📄 শাতিমে রাসুলের করুণ পরিণতি
দিন দিন ইসলামের প্রচার বেড়েই চলেছে। দলে দলে মানুষ ইসলামে দীক্ষিত হচ্ছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকদের নিয়ে নিজ মজলিসে বসে বিশ্ব- জগতের প্রতিপালকের একত্মবাদ বর্ণনা করছেন। বিভিন্ন গোত্রের নেতারাও ইসলাম গ্রহণ করে অবনত মস্তকে রাসুলের সামনে বসে আছেন।
একদিন আরবের একনেতা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে এলেন। সাধারণ মানুষের কাছে তার প্রবল প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল। লোকটির নাম আমের বিন তুফাইল। ইসলামের প্রচার-প্রসার দেখে সমাজের লোকেরা তাকে বলল, 'হে আমের, লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করেছে, তুমিও ইসলাম গ্রহণ করো।'
সে ছিল আমিত্বে আক্রান্ত অহংকারী মানুষ। সে বলত, 'আমি আল্লাহর কসম করে বলছি, আমি ততক্ষণ মারা যাব না, যতক্ষণ না আরবরা আমাকে তাদের রাজা বানাবে, যত দিন না তারা আমার পিছে পিছে চলবে। সুতরাং যেখানে আমার অবস্থান এমন, সেখানে আমি কীভাবে কুরাইশের ওই যুবকের অনুসরণ করতে পারি!'
কিন্তু এর কিছুদিন পর সে দেখল, ইসলাম আধিপত্য কায়েম করেছে, জনগণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সমর্থন করেছে, তখন তার কয়েকজন সাথিসহ উষ্ট্রিতে আরোহণ করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারের উদ্দেশে যাত্রা করল। সে মসজিদে প্রবেশ করল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন সাহাবিদের মাঝে বসা ছিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে দাঁড়িয়ে সে বলল, 'হে মুহাম্মদ, আমি তোমার সাথে একান্তে কথা বলতে চাই।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একান্তে কথা বলতে চাচ্ছিলেন না। তিনি বললেন, 'না, আল্লাহর শপথ, যতক্ষণ না তুমি এক আল্লাহর প্রতি ইমান আনবে, ততক্ষণ তোমার সাথে একান্তে মিলিত হব না।' আমের বিন তুফাইল আবার বলল, 'হে মুহাম্মদ, আমি তোমার সাথে একান্তে কথা বলতে চাই।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবারও তার প্রস্তাবে অস্বীকৃতি জানালেন।'
এবার সে অবিরত বলতে লাগল, 'হে মুহাম্মদ, দাঁড়াও, আমি তোমার সাথে কথা বলব। হে মুহাম্মদ, দাঁড়াও, আমি তোমার সাথে কথা বলব।' শেষপর্যন্ত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাথে কথা বলার জন্য দাঁড়ালেন। তখন আমের বিন তুফাইল ইরবিদ নামের তার একসঙ্গীকে ডেকে কানে কানে বলল, 'আমি মুহাম্মদের সঙ্গে কথা বলব। তার মুখ তোমার থেকে অন্য দিকে ফিরিয়ে রাখব, আর তখন তুমি তলোয়ার দ্বারা তাকে আঘাত করবে।' ইরবিদ তলোয়ার হাতে প্রস্তুতি গ্রহণ করল।
তারপর দুজনে একটি দেয়ালের কাছে গেল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমেরের সাথে কথা বলার জন্য উভয়ের মাঝে গিয়ে দাঁড়ালেন। ইরবিদ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আঘাত করার ইচ্ছায় তলোয়ার হাতে নিল, কিন্তু যখনই সে তলোয়ার কোষমুক্ত করতে চায়, তার হাত অবশ হয়ে যায়। শেষপর্যন্ত তলোয়ার কোষমুক্ত করতেই পারল না।
অপর দিকে আমের রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এটা-ওটা বলে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করছিল, আর ঘুরে ঘুরে এদিক-সেদিক করে ইরবিদের দিকে তাকাচ্ছিল। ইরবিদ জড়পদার্থের ন্যায় জমাট বেঁধে স্থির দাঁড়িয়ে আছে, নড়াচড়াও করতে পারছে না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরবিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'হে আমের বিন তুফাইল, ইসলাম গ্রহণ করো।'
আমের বলল, 'হে মুহাম্মদ, ইসলাম গ্রহণ করলে তুমি আমাকে কী দেবে?' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'মুসলিমরা যা পাবে, তুমিও তাই পাবে। মুসলিমদের যেই সমস্যা হবে, সেই সমস্যা তোমারও হবে।' আমের বলল, 'আমি যদি ইসলাম গ্রহণ করি, তা হলে তোমার মৃত্যুর পর কি রাজত্ব আমাকে দেবে?' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমার এবং তোমার কওমের জন্য এমন কিছু নেই।' আমের বলল, 'তা হলে আমি এই শর্তে ইসলাম গ্রহণ করতে পারি যে, আমি গ্রামের রাজা হব আর তুমি হবে শহরের রাজা।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'না।' তখন আমের রেগে গেল এবং তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। সে চিৎকার করে বলতে লাগল, 'হে মুহাম্মদ, আমি তোমার বিরুদ্ধে দ্রুতগামী ঘোড়া এবং শক্তিশালী মানুষের সমাবেশ ঘটাব। প্রতিটি খেজুরবাগানের সঙ্গে ঘোড়ার সংযোগ স্থাপন করব। তোমার বিরুদ্ধে গাতফান গোত্রের ১ হাজার স্বর্ণকেশী পুরুষ ও ১ হাজার স্বর্ণকেশী নারী নিয়ে যুদ্ধ করব।' তারপর তর্জনগর্জন করতে করতে সে বের হয়ে গেল।
তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'হে আল্লাহ, আমেরের ব্যাপারে তুমি আমার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাও এবং তার কওমকে হেদায়াত দান করো।' আমের তার সাথিদের নিয়ে মদিনা থেকে বেরিয়ে গেল। দীর্ঘ সফরে সে ছিল ক্লান্ত। মদিনার বাইরে তার গোত্রের সালুলিয়া নামের একমহিলা থাকত। ঘোড়া থেকে নেমে মহিলার তাঁবুতে সে অবস্থান করল। রাতে সেখানেই ঘুমাল। ঘুমের মধ্যেই হঠাৎ তার গলায় বড় এক ফোঁড়া উঠল। গলার ভেতর দিক থেকে তা ফুলে উঠল, যেমন উটের ঘাড়ের উপর ফোঁড়া উঠে উটকে মেরে ফেলে। সে আতঙ্কিত হয়ে ছটফট করতে লাগল। ঘোড়াকে বেদম প্রহার করে ঘোড়ার লাগাম ধরে সামনের দিকে চলতে লাগল। মারাত্মক ব্যথা তাকে অস্থির করে তুলেছিল। চিৎকার করে করে ঘাড় হাত দিয়ে মলতে মলতে বলল, 'হায়! এ তো উটের মতো বড় ফোঁড়া!' এই অবস্থাতেই ঘোড়া তাকে নিয়ে ঘুরছিল। ঘোড়ার উপরই মারা গিয়ে ঘোড়া থেকে সে মাটিতে পড়ল।
তার সাথিরা তাকে এভাবেই ফেলে রাখে। তারা নিজ গোত্রে ফিরে যায়। বাড়িতে প্রবেশ করার সময় ইরবিদকে লোকজন প্রশ্ন করল, 'হে ইরবিদ, তোমার পেছনে কী?' ইরবিদ বলল, 'কিছুই নেই তো! আল্লাহর শপথ, মুহাম্মদ আমাদের একটি বস্তুর ইবাদতের দিকে আহ্বান করেছে। এখন আমার আকাঙ্ক্ষা হলো, যদি এখন সে আমার সামনে থাকত, তা হলে আমি তাকে হত্যা করা পর্যন্ত তির নিক্ষেপ করতেই থাকতাম।'
তার এই উক্তির দু-এক দিন পর একটি উট বিক্রির জন্য সে কোথাও যাচ্ছিল। আল্লাহ তাআলা তার উপর এবং উটের উপর অগ্নিবায়ু প্রেরণ করলেন। আগুন তাদের উভয়কে জ্বালিয়ে দিলো। আল্লাহ তাআলা আমের ও ইরবিদের অবস্থা সম্পর্কে অবতীর্ণ করলেন— 'তোমাদের মধ্যে কেউ গোপনে কথা বলুক বা তা সশব্দে প্রকাশ করুক, রাতের অন্ধকারে সে আত্মগোপন করুক বা প্রকাশ্য দিবালোকে বিচরণ করুক, সবই তাঁর নিকট সমান। তাঁর পক্ষ থেকে অনুসরণকারী রয়েছে তাদের অগ্রে এবং পশ্চাতে। আল্লাহর নির্দেশে তারা ওদের হেফাজত করে। আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা ততক্ষণ পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। আল্লাহ যখন কোনো জাতির উপর বিপদ দিতে চান, তখন তা ফিরে যাবার নয় এবং তিনি ব্যতীত তাদের কোনো সাহায্যকারীও নেই। তিনিই তোমাদের বিদ্যুৎ দেখান ভয় ও আশার জন্য এবং উত্থিত করেন ঘন মেঘমালা। তাঁর প্রশংসা পাঠ করে বজ্র এবং সব ফেরেশতা, সভয়ে। তিনি বজ্রপাত করেন, অতঃপর যাকে ইচ্ছা তাকে তা দ্বারা আঘাত করেন। তথাপি তারা আল্লাহ সম্পর্কে বিতর্ক করে, অথচ তিনি মহাশক্তিশালী।' [সুরা রাদ : ১০-১৩]
দিন দিন ইসলামের প্রচার বেড়েই চলেছে। দলে দলে মানুষ ইসলামে দীক্ষিত হচ্ছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকদের নিয়ে নিজ মজলিসে বসে বিশ্ব-জগতের প্রতিপালকের একত্মবাদ বর্ণনা করছেন। বিভিন্ন গোত্রের নেতারাও ইসলাম গ্রহণ করে অবনত মস্তকে রাসুলের সামনে বসে আছেন।
একদিন আরবের একনেতা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে এলেন। সাধারণ মানুষের কাছে তার প্রবল প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল। লোকটির নাম আমের বিন তুফাইল। ইসলামের প্রচার-প্রসার দেখে সমাজের লোকেরা তাকে বলল, 'হে আমের, লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করেছে, তুমিও ইসলাম গ্রহণ করো।'
সে ছিল আমিত্বে আক্রান্ত অহংকারী মানুষ। সে বলত, 'আমি আল্লাহর কসম করে বলছি, আমি ততক্ষণ মারা যাব না, যতক্ষণ না আরবরা আমাকে তাদের রাজা বানাবে, যত দিন না তারা আমার পিছে পিছে চলবে। সুতরাং যেখানে আমার অবস্থান এমন, সেখানে আমি কীভাবে কুরাইশের ওই যুবকের অনুসরণ করতে পারি!'
কিন্তু এর কিছুদিন পর সে দেখল, ইসলাম আধিপত্য কায়েম করেছে, জনগণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সমর্থন করেছে, তখন তার কয়েকজন সাথিসহ উষ্ট্রিতে আরোহণ করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারের উদ্দেশে যাত্রা করল। সে মসজিদে প্রবেশ করল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন সাহাবিদের মাঝে বসা ছিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে দাঁড়িয়ে সে বলল, 'হে মুহাম্মদ, আমি তোমার সাথে একান্তে কথা বলতে চাই।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একান্তে কথা বলতে চাচ্ছিলেন না। তিনি বললেন, 'না, আল্লাহর শপথ, যতক্ষণ না তুমি এক আল্লাহর প্রতি ইমান আনবে, ততক্ষণ তোমার সাথে একান্তে মিলিত হব না।'
আমের বিন তুফাইল আবার বলল, 'হে মুহাম্মদ, আমি তোমার সাথে একান্তে কথা বলতে চাই।' রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবারও তার প্রস্তাবে অস্বীকৃতি জানালেন।'
এবার সে অবিরত বলতে লাগল, 'হে মুহাম্মদ, দাঁড়াও, আমি তোমার সাথে কথা বলব। হে মুহাম্মদ, দাঁড়াও, আমি তোমার সাথে কথা বলব।' শেষপর্যন্ত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাথে কথা বলার জন্য দাঁড়ালেন। তখন আমের বিন তুফাইল ইরবিদ নামের তার একসঙ্গীকে ডেকে কানে কানে বলল, 'আমি মুহাম্মদের সঙ্গে কথা বলব। তার মুখ তোমার থেকে অন্য দিকে ফিরিয়ে রাখব, আর তখন তুমি তলোয়ার দ্বারা তাকে আঘাত করবে।' ইরবিদ তলোয়ার হাতে প্রস্তুতি গ্রহণ করল।
তারপর দুজনে একটি দেয়ালের কাছে গেল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমেরের সাথে কথা বলার জন্য উভয়ের মাঝে গিয়ে দাঁড়ালেন। ইরবিদ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আঘাত করার ইচ্ছায় তলোয়ার হাতে নিল, কিন্তু যখনই সে তলোয়ার কোষমুক্ত করতে চায়, তার হাত অবশ হয়ে যায়। শেষপর্যন্ত তলোয়ার কোষমুক্ত করতেই পারল না।
অপর দিকে আমের রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এটা-ওটা বলে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করছিল, আর ঘুরে ঘুরে এদিক-সেদিক করে ইরবিদের দিকে তাকাচ্ছিল। ইরবিদ জড়পদার্থের ন্যায় জমাট বেঁধে স্থির দাঁড়িয়ে আছে, নড়াচড়াও করতে পারছে না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরবিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'হে আমের বিন তুফাইল, ইসলাম গ্রহণ করো।'
আমের বলল, 'হে মুহাম্মদ, ইসলাম গ্রহণ করলে তুমি আমাকে কী দেবে?'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'মুসলিমরা যা পাবে, তুমিও তাই পাবে। মুসলিমদের যেই সমস্যা হবে, সেই সমস্যা তোমারও হবে।'
আমের বলল, 'আমি যদি ইসলাম গ্রহণ করি, তা হলে তোমার মৃত্যুর পর কি রাজত্ব আমাকে দেবে?'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমার এবং তোমার কওমের জন্য এমন কিছু নেই।'
আমের বলল, 'তা হলে আমি এই শর্তে ইসলাম গ্রহণ করতে পারি যে, আমি গ্রামের রাজা হব আর তুমি হবে শহরের রাজা।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'না।'
তখন আমের রেগে গেল এবং তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। সে চিৎকার করে বলতে লাগল, 'হে মুহাম্মদ, আমি তোমার বিরুদ্ধে দ্রুতগামী ঘোড়া এবং শক্তিশালী মানুষের সমাবেশ ঘটাব। প্রতিটি খেজুরবাগানের সঙ্গে ঘোড়ার সংযোগ স্থাপন করব। তোমার বিরুদ্ধে গাতফান গোত্রের ১ হাজার স্বর্ণকেশী পুরুষ ও ১ হাজার স্বর্ণকেশী নারী নিয়ে যুদ্ধ করব।' তারপর তর্জনগর্জন করতে করতে সে বের হয়ে গেল।
তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'হে আল্লাহ, আমেরের ব্যাপারে তুমি আমার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাও এবং তার কওমকে হেদায়াত দান করো।'
আমের তার সাথিদের নিয়ে মদিনা থেকে বেরিয়ে গেল। দীর্ঘ সফরে সে ছিল ক্লান্ত। মদিনার বাইরে তার গোত্রের সালুলিয়া নামের একমহিলা থাকত। ঘোড়া থেকে নেমে মহিলার তাঁবুতে সে অবস্থান করল। রাতে সেখানেই ঘুমাল। ঘুমের মধ্যেই হঠাৎ তার গলায় বড় এক ফোঁড়া উঠল। গলার ভেতর দিক থেকে তা ফুলে উঠল, যেমন উটের ঘাড়ের উপর ফোঁড়া উঠে উটকে মেরে ফেলে। সে আতঙ্কিত হয়ে ছটফট করতে লাগল। ঘোড়াকে বেদম প্রহার করে ঘোড়ার লাগাম ধরে সামনের দিকে চলতে লাগল। মারাত্মক ব্যথা তাকে অস্থির করে তুলেছিল। চিৎকার করে করে ঘাড় হাত দিয়ে মলতে মলতে বলল, 'হায়! এ তো উটের মতো বড় ফোঁড়া!' এই অবস্থাতেই ঘোড়া তাকে নিয়ে ঘুরছিল। ঘোড়ার উপরই মারা গিয়ে ঘোড়া থেকে সে মাটিতে পড়ল।
তার সাথিরা তাকে এভাবেই ফেলে রাখে। তারা নিজ গোত্রে ফিরে যায়। বাড়িতে প্রবেশ করার সময় ইরবিদকে লোকজন প্রশ্ন করল, 'হে ইরবিদ, তোমার পেছনে কী?'
ইরবিদ বলল, 'কিছুই নেই তো! আল্লাহর শপথ, মুহাম্মদ আমাদের একটি বস্তুর ইবাদতের দিকে আহ্বান করেছে। এখন আমার আকাঙ্ক্ষা হলো, যদি এখন সে আমার সামনে থাকত, তা হলে আমি তাকে হত্যা করা পর্যন্ত তির নিক্ষেপ করতেই থাকতাম।'
তার এই উক্তির দু-এক দিন পর একটি উট বিক্রির জন্য সে কোথাও যাচ্ছিল। আল্লাহ তাআলা তার উপর এবং উটের উপর অগ্নিবায়ু প্রেরণ করলেন। আগুন তাদের উভয়কে জ্বালিয়ে দিলো।
আল্লাহ তাআলা আমের ও ইরবিদের অবস্থা সম্পর্কে অবতীর্ণ করলেন- ‘তোমাদের মধ্যে কেউ গোপনে কথা বলুক বা তা সশব্দে প্রকাশ করুক, রাতের অন্ধকারে সে আত্মগোপন করুক বা প্রকাশ্য দিবালোকে বিচরণ করুক, সবই তাঁর নিকট সমান। তাঁর পক্ষ থেকে অনুসরণকারী রয়েছে তাদের অগ্রে এবং পশ্চাতে। আল্লাহর নির্দেশে তারা ওদের হেফাজত করে। আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা ততক্ষণ পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। আল্লাহ যখন কোনো জাতির উপর বিপদ দিতে চান, তখন তা ফিরে হবার নয় এবং তিনি ব্যতীত তাদের কোনো সাহায্যকারীও নেই। তিনিই তোমাদের বিদ্যুৎ দেখান ভয় ও আশার জন্য এবং উত্থিত করেন ঘন মেঘমালা। তাঁর প্রশংসা পাঠ করে বজ্র এবং সব ফেরেশতা, সভয়ে। তিনি বজ্রপাত করেন, অতঃপর যাকে ইচ্ছা তাকে তা দ্বারা আঘাত করেন। তথাপি তারা আল্লাহ সম্পর্কে বিতর্ক করে, অথচ তিনি মহাশক্তিশালী।' [সুরা রাদ : ১০-১৩]
📄 মুশরিকদের সাক্ষ্য
মক্কা বিজয়ের পূর্বের ঘটনা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমরা পালন করার উদ্দেশ্যে মক্কার দিকে যাত্রা করলেন। যখন তিনি হারাম শরিফে পৌঁছুলেন, তখন কুরাইশরা তাঁকে মসজিদে হারাম থেকে ফিরিয়ে দিতে দূত হিসেবে উরওয়া ইবনে মাসউদকে পাঠাল। সে এসে দেখল, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বসে আছেন। আর সাহাবিগণ তাঁর চারপাশে জড়ো হয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে কথা শুনছেন। কথার মাঝে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখনই থুথু ফেলছিলেন, তখন তা কোনো সাহাবির হাতে পড়ছিল। সাহাবিগণ সে পবিত্র থুথু-মোবারক সুগন্ধি হিসেবে নিজেদের শরীর ও চেহারায় মেখে নিচ্ছিলেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিগণকে যখন কোনো নির্দেশ দিতেন, তা পালনে সাহাবিগণ প্রতিযোগিতা শুরু করতেন। যখন তিনি অজু করতেন, অজুর পানি আনার জন্য সাহাবিদের মাঝে হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যেত। যখন তিনি কথা বলতেন, সম্মানের আতিশয্যে নবিজির দিকে চোখ তুলে তাঁরা তাকাতেন না। উরওয়া যখন বিষয়টি প্রত্যক্ষ করল, তখন সে সাথিদের কাছে ফিরে গিয়ে বলল, 'হে আমার কওম, আল্লাহর শপথ, আমি অনেক প্রতাপশালী বাদশাহর দরবারে গিয়েছি, কিসরা, কায়সার এবং নাজাশির দরবারে গিয়েছি, কিন্তু কোনো বাদশাহকে তার সঙ্গীগণ এত বেশি সম্মান করতে দেখিনি; যতটা সম্মান মুহাম্মদকে তাঁর সাথি ও অনুসারীরা করে থাকে। তারা মুহাম্মদকে এতটা ভালোবাসে যে, তাদের প্রতিটি কাজেকর্মে তা স্পষ্ট ফুটে ওঠে।
একদিন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাজির হয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আমার কাছে শুধু আমার সম্পদ ও সন্তানের চেয়ে অধিক প্রিয় নন; আপনার প্রতি কিতাব অবতীর্ণকারী আল্লাহর শপথ, বরং আপনি আমার কাছে আমার প্রাণের চেয়েও অধিক প্রিয়।'
একলোক নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, কিয়ামত কখন হবে?' নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তুমি কিয়ামতের জন্য কী প্রস্তুতি গ্রহণ করেছ?' লোকটি বলল, 'আমি কিয়ামতের প্রস্তুতি হিসেবে খুব বেশি নামাজ, রোজা এবং প্রচুর পরিমাণ দান-সদকা করিনি ঠিক, তবে আমি আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলকে অনেক ভালোবাসি।' তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- أَنْتَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ। তুমি যাকে ভালোবাসো তার সাথেই থাকবে।
সাহাবিগণ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ কথা, 'তুমি যাকে ভালোবাসো তার সাথেই থাকবে' শুনে এতটাই খুশি হয়েছেন যে, এমন খুশি আর কখনো হননি। তাঁরা যখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে চলতেন, সূর্যের তাপ থেকে ছায়া দিয়ে চলতেন; যেন রাসুলের গায়ে সূর্যের তাপ না লাগে। যখন তাঁর সাথে সফর করতেন, নবিজিকে ছায়াদার বৃক্ষের ছায়ায় বসাতেন, যেন তিনি আরাম করতে পারেন। তাঁরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কতই-না ভালোবেসেছেন!
কিন্তু ভাবার বিষয় হলো, সাহাবিগণের হৃদয়ে নবিজির প্রতি এত ভালোবাসা, সম্মান-মর্যাদা, অনুসরণ-অনুকরণ, সীমাহীন ভক্তি থাকা সত্ত্বেও তাঁকে তাঁর অবস্থান থেকে উপরে উঠাননি, অথবা মানবীয় গুণের ঊর্ধ্বে মনে করেননি। তাঁরা বিশ্বাস করতেন ও বলতেন, 'মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ—তিনি আল্লাহর নবি ও রাসুল এবং তাঁরই বান্দা।' তবে হ্যাঁ, তিনি আদমসন্তানের সর্দার। হাশরের মাঠে সুপারিশকারী; কিন্তু তিনি তেমনই, যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন— 'বলুন, আমি কেবল তোমাদের মতো একজন মানুষ। আমার কাছে অহি পাঠানো হয় যে, তোমাদের উপাস্য কেবল একক উপাস্য। অতএব, তোমরা তাঁর পথে দৃঢ়ভাবে অটল থাকো এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চাও, আর মুশরিকদের জন্য রয়েছে ধ্বংস।' [সুরা ফুসসিলাত : ৬]
সুতরাং তাঁর মানব হওয়াটা তাঁর সম্মানকে হ্রাস করবে না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর প্রতিপালকের রিসালাত পূর্ণরূপে পৌঁছে দিয়েছেন। সীমাহীন কষ্ট সহ্য করেছেন। এমনকি আল্লাহ তাআলা তাঁকে সাহায্য করেছেন এবং তাঁর দ্বীন পূর্ণ করেছেন।
অতএব, উম্মতের উপর রাসুলের হক কী? সেটা কি তার প্রশংসায় অতিরঞ্জন করা? না, কখনো না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন গর্হিত কাজ থেকে বারণ করেছেন। যেমন: সহিহ বুখারি ও মুসলিম-এ বর্ণিত আছে— 'আমাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি কোরো না; যেমন খ্রিষ্টানরা মরিয়ম-তনয় (ঈসা আ.)-কে নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে। আমি তো কেবল আল্লাহর বান্দা। অতএব, তোমরা বলো, মুহাম্মদ আল্লাহর বান্দা ও রাসুল।' [১]
উম্মতের উপর নবিজির হক কি তাঁকে নিয়ে মিলাদ মাহফিল করা? নাকি ইসরা-মিরাজ উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁর হক রয়েছে? না, কখনো না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন কাজ থেকেও বারণ করেছেন। যেমন: সহিহ বুখারি ও মুসলিম-এ বর্ণিত আছে— 'যে ব্যক্তি (শরিয়তের নামে) এমন কোনো কাজ করল, যা আমার বিধিসম্মত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত। [২]
উম্মতের উপর নবিজির হক কি বিপদে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে সাহায্য চাওয়া? নাকি গাইরুল্লাহকে ডাকার মাঝে রাসুলের অধিকার নিহিত আছে? নাকি তাঁর কবর তাওয়াফ করার মাঝে এবং গাইরুল্লাহর নামে শপথ করার মাঝে? না, না, না, কখনো না; এর সবই আল্লাহর সঙ্গে শিরক।
টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: ১১/২৬২।
২. সহিহ বুখারি: ২২/৩৩২; সহিহ মুসলিম: ৯/১১৯।
মক্কা বিজয়ের পূর্বের ঘটনা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমরা পালন করার উদ্দেশ্যে মক্কার দিকে যাত্রা করলেন। যখন তিনি হারাম শরিফে পৌঁছুলেন, তখন কুরাইশরা তাঁকে মসজিদে হারাম থেকে ফিরিয়ে দিতে দূত হিসেবে উরওয়া ইবনে মাসউদকে পাঠাল। সে এসে দেখল, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বসে আছেন। আর সাহাবিগণ তাঁর চারপাশে জড়ো হয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে কথা শুনছেন। কথার মাঝে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখনই থুথু ফেলছিলেন, তখন তা কোনো সাহাবির হাতে পড়ছিল। সাহাবিগণ সে পবিত্র থুথু-মোবারক সুগন্ধি হিসেবে নিজেদের শরীর ও চেহারায় মেখে নিচ্ছিলেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিগণকে যখন কোনো নির্দেশ দিতেন, তা পালনে সাহাবিগণ প্রতিযোগিতা শুরু করতেন। যখন তিনি অজু করতেন, অজুর পানি আনার জন্য সাহাবিদের মাঝে হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যেত। যখন তিনি কথা বলতেন, সম্মানের আতিশয্যে নবিজির দিকে চোখ তুলে তাঁরা তাকাতেন না।
উরওয়া যখন বিষয়টি প্রত্যক্ষ করল, তখন সে সাথিদের কাছে ফিরে গিয়ে বলল, 'হে আমার কওম, আল্লাহর শপথ, আমি অনেক প্রতাপশালী বাদশাহর দরবারে গিয়েছি, কিসরা, কায়সার এবং নাজাশির দরবারে গিয়েছি, কিন্তু কোনো বাদশাহকে তার সঙ্গীগণ এত বেশি সম্মান করতে দেখিনি; যতটা সম্মান মুহাম্মদকে তাঁর সাথি ও অনুসারীরা করে থাকে। তারা মুহাম্মদকে এতটা ভালোবাসে যে, তাদের প্রতিটি কাজেকর্মে তা স্পষ্ট ফুটে ওঠে।
একদিন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাজির হয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আমার কাছে শুধু আমার সম্পদ ও সন্তানের চেয়ে অধিক প্রিয় নন; আপনার প্রতি কিতাব অবতীর্ণকারী আল্লাহর শপথ, বরং আপনি আমার কাছে আমার প্রাণের চেয়েও অধিক প্রিয়।'
একলোক নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসুল, কিয়ামত কখন হবে?'
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তুমি কিয়ামতের জন্য কী প্রস্তুতি গ্রহণ করেছ?'
লোকটি বলল, 'আমি কিয়ামতের প্রস্তুতি হিসেবে খুব বেশি নামাজ, রোজা এবং প্রচুর পরিমাণ দান-সদকা করিনি ঠিক, তবে আমি আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলকে অনেক ভালোবাসি।'
তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- أَنْتَ مَعَ مَنْ أَحْبَبْتَ. তুমি যাকে ভালোবাসো তার সাথেই থাকবে।
সাহাবিগণ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ কথা, 'তুমি যাকে ভালোবাসো তার সাথেই থাকবে' শুনে এতটাই খুশি হয়েছেন যে, এমন খুশি আর কখনো হননি। তাঁরা যখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে চলতেন, সূর্যের তাপ থেকে ছায়া দিয়ে চলতেন; যেন রাসুলের গায়ে সূর্যের তাপ না লাগে। যখন তাঁর সাথে সফর করতেন, নবিজিকে ছায়াদার বৃক্ষের ছায়ায় বসাতেন, যেন তিনি আরাম করতে পারেন। তাঁরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কতই-না ভালোবেসেছেন!
কিন্তু ভাবার বিষয় হলো, সাহাবিগণের হৃদয়ে নবিজির প্রতি এত ভালোবাসা, সম্মান-মর্যাদা, অনুসরণ-অনুকরণ, সীমাহীন ভক্তি থাকা সত্ত্বেও তাঁকে তাঁর অবস্থান থেকে উপরে উঠাননি, অথবা মানবীয় গুণের ঊর্ধ্বে মনে করেননি। তাঁরা বিশ্বাস করতেন ও বলতেন, 'মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ—তিনি আল্লাহর নবি ও রাসুল এবং তাঁরই বান্দা।'
তবে হ্যাঁ, তিনি আদমসন্তানের সর্দার। হাশরের মাঠে সুপারিশকারী; কিন্তু তিনি তেমনই, যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন— ‘বলুন, আমি কেবল তোমাদের মতো একজন মানুষ। আমার কাছে অহি পাঠানো হয় যে, তোমাদের উপাস্য কেবল একক উপাস্য। অতএব, তোমরা তাঁর পথে দৃঢ়ভাবে অটল থাকো এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চাও, আর মুশরিকদের জন্য রয়েছে ধ্বংস।’ [সুরা ফুসসিলাত : ৬]
সুতরাং তাঁর মানব হওয়াটা তাঁর সম্মানকে হ্রাস করবে না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর প্রতিপালকের রিসালাত পূর্ণরূপে পৌঁছে দিয়েছেন। সীমাহীন কষ্ট সহ্য করেছেন। এমনকি আল্লাহ তাআলা তাঁকে সাহায্য করেছেন এবং তাঁর দ্বীন পূর্ণ করেছেন।
অতএব, উম্মতের উপর রাসুলের হক কী? সেটা কি তার প্রশংসায় অতিরঞ্জন করা? না, কখনো না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন গর্হিত কাজ থেকে বারণ করেছেন। যেমন: সহিহ বুখারি ও মুসলিম-এ বর্ণিত আছে- لا تُظْرُونِي كَمَا أَطْرَتْ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ فَقُولُوا عَبْدُ اللهِ وَرَسُولُهُ . আমাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি কোরো না; যেমন খ্রিষ্টানরা মরিয়ম-তনয় (ঈসা আ.)-কে নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে। আমি তো কেবল আল্লাহর বান্দা। অতএব, তোমরা বলো, মুহাম্মদ আল্লাহর বান্দা ও রাসুল।
উম্মতের উপর নবিজির হক কি তাঁকে নিয়ে মিলাদ মাহফিল করা? নাকি ইসরা-মিরাজ উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁর হক রয়েছে? না, কখনো না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন কাজ থেকেও বারণ করেছেন। যেমন: সহিহ বুখারি ও মুসলিম-এ বর্ণিত আছে- مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْসَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدُّ . 'যে ব্যক্তি (শরিয়তের নামে) এমন কোনো কাজ করল, যা আমার বিধিসম্মত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।
উম্মতের উপর নবিজির হক কি বিপদে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে সাহায্য চাওয়া? নাকি গাইরুল্লাহকে ডাকার মাঝে রাসুলের অধিকার নিহিত আছে? নাকি তাঁর কবর তাওয়াফ করার মাঝে এবং গাইরুল্লাহর নামে শপথ করার মাঝে? না, না, না, কখনো না; এর সবই আল্লাহর সঙ্গে শিরক।
টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: ১১/২৬২।
২. সহিহ বুখারি: ২২/৩৩২; সহিহ মুসলিম: ৯/১১৯।
📄 উমাইয়া বিন খালফের মৃত্যু
মুসা বিন উকবা তার মাগাজিতে বর্ণনা করেছেন, জাহেলি যুগে সাআদ বিন মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং উমাইয়া বিন খালফের মাঝে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক ছিল। সেই সূত্রে উমাইয়া বিন খালফ যখন সিরিয়া সফরের ইচ্ছা করত, তখন মক্কার উত্তরাঞ্চল হয়ে যাত্রা করে মদিনায় গিয়ে বিশ্রামের জন্য সাআদ বিন মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহুর বাড়িতে দু-এক দিন অবস্থান করত। যাত্রাবিরতির পর আবার সিরিয়ার দিকে রওয়ানা হতো। এরপর যখন সিরিয়া থেকে দক্ষিণাঞ্চল হয়ে ফিরত, তখনও মদিনায় এসে তার বন্ধুর বাড়িতে বিশ্রামের জন্য দু-এক দিন অবস্থান করে মক্কার দিকে যাত্রা করত।
সাআদ বিন মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজেও এমনটি করতেন। যখন ইয়ামেন যেতেন বা কোনো প্রয়োজনে মক্কায় যেতেন, উমাইয়া বিন খালফের বাড়িতে মেহমান হতেন। দু-এক দিন বিশ্রাম করে গন্তব্যের পথে যাত্রা করতেন। ইতোপূর্বে মুসলিম ও কুরাইশদের মাঝে কোনো যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাত্র কিছুদিন হলো মদিনায় হিজরত করেছেন।
হঠাৎ একদিন সাআদ বিন মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহু কোনো প্রয়োজনে মক্কায় গেলেন। সেখানে বন্ধু উমাইয়া বিন খালফের বাড়িতে মেহমান হলেন। সাআদ উমাইয়াকে বললেন, 'একটু নিরিবিলি সময়ের প্রতি লক্ষ রেখো, আমি কাবাঘর তাওয়াফ করার ইচ্ছে করেছি।'
উমাইয়া বলল, 'ঠিক আছে, আমি দুপুরে রোদের প্রখরতা কমে এলে তোমাকে নিয়ে যাব। সাধারণত এ সময় লোকজন বাড়িতে অবস্থান করে। আমি আর তুমি বের হব। তুমি তাওয়াফ করবে। এতে ভীড়ের মাঝেও পড়তে হবে না, আবার পথে আমাদের কেউ দেখতেও পাবে না। এতে অহেতুক ঝামেলা এড়ানো যাবে।
যখন দুপুর হলো, উমাইয়া বিন খালফ তার সাথির হাত ধরে বের হলো। রাস্তায় তাদের সাথে কোনো দাসদাসীরও সাক্ষাৎ হয়নি, দুর্বল কোনো মানুষের সাথেও দেখা হয়নি। কিন্তু কাফেরদের নেতা, এই উম্মাহর ফেরাউন আবু জাহেলের সঙ্গে হঠাৎ সাক্ষাৎ।
আবু জাহেল উমাইয়াকে জিজ্ঞাসা করল, 'উনি কে?' উমাইয়া বলল, 'আমার ইয়াসরিবি ভাই।' [৩] আবু জাহেল জিজ্ঞাসা করল, 'ইয়াসরিব থেকে এসেছে?' উমাইয়া বলল, 'হ্যাঁ।'
তখন আবু জাহেল রেগে সাআদ বিন মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলল, 'তোমরা মুহাম্মদ এবং তার সাথের বিধর্মীদের [৪] আশ্রয় দিয়েছ। তারপর আবার নিরাপদে কাবাঘর তাওয়াফ করতে এসেছ! আল্লাহর শপথ, যদি তুমি আবু সাফওয়ানের সাথে না থাকতে, তা হলে নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারতে না।' [৫]
আবু জাহেলের কথা শুনে সাআদ বিন মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহুও রেগে গেলেন। তিনি এই ধরনের অভদ্রতা দেখে সহ্য করার মতো নেতা ছিলেন না। তিনি তো মদিনার নিজ কওমের নেতাদের অন্যতম ছিলেন। তিনি অগ্নিশর্মা হয়ে বললেন, 'হে আবু জাহেল, তুই যদি আমাকে এই পবিত্র কাজ 'তাওয়াফ' থেকে বাধা দিস, তা হলে আমি তোকে আরও প্রিয় কাজ থেকে বাধা দেব।' আবু জাহেল বলল, 'তুমি আমাকে কোন্ কাজ থেকে বাধা দেবে? তোমাদের মদিনায় কি কাবা আছে যে, সেখানে আমাকে বাধা দেবে?' সাআদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তোকে সিরিয়ার পথে চলতে বাধা দেব।' আবু জাহেল রেগে বলল, 'আল্লাহর কসম, তুমি পারবে না।' সাআদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'অবশ্যই পারব।'
দুজনের মাঝে বিতর্ক চলতে থাকল। ওদিকে উমাইয়া বিন খালফ অসহায়ের মতো একবার ডানে তাকিয়ে দেখে মদিনার নেতা সাআদ বিন মুআজ; আবার বামে তাকিয়ে দেখে মক্কার নেতা আবু জাহেল। সে বুঝতে পারছিল না, কার পক্ষ নেবে! একপর্যায়ে তার মন আবু জাহেলের দিকে আকৃষ্ট হলো। সাআদ বিন মুআজের দিকে লক্ষ্য করে উমাইয়া বলল, 'সাআদ, আবুল হিকামের [৬] উপর জোরে কথা বোলো না। সে এই এলাকার নেতা।'
সাআদ বিন মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহু বিতর্ক বন্ধ করে উমাইয়াকে সম্বোধন করে বললেন, 'উমাইয়া, আমাকে ছেড়ে দাও! আল্লাহর শপথ, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে শুনেছি, আমরা তোমাকে হত্যা করব।' উমাইয়া বলল, 'হা-হা-হা! মুহাম্মদ তোমাদের বলেছে, তোমরা আমাকে হত্যা করবে?' সাআদ বললেন, 'হ্যাঁ।'
উমাইয়া বলল, 'আল্লাহর কসম, মুহাম্মদ কখনো মিথ্যা বলে না; কিন্তু এবার তোমাদের মিথ্যা বলেছে। আচ্ছা বলো তো, তোমরা আমাকে কোথায় হত্যা করবে, মক্কায় নাকি অন্য কোথাও?' সাআদ বিন মুআজ বললেন, 'আমি জানি না, মক্কায় নাকি অন্য কোথাও! তবে কথা হলো, তুমি নিহত হবে এবং তা হবে মুসলমানদের হাতেই।'
উমাইয়া বিন খালফ বিতর্ক ছেড়ে চলে গেল এবং মনে মনে বলতে লাগল, মুহাম্মদ কখনো মিথ্যা বলে না। স্ত্রীর সামনে গিয়ে বলল, 'হে উম্মে সাফওয়ান,' স্ত্রী বলল, 'হ্যাঁ, বলুন।' উমাইয়া বলল, 'তুমি কি জানো, ইয়াসরিবি ভাই আমাকে কী বলেছে?' স্ত্রী বলল, 'সে কী বলেছে?' উমাইয়া বলল, 'সে বিশ্বাস করে, মুহাম্মদ নাকি সংবাদ দিয়েছে যে, তারা আমাকে হত্যা করবে।'
স্ত্রী বলল, 'আল্লাহর কসম, মুহাম্মদ মিথ্যা বলে না, কিন্তু কোথায় হত্যা করবে, মক্কায় নাকি অন্য কোথাও?' উমাইয়া বলল, 'আল্লাহর কসম, আমি জানি না, কিন্তু তোমাকে ছেড়ে আমি কখনো মক্কা থেকে বের হব না। মক্কায় পাহারা-নিরাপত্তা রয়েছে। এখানে আমার দাসদসী আছে, আমার কওম আছে, আমি কখনো মক্কা থেকে বের হব না।'
সুতরাং এভাবে কিছুদিন চলল। একসময় কুরাইশের একটি কাফেলা যাত্রা করল এবং মদিনার নিকটবর্তী পথ ধরে চলতে লাগল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের পাকড়াও করার জন্য বের হলেন। তখন আবু সুফিয়ান মক্কায় দূত পাঠাল, যেন তাদের সাহায্যে ও যুদ্ধ করার জন্য, কাফেলাকে বাঁচানোর স্বার্থে মক্কাবাসী বের হয়ে আসে। সংবাদ পাওয়া-মাত্র আবু জাহেল মানুষের মাঝে ঘুরে ঘুরে বলতে লাগল, 'হে লোকসকল, তোমাদের কাফেলার উদ্দেশে বের হও এবং তাদের রক্ষা করো।'
এই ঘোষণা শুনে প্রতিটি মানুষ যুদ্ধযাত্রার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করেছে; কেবল একজন ছাড়া। সে হলো, উমাইয়া বিন খালফ। সে ছায়ায় বসে আছে। আবু জাহেল তার পাশ দিয়ে যাচ্ছে-আসছে। লোকজন প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। উমাইয়া বিন খালফ কাবার ছায়ায় উপবিষ্ট। আবু জাহেল এক-দুবার এল-গেল, উমাইয়া বসেই আছে। একসময় আবু জাহেল তার কাছে গিয়ে বলল, 'হে উমাইয়া, হে আবু সাফওয়ান, এসো, প্রস্তুত হও।'
উমাইয়া বলল, 'আমি না-যাওয়ার ইচ্ছে করেছি।' আবু জাহেল বলল, 'আশ্চর্য! তুমি কী বলছ এটা! তুমি বসে গেলে সবাই বসে যাবে। তুমি অন্য সবার মতো নও। তুমি তো কওমের অন্যতম নেতা।'
উমাইয়া বলল, 'তোমার কি মনে আছে, ইয়াসরিবি ভাই কী বলেছিল?' আবু জাহেল বলল, 'হে আবু সাফওয়ান, আমাদের সাথে চলো। তুমি তো দেখছি এখন পুরো সেনাদলকেই বিভ্রান্ত করবে!' উমাইয়া বলল, 'আমি মক্কা থেকে এক পা-ও নড়ব না।'
আবু জাহেল কাফের ও পথভ্রষ্ট; তবে সে প্রচণ্ড ধী-শক্তির অধিকারী ছিল। আবু জাহেল চলে গেল এবং একটি ধুনুচি এনে তাতে আগুন রাখল। এরপর তাতে ধুপসলার টুকরো দিলো। তারপর উমাইয়ার কাছে গেল। উমাইয়া তখন নিজ কওমের সাথে বসা ছিল। উমাইয়াকে লক্ষ করে আবু জাহেল বলল, 'ধরো, সুগন্ধি মাখো! তুমি তো পুরুষ নও, নারী!' উমাইয়া বলে উঠল, 'কী বললে? আমি নারী!' আবু জাহেল বলল, 'হ্যাঁ, যদি তুমি পুরুষ হতে, তা হলে পুরুষের সাথে যুদ্ধ করতে সম্মত হতে। তুমি অন্দরমহলের নারীদের সাথে বসে থাকো, আমরা যুদ্ধে যাচ্ছি।'
উমাইয়া ক্ষিপ্ত হয়ে ধুনুচি ছুড়ে ফেলে বাড়ির দিকে গেল। স্ত্রীকে বলল, 'হে উম্মে সাফওয়ান, সামানা তৈরি করে দাও।' স্ত্রী বলল, 'কীসের জন্য সামানা তৈরি করব?' উমাইয়া বলল, 'সৈন্যদের সাথে যাব।' স্ত্রী বলল, 'তোমার কি মনে নেই, ইয়াসরিবি ভাই কী বলেছিল?' উমাইয়া বলল, 'তাদের সাথে এক-দু মনজিল গিয়েই আমি ফিরে আসব। মদিনার পথ সুদীর্ঘ ৫০০ কিলোমিটার। তাদের সাথে যাব। আমি রাস্তায় গিয়ে সুযোগ বুঝে চলে আসব। তারা তো নাশতার জন্য যাত্রাবিরতি করবে, রাতের খাবারের জন্য যাত্রাবিরতি করবে, রাতযাপনের জন্য যাত্রাবিরতি করবে। ১৩০০ মানুষ। যাত্রাবিরতির কোনো ফাঁকে তাদের ধোঁকা দিয়ে আমি ফিরে আসব।'
কিন্তু আবু জাহেল তার চেয়েও বুদ্ধিমান ছিল। যখনই যাত্রাবিরতি করেছে, উমাইয়া এসেছে এবং তার উটের উপর বসেছে আর অপেক্ষায় থেকেছে যে, যখন লোকজন যাত্রাবিরতি শেষ করে যাত্রার জন্য ব্যস্ত থাকবে তখনই পালাবে। কিন্তু ঠিক তখনই আবু জাহেল এসেছে এবং সেনাদলের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থেকেছে। সে বলত, চলো, সবাই চলো। উমাইয়া দাঁড়াও, চলো। প্রতিটি মনজিলেই আবু জাহেল এমন করত।
এভাবে চলতে চলতে উমাইয়া বদরপ্রান্তরে এসে উপনীত হয় এবং মুসলমানদের হাতে নিহত হয়। এভাবেই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তব হয়ে প্রকাশ পায়।
টিকাঃ
৩. মদিনার প্রাচীন নাম।
৪. প্রতিমাপূজা ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করার কারণে কাফেররা মুসলমানদের বিধর্মী বলত।
৫. 'আবু সাফওয়ান' উমাইয়া বিন খালফের উপাধি।
৬. আবু জাহেলের আসল নাম। যার অর্থ সেরা জ্ঞানী। কিন্তু বুঝেশুনে ইসলামকে উপেক্ষা করার কারণে ইসলামের পক্ষ থেকে তাকে উপাধি দেওয়া হয়েছে আবু জাহেল-মূর্খের সেরা।
মুসা বিন উকবা তার মাগাজিতে বর্ণনা করেছেন, জাহেলি যুগে সাআদ বিন মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং উমাইয়া বিন খালফের মাঝে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক ছিল। সেই সূত্রে উমাইয়া বিন খালফ যখন সিরিয়া সফরের ইচ্ছা করত, তখন মক্কার উত্তরাঞ্চল হয়ে যাত্রা করে মদিনায় গিয়ে বিশ্রামের জন্য সাআদ বিন মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহুর বাড়িতে দু-এক দিন অবস্থান করত। যাত্রাবিরতির পর আবার সিরিয়ার দিকে রওয়ানা হতো। এরপর যখন সিরিয়া থেকে দক্ষিণাঞ্চল হয়ে ফিরত, তখনও মদিনায় এসে তার বন্ধুর বাড়িতে বিশ্রামের জন্য দু-এক দিন অবস্থান করে মক্কার দিকে যাত্রা করত।
সাআদ বিন মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজেও এমনটি করতেন। যখন ইয়ামেন যেতেন বা কোনো প্রয়োজনে মক্কায় যেতেন, উমাইয়া বিন খালফের বাড়িতে মেহমান হতেন। দু-এক দিন বিশ্রাম করে গন্তব্যের পথে যাত্রা করতেন। ইতোপূর্বে মুসলিম ও কুরাইশদের মাঝে কোনো যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাত্র কিছুদিন হলো মদিনায় হিজরত করেছেন।
হঠাৎ একদিন সাআদ বিন মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহু কোনো প্রয়োজনে মক্কায় গেলেন। সেখানে বন্ধু উমাইয়া বিন খালফের বাড়িতে মেহমান হলেন। সাআদ উমাইয়াকে বললেন, 'একটু নিরিবিলি সময়ের প্রতি লক্ষ রেখো, আমি কাবাঘর তাওয়াফ করার ইচ্ছে করেছি।'
উমাইয়া বলল, 'ঠিক আছে, আমি দুপুরে রোদের প্রখরতা কমে এলে তোমাকে নিয়ে যাব। সাধারণত এ সময় লোকজন বাড়িতে অবস্থান করে। আমি আর তুমি বের হব। তুমি তাওয়াফ করবে। এতে ভীড়ের মাঝেও পড়তে হবে না, আবার পথে আমাদের কেউ দেখতেও পাবে না। এতে অহেতুক ঝামেলা এড়ানো যাবে।
যখন দুপুর হলো, উমাইয়া বিন খালফ তার সাথির হাত ধরে বের হলো। রাস্তায় তাদের সাথে কোনো দাসদাসীরও সাক্ষাৎ হয়নি, দুর্বল কোনো মানুষের সাথেও দেখা হয়নি। কিন্তু কাফেরদের নেতা, এই উম্মাহর ফেরাউন আবু জাহেলের সঙ্গে হঠাৎ সাক্ষাৎ।
আবু জাহেল উমাইয়াকে জিজ্ঞাসা করল, 'উনি কে?'
উমাইয়া বলল, 'আমার ইয়াসরিবি ভাই।'
আবু জাহেল জিজ্ঞাসা করল, 'ইয়াসরিব থেকে এসেছে?'
উমাইয়া বলল, 'হ্যাঁ।'
তখন আবু জাহেল রেগে সাআদ বিন মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলল, 'তোমরা মুহাম্মদ এবং তার সাথের বিধর্মীদের আশ্রয় দিয়েছ। তারপর আবার নিরাপদে কাবাঘর তাওয়াফ করতে এসেছ! আল্লাহর শপথ, যদি তুমি আবু সাফওয়ানের সাথে না থাকতে, তা হলে নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারতে না।'
আবু জাহেলের কথা শুনে সাআদ বিন মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহুও রেগে গেলেন। তিনি এই ধরনের অভদ্রতা দেখে সহ্য করার মতো নেতা ছিলেন না। তিনি তো মদিনার নিজ কওমের নেতাদের অন্যতম ছিলেন। তিনি অগ্নিশর্মা হয়ে বললেন, 'হে আবু জাহেল, তুই যদি আমাকে এই পবিত্র কাজ 'তাওয়াফ' থেকে বাধা দিস, তা হলে আমি তোকে আরও প্রিয় কাজ থেকে বাধা দেব।'
আবু জাহেল বলল, 'তুমি আমাকে কোন্ কাজ থেকে বাধা দেবে? তোমাদের মদিনায় কি কাবা আছে যে, সেখানে আমাকে বাধা দেবে?'
সাআদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তোকে সিরিয়ার পথে চলতে বাধা দেব।'
আবু জাহেল রেগে বলল, 'আল্লাহর কসম, তুমি পারবে না।'
সাআদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'অবশ্যই পারব।'
দুজনের মাঝে বিতর্ক চলতে থাকল। ওদিকে উমাইয়া বিন খালফ অসহায়ের মতো একবার ডানে তাকিয়ে দেখে মদিনার নেতা সাআদ বিন মুআজ; আবার বামে তাকিয়ে দেখে মক্কার নেতা আবু জাহেল। সে বুঝতে পারছিল না, কার পক্ষ নেবে!
একপর্যায়ে তার মন আবু জাহেলের দিকে আকৃষ্ট হলো। সাআদ বিন মুআজের দিকে লক্ষ্য করে উমাইয়া বলল, 'সাআদ, আবুল হিকামের উপর জোরে কথা বোলো না। সে এই এলাকার নেতা।'
সাআদ বিন মুআজ রাদিয়াল্লাহু আনহু বিতর্ক বন্ধ করে উমাইয়াকে সম্বোধন করে বললেন, 'উমাইয়া, আমাকে ছেড়ে দাও! আল্লাহর শপথ, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে শুনেছি, আমরা তোমাকে হত্যা করব।'
উমাইয়া বলল, 'হা-হা-হা! মুহাম্মদ তোমাদের বলেছে, তোমরা আমাকে হত্যা করবে?' সাআদ বললেন, 'হ্যাঁ।'
উমাইয়া বলল, 'আল্লাহর কসম, মুহাম্মদ কখনো মিথ্যা বলে না; কিন্তু এবার তোমাদের মিথ্যা বলেছে। আচ্ছা বলো তো, তোমরা আমাকে কোথায় হত্যা করবে, মক্কায় নাকি অন্য কোথাও?'
সাআদ বিন মুআজ বললেন, 'আমি জানি না, মক্কায় নাকি অন্য কোথাও! তবে কথা হলো, তুমি নিহত হবে এবং তা হবে মুসলমানদের হাতেই।'
উমাইয়া বিন খালফ বিতর্ক ছেড়ে চলে গেল এবং মনে মনে বলতে লাগল, মুহাম্মদ কখনো মিথ্যা বলে না। স্ত্রীর সামনে গিয়ে বলল, 'হে উম্মে সাফওয়ান,' স্ত্রী বলল, 'হ্যাঁ, বলুন।'
উমাইয়া বলল, 'তুমি কি জানো, ইয়াসরিবি ভাই আমাকে কী বলেছে?' স্ত্রী বলল, 'সে কী বলেছে?'
উমাইয়া বলল, 'সে বিশ্বাস করে, মুহাম্মদ নাকি সংবাদ দিয়েছে যে, তারা আমাকে হত্যা করবে।'
স্ত্রী বলল, 'আল্লাহর কসম, মুহাম্মদ মিথ্যা বলে না, কিন্তু কোথায় হত্যা করবে, মক্কায় নাকি অন্য কোথাও?'
উমাইয়া বলল, 'আল্লাহর কসম, আমি জানি না, কিন্তু তোমাকে ছেড়ে আমি কখনো মক্কা থেকে বের হব না। মক্কায় পাহারা-নিরাপত্তা রয়েছে। এখানে আমার দাসদাসী আছে, আমার কওম আছে, আমি কখনো মক্কা থেকে বের হব না।'
সুতরাং এভাবে কিছুদিন চলল। একসময় কুরাইশের একটি কাফেলা যাত্রা করল এবং মদিনার নিকটবর্তী পথ ধরে চলতে লাগল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের পাকড়াও করার জন্য বের হলেন। তখন আবু সুফিয়ান মক্কায় দূত পাঠাল, যেন তাদের সাহায্যে ও যুদ্ধ করার জন্য, কাফেলাকে বাঁচানোর স্বার্থে মক্কাবাসী বের হয়ে আসে। সংবাদ পাওয়া-মাত্র আবু জাহেল মানুষের মাঝে ঘুরে ঘুরে বলতে লাগল, 'হে লোকসকল, তোমাদের কাফেলার উদ্দেশে বের হও এবং তাদের রক্ষা করো।'
এই ঘোষণা শুনে প্রতিটি মানুষ যুদ্ধযাত্রার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করেছে; কেবল একজন ছাড়া। সে হলো, উমাইয়া বিন খালফ। সে ছায়ায় বসে আছে। আবু জাহেল তার পাশ দিয়ে যাচ্ছে-আসছে। লোকজন প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। উমাইয়া বিন খালফ কাবার ছায়ায় উপবিষ্ট। আবু জাহেল এক-দুবার এল-গেল, উমাইয়া বসেই আছে। একসময় আবু জাহেল তার কাছে গিয়ে বলল, 'হে উমাইয়া, হে আবু সাফওয়ান, এসো, প্রস্তুত হও।'
উমাইয়া বলল, 'আমি না-যাওয়ার ইচ্ছে করেছি।'
আবু জাহেল বলল, 'আশ্চর্য! তুমি কী বলছ এটা! তুমি বসে গেলে সবাই বসে যাবে। তুমি অন্য সবার মতো নও। তুমি তো কওমের অন্যতম নেতা।'
উমাইয়া বলল, 'তোমার কি মনে আছে, ইয়াসরিবি ভাই কী বলেছিল?'
আবু জাহেল বলল, 'হে আবু সাফওয়ান, আমাদের সাথে চলো। তুমি তো দেখছি এখন পুরো সেনাদলকেই বিভ্রান্ত করবে!'
উমাইয়া বলল, 'আমি মক্কা থেকে এক পা-ও নড়ব না।'
আবু জাহেল কাফের ও পথভ্রষ্ট; তবে সে প্রচণ্ড ধী-শক্তির অধিকারী ছিল। আবু জাহেল চলে গেল এবং একটি ধুনুচি এনে তাতে আগুন রাখল। এরপর তাতে ধুপসলার টুকরো দিলো। তারপর উমাইয়ার কাছে গেল। উমাইয়া তখন নিজ কওমের সাথে বসা ছিল। উমাইয়াকে লক্ষ করে আবু জাহেল বলল, 'ধরো, সুগন্ধি মাখো! তুমি তো পুরুষ নও, নারী!'
উমাইয়া বলে উঠল, 'কী বললে? আমি নারী!'
আবু জাহেল বলল, 'হ্যাঁ, যদি তুমি পুরুষ হতে, তা হলে পুরুষের সাথে যুদ্ধ করতে সম্মত হতে। তুমি অন্দরমহলের নারীদের সাথে বসে থাকো, আমরা যুদ্ধে যাচ্ছি।'
উমাইয়া ক্ষিপ্ত হয়ে ধুনুচি ছুড়ে ফেলে বাড়ির দিকে গেল। স্ত্রীকে বলল, 'হে উম্মে সাফওয়ান, সামানা তৈরি করে দাও।'
স্ত্রী বলল, 'কীসের জন্য সামানা তৈরি করব?'
উমাইয়া বলল, 'সৈন্যদের সাথে যাব।'
স্ত্রী বলল, 'তোমার কি মনে নেই, ইয়াসরিবি ভাই কী বলেছিল?'
উমাইয়া বলল, 'তাদের সাথে এক-দু মনজিল গিয়েই আমি ফিরে আসব। মদিনার পথ সুদীর্ঘ ৫০০ কিলোমিটার। তাদের সাথে যাব। আমি রাস্তায় গিয়ে সুযোগ বুঝে চলে আসব। তারা তো নাশতার জন্য যাত্রাবিরতি করবে, রাতের খাবারের জন্য যাত্রাবিরতি করবে, রাতযাপনের জন্য যাত্রাবিরতি করবে। ১৩০০ মানুষ। যাত্রাবিরতির কোনো ফাঁকে তাদের ধোঁকা দিয়ে আমি ফিরে আসব।'
কিন্তু আবু জাহেল তার চেয়েও বুদ্ধিমান ছিল। যখনই যাত্রাবিরতি করেছে, উমাইয়া এসেছে এবং তার উটের উপর বসেছে আর অপেক্ষায় থেকেছে যে, যখন লোকজন যাত্রাবিরতি শেষ করে যাত্রার জন্য ব্যস্ত থাকবে তখনই পালাবে। কিন্তু ঠিক তখনই আবু জাহেল এসেছে এবং সেনাদলের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থেকেছে। সে বলত, চলো, সবাই চলো। উমাইয়া দাঁড়াও, চলো। প্রতিটি মনজিলেই আবু জাহেল এমন করত।
এভাবে চলতে চলতে উমাইয়া বদরপ্রান্তরে এসে উপনীত হয় এবং মুসলমানদের হাতে নিহত হয়। এভাবেই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তব হয়ে প্রকাশ পায়।
টিকাঃ
৩. মদিনার প্রাচীন নাম।
৪. প্রতিমাপূজা ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করার কারণে কাফেররা মুসলমানদের বিধর্মী বলত।
৫. 'আবু সাফওয়ান' উমাইয়া বিন খালফের উপাধী।
৬. আবু জাহেলের আসল নাম। যার অর্থ সেরা জ্ঞানী। কিন্তু বুঝেশুনে ইসলামকে উপেক্ষা করার কারণে ইসলামের পক্ষ থেকে তাকে উপাধী দেওয়া হয়েছে আবু জাহেল—মূর্খের সেরা।
📄 বিষ মাখানো গোশত
ইমাম বুখারি রহমাতুল্লাহি আলাইহি সহিহ বুখারিতে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর সূত্রে বর্ণনা করেছেন, খায়বার বিজয়ের পর এক-ইহুদি নারী নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে খাবারের দাওয়াত দিলো। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাওয়াত গ্রহণ করে মহিলার বাড়ি গেলেন। এ দিকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-সহ সাহাবিগণ দীর্ঘদিন যাবত খায়বার অবরোধ করে রেখেছেন। ফলে সাহাবিগণ ছিলেন ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। তাঁদের খাবারের তীব্র প্রয়োজন ছিল। ওই মহিলা খাবারের দাওয়াত দিলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদের নিয়ে সেখানে গেলেন। তাঁরা ভুনা বকরির চারদিকে বসে গেলেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাওয়ার জন্য বকরির বাহু উঠালেন এবং খেতে মুখ লাগালেন তখন সাহাবিগণ চিৎকার করে খাওয়া থেকে নবিজিকে নিবৃত্ত করলেন এবং বাহুটা রেখে দিলেন। তারপর নবিজি বললেন, 'ইহুদিদের আমার সামনে ডাকো।' ডাকা হলে তাদের নেতৃবৃন্দ এল এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে দাঁড়াল। নবিজি তাদের বললেন, 'হে ইহুদিরা, তোমরা আমাকে একটি সত্য কথা বলবে?'
ইহুদিরা বলল, 'হ্যাঁ, হে আবুল কাসিম।'
নবিজি বললেন, 'তোমাদের পিতা কে?'
তারা বলল, 'অমুক।'
নবিজি বললেন, 'তোমরা মিথ্যে বলছ; বরং তোমাদের পিতা অমুক।'
তারা বলল, 'আপনি সত্যিই বলেছেন। কেননা, ইহুদিরা নিজেদের পিতৃপুরুষ জাবানের দাদার দিকে সম্বোধন করত। আর যখন তাদের বংশীয় গৌরবের দিকে লক্ষ করে জিজ্ঞাসা করা হতো, তোমাদের পিতৃপুরুষ কে? তখন তারা ভিন্ন পিতৃপুরুষের নাম বলত যিনি প্রকৃতপক্ষে খায়বারের ইহুদিদের পিতৃপুরুষ ছিলেন না; তারা হলো অন্য ইহুদি বংশধারা। এরা নিজেদের পিতৃপুরুষ জাবানের দিকে সম্বোধিত করত, তবে বংশীয় গৌরবের ব্যাপার হলে অন্য পিতৃপুরুষের দিকে নিজেদের সম্বোধন করত।
সুতরাং তারা বলল, 'আমাদের পিতৃপুরুষ অমুক, তিনি হলেন অন্য পিতৃপুরুষ।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমরা মিথ্যে বলছ, তোমাদের পিতৃপুরুষ তো অমুক।'
তারা বলল, 'আপনি ঠিক এবং ন্যায়সঙ্গত বলেছেন।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হে ইহুদিরা, তোমরা আমাকে আরেকটি সত্য কথা বলবে?'
ইহুদিরা বলল, 'হ্যাঁ, হে আবুল কাসিম। আমরা যদি মিথ্যা বলি, তা হলে তো আপনি পূর্বের মতো এবারও আমাদের মিথ্যা ধরে ফেলবেন।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, 'জাহান্নামি কারা?'
তারা বলল, 'আমরা সেখানে অল্প কিছু সময় থাকব, তারপর আপনারা আমাদের অনুসরণ করবেন।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বললেন, 'তোমরা সেখানে লাঞ্ছিত হবে। আল্লাহর কসম, আমরা সেখানে কখনোই তোমাদের অনুসরণ করব না।' নবিজি তাদের বললেন, 'হে ইহুদিরা, আমাকে কি আরেকটি সত্য কথা বলবে?'
তারা বলল, 'হ্যাঁ।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমরা কি বকরির গোশতে বিষ মিশিয়েছ?'
তারা বলল, 'হ্যাঁ।'
নবিজি বললেন, 'তোমরা কেন বিষ মিশিয়েছ?'
তারা বলল, 'আমরা ভাবলাম, যদি আপনি সাধারণ রাজা-বাদশাহ হন, তা হলে মারা যাবেন আর আমরা আপনার থেকে মুক্তি পাব। আর যদি আপনি নবি হন, তা হলে আপনার কোনো ক্ষতি হবে না; কিন্তু আপনাকে বিষয়টি কে জানিয়েছে?'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'বকরির বাহু।'
সুবহানাল্লাহ! নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বকরির বাহুর মাংস ভালোবাসতেন। তাই যখন খাওয়ার জন্য বাহুটি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুখের কাছে নিলেন, তখন বাহুই বলল, 'আমাকে খাবেন না, আমি বিষাক্ত হে আল্লাহর রাসুল।'
ইমাম বুখারি রহমাতুল্লাহি আলাইহি সহিহ বুখারিতে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর সূত্রে বর্ণনা করেছেন, খায়বার বিজয়ের পর এক-ইহুদি নারী নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে খাবারের দাওয়াত দিলো। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাওয়াত গ্রহণ করে মহিলার বাড়ি গেলেন। এ দিকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-সহ সাহাবিগণ দীর্ঘদিন যাবত খায়বার অবরোধ করে রেখেছেন। ফলে সাহাবিগণ ছিলেন ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। তাঁদের খাবারের তীব্র প্রয়োজন ছিল। ওই মহিলা খাবারের দাওয়াত দিলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদের নিয়ে সেখানে গেলেন। তাঁরা ভুনা বকরির চারদিকে বসে গেলেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাওয়ার জন্য বকরির বাহু উঠালেন এবং খেতে মুখ লাগালেন তখন সাহাবিগণ চিৎকার করে খাওয়া থেকে নবিজিকে নিবৃত্ত করলেন এবং বাহুটা রেখে দিলেন। তারপর নবিজি বললেন, 'ইহুদিদের আমার সামনে ডাকো।' ডাকা হলে তাদের নেতৃবৃন্দ এল এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে দাঁড়াল। নবিজি তাদের বললেন, 'হে ইহুদিরা, তোমরা আমাকে একটি সত্য কথা বলবে?'
ইহুদিরা বলল, 'হ্যাঁ, হে আবুল কাসিম।'
নবিজি বললেন, 'তোমাদের পিতা কে?'
তারা বলল, 'অমুক।'
নবিজি বললেন, 'তোমরা মিথ্যে বলছ; বরং তোমাদের পিতা অমুক।'
তারা বলল, 'আপনি সত্যিই বলেছেন।'
কেননা, ইহুদিরা নিজেদের পিতৃপুরুষ জাবানের দাদার দিকে সম্বোধন করত। আর যখন তাদের বংশীয় গৌরবের দিকে লক্ষ করে জিজ্ঞাসা করা হতো, তোমাদের পিতৃপুরুষ কে? তখন তারা ভিন্ন পিতৃপুরুষের নাম বলত যিনি প্রকৃতপক্ষে খায়বারের ইহুদিদের পিতৃপুরুষ ছিলেন না; তারা হলো অন্য ইহুদি বংশধারা। এরা নিজেদের পিতৃপুরুষ জাবানের দিকে সম্বোধিত করত, তবে বংশীয় গৌরবের ব্যাপার হলে অন্য পিতৃপুরুষের দিকে নিজেদের সম্বোধন করত।
সুতরাং তারা বলল, 'আমাদের পিতৃপুরুষ অমুক, তিনি হলেন অন্য পিতৃপুরুষ।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমরা মিথ্যে বলছ, তোমাদের পিতৃপুরুষ তো অমুক।'
তারা বলল, 'আপনি ঠিক এবং ন্যায়সঙ্গত বলেছেন।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হে ইহুদিরা, তোমরা আমাকে আরেকটি সত্য কথা বলবে?'
ইহুদিরা বলল, 'হ্যাঁ, হে আবুল কাসিম। আমরা যদি মিথ্যা বলি, তা হলে তো আপনি পূর্বের মতো এবারও আমাদের মিথ্যা ধরে ফেলবেন।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, 'জাহান্নামি কারা?'
তারা বলল, 'আমরা সেখানে অল্প কিছু সময় থাকব, তারপর আপনারা আমাদের অনুসরণ করবেন।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বললেন, 'তোমরা সেখানে লাঞ্ছিত হবে। আল্লাহর কসম, আমরা সেখানে কখনোই তোমাদের অনুসরণ করব না।' নবিজি তাদের বললেন, 'হে ইহুদিরা, আমাকে কি আরেকটি সত্য কথা বলবে?'
তারা বলল, 'হ্যাঁ।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমরা কি বকরির গোশতে বিষ মিশিয়েছ?'
তারা বলল, 'হ্যাঁ।'
নবিজি বললেন, 'তোমরা কেন বিষ মিশিয়েছ?'
তারা বলল, 'আমরা ভাবলাম, যদি আপনি সাধারণ রাজা-বাদশাহ হন, তা হলে মারা যাবেন আর আমরা আপনার থেকে মুক্তি পাব। আর যদি আপনি নবি হন, তা হলে আপনার কোনো ক্ষতি হবে না; কিন্তু আপনাকে বিষয়টি কে জানিয়েছে?'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'বকরির বাহু।'
সুবহানাল্লাহ! নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বকরির বাহুর মাংস ভালোবাসতেন। তাই যখন খাওয়ার জন্য বাহুটি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুখের কাছে নিলেন, তখন বাহুই বলল, 'আমাকে খাবেন না, আমি বিষাক্ত হে আল্লাহর রাসুল।'