📄 বহুবিবাহের অশান্তি
সুখী-শান্ত একটি পরিবার। পিতা একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে অধিষ্ঠিত। বস্তুগত উন্নতি আকাশচুম্বি। পার্থিব সুখ-শান্তি বলতে যা বোঝায়, যা প্রত্যাশা করা যেতে পারে, সবকিছুই তাদের পরিবারে আছে। তারা সকলেই একটি মাত্র গোশতের টুকরার মতো ছিল। একপর্যায়ে এমন করুণ অবস্থার সৃষ্টি হয়:
বড় ভাই হিসেবে মনে করে, বয়সে ছোট একবোন বলল, 'আমার বাবার আচরণ পরিবর্তন হয়ে গেছে, তার চলাফেরা পাল্টে গেছে, যেন তিনি কিছু একটার অপেক্ষা করছেন; কিন্তু আমরা জানি না, কী সেটা!
হঠাৎ আমার মায়ের বিকট চিৎকার। বাবা বলছেন, 'আমি আরেকটি বিয়ে করব! তোমার সমস্ত অহংকার, গোঁড়ামি এবং অন্যায় নিয়ন্ত্রণ করে নেব।'
আমার মা এমন অপ্রত্যাশিত অযাচিত ঢঙের সংবাদ শুনে অন্যান্য নারীর মতো হঠাৎ ভেঙে পড়লেন, যেন তা কোনো কঠিন শাস্তি! যদিও মা কোনো দোষ করেননি, তিনি তো শান্ত, স্থির এবং চমৎকার একজন গৃহিণী। বাবা-মার মাঝে টানাপোড়েন আরম্ভ হলো।
সিরিয়ার একটি সফরের মাধ্যমে বাবার ভয়ানক আচারণের ইতি ঘটে। তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করে আরেকজন স্ত্রী নিয়ে এলেন এবং সাথে অনেক সমস্যাও নিয়ে এলেন। দ্বিতীয় স্ত্রী বয়সে ছোট ছিল আর বাবা ছিলেন তার তুলনায় বয়সে অনেক বড়।
আমি এটা গোপন করব না যে, বাবা রাতযাপনে সমতা রক্ষা করতেন। তিনি চরিত্রগতভাবে খুব ভালো ছিলেন, কিন্তু আনন্দের কারণে নতুন দিনগুলোতে তার অবস্থা পরিবর্তন হয়ে গেল।
বর্তমানে তিনি হিংস্র আচরণ করছেন! আমি তার দিকে তাকানোর মতো সাহস রাখি না। তাকে অনেক কথা শুনিয়েছি। আমি বলেছি, আপনি তো নিজের কাছে অল্পবয়স্ক কিশোর, কিন্তু বাস্তবতা কীভাবে অস্বীকার করবেন? আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলাম, তাঁকে ভবিষ্যতে এমন অন্যায় করতে বাধা দিলাম এবং তাঁর ভুল দেখিয়ে দিলাম। তারপর ফিরে গেলাম।
mayer মানসিক অবস্থা খুব খারাপ। আমিও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত। এখন শুধু কাঁদি। মানুষের সামনে যেতে পারি না।
আমি একা। আমাকে সাহায্য করার জন্য একজন সাথি খুব জরুরি। যখন আমার প্রতিবেশী ছোটবোনটি সাথে থাকে, আমি কেবল তখন ইউনিভার্সিটিতে যেতে পারি এবং বক্তৃতা রেকর্ডিং করতে পারি। তারপরও ভয় লাগে। অন্যদিকে দেশের সামগ্রিক অবস্থাও খারাপ হচ্ছে। এখন কেবল আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাই।
মেঝো ভাই ধুমপান শুরু করেছে। দিনকে দিন তার অবস্থা খারাপের দিকে যেতে শুরু করেছে। শাসন করেও ঘরে রাখা যায় না। তার পড়ালেখার অবস্থাও খারাপ, নিন্মগামী।
বাবা বাড়ি আসামাত্রই বাড়ি জাহান্নামে পরিণত হয়ে যায়। আমরা সকলেই যার-যার কামরায় ঢুকে পড়ি। কেবল মা বাবার কাছে গিয়ে বসেন। আমরা বাবাকে একদম দেখতেই পারি না। বাবাকে ঘৃণা করি আমরা।
এখানে আমি বলব, বহুবিবাহ আল্লাহর নেয়ামত। যার প্রয়োজন আল্লাহ তাকে তার ব্যবস্থা করে দিন। পরিতাপের বিষয় হলো, আমরা তার অপব্যবহার করছি। এমনকি বলা শুরু হয়েছে যে, বহুবিবাহ অধঃপতনের দিকে নিয়ে যায়, এর পেছনে রয়েছে অনেক অপরাধ ও জুলুম-নির্যাতন।
এই প্রশ্নকর্তা নারীর অবস্থা তার মৌন অবস্থার চেয়ে বেশি খারাপ ছিল। কারণ, তার মা অধিকাংশ সময় তালাক নিয়ে ভাবত। ভাইয়েরা নামাজ পড়ত না, পড়ালেখা করত না, এভাবে তারা আরও অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে।
এটাই কি শরিয়তের বহুবিবাহের উদ্দেশ্য?
এখানে কে আছে, যে তাদের বিবাহের মূল্য জানে? তাদের পিতা? সে তো দ্বিতীয় বিয়ের পর তাদের ত্যাগ করেছে। তাদের ব্যয়ভার পর্যন্ত বহন করেনি।
স্বাভাবিকভাবেই আমি বোনটিকে কিছু বলে বিদায় দিই। তাকে উপকারী কিছু কথা বলেছি। ইনশাআল্লাহ এবার বিষয়টি একটু হলেও সহজ হয়ে আসবে।
অন্যায়ভাবে বহুবিবাহের সিদ্ধান্ত অনেক পরিবার ধ্বংস করেছে। পারিবারিক সম্পর্ক টুকরো টুকরো করে ফেলেছে। পুরুষের কর্মপরিধি সুন্দর করে, এমন উপকারী বহুবিবাহের চেয়ে ক্ষতিকর বহুবিবাহই বেশি হচ্ছে! আল্লাহই সাহায্যকারী।
এটা একান্ত আমার মতামত। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী? এটা অতীতের সমস্ত ইনসাফপূর্ণ বহুবিবাহগুলোর ন্যায় কি আমাদের যুগের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ, নাকি বাহ্যিকভাবে অন্যায় ও জুলুম-নির্যাতনকে উৎসাহিত করছে?
সুখী-শান্ত একটি পরিবার। পিতা একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে অধিষ্ঠিত। বস্তুগত উন্নতি আকাশচুম্বি। পার্থিব সুখ-শান্তি বলতে যা বোঝায়, যা প্রত্যাশা করা যেতে পারে, সবকিছুই তাদের পরিবারে আছে। তারা সকলেই একটি মাত্র গোশতের টুকরার মতো ছিল। একপর্যায়ে এমন করুণ অবস্থার সৃষ্টি হয়:
বড় ভাই হিসেবে মনে করে, বয়সে ছোট একবোন বলল, 'আমার বাবার আচরণ পরিবর্তন হয়ে গেছে, তার চলাফেরা পাল্টে গেছে, যেন তিনি কিছু একটার অপেক্ষা করছেন; কিন্তু আমরা জানি না, কী সেটা!
হঠাৎ আমার মায়ের বিকট চিৎকার। বাবা বলছেন, 'আমি আরেকটি বিয়ে করব! তোমার সমস্ত অহংকার, গোঁড়ামি এবং অন্যায় নিয়ন্ত্রণ করে নেব।' আমার মা এমন অপ্রত্যাশিত অযাচিত ঢঙের সংবাদ শুনে অন্যান্য নারীর মতো হঠাৎ ভেঙে পড়লেন, যেন তা কোনো কঠিন শাস্তি! যদিও মা কোনো দোষ করেননি, তিনি তো শান্ত, স্থির এবং চমৎকার একজন গৃহিণী। বাবা-মার মাঝে টানাপোড়েন আরম্ভ হলো।
সিরিয়ার একটি সফরের মাধ্যমে বাবার ভয়ানক আচারণের ইতি ঘটে। তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করে আরেকজন স্ত্রী নিয়ে এলেন এবং সাথে অনেক সমস্যাও নিয়ে এলেন। দ্বিতীয় স্ত্রী বয়সে ছোট ছিল আর বাবা ছিলেন তার তুলনায় বয়সে অনেক বড়। আমি এটা গোপন করব না যে, বাবা রাতযাপনে সমতা রক্ষা করতেন। তিনি চরিত্রগতভাবে খুব ভালো ছিলেন, কিন্তু আনন্দের কারণে নতুন দিনগুলোতে তার অবস্থা পরিবর্তন হয়ে গেল। বর্তমানে তিনি হিংস্র আচরণ করছেন! আমি তার দিকে তাকানোর মতো সাহস রাখি না। তাকে অনেক কথা শুনিয়েছি। আমি বলেছি, আপনি তো নিজের কাছে অল্পবয়স্ক কিশোর, কিন্তু বাস্তবতা কীভাবে অস্বীকার করবেন? আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলাম, তাঁকে ভবিষ্যতে এমন অন্যায় করতে বাধা দিলাম এবং তাঁর ভুল দেখিয়ে দিলাম। তারপর ফিরে গেলাম।
মায়ের মানসিক অবস্থা খুব খারাপ। আমিও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত। এখন শুধু কাঁদি। মানুষের সামনে যেতে পারি না। আমি একা। আমাকে সাহায্য করার জন্য একজন সাথি খুব জরুরি। যখন আমার প্রতিবেশী ছোটবোনটি সাথে থাকে, আমি কেবল তখন ইউনিভার্সিটিতে যেতে পারি এবং বক্তৃতা রেকর্ডিং করতে পারি। তারপরও ভয় লাগে। অন্যদিকে দেশের সামগ্রিক অবস্থাও খারাপ হচ্ছে। এখন কেবল আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাই।
মেঝো ভাই ধুমপান শুরু করেছে। দিনকে দিন তার অবস্থা খারাপের দিকে যেতে শুরু করেছে। শাসন করেও ঘরে রাখা যায় না। তার পড়ালেখার অবস্থাও খারাপ, নিন্মগামী। বাবা বাড়ি আসামাত্রই বাড়ি জাহান্নামে পরিণত হয়ে যায়। আমরা সকলেই যার-যার কামরায় ঢুকে পড়ি। কেবল মা বাবার কাছে গিয়ে বসেন। আমরা বাবাকে একদম দেখতেই পারি না। বাবাকে ঘৃণা করি আমরা।
এখানে আমি বলব, বহুবিবাহ আল্লাহর নেয়ামত। যার প্রয়োজন আল্লাহ তাকে তার ব্যবস্থা করে দিন। পরিতাপের বিষয় হলো, আমরা তার অপব্যবহার করছি। এমনকি বলা শুরু হয়েছে যে, বহুবিবাহ অধঃপতনের দিকে নিয়ে যায়, এর পেছনে রয়েছে অনেক অপরাধ ও জুলুম-নির্যাতন।
এই প্রশ্নকর্তা নারীর অবস্থা তার মৌন অবস্থার চেয়ে বেশি খারাপ ছিল। কারণ, তার মা অধিকাংশ সময় তালাক নিয়ে ভাবত। ভাইয়েরা নামাজ পড়ত না, পড়ালেখা করত না, এভাবে তারা আরও অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। এটাই কি শরিয়তের বহুবিবাহের উদ্দেশ্য? এখানে কে আছে, যে তাদের বিবাহের মূল্য জানে? তাদের পিতা? সে তো দ্বিতীয় বিয়ের পর তাদের ত্যাগ করেছে। তাদের ব্যয়ভার পর্যন্ত বহন করেনি।
স্বাভাবিকভাবেই আমি বোনটিকে কিছু বলে বিদায় দিই। তাকে উপকারী কিছু কথা বলেছি। ইনশাআল্লাহ এবার বিষয়টি একটু হলেও সহজ হয়ে আসবে। অন্যায়ভাবে বহুবিবাহের সিদ্ধান্ত অনেক পরিবার ধ্বংস করেছে। পারিবারিক সম্পর্ক টুকরো টুকরো করে ফেলেছে। পুরুষের কর্মপরিধি সুন্দর করে, এমন উপকারী বহুবিবাহের চেয়ে ক্ষতিকর বহুবিবাহই বেশি হচ্ছে! আল্লাহই সাহায্যকারী।
এটা একান্ত আমার মতামত। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী? এটা অতীতের সমস্ত ইনসাফপূর্ণ বহুবিবাহগুলোর ন্যায় কি আমাদের যুগের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ, নাকি বাহ্যিকভাবে অন্যায় ও জুলুম-নির্যাতনকে উৎসাহিত করছে?
📄 সুন্দর চরিত্র
একভাই বলেন, আমি একদিন চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গেলাম। সেখানের ব্যবস্থাপনা, ডাক্তারের সুন্দর আচরণ এবং রোগীর প্রতি তার আন্তরিকতা গভীরভাবে খেয়াল করছিলাম। আমি মনে মনে ভাবলাম, হয়তো তা কোনো দাতব্যসংস্থার প্রতিষ্ঠান হবে। ফলে আমি তাদের কর্মপদ্ধতি বিষয়গুলো পড়লাম এবং শুনলাম।
পরবর্তী সময়ে ভাইটির কথায় আমার ঘোর কেটে গেল। জানালেন, ডাক্তার সাহেব আরবি এবং হাসপাতালটি একটি মুসলিম দেশে। ডাক্তার একজন খ্রিষ্টান। হতে পারে ডাক্তার সাহেব দাতব্যসংস্থার লোক এবং সেই সুবাদেই হাসিখুশি। ভাইটির কথা এখানেই শেষ।
তবে মনে রাখতে হবে, ইমান-আকিদার সাথে সুন্দর চরিত্রের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন- আদ্-দিনু কুল্লুহু খুলুক - ফামান জাদা আলাইকা ফিল খুলুকি জাদা আলাইকা ফিদ দিন। 'দ্বীন পুরোটাই চরিত্র। তোমার কাছে যার চরিত্র বেশি সুন্দর মনে হবে, সে দ্বীনদার হিসেবেও অগ্রণী হবে।'
সিলাতুল আখলাকি বিল-আকিদাতি ওয়াল ইমানি-নামক গ্রন্থের লেখক বলেছেন, 'খুব যত্নসহ মানুষের অবস্থা নিয়ে গবেষণাকারীগণ এই দিকটিতে অধিকাংশ মুসলিমকে গুরুত্বহীন এবং ভাবলেশহীন পেয়েছেন। তারা জানেই না যে, ইমান-আকিদা এবং সুন্দর আখলাকের মাঝে কত দৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে।'
কখনো আপনি এমন কাউকে পাবেন, যে তাওহিদ বাস্তবায়ন করছে, ইমান নির্ভেজাল করছে, অথচ চারিত্রিক অনেক ব্যাপারে তাকে উদাসীন পাবেন বা তাকে এমন দোষে আক্রান্ত পাবেন, যা তার আবশ্যিক ইমানে বিঘ্নতা সৃষ্টি করে, অথবা তার ইমানকে পূর্ণতা দানকারী অনেক সুন্দর বিষয় থেকে বঞ্চিত করে, যেমন: অহংকার, হিংসা, কুধারণা, মিথ্যা, নির্লজ্জতা এবং দুনিয়াপ্রীতি ইত্যাদি বিষয়ে সে আক্রান্ত। উপরন্তু এই বিষয়গুলোর ক্ষতির ব্যাপারে তারা অজ্ঞ থাকে, অথবা জীবনের সার্বিক পরিমণ্ডলে ইসলামের ব্যাপকতা সম্পর্কেও উদাসীন থাকে।
আল্লাহ তাআলা কুরআন কারিমে বলেছেন- কুল ইন্না সালাতি ওয়া নুসুউকি ওয়া মাহইয়াইয়া ওয়া মামাতি লিল্লাাহি রব্বিল আলামিন লা শারিকা লাহু ওয়া বিদালিকা উমিরতু ওয়া আনা আউয়ালুল মুসলিমিন। আপনি বলুন, আমার নামাজ, আমার কুরবানি এবং আমার জীবন ও মরণ বিশ্ব-পালনকর্তা আল্লাহরই জন্য। তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আমি তা-ই আদিষ্ট হয়েছি এবং আমি প্রথম আনুগত্যশীল। [সুরা আনআম : ১৬২-৬৩]
রিসালাতের বাহক নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাওহিদ বাস্তবায়ন করেছেন। কেবল শিরকে আকবার পরিত্যাগ করাই পরিপূর্ণ ইমান নয়; বরং ইমান-আকিদার পরিপন্থী এবং ইমান-আকিদায় বিঘ্নতা সৃষ্টি করে, এমন প্রতিটি কাজই শিরকের পর্যায়ভুক্ত।
মনে রাখতে হবে, আকিদা বারবার মুখে আওড়ানোর মতো বা লিখে হেফাজত করার মতো জিনিস নয়; বরং আমাদের বাস্তব কর্মজীবনে তার প্রয়োগ ঘটাতে হবে, মানুষের মাঝে তার ব্যবহার দেখাতে হবে।
একভাই বলেন, আমি একদিন চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গেলাম। সেখানের ব্যবস্থাপনা, ডাক্তারের সুন্দর আচরণ এবং রোগীর প্রতি তার আন্তরিকতা গভীরভাবে খেয়াল করছিলাম। আমি মনে মনে ভাবলাম, হয়তো তা কোনো দাতব্যসংস্থার প্রতিষ্ঠান হবে। ফলে আমি তাদের কর্মপদ্ধতি বিষয়গুলো পড়লাম এবং শুনলাম।
পরবর্তী সময়ে ভাইটির কথায় আমার ঘোর কেটে গেল। জানালেন, ডাক্তার সাহেব আরবি এবং হাসপাতালটি একটি মুসলিম দেশে। ডাক্তার একজন খ্রিষ্টান। হতে পারে ডাক্তার সাহেব দাতব্যসংস্থার লোক এবং সেই সুবাদেই হাসিখুশি। ভাইটির কথা এখানেই শেষ।
তবে মনে রাখতে হবে, ইমান-আকিদার সাথে সুন্দর চরিত্রের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন- الدِّينُ كُلُّهُ خُلُقُ - فَمَنْ زَادَ عَلَيْكَ فِي الْخُلُقِ زَادَ عَلَيْكَ فِي الدِّينِ. 'দ্বীন পুরোটাই চরিত্র। তোমার কাছে যার চরিত্র বেশি সুন্দর মনে হবে, সে দ্বীনদার হিসেবেও অগ্রণী হবে।'
সিলাতুল আখলাকি বিল-আকিদাতি ওয়াল ইমানি-নামক গ্রন্থের লেখক বলেছেন, 'খুব যত্নসহ মানুষের অবস্থা নিয়ে গবেষণাকারীগণ এই দিকটিতে অধিকাংশ মুসলিমকে গুরুত্বহীন এবং ভাবলেশহীন পেয়েছেন। তারা জানেই না যে, ইমান-আকিদা এবং সুন্দর আখলাকের মাঝে কত দৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে।'
কখনো আপনি এমন কাউকে পাবেন, যে তাওহিদ বাস্তবায়ন করছে, ইমান নির্ভেজাল করছে, অথচ চারিত্রিক অনেক ব্যাপারে তাকে উদাসীন পাবেন বা তাকে এমন দোষে আক্রান্ত পাবেন, যা তার আবশ্যিক ইমানে বিঘ্নতা সৃষ্টি করে, অথবা তার ইমানকে পূর্ণতা দানকারী অনেক সুন্দর বিষয় থেকে বঞ্চিত করে, যেমন: অহংকার, হিংসা, কুধারণা, মিথ্যা, নির্লজ্জতা এবং দুনিয়াপ্রীতি ইত্যাদি বিষয়ে সে আক্রান্ত। উপরন্তু এই বিষয়গুলোর ক্ষতির ব্যাপারে তারা অজ্ঞ থাকে, অথবা জীবনের সার্বিক পরিমণ্ডলে ইসলামের ব্যাপকতা সম্পর্কেও উদাসীন থাকে।
আল্লাহ তাআলা কুরআন কারিমে বলেছেন- قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ.
আপনি বলুন, আমার নামাজ, আমার কুরবানি এবং আমার জীবন ও মরণ বিশ্ব-পালনকর্তা আল্লাহরই জন্য। তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আমি তা-ই আদিষ্ট হয়েছি এবং আমি প্রথম আনুগত্যশীল। [সুরা আনআম : ১৬২-৬৩]
রিসালাতের বাহক নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাওহিদ বাস্তবায়ন করেছেন। কেবল শিরকে আকবার পরিত্যাগ করাই পরিপূর্ণ ইমান নয়; বরং ইমান-আকিদার পরিপন্থী এবং ইমান-আকিদায় বিঘ্নতা সৃষ্টি করে, এমন প্রতিটি কাজই শিরকের পর্যায়ভুক্ত।
মনে রাখতে হবে, আকিদা বারবার মুখে আওড়ানোর মতো বা লিখে হেফাজত করার মতো জিনিস নয়; বরং আমাদের বাস্তব কর্মজীবনে তার প্রয়োগ ঘটাতে হবে, মানুষের মাঝে তার ব্যবহার দেখাতে হবে।
📄 নীরব নিবেদক
আমাকে একভাই ঘটনাটি শুনিয়েছেন। আরবের কয়েকজন যুবক পাশ্চাত্যের কোনো দেশে একবৃদ্ধার ঘর ভাড়া নেয়। ভাড়ার মেয়াদকাল শেষ হয়ে গেলে তারা নম্রতা পরিহার করে এবং এই দলিলে বৃদ্ধার সাথে রূঢ় আচরণ করা শুরু করে যে, বৃদ্ধা একজন কাফের-অমুসলিম। কাফেররা আমাদের সম্পদ ছিনিয়ে নিয়েছে; যেমন আরবকে তারা চুষে খাচ্ছে।
আশ্চর্য! এটা কেমন কথা? কোন বিবেকে তারা এমন কাজ করল? আসলে এটা প্রবৃত্তির চাহিদা এবং ইসলামি সভ্যতার ব্যাপারে অজ্ঞতার ফল ছাড়া কিছুই নয়। ওলামায়ে কেরাম কি আকিদার কিতাবে, ফিকহের কিতাবে অমুসলিমদের সাথে মুসলিমদের আচার-আচরণ, লেনদেন এবং আদব-সভ্যতার অধ্যায় সন্নিবেশিত করেননি? যুদ্ধরত কাফের এবং সাধারণ কাফেরদের সাথে মুসলিমদের আচরণ কেমন হবে, তা কি আমাদের কিতাবাদিতে স্পষ্ট উল্লেখ নেই?
আমরা কীভাবে ইসলাম নিয়ে গর্ব করি, অথচ আমরা নিজেরাই ইসলামি শিষ্টাচার ও সভ্যতা সম্পর্কে অজ্ঞ!
ঘটনার বর্ণনাকারী বলেন, আমি সেই বৃদ্ধার কাছ থেকে ঘর ভাড়া নিতে চাইলে সে পাশ কেটে চলে গেল। বিশেষভাবে যখন জানল যে, আমি মুসলিম তখন পরিষ্কার বলে দিলো, 'ওহ, মুসলিম! তোমরা তো চোর!'
বর্ণনাকারী বলেন, আমি বৃদ্ধাকে এই অপবাদ আরোপের কারণ জিজ্ঞাসা করলাম, 'কেন আপনি মুসলিমদের চোর বলছেন?' জবাবে বৃদ্ধাটি উক্ত যুবকদের ঘটনা বর্ণনা করলেন। বর্ণনাকারী বলেন, এই ঘটনা জানার পর থেকে মুসলিমদের উপর থেকে এই কলঙ্ক দূর করার চিন্তা শুরু করি।
শেষপর্যন্ত অনেক চেষ্টা-প্রচেষ্টা, প্রলোভন এবং অগ্রীম দেওয়ার প্রতিশ্রুতির পর আমাকে ভাড়া দিতে রাজি হয় এবং আমি তাকে ভাড়া বেশি দিতে রাজি হই।
আমি তার বাড়িতে অবস্থান করার পাশাপাশি তার প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়াতে সচেষ্ট হলাম। কখনো নিজেকে ইসলামের ফজিলতপূর্ণ আমল দ্বারা সাজিয়ে তাকে ইসলামি আদর্শ স্মরণ করিয়ে দেওয়ার প্রয়াস চালাতে থাকি এবং তাকে বুঝানোর চেষ্টা করি যে, এটাই হলো ইসলামি সভ্যতা। আমাদের ইসলামধর্ম এমন আখলাক-চরিত্র অর্জনে কেবল উৎসাহিতই করে না; বরং নির্দেশ প্রদান করে।
বর্ণনাকারী বলেন, যখন আমার বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এল, আমাকে নেওয়ার জন্য গাড়ি এল। সেই বৃদ্ধা তখন অশ্রুসিক্ত নয়নে বলছিলেন, 'বেটা, তোমার প্রতি আমার অসিয়ত থাকল, তুমি এই ধর্মের ওপরই মৃত্যুবরণ করবে।' আমি দেখছিলাম, অশ্রু তার গণ্ডদেশ সিক্ত করে বুকের দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে।
তারপর তিনি বললেন, 'হে বেটা, মানুষের সাথে এমন আচরণ করবে, যেন তোমরা বেঁচে থাকলে তোমাদের সম্ভাষণ জানায় আর মারা গেলে তোমাদের জন্য ক্রন্দন করে।'
আমরা ইমানের ন্যায় অমূল্য সম্পদের ভাণ্ডারের অধিকারী। সুতরাং সেটা হতে হবে প্রকৃত ইমান। শুধু ইমানের লেবেল থাকলে হবে না। এমন ইমান হতে হবে, যার মিষ্টতা অন্তরের গভীরে রেখাপাত করে, তারপর এই মিষ্টতা সেই মুসলমানের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। তখন তার কথা, কাজ, গুণাবলি ইমানের স্বাদ আস্বাদন করে। তো প্রকৃত ইমান যখন অর্জিত হবে, তখন তার প্রতিক্রিয়া, আচার-আচরণ, সততা এবং লেনদেনে তা প্রকাশ পাবে।
ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, দক্ষিণ হিন্দুস্থান, সিলান, মালদ্বীপ, চীনের উপকূল, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া এবং মধ্য আফ্রিকায় মুসলিম বণিকদের মাধ্যমে ইসলাম প্রচারিত ও প্রসারিত হয়েছে। তবে তাঁরা ছিলেন সত্যিকারের মুসলিম। টাকা-পয়সার চাকচিক্য তাঁদের প্রভাবিত করতে পারেনি; বরং তাঁদের আচরণ-বিচরণে, তাঁদের নিষ্ঠা এবং সততায় ইসলাম জীবন্ত রূপ ধারণ করেছিল।
তাঁদের এমন অমায়িক চরিত্রে মানুষ বিস্মিত হয়েছিল। মুসলিম বণিকদের সাথে এই চরিত্রের উৎস সম্পর্কে আলোচনা করতে থাকে। পরিশেষে তৃপ্ত হয়ে সেসব লোক সাগ্রহে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে।
তাদের হৃদয়ে অধিক প্রভাব বিস্তারকারী গুণটিই ছিল 'নেককার নেতৃত্বের মাঝে স্বতন্ত্র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য'; বরং সব জায়গায় ইসলাম প্রচারের এটিই ছিল সর্বোচ্চ মাধ্যম।
রাসুল সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিরাত গভীরভাবে লক্ষ করলে এই সত্যটিই ফুটে ওঠে যে, তিনি সর্বাবস্থায় উত্তম চরিত্র ধারণ করেছেন। বিশেষভাবে মানুষকে দ্বীনের পথে দাওয়াত দেওয়ার সময় তাঁর উত্তম চরিত্র প্রস্ফুটিত হয়েছে পূর্ণরূপে। সঙ্গত কারণেই আল্লাহর অনুগ্রহে এবং নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরিত্র মাধুরিতে মুগ্ধ হয়ে মানুষ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে এবং দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে।
একজন সাহাবি ইসলাম গ্রহণ করেই বলেছেন, 'আল্লাহর কসম, পৃথিবীর বুকে আপনার চেয়ে ঘৃণিত কোনো চেহারা আমার কাছে ছিল না, আর এখন আপনার চেহারা আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় চেহারা।'
অন্যজন বলেছেন, 'হে আল্লাহ, আমাকে রহম করুন এবং মুহাম্মদকে রহম করুন। আমাদের সাথে অন্য কাউকে রহম করবেন না।'
তিনি নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামের রহমকে প্রাধান্য দিলেন; তবে নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে আল্লাহ তাআলার রহমত সংকীর্ণ করার উপর ছেড়ে দিলেন না, তাঁর রহম তো সবকিছু পরিব্যাপ্ত করে রেখেছে; তাই রাসুল সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তুমি তো বিশাল বিস্তৃত একটি জিনিসকে সংকুচিত করে ফেললে।'
তৃতীয়জন বললেন, 'আমার পিতা-মাতার শপথ, আমি পূর্বে ও পরে তাঁর চেয়ে উত্তম শিক্ষক পাইনি।'
চতুর্থজন বলেছেন, 'হে আমার কওম, ইসলাম গ্রহণ করো। কেননা, মুহাম্মদ তাকে দেয়, যে অভাবের ভয় করে না।'
পঞ্চমজন বললেন, 'আল্লাহর কসম, রাসুল সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে কিছুই দেননি এবং তিনি আমার কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত মানুষ ছিলেন। তারপর আমাকে এমন কিছু দেওয়া আরম্ভ করলেন, যে জন্য এখন তিনি আমার সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি।'
ষষ্ঠজন নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক তাঁকে ক্ষমা করার পর বলেছেন, 'আমি সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষের নিকট থেকে মাত্র এলাম।' তারপর মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করতে থাকলেন। সুতরাং তাঁর আহ্বানে অনেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে।
তো বেসামরিক কাফেরদের সাথে মুসলিমদের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাদের কষ্ট, তাদের প্রতি অত্যাচার, সীমালঙ্ঘন এবং তাদের অধিকার খর্ব হওয়া প্রতিরোধ করা। সাথে সাথে তাদের সাথে সততা, নিষ্ঠা ইত্যাদি ইসলামি সভ্যতার প্রশংসিত বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্ব প্রদান করা এবং তাদের নিকট কল্যাণ ও উত্তম চরিত্র পৌঁছে দেওয়া।
সহিহ বুখারি-র একটি বর্ণনায় আছে, উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু মক্কায় অবস্থানরত তাঁর এক মুশরিক ভাইকে স্বর্ণের একটি অলংকার হাদিয়া দিয়েছিলেন। অলংকারটি তিনি নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে পেয়েছিলেন।
সহিহ বুখারির আরেকটি বর্ণনায় রয়েছে, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহu আনহুর পরিবারে তার সৌজন্যে বকরি জবাই করা হলো। যখন তার সামনে উপস্থাপন করা হলো, তখন তিনি বললেন-
আ-হদাইতুম লি-জারিনাল ইয়াহুদি। আমার প্রতিবেশী ইহুদিকে দিয়েছ কি? আবদুল্লাহ ইবনে উমর বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি-
মা জালা জিবরিলু ইউসিনি বিল জারি হাত্তা জনানতু আন্নাহু সাইউর্য়িরসুহু। জিবরাইল আ. আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে এত বেশি নির্দেশ দিতেন যে, আমি মনে করেছিলাম, প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেবেন।
একভাই বলেছেন, বর্ষাকালে আমি আমার গাড়ি রাস্তায় জমা পানির উপর দিয়ে চালিয়ে দিয়েছিলাম; বিষয়টি তখন আমি বুঝতে পারিনি। সুতরাং দুই দিকে পানি ছিটকে পড়ল। দরজার চৌকাঠে বসে থাকা একযুবকের ভাগ্য খারাপ ছিল। হায়! যদি আপনি তার অবস্থা দেখতেন; পুরো পাল্টে গেছে। সাদা কাপড় কালো হয়ে গেছে। কালো চুল কাদা আর পানির খেজাবে রঙিন হয়ে গেছে।
আমি পরে একসময় তাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন কেবল তাদের ধিক্কার, অভিসম্পাত এবং আমাকে অকথ্য ভাষায় গালি দেওয়ার আওয়াজই শুনতে পেলাম। তিনি বলেন, আমি লজ্জিত হয়ে পরিতাপ করতে করতে তাদের নিকট গেলাম। সুবহানাল্লাহ! কী আশ্চর্য! তাদের সেই গালি এবং অভিসম্পাত অভ্যর্থনা ও সালামের রূপে পরিবর্তন হয়ে গেল। তারা খাবারের দাওয়াত দিলো। ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার কথা বলতে লাগল। তারা বলল, 'আমরা সবাই তো একই জাতির।' ভাইটির কথা এখানেই শেষ।
হে প্রিয়, আমি সংক্ষেপে বলব, এটাই চরিত্র, যা বিস্ময়কর উপাখ্যান সৃষ্টি করে। আমরা যখন কোনো মানুষকে লাঞ্ছিত করি; মারাত্মক ভুল করে থাকি। কেননা, এই লাঞ্ছনার মাধ্যমে আমরা বুঝাতে চাই, আমাদের রুহ তাদের চেয়ে পবিত্র, আমাদের কলব তাদের চেয়ে স্বচ্ছ এবং আমরা তাদের চেয়ে মেধাবী।
একলোক আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে বলল, 'আমাকে কিছু নসিহত করুন।' ইবনে মোবারক রহমাতুল্লাহি আলাইহি বললেন, 'যখন তুমি বাড়ি থেকে বের হবে, পথে যত মানুষকে দেখবে, সবাইকে তোমার চেয়ে উত্তম মনে করবে।' মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণের অর্থ এই নয় যে, আমরা আমাদের আদর্শ থেকে বের হয়ে যাব, কিংবা চাটুকারিতা বা বাহুল্য প্রশংসা করব। না, এটা আমার উদ্দেশ্য নয়; বরং আমার উদ্দেশ্য হলো, হেকমত-প্রজ্ঞা, সুন্দর নসিহত এবং অন্যের সাথে লেনদেনের বিষয়টি পরিষ্কার রাখা।
হে প্রিয়, লেনদেন এবং সুন্দর চরিত্রের বিষয়ের দিকে তাকাও। দেখো, কী করছ তুমি! এই যে ইকরামা বিন আবু জাহেল। পিতা থেকে মিরাসসূত্রে ইসলামের শত্রুতা পেয়েছিল। প্রায় সব যুদ্ধেই সে মুসলিমদের বিপক্ষে অংশগ্রহণ করে। মক্কা বিজয়ের দিন মুসলিমদের সামনে প্রতিরোধ তৈরি করে। রাসুল সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক তার রক্ত হালাল ঘোষণার পর ইয়ামেনের দিকে সে পালিয়ে যায়।
পরবর্তী সময়ে তার স্ত্রী উম্মে হাকিম ইসলাম গ্রহণ-পূর্বক নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাজির হয়ে স্বামীর নিরাপত্তা চাইলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বললেন, 'তার প্রতি আমার পিতা-মাতা কুরবান হোক। সে নিরাপদ।' তারপর রাসুল সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিগণকে বললেন, 'ইকরামা মুমিন হয়ে হিজরত করে তোমাদের কাছে আসবে। সুতরাং তোমরা কেউ তার পিতাকে গালি দেবে না। মৃতকে গালি দিলে জীবিতরা কষ্ট পায়, মৃতের কিছু হয় না।' অতঃপর ইকরামা নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাজির হয়ে বললেন—
আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্নাকা আবদুহু ওয়া রাসুলুহু আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহই একমাত্র ইলাহ এবং আপনি তাঁর বান্দা ও রাসুল।
আরও বললেন, 'আপনি সবচেয়ে কল্যাণকামী নেককার মানুষ, সবচেয়ে সত্যবাদী মানুষ, সবচেয়ে বেশি প্রতিশ্রুতি পূর্ণকারী মানুষ। হে আল্লাহর রাসুল, আমি কসম করে বলছি, আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বাধা দেওয়ার জন্য যত অর্থ ব্যয় করেছি, তার দ্বিগুণ ইসলামের পথে ব্যয় করব।'
নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র স্পর্শে এই উম্মাতের ফেরাউন-পুত্র রহমান-রহিম আল্লাহর বন্ধুদের কাতারে প্রবেশ করলেন। ইসলাম-বিরোধিতার এই লজ্জা তাঁকে লজ্জিত করত, আবার ইসলাম গ্রহণের এই ইচ্ছা তাঁকে আশ্বস্ত করত। তারপর তাঁর অন্তরে ইসলাম দৃঢ় হয়ে গেল। চরিত্র কত বিস্ময়কর ইতিহাস রচনা করতে পারে!
হাসান বিন সাহাল কারও জন্য একটি সুপারিশপত্র লিখে দিয়েছিলেন। এর জন্য লোকটি তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করত। হাসান তাকে বললেন, 'ওহে, তুমি কেন আমার কৃতজ্ঞতা আদায় করছ? আমরা তো সুপারিশ করাকে নিজেদের অসদাচরণের কাফফারা মনে করি।'
টিকাঃ
[১২] সহিহ বুখারি: ১৮/৪৩১।
[১৩] আফরাহুররুহ-নামক কিতাব থেকে সংগৃহীত।
আমাকে একভাই ঘটনাটি শুনিয়েছেন। আরবের কয়েকজন যুবক পাশ্চাত্যের কোনো দেশে একবৃদ্ধার ঘর ভাড়া নেয়। ভাড়ার মেয়াদকাল শেষ হয়ে গেলে তারা নম্রতা পরিহার করে এবং এই দলিলে বৃদ্ধার সাথে রূঢ় আচরণ করা শুরু করে যে, বৃদ্ধা একজন কাফের-অমুসলিম। কাফেররা আমাদের সম্পদ ছিনিয়ে নিয়েছে; যেমন আরবকে তারা চুষে খাচ্ছে।
আশ্চর্য! এটা কেমন কথা? কোন বিবেকে তারা এমন কাজ করল? আসলে এটা প্রবৃত্তির চাহিদা এবং ইসলামি সভ্যতার ব্যাপারে অজ্ঞতার ফল ছাড়া কিছুই নয়। ওলামায়ে কেরাম কি আকিদার কিতাবে, ফিকহের কিতাবে অমুসলিমদের সাথে মুসলিমদের আচার-আচরণ, লেনদেন এবং আদব-সভ্যতার অধ্যায় সন্নিবেশিত করেননি? যুদ্ধরত কাফের এবং সাধারণ কাফেরদের সাথে মুসলিমদের আচরণ কেমন হবে, তা কি আমাদের কিতাবাদিতে স্পষ্ট উল্লেখ নেই?
আমরা কীভাবে ইসলাম নিয়ে গর্ব করি, অথচ আমরা নিজেরাই ইসলামি শিষ্টাচার ও সভ্যতা সম্পর্কে অজ্ঞ! ঘটনার বর্ণনাকারী বলেন, আমি সেই বৃদ্ধার কাছ থেকে ঘর ভাড়া নিতে চাইলে সে পাশ কেটে চলে গেল। বিশেষভাবে যখন জানল যে, আমি মুসলিম তখন পরিষ্কার বলে দিলো, 'ওহ, মুসলিম! তোমরা তো চোর!'
বর্ণনাকারী বলেন, আমি বৃদ্ধাকে এই অপবাদ আরোপের কারণ জিজ্ঞাসা করলাম, 'কেন আপনি মুসলিমদের চোর বলছেন?' জবাবে বৃদ্ধাটি উক্ত যুবকদের ঘটনা বর্ণনা করলেন। বর্ণনাকারী বলেন, এই ঘটনা জানার পর থেকে মুসলিমদের উপর থেকে এই কলঙ্ক দূর করার চিন্তা শুরু করি।
শেষপর্যন্ত অনেক চেষ্টা-প্রচেষ্টা, প্রলোভন এবং অগ্রীম দেওয়ার প্রতিশ্রুতির পর আমাকে ভাড়া দিতে রাজি হয় এবং আমি তাকে ভাড়া বেশি দিতে রাজি হই। আমি তার বাড়িতে অবস্থান করার পাশাপাশি তার প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়াতে সচেষ্ট হলাম। কখনো নিজেকে ইসলামের ফজিলতপূর্ণ আমল দ্বারা সাজিয়ে তাকে ইসলামি আদর্শ স্মরণ করিয়ে দেওয়ার প্রয়াস চালাতে থাকি এবং তাকে বুঝানোর চেষ্টা করি যে, এটাই হলো ইসলামি সভ্যতা। আমাদের ইসলামধর্ম এমন আখলাক-চরিত্র অর্জনে কেবল উৎসাহিতই করে না; বরং নির্দেশ প্রদান করে।
বর্ণনাকারী বলেন, যখন আমার বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এল, আমাকে নেওয়ার জন্য গাড়ি এল। সেই বৃদ্ধা তখন অশ্রুসিক্ত নয়নে বলছিলেন, 'বেটা, তোমার প্রতি আমার অসিয়ত থাকল, তুমি এই ধর্মের ওপরই মৃত্যুবরণ করবে।' আমি দেখছিলাম, অশ্রু তার গণ্ডদেশ সিক্ত করে বুকের দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে। তারপর তিনি বললেন, 'হে বেটা, মানুষের সাথে এমন আচরণ করবে, যেন তোমরা বেঁচে থাকলে তোমাদের সম্ভাষণ জানায় আর মারা গেলে তোমাদের জন্য ক্রন্দন করে।'
আমরা ইমানের ন্যায় অমূল্য সম্পদের ভাণ্ডারের অধিকারী। সুতরাং সেটা হতে হবে প্রকৃত ইমান। শুধু ইমানের লেবেল থাকলে হবে না। এমন ইমান হতে হবে, যার মিষ্টতা অন্তরের গভীরে রেখাপাত করে, তারপর এই মিষ্টতা সেই মুসলমানের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। তখন তার কথা, কাজ, গুণাবলি ইমানের স্বাদ আস্বাদন করে। তো প্রকৃত ইমান যখন অর্জিত হবে, তখন তার প্রতিক্রিয়া, আচার-আচরণ, সততা এবং লেনদেনে তা প্রকাশ পাবে।
ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, দক্ষিণ হিন্দুস্থান, সিলান, মালদ্বীপ, চীনের উপকূল, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া এবং মধ্য আফ্রিকায় মুসলিম বণিকদের মাধ্যমে ইসলাম প্রচারিত ও প্রসারিত হয়েছে। তবে তাঁরা ছিলেন সত্যিকারের মুসলিম। টাকা-পয়সার চাকচিক্য তাঁদের প্রভাবিত করতে পারেনি; বরং তাঁদের আচরণ-বিচরণে, তাঁদের নিষ্ঠা এবং সততায় ইসলাম জীবন্ত রূপ ধারণ করেছিল। তাঁদের এমন অমায়িক চরিত্রে মানুষ বিস্মিত হয়েছিল। মুসলিম বণিকদের সাথে এই চরিত্রের উৎস সম্পর্কে আলোচনা করতে থাকে। পরিশেষে তৃপ্ত হয়ে সেসব লোক সাগ্রহে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে। তাদের হৃদয়ে অধিক প্রভাব বিস্তারকারী গুণটিই ছিল 'নেককার নেতৃত্বের মাঝে স্বতন্ত্র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য'; বরং সব জায়গায় ইসলাম প্রচারের এটিই ছিল সর্বোচ্চ মাধ্যম।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিরাত গভীরভাবে লক্ষ করলে এই সত্যটিই ফুটে ওঠে যে, তিনি সর্বাবস্থায় উত্তম চরিত্র ধারণ করেছেন। বিশেষভাবে মানুষকে দ্বীনের পথে দাওয়াত দেওয়ার সময় তাঁর উত্তম চরিত্র প্রস্ফুটিত হয়েছে পূর্ণরূপে। সঙ্গত কারণেই আল্লাহর অনুগ্রহে এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরিত্র মাধুরিতে মুগ্ধ হয়ে মানুষ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে এবং দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে।
একজন সাহাবি ইসলাম গ্রহণ করেই বলেছেন, 'আল্লাহর কসম, পৃথিবীর বুকে আপনার চেয়ে ঘৃণিত কোনো চেহারা আমার কাছে ছিল না, আর এখন আপনার চেহারা আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় চেহারা।' অন্যজন বলেছেন, 'হে আল্লাহ, আমাকে রহম করুন এবং মুহাম্মদকে রহম করুন। আমাদের সাথে অন্য কাউকে রহম করবেন না।'
তিনি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রহমকে প্রাধান্য দিলেন; তবে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে আল্লাহ তাআলার রহমত সংকীর্ণ করার উপর ছেড়ে দিলেন না, তাঁর রহম তো সবকিছু পরিব্যাপ্ত করে রেখেছে; তাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তুমি তো বিশাল বিস্তৃত একটি জিনিসকে সংকুচিত করে ফেললে।' তৃতীয়জন বললেন, 'আমার পিতা-মাতার শপথ, আমি পূর্বে ও পরে তাঁর চেয়ে উত্তম শিক্ষক পাইনি।' চতুর্থজন বলেছেন, 'হে আমার কওম, ইসলাম গ্রহণ করো। কেননা, মুহাম্মদ তাকে দেয়, যে অভাবের ভয় করে না।' পঞ্চমজন বললেন, 'আল্লাহর কসম, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে কিছুই দেননি এবং তিনি আমার কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত মানুষ ছিলেন। তারপর আমাকে এমন কিছু দেওয়া আরম্ভ করলেন, যে জন্য এখন তিনি আমার সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি।'
ষষ্ঠজন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক তাঁকে ক্ষমা করার পর বলেছেন, 'আমি সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষের নিকট থেকে মাত্র এলাম।' তারপর মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করতে থাকলেন। সুতরাং তাঁর আহ্বানে অনেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে। তো বেসামরিক কাফেরদের সাথে মুসলিমদের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাদের কষ্ট, তাদের প্রতি অত্যাচার, সীমালঙ্ঘন এবং তাদের অধিকার খর্ব হওয়া প্রতিরোধ করা। সাথে সাথে তাদের সাথে সততা, নিষ্ঠা ইত্যাদি ইসলামি সভ্যতার প্রশংসিত বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্ব প্রদান করা এবং তাদের নিকট কল্যাণ ও উত্তম চরিত্র পৌঁছে দেওয়া।
সহিহ বুখারি-র একটি বর্ণনায় আছে, উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু মক্কায় অবস্থানরত তাঁর এক মুশরিক ভাইকে স্বর্ণের একটি অলংকার হাদিয়া দিয়েছিলেন। অলংকারটি তিনি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে পেয়েছিলেন। সহিহ বুখারির আরেকটি বর্ণনায় রয়েছে, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর পরিবারে তার সৌজন্যে বকরি জবাই করা হলো। যখন তার সামনে উপস্থাপন করা হলো, তখন তিনি বললেন- أهديتم الجارنا اليهودي. আমার প্রতিবেশী ইহুদিকে দিয়েছ কি? আবদুল্লাহ ইবনে উমর বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি- مَا زَالَ جِبْرِيلُ يُوصِينِي بِالْجَارِ حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ سَيُوَرِّثُهُ. জিবরাইল আ. আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে এত বেশি নির্দেশ দিতেন যে, আমি মনে করেছিলাম, প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেবেন।
একভাই বলেছেন, বর্ষাকালে আমি আমার গাড়ি রাস্তায় জমা পানির উপর দিয়ে চালিয়ে দিয়েছিলাম; বিষয়টি তখন আমি বুঝতে পারিনি। সুতরাং দুই দিকে পানি ছিটকে পড়ল। দরজার চৌকাঠে বসে থাকা একযুবকের ভাগ্য খারাপ ছিল। হায়! যদি আপনি তার অবস্থা দেখতেন; পুরো পাল্টে গেছে। সাদা কাপড় কালো হয়ে গেছে। কালো চুল কাদা আর পানির খেজাবে রঙিন হয়ে গেছে। আমি পরে একসময় তাদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন কেবল তাদের ধিক্কার, অভিসম্পাত এবং আমাকে অকথ্য ভাষায় গালি দেওয়ার আওয়াজই শুনতে পেলাম। তিনি বলেন, আমি লজ্জিত হয়ে পরিতাপ করতে করতে তাদের নিকট গেলাম। সুবহানাল্লাহ! কী আশ্চর্য! তাদের সেই গালি এবং অভিসম্পাত অভ্যর্থনা ও সালামের রূপে পরিবর্তন হয়ে গেল। তারা খাবারের দাওয়াত দিলো। ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার কথা বলতে লাগল। তারা বলল, 'আমরা সবাই তো একই জাতির।' ভাইটির কথা এখানেই শেষ।
হে প্রিয়, আমি সংক্ষেপে বলব, এটাই চরিত্র, যা বিস্ময়কর উপাখ্যান সৃষ্টি করে। আমরা যখন কোনো মানুষকে লাঞ্ছিত করি; মারাত্মক ভুল করে থাকি। কেননা, এই লাঞ্ছনার মাধ্যমে আমরা বুঝাতে চাই, আমাদের রুহ তাদের চেয়ে পবিত্র, আমাদের কলব তাদের চেয়ে স্বচ্ছ এবং আমরা তাদের চেয়ে মেধাবী।
একলোক আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে বলল, 'আমাকে কিছু নসিহত করুন।' ইবনে মোবারক রহমাতুল্লাহি আলাইহি বললেন, 'যখন তুমি বাড়ি থেকে বের হবে, পথে যত মানুষকে দেখবে, সবাইকে তোমার চেয়ে উত্তম মনে করবে।' মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণের অর্থ এই নয় যে, আমরা আমাদের আদর্শ থেকে বের হয়ে যাব, কিংবা চাটুকারিতা বা বাহুল্য প্রশংসা করব। না, এটা আমার উদ্দেশ্য নয়; বরং আমার উদ্দেশ্য হলো, হেকমত-প্রজ্ঞা, সুন্দর নসিহত এবং অন্যের সাথে লেনদেনের বিষয়টি পরিষ্কার রাখা।
হে প্রিয়, লেনদেন এবং সুন্দর চরিত্রের বিষয়ের দিকে তাকাও। দেখো, কী করছ তুমি! এই যে ইকরামা বিন আবু জাহেল। পিতা থেকে মিরাসসূত্রে ইসলামের শত্রুতা পেয়েছিল। প্রায় সব যুদ্ধেই সে মুসলিমদের বিপক্ষে অংশগ্রহণ করে। মক্কা বিজয়ের দিন মুসলিমদের সামনে প্রতিরোধ তৈরি করে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক তার রক্ত হালাল ঘোষণার পর ইয়ামেনের দিকে সে পালিয়ে যায়।
পরবর্তী সময়ে তার স্ত্রী উম্মে হাকিম ইসলাম গ্রহণ-পূর্বক নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাজির হয়ে স্বামীর নিরাপত্তা চাইলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বললেন, 'তার প্রতি আমার পিতা-মাতা কুরবান হোক। সে নিরাপদ।' তারপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিগণকে বললেন, 'ইকরামা মুমিন হয়ে হিজরত করে তোমাদের কাছে আসবে। সুতরাং তোমরা কেউ তার পিতাকে গালি দেবে না। মৃতকে গালি দিলে জীবিতরা কষ্ট পায়, মৃতের কিছু হয় না।' অতঃপর ইকরামা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাজির হয়ে বললেন— أَشْهَدُ أَنْ لَّا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّكَ عَبْدُهُ وَ رَسُوْلُهُ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহই একমাত্র ইলাহ এবং আপনি তাঁর বান্দা ও রাসুল। আরও বললেন, 'আপনি সবচেয়ে কল্যাণকামী নেককার মানুষ, সবচেয়ে সত্যবাদী মানুষ, সবচেয়ে বেশি প্রতিশ্রুতি পূর্ণকারী মানুষ। হে আল্লাহর রাসুল, আমি কসম করে বলছি, আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বাধা দেওয়ার জন্য যত অর্থ ব্যয় করেছি, তার দ্বিগুণ ইসলামের পথে ব্যয় করব।'
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র স্পর্শে এই উম্মাতের ফেরাউন-পুত্র রহমান-রহিম আল্লাহর বন্ধুদের কাতারে প্রবেশ করলেন। ইসলাম-বিরোধিতার এই লজ্জা তাঁকে লজ্জিত করত, আবার ইসলাম গ্রহণের এই ইচ্ছা তাঁকে আশ্বস্ত করত। তারপর তাঁর অন্তরে ইসলাম দৃঢ় হয়ে গেল। চরিত্র কত বিস্ময়কর ইতিহাস রচনা করতে পারে!
হাসান বিন সাহাল কারও জন্য একটি সুপারিশপত্র লিখে দিয়েছিলেন। এর জন্য লোকটি তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করত। হাসান তাকে বললেন, 'ওহে, তুমি কেন আমার কৃতজ্ঞতা আদায় করছ? আমরা তো সুপারিশ করাকে নিজেদের অসদাচরণের কাফফারা মনে করি।'
টিকাঃ
১২. সহিহ বুখারি: ১৮/৪৩১।
১৩. আফরাহুররুহ-নামক কিতাব থেকে সংগৃহীত।
📄 জাদুর কারণে অসুস্থতা
জাদুর মাধ্যমে একপ্রকারের রোগ তৈরি করা হয়। জাদুর মাধ্যমে সৃষ্ট রোগটি শারীরিক রোগের চেয়ে ভিন্ন প্রকৃতির হয়। কেননা, এই রোগটি শরীরের একস্থান থেকে অন্যস্থানে স্থানান্তরিত হয় অনুভূতিশীল কোনো কারণ ছাড়াই।
জামাল আবদুল বারি বলেন, 'এই রোগের উপর মেডিকেল পরীক্ষা চালানোর সময় আমি যেই অবস্থাগুলো দেখেছি, সেগুলো মূলত রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া। এর মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, এই সমস্যাগুলো কিডনির মধ্যে অতিরিক্ত চাপ, উন্মত্ততা এবং পাথরের কারণে সৃষ্টি হয়েছে। আগামীতে আরও মেডিকেল পরীক্ষা চলবে, তখন এই প্রকারের রোগী নিজেকে পূর্ণ সুস্থ পাবে। এ বিষয়ে অন্যান্য গবেষণা এ কথাই বলে।'
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রাদিয়াল্লাহu আনহা-ও এই প্রকারের জাদুরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহu আনহা থেকে বর্ণিত আছে; তিনি এক-দাসীর ব্যাপারে ঘোষণা দিয়েছেন যে, 'আমি মারা গেলে তুমি স্বাধীন।' ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় যাকে 'মুদাব্বার' তথা মনিব বা মনীবের মৃত্যু-পরবর্তী স্বাধীন হবে বলা হয়।
এরপর আয়েশা রাদিয়াল্লাহu আনহা আল্লাহ তাআলা যত দিন চেয়েছেন অসুস্থ থেকেছেন। একসময় এক-সিন্ধি লোক তাঁর কাছে এল। তারপর বলল, 'আপনি তো জাদুরোগে আক্রান্ত।' আয়েশা জিজ্ঞেস করলেন, 'কে আমাকে জাদু করেছে?' লোকটি বলল, 'একজন নারী, যার মাঝে এই এই গুণ রয়েছে। তার কামরায় তার এক শিশু সাথি আছে।'
আয়েশা রাদিয়াল্লাহu আনহা বললেন, 'অমুক দাসীকে ডেকে আনো, যে আমার খেদমত করে।' খোঁজ করে তাকে এমন নারী প্রতিবেশীর বাড়িতে পাওয়া গেল, যেখানে উক্ত মহিলার একজন শিশু সাথি আছে। তাকে বলা হলো, 'আয়েশা রাদিয়াল্লাহu আনহা তোমাকে ডাকছেন।' মহিলা বলল, 'এই শিশুর পেশাব ধুয়ে পরে আসছি।' সুতরাং সে শিশুকে ধুইয়ে দেওয়ার পর এল।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহu আনহা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি আমাকে জাদু করেছ?' সে বলল, 'হ্যাঁ।' আয়েশা বললেন, 'কেন?' মহিলা বলল, 'আমি স্বাধীনতা ভালোবাসি।'
টিকাঃ
[১৪] মুওয়াত্তায়ে ইমাম মালেক।
জাদুর মাধ্যমে একপ্রকারের রোগ তৈরি করা হয়। জাদুর মাধ্যমে সৃষ্ট রোগটি শারীরিক রোগের চেয়ে ভিন্ন প্রকৃতির হয়। কেননা, এই রোগটি শরীরের একস্থান থেকে অন্যস্থানে স্থানান্তরিত হয় অনুভূতিশীল কোনো কারণ ছাড়াই।
জামাল আবদুল বারি বলেন, 'এই রোগের উপর মেডিকেল পরীক্ষা চালানোর সময় আমি যেই অবস্থাগুলো দেখেছি, সেগুলো মূলত রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া। এর মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, এই সমস্যাগুলো কিডনির মধ্যে অতিরিক্ত চাপ, উন্মত্ততা এবং পাথরের কারণে সৃষ্টি হয়েছে। আগামীতে আরও মেডিকেল পরীক্ষা চলবে, তখন এই প্রকারের রোগী নিজেকে পূর্ণ সুস্থ পাবে। এ বিষয়ে অন্যান্য গবেষণা এ কথাই বলে।'
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা-ও এই প্রকারের জাদুরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত আছে; তিনি এক-দাসীর ব্যাপারে ঘোষণা দিয়েছেন যে, 'আমি মারা গেলে তুমি স্বাধীন।' ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় যাকে 'মুদাব্বার' তথা মনিব বা মনীবের মৃত্যু-পরবর্তী স্বাধীন হবে বলা হয়।
এরপর আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা আল্লাহ তাআলা যত দিন চেয়েছেন অসুস্থ থেকেছেন। একসময় এক-সিন্ধি লোক তাঁর কাছে এল। তারপর বলল, 'আপনি তো জাদুরোগে আক্রান্ত।' আয়েশা জিজ্ঞেস করলেন, 'কে আমাকে জাদু করেছে?' লোকটি বলল, 'একজন নারী, যার মাঝে এই এই গুণ রয়েছে। তার কামরায় তার এক শিশু সাথি আছে।'
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন, 'অমুক দাসীকে ডেকে আনো, যে আমার খেদমত করে।' খোঁজ করে তাকে এমন নারী প্রতিবেশীর বাড়িতে পাওয়া গেল, যেখানে উক্ত মহিলার একজন শিশু সাথি আছে। তাকে বলা হলো, 'আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা তোমাকে ডাকছেন।' মহিলা বলল, 'এই শিশুর পেশাব ধুয়ে পরে আসছি।' সুতরাং সে শিশুকে ধুইয়ে দেওয়ার পর এল। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি আমাকে জাদু করেছ?' সে বলল, 'হ্যাঁ।' আয়েশা বললেন, 'কেন?' মহিলা বলল, 'আমি স্বাধীনতা ভালোবাসি।'
টিকাঃ
১৪. মুওয়াত্তায়ে ইমাম মালেক।