাপ্ত করে রেখেছে; তাই রাসুল সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তুমি তো বিশাল বিস্তৃত একটি জিনিসকে সংকুচিত করে ফেললে।'
তৃতীয়জন বললেন, 'আমার পিতা-মাতার শপথ, আমি পূর্বে ও পরে তাঁর চেয়ে উত্তম শিক্ষক পাইনি।'
চতুর্থজন বলেছেন, 'হে আমার কওম, ইসলাম গ্রহণ করো। কেননা, মুহাম্মদ তাকে দেয়, যে অভাবের ভয় করে না।'
পঞ্চমজন বললেন, 'আল্লাহর কসম, রাসুল সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে কিছুই দেননি এবং তিনি আমার কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত মানুষ ছিলেন। তারপর আমাকে এমন কিছু দেওয়া আরম্ভ করলেন, যে জন্য এখন তিনি আমার সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি।'
ষষ্ঠজন নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক তাঁকে ক্ষমা করার পর বলেছেন, 'আমি সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষের নিকট থেকে মাত্র এলাম।' তারপর মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করতে থাকলেন। সুতরাং তাঁর আহ্বানে অনেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে।
তো বেসামরিক কাফেরদের সাথে মুসলিমদের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাদের কষ্ট, তাদের প্রতি অত্যাচার, সীমালঙ্ঘন এবং তাদের অধিকার খর্ব হওয়া প্রতিরোধ করা। সাথে সাথে তাদের সাথে সততা, নিষ্ঠা ইত্যাদি ইসলামি সভ্যতার প্রশংসিত বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্ব প্রদান করা এবং তাদের নিকট কল্যাণ ও উত্তম চরিত্র পৌঁছে দেওয়া।
সহিহ বুখারি-র একটি বর্ণনায় আছে, উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু মক্কায় অবস্থানরত তাঁর এক মুশরিক ভাইকে স্বর্ণের একটি অলংকার হাদিয়া দিয়েছিলেন। অলংকারটি তিনি নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে পেয়েছিলেন।
সহিহ বুখারির আরেকটি বর্ণনায় রয়েছে, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহu আনহুর পরিবারে তার সৌজন্যে বকরি জবাই করা হলো। যখন তার সামনে উপস্থাপন করা হলো, তখন তিনি বললেন-
আ-হদাইতুম লি-জারিনাল ইয়াহুদি। আমার প্রতিবেশী ইহুদিকে দিয়েছ কি? আবদুল্লাহ ইবনে উমর বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি-
মা জালা জিবরিলু ইউসিনি বিল জারি হাত্তা জনানতু আন্নাহু সাইউর্য়িরসুহু। জিবরাইল আ. আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে এত বেশি নির্দেশ দিতেন যে, আমি মনে করেছিলাম, প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেবেন।
একভাই বলেছেন, বর্ষাকালে আমি আমার গাড়ি রাস্তায় জমা পানির উপর দিয়ে চালিয়ে দিয়েছিলাম; বিষয়টি তখন আমি বুঝতে পারিনি। সুতরাং দুই দিকে পানি ছিটকে পড়ল। দরজার চৌকাঠে বসে থাকা একযুবকের ভাগ্য খারাপ ছিল। হায়! যদি আপনি তার অবস্থা দেখতেন; পুরো পাল্টে গেছে। সাদা কাপড় কালো হয়ে গেছে। কালো চুল কাদা আর পানির খেজাবে রঙিন হয়ে গেছে।
আমি পরে একসময় তাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন কেবল তাদের ধিক্কার, অভিসম্পাত এবং আমাকে অকথ্য ভাষায় গালি দেওয়ার আওয়াজই শুনতে পেলাম। তিনি বলেন, আমি লজ্জিত হয়ে পরিতাপ করতে করতে তাদের নিকট গেলাম। সুবহানাল্লাহ! কী আশ্চর্য! তাদের সেই গালি এবং অভিসম্পাত অভ্যর্থনা ও সালামের রূপে পরিবর্তন হয়ে গেল। তারা খাবারের দাওয়াত দিলো। ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার কথা বলতে লাগল। তারা বলল, 'আমরা সবাই তো একই জাতির।' ভাইটির কথা এখানেই শেষ।
হে প্রিয়, আমি সংক্ষেপে বলব, এটাই চরিত্র, যা বিস্ময়কর উপাখ্যান সৃষ্টি করে। আমরা যখন কোনো মানুষকে লাঞ্ছিত করি; মারাত্মক ভুল করে থাকি। কেননা, এই লাঞ্ছনার মাধ্যমে আমরা বুঝাতে চাই, আমাদের রুহ তাদের চেয়ে পবিত্র, আমাদের কলব তাদের চেয়ে স্বচ্ছ এবং আমরা তাদের চেয়ে মেধাবী।
একলোক আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে বলল, 'আমাকে কিছু নসিহত করুন।' ইবনে মোবারক রহমাতুল্লাহি আলাইহি বললেন, 'যখন তুমি বাড়ি থেকে বের হবে, পথে যত মানুষকে দেখবে, সবাইকে তোমার চেয়ে উত্তম মনে করবে।' মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণের অর্থ এই নয় যে, আমরা আমাদের আদর্শ থেকে বের হয়ে যাব, কিংবা চাটুকারিতা বা বাহুল্য প্রশংসা করব। না, এটা আমার উদ্দেশ্য নয়; বরং আমার উদ্দেশ্য হলো, হেকমত-প্রজ্ঞা, সুন্দর নসিহত এবং অন্যের সাথে লেনদেনের বিষয়টি পরিষ্কার রাখা।
হে প্রিয়, লেনদেন এবং সুন্দর চরিত্রের বিষয়ের দিকে তাকাও। দেখো, কী করছ তুমি! এই যে ইকরামা বিন আবু জাহেল। পিতা থেকে মিরাসসূত্রে ইসলামের শত্রুতা পেয়েছিল। প্রায় সব যুদ্ধেই সে মুসলিমদের বিপক্ষে অংশগ্রহণ করে। মক্কা বিজয়ের দিন মুসলিমদের সামনে প্রতিরোধ তৈরি করে। রাসুল সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক তার রক্ত হালাল ঘোষণার পর ইয়ামেনের দিকে সে পালিয়ে যায়।
পরবর্তী সময়ে তার স্ত্রী উম্মে হাকিম ইসলাম গ্রহণ-পূর্বক নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাজির হয়ে স্বামীর নিরাপত্তা চাইলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বললেন, 'তার প্রতি আমার পিতা-মাতা কুরবান হোক। সে নিরাপদ।' তারপর রাসুল সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিগণকে বললেন, 'ইকরামা মুমিন হয়ে হিজরত করে তোমাদের কাছে আসবে। সুতরাং তোমরা কেউ তার পিতাকে গালি দেবে না। মৃতকে গালি দিলে জীবিতরা কষ্ট পায়, মৃতের কিছু হয় না।' অতঃপর ইকরামা নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাজির হয়ে বললেন—
আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্নাকা আবদুহু ওয়া রাসুলুহু আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহই একমাত্র ইলাহ এবং আপনি তাঁর বান্দা ও রাসুল।
আরও বললেন, 'আপনি সবচেয়ে কল্যাণকামী নেককার মানুষ, সবচেয়ে সত্যবাদী মানুষ, সবচেয়ে বেশি প্রতিশ্রুতি পূর্ণকারী মানুষ। হে আল্লাহর রাসুল, আমি কসম করে বলছি, আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বাধা দেওয়ার জন্য যত অর্থ ব্যয় করেছি, তার দ্বিগুণ ইসলামের পথে ব্যয় করব।'
নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র স্পর্শে এই উম্মাতের ফেরাউন-পুত্র রহমান-রহিম আল্লাহর বন্ধুদের কাতারে প্রবেশ করলেন। ইসলাম-বিরোধিতার এই লজ্জা তাঁকে লজ্জিত করত, আবার ইসলাম গ্রহণের এই ইচ্ছা তাঁকে আশ্বস্ত করত। তারপর তাঁর অন্তরে ইসলাম দৃঢ় হয়ে গেল। চরিত্র কত বিস্ময়কর ইতিহাস রচনা করতে পারে!
হাসান বিন সাহাল কারও জন্য একটি সুপারিশপত্র লিখে দিয়েছিলেন। এর জন্য লোকটি তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করত। হাসান তাকে বললেন, 'ওহে, তুমি কেন আমার কৃতজ্ঞতা আদায় করছ? আমরা তো সুপারিশ করাকে নিজেদের অসদাচরণের কাফফারা মনে করি।'
টিকাঃ
[১২] সহিহ বুখারি: ১৮/৪৩১।
[১৩] আফরাহুররুহ-নামক কিতাব থেকে সংগৃহীত।
আমাকে একভাই ঘটনাটি শুনিয়েছেন। আরবের কয়েকজন যুবক পাশ্চাত্যের কোনো দেশে একবৃদ্ধার ঘর ভাড়া নেয়। ভাড়ার মেয়াদকাল শেষ হয়ে গেলে তারা নম্রতা পরিহার করে এবং এই দলিলে বৃদ্ধার সাথে রূঢ় আচরণ করা শুরু করে যে, বৃদ্ধা একজন কাফের-অমুসলিম। কাফেররা আমাদের সম্পদ ছিনিয়ে নিয়েছে; যেমন আরবকে তারা চুষে খাচ্ছে।
আশ্চর্য! এটা কেমন কথা? কোন বিবেকে তারা এমন কাজ করল? আসলে এটা প্রবৃত্তির চাহিদা এবং ইসলামি সভ্যতার ব্যাপারে অজ্ঞতার ফল ছাড়া কিছুই নয়। ওলামায়ে কেরাম কি আকিদার কিতাবে, ফিকহের কিতাবে অমুসলিমদের সাথে মুসলিমদের আচার-আচরণ, লেনদেন এবং আদব-সভ্যতার অধ্যায় সন্নিবেশিত করেননি? যুদ্ধরত কাফের এবং সাধারণ কাফেরদের সাথে মুসলিমদের আচরণ কেমন হবে, তা কি আমাদের কিতাবাদিতে স্পষ্ট উল্লেখ নেই?
আমরা কীভাবে ইসলাম নিয়ে গর্ব করি, অথচ আমরা নিজেরাই ইসলামি শিষ্টাচার ও সভ্যতা সম্পর্কে অজ্ঞ! ঘটনার বর্ণনাকারী বলেন, আমি সেই বৃদ্ধার কাছ থেকে ঘর ভাড়া নিতে চাইলে সে পাশ কেটে চলে গেল। বিশেষভাবে যখন জানল যে, আমি মুসলিম তখন পরিষ্কার বলে দিলো, 'ওহ, মুসলিম! তোমরা তো চোর!'
বর্ণনাকারী বলেন, আমি বৃদ্ধাকে এই অপবাদ আরোপের কারণ জিজ্ঞাসা করলাম, 'কেন আপনি মুসলিমদের চোর বলছেন?' জবাবে বৃদ্ধাটি উক্ত যুবকদের ঘটনা বর্ণনা করলেন। বর্ণনাকারী বলেন, এই ঘটনা জানার পর থেকে মুসলিমদের উপর থেকে এই কলঙ্ক দূর করার চিন্তা শুরু করি।
শেষপর্যন্ত অনেক চেষ্টা-প্রচেষ্টা, প্রলোভন এবং অগ্রীম দেওয়ার প্রতিশ্রুতির পর আমাকে ভাড়া দিতে রাজি হয় এবং আমি তাকে ভাড়া বেশি দিতে রাজি হই। আমি তার বাড়িতে অবস্থান করার পাশাপাশি তার প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়াতে সচেষ্ট হলাম। কখনো নিজেকে ইসলামের ফজিলতপূর্ণ আমল দ্বারা সাজিয়ে তাকে ইসলামি আদর্শ স্মরণ করিয়ে দেওয়ার প্রয়াস চালাতে থাকি এবং তাকে বুঝানোর চেষ্টা করি যে, এটাই হলো ইসলামি সভ্যতা। আমাদের ইসলামধর্ম এমন আখলাক-চরিত্র অর্জনে কেবল উৎসাহিতই করে না; বরং নির্দেশ প্রদান করে।
বর্ণনাকারী বলেন, যখন আমার বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এল, আমাকে নেওয়ার জন্য গাড়ি এল। সেই বৃদ্ধা তখন অশ্রুসিক্ত নয়নে বলছিলেন, 'বেটা, তোমার প্রতি আমার অসিয়ত থাকল, তুমি এই ধর্মের ওপরই মৃত্যুবরণ করবে।' আমি দেখছিলাম, অশ্রু তার গণ্ডদেশ সিক্ত করে বুকের দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে। তারপর তিনি বললেন, 'হে বেটা, মানুষের সাথে এমন আচরণ করবে, যেন তোমরা বেঁচে থাকলে তোমাদের সম্ভাষণ জানায় আর মারা গেলে তোমাদের জন্য ক্রন্দন করে।'
আমরা ইমানের ন্যায় অমূল্য সম্পদের ভাণ্ডারের অধিকারী। সুতরাং সেটা হতে হবে প্রকৃত ইমান। শুধু ইমানের লেবেল থাকলে হবে না। এমন ইমান হতে হবে, যার মিষ্টতা অন্তরের গভীরে রেখাপাত করে, তারপর এই মিষ্টতা সেই মুসলমানের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। তখন তার কথা, কাজ, গুণাবলি ইমানের স্বাদ আস্বাদন করে। তো প্রকৃত ইমান যখন অর্জিত হবে, তখন তার প্রতিক্রিয়া, আচার-আচরণ, সততা এবং লেনদেনে তা প্রকাশ পাবে।
ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, দক্ষিণ হিন্দুস্থান, সিলান, মালদ্বীপ, চীনের উপকূল, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া এবং মধ্য আফ্রিকায় মুসলিম বণিকদের মাধ্যমে ইসলাম প্রচারিত ও প্রসারিত হয়েছে। তবে তাঁরা ছিলেন সত্যিকারের মুসলিম। টাকা-পয়সার চাকচিক্য তাঁদের প্রভাবিত করতে পারেনি; বরং তাঁদের আচরণ-বিচরণে, তাঁদের নিষ্ঠা এবং সততায় ইসলাম জীবন্ত রূপ ধারণ করেছিল। তাঁদের এমন অমায়িক চরিত্রে মানুষ বিস্মিত হয়েছিল। মুসলিম বণিকদের সাথে এই চরিত্রের উৎস সম্পর্কে আলোচনা করতে থাকে। পরিশেষে তৃপ্ত হয়ে সেসব লোক সাগ্রহে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে। তাদের হৃদয়ে অধিক প্রভাব বিস্তারকারী গুণটিই ছিল 'নেককার নেতৃত্বের মাঝে স্বতন্ত্র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য'; বরং সব জায়গায় ইসলাম প্রচারের এটিই ছিল সর্বোচ্চ মাধ্যম।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিরাত গভীরভাবে লক্ষ করলে এই সত্যটিই ফুটে ওঠে যে, তিনি সর্বাবস্থায় উত্তম চরিত্র ধারণ করেছেন। বিশেষভাবে মানুষকে দ্বীনের পথে দাওয়াত দেওয়ার সময় তাঁর উত্তম চরিত্র প্রস্ফুটিত হয়েছে পূর্ণরূপে। সঙ্গত কারণেই আল্লাহর অনুগ্রহে এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরিত্র মাধুরিতে মুগ্ধ হয়ে মানুষ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে এবং দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে।
একজন সাহাবি ইসলাম গ্রহণ করেই বলেছেন, 'আল্লাহর কসম, পৃথিবীর বুকে আপনার চেয়ে ঘৃণিত কোনো চেহারা আমার কাছে ছিল না, আর এখন আপনার চেহারা আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় চেহারা।' অন্যজন বলেছেন, 'হে আল্লাহ, আমাকে রহম করুন এবং মুহাম্মদকে রহম করুন। আমাদের সাথে অন্য কাউকে রহম করবেন না।'
তিনি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রহমকে প্রাধান্য দিলেন; তবে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে আল্লাহ তাআলার রহমত সংকীর্ণ করার উপর ছেড়ে দিলেন না, তাঁর রহম তো সবকিছু পরিব্যাপ্ত করে রেখেছে; তাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তুমি তো বিশাল বিস্তৃত একটি জিনিসকে সংকুচিত করে ফেললে।' তৃতীয়জন বললেন, 'আমার পিতা-মাতার শপথ, আমি পূর্বে ও পরে তাঁর চেয়ে উত্তম শিক্ষক পাইনি।' চতুর্থজন বলেছেন, 'হে আমার কওম, ইসলাম গ্রহণ করো। কেননা, মুহাম্মদ তাকে দেয়, যে অভাবের ভয় করে না।' পঞ্চমজন বললেন, 'আল্লাহর কসম, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে কিছুই দেননি এবং তিনি আমার কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত মানুষ ছিলেন। তারপর আমাকে এমন কিছু দেওয়া আরম্ভ করলেন, যে জন্য এখন তিনি আমার সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি।'
ষষ্ঠজন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক তাঁকে ক্ষমা করার পর বলেছেন, 'আমি সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষের নিকট থেকে মাত্র এলাম।' তারপর মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করতে থাকলেন। সুতরাং তাঁর আহ্বানে অনেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে। তো বেসামরিক কাফেরদের সাথে মুসলিমদের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাদের কষ্ট, তাদের প্রতি অত্যাচার, সীমালঙ্ঘন এবং তাদের অধিকার খর্ব হওয়া প্রতিরোধ করা। সাথে সাথে তাদের সাথে সততা, নিষ্ঠা ইত্যাদি ইসলামি সভ্যতার প্রশংসিত বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্ব প্রদান করা এবং তাদের নিকট কল্যাণ ও উত্তম চরিত্র পৌঁছে দেওয়া।
সহিহ বুখারি-র একটি বর্ণনায় আছে, উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু মক্কায় অবস্থানরত তাঁর এক মুশরিক ভাইকে স্বর্ণের একটি অলংকার হাদিয়া দিয়েছিলেন। অলংকারটি তিনি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে পেয়েছিলেন। সহিহ বুখারির আরেকটি বর্ণনায় রয়েছে, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর পরিবারে তার সৌজন্যে বকরি জবাই করা হলো। যখন তার সামনে উপস্থাপন করা হলো, তখন তিনি বললেন- أهديتم الجارنا اليهودي. আমার প্রতিবেশী ইহুদিকে দিয়েছ কি? আবদুল্লাহ ইবনে উমর বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি- مَا زَالَ جِبْرِيلُ يُوصِينِي بِالْجَارِ حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ سَيُوَرِّثُهُ. জিবরাইল আ. আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে এত বেশি নির্দেশ দিতেন যে, আমি মনে করেছিলাম, প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেবেন।
একভাই বলেছেন, বর্ষাকালে আমি আমার গাড়ি রাস্তায় জমা পানির উপর দিয়ে চালিয়ে দিয়েছিলাম; বিষয়টি তখন আমি বুঝতে পারিনি। সুতরাং দুই দিকে পানি ছিটকে পড়ল। দরজার চৌকাঠে বসে থাকা একযুবকের ভাগ্য খারাপ ছিল। হায়! যদি আপনি তার অবস্থা দেখতেন; পুরো পাল্টে গেছে। সাদা কাপড় কালো হয়ে গেছে। কালো চুল কাদা আর পানির খেজাবে রঙিন হয়ে গেছে। আমি পরে একসময় তাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন কেবল তাদের ধিক্কার, অভিসম্পাত এবং আমাকে অকথ্য ভাষায় গালি দেওয়ার আওয়াজই শুনতে পেলাম। তিনি বলেন, আমি লজ্জিত হয়ে পরিতাপ করতে করতে তাদের নিকট গেলাম। সুবহানাল্লাহ! কী আশ্চর্য! তাদের সেই গালি এবং অভিসম্পাত অভ্যর্থনা ও সালামের রূপে পরিবর্তন হয়ে গেল। তারা খাবারের দাওয়াত দিলো। ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার কথা বলতে লাগল। তারা বলল, 'আমরা সবাই তো একই জাতির।' ভাইটির কথা এখানেই শেষ।
হে প্রিয়, আমি সংক্ষেপে বলব, এটাই চরিত্র, যা বিস্ময়কর উপাখ্যান সৃষ্টি করে। আমরা যখন কোনো মানুষকে লাঞ্ছিত করি; মারাত্মক ভুল করে থাকি। কেননা, এই লাঞ্ছনার মাধ্যমে আমরা বুঝাতে চাই, আমাদের রুহ তাদের চেয়ে পবিত্র, আমাদের কলব তাদের চেয়ে স্বচ্ছ এবং আমরা তাদের চেয়ে মেধাবী।
একলোক আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে বলল, 'আমাকে কিছু নসিহত করুন।' ইবনে মোবারক রহমাতুল্লাহি আলাইহি বললেন, 'যখন তুমি বাড়ি থেকে বের হবে, পথে যত মানুষকে দেখবে, সবাইকে তোমার চেয়ে উত্তম মনে করবে।' মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণের অর্থ এই নয় যে, আমরা আমাদের আদর্শ থেকে বের হয়ে যাব, কিংবা চাটুকারিতা বা বাহুল্য প্রশংসা করব। না, এটা আমার উদ্দেশ্য নয়; বরং আমার উদ্দেশ্য হলো, হেকমত-প্রজ্ঞা, সুন্দর নসিহত এবং অন্যের সাথে লেনদেনের বিষয়টি পরিষ্কার রাখা।
হে প্রিয়, লেনদেন এবং সুন্দর চরিত্রের বিষয়ের দিকে তাকাও। দেখো, কী করছ তুমি! এই যে ইকরামা বিন আবু জাহেল। পিতা থেকে মিরাসসূত্রে ইসলামের শত্রুতা পেয়েছিল। প্রায় সব যুদ্ধেই সে মুসলিমদের বিপক্ষে অংশগ্রহণ করে। মক্কা বিজয়ের দিন মুসলিমদের সামনে প্রতিরোধ তৈরি করে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক তার রক্ত হালাল ঘোষণার পর ইয়ামেনের দিকে সে পালিয়ে যায়।
পরবর্তী সময়ে তার স্ত্রী উম্মে হাকিম ইসলাম গ্রহণ-পূর্বক নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাজির হয়ে স্বামীর নিরাপত্তা চাইলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বললেন, 'তার প্রতি আমার পিতা-মাতা কুরবান হোক। সে নিরাপদ।' তারপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিগণকে বললেন, 'ইকরামা মুমিন হয়ে হিজরত করে তোমাদের কাছে আসবে। সুতরাং তোমরা কেউ তার পিতাকে গালি দেবে না। মৃতকে গালি দিলে জীবিতরা কষ্ট পায়, মৃতের কিছু হয় না।' অতঃপর ইকরামা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাজির হয়ে বললেন— أَشْهَدُ أَنْ لَّا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّكَ عَبْدُهُ وَ رَسُوْلُهُ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহই একমাত্র ইলাহ এবং আপনি তাঁর বান্দা ও রাসুল। আরও বললেন, 'আপনি সবচেয়ে কল্যাণকামী নেককার মানুষ, সবচেয়ে সত্যবাদী মানুষ, সবচেয়ে বেশি প্রতিশ্রুতি পূর্ণকারী মানুষ। হে আল্লাহর রাসুল, আমি কসম করে বলছি, আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বাধা দেওয়ার জন্য যত অর্থ ব্যয় করেছি, তার দ্বিগুণ ইসলামের পথে ব্যয় করব।'
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র স্পর্শে এই উম্মাতের ফেরাউন-পুত্র রহমান-রহিম আল্লাহর বন্ধুদের কাতারে প্রবেশ করলেন। ইসলাম-বিরোধিতার এই লজ্জা তাঁকে লজ্জিত করত, আবার ইসলাম গ্রহণের এই ইচ্ছা তাঁকে আশ্বস্ত করত। তারপর তাঁর অন্তরে ইসলাম দৃঢ় হয়ে গেল। চরিত্র কত বিস্ময়কর ইতিহাস রচনা করতে পারে!
হাসান বিন সাহাল কারও জন্য একটি সুপারিশপত্র লিখে দিয়েছিলেন। এর জন্য লোকটি তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করত। হাসান তাকে বললেন, 'ওহে, তুমি কেন আমার কৃতজ্ঞতা আদায় করছ? আমরা তো সুপারিশ করাকে নিজেদের অসদাচরণের কাফফারা মনে করি।'
টিকাঃ
১২. সহিহ বুখারি: ১৮/৪৩১।
১৩. আফরাহুররুহ-নামক কিতাব থেকে সংগৃহীত।
📄 জাদুর কারণে অসুস্থতা
জাদুর মাধ্যমে একপ্রকারের রোগ তৈরি করা হয়। জাদুর মাধ্যমে সৃষ্ট রোগটি শারীরিক রোগের চেয়ে ভিন্ন প্রকৃতির হয়। কেননা, এই রোগটি শরীরের একস্থান থেকে অন্যস্থানে স্থানান্তরিত হয় অনুভূতিশীল কোনো কারণ ছাড়াই।
জামাল আবদুল বারি বলেন, 'এই রোগের উপর মেডিকেল পরীক্ষা চালানোর সময় আমি যেই অবস্থাগুলো দেখেছি, সেগুলো মূলত রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া। এর মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, এই সমস্যাগুলো কিডনির মধ্যে অতিরিক্ত চাপ, উন্মত্ততা এবং পাথরের কারণে সৃষ্টি হয়েছে। আগামীতে আরও মেডিকেল পরীক্ষা চলবে, তখন এই প্রকারের রোগী নিজেকে পূর্ণ সুস্থ পাবে। এ বিষয়ে অন্যান্য গবেষণা এ কথাই বলে।'
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রাদিয়াল্লাহu আনহা-ও এই প্রকারের জাদুরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহu আনহা থেকে বর্ণিত আছে; তিনি এক-দাসীর ব্যাপারে ঘোষণা দিয়েছেন যে, 'আমি মারা গেলে তুমি স্বাধীন।' ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় যাকে 'মুদাব্বার' তথা মনিব বা মনীবের মৃত্যু-পরবর্তী স্বাধীন হবে বলা হয়।
এরপর আয়েশা রাদিয়াল্লাহu আনহা আল্লাহ তাআলা যত দিন চেয়েছেন অসুস্থ থেকেছেন। একসময় এক-সিন্ধি লোক তাঁর কাছে এল। তারপর বলল, 'আপনি তো জাদুরোগে আক্রান্ত।' আয়েশা জিজ্ঞেস করলেন, 'কে আমাকে জাদু করেছে?' লোকটি বলল, 'একজন নারী, যার মাঝে এই এই গুণ রয়েছে। তার কামরায় তার এক শিশু সাথি আছে।'
আয়েশা রাদিয়াল্লাহu আনহা বললেন, 'অমুক দাসীকে ডেকে আনো, যে আমার খেদমত করে।' খোঁজ করে তাকে এমন নারী প্রতিবেশীর বাড়িতে পাওয়া গেল, যেখানে উক্ত মহিলার একজন শিশু সাথি আছে। তাকে বলা হলো, 'আয়েশা রাদিয়াল্লাহu আনহা তোমাকে ডাকছেন।' মহিলা বলল, 'এই শিশুর পেশাব ধুয়ে পরে আসছি।' সুতরাং সে শিশুকে ধুইয়ে দেওয়ার পর এল।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহu আনহা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি আমাকে জাদু করেছ?' সে বলল, 'হ্যাঁ।' আয়েশা বললেন, 'কেন?' মহিলা বলল, 'আমি স্বাধীনতা ভালোবাসি।'
টিকাঃ
[১৪] মুওয়াত্তায়ে ইমাম মালেক।
জাদুর মাধ্যমে একপ্রকারের রোগ তৈরি করা হয়। জাদুর মাধ্যমে সৃষ্ট রোগটি শারীরিক রোগের চেয়ে ভিন্ন প্রকৃতির হয়। কেননা, এই রোগটি শরীরের একস্থান থেকে অন্যস্থানে স্থানান্তরিত হয় অনুভূতিশীল কোনো কারণ ছাড়াই।
জামাল আবদুল বারি বলেন, 'এই রোগের উপর মেডিকেল পরীক্ষা চালানোর সময় আমি যেই অবস্থাগুলো দেখেছি, সেগুলো মূলত রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া। এর মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, এই সমস্যাগুলো কিডনির মধ্যে অতিরিক্ত চাপ, উন্মত্ততা এবং পাথরের কারণে সৃষ্টি হয়েছে। আগামীতে আরও মেডিকেল পরীক্ষা চলবে, তখন এই প্রকারের রোগী নিজেকে পূর্ণ সুস্থ পাবে। এ বিষয়ে অন্যান্য গবেষণা এ কথাই বলে।'
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা-ও এই প্রকারের জাদুরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত আছে; তিনি এক-দাসীর ব্যাপারে ঘোষণা দিয়েছেন যে, 'আমি মারা গেলে তুমি স্বাধীন।' ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় যাকে 'মুদাব্বার' তথা মনিব বা মনীবের মৃত্যু-পরবর্তী স্বাধীন হবে বলা হয়।
এরপর আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা আল্লাহ তাআলা যত দিন চেয়েছেন অসুস্থ থেকেছেন। একসময় এক-সিন্ধি লোক তাঁর কাছে এল। তারপর বলল, 'আপনি তো জাদুরোগে আক্রান্ত।' আয়েশা জিজ্ঞেস করলেন, 'কে আমাকে জাদু করেছে?' লোকটি বলল, 'একজন নারী, যার মাঝে এই এই গুণ রয়েছে। তার কামরায় তার এক শিশু সাথি আছে।'
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন, 'অমুক দাসীকে ডেকে আনো, যে আমার খেদমত করে।' খোঁজ করে তাকে এমন নারী প্রতিবেশীর বাড়িতে পাওয়া গেল, যেখানে উক্ত মহিলার একজন শিশু সাথি আছে। তাকে বলা হলো, 'আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা তোমাকে ডাকছেন।' মহিলা বলল, 'এই শিশুর পেশাব ধুয়ে পরে আসছি।' সুতরাং সে শিশুকে ধুইয়ে দেওয়ার পর এল। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি আমাকে জাদু করেছ?' সে বলল, 'হ্যাঁ।' আয়েশা বললেন, 'কেন?' মহিলা বলল, 'আমি স্বাধীনতা ভালোবাসি।'
টিকাঃ
১৪. মুওয়াত্তায়ে ইমাম মালেক।
📄 যৌবনের আসক্তি
সম্প্রতি লোভ-প্রলোভন আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রবৃত্তির চাহিদা নানান কিসিম ধারণ করেছে। নৈরাজ্যবাদীরা তাদের চ্যানেল এবং ম্যাগাজিনগুলোতে এ ব্যাপারে বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞদের বচন বলতে আরম্ভ করেছে। তারা সহানুভূতি দেখিয়ে হারামকে আলোড়িত করতে এসেছে।
সুতরাং অনেক পুরুষ-নারী ম্যাগাজিনের চমক ও প্রবৃত্তির চাহিদার চোরাবালিতে ঘুরপাক খাচ্ছে এবং চ্যানেলগুলো উলঙ্গপনা ছড়াচ্ছে আর চলচ্চিত্রগুলো তাতে রঙ চড়িয়ে প্রচার-প্রসারের প্রতিনিধিত্ব করছে।
আল্লাহর কসম, এগুলো বড় ফিতনা, কঠিন পরীক্ষা। এসব মানুষকে এমন বস্তুর দাসত্বে মত্ত করছে, যে জন্য তাদের সৃষ্টি করা হয়নি। হৃদয়কে বানিয়েছে প্রেমাষ্পদের জন্য। সুতরাং হৃদয় কষ্টে জর্জরিত, ফিতনায় পরিপূর্ণ। ফলে প্রেমিক প্রেমাষ্পদের জন্য জীবন দিচ্ছে, তার জন্য লাঞ্ছিত অপদস্থ হচ্ছে। তাকে ডাকলেই সাড়া দেয়। যদি বলা হয়, কী চাও তুমি? সে তখন প্রেমের প্রতিফল চায়।
অসংযত দৃষ্টি চোখের প্রমাদে লিপ্ত হওয়া বেহায়াপনা ও গোনাহের দিকে আকৃষ্ট করে, হারাম কাজে জড়িত করে এবং আল্লাহ থেকে বিমুখ করে দেয়।
কত দিন পর্যন্ত জাহান্নামে মাথা ঢুকিয়ে দৃষ্টির ফিতনায় লিপ্ত থাকবে? এগুলোর স্বাদ আস্বাদন মূলত যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আল্লাহর নেয়ামত থেকে কত দিন দূরে থাকবে এবং তার অভিশাপ আর কত ডেকে আনবে? কোন বস্তু তোমাকে আল্লাহর নেয়ামত থেকে দূরে রেখেছে? কোন বস্তু চিন্তা ও পেরেশানিকে বাড়িয়ে দিয়েছে? সুস্থতা থেকে কোন বস্তু তোমাকে সরিয়ে রেখেছে? তোমার গোপন দোষ কীসে প্রকাশ করেছে? তোমার চেহারা থেকে কীসে নুরের জ্যোতি দূরীভূত করেছে?
হয়তো এখন তুমি জবাব দিবে, এটা প্রেমাষ্পদের প্রতি প্রেমের কারণে। হায়! যদি মানুষ বুঝত! হ্যাঁ, তুমি অসংযত দৃষ্টির ব্যাপারে কি বলবে? কেননা, হারাম বস্তুর সাথে অনিয়ন্ত্রিত সম্পর্ক কেবল আক্রান্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিগ্রস্তই করে না; বরং আল্লাহ তাআলার নিয়ম হলো, ব্যভিচারের সময় পরাক্রমশালী আল্লাহর ক্রোধ কঠিনাকার ধারণ করে।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহu আনহু বলেন, যখন কোনো জনপদে সুদ ও ব্যভিচার প্রকাশ পায়, আল্লাহ তাআলা সেই জনপদ ধ্বংসের অনুমতি দেন।
ইবনে মাজাহ রহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং অন্যান্য ইমামের গবেষণা অনুযায়ী একটি হাসান হাদিসে বর্ণিত আছে-
লাম তাজহারিল ফাহিশাতু ফি কওমিন কত্তু হাত্তা ইউ’লিনু বিহা ইল্লা ফাসা ফিহিমুত তউন ওয়াল আওজাউ আল্লাতি লাম তাকুন মাদাত ফি আসলাফিহিমুল্লাদিনা মদাউ। 'যখন কোনো সমাজে প্রকাশ্যে ব্যভিচার হয়, সেখানে মহামারি ছড়িয়ে পড়ে এবং এমন ক্ষুধা (দুর্ভিক্ষ) তাদের আক্রান্ত করে; তাদের পূর্বপুরুষদের মাঝে যেমনটি হয়নি।
ইউসুফ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে ভাবুন, যাঁকে কল্পনাতীত জ্যোতি, সৌন্দর্য এবং ঔজ্জ্বল্য দান করা হয়েছিল। তাঁর মনিবের স্ত্রী তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হলো। এই গোলামকে তার স্বামী খেদমতের জন্য স্বল্পমূল্যে ক্রয় করেছিলেন। এটি একটি অভূতপূর্ব বিষয় যে, কেলেঙ্কারির ভয় নেই। টগবগে যুবক। এমন নারীর প্রতি আকৃষ্ট হওয়াটাই স্বাভাবিক। তদুপরি নারীটি সম্মান ও সম্পদের অধিকারী। আবার তাঁকে জেলখানা এবং লাঞ্ছনার ভয় দেখাচ্ছে, তাঁর প্রতি আসক্তও, তাঁকে পদস্খলিত করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে। একপর্যায়ে ঘরে ঢুকে সব দরজা বন্ধ করে, সুন্দর জামা-কাপড় পরিধান করে, বিছানা পরিপাটি করে, বেহায়াপনা ও আকুতির স্বরে বলল, 'ইউসুফ এসো, আমার যৌবনের ক্ষুধা মেটাও!'
তখন পবিত্র ইউসুফ আলাইহিস সালাম তার খপ্পর থেকে বাঁচার জন্য চিৎকার দিয়ে বললেন- মা’আদাল্লাহ ইন্না হু রব্বি আহসানা মাসওয়া-ইয়া ইন্নাহু লা ইউফলিহুজ জালিমুন। 'সে বলল, আল্লাহ রক্ষা করুন! তোমার স্বামী আমার মালিক। তিনি আমাকে সযত্নে থাকতে দিয়েছেন। নিশ্চয় সীমালঙ্ঘনকারীরা সফল হয় না।' [সুরা ইউসুফ: ২৩]
ইউসুফ আলাইহিস সালামের সেই অবস্থাটি নিয়েও ভাবুন! যখন আজিজের স্ত্রী মন্ত্রীদের বিবি ও নেতাদের রক্ষিতাদের সমবেত করল। তাদের জন্য রাখল ফলের তশতরি। প্রত্যেকের হাতে দিলো একটি করে চাকু। তারপর ইউসুফ আলাইহিস সালামকে তাদের সামনে যেতে বলেই বিবিদের নির্দেশ দিলো ফল কাটার। ইউসুফকে দেখা-মাত্র তাঁর সৌন্দর্য ও ঔজ্জ্বল্যে তাদের জ্ঞান লোপ পেল এবং ফলের পরিবর্তে চাকু দিয়ে হাত কেটে ফেলল এবং বলল-
হাশা লিল্লাাহি মা হাদা বাশারান ইন হাদা ইল্লা মালাকুন কারিম। 'কখনোই নয়, এ ব্যক্তি মানব নয়-এ তো কোনো মহান ফেরেশতা।' [সুরা ইউসুফ: ৩১]
ইউসুফ আলাইহিস সালাম কি তার দিকে তাকিয়েছেন? অথবা নিজের যৌবন ও সৌন্দর্যের কারণে ধোঁকা খেয়েছেন?
কখনো না; বরং তিনি জোরে চিৎকার করেছেন এবং বলেছেন-
কলা রব্বিস সিজ্নু আহাব্বু ইলাইয়া মিম্মা ইয়াদ’উনানি ইলাইহি ওয়া ইল্লা তাসরিফ আন্নি কাইদাহুন্না আসবু ইলাইহিন্না ওয়া আকুম মিনাল জাহিলিন। 'ইউসুফ বলল, হে আমার পালনকর্তা, তারা আমাকে যে কাজের দিকে আহ্বান করে, তার চাইতে আমি কারাগারই পছন্দ করি। যদি আপনি তাদের চক্রান্ত আমার ওপর থেকে প্রতিহত না করেন, তবে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ব এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।' [সুরা ইউসুফ : ৩৩]
তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর দুআ কবুল করেছেন এবং আজিজের স্ত্রী জুলাইখার চক্রান্ত রুখে দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে-
ফাস্তাজাবা লাহু রব্বুহু ফাসরফা আনহু কাইদাহুন্না ইন্নাহু হুয়াস সামিউল আলিম। 'অতঃপর তার পালনকর্তা তার দুআ কবুল করে নিলেন। তারপর তাদের চক্রান্ত প্রতিহত করলেন। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।' [সুরা ইউসুফ: ৩৪]
হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন, তাঁর কাছে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার চেয়ে কারাগারে বন্দি হওয়াটাই উত্তম ছিল।
জুলাইখার ঘটনাটি কবি উমর বিন রবিয়া'-এর ঘটনার সাথে মিলে যায়।
কবি উমর বিন রবিয়া পথ দিয়ে চলার সময় একমহিলার হাতের ওপর দৃষ্টি পড়ে। কবি মনে করেছেন মহিলাটি তাকে হাত দ্বারা ইঙ্গিত করেছে। আর এতেই কবি মহিলার প্রেমে পড়ে যায়। এমনকি সেই মহিলার সঙ্গে সাক্ষাৎ ও তার সঙ্গে মিলিত হতে কবি অস্থির হয়ে পড়েন। (আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।)
নোংরা ফিল্মগুলো দেখার কারণে, যেখানে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা উপস্থাপন করা হয়; এমন কুধারণা অন্তরে সৃষ্টি হয় যে, নারী-পুরুষের মেলামেশা স্বাভাবিক ব্যাপার। এর চেয়েও বড় বিষয়টি হলো, এই ফ্লিমগুলোতে যখন নারী-পুরুষের একান্ত আচরণ এবং চুমু খাওয়ার দৃশ্য দেখানো হয়, তখন যেসব নারী-পুরুষ এটা দেখে, তাদের হৃদয়ের সুপ্ত চাহিদা জেগে ওঠে, শিহরণ তৈরি হয়, লজ্জা দূর হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে তারাই বিপদে আক্রান্ত হয়।
যে ব্যক্তি এই বেহায়াপনা ও পাপাচারিতা দেখে এবং প্রেমাষ্পদ ও প্রেমিকের সাক্ষাৎ অবলোকন করে, তার হৃদয় সর্বদা এই চিত্র অনুসরণ করার চেষ্টা করে। বাজারে, ঘরে এবং অফিসে সর্বদা সেই কল্পনার আল্পনাই আঁকতে থাকে। এ দিকে শয়তান অবিরত তাকে উসকানি দিতে থাকে এবং ওই নারীর দিকে আহ্বান করতে থাকে।
তাই আল্লাহ তাআলা যখন ব্যভিচার থেকে লজ্জাস্থানকে হেফাজত করার নির্দেশ দিয়েছেন, তার পূর্বে চোখ সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
কুল লিলমুমিনিনা ইয়াগুদ্দু মিন আবসারিহিম ওয়া ইয়াহফাজু ফুরুজাহুম ওয়া কুল লিলমুমিনাতি ইয়াগদুদনা মিন আবসারিহিন্না ওয়া ইয়াহফাজনা ফুরুজাহুন্না
'মুমিন পুরুষ ও নারীকে বলুন, তারা যেন চোখ সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে।' [সুরা নূর: ৩০-৩১]
হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে-
আল-আইনানি তাজনি-ইয়ান 'দুই চোখ ব্যভিচার করে।
তো এই হাদিসে হারাম দৃষ্টিকেও ব্যভিচারের একটি প্রকার বলা হয়েছে এবং দৃষ্টি প্রদানকারীকে গোনাহগার সাব্যস্ত করা হয়েছে।
গায়রে মাহরামের সাথে একান্ত সাক্ষাৎ হারাম করে ইরশাদ হয়েছে
ওয়া লা ইয়াখলুউন্না রাজুলুন বিইমরাআতিন ইল্লা কানাস শাইতানু সালিসাহুমা।
'দুজন গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষ যখন একান্তে মিলিত হয়, তাদের তৃতীয় জন থাকে শয়তান।'
হাদিস শরিফে আরও বর্ণিত হয়েছে- ইয়্যাকুম আদ-দু খুলা আলান নিসা
‘তোমরা মহিলাদের সাথে একান্তে মিলিত হওয়া থেকে দূরে থেকো। আল্লাহ তাআলা মহিলাদের পর্দাবৃত হয়ে থাকার নির্দেশ করেছেন, যেন পুরুষ তাদের দেখতে না পায়। ইরশাদ হয়েছে- ইয়া আইয়্যুহান নাবিয়্যু কুল লিআযওয়াজিকা ওয়া বানাতিকা ওয়া নিসাইল মুমিনিনা ইউদনিনা আলাইহিন্না মিন জালাবি বিহীননা দালিকা আদনা আই ইউ’রাফনা ফালা ইউ’দাইনা।
'হে নবি, আপনি আপনার পত্নীগণকে ও কন্যাগণকে এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের ওপর টেনে নেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে, ফলে তাদের উত্যক্ত করা হবে না।' [সুরা আহজাব: ৫৯]
আল্লাহ তাআলা সকল সাহাবি রাদিয়াল্লাহu আনহুমকে নারীদের সাথে মেশা থেকে নিষেধ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে- ওয়া ইদা সাআলতুমুহুন্না মাতাআন
'যখন তোমরা তাদের কাছে কিছু চাইবে’ (তাঁরা নবির স্ত্রী এবং সর্বাধিক পবিত্র রমণী হওয়া সত্ত্বেও) ফাসআলুহুন্না মিন ওরায়ি হিজাব
'তাদের কাছে পর্দার আড়াল থেকে চাও।' (কেন না এটা) দালিকুম আতহারু লিকুলুবিকুম ওয়া কুলুবিহিন্না -
'তোমাদের এবং তাদের কলবের জন্য পবিত্রতার মাধ্যম।' [সুরা আহজাব: ৫৩]
আজ আমাদের যুবক-যুবতীদের অবস্থা কতই-না জঘন্য!
টিকাঃ
[১৫] ইবনে মাজাহ: ১২/২৫; মুস্তাদরাক হাকেম: ২০/৩০।
[১৬] মুসনাদে আহমদ: ৮/২৫২; মুসনাদে আবদুর রাজ্জাক: ৭/৪১৪।
[১৭] আল বাইয়্যিনাতুল কুবরা: ১/২৫
[১৮] সহিহ বুখারি: ১৬/২৫৭; সহিহ মুসলিম: ১১/১৪৬; তিরমিজি: ৪/৪০৪
সম্প্রতি লোভ-প্রলোভন আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রবৃত্তির চাহিদা নানান কিসিম ধারণ করেছে। নৈরাজ্যবাদীরা তাদের চ্যানেল এবং ম্যাগাজিনগুলোতে এ ব্যাপারে বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞদের বচন বলতে আরম্ভ করেছে। তারা সহানুভূতি দেখিয়ে হারামকে আলোড়িত করতে এসেছে।
সুতরাং অনেক পুরুষ-নারী ম্যাগাজিনের চমক ও প্রবৃত্তির চাহিদার চোরাবালিতে ঘুরপাক খাচ্ছে এবং চ্যানেলগুলো উলঙ্গপনা ছড়াচ্ছে আর চলচ্চিত্রগুলো তাতে রঙ চড়িয়ে প্রচার-প্রসারের প্রতিনিধিত্ব করছে। আল্লাহর কসম, এগুলো বড় ফিতনা, কঠিন পরীক্ষা। এসব মানুষকে এমন বস্তুর দাসত্বে মত্ত করছে, যে জন্য তাদের সৃষ্টি করা হয়নি। হৃদয়কে বানিয়েছে প্রেমাষ্পদের জন্য। সুতরাং হৃদয় কষ্টে জর্জরিত, ফিতনায় পরিপূর্ণ। ফলে প্রেমিক প্রেমাষ্পদের জন্য জীবন দিচ্ছে, তার জন্য লাঞ্ছিত অপদস্থ হচ্ছে। তাকে ডাকলেই সাড়া দেয়। যদি বলা হয়, কী চাও তুমি? সে তখন প্রেমের প্রতিফল চায়।
অসংযত দৃষ্টি চোখের প্রমাদে লিপ্ত হওয়া বেহায়াপনা ও গোনাহের দিকে আকৃষ্ট করে, হারাম কাজে জড়িত করে এবং আল্লাহ থেকে বিমুখ করে দেয়। কত দিন পর্যন্ত জাহান্নামে মাথা ঢুকিয়ে দৃষ্টির ফিতনায় লিপ্ত থাকবে? এগুলোর স্বাদ আস্বাদন মূলত যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আল্লাহর নেয়ামত থেকে কত দিন দূরে থাকবে এবং তার অভিশাপ আর কত ডেকে আনবে? কোন বস্তু তোমাকে আল্লাহর নেয়ামত থেকে দূরে রেখেছে? কোন বস্তু চিন্তা ও পেরেশানিকে বাড়িয়ে দিয়েছে? সুস্থতা থেকে কোন বস্তু তোমাকে সরিয়ে রেখেছে? তোমার গোপন দোষ কীসে প্রকাশ করেছে? তোমার চেহারা থেকে কীসে নুরের জ্যোতি দূরীভূত করেছে?
হয়তো এখন তুমি জবাব দিবে, এটা প্রেমাষ্পদের প্রতি প্রেমের কারণে। হায়! যদি মানুষ বুঝত! হ্যাঁ, তুমি অসংযত দৃষ্টির ব্যাপারে কি বলবে? কেননা, হারাম বস্তুর সাথে অনিয়ন্ত্রিত সম্পর্ক কেবল আক্রান্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিগ্রস্তই করে না; বরং আল্লাহ তাআলার নিয়ম হলো, ব্যভিচারের সময় পরাক্রমশালী আল্লাহর ক্রোধ কঠিনাকার ধারণ করে।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, যখন কোনো জনপদে সুদ ও ব্যভিচার প্রকাশ পায়, আল্লাহ তাআলা সেই জনপদ ধ্বংসের অনুমতি দেন। ইবনে মাজাহ রহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং অন্যান্য ইমামের গবেষণা অনুযায়ী একটি হাসান হাদিসে বর্ণিত আছে- ‘যখন কোনো সমাজে প্রকাশ্যে ব্যভিচার হয়, সেখানে মহামারি ছড়িয়ে পড়ে এবং এমন ক্ষুধা (দুর্ভিক্ষ) তাদের আক্রান্ত করে; তাদের পূর্বপুরুষদের মাঝে যেমনটি হয়নি।
ইউসুফ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে ভাবুন, যাঁকে কল্পনাতীত জ্যোতি, সৌন্দর্য এবং ঔজ্জ্বল্য দান করা হয়েছিল। তাঁর মনিবের স্ত্রী তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হলো। এই গোলামকে তার স্বামী খেদমতের জন্য স্পল্পমূল্যে ক্রয় করেছিলেন। এটি একটি অভূতপূর্ব বিষয় যে, কেলেঙ্কারির ভয় নেই। টগবগে যুবক। এমন নারীর প্রতি আকৃষ্ট হওয়াটাই স্বাভাবিক। তদুপরি নারীটি সম্মান ও সম্পদের অধিকারী। আবার তাঁকে জেলখানা এবং লাঞ্ছনার ভয় দেখাচ্ছে, তাঁর প্রতি আসক্তও, তাঁকে পদস্খলিত করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে। একপর্যায়ে ঘরে ঢুকে সব দরজা বন্ধ করে, সুন্দর জামা-কাপড় পরিধান করে, বিছানা পরিপাটি করে, বেহায়াপনা ও আকুতির স্বরে বলল, 'ইউসুফ এসো, আমার যৌবনের ক্ষুধা মেটাও!' তখন পবিত্র ইউসুফ আলাইহিস সালাম তার খপ্পর থেকে বাঁচার জন্য চিৎকার দিয়ে বললেন- ‘সে বলল, আল্লাহ রক্ষা করুন! তোমার স্বামী আমার মালিক। তিনি আমাকে সযত্নে থাকতে দিয়েছেন। নিশ্চয় সীমালঙ্ঘনকারীরা সফল হয় না।’ [সুরা ইউসুফ: ২৩]
ইউসুফ আলাইহিস সালামের সেই অবস্থাটি নিয়েও ভাবুন! যখন আজিজের স্ত্রী মন্ত্রীদের বিবি ও নেতাদের রক্ষিতাদের সমবেত করল। তাদের জন্য রাখল ফলের তশতরি। প্রত্যেকের হাতে দিলো একটি করে চাকু। তারপর ইউসুফ আলাইহিস সালামকে তাদের সামনে যেতে বলেই বিবিদের নির্দেশ দিলো ফল কাটার। ইউসুফকে দেখা-মাত্র তাঁর সৌন্দর্য ও ঔজ্জ্বল্যে তাদের জ্ঞান লোপ পেল এবং ফলের পরিবর্তে চাকু দিয়ে হাত কেটে ফেলল এবং বলল- ‘কখনোই নয়, এ ব্যক্তি মানব নয়-এ তো কোনো মহান ফেরেশতা।’ [সুরা ইউসুফ: ৩১]
ইউসুফ আলাইহিস সালাম কি তার দিকে তাকিয়েছেন? অথবা নিজের যৌবন ও সৌন্দর্যের কারণে ধোঁকা খেয়েছেন? কখনো না; বরং তিনি জোরে চিৎকার করেছেন এবং বলেছেন- ‘ইউসুফ বলল, হে আমার পালনকর্তা, তারা আমাকে যে কাজের দিকে আহ্বান করে, তার চাইতে আমি কারাগারই পছন্দ করি। যদি আপনি তাদের চক্রান্ত আমার ওপর থেকে প্রতিহত না করেন, তবে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ব এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।’ [সুরা ইউসুফ : ৩৩]
তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর দুআ কবুল করেছেন এবং আজিজের স্ত্রী জুলাইখার চক্রান্ত রুখে দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে- ‘অতঃপর তার পালনকর্তা তার দুআ কবুল করে নিলেন। তারপর তাদের চক্রান্ত প্রতিহত করলেন। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।’ [সুরা ইউসুফ: ৩৪] হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন, তাঁর কাছে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার চেয়ে কারাগারে বন্দি হওয়াটাই উত্তম ছিল।
জুলাইখার ঘটনাটি কবি উমর বিন রবিয়া'-এর ঘটনার সাথে মিলে যায়। কবি উমর বিন রবিয়া পথ দিয়ে চলার সময় একমহিলার হাতের ওপর দৃষ্টি পড়ে। কবি মনে করেছেন মহিলাটি তাকে হাত দ্বারা ইঙ্গিত করেছে। আর এতেই কবি মহিলার প্রেমে পড়ে যায়। এমনকি সেই মহিলার সঙ্গে সাক্ষাৎ ও তার সঙ্গে মিলিত হতে কবি অস্থির হয়ে পড়েন। (আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।)
নোংরা ফ্লিমগুলো দেখার কারণে, যেখানে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা উপস্থাপন করা হয়; এমন কুধারণা অন্তরে সৃষ্টি হয় যে, নারী-পুরুষের মেলামেশা স্বাভাবিক ব্যাপার। এর চেয়েও বড় বিষয়টি হলো, এই ফ্লিমগুলোতে যখন নারী-পুরুষের একান্ত আচরণ এবং চুমু খাওয়ার দৃশ্য দেখানো হয়, তখন যেসব নারী-পুরুষ এটা দেখে, তাদের হৃদয়ের সুপ্ত চাহিদা জেগে ওঠে, শিহরণ তৈরি হয়, লজ্জা দূর হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে তারাই বিপদে আক্রান্ত হয়। যে ব্যক্তি এই বেহায়াপনা ও পাপাচারিতা দেখে এবং প্রেমাষ্পদ ও প্রেমিকের সাক্ষাৎ অবলোকন করে, তার হৃদয় সর্বদা এই চিত্র অনুসরণ করার চেষ্টা করে। বাজারে, ঘরে এবং অফিসে সর্বদা সেই কল্পনার আল্পনাই আঁকতে থাকে। এ দিকে শয়তান অবিরত তাকে উসকানি দিতে থাকে এবং ওই নারীর দিকে আহ্বান করতে থাকে।
তাই আল্লাহ তাআলা যখন ব্যভিচার থেকে লজ্জাস্থানকে হেফাজত করার নির্দেশ দিয়েছেন, তার পূর্বে চোখ সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন- ‘মুমিন পুরুষ ও নারীকে বলুন, তারা যেন চোখ সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে।’ [সুরা নূর: ৩০-৩১] হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে- الْعَيْنَانِ تَزْنِيَانِ 'দুই চোখ ব্যভিচার করে।
তো এই হাদিসে হারাম দৃষ্টিকেও ব্যভিচারের একটি প্রকার বলা হয়েছে এবং দৃষ্টি প্রদানকারীকে গোনাহগার সাব্যস্ত করা হয়েছে। গায়রে মাহরামের সাথে একান্ত সাক্ষাৎ হারাম করে ইরশাদ হয়েছে- ‘দুজন গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষ যখন একান্তে মিলিত হয়, তাদের তৃতীয় জন থাকে শয়তান।’ হাদিস শরিফে আরও বর্ণিত হয়েছে- إِيَّاكُمْ وَالدُّخُولَ عَلَى النِّسَاءِ ‘তোমরা মহিলাদের সাথে একান্তে মিলিত হওয়া থেকে দূরে থেকো। আল্লাহ তাআলা মহিলাদের পর্দাবৃত হয়ে থাকার নির্দেশ করেছেন, যেন পুরুষ তাদের দেখতে না পায়। ইরশাদ হয়েছে- ‘হে নবি, আপনি আপনার পত্নীগণকে ও কন্যাগণকে এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের ওপর টেনে নেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে, ফলে তাদের উত্যক্ত করা হবে না।’ [সুরা আহজাব: ৫৯] আল্লাহ তাআলা সকল সাহাবি রাদিয়াল্লাহু আনহুমকে নারীদের সাথে মেশা থেকে নিষেধ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে- ‘যখন তোমরা তাদের কাছে কিছু চাইবে’ (তাঁরা নবির স্ত্রী এবং সর্বাধিক পবিত্র রমণী হওয়া সত্ত্বেও) ‘তাদের কাছে পর্দার আড়াল থেকে চাও।’ (কেন না এটা) ‘তোমাদের এবং তাদের কলবের জন্য পবিত্রতার মাধ্যম।’ [সুরা আহজাব: ৫৩] আজ আমাদের যুবক-যুবতীদের অবস্থা কতই-না জঘন্য!
টিকাঃ
১৫. ইবনে মাজাহ: ১২/২৫; মুস্তাদরাক হাকেম: ২০/৩০।
১৬. মুসনাদে আহমদ: ৮/২৫২; মুসনাদে আবদুর রাজ্জাক: ৭/৪১৪।
১৭. আল বাইয়্যিনাতুল কুবরা: ১/২৫।
১৮. সহিহ বুখারি: ১৬/২৫৭; সহিহ মুসলিম: ১১/১৪৬; তিরমিজি: ৪/৪০৪।
📄 উম্মুল মুমিনিন খাদিজার গল্প
সহিহ বুখারির বর্ণনায় রয়েছে, নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুওয়াত পাওয়ার পূর্বে শহরের উপকণ্ঠে হেরা গুহায় যেতেন এবং সেখানে ইবাদত করতেন। একদিন তিনি গুহার একেবারে গভীরে গভীর ধ্যানমগ্ন ছিলেন।
হঠাৎ জিবরাইল আলাইহিস সালাম তাঁর কাছে আগমন করলেন। অতঃপর বললেন— ইকরা ‘পড়ুন!’ নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটা শুনে ঘাবড়ে গেলেন; বললেন, ‘আমি কখনো কোনো কিতাব পড়িনি। ভালোভাবে পড়তে জানি না এবং লিখতেও পারি না।’
জিবরাইল আলাইহিস সালাম তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন, ফলে নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম কষ্ট পেলেন। ছেড়ে দিয়ে বললেন— ইকরা ‘পড়ুন!’ নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘আমি পড়তে জানি না।
’ জিবরাইল আলাইহিস সালাম দ্বিতীয়বার তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন, ফলে তিনি কষ্ট অনুভব করলেন। আবার ছেড়ে দিয়ে বললেন— ইকরা ‘পড়ুন!’ নবিজি আবারও বললেন, ‘আমি পড়তে জানি না।’
জিবরাইল আলাইহিস সালাম তৃতীয়বার তাঁকে বুকের সাথে চাপ দিয়ে ধরলেন, ফলে নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম কষ্ট পেলেন। তারপর ছেড়ে দিয়ে বললেন— ইকরা বিইসমি রব্বিকাল্লাদি খলাক - খলাকাল ইনসানা মিন আলাক - ইকরা ওয়া রব্বুকাল আকরাম - আল্লাদি আল্লামা বিল কলাম - আল্লামাল ইনসানা মা লাম ইয়া’লাম।
'পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন; সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা মহা দয়ালু; যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।' [সুরা আলাক: ১-৫]
যখন নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই আয়াতগুলো শুনলেন এবং এই দৃশ্য দেখলেন, মারাত্মক ভয় পেলেন। তাঁর অন্তরে আতঙ্ক সৃষ্টি হলো। তিনি শহরে ফিরে এসেই সর্বপ্রথম উম্মুল মুমিনিন খাদিজা রাদিয়াল্লাহu আনহার কাছে গেলেন। তারপর বললেন, 'আমাকে চাদরে জড়িয়ে নাও! আমাকে চাদরে জড়িয়ে নাও! আমাকে চাদরে জড়িয়ে নাও!' অতঃপর নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুয়ে পড়লেন। খাদিজা তাঁকে ঢেকে দিলেন। উম্মুল মুমিনিন খাদিজা রাদিয়াল্লাহu আনহা কেবল প্রাণাধিক প্রিয় স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তিনি জানেন না যে, স্বামী কেন এত আতঙ্কিত! কিছুক্ষণের মধ্যেই নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভয়ের ভাবটা কেটে গেল।
তারপর নবিজি খাদিজার দিকে মনোনিবেশ করে তাঁকে ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে বললেন, 'খাদিজা, আমি আমার জীবনের ব্যাপারে শঙ্কিত!'
জবাবে খাদিজা বললেন, 'কখনো এমন হবে না! আল্লাহর কসম, তিনি আপনাকে কখনো লাঞ্ছিত করবেন না। আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, মেহমানের আপ্যায়ন করেন, অন্যের বিপদে কষ্ট সহ্য করেন, মানুষের বোঝা বহন করেন, অন্যের অধিকার আদায়ে সহযোগিতা করেন; এগুলোর কল্যাণ বন্ধ হয়নি, এগুলোর প্রভাব শেষ হয়নি।'
খাদিজা রাদিয়াল্লাহu আনহা নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাত ধরলেন এবং তাঁকে নিয়ে চাচাতো ভাই ওয়ারাকা বিন নাওফিলের কাছে গেলেন। তিনি ছিলেন অন্ধ বৃদ্ধ মানুষ। তিনি জাহেলিযুগে খ্রিষ্টান ছিলেন। ইনজিল কিতাব পড়তেন এবং লিখতেন। নবিদের ব্যাপারে খুব ভালোভাবে অবহিত ছিলেন।
খাদিজা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে তার কাছে বসলেন। তারপর বললেন, 'হে আমার চাচাতো ভাই, আপনার ভাতিজার কথা শুনুন।' ওয়ারাকা বিন নাওফিল নবিজিকে জিজ্ঞেস করলেন, 'ভাতিজা, বলো, তুমি কী দেখেছ?' রাসুল সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাথে ঘটে যাওয়া বিষয়টির বিস্তারিত বিবরণ দিলেন এবং কুরআন কারিমের শ্রুত আয়াতগুলোও শোনালেন। ওয়ারাকা বললেন, 'সুব্বুহুন! সুব্বহুন! তুমি সুসংবাদ গ্রহণ করো! তুমি সুসংবাদ গ্রহণ করো! ইনিই সেই ফেরেশতা, যিনি মুসা আলাইহিস সালামের নিকট এসেছিলেন।' তারপর ওয়ারাকা বিন নাওফিল বললেন, 'হায় আফসোস! এর মাঝে কষ্ট রয়েছে! যখন তোমাকে তোমার কওম এলাকা থেকে বের করে দেবে, যদি তখন আমি যুবক হতাম, তোমার সাথে আমিও বেরিয়ে যেতাম এবং তোমাকে সাহায্য করতাম।'
রাসুল সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম আতঙ্কিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'তারা কি আমাকে বের করে দেবে?' ওয়ারাকা বিন নাওফিল বললেন, 'হ্যাঁ, তোমার পূর্বেও যাঁরা এই দাওয়াত নিয়ে এসেছেন, তাঁদের সাথেও একই রকম আচরণ করা হয়েছে। তবে আমি যদি সে পর্যন্ত জীবিত থাকি, তাহলে তোমাকে জোরালোভাবে সাহায্য করব।'
তারপর নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাদিজাকে নিয়ে চলে এলেন। খাদিজা রাদিয়াল্লাহu আনহা নিশ্চিত হয়ে গেলেন, তাঁর ঘুমের সময় শেষ। তাঁকেও স্বামীর সাথে বিপদে আক্রান্ত হতে হবে অতিসত্বর। তাঁকেও বহিষ্কার করা হবে নিজ বাড়ি থেকে। কষ্ট দেওয়া হবে তাঁকেও। অথচ তিনি ছিলেন এমন নারী, যিনি বেড়ে উঠেছেন ঐশ্বর্যের মাঝে, সুখ-সম্ভোগের মাঝে। ছিলেন সম্ভ্রান্ত বংশের সম্মানী নারী। তিনিই কিনা বিপদের মোকাবিলা করবেন!
তিনি কি দ্বীনের সাহায্যে লাঞ্ছনা গ্রহণ করেছেন, নাকি তাঁর বিশ্বাসে চির ধরেছিল? কখনো না; বরং তিনি তাঁর প্রতিপালকের প্রতি ইমান এনেছেন; ধন দিয়ে, মন দিয়ে, পরামর্শ দিয়ে এবং শ্রম দিয়ে নবিকে সাহায্য করেছেন। তিনি আমৃত্যu এভাবেই চলেছেন এবং ইতিহাসে অনন্য নজির স্থাপন করে তাঁর প্রতিপালকের প্রিয় হয়েছেন।
ইমাম মুসলিম রহমাতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেছেন, জিবরাইল আলাইহিস সালাম নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, এই যে খাদিজা, আপনার কাছে একটি পাত্র নিয়ে আসছে, যাতে তরকারি এবং পানাহারের বস্তু রয়েছে। যখন সে আপনার কাছে আসবে, তাঁকে তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এবং আমার পক্ষ থেকে সালাম প্রদান করবেন, জান্নাতে বিশেষ ধরনের বেতের তৈরি ঘরের সুসংবাদ দেবেন, যেখানে কোনো প্রকার শ্রম ও কষ্ট থাকবে না।'
এটাই হলো খাদিজা রাদিয়াল্লাহu আনহার সংবাদ, যিনি সর্বপ্রথম ইসলামে প্রবেশ করেছেন, প্রতিমাপূজা পরিহার করেছেন, পুরুষদেরও অতিক্রম করেছেন, বহু খ্যাতি অর্জন করা তারকাকে পিছে ফেলেছেন এবং ইতিহাসে দান-দক্ষিণার দৃষ্টান্ত এঁকেছেন। রাসুলের পথ অনুসরণ করার আহ্বান করেছেন। কোনো কাফিরের তিরস্কার পরোয়া করেননি, কোনো পাপাচারীর অপপ্রচারে সন্দিহান হননি। প্রতিদান হিসেবে আল্লাহ তাআলা তাঁর মেহমানদারির আয়োজন করেছেন। তাঁর জন্য জান্নাতে ঘর বানিয়েছেন।
খাদিজা রাদিয়াল্লাহu আনহা সুসংবাদ শুনে খুশি হলেন। আরও বেশি ইবাদত-বন্দেগিতে আত্মনিয়োগ করলেন। পরিশেষে এমন অবস্থায় প্রতিপালকের সাথে মিলিত হলেন, যখন প্রতিপালক তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন।
কুরআন কারিমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন— অয়াদাল্লাহুল মুমিনিনা ওয়াল মুমিনাতি জান্নাতিন তাজরি মিন তাহতিহাল আনহারু খলিদিনা ফিহা ওয়া মাসাকিনা তইয়্যিবাতান ফি জান্নাতি আদনিন ওয়া রিদওয়ানুম মিনাল্লাহি আকবারু দালিকা হুয়াল ফাউযুল আজিম।
'আল্লাহ ইমানদার পুরুষ ও নারীদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কানন-কুঞ্জের, যার তলদেশে প্রবাহিত হয় প্রস্রবণ। তারা সেগুলোরই মাঝে থাকবে। আর এসব কানন-কুঞ্জে থাকবে পরিচ্ছন্ন থাকার ঘর। বস্তুত এ সমুদ্রের মাঝে সবচেয়ে বড় হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি। এটিই হলো মহা সফলতা।' [সুরা নাহল : ৯৭]
আল্লাহ তাআলা উম্মুল মুমিনিন খাদিজা রাদিয়াল্লাহu আনহার প্রতি রাজি হয়েছেন। তাঁর কন্যারা কি তাঁর অনুসরণ করবে না? আপনি কি তার অনুকরণ করবেন না? যেন আপনিও তাঁর মতো জান্নাতে বেতের এমন ঘর পান, যেখানে কোনো প্রকার শ্রম ও কষ্ট থাকবে না?
সহিহ বুখারির বর্ণনায় রয়েছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুওয়াত পাওয়ার পূর্বে শহরের উপকণ্ঠে হেরা গুহায় যেতেন এবং সেখানে ইবাদত করতেন। একদিন তিনি গুহার একেবারে গভীরে গভীর ধ্যানমগ্ন ছিলেন।
হঠাৎ জিবরাইল আলাইহিস সালাম তাঁর কাছে আগমন করলেন। অতঃপর বললেন— اقরأ ‘পড়ুন!’ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটা শুনে ঘাবড়ে গেলেন; বললেন, ‘আমি কখনো কোনো কিতাব পড়িনি। ভালোভাবে পড়তে জানি না এবং লিখতেও পারি না।’
জিবরাইল আলাইহিস সালাম তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন, ফলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কষ্ট পেলেন। ছেড়ে দিয়ে বললেন— اقরأ ‘পড়ুন!’ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘আমি পড়তে জানি না।’ জিবরাইল আলাইহিস সালাম দ্বিতীয়বার তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন, ফলে তিনি কষ্ট অনুভব করলেন। আবার ছেড়ে দিয়ে বললেন— اقরأ ‘পড়ুন!’ নবিজি আবারও বললেন, ‘আমি পড়তে জানি না।’
জিবরাইল আলাইহিস সালাম তৃতীয়বার তাঁকে বুকের সাথে চাপ দিয়ে ধরলেন, ফলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কষ্ট পেলেন। তারপর ছেড়ে দিয়ে বললেন— ‘পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন; সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা মহা দয়ালু; যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।’ [সুরা আলাক: ১-৫]
যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই আয়াতগুলো শুনলেন এবং এই দৃশ্য দেখলেন, মারাত্মক ভয় পেলেন। তাঁর অন্তরে আতঙ্ক সৃষ্টি হলো। তিনি শহরে ফিরে এসেই সর্বপ্রথম উম্মুল মুমিনিন খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে গেলেন। তারপর বললেন, 'আমাকে চাদরে জড়িয়ে নাও! আমাকে চাদরে জড়িয়ে নাও! আমাকে চাদরে জড়িয়ে নাও!' অতঃপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শুয়ে পড়লেন। খাদিজা তাঁকে ঢেকে দিলেন। উম্মুল মুমিনিন খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা কেবল প্রাণাধিক প্রিয় স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তিনি জানেন না যে, স্বামী কেন এত আতঙ্কিত! কিছুক্ষণের মধ্যেই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভয়ের ভাবটা কেটে গেল।
তারপর নবিজি খাদিজার দিকে মনোনিবেশ করে তাঁকে ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে বললেন, 'খাদিজা, আমি আমার জীবনের ব্যাপারে শঙ্কিত!' জবাবে খাদিজা বললেন, 'কখনো এমন হবে না! আল্লাহর কসম, তিনি আপনাকে কখনো লাঞ্ছিত করবেন না। আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, মেহমানের আপ্যায়ন করেন, অন্যের বিপদে কষ্ট সহ্য করেন, মানুষের বোঝা বহন করেন, অন্যের অধিকার আদায়ে সহযোগিতা করেন; এগুলোর কল্যাণ বন্ধ হয়নি, এগুলোর প্রভাব শেষ হয়নি।'
খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাত ধরলেন এবং তাঁকে নিয়ে চাচাতো ভাই ওয়ারাকা বিন নাওফিলের কাছে গেলেন। তিনি ছিলেন অন্ধ বৃদ্ধ মানুষ। তিনি জাহেলিযুগে খ্রিষ্টান ছিলেন। ইনজিল কিতাব পড়তেন এবং লিখতেন। নবিদের ব্যাপারে খুব ভালোভাবে অবহিত ছিলেন। খাদিজা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে তার কাছে বসলেন। তারপর বললেন, 'হে আমার চাচাতো ভাই, আপনার ভাতিজার কথা শুনুন।' ওয়ারাকা বিন নাওফিল নবিজিকে জিজ্ঞেস করলেন, 'ভাতিজা, বলো, তুমি কী দেখেছ?' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাথে ঘটে যাওয়া বিষয়টির বিস্তারিত বিবরণ দিলেন এবং কুরআন কারিমের শ্রুত আয়াতগুলোও শোনালেন। ওয়ারাকা বললেন, 'সুব্বুহুন! সুব্বহুন! তুমি সুসংবাদ গ্রহণ করো! তুমি সুসংবাদ গ্রহণ করো! ইনিই সেই ফেরেশতা, যিনি মুসা আলাইহিস সালামের নিকট এসেছিলেন।' তারপর ওয়ারাকা বিন নাওফিল বললেন, 'হায় আফসোস! এর মাঝে কষ্ট রয়েছে! যখন তোমাকে তোমার কওম এলাকা থেকে বের করে দেবে, যদি তখন আমি যুবক হতাম, তোমার সাথে আমিও বেরিয়ে যেতাম এবং তোমাকে সাহায্য করতাম।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আতঙ্কিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'তারা কি আমাকে বের করে দেবে?' ওয়ারাকা বিন নাওফিল বললেন, 'হ্যাঁ, তোমার পূর্বেও যাঁরা এই দাওয়াত নিয়ে এসেছেন, তাঁদের সাথেও একই রকম আচরণ করা হয়েছে। তবে আমি যদি সে পর্যন্ত জীবিত থাকি, তাহলে তোমাকে জোরালোভাবে সাহায্য করব।'
তারপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাদিজাকে নিয়ে চলে এলেন। খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা নিশ্চিত হয়ে গেলেন, তাঁর ঘুমের সময় শেষ। তাঁকেও স্বামীর সাথে বিপদে আক্রান্ত হতে হবে অতিসত্বর। তাঁকেও বহিষ্কার করা হবে নিজ বাড়ি থেকে। কষ্ট দেওয়া হবে তাঁকেও। অথচ তিনি ছিলেন এমন নারী, যিনি বেড়ে উঠেছেন ঐশ্বর্যের মাঝে, সুখ-সম্ভোগের মাঝে। ছিলেন সম্ভ্রান্ত বংশের সম্মানী নারী। তিনিই কিনা বিপদের মোকাবিলা করবেন!
তিনি কি দ্বীনের সাহায্যে লাঞ্ছনা গ্রহণ করেছেন, নাকি তাঁর বিশ্বাসে চির ধরেছিল? কখনো না; বরং তিনি তাঁর প্রতিপালকের প্রতি ইমান এনেছেন; ধন দিয়ে, মন দিয়ে, পরামর্শ দিয়ে এবং শ্রম দিয়ে নবিকে সাহায্য করেছেন। তিনি আমৃত্যু এভাবেই চলেছেন এবং ইতিহাসে অনন্য নজির স্থাপন করে তাঁর প্রতিপালকের প্রিয় হয়েছেন।
ইমাম মুসলিম রহমাতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেছেন, জিবরাইল আলাইহিস সালাম নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, এই যে খাদিজা, আপনার কাছে একটি পাত্র নিয়ে আসছে, যাতে তরকারি এবং পানাহারের বস্তু রয়েছে। যখন সে আপনার কাছে আসবে, তাঁকে তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এবং আমার পক্ষ থেকে সালাম প্রদান করবেন, জান্নাতে বিশেষ ধরনের বেতের তৈরি ঘরের সুসংবাদ দেবেন, যেখানে কোনো প্রকার শ্রম ও কষ্ট থাকবে না।'
এটাই হলো খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার সংবাদ, যিনি সর্বপ্রথম ইসলামে প্রবেশ করেছেন, প্রতিমাপূজা পরিহার করেছেন, পুরুষদেরও অতিক্রম করেছেন, বহু খ্যাতি অর্জন করা তারকাকে পিছে ফেলেছেন এবং ইতিহাসে দান-দক্ষিণার দৃষ্টান্ত এঁকেছেন। রাসুলের পথ অনুসরণ করার আহ্বান করেছেন। কোনো কাফিরের তিরস্কার পরোয়া করেননি, কোনো পাপাচারীর অপপ্রচারে সন্দিহান হননি। প্রতিদান হিসেবে আল্লাহ তাআলা তাঁর মেহমানদারির আয়োজন করেছেন। তাঁর জন্য জান্নাতে ঘর বানিয়েছেন।
খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা সুসংবাদ শুনে খুশি হলেন। আরও বেশি ইবাদত-বন্দেগিতে আত্মনিয়োগ করলেন। পরিশেষে এমন অবস্থায় প্রতিপালকের সাথে মিলিত হলেন, যখন প্রতিপালক তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন। কুরআন কারিমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন— ‘আল্লাহ ইমানদার পুরুষ ও নারীদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কানন-কুঞ্জের, যার তলদেশে প্রবাহিত হয় প্রস্রবণ। তারা সেগুলোরই মাঝে থাকবে। আর এসব কানন-কুঞ্জে থাকবে পরিচ্ছন্ন থাকার ঘর। বস্তুত এ সমুদ্রের মাঝে সবচেয়ে বড় হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি। এটিই হলো মহা সফলতা।’ [সুরা নাহল : ৯৭]
আল্লাহ তাআলা উম্মুল মুমিনিন খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার প্রতি রাজি হয়েছেন। তাঁর কন্যারা কি তাঁর অনুসরণ করবে না? আপনি কি তার অনুকরণ করবেন না? যেন আপনিও তাঁর মতো জান্নাতে বেতের এমন ঘর পান, যেখানে কোনো প্রকার শ্রম ও কষ্ট থাকবে না?