📄 মুশরিকদের সাক্ষ্য
মক্কা বিজয়ের পূর্বের ঘটনা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমরা পালন করার উদ্দেশ্যে মক্কার দিকে যাত্রা করলেন। যখন তিনি হারাম শরিফে পৌঁছুলেন, তখন কুরাইশরা তাঁকে মসজিদে হারাম থেকে ফিরিয়ে দিতে দূত হিসেবে উরওয়া ইবনে মাসউদকে পাঠাল। সে এসে দেখল, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বসে আছেন। আর সাহাবিগণ তাঁর চারপাশে জড়ো হয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে কথা শুনছেন। কথার মাঝে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখনই থুথু ফেলছিলেন, তখন তা কোনো সাহাবির হাতে পড়ছিল। সাহাবিগণ সে পবিত্র থুথু-মোবারক সুগন্ধি হিসেবে নিজেদের শরীর ও চেহারায় মেখে নিচ্ছিলেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিগণকে যখন কোনো নির্দেশ দিতেন, তা পালনে সাহাবিগণ প্রতিযোগিতা শুরু করতেন। যখন তিনি অজু করতেন, অজুর পানি আনার জন্য সাহাবিদের মাঝে হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যেত। যখন তিনি কথা বলতেন, সম্মানের আতিশয্যে নবিজির দিকে চোখ তুলে তাঁরা তাকাতেন না। উরওয়া যখন বিষয়টি প্রত্যক্ষ করল, তখন সে সাথিদের কাছে ফিরে গিয়ে বলল, 'হে আমার কওম, আল্লাহর শপথ, আমি অনেক প্রতাপশালী বাদশাহর দরবারে গিয়েছি, কিসরা, কায়সার এবং নাজাশির দরবারে গিয়েছি, কিন্তু কোনো বাদশাহকে তার সঙ্গীগণ এত বেশি সম্মান করতে দেখিনি; যতটা সম্মান মুহাম্মদকে তাঁর সাথি ও অনুসারীরা করে থাকে। তারা মুহাম্মদকে এতটা ভালোবাসে যে, তাদের প্রতিটি কাজেকর্মে তা স্পষ্ট ফুটে ওঠে।
একদিন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাজির হয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আমার কাছে শুধু আমার সম্পদ ও সন্তানের চেয়ে অধিক প্রিয় নন; আপনার প্রতি কিতাব অবতীর্ণকারী আল্লাহর শপথ, বরং আপনি আমার কাছে আমার প্রাণের চেয়েও অধিক প্রিয়।'
একলোক নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, কিয়ামত কখন হবে?' নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তুমি কিয়ামতের জন্য কী প্রস্তুতি গ্রহণ করেছ?' লোকটি বলল, 'আমি কিয়ামতের প্রস্তুতি হিসেবে খুব বেশি নামাজ, রোজা এবং প্রচুর পরিমাণ দান-সদকা করিনি ঠিক, তবে আমি আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলকে অনেক ভালোবাসি।' তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- أَنْتَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ। তুমি যাকে ভালোবাসো তার সাথেই থাকবে।
সাহাবিগণ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ কথা, 'তুমি যাকে ভালোবাসো তার সাথেই থাকবে' শুনে এতটাই খুশি হয়েছেন যে, এমন খুশি আর কখনো হননি। তাঁরা যখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে চলতেন, সূর্যের তাপ থেকে ছায়া দিয়ে চলতেন; যেন রাসুলের গায়ে সূর্যের তাপ না লাগে। যখন তাঁর সাথে সফর করতেন, নবিজিকে ছায়াদার বৃক্ষের ছায়ায় বসাতেন, যেন তিনি আরাম করতে পারেন। তাঁরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কতই-না ভালোবেসেছেন!
কিন্তু ভাবার বিষয় হলো, সাহাবিগণের হৃদয়ে নবিজির প্রতি এত ভালোবাসা, সম্মান-মর্যাদা, অনুসরণ-অনুকরণ, সীমাহীন ভক্তি থাকা সত্ত্বেও তাঁকে তাঁর অবস্থান থেকে উপরে উঠাননি, অথবা মানবীয় গুণের ঊর্ধ্বে মনে করেননি। তাঁরা বিশ্বাস করতেন ও বলতেন, 'মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ—তিনি আল্লাহর নবি ও রাসুল এবং তাঁরই বান্দা।' তবে হ্যাঁ, তিনি আদমসন্তানের সর্দার। হাশরের মাঠে সুপারিশকারী; কিন্তু তিনি তেমনই, যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন— 'বলুন, আমি কেবল তোমাদের মতো একজন মানুষ। আমার কাছে অহি পাঠানো হয় যে, তোমাদের উপাস্য কেবল একক উপাস্য। অতএব, তোমরা তাঁর পথে দৃঢ়ভাবে অটল থাকো এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চাও, আর মুশরিকদের জন্য রয়েছে ধ্বংস।' [সুরা ফুসসিলাত : ৬]
সুতরাং তাঁর মানব হওয়াটা তাঁর সম্মানকে হ্রাস করবে না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর প্রতিপালকের রিসালাত পূর্ণরূপে পৌঁছে দিয়েছেন। সীমাহীন কষ্ট সহ্য করেছেন। এমনকি আল্লাহ তাআলা তাঁকে সাহায্য করেছেন এবং তাঁর দ্বীন পূর্ণ করেছেন।
অতএব, উম্মতের উপর রাসুলের হক কী? সেটা কি তার প্রশংসায় অতিরঞ্জন করা? না, কখনো না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন গর্হিত কাজ থেকে বারণ করেছেন। যেমন: সহিহ বুখারি ও মুসলিম-এ বর্ণিত আছে— 'আমাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি কোরো না; যেমন খ্রিষ্টানরা মরিয়ম-তনয় (ঈসা আ.)-কে নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে। আমি তো কেবল আল্লাহর বান্দা। অতএব, তোমরা বলো, মুহাম্মদ আল্লাহর বান্দা ও রাসুল।' [১]
উম্মতের উপর নবিজির হক কি তাঁকে নিয়ে মিলাদ মাহফিল করা? নাকি ইসরা-মিরাজ উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁর হক রয়েছে? না, কখনো না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন কাজ থেকেও বারণ করেছেন। যেমন: সহিহ বুখারি ও মুসলিম-এ বর্ণিত আছে— 'যে ব্যক্তি (শরিয়তের নামে) এমন কোনো কাজ করল, যা আমার বিধিসম্মত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত। [২]
উম্মতের উপর নবিজির হক কি বিপদে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে সাহায্য চাওয়া? নাকি গাইরুল্লাহকে ডাকার মাঝে রাসুলের অধিকার নিহিত আছে? নাকি তাঁর কবর তাওয়াফ করার মাঝে এবং গাইরুল্লাহর নামে শপথ করার মাঝে? না, না, না, কখনো না; এর সবই আল্লাহর সঙ্গে শিরক।
টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: ১১/২৬২।
২. সহিহ বুখারি: ২২/৩৩২; সহিহ মুসলিম: ৯/১১৯।
মক্কা বিজয়ের পূর্বের ঘটনা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমরা পালন করার উদ্দেশ্যে মক্কার দিকে যাত্রা করলেন। যখন তিনি হারাম শরিফে পৌঁছুলেন, তখন কুরাইশরা তাঁকে মসজিদে হারাম থেকে ফিরিয়ে দিতে দূত হিসেবে উরওয়া ইবনে মাসউদকে পাঠাল। সে এসে দেখল, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বসে আছেন। আর সাহাবিগণ তাঁর চারপাশে জড়ো হয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে কথা শুনছেন। কথার মাঝে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখনই থুথু ফেলছিলেন, তখন তা কোনো সাহাবির হাতে পড়ছিল। সাহাবিগণ সে পবিত্র থুথু-মোবারক সুগন্ধি হিসেবে নিজেদের শরীর ও চেহারায় মেখে নিচ্ছিলেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিগণকে যখন কোনো নির্দেশ দিতেন, তা পালনে সাহাবিগণ প্রতিযোগিতা শুরু করতেন। যখন তিনি অজু করতেন, অজুর পানি আনার জন্য সাহাবিদের মাঝে হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যেত। যখন তিনি কথা বলতেন, সম্মানের আতিশয্যে নবিজির দিকে চোখ তুলে তাঁরা তাকাতেন না।
উরওয়া যখন বিষয়টি প্রত্যক্ষ করল, তখন সে সাথিদের কাছে ফিরে গিয়ে বলল, 'হে আমার কওম, আল্লাহর শপথ, আমি অনেক প্রতাপশালী বাদশাহর দরবারে গিয়েছি, কিসরা, কায়সার এবং নাজাশির দরবারে গিয়েছি, কিন্তু কোনো বাদশাহকে তার সঙ্গীগণ এত বেশি সম্মান করতে দেখিনি; যতটা সম্মান মুহাম্মদকে তাঁর সাথি ও অনুসারীরা করে থাকে। তারা মুহাম্মদকে এতটা ভালোবাসে যে, তাদের প্রতিটি কাজেকর্মে তা স্পষ্ট ফুটে ওঠে।
একদিন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাজির হয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আমার কাছে শুধু আমার সম্পদ ও সন্তানের চেয়ে অধিক প্রিয় নন; আপনার প্রতি কিতাব অবতীর্ণকারী আল্লাহর শপথ, বরং আপনি আমার কাছে আমার প্রাণের চেয়েও অধিক প্রিয়।'
একলোক নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, কিয়ামত কখন হবে?'
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তুমি কিয়ামতের জন্য কী প্রস্তুতি গ্রহণ করেছ?'
লোকটি বলল, 'আমি কিয়ামতের প্রস্তুতি হিসেবে খুব বেশি নামাজ, রোজা এবং প্রচুর পরিমাণ দান-সদকা করিনি ঠিক, তবে আমি আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলকে অনেক ভালোবাসি।'
তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- أَنْتَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ. তুমি যাকে ভালোবাসো তার সাথেই থাকবে।
সাহাবিগণ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ কথা, 'তুমি যাকে ভালোবাসো তার সাথেই থাকবে' শুনে এতটাই খুশি হয়েছেন যে, এমন খুশি আর কখনো হননি। তাঁরা যখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে চলতেন, সূর্যের তাপ থেকে ছায়া দিয়ে চলতেন; যেন রাসুলের গায়ে সূর্যের তাপ না লাগে। যখন তাঁর সাথে সফর করতেন, নবিজিকে ছায়াদার বৃক্ষের ছায়ায় বসাতেন, যেন তিনি আরাম করতে পারেন। তাঁরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কতই-না ভালোবেসেছেন!
কিন্তু ভাবার বিষয় হলো, সাহাবিগণের হৃদয়ে নবিজির প্রতি এত ভালোবাসা, সম্মান-মর্যাদা, অনুসরণ-অনুকরণ, সীমাহীন ভক্তি থাকা সত্ত্বেও তাঁকে তাঁর অবস্থান থেকে উপরে উঠাননি, অথবা মানবীয় গুণের ঊর্ধ্বে মনে করেননি। তাঁরা বিশ্বাস করতেন ও বলতেন, 'মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ—তিনি আল্লাহর নবি ও রাসুল এবং তাঁরই বান্দা।'
তবে হ্যাঁ, তিনি আদমসন্তানের সর্দার। হাশরের মাঠে সুপারিশকারী; কিন্তু তিনি তেমনই, যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন— ‘বলুন, আমি কেবল তোমাদের মতো একজন মানুষ। আমার কাছে অহি পাঠানো হয় যে, তোমাদের উপাস্য কেবল একক উপাস্য। অতএব, তোমরা তাঁর পথে দৃঢ়ভাবে অটল থাকো এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চাও, আর মুশরিকদের জন্য রয়েছে ধ্বংস।’ [সুরা ফুসসিলাত : ৬]
সুতরাং তাঁর মানব হওয়াটা তাঁর সম্মানকে হ্রাস করবে না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর প্রতিপালকের রিসালাত পূর্ণরূপে পৌঁছে দিয়েছেন। সীমাহীন কষ্ট সহ্য করেছেন। এমনকি আল্লাহ তাআলা তাঁকে সাহায্য করেছেন এবং তাঁর দ্বীন পূর্ণ করেছেন।
অতএব, উম্মতের উপর রাসুলের হক কী? সেটা কি তার প্রশংসায় অতিরঞ্জন করা? না, কখনো না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন গর্হিত কাজ থেকে বারণ করেছেন। যেমন: সহিহ বুখারি ও মুসলিম-এ বর্ণিত আছে- لا تُظْرُونِي كَمَا أَطْرَتْ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ فَقُولُوا عَبْدُ اللهِ وَرَسُولُهُ . আমাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি কোরো না; যেমন খ্রিষ্টানরা মরিয়ম-তনয় (ঈসা আ.)-কে নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে। আমি তো কেবল আল্লাহর বান্দা। অতএব, তোমরা বলো, মুহাম্মদ আল্লাহর বান্দা ও রাসুল।
উম্মতের উপর নবিজির হক কি তাঁকে নিয়ে মিলাদ মাহফিল করা? নাকি ইসরা-মিরাজ উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁর হক রয়েছে? না, কখনো না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন কাজ থেকেও বারণ করেছেন। যেমন: সহিহ বুখারি ও মুসলিম-এ বর্ণিত আছে- مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْসَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدُّ . 'যে ব্যক্তি (শরিয়তের নামে) এমন কোনো কাজ করল, যা আমার বিধিসম্মত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।
উম্মতের উপর নবিজির হক কি বিপদে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে সাহায্য চাওয়া? নাকি গাইরুল্লাহকে ডাকার মাঝে রাসুলের অধিকার নিহিত আছে? নাকি তাঁর কবর তাওয়াফ করার মাঝে এবং গাইরুল্লাহর নামে শপথ করার মাঝে? না, না, না, কখনো না; এর সবই আল্লাহর সঙ্গে শিরক।
টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: ১১/২৬২।
২. সহিহ বুখারি: ২২/৩৩২; সহিহ মুসলিম: ৯/১১৯।
📄 উমাইয়া বিন খালফের মৃত্যু
মুসা বিন উকবা তার মাগাজিতে বর্ণনা করেছেন, জাহেলি যুগে সাআদ বিন মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং উমাইয়া বিন খালফের মাঝে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক ছিল। সেই সূত্রে উমাইয়া বিন খালফ যখন সিরিয়া সফরের ইচ্ছা করত, তখন মক্কার উত্তরাঞ্চল হয়ে যাত্রা করে মদিনায় গিয়ে বিশ্রামের জন্য সাআদ বিন মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহুর বাড়িতে দু-এক দিন অবস্থান করত। যাত্রাবিরতির পর আবার সিরিয়ার দিকে রওয়ানা হতো। এরপর যখন সিরিয়া থেকে দক্ষিণাঞ্চল হয়ে ফিরত, তখনও মদিনায় এসে তার বন্ধুর বাড়িতে বিশ্রামের জন্য দু-এক দিন অবস্থান করে মক্কার দিকে যাত্রা করত।
সাআদ বিন মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজেও এমনটি করতেন। যখন ইয়ামেন যেতেন বা কোনো প্রয়োজনে মক্কায় যেতেন, উমাইয়া বিন খালফের বাড়িতে মেহমান হতেন। দু-এক দিন বিশ্রাম করে গন্তব্যের পথে যাত্রা করতেন। ইতোপূর্বে মুসলিম ও কুরাইশদের মাঝে কোনো যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাত্র কিছুদিন হলো মদিনায় হিজরত করেছেন।
হঠাৎ একদিন সাআদ বিন মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহু কোনো প্রয়োজনে মক্কায় গেলেন। সেখানে বন্ধু উমাইয়া বিন খালফের বাড়িতে মেহমান হলেন। সাআদ উমাইয়াকে বললেন, 'একটু নিরিবিলি সময়ের প্রতি লক্ষ রেখো, আমি কাবাঘর তাওয়াফ করার ইচ্ছে করেছি।'
উমাইয়া বলল, 'ঠিক আছে, আমি দুপুরে রোদের প্রখরতা কমে এলে তোমাকে নিয়ে যাব। সাধারণত এ সময় লোকজন বাড়িতে অবস্থান করে। আমি আর তুমি বের হব। তুমি তাওয়াফ করবে। এতে ভীড়ের মাঝেও পড়তে হবে না, আবার পথে আমাদের কেউ দেখতেও পাবে না। এতে অহেতুক ঝামেলা এড়ানো যাবে।
যখন দুপুর হলো, উমাইয়া বিন খালফ তার সাথির হাত ধরে বের হলো। রাস্তায় তাদের সাথে কোনো দাসদাসীরও সাক্ষাৎ হয়নি, দুর্বল কোনো মানুষের সাথেও দেখা হয়নি। কিন্তু কাফেরদের নেতা, এই উম্মাহর ফেরাউন আবু জাহেলের সঙ্গে হঠাৎ সাক্ষাৎ।
আবু জাহেল উমাইয়াকে জিজ্ঞাসা করল, 'উনি কে?' উমাইয়া বলল, 'আমার ইয়াসরিবি ভাই।' [৩] আবু জাহেল জিজ্ঞাসা করল, 'ইয়াসরিব থেকে এসেছে?' উমাইয়া বলল, 'হ্যাঁ।'
তখন আবু জাহেল রেগে সাআদ বিন মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলল, 'তোমরা মুহাম্মদ এবং তার সাথের বিধর্মীদের [৪] আশ্রয় দিয়েছ। তারপর আবার নিরাপদে কাবাঘর তাওয়াফ করতে এসেছ! আল্লাহর শপথ, যদি তুমি আবু সাফওয়ানের সাথে না থাকতে, তা হলে নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারতে না।' [৫]
আবু জাহেলের কথা শুনে সাআদ বিন মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহুও রেগে গেলেন। তিনি এই ধরনের অভদ্রতা দেখে সহ্য করার মতো নেতা ছিলেন না। তিনি তো মদিনার নিজ কওমের নেতাদের অন্যতম ছিলেন। তিনি অগ্নিশর্মা হয়ে বললেন, 'হে আবু জাহেল, তুই যদি আমাকে এই পবিত্র কাজ 'তাওয়াফ' থেকে বাধা দিস, তা হলে আমি তোকে আরও প্রিয় কাজ থেকে বাধা দেব।' আবু জাহেল বলল, 'তুমি আমাকে কোন্ কাজ থেকে বাধা দেবে? তোমাদের মদিনায় কি কাবা আছে যে, সেখানে আমাকে বাধা দেবে?' সাআদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তোকে সিরিয়ার পথে চলতে বাধা দেব।' আবু জাহেল রেগে বলল, 'আল্লাহর কসম, তুমি পারবে না।' সাআদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'অবশ্যই পারব।'
দুজনের মাঝে বিতর্ক চলতে থাকল। ওদিকে উমাইয়া বিন খালফ অসহায়ের মতো একবার ডানে তাকিয়ে দেখে মদিনার নেতা সাআদ বিন মুআজ; আবার বামে তাকিয়ে দেখে মক্কার নেতা আবু জাহেল। সে বুঝতে পারছিল না, কার পক্ষ নেবে! একপর্যায়ে তার মন আবু জাহেলের দিকে আকৃষ্ট হলো। সাআদ বিন মুআজের দিকে লক্ষ্য করে উমাইয়া বলল, 'সাআদ, আবুল হিকামের [৬] উপর জোরে কথা বোলো না। সে এই এলাকার নেতা।'
সাআদ বিন মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহু বিতর্ক বন্ধ করে উমাইয়াকে সম্বোধন করে বললেন, 'উমাইয়া, আমাকে ছেড়ে দাও! আল্লাহর শপথ, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে শুনেছি, আমরা তোমাকে হত্যা করব।' উমাইয়া বলল, 'হা-হা-হা! মুহাম্মদ তোমাদের বলেছে, তোমরা আমাকে হত্যা করবে?' সাআদ বললেন, 'হ্যাঁ।'
উমাইয়া বলল, 'আল্লাহর কসম, মুহাম্মদ কখনো মিথ্যা বলে না; কিন্তু এবার তোমাদের মিথ্যা বলেছে। আচ্ছা বলো তো, তোমরা আমাকে কোথায় হত্যা করবে, মক্কায় নাকি অন্য কোথাও?' সাআদ বিন মুআজ বললেন, 'আমি জানি না, মক্কায় নাকি অন্য কোথাও! তবে কথা হলো, তুমি নিহত হবে এবং তা হবে মুসলমানদের হাতেই।'
উমাইয়া বিন খালফ বিতর্ক ছেড়ে চলে গেল এবং মনে মনে বলতে লাগল, মুহাম্মদ কখনো মিথ্যা বলে না। স্ত্রীর সামনে গিয়ে বলল, 'হে উম্মে সাফওয়ান,' স্ত্রী বলল, 'হ্যাঁ, বলুন।' উমাইয়া বলল, 'তুমি কি জানো, ইয়াসরিবি ভাই আমাকে কী বলেছে?' স্ত্রী বলল, 'সে কী বলেছে?' উমাইয়া বলল, 'সে বিশ্বাস করে, মুহাম্মদ নাকি সংবাদ দিয়েছে যে, তারা আমাকে হত্যা করবে।'
স্ত্রী বলল, 'আল্লাহর কসম, মুহাম্মদ মিথ্যা বলে না, কিন্তু কোথায় হত্যা করবে, মক্কায় নাকি অন্য কোথাও?' উমাইয়া বলল, 'আল্লাহর কসম, আমি জানি না, কিন্তু তোমাকে ছেড়ে আমি কখনো মক্কা থেকে বের হব না। মক্কায় পাহারা-নিরাপত্তা রয়েছে। এখানে আমার দাসদসী আছে, আমার কওম আছে, আমি কখনো মক্কা থেকে বের হব না।'
সুতরাং এভাবে কিছুদিন চলল। একসময় কুরাইশের একটি কাফেলা যাত্রা করল এবং মদিনার নিকটবর্তী পথ ধরে চলতে লাগল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের পাকড়াও করার জন্য বের হলেন। তখন আবু সুফিয়ান মক্কায় দূত পাঠাল, যেন তাদের সাহায্যে ও যুদ্ধ করার জন্য, কাফেলাকে বাঁচানোর স্বার্থে মক্কাবাসী বের হয়ে আসে। সংবাদ পাওয়া-মাত্র আবু জাহেল মানুষের মাঝে ঘুরে ঘুরে বলতে লাগল, 'হে লোকসকল, তোমাদের কাফেলার উদ্দেশে বের হও এবং তাদের রক্ষা করো।'
এই ঘোষণা শুনে প্রতিটি মানুষ যুদ্ধযাত্রার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করেছে; কেবল একজন ছাড়া। সে হলো, উমাইয়া বিন খালফ। সে ছায়ায় বসে আছে। আবু জাহেল তার পাশ দিয়ে যাচ্ছে-আসছে। লোকজন প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। উমাইয়া বিন খালফ কাবার ছায়ায় উপবিষ্ট। আবু জাহেল এক-দুবার এল-গেল, উমাইয়া বসেই আছে। একসময় আবু জাহেল তার কাছে গিয়ে বলল, 'হে উমাইয়া, হে আবু সাফওয়ান, এসো, প্রস্তুত হও।'
উমাইয়া বলল, 'আমি না-যাওয়ার ইচ্ছে করেছি।' আবু জাহেল বলল, 'আশ্চর্য! তুমি কী বলছ এটা! তুমি বসে গেলে সবাই বসে যাবে। তুমি অন্য সবার মতো নও। তুমি তো কওমের অন্যতম নেতা।'
উমাইয়া বলল, 'তোমার কি মনে আছে, ইয়াসরিবি ভাই কী বলেছিল?' আবু জাহেল বলল, 'হে আবু সাফওয়ান, আমাদের সাথে চলো। তুমি তো দেখছি এখন পুরো সেনাদলকেই বিভ্রান্ত করবে!' উমাইয়া বলল, 'আমি মক্কা থেকে এক পা-ও নড়ব না।'
আবু জাহেল কাফের ও পথভ্রষ্ট; তবে সে প্রচণ্ড ধী-শক্তির অধিকারী ছিল। আবু জাহেল চলে গেল এবং একটি ধুনুচি এনে তাতে আগুন রাখল। এরপর তাতে ধুপসলার টুকরো দিলো। তারপর উমাইয়ার কাছে গেল। উমাইয়া তখন নিজ কওমের সাথে বসা ছিল। উমাইয়াকে লক্ষ করে আবু জাহেল বলল, 'ধরো, সুগন্ধি মাখো! তুমি তো পুরুষ নও, নারী!' উমাইয়া বলে উঠল, 'কী বললে? আমি নারী!' আবু জাহেল বলল, 'হ্যাঁ, যদি তুমি পুরুষ হতে, তা হলে পুরুষের সাথে যুদ্ধ করতে সম্মত হতে। তুমি অন্দরমহলের নারীদের সাথে বসে থাকো, আমরা যুদ্ধে যাচ্ছি।'
উমাইয়া ক্ষিপ্ত হয়ে ধুনুচি ছুড়ে ফেলে বাড়ির দিকে গেল। স্ত্রীকে বলল, 'হে উম্মে সাফওয়ান, সামানা তৈরি করে দাও।' স্ত্রী বলল, 'কীসের জন্য সামানা তৈরি করব?' উমাইয়া বলল, 'সৈন্যদের সাথে যাব।' স্ত্রী বলল, 'তোমার কি মনে নেই, ইয়াসরিবি ভাই কী বলেছিল?' উমাইয়া বলল, 'তাদের সাথে এক-দু মনজিল গিয়েই আমি ফিরে আসব। মদিনার পথ সুদীর্ঘ ৫০০ কিলোমিটার। তাদের সাথে যাব। আমি রাস্তায় গিয়ে সুযোগ বুঝে চলে আসব। তারা তো নাশতার জন্য যাত্রাবিরতি করবে, রাতের খাবারের জন্য যাত্রাবিরতি করবে, রাতযাপনের জন্য যাত্রাবিরতি করবে। ১৩০০ মানুষ। যাত্রাবিরতির কোনো ফাঁকে তাদের ধোঁকা দিয়ে আমি ফিরে আসব।'
কিন্তু আবু জাহেল তার চেয়েও বুদ্ধিমান ছিল। যখনই যাত্রাবিরতি করেছে, উমাইয়া এসেছে এবং তার উটের উপর বসেছে আর অপেক্ষায় থেকেছে যে, যখন লোকজন যাত্রাবিরতি শেষ করে যাত্রার জন্য ব্যস্ত থাকবে তখনই পালাবে। কিন্তু ঠিক তখনই আবু জাহেল এসেছে এবং সেনাদলের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থেকেছে। সে বলত, চলো, সবাই চলো। উমাইয়া দাঁড়াও, চলো। প্রতিটি মনজিলেই আবু জাহেল এমন করত।
এভাবে চলতে চলতে উমাইয়া বদরপ্রান্তরে এসে উপনীত হয় এবং মুসলমানদের হাতে নিহত হয়। এভাবেই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তব হয়ে প্রকাশ পায়।
টিকাঃ
৩. মদিনার প্রাচীন নাম।
৪. প্রতিমাপূজা ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করার কারণে কাফেররা মুসলমানদের বিধর্মী বলত।
৫. 'আবু সাফওয়ান' উমাইয়া বিন খালফের উপাধি।
৬. আবু জাহেলের আসল নাম। যার অর্থ সেরা জ্ঞানী। কিন্তু বুঝেশুনে ইসলামকে উপেক্ষা করার কারণে ইসলামের পক্ষ থেকে তাকে উপাধি দেওয়া হয়েছে আবু জাহেল-মূর্খের সেরা।
মুসা বিন উকবা তার মাগাজিতে বর্ণনা করেছেন, জাহেলি যুগে সাআদ বিন মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং উমাইয়া বিন খালফের মাঝে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক ছিল। সেই সূত্রে উমাইয়া বিন খালফ যখন সিরিয়া সফরের ইচ্ছা করত, তখন মক্কার উত্তরাঞ্চল হয়ে যাত্রা করে মদিনায় গিয়ে বিশ্রামের জন্য সাআদ বিন মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহুর বাড়িতে দু-এক দিন অবস্থান করত। যাত্রাবিরতির পর আবার সিরিয়ার দিকে রওয়ানা হতো। এরপর যখন সিরিয়া থেকে দক্ষিণাঞ্চল হয়ে ফিরত, তখনও মদিনায় এসে তার বন্ধুর বাড়িতে বিশ্রামের জন্য দু-এক দিন অবস্থান করে মক্কার দিকে যাত্রা করত।
সাআদ বিন মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজেও এমনটি করতেন। যখন ইয়ামেন যেতেন বা কোনো প্রয়োজনে মক্কায় যেতেন, উমাইয়া বিন খালফের বাড়িতে মেহমান হতেন। দু-এক দিন বিশ্রাম করে গন্তব্যের পথে যাত্রা করতেন। ইতোপূর্বে মুসলিম ও কুরাইশদের মাঝে কোনো যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাত্র কিছুদিন হলো মদিনায় হিজরত করেছেন।
হঠাৎ একদিন সাআদ বিন মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহু কোনো প্রয়োজনে মক্কায় গেলেন। সেখানে বন্ধু উমাইয়া বিন খালফের বাড়িতে মেহমান হলেন। সাআদ উমাইয়াকে বললেন, 'একটু নিরিবিলি সময়ের প্রতি লক্ষ রেখো, আমি কাবাঘর তাওয়াফ করার ইচ্ছে করেছি।'
উমাইয়া বলল, 'ঠিক আছে, আমি দুপুরে রোদের প্রখরতা কমে এলে তোমাকে নিয়ে যাব। সাধারণত এ সময় লোকজন বাড়িতে অবস্থান করে। আমি আর তুমি বের হব। তুমি তাওয়াফ করবে। এতে ভীড়ের মাঝেও পড়তে হবে না, আবার পথে আমাদের কেউ দেখতেও পাবে না। এতে অহেতুক ঝামেলা এড়ানো যাবে।
যখন দুপুর হলো, উমাইয়া বিন খালফ তার সাথির হাত ধরে বের হলো। রাস্তায় তাদের সাথে কোনো দাসদাসীরও সাক্ষাৎ হয়নি, দুর্বল কোনো মানুষের সাথেও দেখা হয়নি। কিন্তু কাফেরদের নেতা, এই উম্মাহর ফেরাউন আবু জাহেলের সঙ্গে হঠাৎ সাক্ষাৎ।
আবু জাহেল উমাইয়াকে জিজ্ঞাসা করল, 'উনি কে?'
উমাইয়া বলল, 'আমার ইয়াসরিবি ভাই।'
আবু জাহেল জিজ্ঞাসা করল, 'ইয়াসরিব থেকে এসেছে?'
উমাইয়া বলল, 'হ্যাঁ।'
তখন আবু জাহেল রেগে সাআদ বিন মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলল, 'তোমরা মুহাম্মদ এবং তার সাথের বিধর্মীদের আশ্রয় দিয়েছ। তারপর আবার নিরাপদে কাবাঘর তাওয়াফ করতে এসেছ! আল্লাহর শপথ, যদি তুমি আবু সাফওয়ানের সাথে না থাকতে, তা হলে নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারতে না।'
আবু জাহেলের কথা শুনে সাআদ বিন মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহুও রেগে গেলেন। তিনি এই ধরনের অভদ্রতা দেখে সহ্য করার মতো নেতা ছিলেন না। তিনি তো মদিনার নিজ কওমের নেতাদের অন্যতম ছিলেন। তিনি অগ্নিশর্মা হয়ে বললেন, 'হে আবু জাহেল, তুই যদি আমাকে এই পবিত্র কাজ 'তাওয়াফ' থেকে বাধা দিস, তা হলে আমি তোকে আরও প্রিয় কাজ থেকে বাধা দেব।'
আবু জাহেল বলল, 'তুমি আমাকে কোন্ কাজ থেকে বাধা দেবে? তোমাদের মদিনায় কি কাবা আছে যে, সেখানে আমাকে বাধা দেবে?'
সাআদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তোকে সিরিয়ার পথে চলতে বাধা দেব।'
আবু জাহেল রেগে বলল, 'আল্লাহর কসম, তুমি পারবে না।'
সাআদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'অবশ্যই পারব।'
দুজনের মাঝে বিতর্ক চলতে থাকল। ওদিকে উমাইয়া বিন খালফ অসহায়ের মতো একবার ডানে তাকিয়ে দেখে মদিনার নেতা সাআদ বিন মুআজ; আবার বামে তাকিয়ে দেখে মক্কার নেতা আবু জাহেল। সে বুঝতে পারছিল না, কার পক্ষ নেবে!
একপর্যায়ে তার মন আবু জাহেলের দিকে আকৃষ্ট হলো। সাআদ বিন মুআজের দিকে লক্ষ্য করে উমাইয়া বলল, 'সাআদ, আবুল হিকামের উপর জোরে কথা বোলো না। সে এই এলাকার নেতা।'
সাআদ বিন মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহু বিতর্ক বন্ধ করে উমাইয়াকে সম্বোধন করে বললেন, 'উমাইয়া, আমাকে ছেড়ে দাও! আল্লাহর শপথ, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে শুনেছি, আমরা তোমাকে হত্যা করব।'
উমাইয়া বলল, 'হা-হা-হা! মুহাম্মদ তোমাদের বলেছে, তোমরা আমাকে হত্যা করবে?' সাআদ বললেন, 'হ্যাঁ।'
উমাইয়া বলল, 'আল্লাহর কসম, মুহাম্মদ কখনো মিথ্যা বলে না; কিন্তু এবার তোমাদের মিথ্যা বলেছে। আচ্ছা বলো তো, তোমরা আমাকে কোথায় হত্যা করবে, মক্কায় নাকি অন্য কোথাও?'
সাআদ বিন মুআজ বললেন, 'আমি জানি না, মক্কায় নাকি অন্য কোথাও! তবে কথা হলো, তুমি নিহত হবে এবং তা হবে মুসলমানদের হাতেই।'
উমাইয়া বিন খালফ বিতর্ক ছেড়ে চলে গেল এবং মনে মনে বলতে লাগল, মুহাম্মদ কখনো মিথ্যা বলে না। স্ত্রীর সামনে গিয়ে বলল, 'হে উম্মে সাফওয়ান,' স্ত্রী বলল, 'হ্যাঁ, বলুন।'
উমাইয়া বলল, 'তুমি কি জানো, ইয়াসরিবি ভাই আমাকে কী বলেছে?' স্ত্রী বলল, 'সে কী বলেছে?'
উমাইয়া বলল, 'সে বিশ্বাস করে, মুহাম্মদ নাকি সংবাদ দিয়েছে যে, তারা আমাকে হত্যা করবে।'
স্ত্রী বলল, 'আল্লাহর কসম, মুহাম্মদ মিথ্যা বলে না, কিন্তু কোথায় হত্যা করবে, মক্কায় নাকি অন্য কোথাও?'
উমাইয়া বলল, 'আল্লাহর কসম, আমি জানি না, কিন্তু তোমাকে ছেড়ে আমি কখনো মক্কা থেকে বের হব না। মক্কায় পাহারা-নিরাপত্তা রয়েছে। এখানে আমার দাসদাসী আছে, আমার কওম আছে, আমি কখনো মক্কা থেকে বের হব না।'
সুতরাং এভাবে কিছুদিন চলল। একসময় কুরাইশের একটি কাফেলা যাত্রা করল এবং মদিনার নিকটবর্তী পথ ধরে চলতে লাগল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের পাকড়াও করার জন্য বের হলেন। তখন আবু সুফিয়ান মক্কায় দূত পাঠাল, যেন তাদের সাহায্যে ও যুদ্ধ করার জন্য, কাফেলাকে বাঁচানোর স্বার্থে মক্কাবাসী বের হয়ে আসে। সংবাদ পাওয়া-মাত্র আবু জাহেল মানুষের মাঝে ঘুরে ঘুরে বলতে লাগল, 'হে লোকসকল, তোমাদের কাফেলার উদ্দেশে বের হও এবং তাদের রক্ষা করো।'
এই ঘোষণা শুনে প্রতিটি মানুষ যুদ্ধযাত্রার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করেছে; কেবল একজন ছাড়া। সে হলো, উমাইয়া বিন খালফ। সে ছায়ায় বসে আছে। আবু জাহেল তার পাশ দিয়ে যাচ্ছে-আসছে। লোকজন প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। উমাইয়া বিন খালফ কাবার ছায়ায় উপবিষ্ট। আবু জাহেল এক-দুবার এল-গেল, উমাইয়া বসেই আছে। একসময় আবু জাহেল তার কাছে গিয়ে বলল, 'হে উমাইয়া, হে আবু সাফওয়ান, এসো, প্রস্তুত হও।'
উমাইয়া বলল, 'আমি না-যাওয়ার ইচ্ছে করেছি।'
আবু জাহেল বলল, 'আশ্চর্য! তুমি কী বলছ এটা! তুমি বসে গেলে সবাই বসে যাবে। তুমি অন্য সবার মতো নও। তুমি তো কওমের অন্যতম নেতা।'
উমাইয়া বলল, 'তোমার কি মনে আছে, ইয়াসরিবি ভাই কী বলেছিল?'
আবু জাহেল বলল, 'হে আবু সাফওয়ান, আমাদের সাথে চলো। তুমি তো দেখছি এখন পুরো সেনাদলকেই বিভ্রান্ত করবে!'
উমাইয়া বলল, 'আমি মক্কা থেকে এক পা-ও নড়ব না।'
আবু জাহেল কাফের ও পথভ্রষ্ট; তবে সে প্রচণ্ড ধী-শক্তির অধিকারী ছিল। আবু জাহেল চলে গেল এবং একটি ধুনুচি এনে তাতে আগুন রাখল। এরপর তাতে ধুপসলার টুকরো দিলো। তারপর উমাইয়ার কাছে গেল। উমাইয়া তখন নিজ কওমের সাথে বসা ছিল। উমাইয়াকে লক্ষ করে আবু জাহেল বলল, 'ধরো, সুগন্ধি মাখো! তুমি তো পুরুষ নও, নারী!'
উমাইয়া বলে উঠল, 'কী বললে? আমি নারী!'
আবু জাহেল বলল, 'হ্যাঁ, যদি তুমি পুরুষ হতে, তা হলে পুরুষের সাথে যুদ্ধ করতে সম্মত হতে। তুমি অন্দরমহলের নারীদের সাথে বসে থাকো, আমরা যুদ্ধে যাচ্ছি।'
উমাইয়া ক্ষিপ্ত হয়ে ধুনুচি ছুড়ে ফেলে বাড়ির দিকে গেল। স্ত্রীকে বলল, 'হে উম্মে সাফওয়ান, সামানা তৈরি করে দাও।'
স্ত্রী বলল, 'কীসের জন্য সামানা তৈরি করব?'
উমাইয়া বলল, 'সৈন্যদের সাথে যাব।'
স্ত্রী বলল, 'তোমার কি মনে নেই, ইয়াসরিবি ভাই কী বলেছিল?'
উমাইয়া বলল, 'তাদের সাথে এক-দু মনজিল গিয়েই আমি ফিরে আসব। মদিনার পথ সুদীর্ঘ ৫০০ কিলোমিটার। তাদের সাথে যাব। আমি রাস্তায় গিয়ে সুযোগ বুঝে চলে আসব। তারা তো নাশতার জন্য যাত্রাবিরতি করবে, রাতের খাবারের জন্য যাত্রাবিরতি করবে, রাতযাপনের জন্য যাত্রাবিরতি করবে। ১৩০০ মানুষ। যাত্রাবিরতির কোনো ফাঁকে তাদের ধোঁকা দিয়ে আমি ফিরে আসব।'
কিন্তু আবু জাহেল তার চেয়েও বুদ্ধিমান ছিল। যখনই যাত্রাবিরতি করেছে, উমাইয়া এসেছে এবং তার উটের উপর বসেছে আর অপেক্ষায় থেকেছে যে, যখন লোকজন যাত্রাবিরতি শেষ করে যাত্রার জন্য ব্যস্ত থাকবে তখনই পালাবে। কিন্তু ঠিক তখনই আবু জাহেল এসেছে এবং সেনাদলের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থেকেছে। সে বলত, চলো, সবাই চলো। উমাইয়া দাঁড়াও, চলো। প্রতিটি মনজিলেই আবু জাহেল এমন করত।
এভাবে চলতে চলতে উমাইয়া বদরপ্রান্তরে এসে উপনীত হয় এবং মুসলমানদের হাতে নিহত হয়। এভাবেই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তব হয়ে প্রকাশ পায়।
টিকাঃ
৩. মদিনার প্রাচীন নাম।
৪. প্রতিমাপূজা ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করার কারণে কাফেররা মুসলমানদের বিধর্মী বলত।
৫. 'আবু সাফওয়ান' উমাইয়া বিন খালফের উপাধী।
৬. আবু জাহেলের আসল নাম। যার অর্থ সেরা জ্ঞানী। কিন্তু বুঝেশুনে ইসলামকে উপেক্ষা করার কারণে ইসলামের পক্ষ থেকে তাকে উপাধী দেওয়া হয়েছে আবু জাহেল—মূর্খের সেরা।
📄 বিষ মাখানো গোশত
ইমাম বুখারি রহমাতুল্লাহি আলাইহি সহিহ বুখারিতে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর সূত্রে বর্ণনা করেছেন, খায়বার বিজয়ের পর এক-ইহুদি নারী নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে খাবারের দাওয়াত দিলো। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাওয়াত গ্রহণ করে মহিলার বাড়ি গেলেন। এ দিকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-সহ সাহাবিগণ দীর্ঘদিন যাবত খায়বার অবরোধ করে রেখেছেন। ফলে সাহাবিগণ ছিলেন ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। তাঁদের খাবারের তীব্র প্রয়োজন ছিল। ওই মহিলা খাবারের দাওয়াত দিলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদের নিয়ে সেখানে গেলেন। তাঁরা ভুনা বকরির চারদিকে বসে গেলেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাওয়ার জন্য বকরির বাহু উঠালেন এবং খেতে মুখ লাগালেন তখন সাহাবিগণ চিৎকার করে খাওয়া থেকে নবিজিকে নিবৃত্ত করলেন এবং বাহুটা রেখে দিলেন। তারপর নবিজি বললেন, 'ইহুদিদের আমার সামনে ডাকো।' ডাকা হলে তাদের নেতৃবৃন্দ এল এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে দাঁড়াল। নবিজি তাদের বললেন, 'হে ইহুদিরা, তোমরা আমাকে একটি সত্য কথা বলবে?'
ইহুদিরা বলল, 'হ্যাঁ, হে আবুল কাসিম।'
নবিজি বললেন, 'তোমাদের পিতা কে?'
তারা বলল, 'অমুক।'
নবিজি বললেন, 'তোমরা মিথ্যে বলছ; বরং তোমাদের পিতা অমুক।'
তারা বলল, 'আপনি সত্যিই বলেছেন। কেননা, ইহুদিরা নিজেদের পিতৃপুরুষ জাবানের দাদার দিকে সম্বোধন করত। আর যখন তাদের বংশীয় গৌরবের দিকে লক্ষ করে জিজ্ঞাসা করা হতো, তোমাদের পিতৃপুরুষ কে? তখন তারা ভিন্ন পিতৃপুরুষের নাম বলত যিনি প্রকৃতপক্ষে খায়বারের ইহুদিদের পিতৃপুরুষ ছিলেন না; তারা হলো অন্য ইহুদি বংশধারা। এরা নিজেদের পিতৃপুরুষ জাবানের দিকে সম্বোধিত করত, তবে বংশীয় গৌরবের ব্যাপার হলে অন্য পিতৃপুরুষের দিকে নিজেদের সম্বোধন করত।
সুতরাং তারা বলল, 'আমাদের পিতৃপুরুষ অমুক, তিনি হলেন অন্য পিতৃপুরুষ।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমরা মিথ্যে বলছ, তোমাদের পিতৃপুরুষ তো অমুক।'
তারা বলল, 'আপনি ঠিক এবং ন্যায়সঙ্গত বলেছেন।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হে ইহুদিরা, তোমরা আমাকে আরেকটি সত্য কথা বলবে?'
ইহুদিরা বলল, 'হ্যাঁ, হে আবুল কাসিম। আমরা যদি মিথ্যা বলি, তা হলে তো আপনি পূর্বের মতো এবারও আমাদের মিথ্যা ধরে ফেলবেন।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, 'জাহান্নামি কারা?'
তারা বলল, 'আমরা সেখানে অল্প কিছু সময় থাকব, তারপর আপনারা আমাদের অনুসরণ করবেন।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বললেন, 'তোমরা সেখানে লাঞ্ছিত হবে। আল্লাহর কসম, আমরা সেখানে কখনোই তোমাদের অনুসরণ করব না।' নবিজি তাদের বললেন, 'হে ইহুদিরা, আমাকে কি আরেকটি সত্য কথা বলবে?'
তারা বলল, 'হ্যাঁ।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমরা কি বকরির গোশতে বিষ মিশিয়েছ?'
তারা বলল, 'হ্যাঁ।'
নবিজি বললেন, 'তোমরা কেন বিষ মিশিয়েছ?'
তারা বলল, 'আমরা ভাবলাম, যদি আপনি সাধারণ রাজা-বাদশাহ হন, তা হলে মারা যাবেন আর আমরা আপনার থেকে মুক্তি পাব। আর যদি আপনি নবি হন, তা হলে আপনার কোনো ক্ষতি হবে না; কিন্তু আপনাকে বিষয়টি কে জানিয়েছে?'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'বকরির বাহু।'
সুবহানাল্লাহ! নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বকরির বাহুর মাংস ভালোবাসতেন। তাই যখন খাওয়ার জন্য বাহুটি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুখের কাছে নিলেন, তখন বাহুই বলল, 'আমাকে খাবেন না, আমি বিষাক্ত হে আল্লাহর রাসুল।'
ইমাম বুখারি রহমাতুল্লাহি আলাইহি সহিহ বুখারিতে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর সূত্রে বর্ণনা করেছেন, খায়বার বিজয়ের পর এক-ইহুদি নারী নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে খাবারের দাওয়াত দিলো। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাওয়াত গ্রহণ করে মহিলার বাড়ি গেলেন। এ দিকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-সহ সাহাবিগণ দীর্ঘদিন যাবত খায়বার অবরোধ করে রেখেছেন। ফলে সাহাবিগণ ছিলেন ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। তাঁদের খাবারের তীব্র প্রয়োজন ছিল। ওই মহিলা খাবারের দাওয়াত দিলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদের নিয়ে সেখানে গেলেন। তাঁরা ভুনা বকরির চারদিকে বসে গেলেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাওয়ার জন্য বকরির বাহু উঠালেন এবং খেতে মুখ লাগালেন তখন সাহাবিগণ চিৎকার করে খাওয়া থেকে নবিজিকে নিবৃত্ত করলেন এবং বাহুটা রেখে দিলেন। তারপর নবিজি বললেন, 'ইহুদিদের আমার সামনে ডাকো।' ডাকা হলে তাদের নেতৃবৃন্দ এল এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে দাঁড়াল। নবিজি তাদের বললেন, 'হে ইহুদিরা, তোমরা আমাকে একটি সত্য কথা বলবে?'
ইহুদিরা বলল, 'হ্যাঁ, হে আবুল কাসিম।'
নবিজি বললেন, 'তোমাদের পিতা কে?'
তারা বলল, 'অমুক।'
নবিজি বললেন, 'তোমরা মিথ্যে বলছ; বরং তোমাদের পিতা অমুক।'
তারা বলল, 'আপনি সত্যিই বলেছেন।'
কেননা, ইহুদিরা নিজেদের পিতৃপুরুষ জাবানের দাদার দিকে সম্বোধন করত। আর যখন তাদের বংশীয় গৌরবের দিকে লক্ষ করে জিজ্ঞাসা করা হতো, তোমাদের পিতৃপুরুষ কে? তখন তারা ভিন্ন পিতৃপুরুষের নাম বলত যিনি প্রকৃতপক্ষে খায়বারের ইহুদিদের পিতৃপুরুষ ছিলেন না; তারা হলো অন্য ইহুদি বংশধারা। এরা নিজেদের পিতৃপুরুষ জাবানের দিকে সম্বোধিত করত, তবে বংশীয় গৌরবের ব্যাপার হলে অন্য পিতৃপুরুষের দিকে নিজেদের সম্বোধন করত।
সুতরাং তারা বলল, 'আমাদের পিতৃপুরুষ অমুক, তিনি হলেন অন্য পিতৃপুরুষ।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমরা মিথ্যে বলছ, তোমাদের পিতৃপুরুষ তো অমুক।'
তারা বলল, 'আপনি ঠিক এবং ন্যায়সঙ্গত বলেছেন।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হে ইহুদিরা, তোমরা আমাকে আরেকটি সত্য কথা বলবে?'
ইহুদিরা বলল, 'হ্যাঁ, হে আবুল কাসিম। আমরা যদি মিথ্যা বলি, তা হলে তো আপনি পূর্বের মতো এবারও আমাদের মিথ্যা ধরে ফেলবেন।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, 'জাহান্নামি কারা?'
তারা বলল, 'আমরা সেখানে অল্প কিছু সময় থাকব, তারপর আপনারা আমাদের অনুসরণ করবেন।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বললেন, 'তোমরা সেখানে লাঞ্ছিত হবে। আল্লাহর কসম, আমরা সেখানে কখনোই তোমাদের অনুসরণ করব না।' নবিজি তাদের বললেন, 'হে ইহুদিরা, আমাকে কি আরেকটি সত্য কথা বলবে?'
তারা বলল, 'হ্যাঁ।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমরা কি বকরির গোশতে বিষ মিশিয়েছ?'
তারা বলল, 'হ্যাঁ।'
নবিজি বললেন, 'তোমরা কেন বিষ মিশিয়েছ?'
তারা বলল, 'আমরা ভাবলাম, যদি আপনি সাধারণ রাজা-বাদশাহ হন, তা হলে মারা যাবেন আর আমরা আপনার থেকে মুক্তি পাব। আর যদি আপনি নবি হন, তা হলে আপনার কোনো ক্ষতি হবে না; কিন্তু আপনাকে বিষয়টি কে জানিয়েছে?'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'বকরির বাহু।'
সুবহানাল্লাহ! নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বকরির বাহুর মাংস ভালোবাসতেন। তাই যখন খাওয়ার জন্য বাহুটি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুখের কাছে নিলেন, তখন বাহুই বলল, 'আমাকে খাবেন না, আমি বিষাক্ত হে আল্লাহর রাসুল।'
📄 পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার
একজন আলেম। তিনি কাহমাস বিন আল-হাসান আল-হানাফি আল-বসরি। ইমাম জাহাবি রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর সম্পর্কে বলেন, 'তিনি নির্ভরযোগ্য আলেমদের অন্যতম ছিলেন। মায়ের সাথে সদাচারী ছিলেন। মায়ের মৃত্যুর পর তিনি হজ করেছেন এবং আমৃত্যু মক্কায় অবস্থান করেছেন।'
মায়ের সাথে সদাচরণের প্রতিফল হিসেবে তিনি কী পেয়েছেন? বর্ণিত আছে, তিনি একবার একটি বিচ্ছু মারতে চাইলে তা গর্তে ঢুকে পড়ে। তিনি বিচ্ছুটিকে মারার জন্য গর্তে হাত ঢুকিয়ে দেন। ফলে বিচ্ছুটি তাঁকে দংশন করে। তিনি কেন গর্তে হাত ঢুকিয়েছেন, এর কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে বললেন, 'আমি আশঙ্কা করছিলাম, বিচ্ছুটি বের হয়ে আমার মাকে দংশন করবে।' তিনি মায়ের পরিবর্তে নিজেকে বিচ্ছুর দংশন খাওয়ালেন!
পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ নিশ্চয় এমন সৎকাজ, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ হয়। যেমনটি গুহায় বন্দি হওয়া তিন ব্যক্তির ঘটনায় বর্ণিত হয়েছে। ঘটনাটি সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত আছে। সেখানে বলা হয়েছে; তাদের মধ্য থেকে একজন বলল, 'হে আল্লাহ, আমার বৃদ্ধ পিতা-মাতা ছিল। আমি প্রত্যেক রাতে তাদের জন্য আমার বকরির দুধ নিয়ে আসতাম। হঠাৎ একদিন বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে যায়। এসে দেখি আমার পিতা-মাতা ঘুমিয়ে পড়েছেন। এ দিকে আমার স্ত্রী ও সন্তান ক্ষুধায় ছটফট করছে। আমার পিতা-মাতাকে তৃপ্তিসহ খাওয়ানোর পূর্বে আমি তাদের খেতে দিইনি।
'তাদের কষ্ট হবে ভেবে ঘুম থেকে তাদের জাগাতেও অস্বস্তি হচ্ছিল। আবার তাদের জন্য রেখে দিয়ে আমরা খেয়ে নেব, এটাও ভালো লাগছিল না। এভাবে তাদের জন্য অপেক্ষা করতে করতে সকাল হয়ে গেল। যদি তুমি জানো যে, এই কাজটি আমি তোমার ভয়েই করেছি, তা হলে আমাদের জন্য গর্তের মুখ খুলে দাও।' তখন পাথর কিছুটা সরে গেল এবং তারা আকাশ দেখতে পেল।
পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ এমন নেককাজ, যার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর কাছে উঁচু মর্যাদার অধিকারী হতে পারে। শুধু তাই নয়; বরং পিতা-মাতার সাথে সদাচরণকারী এমন মর্যাদায় উত্তীর্ণ হয়, সে যদি আল্লাহর নামে শপথ করে, তা হলে আল্লাহ তাআলা তাকে শপথ থেকে মুক্তি দেন। যেমন: ওয়াইস আল-কারনির ঘটনায় বর্ণিত আছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ব্যাপারে বলেছেন, 'ইয়ামেনের অন্তর্গত মুরাদ-এর কারন এলাকার কাফেলার সাথে তোমাদের কাছে ওয়াইস বিন আমের আসবে। এক দিরহাম পরিমাণ জায়গা ব্যতিরেকে তার পুরো শরীরে ধবলরোগ থাকবে। তার মা আছেন। তাঁর সাথে সে সদাচরণ করে। যদি আল্লাহর নামে শপথ করে, আল্লাহ তাকে মুক্ত করবেন। যদি সম্ভব হয়, তা হলে তার মাধ্যমে তোমার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইয়ে নিয়ো।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উক্ত কথাটি বলেছেন উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহুকে। সহিহ মুসলিমে অন্য বর্ণনায় আছে, 'সর্বশ্রেষ্ঠ তাবেয়ি লোকটির নাম ওয়াইস। তার মা আছেন। তার শরীরে ধবলরোগ আছে। তোমরা তার নিকট যেয়ো এবং তার মাধ্যমে নিজেদের গোনাহ ক্ষমা চাইয়ে নিয়ো।'
নিশ্চয় মায়ের সাথে সদাচরণ একজন ব্যক্তিকে সুউচ্চ মর্যাদায় উত্তীর্ণ করে। ইমাম বুখারি রহমাতুল্লাহি আলাইহি আনাস বিন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন, আনাসের ফুফু রুবাই বিনতে নজর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে এলেন। তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর নবি, আমাকে হারেসাহ সম্পর্কে কিছু বলবেন কি? সে বদরে তিরের আঘাতে শহিদ হয়েছে। সে যদি জান্নাতে যায়, তা হলে ধৈর্যধারণ করব। যদি জাহান্নামে যায়, তা হলে তার জন্য খুব বেশি কাঁদব।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হে উম্মে হারেসাহ, জান্নাতে অনেক বাগান রয়েছে। তোমার ছেলে হারেসাহ ফিরদাউসের সুউচ্চ মাকাম পেয়েছে।'
হারেসাহ বিন নু'মান রাদিয়াল্লাহু আনহু। তাঁকে হারেসাহ বিন সুরাকাও বলা হয়। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি রহমাতুল্লাহি আলাইহি আল-ইসাবাহ গ্রন্থে দুজনের চরিত উল্লেখ করেছেন। তবে ফাতহুল বারি-তে তিনি একজনের কথাই প্রাধান্য দিয়েছেন, বলেছেন একব্যক্তির দুটি নাম। লোকটিকে পিতা-মাতার সাথে সদাচরণই জান্নাতে পৌঁছিয়েছে।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত আছে; রাসুল সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আমি জান্নাতে ঘোরাফেরা করছিলাম। হঠাৎ একজন তিলাওয়াতকারীর আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “কে সে?” ফেরেশতারা বললেন, “হারেসাহ বিন নু'মান।” রাসুল সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'এভাবে তোমাদেরও পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করা উচিত।' তারপর বলেছেন, 'হারেসাহ বিন নু'মান তাঁর মায়ের সাথে সবচেয়ে বেশি সদাচরণকারী ছিল।'
হাদিসটি ইমাম আহমদ, ইমাম ইবনে হিব্বান, ইমাম হাকিম রহমাতুল্লাহি আলাইহিম বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন, 'হাদিসটি বুখারি ও মুসলিমের শর্তে বিশুদ্ধ। হাসান বসরিকে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'পিতা-মাতার সাথে সদাচরণটা কী?' তিনি বললেন, 'নিজের সম্পদ থেকে তাদের জন্য ব্যয় করা এবং আল্লাহর অবাধ্যতা না হলে তাদের প্রতিটি কথা মেনে চলা।'
পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করার এই ফজিলতগুলোর জন্য আমাদের পূর্বসূরি আল্লাহওয়ালাগণ পিতা-মাতার সাথে সদাচরণে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর পিতার মৃত্যুর পর পিতার বন্ধুর পুত্রের সাথে সদাচরণ করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে দিনার থেকে বর্ণিত; আবদুল্লাহ ইবনে উমর মক্কার দিকে যাত্রা করলে গাধায় আরোহণ করে ধীরে ধীরে অগ্রসর হতেন। মাথায় পাগড়ি বাঁধতেন। এভাবে একদিন তিনি গাধায় চড়ে রওয়ানা হলেন। হঠাৎ এক গ্রাম্যলোক তাঁর পাশ দিয়ে অতিক্রম করল। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, 'তুমি কি অমুকের ছেলে অমুক?' সে বলল, 'হ্যাঁ।' তখন ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে নিজের গাধাটি দিয়ে বললেন, 'এটাতে আরোহণ করো, মাথায় এই পাগড়িটা বাঁধো।'
একসাথি তাঁকে বলল, 'আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন, আপনি এই গ্রাম্যলোকটাকে নিজের আরোহণ করার গাধাটাও দিলেন এবং আপনার মাথার পাগড়িটাও দিয়ে দিলেন!' তিনি বললেন, 'আমি রাসুল সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি-
ইননা মিন আবররিল বিররি সিলাতার রাজুলি আহলা উদ্দি আবিহি বা’দা আন ইউওয়াল্লিয়া ওয়া ইন্না আবাহু কানা সাদিকান লি-উমার। নিশ্চয় বড় নেককাজ হলো, পিতার মৃত্যুর পর পিতার ভালোবাসার মানুষের সাথে সম্পর্ক জুড়ে রাখা। আর এই লোকটির পিতা ছিল উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর বন্ধু।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুও নিজের মায়ের সাথে সর্বাধিক সদাচারী ছিলেন। এসব কারণেই কবিগণ তাদের পিতা-মাতার জন্য বেশি কাঁদতেন, যাতে স্বীয় পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ এবং তাদের প্রতি ইহসান করা হয়। যারা তাদের পিতা-মাতার জন্য ব্যথিত হয়েছেন এবং কেঁদেছেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে অগ্রগামী হলেন কবি উমর বাহাউদ্দিন আল-উমায়রি।
আল্লাহ তাআলা পিতা-মাতার সাথে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন; যদিও তারা মুশরিক হয়। কুরআন কারিমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
ওয়া ওয়াসসাউয়াইনাল ইনসানা বিওয়ালিদাইহি হুসনা ওয়া ইন জাহাদাকা লিতুশরিকাবি মা লাইসা লাকা বিহি ইলমুন ফালা তুতি’হুমা ইলাইয়া মারজিউকুম ফাউয়ুনাব্বিউকুম বিমা কুনতুম তা’মালুন। 'আমি মানুষকে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার জোর নির্দেশ দিয়েছি। যদি তারা তোমাকে আমার সাথে এমন কিছু শরিক করার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালায়, যার সম্পর্কে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তবে তাদের আনুগত্য কোরো না। আমারই দিকে তোমাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর আমি তোমাদের বলে দেব, যা কিছু তোমরা করতে।' [সুরা আনকাবুত : ৮]
এই আয়াতের তাফসিরে ইমাম কুরতুবি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, 'আয়াতটি সাআদ বিন আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে।' ইমাম তিরমিজি রহমাতুল্লাহি আলাইহি সাআদ বিন আবি ওয়াক্কাস থেকে এভাবে উদ্ধৃত করেছেন; সাআদ বলেন, আমার ব্যাপারে চারটি আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। তারপর একটি ঘটনা বলেছেন, তা হলো, উম্মে সাআদ বললেন, 'আল্লাহ তাআলা কি মা-বাবার সঙ্গে সদাচারের নির্দেশ দেননি? আল্লাহর শপথ, আমি খানা খাব না, পানীয় পান করব না, এমনকি মারা যাব অথবা তুমি কাফির হয়ে যাবে।' সাআদ বলেন, 'যখনই পরিবারের সদস্যরা তাকে খানা খাওয়াতে চাইত, (কসমের দরুণ মুখ না খোলার কারণে) তার মুখ ফাঁক করে ধরত।'
সাআদ বলেছেন, আমি আমার মায়ের সাথে সদাচারী ছিলাম। অতঃপর আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম। মা বললেন, তুমি ইসলাম ত্যাগ না করলে আমি মরে যাব; তবুও কিছু খাব না ও পান করব না। তখন তোমাকে দোষী সাব্যস্ত করে তিরস্কার করা হবে এবং বলা হবে, 'হে মাকে হত্যাকারী!' এভাবেই দিন কাটতে লাগল। মা পানাহার করছিল না। আমি মাকে বললাম, 'মা, যদি তোমার শত প্রাণ থাকত আর একের পর এক সমস্ত প্রাণ বের হয়ে যেত; তবুও আমি ইসলাম ত্যাগ করতাম না। তুমি চাইলে খাও, না চাইলে না খাও!' মা আমার এমন প্রত্যয় দেখে খানা খেতে লাগল।'
সুতরাং, মনে রাখতে হবে, আল্লাহর অবাধ্যতা করে পিতা-মাতার আনুগত্য করা যাবে না। হাসান বসরি বলেন, যদি তার মা তাকে মমতাবশত এশার নামাজ জামাআতে পড়তে নিষেধ করত, তিনি মায়ের কথা মেনে নিতেন না।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন- ওয়া ওয়াসসাউয়াইনাল ইনসানা বিওয়ালিদাইহি হামালাতহু উম্মুহু ওয়াহনান আলা ওয়াহনিন ওয়া ফিসালুহু ফি আমাইনি আনিশ কুরলি ওয়া লিওয়ালিদাইকা ইলাইয়াল মাসির - ওয়া ইন জাহাদাকা আলা আন তুশরিকা বি মা লাইসা লাকা বিহি ইলমুন ফালা তুতি’হুমা ওয়া সাহিবহুমা ফিদদুনইয়া মা’রুফা। 'আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মাতা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। তার দুধ ছাড়ানো দু-বছরে হয়। নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। অবশেষে আমারই নিকট ফিরে আসতে হবে। পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন বিষয়কে শরিক স্থির করতে পীড়াপীড়ি করে, যার জ্ঞান তোমার নেই; তবে তুমি তাদের কথা মানবে না এবং দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাবে সহাবস্থান করবে।' [সুরা লুকমান: ১৪-১৫]
অতএব, পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের বিষয়ে ভাবতে হবে; যদিও তারা মুশরিক হয়। তারা শিরকের প্রতি আহ্বান করলেও তাদের সাথে সদাচার করতে হবে। আসমা বিনতে আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় একদিন আমার মা আমার কাছে এলেন। তিনি ছিলেন মুশরিক। বিষয়টি নিয়ে আমি রাসুল সাল্লাল্লাহu আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম-
ইন্না উম্মি কদিমাত ওয়া হিয়া রগিবাতু আ-ফা-আসিলুহা কলা না’য়াম সিলি উম্মাকা। 'আমার মা আমার কাছে আসেন এবং তিনি আশা করেন যে, আমি তার সাথে ভালো আচরণ করব। এমতাবস্থায় আমি কি তাঁর সাথে সদাচার করব?' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হ্যাঁ, তোমার মায়ের সাথে সদাচার করো।
টিকাঃ
[৭] সহিহ মুসলিম: ১২/৩৭৩।
[৮] প্রাগুক্ত।
[৯] মুসলিম শরিফ: ১২/৪০১।
[১০] সহিহ বুখারি: ৩/৩১।
[১১] সহিহ বুখারি: ১১/২৬২।
একজন আলেম। তিনি কাহমাস বিন আল-হাসান আল-হানাফি আল-বসরি। ইমাম জাহাবি রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর সম্পর্কে বলেন, 'তিনি নির্ভরযোগ্য আলেমদের অন্যতম ছিলেন। মায়ের সাথে সদাচারী ছিলেন। মায়ের মৃত্যুর পর তিনি হজ করেছেন এবং আমৃত্যু মক্কায় অবস্থান করেছেন।'
মায়ের সাথে সদাচরণের প্রতিফল হিসেবে তিনি কী পেয়েছেন? বর্ণিত আছে, তিনি একবার একটি বিচ্ছু মারতে চাইলে তা গর্তে ঢুকে পড়ে। তিনি বিচ্ছুটিকে মারার জন্য গর্তে হাত ঢুকিয়ে দেন। ফলে বিচ্ছুটি তাঁকে দংশন করে। তিনি কেন গর্তে হাত ঢুকিয়েছেন, এর কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে বললেন, 'আমি আশঙ্কা করছিলাম, বিচ্ছুটি বের হয়ে আমার মাকে দংশন করবে।' তিনি মায়ের পরিবর্তে নিজেকে বিচ্ছুর দংশন খাওয়ালেন!
পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ নিশ্চয় এমন সৎকাজ, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ হয়। যেমনটি গুহায় বন্দি হওয়া তিন ব্যক্তির ঘটনায় বর্ণিত হয়েছে। ঘটনাটি সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত আছে। সেখানে বলা হয়েছে; তাদের মধ্য থেকে একজন বলল, 'হে আল্লাহ, আমার বৃদ্ধ পিতা-মাতা ছিল। আমি প্রত্যেক রাতে তাদের জন্য আমার বকরির দুধ নিয়ে আসতাম। হঠাৎ একদিন বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে যায়। এসে দেখি আমার পিতা-মাতা ঘুমিয়ে পড়েছেন। এ দিকে আমার স্ত্রী ও সন্তান ক্ষুধায় ছটফট করছে। আমার পিতা-মাতাকে তৃপ্তিসহ খাওয়ানোর পূর্বে আমি তাদের খেতে দিইনি। 'তাদের কষ্ট হবে ভেবে ঘুম থেকে তাদের জাগাতেও অস্বস্তি হচ্ছিল। আবার তাদের জন্য রেখে দিয়ে আমরা খেয়ে নেব, এটাও ভালো লাগছিল না। এভাবে তাদের জন্য অপেক্ষা করতে করতে সকাল হয়ে গেল। যদি তুমি জানো যে, এই কাজটি আমি তোমার ভয়েই করেছি, তা হলে আমাদের জন্য গর্তের মুখ খুলে দাও।' তখন পাথর কিছুটা সরে গেল এবং তারা আকাশ দেখতে পেল।
পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ এমন নেককাজ, যার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর কাছে উঁচু মর্যাদার অধিকারী হতে পারে। শুধু তাই নয়; বরং পিতা-মাতার সাথে সদাচরণকারী এমন মর্যাদায় উত্তীর্ণ হয়, সে যদি আল্লাহর নামে শপথ করে, তা হলে আল্লাহ তাআলা তাকে শপথ থেকে মুক্তি দেন। যেমন: ওয়াইস আল-কারনির ঘটনায় বর্ণিত আছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ব্যাপারে বলেছেন, 'ইয়ামেনের অন্তর্গত মুরাদ-এর কারন এলাকার কাফেলার সাথে তোমাদের কাছে ওয়াইস বিন আমের আসবে। এক দিরহাম পরিমাণ জায়গা ব্যতিরেকে তার পুরো শরীরে ধবলরোগ থাকবে। তার মা আছেন। তাঁর সাথে সে সদাচরণ করে। যদি আল্লাহর নামে শপথ করে, আল্লাহ তাকে মুক্ত করবেন। যদি সম্ভব হয়, তা হলে তার মাধ্যমে তোমার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইয়ে নিয়ো।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উক্ত কথাটি বলেছেন উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহুকে। সহিহ মুসলিমে অন্য বর্ণনায় আছে, 'সর্বশ্রেষ্ঠ তাবেয়ি লোকটির নাম ওয়াইস। তার মা আছেন। তার শরীরে ধবলরোগ আছে। তোমরা তার নিকট যেয়ো এবং তার মাধ্যমে নিজেদের গোনাহ ক্ষমা চাইয়ে নিয়ো।'
নিশ্চয় মায়ের সাথে সদাচরণ একজন ব্যক্তিকে সুউচ্চ মর্যাদায় উত্তীর্ণ করে। ইমাম বুখারি রহমাতুল্লাহি আলাইহি আনাস বিন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন, আনাসের ফুফু রুবাই বিনতে নজর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে এলেন। তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর নবি, আমাকে হারেসাহ সম্পর্কে কিছু বলবেন কি? সে বদরে তিরের আঘাতে শহিদ হয়েছে। সে যদি জান্নাতে যায়, তা হলে ধৈর্যধারণ করব। যদি জাহান্নামে যায়, তা হলে তার জন্য খুব বেশি কাঁদব।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হে উম্মে হারেসাহ, জান্নাতে অনেক বাগান রয়েছে। তোমার ছেলে হারেসাহ ফিরদাউসের সুউচ্চ মাকাম পেয়েছে।'
হারেসাহ বিন নু'মান রাদিয়াল্লাহু আনহু। তাঁকে হারেসাহ বিন সুরাকাও বলা হয়। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি রহমাতুল্লাহি আলাইহি আল-ইসাবাহ গ্রন্থে দুজনের চরিত উল্লেখ করেছেন। তবে ফাতহুল বারি-তে তিনি একজনের কথাই প্রাধান্য দিয়েছেন, বলেছেন একব্যক্তির দুটি নাম। লোকটিকে পিতা-মাতার সাথে সদাচরণই জান্নাতে পৌঁছিয়েছে।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত আছে; রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আমি জান্নাতে ঘোরাফেরা করছিলাম। হঠাৎ একজন তিলাওয়াতকারীর আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “কে সে?” ফেরেশতারা বললেন, “হারেসাহ বিন নু'মান।” রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'এভাবে তোমাদেরও পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করা উচিত।' তারপর বলেছেন, 'হারেসাহ বিন নু'মান তাঁর মায়ের সাথে সবচেয়ে বেশি সদাচরণকারী ছিল।'
হাসান বসরিকে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'পিতা-মাতার সাথে সদাচরণটা কী?' তিনি বললেন, 'নিজের সম্পদ থেকে তাদের জন্য ব্যয় করা এবং আল্লাহর অবাধ্যতা না হলে তাদের প্রতিটি কথা মেনে চলা।'
পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করার এই ফজিলতগুলোর জন্য আমাদের পূর্বসূরি আল্লাহওয়ালাগণ পিতা-মাতার সাথে সদাচরণে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর পিতার মৃত্যুর পর পিতার বন্ধুর পুত্রের সাথে সদাচরণ করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে দিনার থেকে বর্ণিত; আবদুল্লাহ ইবনে উমর মক্কার দিকে যাত্রা করলে গাধায় আরোহণ করে ধীরে ধীরে অগ্রসর হতেন। মাথায় পাগড়ি বাঁধতেন। এভাবে একদিন তিনি গাধায় চড়ে রওয়ানা হলেন। হঠাৎ এক গ্রাম্যলোক তাঁর পাশ দিয়ে অতিক্রম করল। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, 'তুমি কি অমুকের ছেলে অমুক?' সে বলল, 'হ্যাঁ।' তখন ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে নিজের গাধাটি দিয়ে বললেন, 'এটাতে আরোহণ করো, মাথায় এই পাগড়িটা বাঁধো।'
একসাথি তাঁকে বলল, 'আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন, আপনি এই গ্রাম্যলোকটাকে নিজের আরোহণ করার গাধাটাও দিলেন এবং আপনার মাথার পাগড়িটাও দিয়ে দিলেন!' তিনি বললেন, 'আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি- ‘নিশ্চয় বড় নেককাজ হলো, পিতার মৃত্যুর পর পিতার ভালোবাসার মানুষের সাথে সম্পর্ক জুড়ে রাখা। আর এই লোকটির পিতা ছিল উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর বন্ধু।’
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুও নিজের মায়ের সাথে সর্বাধিক সদাচারী ছিলেন। এসব কারণেই কবিগণ তাদের পিতা-মাতার জন্য বেশি কাঁদতেন, যাতে স্বীয় পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ এবং তাদের প্রতি ইহসান করা হয়। যারা তাদের পিতা-মাতার জন্য ব্যথিত হয়েছেন এবং কেঁদেছেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে অগ্রগামী হলেন কবি উমর বাহাউদ্দিন আল-উমায়রি।
আল্লাহ তাআলা পিতা-মাতার সাথে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন; যদিও তারা মুশরিক হয়। কুরআন কারিমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- ‘আমি মানুষকে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার জোর নির্দেশ দিয়েছি। যদি তারা তোমাকে আমার সাথে এমন কিছু শরিক করার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালায়, যার সম্পর্কে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তবে তাদের আনুগত্য কোরো না। আমারই দিকে তোমাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর আমি তোমাদের বলে দেব, যা কিছু তোমরা করতে।’ [সুরা আনকাবুত : ৮]
এই আয়াতের তাফসিরে ইমাম কুরতুবি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, 'আয়াতটি সাআদ বিন আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে।' ইমাম তিরমিজি রহমাতুল্লাহি আলাইহি সাআদ বিন আবি ওয়াক্কাস থেকে এভাবে উদ্ধৃত করেছেন; সাআদ বলেন, আমার ব্যাপারে চারটি আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। তারপর একটি ঘটনা বলেছেন, তা হলো, উম্মে সাআদ বললেন, 'আল্লাহ তাআলা কি মা-বাবার সঙ্গে সদাচারের নির্দেশ দেননি? আল্লাহর শপথ, আমি খানা খাব না, পানীয় পান করব না, এমনকি মারা যাব অথবা তুমি কাফির হয়ে যাবে।' সাআদ বলেন, 'যখনই পরিবারের সদস্যরা তাকে খানা খাওয়াতে চাইত, (কসমের দরুণ মুখ না খোলার কারণে) তার মুখ ফাঁক করে ধরত।'
সাআদ বলেছেন, আমি আমার মায়ের সাথে সদাচারী ছিলাম। অতঃপর আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম। মা বললেন, তুমি ইসলাম ত্যাগ না করলে আমি মরে যাব; তবুও কিছু খাব না ও পান করব না। তখন তোমাকে দোষী সাব্যস্ত করে তিরস্কার করা হবে এবং বলা হবে, 'হে মাকে হত্যাকারী!' এভাবেই দিন কাটতে লাগল। মা পানাহার করছিল না। আমি মাকে বললাম, 'মা, যদি তোমার শত প্রাণ থাকত আর একের পর এক সমস্ত প্রাণ বের হয়ে যেত; তবুও আমি ইসলাম ত্যাগ করতাম না। তুমি চাইলে খাও, না চাইলে না খাও!' মা আমার এমন প্রত্যয় দেখে খানা খেতে লাগল।'
সুতরাং, মনে রাখতে হবে, আল্লাহর অবাধ্যতা করে পিতা-মাতার আনুগত্য করা যাবে না। হাসান বসরি বলেন, যদি তার মা তাকে মমতাবশত এশার নামাজ জামাআতে পড়তে নিষেধ করত, তিনি মায়ের কথা মেনে নিতেন না।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন- ‘আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মাতা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। তার দুধ ছাড়ানো দু-বছরে হয়। নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। অবশেষে আমারই নিকট ফিরে আসতে হবে। পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন বিষয়কে শরিক স্থির করতে পীড়াপীড়ি করে, যার জ্ঞান তোমার নেই; তবে তুমি তাদের কথা মানবে না এবং দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাবে সহাবস্থান করবে।’ [সুরা লুকমান: ১৪-১৫]
অতএব, পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের বিষয়ে ভাবতে হবে; যদিও তারা মুশরিক হয়। তারা শিরকের প্রতি আহ্বান করলেও তাদের সাথে সদাচার করতে হবে। আসমা বিনতে আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় একদিন আমার মা আমার কাছে এলেন। তিনি ছিলেন মুশরিক। বিষয়টি নিয়ে আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম- ‘আমার মা আমার কাছে আসেন এবং তিনি আশা করেন যে, আমি তার সাথে ভালো আচরণ করব। এমতাবস্থায় আমি কি তাঁর সাথে সদাচার করব?’ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হ্যাঁ, তোমার মায়ের সাথে সদাচার করো।
টিকাঃ
৭. সহিহ মুসলিম: ১২/৩৭৩।
৮. প্রাগুক্ত।
৯. মুসলিম শরিফ: ১২/৪০১।
১০. সহিহ বুখারি: ৩/৩১।